মদ ও গঙ্গারাম
গঙ্গারাম আমার বৃদ্ধকালের অসমবয়সী বন্ধু। বুঝে না বুঝে, সে আমাকে অনেক সময়েই সাহায্য করে, আমার রচনার রসদ যোগায়।
কালি ও কলমের পাঠক-পাঠিকারা গঙ্গারামকে চেনেন না। সে আমার মতো ওপারের লোক নয়, সে খাঁটি এপারের লোক, রাঢ়ভূমির নৈকষ্যকুলীন ঘটি।
এখন অবশ্য ‘ঘটি’ কথাটা প্রায় উঠেই গেছে, ঘটি-বাঙালের ভেদাভেদ এখন আর নেই। কিন্তু গঙ্গারাম কখনো ওপারে মানে পূর্ব বঙ্গদেশে মানে 888sport appsে যায়নি। তার গঙ্গারাম নামের জন্যেই হয়তো সে কখনো গঙ্গা পেরোয়নি।
কালি ও কলমের পৃষ্ঠায় গঙ্গারামকে নিয়ে আসছি সুরা-সহযোগে। আশা করি, ব্যাপারটা জমবে।
‘মদ ও গঙ্গারাম’-প্রসঙ্গে প্রথমেই শ্রীমান গঙ্গারামের বাল্যকালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে হয়। গঙ্গারামদের বাসায় কেউ মাতাল বা মদ্যাসক্ত ছিল না। কিন্তু ঠিক পাশের বাড়িতেই থাকতেন একজন আবগারির দারোগা। সে-বাড়িতে দিবারাত্র কাচের গেলাসে টুং-টাং, সোডার বোতলের হুঁশ-হুঁশ, ‘থ্রি চিয়ার্স’ ইত্যাদি মদ্যপানের আনুষঙ্গিক চলত।
সেই মদ্যপায়ী আবগারি পরিবার শ্রীমান গঙ্গারামের ভবিষ্যৎ-জীবনের ওপর গভীর ছায়াপাত করেছিল। এ-বিষয়ে একটি ছোট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। গঙ্গারাম যখন ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ে, বয়স দশ-এগারো, সেই সময়ে তাকে ইংরেজি শিক্ষক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘স্ট্রেট বানান কী?’ গঙ্গারাম শুদ্ধ উত্তর দিয়েছিল ‘ঝ-ঃ-ৎ-ধ-র-ম-য-ঃ’। অবশ্যই মাস্টারমশাই বানান শুদ্ধ দেখে খুশি হয়েছিলেন এবং এরপর জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ঝঃৎধরমযঃ মানে কী?’
গঙ্গারাম এর উত্তর দিয়েছিল, ‘বোতল থেকে গলায় ঢক্ ঢক্ করে ঢেলে খাওয়া।’
এটা অবশ্যই প্রতিবেশী আবগারি পরিবারের প্রভাব গঙ্গারামের উপর। বয়স বাড়তে বাড়তে স্কুলের ক্লাস পার হয়ে কলেজে ভর্তি হয়েই সে দেদার মদ খেতে লাগল। পুরো অঞ্চলে তার গোলমেলে মদ্যপ হিসেবে প্রচুর নাম হলো। ফলে গঙ্গারাম যখন আরেকটু বড় হলো গঙ্গারামের বাবা অনেক চেষ্টা করেও তার যুবক পুত্রটির জন্যে পাত্রী সংগ্রহ করতে পারলেন না।
এক-একটা করে বিয়ে ঠিক হয়, তারপর সেটা ভেঙে যায়। তাদের কাছে খবর যথারীতি পৌঁছে যায় যে, পাত্র ডাকসাইটে মাতাল।
গঙ্গারামের অবশ্য কোনো হেল-দোল নেই। তার বাবার পরপর দুটো ওষুধের দোকান শ্যামবাজারে আর বাগবাজারে। সেখান থেকে বাবার অনুপস্থিতিতে যথেচ্ছ টাকা তুলে নেয়, আর মনের আনন্দে মদ্যপান করে।
মানুষের সময় সর্বদা একরকম যায় না। এই যে এমন মদ্যপ গঙ্গারাম, পাশের পাড়ার গঙ্গামণি নামে একটি নরম সুলক্ষণা মেয়ে গঙ্গারামের প্রেমে পড়ল এবং একদিন তাদের বিয়ে হলো। বিয়ের মাসখানেকের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল গন্ডগোল শুরু হলো।
কোনো বাঙালি মেয়ে গঙ্গারামের মতো সকাল-সন্ধ্যা মাতালকে জীবনসঙ্গী বলে মেনে নেবে না। রীতিমতো হই-হট্টগোল প্রতিদিন লেগেই থাকত। অবশেষে একদিন গঙ্গামণি আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো, একটু কান্নাকাটি করার পর সে যখন চুপ করল, আমি তাকে বললাম যে, ‘তুমি এতটা ভালোবেসে এতটা দেখাশোনা করে বিয়ে করলে গঙ্গারামকে, গঙ্গারামের মতো একটা মাতালকে বিয়ে করতে গেলে কেন?’
গঙ্গামণি আমার অভিযোগে আবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তারপর বলল, ‘সত্যি কথা বলছি দাদা, ও যে দু-বেলাই মদ খায়, সবসময়ে মাতাল থাকে, এ-কথা আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সে কী ব্যাপার?’ আমার অবাক হওয়া দেখে সে আবার কাঁদতে লাগল। আমি আবার বললাম, ‘বিয়ের কতদিন পরে তুমি বুঝতে পারলে গঙ্গারাম মদ খায়?’ গঙ্গামণি বলল, ‘বিয়ের দিন
ওর হাব-ভাব দেখে মনে হলো যেন কী রকম, আগের হাবভাবের
সঙ্গে মিলছে না। তখন ওরই বাড়ির এক প্রবীণ চাকর আমাকে বলল,
মদ-না খাওয়ার জন্যে আজ ওকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে, অস্বাভাবিক আচরণ করছে।’
গঙ্গারামের বিয়ের বিষয়ে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। যখন গঙ্গারামের একটার পর একটা বিয়ে ভেঙে যাচ্ছিল, সেইসময়ে অপারগ হয়ে বৃদ্ধ ভদ্রলোক খবরের কাগজে রবিবাসরীয় বিবাহের কলমে একটি বিজ্ঞাপন দিলেন, সুশিক্ষিত-ধনবান-সুরাপায়ী পাত্রের জন্যে উপযুক্ত পাত্রী চাই।
বলাবাহুল্য, এই বিজ্ঞাপনে গঙ্গারামের বিয়ের কোনো সুবিধা হয়নি। অবশেষে ওই গঙ্গামণি প্রেমে পড়ায় সে রক্ষা পায়। গঙ্গামণির নালিশের পর আমি গঙ্গারামকে ডেকে তার মত্ততা-বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। গঙ্গারাম সঙ্গে করে আধবোতল ব্রান্ডি নিয়ে এসেছিল।
সেদিন কলকাতা শহরে বৎসরের শীতলতম আবহাওয়া। গঙ্গারাম আমার ঘরে বসে একটা গ্লাস আর একটা ঠান্ডা জলের বোতল চাইল চাঙ্গা হয়ে উঠবার জন্যে। তারপর গেলাসে ব্রান্ডি ঢেলে তার মধ্যে ঠান্ডা জল মেশাতে মেশাতে গঙ্গারাম বলল, ‘দেখুন দাদা মদ একটা গোলমেলে ব্যাপার। শরীর গরম করার জন্যে দু-পেগ ব্রান্ডি নিলাম আর এখন তা ঠান্ডা করার জন্যে জল মেশাচ্ছি।’ এরপর একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, ‘ঠান্ডা-গরম, গরম-ঠান্ডা- মদের ব্যাপারটা বড়ই জটিল।’ গঙ্গারামের সঙ্গে আলোচনা করে কিছুই হবে না – সেটা বুঝে গঙ্গারামকে ছেড়ে দিলাম আর গঙ্গামণিকে একটা বেড়াল-মারা লাঠি দিয়ে বললাম, ‘গঙ্গারামকে বেতাল দেখলেই পেটাবে।’


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.