॥ ৭ ॥

বাকি সন্ধেটা আমাদের কাটলো অন্যরকমভাবে।

বৃষ্টির বিরাম নেই, বাতাস এমন ঠান্ডা হয়ে গেছে যে গায়ে একটা চাদর দিলে যেন ভালো হয়।

কথার স্রোত এদিক-সেদিক যেতে যেতে একসময় শুরু হলো গান।

নীলোফার নামের তরুণীটি শুধু রূপসী এবং বিদুষী, তাই-ই নয়, সে খুব ভালো গানও করে। এক-একজনের গুণের অন্ত থাকে না। হিন্দিতে একটা কথা আছে, খোদা যিস্কো দেতা, ছপ্পর ফোঁড়কে দেতা।

নীলোফারের তুলনায় করবী খানিকটা নি®প্রভ। সে কথা বেশি বলে।

নীলোফারের সঙ্গে আমি প্রখ্যাত গায়িকা ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের যেন খানিকটা মিল খুঁজে পাই। ইফ্ফাত আরাকে দশ-বারো বছর আগে প্রথম যেমন দেখেছিলাম। নীলোফারও কথা বলে খুব মৃদু গলায়।

নীলোফার শোনালো অতুলপ্রসাদের তিনখানা গান। এইসব গানই আমি অনেকবার অনেকের কণ্ঠে শুনেছি, তবু এক এক সময় মনে হয়, এমনটি আর আগে কখনো শুনিনি। নীলোফারের গলায় ‘আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’ গানটা শুনতে শুনতে সে-রকমই মনে হলো।

নীলোফার আগেই বলেছে যে, ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করবে আর কলেজে পড়াবে ঠিক করেছে। কিন্তু এরকম একটি গুণী তরুণীকে পারফরমিং আর্টসের জগতের লোকেরা পেলে অনেক লাভবান হতো।

 সে-রকম কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা, আমি একবার এই প্রশ্ন করতেই নীলোফার প্রবলভাবে মাথা নেড়ে জানালো, সে শুধু পড়াশুনো নিয়েই থাকতে চায়। গান তার অবসরের সঙ্গী।

ওদের রিকশাওয়ালাটি আপত্তি জানাচ্ছিল দেরি হবার জন্য। তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।

শান্তিনিকেতনের অনেক বাড়িতেই কেয়ারটেকাররা সাইকেল-রিকশাও চালায়। আমাদের পাড়াতেই আছে কয়েকজন। তাদের একজনকে খবর দেওয়া হলো, বৃষ্টি থামলে সে ওদের নিয়ে পৌঁছে দেবে।

ওরা দু’জন রাত্রে এখানে থাকতে চায় না। ওদের না খাইয়ে ছাড়লো না স্বাতী।

নীলোফার আর করবীর সঙ্গে পরের দিনও আমার দেখা হলো ইন্দ্রনাথের দোকানে। সকালে ও সন্ধ্যায় সেখানে বেশ আড্ডা বসে, আমি মাঝে মাঝে যাই। বই ছাড়া নানারকম গান-বাজনার ক্যাসেটও পাওয়া যায়। ওরা ক্যাসেট কিনতে এসেছিল।

আমার অনুরোধে ওরা আড্ডার মধ্যে বসলো খানিকক্ষণ।

তারপর দোকান থেকে বেরিয়ে আমরা কিছু পথ হাঁটলাম একসঙ্গে। তারপর ওরা দু’জন চলে গেল পূর্বপল্লী গেস্ট হাউজের দিকে।

এর মধ্যে আনোয়ারা-শামীমদের নিয়ে আর একটি কথাও হলো না। নীলোফারের প্রতি আমার অনেকখানি মুগ্ধতার সঙ্গে কিছুটা ক্ষোভও মিশেছিল। সামান্য একটু মর্মজ্বালা। নীলোফার খুব সম্ভবত আমার একটি লেখাও পড়েনি, অন্তত সে-রকম কিছু উল্লেখ করেনি। ইফ্ফাত আরাও আলাপের পর আমাকে বলেছিল, সে আমার নাম শুনেছে বটে, কিন্তু পড়েনি কিছুই।… সুন্দরী মেয়েরা আমার লেখা পড়ে না!

লেখক হওয়ার এ-ই এক জ্বালা। নিজের লেখা সম্পর্কে সচেতনতা কিছুতেই কোনো সময় মুছে ফেলা যায় না। কেউ সামনাসামনি প্রশংসা করলে অস্বস্তি হয়, আবার কেউ কোনো কিছুই না বললে খানিকটা অভিমান পেয়ে বসে।

নীলোফাররা আমাদের কলকাতার বাড়িতেও দেখা করতে আসবে বলেছিল, কিন্তু আসেনি।

আমাকে ওরা 888sport appsে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু সে-রকম কোনো উপলক্ষ ঘটলো না কিছুদিনের জন্য।

কলকাতায় ফেরার পর অন্য একটি মর্মান্তিক ঘটনায় আমাকে কিছুটা জড়িয়ে পড়তে হলো।

আমাদের আনন্দবাজার পত্রিকার লাইব্রেরিয়ানের নাম নকুল চ্যাটার্জি। বেশ লেখাপড়া-জানা বুদ্ধিমান মানুষ, সুরসিক, আড্ডাবাজ। সে আবার জ্যোতিষও জানে, হাত দেখে, কোষ্ঠী বিচার করে, টপাটপ লোকের ভবিষ্যৎ বলে দেয়। আমাদের কম্পানির মালিকরা, অনেক রাজনৈতিক নেতারাও নতুন কিছু করার আগে তার পরামর্শ নেয়।

নকুল বিবাহিত, তার একটি কিশোরী মেয়ে আছে, তার স্ত্রী পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে একটা বাড়ি পেয়েছে, সেখানেই থাকে। নকুলের উপার্জনও ভালো, সুতরাং তাকে একজন আপাতত সার্থক ও সুখী মানুষ বলা যায়।

আমি হাত-দেখা ফাত-দেখায় বিশ্বাস করি না। ভবিষ্যৎ জানার জন্যও বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এইসব নিয়ে নকুলকে ঠাট্টা করলে     সে-ও হেসে বলতো, এসব যারা বিশ্বাস করে, তাদের ক্ষেত্রে অনেক কিছু মেলে। যারা অবিশ্বাসী, তাদের কিছুই মেলে না।

আমরা কখনো ইতিহাসভিত্তিক কিছু লিখতে চাইলে নকুল রেফারেন্স দিয়ে বই-টই জোগাড়ে সাহায্য করতো। আমি সে-সময়ে রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে একটি 888sport alternative link লিখছিলাম, ভক্তিরস ও অলৌকিকতাবর্জিত গ্রাম্য প্রেমের কাহিনী, নকুল অনেক 888sport free bet login দিয়েছিল আমাকে। এক-এক সময় বলতো, আমি যে আপনার জন্য এত খাটছি, তার বদলে আমাকে কী দেবেন? বলেছিলাম, কী চাও বলো? নকুল বলেছিল, একদিন ভালো করে খাওয়াতে হবে। আমি বলেছিলাম, এ আর বেশি কথা কী, নিশ্চয়ই খাওয়াবো।

তারপর আর দু’এক মাস দেখা হয়নি।

একদিন বিকেলের দিকে অফিসে গেছি, গাড়ি থেকে নেমেই দেখি, গেটের পাশে যে পান-সিগারেটের দোকান, সেখানে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নকুল। জ্যোতিষিগিরি করলেও সে ধুতি-টুতি পরে না। প্যান্ট-শার্টের সঙ্গে টাই পরা, চোখদুটি লালচে, চুল উসকোখুসকো।

দেখেই মনে হলো, সে অনেকটা নেশা করে ফেলেছে এর মধ্যে।

নকুল বিয়ার পান করতে ভালোবাসে, আমার সঙ্গে সন্ধের পর দু’একটি পানশালায় তার সঙ্গে দেখাও হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু বিকেলের মধ্যেই তাকে এমন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আগে কখনো দেখিনি।

নকুল খপ করে আমার একহাত চেপে ধরে বললো, এই যে সুনীলদা, আপনি আমাকে একদিন খাওয়াবেন প্রমিজ করেছিলেন। খুব ফাঁকি দিচ্ছেন। চলুন, আজ আমাকে খাওয়াতে হবে!

আমি বললাম, সত্যি, এর মধ্যে অনেকদিন দেখা হয়নি। খাওয়াবো নিশ্চয়ই। কিন্তু আজ নয়, আজ আমার কাজ আছে।

নকুল জড়ানো গলায় বললো, আজই খাওয়াতে হবে। গুলি মারুন কাজ! চলুন। চলুন!

খাওয়ানো মানে তো শুধু খাদ্য নয়, পানাহার। দু’তিন ঘণ্টা বসতেই হবে। সেদিন আমার সত্যিই খুব জরুরি কাজ ছিল, ‘বুধসন্ধ্যা’র মিটিং, অন্যরা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। অফিসে একটি লেখা জমা দিয়েই চলে যাবার কথা।

নকুলকে বললুম, আজ নয় ভাই, কাল তোমাকে নিশ্চয়ই খাওয়াবো, যত ইচ্ছে, কথা দিচ্ছি, কাল ঠিক এই সময়ে আসবো।

নকুল অভিমানের সঙ্গে বললো, আমার আজই ইচ্ছে হচ্ছে, আপনি আমার সঙ্গে বসবেন না?

 সে বারবার পীড়াপীড়ি করলেও একসময় জোর করে হাত ছাড়িয়ে চলে যেতে হলো আমাকে।

পরের দিন ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে এসেছি।

কাল যে-পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল, সেই দোকানদারটি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তারপর সে বললো, আপনি শুনেছেন তো স্যার?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী?

দোকানদারটি বললো, কাল আপনার সঙ্গে অত কথা হলো তো, আজ দুপুরে নকুলবাবু আত্মহত্যা করেছেন।

আমি প্রায় আর্তনাদের মতো বললাম, অ্যাঁ? বলো কী?

দোকানদারটি বললো, ভেতরে যান, ডেডবডি এখনো রয়েছে।

ঘটনাটি একেবারে অতি নাটকীয়।

যথাসময়ে অফিসে এসে, লাইব্রেরিতে বসেছে নকুল। কয়েকজনের সঙ্গে গল্প করতে করতে কফি খেয়েছে। নেশা-টেশা কিছু করেনি, পরিষ্কার চোখ, অন্যদিনেরই মতন।

লাইব্রেরিতে অন্য কয়েকজন কর্মচারী আছে। সবসময়েই কয়েকজন পড়ুয়া বসে থাকে বিভিন্ন টেবিলে। হঠাৎ একজন দেখলো, নকুল শুয়ে পড়েছে টেবিলে মাথা দিয়ে।

 সে কাছে এসে দেখলো, নকুলের শরীরে প্রাণ নেই।

 তার পকেটে পাওয়া গেল সুইসাইড নোট। সে আসের্নিক বিষ এনে কফিতে মিশিয়ে পান করেছে স্বেচ্ছায়। তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।

একজন মানুষ, যে অভাবী নয়, বেকার নয়, ব্যর্থ প্রেমিক নয়, কাজের জায়গায় অশান্তি হয়নি, সে কেন আত্মহত্যা করলো, তা জানার জন্য সকলেরই কৌতূহল হবে। যেন অন্তরালে আছে এক রহস্য-কাহিনী।

আমি সে-কাহিনীর মধ্যে যেতে চাই না। সেই সময় আমার খুব আত্মগ্লানি হলো।

কাল বিকেলে নকুল আমার কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করে কিছু খেতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি। আজ সে আমাকে কথা রাখার সুযোগই দিলো না, চলে গেল তার আগেই।

সে আমাকে সারাজীবনের মতো ঋণী রেখে গেল।

অফিসের বাইরে, সেই পানের দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার মনে হলো, নকুলের আত্মা যেন বলছে, আপনি কথা রাখেননি, কথা রাখেননি। কেউ কথা রাখে না!

আত্মা?

আমি একটা হার্ডকোর নাস্তিক। ঈশ্বর, পরলোক, আত্মার অস্তিত্ব এসব কিছুতেই বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তবু আমারও মনে হলো, নকুলের আত্মা কিছু বলছে? এ কি জন্ম-সংস্কার? ধুৎ!

বুদ্ধি দিয়ে, যুক্তি দিয়ে ভূত-টুত কিছু গ্রাহ্য করি না, তবু তো কোথাও নির্জন অন্ধকারে হঠাৎ গা ছমছম করে ওঠে, এটাও তো সত্যি?

তখনই হঠাৎ মনে হলো, অনেকদিন তো রশিদ খানের সঙ্গে দেখা হয়নি। সে কি আমার ওপর রাগ করে আছে?

রশিদ প্রায় প্রতিদিনই আমাকে ফোন করে। আমার তেমন ফোন করার অভ্যেস নেই, তা ও জানে, সেইজন্য বলে, তোমাকে ফোন করতে হবে না। আমি তোমাকে জ্বালাবো। সপ্তাহে অন্তত দু’তিন দিন আমরা সারা সন্ধে একসঙ্গে কাটাই। ওর বাড়ি কিংবা আমার বাড়ি।

কিন্তু দু’তিন সপ্তাহের মধ্যে রশিদের কোনো পাত্তা নেই, আমিও খোঁজ নিইনি, কিন্তু উচিত ছিল।

 শেষ যখন দেখা হয়েছিল, তখন রশিদকে খুব বকুনি দিয়েছিলাম। সেজন্য কি ও রাগ করে থাকতে পারে? ওর সঙ্গে তো আমার সে-রকম সম্পর্ক নয়।

রশিদের একটা দোষ আছে। মদ্যপানের সঙ্গীদের ব্যাপারে ওর কোনো বাছ-বিচার নেই। আমি আবার ও-ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে। একেবারে অচেনা লোকের সামনে আমি গেলাশ হাতে নিতে চাই না। আমার মুখেও কোনো কথা ফোটে না।

সপ্তাহতিনেক আগে, রাত প্রায় ন’টা, আমি আমির খানের ক্যাসেট শুনতে শুনতে একটি 888sport app download apk লেখার চেষ্টা করছিলাম, এমন সময় দরজায় বেল বেজে উঠলো।

স্বাতী গেছে থিয়েটার দেখতে। উৎপল নেই, দরজা খোলার কেউ নেই। উৎকৃষ্ট সঙ্গীত ও 888sport app download apk লেখার মেজাজের সময় এইরকম ব্যাঘাত হলে কি মেজাজ ঠিক থাকে? এখন কারুর আসারও কথা নেই। স্বাতী আর উৎপলের কাছে চাবি আছে।

তিনবার বেল বাজার পর উঠতেই হলো।

দরজা খুলতেই দেখি হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে রশিদ, তার সঙ্গে একটি সুদর্শন যুবক। তার হাতে একটা মদের বোতল। কাগজ-টাগজ দিয়ে মোড়াও নয়।

রশিদ বললো, বাড়িতে আর কেউ নেই? চলো, বসি। থোড়া দারু পিয়েঙ্গে।

হঠাৎ আমার খুব রাগ হয়ে গেল। সাধারণত লোকে আমাকে শান্তস্বভাবের মানুষ বলেই জানে। কারুর সঙ্গে পারতপক্ষে খারাপ ব্যবহার করি না। কিন্তু আসলে তো বাঙাল, এক এক সময় মাথায় রাগ চড়ে যায়।

আমি ঝাঁঝালো গলায় বললাম, দারু পিয়েঙ্গে মানে? যখন-তখন একটা বোতল নিয়ে এসে বসবে, এটা কি শুঁড়িখানা নাকি? আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো দাম নেই?

রশিদ তবু আমাকে শান্ত করার জন্য মোলায়েম গলায় বললো, তুমি তো সন্ধের পর কোনো কাজ করো না। একটা বোতল শেষ করতে আর কতক্ষণ লাগবে?

ওর সঙ্গের যুবকটি কোনো কথা বলছে না।

আমি বললুম, না, স্যরি। আমি ব্যস্ত আছি।

দরজা বন্ধ করে দিলাম ওদের মুখের ওপর।

এর ফলে হলো কী, 888sport app download apk লেখার বারোটা বেজে গেল। মাথায় রাগ থাকলে সারা পৃথিবীতে কেউ এক লাইনও 888sport app download apk লিখতে পারে না। মাঠে মারা গেল একটা 888sport app download apk।

পরদিন সকালে যখন রশিদ ফোন করলো, তখনও আমার রাগ পুরোপুরি যায়নি।

রশিদ বললো, শোনো কাল তোমাকে টেলিফোন না করে হঠাৎ গেছি। ভেবেছিলাম…

আমি বললাম, রশিদ, তুমি একা যখন-তখন আসতে পারো। ইউ আর ওয়েলকাম, তোমাকে আমি ইচ্ছে করলে কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে অন্য কাজও করতে পারি। কিন্তু কোনো অচেনা লোককে নিয়ে ওরকম ভাবে কখনো আসবে না।

– ও তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিল, হি ইজ আ ভেরি ইন্টারেস্টিং পার্সন।

– যতই ইন্টারেস্টিং হোক, কেউ মদের বোতল নিয়ে আমার সঙ্গে প্রথম আলাপ করতে আসবে, এটা আমি মোটেই পছন্দ করি না।

– তুমি কাল কিসে ব্যস্ত ছিলে? স্বাতী বাড়িতে ছিল না, অন্য কোনো মেয়ে-টেয়ে এসেছিল?

– সেটা যদি হয়ও তাহলে অল দা মোর রিজ্ন ফর ইউ নট টু ডিসটার্ব!

 রেগে গেলেই বাঙালির মুখে ইংরেজি ফোটে। আরও কিছুক্ষণ এই রকম কথা হয়েছিল। তারপর চলে গেলাম শান্তিনিকেতনে, রশিদের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।

নকুলের মৃতদেহটি দেখার পর আমার মনে হলো, নকুলের কাছে আর কোনোদিন ক্ষমা চাওয়া হবে না। কিন্তু রশিদের কাছে আজই ক্ষমা চাইতে হবে।

তখনও মোবাইল ফোনের যুগ আসেনি। রাস্তাঘাট থেকে ফোন করার অনেক অসুবিধে। সোজা চলে এলাম রশিদের বাড়িতে। যেতে যেতে সন্ধে হয়ে গেল।

রশিদ অফিস থেকে বাড়ি ফেরেনি।

কোনো কোনোদিন রশিদ অফিস থেকে সন্ধের পর বাড়িতেই আসে না, অন্য কোথাও আড্ডা দিয়ে ফেরে মাঝ রাত্তিরে।

নাসিম বললো, আজ তাড়াতাড়ি ফিরবে বলেছে। তুমি বসো না! তুমি কি চা খাবে? রশিদ মোদ-টোদ কোথায় রাখে আমি জানি না। আলমারিতে তালা দেয়।

আমি বললাম, মোদ-টোদ দরকার নেই। তুমি চা-ই খাওয়াও। আজ কি কাবাব-টাবাব রান্না হয়েছে নাকি?

নাসিম হেসে বললো, না! রশিদ এখুন খুব মাছ খাচ্ছে। মাছ ভালোবাসছে। তোমাদের সঙ্গে মিক্স করে খুব বাঙালি হচ্ছে!

আমি বললাম, আমার বউও তো বাঙালি। কিন্তু সে মাছ ভালোবাসে না, মাংস বেশি পছন্দ করে।

রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করতে করতে ঘরে ঢুকলো রশিদের এক মামা।

এঁর নামটি কখনো জানা হয়নি। আমরা সবাই ওঁকে মামা বলেই ডাকি। রানীগঞ্জের লোক, বাংলা জানে না। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা। মাথার সব চুল লাল। আমাদের সঙ্গে কথা বলেন হিন্দি-উর্দু মিলিয়ে। বেশ ভালো গান করেন ইনি। উর্দু গজল্, কলকাতায় এসে রবীন্দ্রসংগীত শিখছেন। বাংলা তো পড়তে পারেন না, উর্দুতে লিখে রবীন্দ্রসংগীত মুখস্থ করে ফেলেছেন কয়েকখানা।

আমাদের দেখলেই গানের উচ্চারণ শুদ্ধ করে নেন।

মামা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, দেখো তো ইয়ে প্রোনানসিয়েশান ঠিক হ্যায়? ‘রিদয়ের একূল-ওকূল দু’কূল ভেসে যায়, হ্যায় সোজ্নি, উথ্লে নোয়ন বারি…’।

অবাঙালিদের মুখে বাংলা শুনলেই যেন বাঙালিদের কানে সুধাবর্ষণ করে, উচ্চারণের এদিক-ওদিক হলে কিছু আসে যায় না।

আমি বললাম, বাঃ চমৎকার। সুরটা একেবারে ঠিক আছে। হৃদয়কে অনেক বাঙালিও রিদয় বলে। তবে হ্যায় নয়, হায়। বলুন হায়, হায়, হায়…।

রশিদের দুটি ফুটফুটে মেয়ে বাবলি আর মাস্তুন মামাবাবুর গান শুনলেই হাসতে শুরু করে। ওরা এখানেই জন্মেছে, এখানেই স্কুলে যায়। তাই বাংলা আর উর্দু দুটো ভাষাই ঠিকঠাক জানে।

মামা বললেন, হামি দো-চারঠো রবীন্দর সংগীত শিখ লেতা হুঁ, কিঁউ কি, ম্যায় এক দফে বাংগ্লা দেশ যানে মাংতা। উ লোগ তো বাংগ্লা গানা বাদ আউর কুছ শুন্তা নেহি!

এই বাক্যটিতে ‘উ লোগ’ কথাটার মধ্যে রয়েছে অবজ্ঞার ভাব।

আমি আগেও কয়েকবার লক্ষ করেছি, রশিদের বাড়িতে যে কিছু কিছু অবাঙালি মুসলমান আসে, তারা পাকিস্তান ভেঙে 888sport appsের জন্ম মোটেই সমর্থন করে না। মাঝে মাঝে খুব উগ্রভাবে 888sport appsের মানুষদের সম্পর্কে গাল-মন্দ করে। কেন পাকিস্তান ভেঙে 888sport appsের জন্ম হলো, তা তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে না। যে-দু’একজন আমাকে চিনতে পারে, তারা অন্যদের গা টিপে আমার সামনে এ-আলোচনা বন্ধ করতে বলে।

আমি অবশ্য ওদের সঙ্গে কখনো তর্ক করা দূরে থাক, একটা      মন্তব্যও করি না, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সিগারেট টানি। ধর্মীয় উগ্রতা কিংবা অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে যে কোনো কাজ হয় না, তা আমি অনেকদিন আগেই জেনে গেছি।

একদিন ওইরকম একজন নেশার ঝোঁকে 888sport appsের মানুষদের বারবার শালা লোগ, শালা লোগ বলছিল বলে আমি নিঃশব্দে সেখান থেকে উঠে পড়ছিলাম, রশিদ আমার হাত ধরে টেনে বসালো।

রশিদ অবশ্য ব্যতিক্রম। সে সবমানুষকেই মানুষ হিসেবে বিচার করে, ধর্ম কিংবা জাত দিয়ে নয়। 888sport appsের মানুষদের অনেককেই সে বিশেষ পছন্দ করে। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক শোষণ, সাধারণ মানুষদের ওপর সামরিক শাসকদের অত্যাচার, মাতৃভাষার অধিকার হরণ, এই সবের বিরুদ্ধে যখন সেখানকার সংগ্রাম শুরু করে, তার প্রথম থেকেই রশিদ সমর্থক। সে-সময় তার বাড়িতে অনেককে আশ্রয় দিয়েছে।

রশিদ সে-রাতে আমার হাত ধরে টেনে বসিয়ে সেই উগ্র ব্যক্তিটিকে বলেছিল, হোয়াই ডোন্ট ইউ গো টু পাকিস্তান? গো, গো। মেরা কোঠি মে আউর কভি নেহি আনা!

আমি রশিদকে বলেছিলাম, না, না ওভাবে বলো না। যে-কোনো ব্যাপারে সমালোচনা করার ব্যক্তি-স্বাধীনতা তো সবারই আছে। 888sport appsকেও সমালোচনা করতে পারে, কিন্তু ভাষাটা ভদ্রসমাজের উপযুক্ত হওয়া দরকার।

এতে সে-লোকটি আমার ওপর আরও রেগে উঠেছিল। আমি তাকে ভদ্রতা শেখাচ্ছি? সে খানদানি বংশের লোক, অযোধ্যার নবাবের বংশধর, বাঙালিরা ভদ্রতার কী জানে?

শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে তাকে শান্ত করেছিল।

মামাকে রবীন্দ্রসংগীতের উচ্চারণ শেখানোর উৎসাহই আমার চলে গেল। তবে, একটু পরেই রশিদ এসে উপস্থিত। পুরোদস্তুর সুট পরা, হাতে ব্যাগ, চুল একেবারে পাট করা, চোখ একটুও লাল নয়। একটুও নেশা করেনি বোঝা যায়।

সন্ধের পর রশিদকে এরকম সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আমি বহুদিন দেখিনি।

আমাকে দেখে রশিদ খানিকটা অবাক হলেও কৌতুকহাস্যে বললো, সুনীল এসেছো? আজ তুমি একটা দারুণ সারপ্রাইজ পাবে।

সে-ব্যাপারে কৌতূহল না দেখিয়ে আমি বললাম, রশিদ, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।

এবার সে-নিজেই হকচকিয়ে গিয়ে বললো, কেন? কী ব্যাপার!

– সেদিন তুমি একজনকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলে। আমি তোমাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি।

– ও, দ্যাট ইভনিং, আমারই উচিত হয়নি ওভাবে একজনকে নিয়ে যাওয়া?

– তাহলেও ওভাবে তোমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া, ইট ওয়াজ ভেরি রুড, আমি রিয়েলি সরি, আমি ক্ষমা চাইছি।

– ধ্যাৎ! ওসব ছোড়ো তো ইয়ার।

– তুমি আমার ওপর রেগে আছো, তাই তিন সপ্তাহে একবারও ফোন করোনি!

– আরে, তার পরের দিনই তো আমি দিল্লি চলে গেলাম অফিসের কাজে। তারপর ফিরেছি, পাঁচদিন আগে, তোমাকে ফোন করার ইচ্ছে হয়েছে খুব। তবু ফোন করিনি, কেন জানো? সেটাই তো সারপ্রাইজ।

– কী সারপ্রাইজ?

– আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। দশদিন একটুও খাইনি। নট আ ড্রপ। আমাকে অনেক ফ্রেশ দেখাচ্ছে না? রোজ সকালে এক্সারসাইজ করছি। দেখো, দেখো আমার ভুঁড়ি কমে গেছে। তাই না?

আমি হতবাক। বলে কি! সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠছে নাকি?

রশিদ বলে চললো, বাড়িতে ড্রিংক্সের বোতলও রাখছি না। পরশু দিন সয়ীদ মির্জা আমায় ফোন করেছিল, কী একটা সেমিনারে এসেছে কলকাতায়। সন্ধেবেলা আমার বাড়িতে এসে আড্ডা দিতে চায়। আমি যে-ই বললাম, আসতে পারো, অবশ্যই, কিন্তু চা খেতে হবে, ড্রিংক্স সার্ভ করতে পারবো না। অমনি ও বললো, দূর শালা, এখন চা খেতে কে যাবে তোর বাড়িতে? আমার কি বন্ধুর অভাব আছে? এইবার বুঝলে, আমি কেন তোমায় ফোন করিনি?

আমি তবু চুপ।

রশিদ ব্যাখ্যা দিয়ে বললো, ফোন করে তোমাকে বাড়িতে ডাকতে পারবো না। তুমি ডাকলে যেতে পারবো না। অন্যরা যেখানে ড্রিংক করে, আমি সেখানে বসতেও চাই না। কী, তুমি কিছু বলছো না, বিশ্বাস হচ্ছে না? নাসিমকে জিজ্ঞেস করো।

এবার আমি বললাম, বিশ্বাস করবো না কেন? কিন্তু ভয়ে আমার বুক কাঁপছে।

– সে কি, কেন?

– তোমার মতন লোকের মদ ছাড়ার প্রতিজ্ঞা অত্যন্ত বিপজ্জনক। শক্তিকে দেখিনি? শক্তি মাঝে মাঝেই বলে, আর কোনোদিন খাবো না। তিন-চারদিন খায় না। তারপর কী কাণ্ডই শুরু করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, যে-ক’দিন খায়নি, সবই পুষিয়ে নেয়। তোমারও সেই অবস্থা হবে। একেবারে ছেড়ে দেবার দরকার কী বাবা? দয়া করে দিনের বেলা খাওয়া বন্ধ করো, সেটাই যথেষ্ট!

– না, না, তুমি বুুঝছো না। কত পড়াশুনো বাকি আছে। আই ওয়ান্ট টু ক্যাচ আপ। এবার আমি আর কিছুতেই ধরছি না। অন্তত ছ’মাস এরকম চালিয়ে যাবো।

– ঠিক আছে, গুড লাক!

– তোমাকেও কিন্তু আমি আজ সার্ভ করবো না। তবু তুমি কি বসতে চাও, না এক্ষুনি চলে যাবে?

– আধঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো বসতেই পারি। আমি এখনো অ্যালকোহলিক হয়ে যাইনি। সে-রাতে আমার বাড়িতে তুমি কাকে নিয়ে গিয়েছিলে বলো তো?

– পিনাকী চ্যাটার্জি, তুমি ওর নাম শোনোনি; ও তোমার লেখা-টেখার… তোমার সঙ্গে খুব আলাপ করতে চেয়েছিল।

– পিনাকী চ্যাটার্জি মানে ডিউক-পিনাকী?

– ইয়েস, অফকোর্স! সে আমার খুব বন্ধু।

কয়েক বছর আগে ডিউক আর পিনাকী নামে দু’জন যুবককে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে খবরের কাগজে। এরা দুঃসাহসী বাঙালি অভিযাত্রী। সাধারণ ডিঙি নৌকো নিয়ে আন্দামানের উদ্দেশে ভেসে পড়েছিল সমুদ্রে। বঙ্গোপসাগর তেমন কিছু বড় নয়, কিন্তু দুটি কারণে বিশ্ববিখ্যাত। ঝড় এবং চিংড়িমাছ!

আমি নিজে একবার জাহাজে চেপে আন্দামান গিয়েছিলাম। মোট চারদিন লাগে, তৃতীয়দিন সকালে শুরু হলো ঝড়। আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত 888sport alternative linkে এক খালাসির উক্তি : কর্তা, কাপ্তেন কইছে, ছাইক্লোন হতি পারে! এই সেই সাইক্লোন। সে কী তার রুদ্ররূপ! এর তুলনায় আমাদের স্থলভূমির ঝড়-টড় নস্যি। কিছুই দেখা যায় না। আজকাল জাহাজ-টাহাজ সহজে ডোবে না, তবে আমাদের জাহাজটা সেখানে নোঙর করে থেকে রইলো চব্বিশ ঘণ্টা।

সেই ঝঞ্ঝাসঙ্কুল সমুদ্র সাধারণ নৌকো নিয়ে যদি কেউ পাড়ি দিতে চায়, তাকে তো বিশেষ কৃতিত্ব দিতে হবেই। প্রতিদিন ছাপা হতো তাদের প্রগ্রেস রিপোর্ট। হেলিকপ্টার নিয়ে ছবি তোলা হতো।

শেষ পর্যন্ত ওরা আন্দামান পৌঁছোতে পেরেছিল কিনা, তা আমার মনে নেই। পৌঁছোনো-না পৌঁছোনো খুব বড় কথা নয়, কিন্তু অতখানি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যে বেরিয়ে পড়েছিল, তার জন্যই তারা 888sport app download for androidীয়।

ডিউকের পরে কী হলো জানি না, তবে পিনাকী চ্যাটার্জির কথা মাঝে মাঝেই শোনা যায়। সে একজন দারুণ সাঁতারু, বন্দুক-পিস্তল চালাতে জানে, আবার ভালো আবৃত্তি করে, একটা কলেজে পড়ায়। সে একবার নির্বাচনেও প্রার্থী হয়ে দাঁড়ালো। বোধহয় নির্দল হিসেবে, জিততে পারেনি, তবু তাকে নিয়ে প্রতিদিন খবর বেরুতো।

সেই পিনাকী চ্যাটার্জির মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া আমার মোটেই ঠিক হয়নি। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে বসানো উচিত ছিল। গন্ডগোলটার জন্য দায়ী একটা 888sport app download apk?

সেদিন যদি আমার মাথায় হঠাৎ 888sport app download apk লেখার বাই না চাপতো, তাহলে হয়তো আমি রশিদদের দেখে খুশিই হতাম।

কিংবা স্বাতী যদি সেদিন থিয়েটারে না যেত, তাহলে সে-ই দরজা খুলতো। স্বাতী রশিদকে বেশ পছন্দ করে, সে খাতির করেই ওদের এনে বসাতো ভেতরে। ওরা গল্প করতো, আমার কিছুক্ষণ পরে যোগ দিলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। ততক্ষণে 888sport app download apkটা লেখা হয়ে গেলে, আমার মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যেত, ওদের বোতলটা সরিয়ে রাখতে বলে আমি নিজেই একটা উৎকৃষ্ট মদ্য উপহার দিতাম।

সামান্য কার্যকারণের জন্য কত কিছু বদলে যায়। মানুষের জীবনেও তার প্রভাব পড়ে। সেইজন্যই এসব বিস্তারিতভাবে লিখছি।

রশিদকে বললাম, আমার সঙ্গে পরিচয় না থাকলেও ছেলেটির কার্যকলাপ আমার ভালো লাগে। ওরকম প্রাণবন্ত ছটফটে মানুষদের আমার খুব পছন্দ। আমি ওর কাছে সেদিনের জন্য ক্ষমা চাইতে চাই!

রশিদ বললো, ক্ষমা-টমা চাইতে হবে না। আমি ওকে বুঝিয়ে বলেছি। একজন লেখককে যখন-তখন বিরক্ত করা উচিত নয় তো বটেই!

– তাহলে, ওকে একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসো। ভালোভাবে আলাপ করবো।

– এখন তো হবে না।

– কেন, পিনাকী কলকাতায় নেই?

– আছে। কিন্তু আমি তো নিয়ে যেতে পারবো না। আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি, পিনাকী তো ছাড়েনি। ও ড্রিংক করতে বেশ ভালোবাসে। তোমরা দু’জনে বসে ড্রিংক করবে, আর আমি চুপ করে বসে থাকবো, সেটা সম্ভব নয়।

– আরে কী মুশকিল! কোনো ছুটির দিনে সকালবেলাতেও তো নিয়ে আসতে পারো। চা খেতে খেতে কি মানুষের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করা যায় না?

– আচ্ছা সে দেখা যাবে!

– না, বেশি দেরি করো না। কারণ…

আমাদের লাইব্রেরিয়ান নকুলের বেমক্কা আত্মহত্যার জন্য আমার মনে একটা কাঁটা বিঁধে আছে। সেটা কারুকে বলা দরকার। রশিদকেই বলে ফেললাম সবটা।

শুনে-টুনে রশিদ বললো, তোমার একটা 888sport app download apk আছে না, ‘কেউ কথা রাখে নি’? দেখো, তোমার জীবনেই সেটা ঘটে যাচ্ছে। সব মানুষের জীবনেই বোধহয় ঘটে। একটু বসো, জামা-টামা বদলে আসি, তারপর তোমাকে আজ আমার কয়েকটা 888sport app download apk শোনাবো। এখন খুব লিখছি।

আমি বললাম, একটু দাঁড়াও। আজ তুমি পুরোপুরি সোবার আছো, তোমার কাছে একটা ব্যাপারে পরামর্শ চাই। 888sport appsের আনোয়ারা নামের একটা মেয়ের কথা তোমাকে বলেছিলাম, মনে আছে?

রশিদ বললো, মনে থাকবে না কেন? আমার মেমারি খুব ভালো। ওই যে সৌদি আরবে চলে গিয়েছিল? তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?

– না। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি আর স্বাতী এ-পর্যন্ত কাউকে বলিনি। 888sport app থেকে চলে আসার সময় মেয়েটি একগাদা গয়না নিয়ে এসেছিল। সেগুলো সে বিদেশে নিয়ে যেতে চায়নি, রেখে গেছে স্বাতীর কাছে।

– মেয়েটি তো ওয়াইজ কাজই করেছে। বিদেশে নিয়ে গেলে নির্ঘাৎ সব গয়না খোয়া যেত, 888sport appতে রেখে এলেও অন্য কেউ সরিয়ে ফেলতে পারতো। তোমাদের কাছে সেফ্ থাকবে।

– কিন্তু আমরা কতদিন রাখবো? মেয়েটি যদি আর না ফেরে? এতদিনে কোনো খবরও পাওয়া গেল না। এক-একবার ভাবছি, ওর হাজব্যান্ডের কাছে পাঠিয়ে দেবো কিনা!

– কখনো দিও না। রেখে দাও! এইসব মেয়েরা দু’তিন বছর পর সাধারণত ফিরে আসে। এদের রূপ-যৌবন অনেকটা শুষে নিয়ে ওরাই একসময় ছুড়ে ফেলে দেয়। তখন এই গয়নাগুলো মেয়েটার অনেক কাজে লাগবে। ফিরে আসার পর বিবাহিতা মেয়েদের স্বামীর সঙ্গে নানারকম গন্ডগোল হয়, অনেক স্বামী আর অ্যাকসেপ্ট করে না। সেই অসহায় অবস্থায় যদি টাকা না থাকে, তাহলে মেয়েটির বিপদের শেষ থাকে না। রেখে দাও!

– গয়নাগুলো যে আমাদের কাছে আছে, তুমি তার সাক্ষী রইলে রশিদ। তাহলে আর আমরা কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবো না।

– ধ্যাৎ, যতসব বাজে কথা। মেয়ে-পাচারচক্র আমরা কিছুতেই বন্ধ করতে পারছি না, এটা আমাদের এক চরম ব্যর্থতা। এই দলের একটা পাণ্ডাকে আমরা ধরেছিলাম, তার নাম কল্মা, আসলে কলিমুদ্দিন। সে-ব্যাটা আমাদের এখানে আর 888sport appsে, দু’জায়গাতেই অপারেট করে। কল্মাটা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই বুদ্ধি ধরে। মুশকিল কী জানো, ওকে অ্যারেস্ট করলেও ধরে রাখা যায় না। ওর ক্রাইমগুলো প্রমাণ করা শক্ত, কেউ ওর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে সাহস করে না। কোর্টে প্রোডিউস করলে বেল পেয়ে যায়। এবার আমি ঠিক করেছি, ব্যাটাকে ধরতে পারলে আর কেস-ফেস না, সোজা গুলি করে মেরে ফেলবো। ভোরবেলা নিয়ে যাবো ময়দানে, গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে বলবো, পালা। যা পালা! ও দৌড়োতে শুরু করলেই পেছন থেকে গুলিতে ফুঁড়ে দেবো ওকে!

– রশিদ, তুমি নিজের হাতে কারুকে কখনো গুলি করে মেরেছো?

– আরে, তুমি ভাবো কী? আই পি এস-এর ট্রেনিং নিয়েছি না? চোখ বুঁজে গুলি চালাতে পারি।

– গুলি চালাতে পারো, কিন্তু এ-পর্যন্ত কারুকে গুলি করে মেরেছো কি?

– অফকোর্স মেরেছি। অনেকবার।

– বাজে কথা। যে-হাত গুলি চালিয়ে মানুষ খুন করতে পারে, সে-হাত কখনো 888sport app download apk লিখতে পারে না। আমি জানি, নক্শাল আমলে তুমি বীরভূমে এস পি ছিলে, বীরভূম তখন নক্শালদের ডেন, কিন্তু তুমি নক্শালদের খুন করার বদলে কয়েকজনকে গোপনে আশ্রয় দিয়েছো।

– এই রে, তুমি কী বলছো সুনীল? আমার চাকরি খেয়ে দেবে দেখছি। খবরদার, এইসব কথা তুমি প্রকাশ্যে কখনো বলতে যেও না, লিখবেও না। তোমার কাছে আজ আমি সত্যি কথাটা স্বীকার করছি, সার্ভিসে আসার পর আমি কোনো লোককে গুলি করে মেরে ফেলা তো দূরের কথা, কারুকে একটা চড়ও মারিনি। আমি পারি না। ভায়োলেন্স আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না। ক্রিমিনালদের যখন টর্চার করা হয়, আমি সেখানে থাকি না কখনো। আমার কলিগরা সবাই জানে!

– তাহলে তুমি পুলিশের চাকরি নিলে কেন? ভালো ছাত্র ছিলে, প্রফেসার হতে পারতে, কমার্শিয়াল হাউজেও ভালো কাজ পেতে পারতে।

– শোনো, ব্যাপারটা তাহলে খুলে বলতে হয়। আমি আই পি এস পরীক্ষা দিয়েছি, আমার বাড়ির লোক আর আমাদের কমিউনিটির লোকদের প্রেশারে। ইন্ডিয়াতে আমরা মাইনরিটি কমিউনিটি। সব দেশেই মাইনরিটি কমিউনিটির নানারকম কমপ্লেনস থাকে। বিশেষত তারা ভাবে, কোনো গন্ডগোল হলে পুলিশ তাদের সাহায্য করবে না। এরকম তো হয়ও বটে, দাঙ্গা-টাঙ্গার সময় পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে বায়াসড হয়। 888sport appsে হিন্দুরা যেমন মনে করে, পুলিশের কাছে সুবিচার পাবে না। তবে, আই মাস্ট সে, ইন্ডিয়াতে অবস্থাটা অনেকটা বেটার। এখানে মুসলমানরা প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হয়, জাকির হোসেন, ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ হয়েছেন, আমাদের নেবারিং কান্ট্রিতে যা কল্পনাও করা যায় না। যাই হোক, আমাদের কমিউনিটির লোকেরা মনে করে, মুসলমান ছেলেরা যদি পুলিশ সার্ভিসে যায়, তাহলে তারা অন্য মুসলমানদের সাহায্য করতে পারবে। সেইজন্য তুমি দেখবে, অন্য সব সার্ভিসের তুলনায় পুলিশ সার্ভিসে মুসলমানদের 888sport free bet বেশি। আমি যদিও ঠিক পুলিশ হবার যোগ্য নই, তবু ঠেলেঠুলে আমাকে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়েছিল। প্রমোশানও পেয়ে গেছি অনেকগুলো।

– এত মদ না খেলে তুমি অনায়াসে পুলিশ কমিশনারও হতে পারতে কলকাতার।

– আমাদের কমিউনিটির কিছু লোক কী বলে জানো? আমি মুসলমান বলেই আমাকে কমিশনার করা হলো না, প্রমোশান দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আরে লাচ্চুদারও তো এই একই ব্যাপার! আমার চেয়ে সিনিয়র, তিনি তো আর মুসলমান নন, ওঁকেও পুলিশ কমিশনার করা হয়নি। ওঁর দোষ, স্বভাবে নরম, শেক্সপিয়র পড়ে আর বেশি মদ খায়। ঠিক করেছে, আমাদের দু’জনের কেউই পুলিশ কমিশনারের অত দায়িত্ব সামলাতে পারতাম না।

এরপর রশিদ পোশাক বদলে এসে নিয়ে এলো 888sport app download apkর খাতা।

চশমা নাকে দিলে ওকে অন্যরকম দেখায়, 888sport app download apk পড়ার সময় গলার আওয়াজও বদলে যায়। রিডিং গ্লাস লেগে থাকে নাকের ডগায়, ঠিক যেন এক পণ্ডিতমশাই।

সামনে গেলাশ নেই, মদের বোতল নেই, এ এক অন্য রশিদ। পড়ে যাচ্ছে একটার পর একটা 888sport app download apk। বিমল আনন্দে কেটে গেল সন্ধেটা। (ক্রমশ)