সুবর্ণরেখা : অরূপকথার অশ্রুস্রোত

‘রাত কত হলো? উত্তর মেলে না।’

ঈশ্বর যখন আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে, তখন জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে থেকে করা হরপ্রসাদের এই প্রশ্ন, থমকে দেয় সময়, চমকে দেয় ঈশ্বরকে। ঘরে প্রবেশ করে হরপ্রসাদ বলতে থাকে, ‘আসল কথা কি জানো ভাইডি, ও প্রতিবাদই করো আর লেজ গুটাইয়া পালাইয়া যাও, কিছুতেই কিছু যায় আসে না। সব লোপাট, আমরা সব নিরলম্বু বায়ুভূত, আমরা মিইটা গেছি। রাত কত হলো?’

ক্লোজ শটে ঈশ্বর নিশ্চুপ। হরপ্রসাদ এবার আরো গাঢ় করে বলে, ‘উত্তর মেলে না।’

ঋত্বিক ঘটক কী অসাধারণ দক্ষতায় ঈশ্বরকে এখানে নির্বাক করে দেন। যেন তিনি ফ্রিডরিক নিৎশের শূন্যবাদের আবাদ করছেন এ-দৃশ্যে। নিৎশে ঘোষণা করেছিলেন, ঈশ্বর মারা গেছেন। কারণ মানুষ আর ঈশ্বরে বিশ্বাস করছে না। ঈশ্বরের শূন্যস্থানে নতুন বিশ্বাস ও আদর্শ জায়গা করে নিচ্ছে। ঋত্বিকের সুবর্ণরেখায় ঈশ্বর পরাজিত ও পর্যুদস্ত। ঈশ্বর পরাজিত মানে, ঈশ্বরের যে আদর্শিক জায়গা, তার সততা, সেটিও পরাজিত। উল্টোদিকে জয়ী হচ্ছে লোভ ও লালসা। ঈশ্বর দেখছিল, যে-আদর্শ দিয়ে সে সংসারকে গড়েছে, সেটি ভেঙে পড়েছে। তাই সে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথকে। কিন্তু হরপ্রসাদ এসে তাকে রক্ষা করে। হরপ্রসাদের উছিলায় মৃত্যুকে পাশ কাটায় ঈশ্বর। এজন্যই পরবর্তী এক দৃশ্যে হরপ্রসাদ বলে, ‘আমরা একেবারে পরাজিত। আত্মহত্যা করার ক্ষমতা পর্যন্ত আমাদের নাই।’

মানুষ যখন আত্মহত্যা করার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে, তখন সে নিজেকে সঁপে দেয় পরিস্থিতির কাছে। ভোগের পথে। আদর্শ ধরে রাখার জন্য যে ত্যাগ করতে হয়, যে সংযম মানুষকে দেখাতে হয়, তার কোনোটাই করা বা দেখানোর অবস্থা ছিল না ঈশ্বরের। যে উদ্বাস্তু ও দরিদ্র ছেলে অভিরামকে সে বড় করেছে, সেই ছেলেটির সঙ্গে বোন সীতা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গেলে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পায় ঈশ্বর। তাছাড়া এ-ঘটনায় অফিসে পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধার পথও বন্ধ হয়ে যায় বলে হতাশা গ্রাস করে ঈশ্বরকে। এরকম বাস্তবতায় পূর্বের সকল আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে ঈশ্বর ঠিক করে, হরপ্রসাদের সঙ্গে সে কলকাতা যাবে। তারা নিজেদের সঁপে দেবে ভোগ ও বিলাসের কাছে। হরপ্রসাদের জবানিতে, ‘কলকাতায় এখন মজা দোকানে, হোটেলে, রেসের মাঠে, সে কি বীভৎস্য মজা। তুমি দাঁড়িয়ে দেখবা আর অবাক হয়ে যাবা। মাইনসে কেমনে স্রোতে গা এলাইয়া দেয় – গড্ডলিকা প্রবাহই সত্যি। ওটাই খাঁটি। ভোগই মুক্তির পথ।’

ঈশ্বর তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, ‘ভোগ!’

এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতর এই দুজন রওনা দেয় কলকাতার পথে, স্রোতে গা এলিয়ে দেওয়ার জন্য। সেখানে গিয়ে তারা ভোগ ও স্ফূর্তিতে হারিয়ে যেতে থাকে। রেসের ময়দান থেকে পানশালা। আকণ্ঠ পান করে ঈশ্বর ও হরপ্রসাদ দুজনই বেসামাল হয়। সেই অবস্থার ভেতর হরপ্রসাদ বলছে :

ওঁ উবার হর্বে সর্ববেদনং দদৌ

তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস।

এর অর্থ : যে ব্যক্তি যজ্ঞ করছিলেন, তিনি সবকিছু দান করলেন। তাঁর এক পুত্র ছিল, যার নাম ছিল নচিকেতা। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই নচিকেতা যমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জানতে চেয়েছিল, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে আত্মার ভূমিকা কি, আর মৃত্যুর পর এই আত্মার পরিণতি কি হয়? জীবনের অর্থ কি, মৃত্যুর অর্থটাই বা কি? এই আত্মার জ্ঞান, আত্মজ্ঞানকে অনুসন্ধান করাই ছিল নচিকেতার অভিপ্রায়। সেই একই অভিপ্রায় আমরা দেখি হরপ্রসাদের ভেতর।

গলায় গরল ঢালতে ঢালতে ঈশ্বরকে হরিপ্রসাদ বলছে, ‘নচিকেতাকে যমরাজ বলছিলেন, আত্মজ্ঞান ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে যেও না। অন্য বর প্রার্থনা কর। এই যে অপ্সরাগণ ইহারা দেবদুর্লভ। ওই যে নৃত্য-গীতাদি, তুমি যদি চাও সবই তোমার। নচিকেতা ওয়াজ এ ফুল।’

ঈশ্বর বলে, ‘নচিকেতা?’

হরপ্রসাদ প্রত্যুত্তরে বলে, ‘আমি।’

ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা, আমার মতে, এই দৃশ্যটিতেই সবচেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে, উপনীত হয় দার্শনিক দশায়। কারণ নচিকেতার গল্প বলার ছলে ঋত্বিক নিজে যেমন সত্যকে জানতে চান, তেমনি দর্শককেও আমন্ত্রণ জানান সত্য জানার অভিযাত্রায়। এই live chat 888sportের চরিত্রগুলি দেশভাগের পর নবজীবন কলোনিতে এসে ওঠে। আমরা দেখি ১৯৪৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবসের দিন এই কলোনিতে জমিদারের লাঠিয়ালদের হামলার শিকার হয় বাস্তুহারা সব মানুষ। যেন স্থানীয় জমির মালিককে তুলনা করা হচ্ছে বিদেশি খুনিদের সঙ্গে। আর মিল টানা হচ্ছে শোষিত ও সংগ্রামী মানুষের মাঝে। জমিদারের লোকজন 888sport apps পাবনা অঞ্চল থেকে আসা এক বাগদি বউসহ অন্য অনেক উদ্বাস্তু মানুষকে তুলে নিয়ে যায় অন্যত্র। পতিত জমিতে বাস্তুহারার দল আবাস গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু জমির মালিক তা মানবে কেন? উদ্বাস্তু সকলের সঙ্গে বাগদি বউকে তো তুলে নিয়ে যায় জমিদারের লোকেরা, পেছনে ফেলে যায় তার নাবালক সন্তানকে। এই নাবালক, ওরফে অভিরাম আশ্রয় পায় ঈশ্বরের কাছে। ঈশ্বরের ছোট বোন সীতার সঙ্গেই বড় হয়ে উঠতে থাকে অভিরাম। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তারা আবিষ্কার করে তাদের মনের জমিনে গন্ধমবৃক্ষে জন্ম নিয়েছে প্রেম। ঈশ্বর তাতে বাধ সাধলে, তারা পালিয়ে চলে যায় কলকাতায়। প্যারাডাইস লস্ট! সুবর্ণরেখাই ছিল তাদের জন্য প্রকৃত স্বর্গ। কিন্তু তারা নারকীয় কলকাতাকেই ভেবে নেয় নতুন স্বর্গ!

ঘটনাক্রমে এই কলকাতাতেই বন্ধু হরপ্রসাদের সঙ্গে এসে মদমত্ত শুধু নয়, পদস্খলন হয় ঈশ্বরের। মদের দোকান থেকে বেরিয়ে দুজন ট্যাক্সিতে করে রাতের কলকাতায় ঘুরতে থাকে। কত লাল-নীল বাতি। রঙিন আলোতে এই শহর কলকাতা যেন ঢেকে ফেলতে চায় সকল ক্লেদ ও কষ্ট। তারই ভেতর ঘুরতে ঘুরতে হরপ্রসাদ বলতে থাকে, ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত। প্রাপ্য বরান নিবোর্ধিত ক্ষুরস্য ধারা নিশ্চিতা দূরত্বয়া দুর্গম পথন্তং কবয়ো বদন্তি। হেঁ-হেঁ-হেঁ … এটমবোমা দেখ নাই।’

কঠোপনিষদের বিখ্যাত মন্ত্র থেকে হরপ্রসাদ যা আওড়ালেন, তার সরলার্থ হলো : ওঠো, জাগো, লক্ষ্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত থেমো না। জ্ঞান বা সত্যের পথ খুবই কঠিন। সেই পথ তীক্ষè ক্ষুরের মতো বিপজ্জনক, যা অতিক্রম করা কঠিন। জ্ঞানীরা বলেন, সত্যের পথ সবসময় কষ্টের হয়, আর এই কষ্ট সহ্য করেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে হয়। যে সত্য, হরপ্রসাদের রসিকতায়, পারমাণবিক বোমার মতো। তো কোনো সে বোমার মুখোমুখি হয় ঈশ্বর?

ঈশ্বর জানতো না, বোন সীতা এক দুর্ঘটনায় স্বামী অভিরামকে হারিয়ে, নাবালক পুত্র বিনুকে নিয়ে দরিদ্র ও নিরুপায় জীবন যাপন করছিল এবং এক পর্যায়ে সে উপায়ান্তর না দেখে বাঈজিদের দেখানো পথে পা বাড়িয়েছিল। ভাগ্যের কি নির্মম সমাপতন, সীতার যেদিন প্রথম দিন, ঠিক সেদিন সন্ধ্যায় ঈশ্বরই তার ঘরে পা রাখে। ঈশ্বর জানে সে এক দেহজীবিনীর ঘরে প্রবেশ করছে; কিন্তু যখন ভাই ও বোন পরস্পরকে আবিষ্কার করে, তখনই সেই সত্য ধরা দেয়, অস্বস্তিকর নগ্ন সত্য। নষ্ট পচে যাওয়া সমাজে ঈশ্বরের মনোজগতের সেই অন্ধকার সত্য আর সীতার সতীত্ব বাজারে তোলার সত্য পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তখন দর্শক বলে ওঠে – দ্বিধা হও ধরণী। সীতা নিজেকে হনন করে। নেপথ্যে শোনা যায়, ‘হে রাম!’

সীতা এই live chat 888sportে একাধারে বোন ও মা। ঈশ্বর তাকে কোলেপিঠে করে বড় করলেও এক সংলাপে ঈশ্বর বলে, সীতাই তার মা। কারণ বয়স্ক ঈশ্বরকে সীতাই দেখভাল করে রাখছিল। কিন্তু অভিরামের প্রেমে পড়ে সীতা তাকে ধোঁকা দিয়ে শহরে চলে গেলে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। হতাশা কাটাতে হরপ্রসাদের সঙ্গে আত্মজ্ঞান অনুসন্ধানে শহরমুখী হয় ঈশ্বর। তারও রয়েছে সত্যকে জানার তৃষ্ণা। দুজনেই যেন সিদ্ধার্থ। জীবনের সব সুধা পানান্তে সত্যের মুখোমুখি হবে তারা। ঈশ্বর যখন পানশালা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, তখন তার চোখে আর চশমা নেই, কারণ ওটা পানশালাতেই ভেঙে গেছে। মদের কল্যাণে ও চশমা না থাকার আশীর্বাদে সবই ঝাপসা দেখছে ঈশ্বর। অর্থাৎ সাধারণ বোধবুদ্ধি হারায় সে। ওরকম অবস্থাতেই সে সীতার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। এ যেন ফ্রয়েড বর্ণিত ঈদিপাস কূটের এক ভিন্নতর প্রকাশ। একইসঙ্গে ঋত্বিক যেন আমাদের রামায়ণ 888sport slot gameেও নিয়ে যান। পুরাণের সীতার মতো এখানেও নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয় সীতাকে। দু-জায়গাতেই পুরুষতন্ত্রের যূপকাষ্ঠে বলিদান হয় 888sport promo codeর। সেজন্যই এই ছবিতে পুরুষের প্রতি, রামের প্রতি আক্ষেপ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, দর্শক শুনতে পায় ‘হে রাম!’ রাম তথা পুরুষের প্রতি এবং আমি বলবো পুঁজিবাদী সমাজের প্রতি এ এক কঠোর তিরস্কার। আরো একটি বার্তা এই দৃশ্যে মিশে রয়েছে। সেটি হলো, মাতৃগমন যেমন সমাজে নিষিদ্ধ, তেমনি দেশমাতৃকার কাছ থেকে ভোগবিলাস প্রত্যাশা করাও সমান অপরাধ।

সুবর্ণরেখা ছবির সীতা চরিত্রটির সঙ্গে পুরাণের সীতা, প্রকৃতির 888sport promo code, চিরন্তন মাতৃরূপ ও দেশের ধারণা মিলেমিশে একাকার। ঋত্বিকের ছবিতে মাতৃরূপ যে কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-প্রবর্তিত প্রত্নপ্রতিমা, ব্রত হয়ে ধরা দেয়, সে-কথা আমাদের অজানা নয়। সুবর্ণরেখাতেও তাই সীতাকে দেখি অগ্রজের মা হতে, নিজের সন্তানের মা হতে। বোন, স্ত্রী, দেহজীবিনী ইত্যাদি রূপেও 888sport promo code এখানে উপস্থিত। এই সীতাই আবার যখন বালিকা ছিল, তখন সেও মায়ের প্রত্নপ্রতিমার মুখোমুখি হয়। আচমকা। অ্যারোড্রামের ভগ্নস্তূপ পড়ে থাকা এক পরিত্যক্ত অঞ্চলে। মা কালীর রূপে এসে বহুরূপী দর্শন দেয় ছোট দুটি ছেলেমেয়েকে। যেন কালীরূপে মহাকাল অকস্মাৎ 888sport app download for android করিয়ে দিয়ে যায় ধ্বংসের স্বরূপকে। 888sport promo code ধ্বংস করতে পারে, গড়তেও পারে। 888sport promo code প্রকৃতি, প্রকৃতিই 888sport promo code। ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে 888sport promo code তথা মাতৃত্ব পরম ও চরম আকার ধারণ করে পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। এই মায়ের প্রত্নপ্রতিমার নানাবিধ রূপ দর্শন, আখেরে নিজেকেই জানা। জানা থেকে জ্ঞানের উৎপত্তি। এই আত্মজ্ঞানকে অবলোকন করতেই হরপ্রসাদ ওরফে নচিকেতার হাত ধরে ঈশ্বর কলকাতা আসে। আর মুখোমুখি হয় এক কঠিন সত্যের। যে-সত্য যমের মতোই নির্মম। এই সত্য কি সত্যিই দেখতে চেয়েছিল ঈশ্বর? মহাপাতক ঈশ্বর আর্তচিৎকার করে ওঠে। সে দাবি করতে থাকে সীতাকে সে-ই খুন করেছে।

সীতার চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর এক সাংবাদিক ঈশ্বরের কাছে আসে সত্য জানার জন্য। হত্যা না আত্মহত্যা, এটি জানার জন্য সে ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করে, ‘শুনেছি আপনি সত্যবাদী!’ ঈশ্বর বলে, ‘মজা লুটতে এসেছো। হ্যাঁ, মিথ্যা আমি বলিনি। তুমিও বাদ পড়বে না। তুমিও দোষী।’

সাংবাদিক বেণিমাধব অবাক হয়ে বলে, ‘আমি?’

ঈশ্বরের উত্তর, ‘তুমি দোষী। তুমি আমি সবাই।’

সুবর্ণরেখার মতো আমরা মেঘে 888sport app তারাতেও দেখি নীতার বাবা শেষদিকে এসে, সকল দুর্ভাগ্যের জন্য ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দর্শকের দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘আই একিউজ।’ অর্থাৎ অভিযোগটা সমাজের প্রতি। সুবর্ণরেখাতেও তাই, সীতা, ঈশ্বর ও অভিরামের এই দশায় উপনীত হওয়ার পেছনে সকলেই দোষী। এই করুণ পরিণতির জন্য গোটা সমাজকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান ঋত্বিক ঘটক।

ঋত্বিক বলতে চান – ঈশ্বরের তো মহাপাতক হওয়ার কথা ছিল না। অথবা সীতার কি ওরকম জীবন বেছে নেওয়ার কথা ছিল? অভিরাম, যার জন্য নির্ধারিত ছিল জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া, সে কি না মরলো বাসচালক হিসেবে দুর্ঘটনায়? ওদিকে হরপ্রসাদ, যে নিজেকে বলেছিল নচিকেতা, তার স্ত্রী রেনুকার কি আত্মহত্যা করার কথা? সীতা-অভিরামের ছেলে বিনুর কি এতিম হওয়ার কথা ছিল? কিন্তু যা যা ঘটেছে এই ছবিতে, তা দেখলে মনে হতে পারে – ঋত্বিক ঘটক নৈরাশ্যবাদ প্রচার করছেন। আদতে তা নয়। দেশে তখন যা ঘটছে তা দেখলে মানুষ নিরাশার ভেতর না পড়ে পারে না। আশার আলো সমাজে নেই, তো ঋত্বিক সেটা দেখাবেন কোত্থেকে? তিনি তো মন ভোলানোর জন্য live chat 888sport বানাননি।

ঋত্বিক বলছেন, ‘নৈরাশ্যবাদ প্রচারের কোনো অপচেষ্টা মনের মধ্যে আসেইনি আমার। … যা আমি ছবিটির মধ্যে দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি, তা হচ্ছে, আজকের 888sport appsের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কথা। যে বিশাল সংকট আস্তে আস্তে একটা দানবের রূপ পরিগ্রহ করেছে, ’৪৮ সাল থেকে ’৬২ সালের পরিধির মধ্যে, সেটাকে ধরবার চেষ্টা করেছি। এই সংকটের প্রথম বলি হচ্ছে আমাদের বোধশক্তি। সেই শক্তি ক্রমশ অসাড় হয়ে এসেছে আমাদের মধ্যে, আমি সেটাকেই ঘা দিতে চেয়েছিলাম।’

দেশভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষগুলো যেন পার্থিব বিচারেই কেবল বাস্তুহারা হয়নি, তারা হৃদয়ের বিচারেও বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। তাই তো ঈশ্বর মানবিক বিচার থেকে বিচ্যুত হয়ে অবস্থান নেয় জাতপাত বিচারে, সে হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক। তাই নামগোত্রহীন অভিরামের সঙ্গে নিজের বোনের বিয়ে দিতে সে অস্বীকৃতি জানায়। চাকরির পদোন্নতিও তার কাছে অনেক বড় হয়ে ওঠে। আরেক ধরনের বিচ্যুতি ঘটে তার ভেতর, সেটি হলো নির্লোভ ও নির্মোহ সত্তা থেকে ভোগবাদী হয়ে ওঠা। যে-ভোগবাদী সংস্কৃতির কথা কার্ল মার্কস বলে গেছেন। যে-সমাজে সকল কিছুই পণ্যে পরিণত হয়, এমনকি 888sport promo code দেহটাও, সেই সমাজেই এক খরিদ্দারে পরিণত হয় ঈশ্বর। ঋত্বিক ঘটক একদিকে মার্কসবাদী দৃষ্টি থেকে সমাজকে বিচার করছেন, অপরদিকে, পুরাণের সঙ্গে মানবচরিত্রকে মিলিয়ে সত্য অন্বেষণ করছেন, ইয়ুংয়ের সহায়তায় করছেন মনোবিশ্লেষণ। সুবর্ণরেখায় ঋত্বিক ঘটক একটি ঝুলন্ত রেখার ওপর দিয়ে হেঁটে গেছেন, তাঁর হাতে একটি দণ্ড, দণ্ডের একদিকে কার্ল মার্কস, অপরদিকে কার্ল গুস্তাফ ইয়ুং। ঋত্বিকের এই ভারসাম্য রাখার অপূর্ব খেলাটা দর্শক দেখে গেলেন ঈশ্বর, সীতা, অভিরাম, হরপ্রসাদ প্রভৃতি চরিত্রের মিথষ্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। একজন মহৎ 888sport live chatী এই কাজটিই করেন, তিনি গল্পের ছলে বলে যান গূঢ় সত্যের কথা। রেখে যান অস্বস্তি জাগানিয়া প্রশ্ন : রাত কত হলো? উত্তর মেলে না?