মধুময় পাল
ইতিহাসমালা
সংকলন : উইলিয়াম্ কেরী
সম্পাদনা : ফাদার দ্যতিয়েন
গাঙচিল
কলকাতা, ২০১১
১৭৫ টাকা
দুশো বছর আগেকার বাংলা গদ্য।
আলোচনা শুরুর আগে সেই গদ্যের দুটো নমুনা পেশ করা যাক :
এক. রাজসভায় বানরকে চাবুকাঘাত উত্তরদিকে তাম্রলিপ্তিকা নামে এক নগর। তাহাতে চন্দ্রাবলোক নামে এক রাজা থাকেন। সে-রাজা পাত্র-মিত্র-পন্ডিত-সৎকবি ইত্যাদি লইয়া সর্বদা আমোদ করেন। সে-রাজা বড় বিদগ্ধ। যে-সময়ে রাজা সভাস্থ হইয়া থাকেন, সেই সময় এক বানর প্রত্যহ রাজাকে পাঁচ মাণিক্য দেয়। রাজা বানরকে পাঁচ চাবুক খুব কসিয়া মারেন। এই প্রকার কথক দিন যায়। এক দিবস পাত্র-আদি সকলে কহিতে লাগিল, ‘হে মহারাজ, এই বানর প্রত্যহ পাঁচ মাণিক্য আপনাকে দেয়; আপনি তাহাকে প্রত্যহ মারেন – ইহার কারণ কি?’ তাহাতে রাজা বলিলেন, ‘তোমরা বুঝ নাই। ছোট লোককে মুখ দিলে সে মাথার উপর চড়ে – ইহা তোমারদিগকে প্রত্যক্ষত দেখাই।’ তাহার পরদিন সে-বানর রাজাকে সেই সময় পাঁচ মাণিক্য দিলো; রাজা সে-দিবস মারিলেন না। তাহাতে যেখানে বানর বসিত, সে-স্থানে সেদিন না বসিয়া রাজার কিছু নিকটস্থ হইয়া বসিল। এই প্রকার তিন দিবসে রাজার আসনে বানর বসিল। রাজা পাত্রেরদিগকে বলিলেন, ‘বানরের আচরণ দেখিলা?’ ইহা বলিয়া পূর্ববৎ চাবুক মারিলেন। বানর যে-স্থানে বসিত, সেই স্থানে বসিল।
অতএব ছোট লোককে মুখ দেওয়া ভালো নয় ইতি।
কাহিনিটির বক্তব্য আমাদের বিচার্য নয়; এখানে যে-হীন মানসিকতার পরিচয় আছে, তা দুশো বছর আগেকার বাংলার সমাজের একটা ছবি হিসেবে গণ্য করা যায়; মানসিকতাটি যে এখন পুরোপুরি লোপ পেয়েছে, সে-কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না।
দুই. কৃষকপত্নীর গণনায় মাছের হিসাব এক কৃষক লাঙল চসিতে গিয়া কোনো খালে গোটা চর্বিশেক মৎস্য ধরিয়া গৃহে আসিয়া আপন গৃহিণীকে পাক করিতে দিয়া আপনি পুনর্বার লাঙল চসিতে গেল। তাহার গৃহিণী সে মৎস্য কয়টি পাক করিয়া মনে বিবেচনা করিল যে, ‘মৎস্য পাক করিলাম; কিন্তু কি-প্রকার হইয়াছে, চাখিয়া দেখি।’ ইহা ভাবিয়া কিঞ্চিৎ ঝোল লইয়া খাইয়া দেখিল যে, ঝোল সরস হইয়াছে। পরে পুনর্বার ভাবিল, ‘মৎস্য কি-রূপ হইয়াছে, তাহাও চাখিয়া দেখি।’ ইহা ভাবিয়া একটি মৎস্য খাইল। পুনর্বার চিন্তা করিল যে, ‘ওটি কী-রূপ হইয়াছে, তাহাও চাখিতে হয়!’ ইহা ভাবিয়া সেটিও খাইল। এইরূপ খাইতে খাইতে একটিমাত্র অবশিষ্ট রাখিল। পরে কৃষক ক্ষেত্র হইতে বাটী আইলে তাহার গৃহিণী সেই মৎস্যটি আর অন্ন তাহাকে দিলে কৃষক কহিল, ‘এ কি? চর্বিশটা মৎস্য আনিয়াছি, আর কি হল?।’ তখন তাহার স্ত্রী মৎস্যের হিসাব দিলো : ‘মাছ আনিলা ছয় গন্ডা; চিলে নিলে দু গন্ডা, বাঁকী রহিল ষোল। তাহা ধুতে আটটা জলে পলাইল, তবে থাকিল আট। দুইটায় কিনিলাম দুই আটি কাট, তবে থাকিল ছয়। প্রতিবাসিকে চারিটা দিতে হয়, তবে থাকিল দুই। আর একটা চাখিয়া দেখিলাম মুই। তবে থাকিল এক; ঐ পাত-পানে চাহিয়া দেখ। এখন হইস যদি মানুষের পো, কাঁটাখান খাইয়া মাছখান থো। আমি যেঁই মেয়ে তেঁই হিসাব দিলাম কয়ে।’ এইরূপ মৎস্যের হিসাবে কৃষকের প্রত্যয় জন্মাইল ইতি \
এই কাহিনির নীতিকথা হতে পারে, লোভী স্ত্রীর মিথ্যাচার বা এইরকম কিছু। চতুর স্ত্রীজাতির হাতে সরল পুরুষজাতি কীভাবে বঞ্চিত ও পীড়িত হয়ে থাকে, তারই আখ্যান। সমাজে এই আখ্যান একদা ব্যাপকভাবেই চালু ছিল এবং এখন হয়তো ঈষৎ গোপনে আড়ালে চালু আছে। কিন্তু আমাদের আলোচনা সেই সমাজতত্ত্ব নয়।
শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশন এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ইউরোপীয় যাজক সম্প্রদায় ও তাঁদের বেতনভোগী বঙ্গজ মুন্শিদের সম্মিলিত প্রয়াস যখন বাংলা গদ্যের একটা নড়বড়ে আদলের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, ধর্মীয় গ্রন্থের দৈবত্ব বজায় রাখতে গিয়ে সেই আদলটাও হয়ে পড়ছে দুর্বোধ্য ও অস্বাভাবিক, সেই সময় উপরিউক্ত দুটি আখ্যান সংবলিত সাবলীল ও সংকেতময় বাংলা গ্রন্থের প্রকাশ শুধু ঐতিহাসিক নয়, বিস্ময়কর ঘটনা। বইটির নাম ইতিহাসমালা। উইলিয়াম কেরী-সংকলিত। শ্রীরামপুরের মিশন প্রেসে ছাপা হয় ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে। ১৫০টি আখ্যান আছে গ্রন্থে। সুকুমার সেন এর মূল্যায়নে বলেছেন, ‘ইতিহাসমালা আসলে আধুনিক ভারতবর্ষের লোক888sport live footballের প্রথম গল্প সংকলন।’ তিনি এই গল্পগুলির উৎস হিসেবে পঞ্চতন্ত্র হিতোপদেশ, কথাকোষ, পুরুষপরীক্ষা, বসুদেব হিন্দি প্রভৃতি সংস্কৃত ও অপভ্রংশ সংকলন বেতালপঞ্চবিংশতি, দ্বাত্রিংশৎপুত্তলিকা, ফারসি, ইউরোপীয়, কবিকঙ্কনের চন্ডীমঙ্গল, অর্ধ-ঐতিহাসিক গল্প সংকলনের কথা বলেছেন। এবং জানিয়েছেন ৪০টি গল্পের কোনো ভূমিকা নেই, লোকের কিংবা স্থানের কোনো নাম নেই, এগুলি বোধহয় প্রকৃত কথিত গল্প। 888sport app download apk latest versionক বা লেখকের বিশদ বিবরণ নামপত্রে নেই, শুধু বলা হয়েছে ‘বিভিন্ন স্থান থেকে সংকলিত, বাংলা ভাষায় রচিত গল্পগুচ্ছের এক সংকলন।’ সংকলক উইলিয়াম কেরী। ইতিহাসমালা। / or/ A Collection/ of/ Stories/ in/ The Bengalee Language/ Collected from various sources./ By W. Carey, D.D.
888sport live football-সমালোচক ও শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাস বৈশাখ, ১৩৪৯ (ইং ১৯৪২)-এ লিখেছেন, ‘ইতিহাসমালার ভাষা ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের প্রাথমিক যুগের ভাষা অপেক্ষা অনেক উন্নত এবং গদ্যরচনার একটা স্টাইলও ইহাতে লক্ষিত হয়। গল্পগুলির অধিকাংশই ব্যঙ্গপ্রধান, বত্রিশ সিংহাসনের টুকরা টুকরা গল্পের মতো। কেরী যদি স্বয়ং এগুলি রচনা করিয়া থাকেন, তাহা হইলে বলিতে হইবে, বাইবেল-888sport app download apk latest versionের আড়ষ্টতা তিনি ইহাতে বর্জ্জন করিয়াছেন – অবশ্য ‘কথোপকথন’-এর সবেগ সাবলীলতা ইহাতে নাই কিন্তু ভাষা নিতান্ত নীরসও নয়।’ প্রসঙ্গত উইলিয়াম কেরী-সম্পাদিত নিউ টেস্টামেন্ট প্রকাশিত হয় ইং ১৮০১-এ, কেরীর কথোপকথন ১৮০১-এ (বাঙালি-রচিত প্রথম বাংলা গদ্য পুস্তক রামরাম বসুর রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র প্রকাশের এক মাস আগে), ওল্ড টেস্টামেন্ট – মোশার ব্যবস্থা ১৮০২, ওল্ড টেস্টামেন্ট – দাউদের গীত ১৮০৩, ওল্ড টেস্টামেন্ট – ভবিষ্যদ্বাক্য ১৮০৭, ওল্ড টেস্টামেন্ট – য়িশরালের বিবরণ ১৮০৯, ইতিহাসমালা ১৮১২ এবং বাংলা-ইংরেজী অভিধান ১৮১৫-২৫।
কথোপকথন কেরীর লেখা কি না সে-বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন সজনীকান্ত দাস। তাঁর অনুমান, এই বই সম্ভবত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের লেখা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতদের মধ্যে ‘অন্য কেহ তাঁহার মত মৌখিক ভাষা এবং প্রচলিত ইডিয়ম সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাঁহার কথোপকথন-পারদর্শিতার পরিচয় আমরা তাঁহার ‘বত্রিশ সিংহাসন’, ‘হিতোপদেশ’ ও ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’য় যথেষ্ট পরিমাণে পাইয়াছি। তথাপি, কেরীর নামে যখন পুস্তকটি বাহির হইয়াছে, আজ সকল প্রশংসা কেরীরই প্রাপ্য।’ কথোপকথনের ‘কন্দল’ শিরোনামের লেখাটি থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হলো : ‘আর শুনেছিসতো নির্ম্মলের মা। এই যে বেনে মাগীর অহঙ্কারে আর চকে মুখে পথ দেখে না। হ্যাদ্যাখ কালি যে আমার ছেলে পথে ভাড়িয়াছিল তা ঐ বুড়া মাগী তিন চারি ছেলের মা করিলে কি ভরন্ত কলসিডা অমনি ছেলের মাথার উপর তলানি দিয়া গেল। সেই হইতে ষাইটের বাছা জ্বরে ঝাউরে পড়েছে। এমন গরবাশুকি বল্লে আবার গালাগালি ঝকড়া করে। এ ভাতার খাগি সর্বনাশীর পুতটা মরুক তিন দিনে উহার তিনডা বেটার মাথা খাউক ঘাটে বসে মঙ্গল গাউক।’ গ্রামবাংলার প্রাকৃত সমাজের প্রত্যহের এই কথনরীতি, ব্যবহৃত শব্দের তীব্রতা ও বিবাদের আক্রমণমুখিতা ইংরেজ মিশনারি কেরী আয়ত্ত করে যদি তা প্রণয়ন করে থাকেন, বাংলাভাষী মানুষ কোনোদিন তাঁকে ভুলতে পারবে না।
ইতিহাসমালা প্রকাশিত হয় ১৮১২-এর মার্চে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেরীর এই বইয়ের কোথাও কোনো উল্লেখ নেই। ১৮০১ থেকে ১৮১২-এর মধ্যে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস ও অন্যত্র বাংলা গদ্যে এবং ইংরেজিতে বাংলা ভাষা-সম্পর্কিত তালিকায় বইটি অনুপস্থিত। রেভারেন্ড লঙের ক্যাটালগেও এর উল্লেখ নেই। শ্রীরামপুরের ‘মেমোয়াসে’ও নেই। এর একটি কারণ, ১১ মার্চ, ১৮১২-তে গুদামে অগ্নিকান্ডে বইয়ের সব কপি পুড়ে যায়। এমনও হতে পারে, কিছু আপত্তিকর আখ্যান থাকায় বইটি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। সজনীকান্ত দাস ১৯৪২-এ এই বইয়ের কয়েকটি কপি বঙ্গীয় 888sport live football পরিষৎ গ্রন্থাগারে লক্ষ করেন। বইটি নিয়ে আলোচনাও করেন। কিন্তু ইতিহাসমালা কার্যত পুনরুদ্ধার করেন, পাঠক সমাজের গোচরে আনেন ফাদার দ্যতিয়েন। ১৯৭২ সালে। প্রথম প্রকাশের ১৬০ বছর পর। ফের তাঁরই সম্পাদনায় নতুন সংস্করণ হলো ২০১১-এ, বইটির দ্বিশতবর্ষপূর্তির প্রাক্কালে। এবং গত বছরই ছিল কেরীর সার্ধজন্মদ্বিশতবর্ষ।
বেলজিয়ামের নাগরিক দ্যতিয়েন ১৯৫০-এর ২৫ জানুয়ারি কলকাতায় আসেন। বলেছেন, ‘সদ্য আগত আমি কলকাতার রাস্তাঘাটে বেড়িয়েছিলাম মুক্তকণ্ঠে ‘জয়হিন্দ জয়হিন্দ’ চেঁচিয়ে। সেই বছরের সেই মাসেই আমার বাংলা ভাষায় হাতে খড়ি অনুষ্ঠিত হয়েছে কেরী সাহেবের পুণ্য888sport sign up bonusচিহ্নিত সেই শ্রীরামপুরে।’ শ্রীরামপুরে এক বছর কাটিয়ে ব্যাঘ্র-অধ্যুষিত সুন্দরবনের বাসন্তীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সেখান থেকে শান্তিনিকেতনে পড়তে যান।
বঙ্গীয় 888sport live football পরিষদের গ্রন্থাগারে তিন কপি ও জাতীয় গ্রন্থাগারে এক কপি ইতিহাসমালা দেখেছেন দ্যতিয়েন। সেই চারটি কপির ভিত্তিতে গ্রন্থের আকার, আয়তন, মুদ্রিত এলাকার পরিসর, মুদ্রণ বিন্যাস, গল্পের দৈর্ঘ্য, যতিচিহ্নের ব্যবহার, মুদ্রণ প্রমাদ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করেছেন। বিশ্লেষণ করেছেন ইতিহাসমালার ভাষা ও ব্যাকরণ, বাক্যবিন্যাস, লিখনশৈলী। ইংরেজ মিশনারি উইলিয়াম কেরী-সম্পাদিত বাংলা গদ্যের বিকাশপর্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বইটি নিয়ে প্রথম আলোচনা করলেন বেলজিয়াম মিশনারি দ্যতিয়েন। সুকুমার সেন ইতিহাসমালার ইংরেজি 888sport app download apk latest version করেন ১৯৭৭-এ। উৎসর্গ পৃষ্ঠায় তিনি লেখেন : To Father Detienne, who resurrected Carey’s work from the oblivion of more than a hundred and sixty years.
ইতিহাসমালার একটি আখ্যান উদ্ধৃত করে সজনীকান্ত দাস লিখেছিলেন, ‘রামরাম বসুর ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ হইতে মাত্র বারো বৎসরের মধ্যে বাংলা ভাষার এই উন্নতি কেমন করিয়া সম্ভব হইল, তাহা বুঝিতে হইলে পন্ডিত মুনশীগণের সমবেত চেষ্টা ও কেরীর বৈজ্ঞানিক নির্দ্দেশের কথা 888sport app download for android করিতে হইবে।’ ফাদার দ্যতিয়েন বইয়ের ভাষা ও 888sport live footballগুণ বিশ্লেষণ করে এক বঙ্গজ মুনশির ভূমিকার কথা বলেছেন। অজ্ঞাতপরিচয় সেই মুনশিই ইতিহাসমালার উৎকর্ষের মূলে। বইটি গুদামে ভস্মীভূত হওয়ায় বাংলা দেশ তথা জগৎ সেই বাঙালি সন্তানকে চিনতে ও জানতে পারল না। সেই মুনশি ‘এমন এক বলীয়ান লেখক, উৎসাহ পেলেই, বাংলা 888sport live footballকে সমৃদ্ধ করতে পারতেন, তাঁর পথ-নির্দেশে বাংলা 888sport live football ত্বরান্বিত পদক্ষেপে সাবালকতার পথে অগ্রসর হয়ে যেতে পারত।’

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.