বেশ বিচিত্র তাঁর জীবন। রংপুরে কলেজজীবনের পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে, স্বজন-পরিজন ত্যাগ করে,
উন্মূল-উদ্বাস্তুর বেশে পাড়ি জমান 888sport appয়, ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে। উদ্দেশ্য লেখক হওয়া। পথে নেমে পথ খুঁজতে গিয়ে রাত কাটাতে হয়েছে পথেঘাটে; এমনকি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রাঙ্গণেও। ক্ষুধার অন্ন জোগাতে কৃপাপ্রার্থী হতে হয়েছে নানা জনের। তবে লেখক হওয়ার বাসনা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। প্রতিষ্ঠার সিঁড়িতে পা রাখার জন্য হানা দিয়েছেন আহসান হাবীব, রাহাত খানদের মতো 888sport live footballিক-সম্পাদকদের দরজায়। সেইসঙ্গে রুটি-রুজির সামান্য ব্যবস্থাও তো চাই। টুকটাক
একাজ-সেকাজ করতে করতে একসময় জুটে যায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ছোটখাটো একটি চাকরি। তাতে পথসন্ধানের দুরূহতা কাটে। গল্পকার হয়ে-ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়। ১৯৮২-তে প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ অবিনাশী আয়োজন দিয়ে নজর কাড়েন, পুরস্কৃত হন।
নোবেল বিজয়ী মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনার তাঁর এক সাক্ষাৎকারে লেখক হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিনটি বিষয়ের আবশ্যকতার কথা বলেছিলেন। সেগুলো হলো – অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা। মঞ্জু সরকার পাথেয় করেছেন তিনটিকেই এবং সফল হয়েছেন। সেই সফলতার পেছনে বড় অবদান রেখেছে তাঁর ভাষা। এমন এক গদ্যশৈলী রপ্ত করেছেন তিনি যাতে পাঠকের মনোযোগ-বিচ্যুতির উপায় থাকে না। লেখকের আত্মজীবনীমূলক রচনা পথে নেমে পথ খোঁজাও আদল পেয়েছে তাই 888sport alternative linkের।
মঞ্জু সরকার জন্মেছেন উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল রংপুরে, পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে। যৌবনের সূচনাতেই দেখা মেলে মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধা হতে বাড়ি থেকে পালিয়ে ভারতে যান, যদিও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সুযোগ পাননি। কর্মযোগ ও লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে 888sport appয় অধিকাংশ সময় কাটালেও জন্মস্থান রংপুরের সঙ্গে সম্পর্ক লঘু করেননি কখনো। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরি ছেড়ে গ্রামে থিতুও হতে চেয়েছিলেন একবার, এখন যেমন নিজেকে সার্বক্ষণিক লেখক ঘোষণা দিয়ে মোটামুটি গ্রামকেই বেছে নিয়েছেন বসবাসের জন্য। অর্জিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার মিশেল ঘটিয়ে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রকৃতির স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। গ্রামের মানুষের চরিত্রের কেবল সরল রূপই দেখেননি, তাদের কারো কারো কুটিল রূপও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি।
গল্প, 888sport alternative link ও শিশু-কিশোর গ্রন্থ মিলিয়ে লেখকের গ্রন্থ888sport free bet অর্ধশত অতিক্রম করেছে বেশ আগেই। বিভিন্ন নামের বইয়ে তাঁর শতাধিক ছোটগল্প রয়েছে। গল্পগুলি উচ্চমানের। বক্তব্য ও পরিবেশনাগুণে অমরত্ব পেতে পারে এর কোনো কোনোটি। বক্ষ্যমাণ 888sport liveের আলোচ্য বিষয় লেখকের ছোটগল্প। তাঁর সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থেকে গুটিকয় গল্প আলোচনার জন্য বেছে নেওয়া হলো।
দুই
স্বাধীনতা সংগ্রাম 888sport appsের ইতিহাসে অতুলনীয় এক ঘটনা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিবিড়ঘন আবেগ, আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিঃশেষ স্বপ্ন। সেই সংগ্রামের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার কারণে মঞ্জু সরকারের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার চিত্র থেকে থেকেই আলো ছড়িয়েছে। এযাবৎ প্রকাশিত তাঁর সর্ববৃহৎ 888sport alternative link অন্তর্দাহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঘটনার সার্থক রূপায়ণ। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বেশকিছু সফল গল্প আছে লেখকের। এর ভেতর দু-একটি নিয়ে আলোচনা করলে গল্পের গভীরতা বোঝা যাবে। ‘দলছুট’ নামক গল্পে যুবক হানিফ ভারতে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নেয়, এরপর ১২ জনের দল নিয়ে বর্ডার পার হয়ে দেশে ঢোকে অপারেশনের উদ্দেশ্যে। এটি তাদের প্রথম অপারেশন। ক্রমশ গভীর হওয়া রাতের অন্ধকার ঠেলে দলটি লক্ষ্যের দিকে এগোয়। এদিকে কুকুকের চিৎকার-চেঁচামেচিতে গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙে, আতঙ্ক ছড়ায় মিলিটারি এলো কি না – এই আশঙ্কায়। ‘ভয় নাই। আমরা মুক্তি’ – এমন অভয়বাণীর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। লেখকের ভাষায়, ‘মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি ঘোষণা ঘুমন্ত গ্রামটিতে যেন প্রাণের সাড়া জাগায়।
মিলিটারি-আতঙ্ক মুছে গিয়ে আনন্দ-কোলাহল জাগে। বাড়িঘর থেকে ছুটে আসে মানুষজন। লম্ফ-হারিকেন হাতে বউঝিরাও বেরিয়ে আসে মুক্তিফৌজকে একনজর দেখার জন্য। গ্রামবাসী ইমামগঞ্জ হাটে পাকবাহিনীর সাম্প্রতিক আগমন ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিবরণ দেয়। পাকবাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছার শর্টকাট রাস্তাও চিনিয়ে দেয়। একজন বৃদ্ধ হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন – ‘যাও বাবারা যুদ্ধে যাও। জানোয়ারগুলাকে খতম করি সহিসালামতে ফিরে আইসেন।’ এক গৃহবধূ বায়না ধরেন মেয়ের বিবাহের মেহমানদের জন্য রান্না করা ক্ষির চেখে যেতে, ‘মুক্তিবাহিনী মোর হাতের ক্ষির চাকি গেইলে কথাটা সারা জেবন মনে থাকপে মোর। আইসেন বাবারা।’
অপারেশনে তীব্র গোলাগুলির মধ্যে পড়ে হানিফ দলবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বাকি রাতটুকুর জন্য আশ্রয়ের দরকার তার। আলো জ্বলতে দেখে কোনো এক বাড়িতে এসে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিয়ে রাতের মতো আশ্রয় চায়। পথ চিনিয়ে দিলে পরদিন বর্ডার পার হয়ে ক্যাম্পে চলে যেতে পারবে একা একাই। মধ্যবয়সী বউ দরজা খোলে, কিন্তু ঘরে ডাকে না। দলছুট মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় পেয়ে ভয়মুক্ত স্বামী বউকে আড়াল করে সামনে দাঁড়ায়। বলে, ‘আপনি ঘরে আরাম করেন বাবা। আমি দেখি, আপনার দলের লোকজনকে খুঁজিয়া পাই কিনা। সকাল বেলা আমি নিজে আপনাকে ইন্ডিয়ায় থুইয়া আসব। মুক্তি ভাইকে ঘরে নিয়া বসাও। আমি আসি।’ বউটির বিস্ময় কাটে না। ফ্যালফ্যাল করে ছেলেটির দিকে তাকায়, ঘরেও ডাকে না। উনি কোথায় গেলেন – এ-প্রশ্নের উত্তরে বধূটি বলে, ‘উনি পাকবাহিনীর দালাল। রাজাকার। আপনি জানেন না?’ অবিশ্বাস্য চোখে তাকালে বউটি বলে, ‘উনি পাকবাহিনী আর রাজাকারদের ডাকতে গেছে। আপনারে ধরায় দেবে। পলায় যান। বাঁচতে চাইলে এ গেরাম ছাড়ি এই দণ্ডে পলায় যান।’ হানিফের গায়ে হাত দিয়ে আরো বলে, ‘আল্লাহ তোমায় বাঁচায় রাখুক ভাই। পালাও জলদি।’ মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ঘটনার যেনবা একটি এই গল্প। মিত্র আছে, আছে শত্রুও।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ের ভিন্ন বাস্তবতার চিত্রও বাদ পড়েনি তাঁর গল্পে। ‘অপারেশন জয় বাংলা’ এর একটি। ভারতে গিয়েও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি এমন এক যুবক হামিদ খুলনা স্টিমারঘাটে আসে 888sport appগামী লঞ্চ ধরার জন্য। ‘এম ভি জিন্নাহ’ নামের লঞ্চখানির নতুন নাম ‘জয় বাংলা’, 888sport appর উদ্দেশে কখন ছেড়ে যাবে ঠিক নেই। হামিদ তাতে চড়ে বসে। ততক্ষণে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে একদল যুবকও যথেষ্ট ঠাটবাট নিয়ে সেখানে চড়ে বসেছে। তাদের একজনের হাতে স্টেনগান, আরেকজনের হাতে রাইফেল। লিডার গোছের একজনের কাছে আছে পিস্তলও। ‘জয় বাংলা’ সেøাগানের হর্ষধ্বনির ভেতর লঞ্চ ছাড়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে। লঞ্চের নিচতলায় রহস্যময় যুবক হিরণ ও তার এক বন্ধু বেডিংপত্র নিয়ে চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর স্টেনগান ও রাইফেলধারী যুবকদের দল শুরু করে অপারেশন। তার আগে বক্তৃতার ঢঙে বলে একজন, ‘বন্ধুগণ, পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু তাদের দোসর বাঙালির দুশমন রাজাকার-আলবদররা আত্মগোপন করে আছে এখনো। তাবলিগ জামাত ও নানা রকম ছদ্মবেশে কিছু কিছু নন-বেঙ্গলি শত্রু এই লঞ্চে আছে।’ হামিদসহ অন্য আরো কয়েকজন লঞ্চ-আরোহীকে তারা সঙ্গে নেয় শত্রু নিধনের জন্য। অবাঙালি আরোহীদের ধরে এনে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে হাত-পা বেঁধে তাদের ছুড়ে ফেলা হতে থাকে নদীতে। রাজাকার-আলবদর প্রমাণ ছাড়া শুধু অবাঙালি হওয়ার কারণে তাদের নির্বিচার হত্যা ও নিঃস্ব করার প্রতিবাদ জানায় হিরণ। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির পর অভিযাত্রীরা পুনরায় নিধন অভিযান শুরু করে। অভিযানের পর ভাগবাটোয়ারার প্রশ্ন এলে অপারেশন তখনো অসমাপ্ত থাকার কথা জানায় কমান্ডার। স্বজাতীয় শত্রুর কথা ওঠে, হিরণ সেই ব্যক্তি। তাকে নকশাল সন্দেহ করা হয়, কেননা নকশালরাও অনেক জায়গায় মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। টার্মিনালে আসার পর হামিদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল এই হিরণের সঙ্গেই। তাকে খাওয়ার জন্য পাঁচটি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল। সেই পরিচয়ের সূত্রে হামিদ চুপচাপ নিচে নেমে হিরণকে তার বিচারের কথা জানায়। গায়ের চাদর খুলে হিরণ ও তার সঙ্গী একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। ছুটে যায় লঞ্চের ছাদের দিকে। অপারেশনকারীরা সেখানে ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত। দুজনের হাতে দুই স্টেনগান দেখে হামিদ অবাক হয়। এবার নতুন অপারেশন সমাপ্ত করে হিরণ ও তার সঙ্গী ফিরে আসে। সঙ্গীর হাতে একটি অতিরিক্ত স্টেনগান। ভীতসন্ত্রস্ত হামিদকে বলে, ‘মুক্তিযোদ্ধা হতে না পারার জন্য তখন দুঃখ করছিলে। এ দেশে যতদিন শোষণ-নিপীড়ন চলবে, মুক্তির জন্য আমাদের যুদ্ধ চলবেই। যাবে আমাদের সঙ্গে?’ হামিদ হাঁ-না কোনোটিই করতে পারে না। হিরণের মাঝে দুর্ধর্ষ এক খুনিকে সে প্রত্যক্ষ করে। হাসতে হাসতেও যেন ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে লোকটি।’ স্পষ্টতই লেখক এখানে ‘অপারেশন জয় বাংলা’র পক্ষ যেমন নেননি, তেমনি পক্ষ নেননি ‘চরমপন্থী’দের খুনখারাবিরও।
মঞ্জু সরকার রাজনীতিক নন, কিন্তু রাজনীতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক। দেশের উথাল-পাতাল রাজনীতির নানা দিক, বাঁকবদল ও পঙ্কিলতা তাঁর গল্পের উপকরণ হয়েছে; কিন্তু নিরপেক্ষ অবস্থানের বিচ্যুতি ঘটেনি, 888sport live chatমানেরও হেরফের হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ভিন্ন কোনো প্রসঙ্গে ইতিহাসের আশ্রয় নেওয়ার বেলায়ও তাঁর দৃষ্টি নির্মোহ। সত্য প্রকাশে কুণ্ঠাহীন। লেখকের ‘প্রিয় দেশবাসী’, ‘উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা’, ‘দলেবলে ও বিলবোর্ডেও হুমায়ুন’ ইত্যাদি গল্প এর পরিচায়ক।
তিন
মঞ্জু সরকারের গল্পের উপকরণ প্রধানত অবহেলিত শ্রেণির মানুষ। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক রূপ নিয়ে অনুষঙ্গ হিসেবে পাশে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, অধিকারহারা মানুষের জীবনের সংগ্রাম নানা রূপ ও মাত্রায় চিত্রিত হয়েছে অধিকাংশ গল্পে। ক্ষৌরকর্ম থেকে শুরু করে গৃহকর্ম পর্যন্ত ক্ষুদ্র-অতি ক্ষুদ্র হরেক পেশার মানুষ – যাদের প্রত্যাশা মূলত জঠরের জ্বালা নিবারণ, তাদের জীবনচিত্র গল্পগুলোকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। লালসাকাতর মানুষ কীভাবে তাদের শিকার বানায়, কিংবা ঠেলে দেয় আরো দুর্দশার মুখে – অনেক গল্পই তার প্রতিচ্ছবি। গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে লেখকের পরিচিতি গভীর বলেই বোধহয় গ্রাম পটভূমি বেশিরভাগ গল্পে। গ্রামের ভালো-মন্দ কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না।
‘কানাইয়ের স্বর্গযাত্রা’ গল্পের মূল চরিত্র কানাই একজন ক্ষৌরকার, প্রচলিত অর্থে নাপিত। পিতার মৃত্যুর পর বাধ্য হয়ে এ-পেশায় যুক্ত হয়। বিধবা মা-বোন-ভাই তার রোজগারের ওপর নির্ভর। কার্তিকমাসি অনটনের দিনে সকালে পরিমাণে কম হওয়ায় পান্তার থালা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কাজে বেরোয়। পেটে চোঁ-চোঁ ক্ষিদে নিয়ে দুই গ্রাম ঘুরে বাঁধা খদ্দের আর ফাও মিলে দু’ডজন মাথা কামালেও নগদ উপার্জন হয়নি এক পয়সাও। বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে হনহন করে হেঁটে চলা কানাইকে আরেক গ্রামে অনিচ্ছাসত্ত্বেও থামতে হয় বছির ধনীর ডাকে। ধনীর দুই ছেলের মাথা কামানোর পর আরো দশজন দাঁড়িয়ে যায় লাইনে। বয়স কম হলেও কানাই ঠকেছে অনেক, এখানেও ঠকার পরিবেশ দেখে তার মেজাজ উষ্ণ হয়। পূর্বের দেনাপাওনার প্রসঙ্গ তোলায় বছির ধনীও ক্ষুব্ধ। ধনীর মাথা-বগল-চিবুকের কাজ শেষ হলে কানাই বলে, ‘পাইসাটা এলায় নিয়া আইসেন কাকা।’ ধৃষ্টতা মনে করে কানাইয়ের গালে তীব্র চড় কষে ধনী গর্জে ওঠে, ‘শালা নাউয়ার বাচ্চা, ছোটলোক কমিনার জাত, আমার মুখের ওপর কথা! যা মুখে আইসে তাই বলিস! জানিস শালা তোর ভিটায় ঘুঘু নাচাতে পারি আমি? এটা কি মগের মুল্লুক পাইচিস, শালা কাটুয়া হিন্দু কাঁহেকা।’ দুঃখে, অভিমানে কানাই পেশাটিকেই বিদায় জানায়। বিলের পানিতে যন্ত্রপাতির বাক্সটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বেছে নেয়।
এ-ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ লেখকের আরো অনেক গল্পকে বাস্তবানুগ করেছে, তবে 888sport live chatমান বিনষ্ট করে নয়। গল্প বলার ধরন, চিত্রকল্প, সংলাপ, বিষয়বৈচিত্র্য অগ্রজ হাসান আজিজুল হক, শওকত আলীদেরও টেক্কা দেওয়ার মতো।
গল্পের নাম ‘আবরণ’। সমাজে 888sport promo codeর অসহায় অবস্থানের প্রতীক, বিশেষত অনগ্রসর শ্রেণির 888sport promo codeর। সম্ভ্রান্ত সৈয়দ বংশের নিঃস্ব কর্ণধার খালেক মিয়া প্রতিবেশী নব্য ধনী নজব মণ্ডলের কাপড়ের দোকানে খলিফার কাজ করে। মেশিনটাও নিজের না, নজবের কাছ থেকে ভাড়ায় নেওয়া। আয়-রোজগার অতি সামান্য, চাল কেনার খরচই ওঠে না। কিন্তু রোষানল ভোগ করতে হয় স্ত্রীকে। ঘরে এসেই – ভাত দে বলে হাঁক দেয় খলিফা। দেরি হলে চোটপাট, কথার পিঠে কথা বললে কিল-চড়। দুদিন আগেও কঞ্চির বাড়িতে পিঠের ছাল তুলে নিয়েছিল। অথচ কীইবা এমন দোষ ছিল বউটির! নিয়মিত ও পরিমাণমতো ভাত জোটে না। আগেভাগে খেয়ে কমিয়ে ফেলল কি না তা নিয়েও তাকে সন্দেহ স্বামীর। পরনের কাপড়টি ছিঁড়ে ত্যানা-ত্যানা, আব্রু 888sport app কঠিন। খালেক মিয়া খেতে বসলে স্ত্রী শাড়ির কথা তোলে। মণ্ডলকে একটি শাড়ি দেওয়ার কথা বলতে বলে, অথবা নিজেই সে-কথা বলার সম্মতি চায়। মণ্ডলের সঙ্গে স্ত্রীর মৌখিক সম্পর্ক স্থাপনের বাসনার কথা শুনে খলিফার খাবারের স্বাদ তেতো হয়ে আসে। শূন্য হয়ে যাওয়া থালায় ফের ভাত দেওয়ার কথা জিজ্ঞেস না করায় স্ত্রীকে গালিগালাজ করে। স্ত্রীর জন্য কিছুই অবশিষ্ট না রেখে হাঁড়ির সবটুকু ভাত নিজের থালায় তুলে নেয়।
‘স্বার্থান্ধ স্বামীর অন্যায় ক্রোধের মুখে অসহায় বসে থেকে কান্না পেল বউটির, নিজেকে সামলাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। ঘরের কোনায় শসার মাচানের তলায় দাঁড়িয়ে সামনের কলাগাছটাকে শুনিয়ে কাঁদতে লাগল। কান্নার নদীতে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের খেদোক্তি – শাড়ি চাইলে দোষ, খাইতে চাইলে দোষ! বেটিছাওয়ার কি এটা জেবন না? বেটিছাওয়ার কি ভোক নাই? বেটিছাওয়ার কি ইজ্জত নাই?’ এরপর সন্ধ্যায় আচমকা বাড়ি ফিরে খালেক মিয়া বউকে আবিষ্কার করে বন্ধ ঘরে, বিস্রস্ত আনকোরা নতুন শাড়িতে। ঘরে নজব মণ্ডল।
চার
মঞ্জু সরকারের গল্পে অসহায় 888sport promo codeরা উঠে এসেছে নানা রূপে। কেউ পরাভব মানে, কেউ মানে না, কেউবা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে দীপ্ত। ‘পাখির মা’, ‘আমৃত্যু আকালু’, ‘দুধওয়ালীর পুষ্টি-উৎস’, ‘টুকির মায়ের পুলিশ জামাই’, ‘মরা নদীর ময়না’ – এসব গল্প শুধু অসহায়ত্বের বিবরণ নয়, প্রতিবন্ধকতা উৎপাটনের বার্তাও। এদের কেউ
স্বামী-পরিত্যক্তা, কেউ বিধবা। কারো স্বামী থেকেও নেই, কিংবা অকর্মণ্য।
‘পাখির মা’ কেবল গল্পের নাম নয়, চরিত্রেরও নাম। স্বামী-পরিত্যক্তা, থাকে নগরের সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা বিনাভাড়ার বস্তিতে, তিন সন্তান ও মাকে নিয়ে। হোটেলের আলো-বাতাসহীন বদ্ধকুঠুরিতে মসলা পেশার কাজ করে। স্বপ্ন দেখে কিছুটা সুবিধার ভাড়া বস্তিতে ওঠার। কাজের মধ্যেই বস্তি ভেঙে ফেলার খবর পেলে ছুটে যায় সেখানে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের খিস্তিখেউরের মুখে পড়ে। আশ্রয়ের নতুন অবলম্বনের সন্ধান করতে গিয়ে কিছুটা দেরিতে হোটেলে ফেরে। দেখে তার জায়গায় অন্য এক মহিলা কাজ করছে। সে চাকরিচ্যুত। ওস্তাদ বাবুর্চির সুপারিশ এ-ঘটনার উৎস। ষড়যন্ত্র বুঝতে পারে পাখির মা। মাসখানেক আগে বাবুর্চিটি তার ডেরায় গিয়েছিল শোয়ার মতলবে। নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এমন প্রতিশোধ নিল। উপায় বের করতে না পারায় এরপর মা ও সন্তানদের নিয়ে মাঠেই শয্যা পাতে পাখির মা। ভেতরে ভেতরে রুখে দাঁড়ায়। বৃদ্ধ মাকে সান্ত্বনা দেয়, ‘এত চিন্তা করিস ক্যান মা? ঘর ভাইঙা গেছে, হাত দুইডা তো খইসা যায় নাই। 888sport app টাউনে যত হোটেল-বাসাবাড়ি আছে, কামের বেটি ছাড়া চলবে কারো? এত দালানকোঠা হইতাছে, আমরা কাম না করলি উঠব?
হোটেল-বাসাবাড়ির কাম না পাই যুদি, ইটা ভাঙার কাম করুম।’ অনেকক্ষণ মড়ার মতো পড়ে থেকে বুড়ি মা মেয়েকে বলে, ‘তাইলে দাওখান বেইচা আমারেও একটা হাতুড়ি কিইনা দিস মা।’
নদীভাঙনের শিকার এক অসহায় পরিবারের গল্প ‘আমৃত্যু আকালু’। ভিটেমাটি হারিয়ে বাঁধের ঢালে ডেরায় আশ্রয় নিয়েছে পরিবারটি। স্বামী আকালু সাধারণত বাঁধেই শয্যা পেতে রাত কাটায়। কাজ কোনোদিন মেলে, কোনোদিন মেলে না। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাটা বেশি আকালুর স্ত্রী তিস্তাবিবির, এনজিওর সহায়তায় ইতোমধ্যে একখানা ছাগল কিনে হৃষ্টপুষ্ট করছে। ডেরার পাশে সবজির যত্নআত্তি করে। স্বপ্ন দেখে বাড়িভিটা হবে এমন একফালি ভুঁইয়ের। রাত বাড়লে অচেনা দুই যুবক বাঁধে শোয়া আকালুর ঘুম ভাঙায়, হাতে একখান সিগারেট গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করে আকালুর বউ কোন ঘরে থাকে। আকালু চমকায়, সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা শোনায় যুবক দুটি। অতঃপর দুজনের একজন পানি খাওয়ার নাম করে পাঁচটি টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে আকালুর ঘরে ঢোকে। অপরজন আকালুকে বাঁধেই ব্যস্ত রাখে। তিস্তাবিবির প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে যুবক পালায়। তারপর ঘটনাক্রমে আকালুর মৃত্যু হয়। তিস্তাবিবির নতুন সংগ্রামের শুরু এরপর।
‘দুধওয়ালীর পুষ্টি-উৎস’ গল্পের হাদির মা স্বামীর মৃত্যুর পর নিজে সংসারের হাল ধরে। অবলম্বন দুধ বিক্রি। নিজের দুটি গাইয়ের পাশাপাশি গ্রামের সাত গৃহস্থের বাড়ি থেকে আরো আটটি গাইয়ের দুধ সংগ্রহ করে শহরের বাসাবাড়িতে পৌঁছায়। এজন্য বগলে আধামণি ও হাতে পাঁচ সেরি দুধের কলস নিয়ে প্রায় দুই মাইল পথ ভেঙে প্রথমে বিশ^রোড, তারপর ভিড় ঠেলে বাসে কিংবা টেম্পোতে শহরে পৌঁছাতে হয় রোজ। ছুটিছাটা নেই কোনো। আয়-রোজগার খারাপ না, কারো কাছে হাত পাততে হয় না, স্বনির্ভর। এ করেই মেয়ে একটিকে বিয়ে দিয়েছে, আরেকটি পড়ছে। হাদি ম্যাট্রিক পাশ করেছে, বখাটেদের সঙ্গে মিশে আইএ পাশ করতে পারেনি। এখন বেকার। ‘শিক্ষিত হয়ে হাদি না পারে রিকশা চালাতে, না পারে জমির দালালি করতে। আবার পুঁজিবাট্টা নেই বলে না করে কোনো ব্যবসার ধান্দা।’ ব্যবসার গোমরটা ফাঁস করে হাদির মা এভাবে – ‘বুঝলিরে বইন, বিশ্বাসটা হইল আসল জিনিস। আমার কাছে টাউনের এত সাহেব-মেমরা দুধ কিনতে চায়। ক্যান চায়? সবাই জানে যে, হাদির মা হাজার টাকা লাভ পাইলেও ভেজাল দুধ কোনো দিন দিব না, দরকার হয় কম দিয়া কম দাম নিব। কিন্তু কয় ফোঁটা পানি মিশাইয়া পোয়া ভইরা দিব না। নিজের ইমানটা ঠিক রাখছি বইলা এই ব্যবসায় অহনো টিইকা আছি।’
নিজে প্রতারণার আশ্রয় না নিলেও প্রতারিত হয় হাদির মা। বেকার ছেলেটিকে একটি চাকরি জোগাড় করে দেওয়ার জন্য শহরে সর্বশেষ যে-বাসায় দুধ দেয় তার মেমসাহেবকে ধরে। মেমসাহেবের স্বামী সরকারি অফিসে ইউনিয়নের নেতা। বাসার কাজের মেয়েটি পালিয়ে যাওয়ায় মেমসাহেব হাদির মাকে একটি কাজের মেয়ে জোগাড় করে দেওয়ার কথা বলে। বিনিময়ে স্বামীকে বলে হাদির একটা চাকরির ব্যবস্থা করবে জানায়। উল্লসিত হাদির মা কাজের মেয়ের খোঁজ করে, কিন্তু সহজে মেলাতে পারে না। আপাতত সমাধান হিসেবে দুধ দেওয়া শেষে নিজেই মেমসাহেবের বাসন মাজা, মসলা বাটার কাজ করে দেয়। এতেও সন্তুষ্ট না হওয়ায় নিজের মেয়েটিকে যতদিন না কাজের মেয়ের বন্দোবস্ত হয়, ততদিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য দেয়। স্বামীর স্বভাব-চরিত্রের দোষে মেয়েটির সেখানে টেকা সম্ভব হয় না। মেমসাহেবও উল্টো দোষ চাপায় মেয়ের ওপর। মেয়েকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পর ভাই ঘটনা শুনে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। এক শিশি বিষ এনে মায়ের হাতে দিয়ে বলে মেমসাহেবের বাড়ির দুধের সঙ্গে তা মিশিয়ে দিতে। তা-ই করবে বলে মা কোমরে গুঁজে নেয় শিশিটি। কিন্তু বিবেক তাকে বাধা দেয়। কোমর থেকে শিশিটি বের করে রাস্তার ধারে ডোবায় ছুড়ে ফেলে ভারমুক্ত হয়।
পাঁচ
জায়গার নাম মরা নদীর ঘাট। ঘাট ছিল ঠিকই, এখন নেই। তিস্তা আরো মাইল দেড়েক পুবে সরে যাওয়ায় ঘাটটিও সরে গেছে। ভাঙাচোরা বাঁধখানি আছে বাঁধের জায়গাতেই। তাতে গজিয়ে উঠেছে ছোটখাটো বাজার। বাজারে একটি ঝুপড়ির মতো দোকান আগলে আছে এক যুবতী 888sport promo code, দোকানের মালিক সে। গেল মঙ্গায় স্বামী বিদেশে গিয়ে আর ফেরেনি, শোনা যায় আরেকটি বিয়ে করে গাজীপুরে থিতু হয়েছে।
সাত-আট বছরের সন্তান ও মাকে নিয়ে ময়না সংসারের হাল ধরে, দোকানটাও খাড়া করে বহু কষ্টে। নিরুদ্দেশ স্বামীর 888sport sign up bonus মন থেকে মুছে ফেলতে পারলেই সে খুশি। তক্কে তক্কে আছে, দেশে ফিরলে তাকে ঘাটের বাজারে এনে সালিশ বসাবে। ‘লম্পট স্বামীর কাছে ভরণপোষণের টাকা সে চায় না, তার মুখে প্রকাশ্যে থু দিয়ে তালাক আদায় করতে পারলেই জ্বালা জুড়াবে তার।’ তারপর নতুন করে কাউকে বিয়ে করবে কি করবে না সেটা নিজের স্বাধীনতা।
শহর থেকে এক আগন্তুক আসে সেই মরা নদীর ঘাটে, ময়নার দোকানে বসে, আলাপ-পরিচয় হয়। জানায়, বদলে যাওয়া জায়গাটির হালচাল ও মানুষজনের জীবনসংগ্রাম নিয়ে একটা লেখা তৈরি করা তার ইচ্ছে। ‘মরা নদীর ময়না’ নামের গল্প আবর্তিত হয় এ-দুজন মানব-মানবীকে কেন্দ্র করে। অদ্ভুত এক রহস্যময়তা ঘিরে আছে গল্পটিকে। মানবমনের ভেতর-বাহির, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিচিত্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এই গল্পের নির্যাস। লেখক বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গে এর স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
আগন্তুক মুগ্ধ হয় ময়নার আত্মনির্ভর জীবন ও সাহসিকতায়। সমাজের ভাবভঙ্গির তোয়াক্কা না করে, পুরুষের চোখ টাটানি সহ্য করে সে দোকান চালায়। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। প্রথম দিনই চা-পান-সিগারেটের মূল্য বাবদ ১১ টাকা দিতে গিয়ে খুচরা না থাকায় পাঁচশো টাকার নোট দেয়। সামান্য বেচাবিক্রির দোকান, ময়না তাই ক্ষুব্ধ হয়ে কটু কথা বলে। আগন্তুক নোটটি রেখে দিতে বলে, পরে বাকি টাকা ফেরত নেবে জানায়। ময়না কী করবে বুঝতে পারে না, লোকটা নোট দোকানে ফেলে রেখে চলে যায়। শুধু আগন্তুককে নয়, তার কাঁধের ব্যাগটাকেও রহস্যপূর্ণ মনে হয় ময়নার। বাড়ি ফিরে ময়না ভাবে, লোকটা আশ্চর্য চোখে তাকে দেখছিল কেন? ‘ভাঙা হাত-আয়নাটা নিয়ে ময়না আজ নিজেকেও দেখে।’ দুদিন বাদে আবার এলে ময়না নোটটি ফেরত দিয়ে শুধু নিজের পাওনাটুকু নেয়। আরেকদিন অবশ্য সাত টাকা বিলের বিপরীতে একশ টাকার নোট দিয়ে বাকি টাকা ফেরত নেয় না, মা ও ছেলের জন্য কিছু কিনে নিতে বলে।
ময়না লোকটির আসল পরিচয় জানার আগ্রহ প্রকাশ করলে 888sport appয় তার সঙ্গে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসার কথা বলে। ময়নার সংগ্রামী জীবনের পরিচয় পেয়ে তার বাড়িতে যাওয়ারও ইচ্ছা প্রকাশ করে। দেশলাই নেওয়ার সময় আগন্তুকের বাড়ানো হাত একদিন, ইচ্ছা করেই কি না কে জানে, ময়নার হাত ছুঁয়েছিল। ‘আগন্তুকের চোখের দিকে তাকিয়ে রাগ নয়, অদ্ভুত এক শিহরণ খেলেছে শরীরে।’ হাটবারের এক রাতে নিরিবিলি পরিবেশে আগন্তুকের কথাবার্তা কিছুটা বেপরোয়া। ‘আমার কি ইচ্ছে করছে ময়না, জানো? তোমাকে নিয়ে টলটলে জ্যোৎস্নার মধ্যে ঘুরে বেড়াই, দুজন মন খুলে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় মেলে ধরি।’ ময়না অন্য কথা বলে। তাকে দোকানের পুঁজি বাড়ানোর জন্য লোন-টোন নিয়ে দেওয়ার যে কথা হয়েছিল তা 888sport app download for android করিয়ে দেয়। ‘লোকটা এবার মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করে বলে, এই দুহাজার টাকা আপনি আপাতত রাখেন। আমি দেখছি, আপনাকে আর কীভাবে সাহায্য করা যায়’ – বলে ময়নার দিকে হাত বাড়ায়। এমন সময় অন্য খদ্দের আসে, ময়নাও নিজেকে ফিরে পায় যেন। রুক্ষ কণ্ঠে বিদেশির কাছে জানতে চায়, ‘আপনি আমারে এত টাকা দিতে চান কী স্বার্থে?’ ময়নার সজোর চিৎকার আর ওই খদ্দেরের গর্জন শুনে মারমুখো জনতা ছুটে আসে, ঘিরে ধরে তাকে। চতুর্মুখী আক্রমণের শিকার হয় আগন্তুক। দোকানে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত বিহ্বল ময়না ভিড়ের মধ্যে ডুবে যাওয়া বিদেশিকে দেখতে পায় না, কান পেতে থেকেও তার রহস্যময় বুলি শুনতে পায় না আর!
ছয়
অশরীরী গল্প 888sport live footballের চিরায়ত একটি রূপ। ভূত-প্রেত, জিন-শয়তানে বিশ্বস সব সমাজেরই এক বাস্তবতা। সেই সমাজবাস্তবতা নিয়ে গল্পের পসরা সাজিয়েছেন বিশ্ব888sport live footballের অনেক রথী-মহারথী। 888sport appsের সমাজও
এ-বাস্তবতার বাইরে নয়, বরং অশিক্ষা-কুশিক্ষার কারণে এর প্রভাব এখানে আরো প্রকট। মঞ্জু সরকারের গল্পের ভাণ্ডারে এ নিয়ে যুক্ত হয়েছে বেশকিছু উৎকৃষ্ট মানের গল্প। পটভূমি প্রধানত গ্রাম, চরিত্রগুলো অসহায় মানুষের। প্রতিটিতেই রয়েছে ক্ষুরধার দৃশ্যকল্প, কাহিনি ও ভাষা।
এরকমই দুটি গল্প ‘ভূতের সাথে যুদ্ধ’ ও ‘মৃত্যুবাণ’। ‘ভূতের সাথে যুদ্ধ’ গল্পের মফিজ ভুখানাঙ্গা মানুষ, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে বলে ‘মেছোয়া মফিজ’ নামেও পরিচিত। স্ত্রী শয্যাশায়ী, ওষুধ কেনার পয়সা নেই, পাড়াপড়শিদের কথা শুনে তাকে ভূতে আক্রান্ত বলে ধরে নিয়েছে। দুই মেয়ের একজন শহরে দাসীবাঁদি। আরেক মেয়ে ও ছেলে নিয়ে সংসার। ‘আজ সারাদিন কিছু খায়নি সে। এর আগের দুদিনও ভরপেট ভাত জোটেনি। উপোসে অভ্যস্ত ছেলেমেয়ে নিষ্ফল ক্রন্দন ও কথাবার্তায় খিদেটাকে হজম করে সন্ধ্যা হতে না হতেই শুয়ে পড়েছে, এখন মড়া সবাই।’ তিন দিনের একঘেয়ে বৃষ্টি থামার পর প্রবল অন্ধকার উপেক্ষা করে পাটশোলার আগুন হাতে নিয়ে মাছ শিকারে বেরোয় মফিজ, গন্তব্য চড়ক বিল। মাছও পায়, কিন্তু বাগড়া দেয় তুমুল বৃষ্টি। হাতের আগুন নিভে যায়। বিলের পানি বাড়তে থাকে, বাড়ি ফেরার পথও হারিয়ে ফেলে। শুরু হয় ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ। স্ত্রীর শরীরে ভর করা যে-ভূতটিকে সে বোতলবন্দি করার পণ করেছিল সেই ভূতটিই প্রতিশোধ নিতে তার পিছু লেগেছে বলে মফিজ ভাবে। বাতাস ভারি হয়ে ওঠে তার বাঁচার আর্তনাদে।
দরিদ্র এক স্কুলমাস্টার ও তার স্ত্রীর গুপ্তধন প্রত্যাশার রহস্য নিয়ে গল্প ‘মৃত্যুবাণ’। দারিদ্র্য কীভাবে মানুষকে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য করে তোলে, অলীক কল্পনায় ভাসায়, পরিণতিতে ডেকে আনে সর্বনাশ – সেরকম চিত্রেরই সুনিপুণ প্রকাশ এই গল্প।
সাত
মঞ্জু সরকারের গল্প বৈচিত্র্যের সুবাসে সুবাসিত। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও প্রাত্যহিক জীবন বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর গল্পসমূহে। দৃষ্টি বেশি ফেলেছেন তিনি সমাজের দুর্বল শ্রেণির উপর। তাই বলে সবল মানুষও বাদ যায়নি। অনাকাক্সিক্ষত নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা তাঁর গল্পের বিষয় হয়েছে। প্রবাসের শ্রমজীবী মানুষও লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি।
প্রবাসীর স্ত্রী অসুখবিসুখ না থাকলেও সেজেগুজে খালি ডাক্তারের কাছে যায় চার বছরের মেয়েকে ঘরে রেখে। একদিন সুযোগ বুঝে ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েটি পথ হারায়। গাড়ির নিচে প্রায় চাপা পড়তে যাওয়া মেয়েটিকে উদ্ধার করে বস্তিবাসী জোবেদার মা। আঁচলে বাঁধা পান কেনার আধুলিটা দিয়ে সীমাকে দুটো চকোলেট কিনে দেয়। মেয়েটি যাতে পরিচিত কারো নজরে পড়ে, সেই আশায় বাজারে ঢোকার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। একদল লোক ছুটে এসে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে, ছেলেধরা সন্দেহে পেটায়, বিনা অপরাধে লাশ হয় জোবেদার মা। এই হলো ‘ছেলেধরা’ গল্পের মর্মান্তিক প্রকাশ।
বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনার ছায়া অবলম্বনে রচিত আরেক গল্প ‘ভেতরে মানুষের কান্না’। গ্রামে মঙ্গায় আক্রান্ত আকবর মা ও বোনকে নিয়ে শহরে আসে। বিশাল আকৃতির এক ভবনের গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। বোন আরেক গার্মেন্টসে চাকরি পায়। বসে না থেকে মা বাসাবাড়ির কাজ নেয়। একদিন ভবনটি আকস্মিক ধসে পড়ে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আকবর। তার আর খোঁজ মেলে না। খবর পেয়ে গ্রাম থেকে ছুটে আসে আকবরের ভগ্নিপতি, আসল অভিপ্রায় তার ক্ষতিপূরণের টাকা হাতানো। এমন লোভাতুর চিত্র তো অহরহই আমরা সমাজে প্রত্যক্ষ করি।
প্রতিদিন মসজিদের সামনে টেবিল সাজিয়ে মসজিদের জন্য চাঁদা ওঠানো ব্যক্তিও লেখকের গল্পের চরিত্র হয়। ‘আত্মসমর্পণ’ গল্পের আবদুর রহমান অভাবী মানুষ, চাঁদার হিসাব ঠিকঠাক রাখে। অভাবের তাড়নায় সেও পথভ্রষ্ট হয় একসময়, পরিণতিতে ডেকে আনে নিজের মৃত্যু।
দেশের অনেক মানুষ বিদেশে কর্মরত। অর্থ জোগাড়ের জন্য তাদের অনেকেকে ভিটেমাটি বিক্রি ও ঋণ করতে হয়। কপালে জোটে ছোটখাটো চাকরি কিংবা খণ্ডকালীন কোনো কাজ। স্বজন-পরিজন দেশে রেখে বছরের পর বছর অতি কষ্টকর জীবন পার করে দুর্বল এই শ্রেণিটি। দেশের মতো বিদেশেও তারা প্রতারণার শিকার হয় কখনোবা। প্রবাসী কর্মজীবী, বিশেষত সেখানকার শ্রমিকশ্রেণির জীবনসংগ্রাম মঞ্জু সরকারকে আন্দোলিত করে, তাদের জীবন প্রতিবিম্বিত হয় কয়েকটি গল্পে। ‘ক্লিনার’, ‘মরু-পাহাড়ের এক বিমূর্ত চাষি’ এ-ধারার দুটি গল্প। পরিবারের একটু সরস জীবনযাপনের জন্য তাদের যে অপরিসীম ত্যাগ তা গল্প দুটিতে পরম মমতায় চিত্রিত।
আট
দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী গ্রামের বাসিন্দা, আর এই গ্রামকে কেন্দ্র করেই মঞ্জু সরকারের অধিকাংশ গল্পের ভিত নির্মিত। গ্রামীণ জীবন নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ গভীর। রেষারেষি ও কুটিলতা সেখানেও কম নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধ্বংসী। ‘ফাঁদ’ ও ‘অগস্ত্যযাত্রা’য় সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত।
এনজিওতে কর্মরত এক যুবক কয়েকদিনের জন্য কোনো এক গ্রামে আসে জরিপের কাজে, থাকার জায়গা পায় হাসেম খন্দকারের বাড়িতে। হাশেম খন্দকার বংশে কুলীন, কিন্তু অভাবী; উপরন্তু কন্যাদায়গ্রস্ত। ক্লাস নাইন পাশ মেয়েটিকে অনেক চেষ্টা করেও বিয়ে দিতে পারছেন না। যুবককে দেখে আশার সঞ্চার হয় খন্দকারের মনে। তার সেবাযত্ন করে, জরিপের কাজে সঙ্গে থাকে। খন্দকারের কথাবার্তায় যুবক বুঝতে পারে মেয়েটি তাকে শুধু-যত্ন করে রেঁধে খাওয়ায় না, অগোচরে তার বিছানা-টেবিল-জামাকাপড় পরিপাটি সাজিয়ে রাখে। অবাক হয়ে একদিন লক্ষ করল, বালিশের ওয়ারটাও পাল্টে গেছে। তাতে সুন্দর সূচিকর্মে লেখা ‘মনে রেখো’। তবে মেয়েটিকে চাক্ষুষ করা হয় না। এদিকে গ্রামে রটে যায়, আগন্তুকের সঙ্গে খন্দকারের মেয়ে আম্বিয়ার বিয়ে হতে যাচ্ছে। যুবকের কানেও আসে রটনার কথা। জরিপের কাজ শেষে বিদায় নেওয়ার আগের রাতে যুবক হাশেম খন্দকারকে অনুরোধ করে তার মেয়েকে ডেকে দেওয়ার জন্য, কিছু কথা বলবে বলে। খন্দকার উৎসাহভরে মেয়েকে ডাকতে যান। অনেক বিলম্বে মেয়েটি ঘরে ঢোকে পানের বাটা হাতে নিয়ে। মাথায় ঘোমটা নেই। তাকে একা দেখে যুবক চমকায়। বাইরে পদশব্দ। দুয়েক কথা বলে মেয়েটিকে চলে যেতে বলে। বদ্ধঘরে যুবতীর সঙ্গে একা হওয়ার ভীরু উত্তেজনা নিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে দেখে দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ। বাইরে হইচই, ছোটাছুটি, হাঁকডাক, 888sport promo codeকণ্ঠের কান্না। ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ঘোরে বন্দি যুবক মেয়েটির দিকে তাকায়, মেয়েটি তার দিকে। ‘এসব কি নোংরা চক্রান্ত? ছি ছি! তোমার বাবা কোথায়?’ ‘আমি জানি না।’ ‘দেখো আমি বিবাহিত। দেশে আমার স্ত্রী, দুটি সন্তান আছে।’ মেয়েটির ভীরু চোখের পানিকে সহানুভূতি ভেবে দিশাহারা যুবক তার হাত চেপে ধরে, ‘তুমি জানো আমি নির্দোষ, তুমি আমাকে উদ্ধার করো।’ মেয়েটি কান্না চেপে জবাব দেয়, ‘আমাকে কে উদ্ধার করবে?’ এই হলো ‘ফাঁদ’ গল্পের সারকথা।
‘যার যে স্থানে জন্ম, সেই জন্মস্থানের মাটিতে মিশে যাওয়ার অন্তিম বাসনা অনেকেরই হয়।’ ‘অগস্ত্যযাত্রা’র কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই বাসনা থেকেই চাকরিতে অবসর নিয়ে শহরবাসের পালা চুকিয়ে গ্রামে ফেরে শেষজীবন কাটানোর উদ্দেশ্যে। অতঃপর মুখোমুখি হয় বিরূপ পরিস্থিতির। তার সাধের বৃক্ষের বাগান ছাগলে খায়, দুপায়া ছাগলে চারা ভাঙে। বিষ প্রয়োগ করে পুকুরের মাছ নিধন করে। বাগান ধ্বংসের কথা জানালে চেয়ারম্যান উপদেশ দেন, ‘চাষাড়ি কাজ আর ছাগল খেদানো কি আপনার কাজ? 888sport appয় থেকে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন, এখন গ্রামে থেকে সমাজসেবামূলক কিছু করেন ভাই।’ হাজি সাহেব প্রস্তাব করেন, ‘কার জন্য বাগান করবেন সরকারের বেটা? তারচেয়ে ওই জমি বেচে হজে যান, গ্রামে আল্লার ঘরটা বড় পাকা করিয়া দেন, তাতেই বরং বেশি লাভ হইবে।’ হেডমাস্টার বলেন, ‘আপনার পতিত জমিটা দেখেছি ভাই। ওই জমিতে একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুললেও ভালো চলবে। এলাকায় ভালো স্কুলের অভাব। স্কুল করলে আপনার সমাজসেবা হবে, নামও হবে।’
দীর্ঘদিন বিরতিহীন লেখালেখির দরুন মঞ্জু সরকারের গল্পের 888sport free bet বিপুল। এসব গল্পের কোনোটিই বার্তাবিহীন নয়। বাস্তবানুগ ও 888sport live chatমানসমৃদ্ধ। তাঁর ভাষা সাবলীল, বহতা নদীর মতোই গতি প্রতিটি গল্পের। যেন এক স্বভাবজাত গদ্য888sport live chatী তিনি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.