॥ ৫ ॥

পুলিশের একজন বড়কর্তা হয়েও আমাদের লাচ্চুদা যেমন শেক্সপিয়ার নিয়ে বিভোর হয়ে থাকেন, রশিদ যেমন স্বপ্ন দেখে সিনেমার পরিচালক হবার, এখানকার এই রাহুল মুখোপাধ্যায়েরও বিশেষ উৎসাহ ফিল্মের জগৎ নিয়ে। পরিচালনা কিংবা অভিনয়ের কথা ভাবে না, কিন্তু বিদেশি ও এ-দেশি live chat 888sport-বিষয়ে অনেক খুঁটিনাটি খবর রাখে। ফিল্ম বাফ্ যাকে বলে। এর মধ্যে দু’খানা বইও লিখে ফেলেছে, এখন সে লেখা শুরু করেছে রাজ কাপুরের জীবনী। রাজ কাপুরের এক ভাই শশী কাপুর তাকে এই বই লেখার ভার দিয়েছে।রাহুলের আসার কথা দুপুর তিনটের সময়। তার অনেক আগে, এগারোটার সময় বুঢ্ঢা এসে হাজির, অর্থাৎ অফিস ডুব মেরেছে। তখন আমি প্রতিযোগিতার চিত্রনাট্যগুলো পড়তে শুরু করেছি, বুঢ্ঢাকে দেখে একটু চিন্তায় পড়ে গেলুম। বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেবো, না কাজ সারবো? কাজটাও তো শেষ করতে হবে পাঁচদিনের মধ্যে।

বুঢ্ঢা অবশ্য নিজেই বললো, তুই কাজ করে নে। আমি বসছি। এ চাকরিটা তো ছেড়েই দিচ্ছি, তাই আজ আর অফিসে বসতে ইচ্ছে হলো না। এর মধ্যে ক’খানা চিত্রনাট্য দেখা হলো?

মোট একচল্লিশটা খাতা। প্রথমেই আমি সবকটা নাম দেখে নিয়েছি, বেশ বিস্মিতও হয়েছি। এইসব প্রতিযোগিতায় নতুন লেখকরাই যোগ দেয়। কফি হাউজে কিংবা অনেক চায়ের দোকানে বহু অল্পবয়েসি ছেলে সিনেমার আলোচনায় মেতে থাকে, আর্ট ফিল্ম বানাবার আকাক্সক্ষা বুকে পুষে রাখে, নন্দন-চত্বরে ঘোরাঘুরি করে, কিন্তু কখনো কোনো সুযোগই পায় না। সেইসব উচ্চাকাক্সক্ষীদের মধ্য থেকে সত্যিকারের প্রতিভাবানদের খুঁজে বার করাই এই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য। তবে, আমি আগেই লক্ষ করেছি, ফিল্মের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার নিয়ে যারা গলা ফাটায়, তারা অনেকেই কিছু লিখতে পারে না। ভালো চিত্রনাট্য যে সার্থক live chat 888sportের আসল মেরুদণ্ড, সেটাই বোঝে না অনেকে। সুতরাং আমি ঠিকই করে নিয়েছি, সবগুলো খাতা পুরো পড়বার দরকার নেই। যেগুলো দু’চার পাতা পড়েই বোঝা যাবে যে একেবারেই দুর্বল, সেগুলো অনায়াসে বাতিল করে দেওয়া যাবে।

আমি অবাক হয়েছি অন্য কারণে। এর মধ্যে পাঁচজন পরিচালকও লেখা পাঠিয়েছেন, যাঁরা বেশ পরিচিত, মধ্যবয়স্ক, কিছু সফল ছবিও তাঁরা তৈরি করেছেন। তাঁরা নেমে পড়েছেন শিং ভেঙে বাছুরের দলে! কারণটা অবশ্য বোঝা যায় এবং তা খুবই করুণ। বাংলা ছবির বাজার এখন খুবই খারাপ। পশ্চিম বাংলার ছবি 888sport appsে দেখানো হয় না, আগে কিছু কিছু ছবি বিহার, ওড়িশা, আসামে চলতো, এখন প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতায় তাও বন্ধ, পশ্চিম বাংলার অধিকাংশ সিনেমা হলগুলোতেও চলে শস্তা নাচ-গানের হিন্দি ছবির দাপট!

এই মোটামুটি খ্যাতিমান পরিচালকের হাতে কোনো কাজ নেই। একবার যারা সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তারা কাজ না পেলেও অন্য কোনো জীবিকায় আর যেতে পারেন না। প্রোডিউসারদের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ান। কারুর কারুর অন্ন-বস্ত্র জোটানোও সমস্যা হয়ে পড়ে। তাই এই পাঁচজন চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। তিনটি 888sport app download bd আছে, এক লক্ষ, পঁচাত্তর হাজার ও পঞ্চাশ হাজার, আর প্রথমটির live chat 888sport হিসেবে প্রযোজনার দায়িত্ব নেবে এন এফ ডি সি। সেটাই আসল প্রলোভন।

সেই পাঁচজনের খাতাই আমি পড়তে শুরু করেছি আগে।

বুঢ্ঢা বললো, আমি যে-কোনো একটা খাতা দেখতে পারি?

আমি বললুম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখ না। তাতে আমার সাহায্যই হবে। একদম বাজেগুলো বাতিল করে দিবি!

একটা খাতা নিয়ে দু’পাতা পড়তে না পড়তেই বুঢ্ঢা চেঁচিয়ে বললো, একী রে, সুনীল! এ ভদ্রলোকের নায়িকার নাম পূর্ণিমা, প্রথম থেকেই লিখে যাচ্ছে পূর্নীমা! মীনাক্ষী বানান লিখেছে এক জায়গায় মিনাক্ষি, আর একবার মীনাক্ষি।

আমি হেসে বললুম, চিত্রনাট্যকারকে যে ভালো বানান জানতে হবে, তার কেনো মানে নেই। ওগুলো শুধরে নেওয়া যায়। আসলে দেখতে হবে, সংলাপ আর কাহিনীর বাঁধুনি কী রকম! ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ বোঝে কি-না।

বুঢ্ঢা বললো, এক জায়গায় লিখেছে, এই যে দ্যাখ, একটা সংলাপে, ‘আপনার অবর্তমানে কয়েকটা দিন আমি এ ঘরে থাকবো।’ এখানে ‘অবর্তমানে’ লেখাটা কি ঠিক হয়েছে? না ‘অনুপস্থিতিতে’ হবে? ‘অবর্তমানে’ মানে মৃত্যুর পরে না?

বুঢ্ঢা, তুই পড়েছিস ইংলিশ মিডিয়ামে মিশনারি স্কুলে। তুই বাংলা ভাষার এত খুঁটিনাটি জানলি কী করে?

বাঃ, বাংলা যার মাতৃভাষা, সে ভাষাটা ভালো করে জানবে না?

হায়রে, তোর এই কথা যদি সবাই বুঝতো, তাহলে আর দুঃখ থাকতো না।

আমি কাজ থামিয়ে চেয়ে রইলুম বুঢ্ঢার দিকে।

হায়রে, বাংলা ভাষার জন্য যে-মানুষটার এত ভালোবাসা, সে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাচ্ছে আফ্রিকা। সেখানে বাংলা ভাষা তার সঙ্গী হতে পারবে না। বাংলা বইও চোখে দেখতে পাবে না। বাংলা সংস্কৃতি থেকে নির্বাসিত হয়ে থাকবে।

বাছাই করার ব্যাপারে বুঢ্ঢার সাহায্য আমার কাজে লাগলো খানিকটা। একটা বাজার পর ও মিনমিন করে বললো, এবার একটু বিয়ার পান করলে হয় না?

আমি সাধারণত দিনের বেলা মদ্যপান করি না। তবে, প্রবাসে নিয়মনাস্তি। তাছাড়া পুরোনো বন্ধুর অনুরোধ। রুম সার্ভিসে অর্ডার দিলাম বিয়ারের। ঘণ্টাখানেক পরে মধ্যাহ্নভোজও সেরে নিলাম ঘরে বসে।

রাহুল মুখোপাধ্যায় পৌঁছে গেল কাঁটায় কাঁটায় তিনটের সময়।

পুলিশের ওপর দিকের অফিসাররা প্রায় সবাই বেশ সুপুুরুষ হয়। সাধারণত এরা আসে উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে, চেহারায় তার ছাপ থাকে।

রাহুল মুখোপাধ্যায়ও দীর্ঘদেহী, সুঠাম গঠন, মুখখানি বেশ সুশ্রী। সেনাবাহিনীর অফিসারদের গোঁফ রাখা বাধ্যতামূলক, পুলিশদের সে বালাই নেই, আমার চেনা সব পুলিশ-কর্তারই গোঁফ কামানো। রাহুলের কমনীয় মুখখানি দেখলে পুলিশ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই, অনায়াসেই সে সিনেমার অভিনেতা হতে পারতো।

আমি বাধা দেবার আগেই সে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে ফেললো।

তারপর হাসিমুখে বললো, কী আশ্চর্য ব্যাপার, আপনি মুম্বাইতে এসে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। অথচ, আমি কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই একবার কলকাতায় যেতে হবে। আপনার একটা ইন্টারভিউ নেওয়া দরকার। রাজ কাপুর-বিষয়ে।

বুঢ্ঢা অবাক হয়ে বললো, রাজ কাপুর-বিষয়ে? সুনীল, তুই কি রাজ কাপুরকে চিনতি না-কি?

আমি দু’দিকে মাথা নেড়ে বললুম, না। কোনোদিন পরিচয় হয়নি। হিন্দি সিনেমাও আমি খুব কম দেখি। রাজ কাপুরের একটাই ফিল্ম দেখেছি, বহুকাল আগেকার, আওয়ারা।

রাহুল বললো, রাজ কাপুরের সঙ্গে আপনার যে পরিচয় ছিল না, তাও আমি জানি। কিন্তু আপনি রাজ কাপুরের জীবনের একটা চরম মুহূর্তে সাক্ষী ছিলেন। তাই না?

আমি বললুম, তা অবশ্য ঠিক।

রাহুল বললো, আমি সেই সময়টার ডিটেইল বর্ণনা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই। আমার খুব কাজে লাগবে। তবে এখন নয়, আপনি দু’একদিন আছেন তো। আমি টেপরেকর্ডার নিয়ে আসবো। তার আগে কাজের কথা হোক।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, উদ্ধার-আশ্রমের সেই মহিলাকে আজই দেখতে যেতে পারবো তো?

রাহুল বললো, হ্যাঁ, আজই, তবে একটা অসুবিধে হয়েছে। আপনাকে কথা দেবার পর আমার এক সহকর্মী মনে করিয়ে দিল যে সম্প্রতি একটা কোর্ট অর্ডার হয়েছে। মেয়েদের উদ্ধার-আশ্রমের মধ্যে পুরুষরা ঢুকতে পারবে না। এমনকি পুলিশ অফিসারদেরও কোনো কাজ থাকলে সঙ্গে কোনো মহিলা সমাজকর্মীকে নিয়ে যেতে হবে। তাও শুধু বিকেল পাঁচটা থেকে সাতটার মধ্যে।

বুঢ্ঢা বললো, এইসব উদ্ধার-আশ্রম নিয়েও তো অনেক স্ক্যান্ডাল আছে। গত মাসেই তো একটা আশ্রমের একটি অল্পবয়েসি মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল, কাগজে পড়েছি!

রাহুল বললো, হ্যাঁ, তারপরেই এরকম কোর্ট অর্ডার হয়েছে। আমি ব্যবস্থা করে এসেছি। ঊর্মিলা চন্দ্রভারকর নামে একজন মহিলা এখানে একটা এন জি ও চালান, সোস্যাল অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে তাঁর খুব নাম আছে, তাঁকে বলেছি, তিনি আমাদের সঙ্গে যাবেন। গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, ঠিক সাড়ে চারটের সময় তিনি এখানে আসবেন। আমরা একসঙ্গে বেরুবো।

আমি বললুম, সাড়ে চারটের তো দেরি আছে। তুমি বসো।

চেয়ারে বসে রাহুল বললো, আপনার ক্যান্ডিডেটের নাম তো আনোয়ারা? আমি লিস্ট চেক করেছি। ওই নামে একজন আছে। বয়েস পঁয়তিরিশের কাছাকাছি। একটা ব্রথেল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি অনবরত কাঁদছিলেন। কোনো কথারই উত্তর দিতে পারেননি ভালো করে।

বাঙালি?

এই ব্যাচে যতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তারা সবাই এসেছে পশ্চিম বাংলা থেকে। আপনি বলেছেন, আপনার চেনা মেয়েটি 888sport appsের। কিন্তু কলকাতা থেকে আনা হয়েছে বলে এখানে পশ্চিম বাংলার বলেই ধরা হয়েছে।

বুঢ্ঢা জিজ্ঞেস করলো, সুনীল যদি মেয়েটিকে আইডেন্টিফাই করে, তাহলে কি তোমরা মেয়েটিকে ছেড়ে দেবে?

রাহুল বললো, দু’চারদিন সময় লাগবে। কোর্টে প্রোডিউস করতে হবে। তার খুব অসুবিধে হবে না। এইসব উদ্ধার আশ্রমগুলোতে এমনিতেই জায়গার অভাব।

ব্রথেল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শুনে আমার মনটা দমে গেল। এর মধ্যেই কি অত্যাচার করা হয়েছে আনোয়ারার ওপরে? অত সরল, সুন্দর একটা মেয়ে!

রাহুল বুঢ্ঢাকে জিজ্ঞেস করলো, মিস্টার গুহঠাকুরতা, আপনি নাকি ইনসিওরেন্সের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন?

বুঢ্ঢা বললো, হ্যাঁ। আফ্রিকায় চলে যাচ্ছি, ভালো চান্স পেয়ে।

রাহুল বললো, আমাদের খুব অসুবিধে হবে। মাঝে মাঝে আপনার সাহায্য পেতাম।

আমার দিকে ফিরে বললো, জানেন, সুনীলদা, একবার আমরা এক স্মাগলারকে ধরেছিলাম, ব্যাটা এক গ্যাংলিডার, জাতে গ্রিক। গ্রিক ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষাই জানে না। তাকে জেরা করা যাচ্ছিল না, আমরা তো কেউ ওই ভাষা জানি না। এখানে গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের এক ফাদার গ্রিক, কিন্তু তিনি খুব অসুস্থ, আর পুলিশ দফতরে তিনি জেরায় সাহায্য করতেও আসবেন না। তখন কে যেন আপনার এই বন্ধুর নাম বললো। কী আশ্চর্য ব্যাপার, ইনি সেই লোকটার সঙ্গে জলের মতন গ্রিক ভাষায় কথা বলতে লাগলেন। অত শক্ত ভাষা –

বুঢ্ঢা বাধা দিয়ে বললো, এমন কিছু শক্ত না। একটু চেষ্টা করলেই শেখা যায়।

রাহুল বললো, আপনি ওই ভাষাটা শিখেছিলেন কেন? আপনার চাকরিতে কোনো কাজে লাগে?

বুঢ্ঢা বললো, ইনসিওরেন্সের চাকরিতে আবার গ্রিক ভাষা কী কাজে লাগে? এমনিই শিখেছিলাম, শখ হয়েছিল!

কথা ঘুরিয়ে বুঢ্ঢা বললো, সুনীল, তুই রাজ কাপুরকে চিনতিস না। অথচ একটা বিশেষ মুহূর্তে ওর কাছে উপস্থিত ছিলি, ব্যাপারটা কী রে? জানতে খুব কৌতূহল হচ্ছে।

আমি বললুম, ব্যাপারটা ঘটেছিল বছর পাঁচেক আগে।

রাহুল বললো, ঠিক চার বছর তিন মাস আগে।

আমি বললুম, তা হবে। সেটা আমার জীবনে একটা 888sport app download for androidীয় দিন। সেদিন আমি দিল্লিতে ভারতের প্রেসিডেন্টের পাশের চেয়ারে বসেছিলুম। ভেবে দ্যাখ, কী কাণ্ড, আমি পূর্ববঙ্গের রিফিউজি পরিবারের ছেলে, ছাত্রবয়েস কাটিয়েছি উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি পাড়ায় ভাড়া বাড়িতে, সেই আমিই বসার সুযোগ পেয়েছি দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির পাশে।

বুঢ্ঢা জিজ্ঞেস করলো, তুই যেবারে 888sport live football আকাদেমি 888sport app download bd পেলি?

রাহুল বললো, উনি 888sport live football আকাদেমি 888sport app download bd পেয়েছেন এর অনেক আগেই।

আমি বললুম, 888sport live football 888sport app download bd হলে আর রাজ কাপুরকে দেখবো কী করে? সেটি ছিল জাতীয় live chat 888sport 888sport app download bd উৎসব। সেবার আমি ছিলুম, বুক কমিটির প্রধান বিচারক। বুক কমিটি মানে সারা ভারতে সিনেমা-বিষয়ে যত বই লেখা হয়, তারও শ্রেষ্ঠ বইটির একটি 888sport app download bd আছে। এইসব উৎসবে সিনেমা জগতের বহু তারকা আসে। রাজ কাপুর তখন জীবন্তপ্রবাদতুল্য। সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে দেখেছি, সেখানে রাজ কাপুর দারুণ জনপ্রিয়, চীনেও আওয়ারা ছবিটা বারবার দেখানো হয়। সে যাইহোক, রাজ কাপুর এসেছেন, কোনো ছবির জন্য নয়, তাঁর সারাজীবনের কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হবে একটি বিশেষ 888sport app download bd, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট যাকে বলে। রাষ্ট্রপতি এক এক করে 888sport app download bd প্রাপকদের নাম ধরে ডাকছেন, তাঁরা মঞ্চের ওপর উঠে এসে 888sport app download bd নিচ্ছেন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে, আমার আর একজনের দায়িত্ব তাঁদের গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া। প্রথমদিকে সহ-অভিনেতা, সহ-অভিনেত্রী ইত্যাদিদের ডাকা হয় … রাজকাপুর বসে আছেন আমাদের ঠিক সামনেই, তাঁর পাশে খুব সম্ভবত বৈজয়ন্তীমালা আর নার্গিস।

রাহুল বললো, না, নার্গিস ছিলেন না। সেবারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার 888sport app download bd পেয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতের কমল হাসান।

আমি বললুম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওদের রীতি-অনুযায়ী সাদা রঙের লুঙ্গি পরে 888sport app download bd নিতে এসেছিল … যাইহোক, সংক্ষেপে বলছি, তারপর তো রাজ কাপুরের নাম ডাকা হলো, রাজ কাপুর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে লাগলেন, একটু একটু করে উঠছেন, স্লো মোশানে দেখার মতন, সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াবার আগেই আবার বসে পড়লেন ঝুপ করে। সারা অডিটোরিয়ামে একটা ভয়ের শব্দ হলো। রাজ কাপুর আর উঠতে পারছেন না। … আমরা বসে আছি স্টেজের ওপর, প্রোটোকল হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি কখনো স্টেজ থেকে নিচে নামেন না, তিনি প্রটোকল ভেঙে নিজে নিচে নেমে গেলেন রাজ কাপুরের হাতে 888sport app download bd তুলে দেবার জন্য, আমরাও কয়েকজন গেলুম তাঁর সঙ্গে। রাজ কাপুর কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তাঁর গলায় মালাটি পরিয়ে দেওয়া মাত্র যেন তিনি সেই ফুলের ভারও সহ্য করতে পারলেন না, অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তখনই তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো। আমিও হাত লাগিয়েছিলাম, অর্থাৎ রাজ কাপুরের সঙ্গে আমার পরিচয় না হলেও আমি তাঁকে ছুঁয়েছি। পরের দিনই –

রাহুল বললো, না, তিনদিন পর তাঁর শেষ নিশ্বাস পড়ে। এর মধ্যে তাঁর আর জ্ঞান ফেরেনি। কয়েকদিন আগে থেকেই তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, ওই অবস্থায় ডাক্তাররা তাঁকে প্লেনে চাপতে বারণ করেছিলেন, তবু তিনি মুম্বাই থেকে উড়ে গেলেন দিল্লিতে জীবনের শেষ 888sport app download bdটা সশরীরে গ্রহণ করার জন্য।

বুঢ্ঢা বললো, তোর এরকম অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাই না?

আমি বললুম, হয়েছে কিছু কিছু। মজার অভিজ্ঞতাও আছে। একদিন আমি ইন্দিরা গান্ধীকে দৌড়োতে দেখেছি। ভেবে দ্যাখ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তাও একজন মহিলা, কলকাতার রাজভবনের অলিন্দ দিয়ে ছুটছেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠার জন্য।

রাহুল বললো, এ-ঘটনাটা আমি জানি। আপনি তো একবার লিখেছেন।

বুঢ্ঢা বললো, আমি সেটি পড়িনি। কী হয়েছিল?

আমি বললুম, উনিশশো একাত্তর সালের তেসরা ডিসেম্বর। পূর্ব পাকিস্তানে তখন স্বাধীন 888sport apps প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে। ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এসে রাজভবনে লেখক-888sport live chatী-বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে এক আলোচনাসভায় বসেছেন। উনি নিজের হাতে চা বানিয়ে পরিবেশন করছেন আমাদের, কার কতটা দুধ বা চিনি লাগবে জেনে নিচ্ছেন –

রাহুল বললো, সুচিত্রা সেনও ছিলেন আপনাদের সঙ্গে।

আমি বললুম, হ্যাঁ, উত্তমকুমার, মৃণাল সেন … এর মধ্যে জেনারেল অরোরা (তখন চিনতাম না, পরে জেনেছি) এসে প্রধানমন্ত্রীর একেবারে কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন কী যেন। ইন্দিরা গান্ধী কোনো উত্তেজনা না দেখিয়ে শুনলেন, তারপর আমাদের বললেন, আজ আলোচনা শেষ হলো না, আবার একদিন হবে, আজ জরুরি কাজে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে এখুনি। ধীর পায়ে তিনি হল ঘরটা পেরিয়ে গেলেন, একবার পেছন ফিরে দু’হাত তুলে নমস্কার জানালেন সকলকে, তারপরই দৌড়োতে আরম্ভ করলেন। পরে শুনেছি, প্রায় নাকি লাফিয়ে উনি উঠে পড়েছিলেন একটা গাড়িতে, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় নিজে যাকে বলে ব্রেক নেক স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে, সেখান থেকে এয়ারফোর্সের প্লেনে তক্ষুনি রওনা হয়েছিলেন দিল্লির দিকে। তার মানে, ইন্দিরা গান্ধী যখন আমাদের সঙ্গে গল্প করছিলেন, সেই সময়েই অমৃতসরে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে পাকিস্তান। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ভারত-পাকিস্তানে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে রাজধানী দিল্লিতে থাকা বিশেষ দরকার।

গল্পে গল্পে তরতরিয়ে সময় কেটে গেল।

এক সময় হোটেলের রিসেপশান থেকে ফোন এলো, রাহুলের গাড়ি এসে গেছে।

রাহুল বললো, চলুন।

ঊর্মিলা চন্দ্রভারকর ছোট্টখাট্টো মহিলা, সালোয়ার-কামিজ পরার জন্য বয়েসটাও কম দেখায়। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, মাথার চুল প্রায় পুরুষদের মতন ছাঁটা। তবে, ইনি যে খুব তেজি, তা বোঝা গেল খানিকটা পরে।

গাড়িতে ওঠার পর আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল রাহুল।

তিনি প্রথমে বুঢ্ঢাকে বললেন, আপনি থাকেন মুম্বাই? বাঙালি। আপনি কতদিন আছেন এ শহরে? কী করেন?

বুঢ্ঢা সংক্ষেপে আত্মপরিচয় দিল।

ঊর্মিলা এবার ওকে জিজ্ঞেস করলেন, উদ্ধারাশ্রমে যে-মেয়েটির সঙ্গে আমরা দেখা করতে যাচ্ছি, সে কি আপনার কেউ হয়?

না।

তাকে আপনি চেনেন? কখনো দেখেছেন?

না।

তাহলে আপনি যাচ্ছেন কেন?

আমার এই বন্ধুর সঙ্গে যাচ্ছি। যদি কোনো কিছু সাহায্য করতে পারি।

এটা ঠিক নিয়মসম্মত হচ্ছে না। আশ্রম-কর্তৃপক্ষ আপনাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে নাও পারে। আপনাকে তাহলে গাড়িতে বসে থাকতে হবে।

এবারে আমার দিকে ফিরে ঊর্মিলা বললেন, শুনলাম তো, আপনি একজন লেখক। দেখা করতে যাচ্ছেন কেন? ওকে নিয়ে গল্প লিখবেন বলে?

আমি হেসে বললুম, গল্প লেখা বা না লেখা তো পরের কথা। আপাতত আমি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমি ওকে চিনি।

কী করে চিনলেন?

888sport appতে আমার এক বন্ধুর স্ত্রী।

শুধু তাই? আপনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই?

আছে।

কী সম্পর্ক?

আমি ওকে ভালোবাসি।

প্রায় মিনিটখানেক আমার দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে ঊর্মিলা আবার বললেন, আপনার বন্ধুর স্ত্রী, আবার আপনি বলছেন, তাকে ভালোবাসেন?

আমি হালকাভাবেই বললুম, বিশ্বসংসারে এই ব্যাপারটি এই প্রথম ঘটছে না। বন্ধুর স্ত্রীকে কেউ ভালোবাসতে পারে না? মামার স্ত্রীকেও ভালোবাসা যায়। তা নিয়ে বিখ্যাত কাব্য হয়।

মামার স্ত্রী?

রাধা শ্রীকৃষ্ণের মামিমা নয়?

মিস্টার গঙ্গোপাধ্যায়, এটা হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার নয়। কঠোর বাস্তব অন্যরকম। হাজার হাজার মেয়ে বিক্রি হচ্ছে শুধু শরীরের মাংসের জন্য। প্রেম-ভালোবাসা সব মিথ্যে কথা। পুরুষরা সবাই স্বার্থপর। আপনার মতন পুরুষরাই সারা পৃথিবী জুড়ে 888sport promo code-মাংসের ব্যবসা চালাচ্ছে।

আমি বললুম, আমাদের মতন পুরুষরাই এই নৃশংস ব্যবসা চালাচ্ছে, তা একেবারে ঠিক কথা। তবে কিছু কিছু 888sport promo codeও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে।

মেয়েটার সঙ্গে যে আপনার পরিচয় আছে, তার প্রমাণ কী?

এ প্রমাণ তো হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় না। মহিলাটি আশা করি আমাকে চিনতে পারবেন। তারপর আমাদের কথাবার্তা শুনেই বোঝা যাবে, কতটা পরিচয় আছে।

রাহুল বললো, অনেক সময় ওরা লজ্জায় কিংবা আতঙ্কে প্রথম প্রথম মুখ খুলতেই চায় না। আপনাকে চিনলেও যে কথা বলবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

ঊর্মিলা বললেন, এর আগে এরকম কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। মিথ্যে পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ এখান থেকে মেয়েদের বার করে নিয়ে     গেছে, তারপর তাকে আবার চালান করে দিয়েছে অন্যদেশে। এইসব ক্রিমিনালরা যে কতরকম ছদ্মবেশ ধরে আসে। এক-একজনকে তো দেখলে মনে হয়, দারুণ ভদ্রলোক, উচ্চশিক্ষিত! পুরুষরা কতরকম ছদ্মবেশ ধরতেই যে জানে!

বুঢ্ঢা বললো, মহাশয়া, আপনি প্রথম থেকেই আমাদের অবিশ্বাস করছেন।

ঊর্মিলা তীব্রভাবে উত্তর দিলেন, আপনাদের প্রথম থেকেই বিশ্বাস করার কোনো কারণ আছে কী? আপনাদের সত্যিকারের কী মতলব, তা আমি বুঝবো কী করে? আমাদের প্রথম থেকেই খুব সাবধানে থাকতে হয়।

এই মহিলার সঙ্গে তর্কাতর্কি করে কোনো লাভ নেই বলে আমি বুঢ্ঢাকে চুপ করে থাকার ইঙ্গিত দিলুম। তারপর কথা ঘোরাবার জন্য ঊর্মিলাকে বললুম, আপনি কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত? মানে, কী ধরনের সামাজিক কাজ করেন?

ঊর্মিলা বললেন, ‘স্বয়ম্ভর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আমি পরিচালিকা। মহিলাদের স্বাধীনভাবে উপার্জন ও আত্মনির্ভর হবার জন্য আমরা নানারকমের প্রশিক্ষণ দিই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে এখন একশো সাতান্নজন মেয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই স্বামী-পরিত্যক্তা। মেয়েদের জীবনের প্রথম এবং প্রধান ভুল কী জানেন? বিয়ে করা। বিয়ে করা মানেই একটি হিংস্র পুরুষের খপ্পরে পড়া। পুরুষগুলো তাদের বউদের শরীর-স্বাস্থ্য নিঙড়ে, চুষে অল্পদিনের মধ্যেই শেষ করে তারপর আখের ছিবড়ের মতন ছুড়ে ফেলে দেয়!

পুরুষদের পক্ষ নিয়ে কিছু বলার বদলে আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, বাঃ, আপনারা ভালো কাজ করছেন, আপনাদের চলে কী করে? বিদেশি সাহায্য নেন?

মহিলাটি তেজের সঙ্গে বললেন, এক পয়সাও নিই না! কেন নেবো, আমরা কি ভিখিরি? নিজের দেশের গরিব দুস্থ মানুষের সেবা করার জন্য বিদেশিদের কাছে হাত পাততে হবে কেন? তাতে আমাদের দেশের কোনো মানসম্মান থাকে? আমাদের দেশে টাকার অভাব আছে? কিছু কিছু পরিবারের হাতে অঢেল টাকা!

তা ঠিক!

আমরা গোটা মহারাষ্ট্রে একশোটি পরিবার ঠিক করেছি। তারা প্রতিমাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা দেয়। এক হাজার টাকা দেওয়া ওদের পক্ষে কিছুই না। এক-একদিন হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেয়ে ওরা এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করে। এইসব পরিবারের তালিকা আমরা জোগাড় করেছি ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে। আমার নিজের বোন এখন ইনকাম ট্যাক্সের জয়েন্ট কমিশনার।

আপনার সেই বোনও নিশ্চয়ই বিয়ে করেননি?

তার মানে?

আপনি কোনো পুরুষকে বিয়ে করবেন না, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সেই জন্যই জানতে চাইলাম।

আমরা পাঁচ বোন। আমরা কেউই বিয়ে করিনি। আপনি হঠাৎ এই ব্যক্তিগত ব্যাপার জানতে চাইলেন কেন?

এমনিই, মানে কিছু না ভেবেই … মানে, আপনারা এইভাবে টাকা সংগ্রহ করছেন, এটা খুবই অভিনব। আশা করি, এরকম ফ্যামিলির 888sport free bet আরও বাড়বে।

প্রতিমাসেই বাড়ছে। যারা ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, আমার বোন তাদের চেপে ধরে। কিছুদিন আগে এক ব্যবসায়ী আমাদের প্রতিষ্ঠানকে পঁয়ষট্টি লাখ টাকা ডোনেশান দিয়েছে। আর একজন একটা জমি দিয়েছে।

বুঢ্ঢা বললো, তার মানে আপনার বোন খুব অনেস্ট। নিজে ঘুস নেন না, সেই টাকটা আপনাদের মতন একটা ভালো কাজে দান করতে বাধ্য করান। যদিও টাকাটা সরকারি তহবিলে জমা পড়ার কথা।

রাহুল তাড়াতাড়ি মুখ বাড়িয়ে বললো, আমরা যে উদ্ধারাশ্রমে যাচ্ছি, সেটা অবশ্য সরকারি টাকায় চলে। প্রায় এসে গেছি।

বুঢ্ঢা বললো, এ তো ইস্ট আন্ধেরি, আমার বাড়ির কাছেই। এই আশ্রমটার নাম কি জিজাবাই হোম ফর দ্য ডেস্টিটিউট উইমেন?

হ্যাঁ।

ওরে বাবা, ওটা তো চিনি। ও-জায়গাটা সম্পর্কে স্ক্যান্ডালের শেষ নেই। প্রায়ই কিছু না কিছু শোনা যায়। ভালো করে খেতে দেয় না, মারধোর করা হয়, রাত্তিরবেলা লোক ঢুকে পড়ে, মাস দু’এক আগে একটি মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাঝে মাঝেই ওখান থেকে মেয়েরা পালায়। হিউম্যান রাইটস কমিশন থেকেই এইসব রিপোর্ট বেরিয়েছে।

ঊর্মিলা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, সরকারি বলেই এই অবস্থা!

ওঁকে সূক্ষ্ম খোঁচা দিয়ে বুঢ্ঢা বললো, আমি যতদূর জানি, ওই হোমে যে এগারোজন কর্মচারী আছে তার মধ্যে দু’জন দারোয়ান ছাড়া আর সবাই মহিলা। মহিলারাই তো চালাচ্ছেন, তবু …

ঊর্মিলা জোর দিয়ে বললেন, না, মহিলারা চালাচ্ছেন না। আড়াল থেকে কিছু পুরুষ কলকাঠি নেড়ে চালাচ্ছেন ওই মহিলাদের। জেনে রাখবেন, পৃথিবীতে যেখানে যত কিছু অন্যায় কাজ হচ্ছে, তার কোনো কোনোটির সামনের দিকে কিছু কিছু মহিলা থাকলেও সবসময়ে আড়ালে থাকে পুরুষরা।

আমার মনে পড়লো ফরাসি প্রবচনটি। র্শেশঁ লা ফাম্! র্শেশঁ    লা ফাম্। অর্থাৎ মেয়েটিকে নিয়ে এসো, মেয়েটিকে নিয়ে এসো! যে-কোনো ঘটনা ঘটলেই ফরাসিরা মনে করে, তার আড়ালে কোনো মেয়ে থাকবেই! সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, একজন রাজমিস্ত্রি প্যারিস শহরে একটা বাড়ির জানালা রং করছিল, দেয়ালের গায়ে ভারা বেঁধে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে সে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে মারা যায়। তাতে মামলা হয় কোম্পানির মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে। বিচারক ঘটনার বিবরণ শুনেই বললেন, র্শেশঁ লা ফাম্। র্শেশঁ লা ফাম্। সবাই অবাক! এর মধ্যে কোনো মেয়ে আসবে কী করে? পরে তদন্ত করে জানা গেল, উঁচুতলার একটি ঘরের মধ্যে একটি সুন্দরী মেয়ে জামাটামা বদলাচ্ছিল, লুকিয়ে তাকে দেখতে গিয়েই অন্যমনস্ক হয়ে মিস্ত্রিটির পতন এবং মৃত্যু!

এ-কথা ঊর্মিলাকে বলতে গেলে উনি নিশ্চয়ই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবেন। আমি মুখ ফিরিয়ে একটা সিগারেট ধরালুম।

বুঢ্ঢা বললো, সুনীল, এই ধরনের হোমগুলোকে বাংলায় যে উদ্ধারাশ্রম বলা হয়, সেটি কি ঠিক? আশ্রম শব্দটায় ধর্মীয় গন্ধ আছে। তাছাড়া, আশ্রম শুনলেই প্রাচীনকালের যে শুদ্ধ, শান্ত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কথা মনে পড়ে, তার সঙ্গে তো এসব জায়গার কোনো মিলই নেই। শুধু নোংরামিতে ভরা। ‘উদ্ধার বাড়ি’ কিংবা শুধু ‘আশ্রয়’ বললে কেমন হয়?

রাহুল বললো, একটা ব্যাপার ভেবে দেখুন। সবদেশেই কিছু কিছু ক্রিমিনাল থাকে। তাদের সামলানো আমাদের কাজ। কিন্তু সাধারণ, সংসারী মানুষ যখন অসৎ কাজ করে, তখন তাদের ধরা কত শক্ত। এইসব হোমে যারা চাকরি করছে, তারা তো মোটামুটি লেখাপড়া জানে, এসেছে ভদ্রপরিবার থেকে। তবু, এইসব অসহায় মেয়েদের বরাদ্দ খাদ্য থেকে চুরি করে, এদের ওপর অত্যাচার করে, একটুও দয়ামায়া নেই, কিছু কিছু মেয়েকে এরাই তো জেনেশুনে ক্রিমিনালদের হাতে তুলে দেয়। সাধারণ মানুষেরও যদি বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায় …।

আমি বললুম, সকলেই নিশ্চয়ই একরম নয়। কেউ কেউ তো নিঃস্বার্থভাবে এদের সেবাও করে। এই যে মিজ চন্দ্রভারকরকেই দ্যাখো। একেবারে সিনিক হয়ে যেও না। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারালে নিজেকেও আর বিশ্বাস করা যায় না।

গাড়িটা এসে থামলো একটা গেটের সামনে।

বেশ বড় বাড়ি, উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা কমপাউন্ড। দেখলে জেলখানা মনে হয়।

গেটটা বন্ধ, তার পাশে একজন লাঠি-হাতে দারোয়ান এই বিকেলবেলাতেই ঘুমোচ্ছে। বেশ গাঢ় ঘুম, এতগুলো লোকের পায়ের শব্দেও জাগলো না। ডাকাডাকি করতে হলো।

বেশ কিছুক্ষণ জেরা করার পর সে আমাদের ঢুকতে দিল ভেতরে। একটুখানি হেঁটে যাবার পর আর একটি বন্ধ দরজা। চারদিকে তাকালে মনে হয়, জেলখানার মতনই বেশ নিশিছদ্র ব্যবস্থা। তবু এখান থেকে মেয়েরা পালায়।

সেই দরজাটা খোলার আগেই আমার মনে হলো, আমরা এখানে বৃথাই এসেছি। আনোয়ারাকে এখানে পাওয়া যাবে না।

এরকম আমার হয়। কোনো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে কিংবা কোনো কিছু সূত্র ধরে কোথাও গেলে, ঠিক শেষ মুহূর্তে মনের মধ্যে ছলকে ওঠে ফলাফল। পাওয়া যাবে কী যাবে না! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিলে যায়। এটা আমার ইনসটিংকট না বিশেষ ক্ষমতা, তা কে জানে!

আমার সব উৎসাহ চলে গেল।

সেই দরজা খুলে দিল এক পরিচারিকা, তারপর এলেন মহিলা-সুপার। তিনি আবার এক প্রস্থ জেরা করলেন।

বুঢ্ঢা সঙ্গেই এসেছে, তার সম্পর্কে অবশ্য কোনো প্রশ্ন উঠলো না।

ঊর্মিলা বললেন, শুধু আনোয়ারা নামের মেয়েটিকে এখানে একা আনা চলবে না। পাঁচটি মেয়েকে আনতে হবে। তাদের মধ্যে কোনজন আনোয়ারা, আমরা চিনতে পারবো কি-না তা দেখা হবে। যদি চিনতে পারি, তাহলে তার সঙ্গে প্রথম কথা বলবেন ঊর্মিলা।

একটু বাদে পাঁচটি মেয়েকে এনে দাঁড় করানো হলো দরজার সামনে। তাদের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই আমি বললুম, দুঃখিত, আমি যে-আনোয়ারাকে চিনি, সে এর মধ্যে নেই।

মহিলা-সুপার একটি মেয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে কিছু বলতে যেতেই ঊর্মিলা বাধা দিয়ে বললেন, দাঁড়ান, ওরা নিজেরাই নিজেদের নাম বলুক।

ওরা পরপর বললো, সুধা, চামেলি, লক্ষ্মী, আনোয়ারা, মাসুদা।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, আনোয়ারা নামে আর কেউ এখানে আছে?

সুপার জানালেন, না নেই। অন্য মেয়েরা বয়েসেও ছোট, আঠারো থেকে পঁচিশের মধ্যে।

আমি দু’দিকে মাথা নাড়লুম। এখানে কোনো আশা নেই।

ঊর্মিলা আনোয়ারাকে কিছু জেরা করতে গেল, কিন্তু মেয়েটি হিন্দি বা ইংরেজি কিছুই বোঝে না। মেয়েটির গায়ের রং ময়লা, একটা নীলচে শাড়ি পরা, বেশ রোগা, চোখদুটো ফোলা ফোলা। তবে সে এখন কাঁদছে না।

রাহুল বাংলায় তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলো। এর বাড়ি মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে, এক যুবকের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সে-যুবকটি তাকে মুম্বাই এনে বিক্রি করে দিয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে।

এরকম কাহিনী আর কতবার শুনবো?

আমি রাহুলকে বললুম, তাহলে ওঠা যাক। সরি, তোমাদের শুধু শুধু ট্রাব্ল দেওয়া হলো।

সুপারকে নমস্কার জানিয়ে আমরা উঠে দাঁড়াতেই হঠাৎ আনোয়ারা নামের সেই মেয়েটি দৌড়ে এসে বুঢ্ঢার হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো, ও দাদা, আমারে বাঁচান। আমারে বাড়ি পৌঁছাইয়া দ্যান। এহানে আমি বাঁচুম না! আমারে দয়া করেন।

সুপার জোরে চেঁচিয়ে উঠতেই দু’জন পরিচারিকা ছুটে এসে সেই আনোয়ারাকে চেপে ধরলো, তারপর টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল ভেতরে। সে তখনো চ্যাঁচাচ্ছে; ও দাদা, আমারে দয়া করেন, আমারে বাঁচান!

আমরা আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে এলাম বাইরে।

গাড়িতে ওঠার আগে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বুঢ্ঢা ভারি গলায় বললো, সুনীল, আমরা একজন আনোয়ারার খোঁজ করতে এসেছিলাম। এ মেয়েটি সে নয়। কিন্তু এই মেয়েটিও তো একটি অসহায় মেয়ে। এই পরিবেশ থেকে উদ্ধার পেতে চায়। বাঁচতে চায়। সেই আনোয়ারাকে আমরা উদ্ধার করতাম, তাহলে একেই বা সাহায্য করবো না কেন?

আমি চুপ করে রইলুম। (ক্রমশ)