করোনা ও কফিন

অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে আদ্রিয়ানার। সার্প সাতটা। বকের পালকের মতো শুভ্র লেপের তলা থেকে কচ্ছপের মতো মাথা ও শরীরটা ঈষৎ বের করে ক্রমাগত আর্তনাদরত ঘড়িটা এক হাতে বন্ধ করে সে। তারপর তন্দ্রাতুর শরীরটা আবার সুড়সুড় করে ঢুকে যায় কোয়েল্টের নিচে। এটা আদ্রিয়ানার চিরকালের অভ্যাস। একবারে কিছুতেই উঠতে পারে না সে। মিনিট পনেরো এভাবে শুয়ে থাকবে লেপের তলায়। তারপর কিছুক্ষণ বিছানায় আড়মোড়া ও গড়াগড়ি দিয়ে তবেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে। হঠাৎ আদ্রিয়ানার মনে হলো বিছানাটা কেমন যেন আর্দ্র আর্দ্র লাগছে। অদ্ভুত একরকম স্যাঁতসেঁতে অনুভূতি। এক ঝটকায় লেপটা সরিয়ে দিতেই বিস্ফারিত চোখে সে তাকাল বেডশিটের ওপর। রক্তজবার মতো লাল রক্তে ভিজে আছে বিছানার মাঝখানটা। সমস্ত চাদরটা যেন দেখাচ্ছে জাপানের পতাকার মতো। আরেব্বাস! রাতে তার রজস্বলা হয়েছে, সে টেরই পায়নি। আজ তো ঋতুস্রাব হওয়ার কথা নয়। ধার্য তারিখ আরো দুদিন পর। জলের স্রোতের মতো হঠাৎ এমন রজোদর্শনে খানিকটা

উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে আদ্রিয়ানা। এর কারণ, দিন দশেক আগে একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে প্রেমিক লুকার সঙ্গে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন তাদের খুব কমই হতে হয়; কিন্তু সেবার কীভাবে যে কী হয়ে গেল।

লুকার সঙ্গে আদ্রিয়ানার সম্পর্ক বছরতিনেক ধরে। লুকা দেখতে ওরকম আহামরি সুদর্শন পুরুষ নয়। গড়পড়তা চেহারা, উচ্চতা মাঝারি গোছের। আদ্রিয়ানার মাথা বরাবর। দুজন একসঙ্গে হাঁটলে বরং আদ্রিয়ানাকেই লম্বা মনে হয়। তবে লেখাপড়ায় অতি মেধাবী ও চৌকস লুকা। প্রচণ্ড ধীসম্পন্ন পুরুষ। লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র লুকাও। আদ্রিয়ানা নিজেও তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। এ-জমানায় সুন্দরী হতে হলে ক্ষীণাঙ্গী হতে হয় কিন্তু আদ্রিয়ানার শরীর পূর্ণবিকশিত। প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুপরিপুষ্ট। দেহ একটু ভারী, সেজন্য চলাফেরাও ঈষৎ মন্থর। আদ্রিয়ানার মুখাবয়বে স্নিগ্ধতার স্পর্শ নেই। আদ্রিয়ানা প্রায়ই রসিকতা করে বলে – জানো তো লুকা, ঈশ্বর আমাকে তৈরি করার সময় চেহারায় লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। লুকা হেসে বলে – তোমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর যদি লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়ে থাকেন তবে আমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর নির্ঘাত সার দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। দেখো না দীর্ঘকায় সব মানুষের ভিড়ে আমি কেমন খর্বকায় হয়ে রইলাম। লুকা দেখতে রাজপুত্র নয়, এটা ঠিক। আয়-রোজগারও কিছু নেই। ছাত্র মানুষ। সেজন্য আয়-রোজগারের প্রশ্ন অবান্তর। শুধু বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আদ্রিয়ানার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলে সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেছে লুকার কাছে।

আদ্রিয়ানার বাবা মারিও দিনি গোঁড়া ও প্রাচীনপন্থী মানুষ। মা-মরা একমাত্র মেয়েকে সেজন্য সে সবসময় কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় করেছে। জীবনের সংকীর্ণ এই জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ততটুকুই আদ্রিয়ানার পৃথিবী। তার বাইরে নিষিদ্ধ এলাকা। সুতরাং প্রত্যক্ষ জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ঘরের জীবনকে বাইরে প্রসারিত করার অথবা বাইরের জীবনকে ঘরে আহ্বান করার স্বচ্ছন্দ অধিকার তার কখনোই ছিল না। তাছাড়া মা নেই বলে সংসারের প্রতিকূল স্রোত ও ঝড়ো বাতাসগুলো ছোটবেলা থেকে প্রতিনিয়ত আদ্রিয়ানার শরীরের ওপর দিয়েই বয়ে যায়। বর্ষার নদীতে বাঁশের খুঁটির মতো সে থরথর করে কাঁপে বটে, কিন্তু ভেসে যায় না।

আদ্রিয়ানা সোজা ছুটল স্নানঘরে। প্রাতঃকৃত্য সেরে ও নিজেকে গুছিয়ে ভাবতে লাগল, এক্ষুনি বাবাকে ডেকে তোলা দরকার। বাবা নিশ্চয়ই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাবার ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে আদ্রিয়ানা হাঁক ছাড়ল – বাবা এখন কি উঠবে নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ। ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আদ্রিয়ানা পুনরায় হাঁক ছাড়ল – বাবা সকাল হয়ে গেছে। তুমি কি উঠবে এবার। নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ? এবার সাড়া পাওয়া গেল।

মারিও দিনি তন্দ্রা-মেশানো কণ্ঠে বললেন, কাজ সেরে তুই দোকানে চলে যা। আমি দুপুরের দিকে আসব। শরীরটা ভালো লাগছে না। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্ত হয়ে বলল,  জ্বরটর আসেনি তো আবার। দরজাটা খোলো। তোমার শরীরটা একটু দেখে যাই। মারিও ওপাশ থেকে বললেন – তেমন কিছু নয়। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষরাতের দিকে কেবল চোখদুটো ধরে এসেছিল একটু। কাঁচা ঘুম ভেঙে এখন আমি দোকানে যেতে পারব না। আদ্রিয়ানা আশ্বস্ত হয়ে বলল, তুমি তাহলে ঘুমাও আরো কিছুক্ষণ। শরীর যদি ভালো লাগে তাহলে এসো।

সকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে রোজ ঘণ্টাখানেক দৌড়ানোর অভ্যাস আদ্রিয়ানার। তারপর বাড়ি ফিরে স্নান ও প্রাতরাশ সেরে সোজা চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে বিকেলের দিকে ঘণ্টাদুয়েক সে বসে কফিন বিক্রির দোকানে। তবে এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, তাই পুরোটা সময়ই সে দোকানে বসে। আদ্রিয়ানাও লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়ছে ইতালিয়ান 888sport live football নিয়ে। বাবা মারিওর ইচ্ছে ছিল মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবে; কিন্তু ছোটবেলায় মা-হারানো এই মেয়েটির প্রতি তেমন সুনজর দিতে পারেনি বাবা মারিও দিনি। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে ডাক্তারি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ের চেয়ে 888sport live football পড়ার প্রতি আদ্রিয়ানার ঝোঁক ছিল।

শরীরে ট্র্যাকস্যুট ও পায়ে ট্রেইনার গলিয়ে ঘর থেকে বের হয় আদ্রিয়ানা।

জানুয়ারির মাঝামাঝি শীতের তীব্রতা যেন অসহ্য হয়ে ওঠে। পাইন, ওক, চেস্টনাট আর ম্যাপল গাছের হলুদ রঙের পাতায় পথ ঢেকে যায়। পা দিয়ে পাতা সরিয়ে গন্তব্যে পথ করে নিতে হয় পথিকের। আদ্রিয়ানা দেখতে পায় ঝোপঝাড়ে ফুটে আছে অ্যাস্টর, ব্লু বেলস, কসমস, সিলভিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেন্ডুলা, গ্লাডিওলাসসহ কত নাম-না-জানা ফুল। এগুলো শীতের ফুল। বসন্তে ফুটবে লিলি, পানসি, রোডেন্ড্রন প্রভৃতি ফুল। পাতার আড়াল থেকে একটা তাসকুনি দোয়েল ডেকে ওঠে – চিইক্ … চিইক্ …।

বাড়ি থেকে সিকি মাইল দূরের সেরিয়া নদীটি ভয়ার্ত এই শীতে শৌর্যহীন অশীতিপর বৃদ্ধের মতো জবুথবু মেরে আছে। দড়ির মতো শীর্ণ নদীটি এঁকেবেঁকে ধাবিত হয়েছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বুকে। বর্তমানে নদীটির এমন দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা হলেও বর্ষায় এর বাড়বাড়ন্ত শরীর। যৌবনবতী তরুণীর মতো তখন সেটা খলখলিয়ে ও উদ্দাম নৃত্যে বয়ে চলে।

লোম্বার্দিয়া প্রদেশের ক্রেমা শহরে কফিনের দোকান কুড়িয়ে-বাড়িয়ে হাতেগোনা চার-পাঁচটির মতো। শহরের ঈশানকোণের একেবারে শেষ প্রান্তে কফিনের দোকান ‘অলতিমো সেলুট্যো’ – অন্তিম বিদায়। দোকানটির মালিক আদ্রিয়ানার পিতা মারিও দিনি। ক্রেমা শহরে তাদের তিন পুরুষের বসবাস। মারিওর পিতাসহ সান্দ্রিও দিনি লোম্বার্দিয়া অঞ্চলে এসেছিলেন ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগ্রেব থেকে। তিনি ছিলেন সম্পন্ন কৃষক। মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি কৃষি পেশায় না গিয়ে কফিন বেচাকেনার ব্যবসায় নেমেছিলেন। সেই থেকে কফিন বিক্রির এই ব্যবসা। মারিওর বয়স সত্তর অতিক্রম করেছে গত বছর। যদিও পিয়েরো নামে একজন কর্মচারী দোকানে কাজ করে বটে; কিন্তু মারিওর একমাত্র কন্যা আদ্রিয়ানা ও মারিও দুজন মিলেই দেখাশোনা করে ব্যবসাটি। 

সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে আদ্রিয়ানা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় বহুদূর। সেরিওর তীরঘেঁষে সোজা পুবে। নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুক্ষণ দৌড়ালে ছোট্ট অরণ্যকুঞ্জের মতো একটা জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে আদ্রিয়ানা বুকভরে নিশ্বাস নেয়। ভোরবেলা সূর্য উঠছে অরণ্যরাজির মাথাঘেঁষে। গাছপালা ও বাড়িঘরের ওপরে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আবির। নদীর কূল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আদ্রিয়ানা ঘন অরণ্য গোছের একটি স্থানে এসে খানিক বিশ্রামের জন্য বসে পড়ে সবুজ ঘাসের ওপর। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানির ফ্লাস্ক খুলে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নেয়। চারদিকে লার্চ, বিচ, হর্নবিম অ্যাশ আর চেস্টনাট গাছের প্রাচুর্য। অজস্র বৃক্ষ বুক চিতিয়ে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্যজুড়ে।

আদ্রিয়ানা উঠি উঠি করছিল, ঠিক এমন সময় ঈষৎ দূরে কিছু মানুষের চেঁচামেচি শুনে সেখানে যেতেই দেখা গেল ভ্রমরের পাখার  মতো কালো কুচকুচে দীর্ঘকায় একটি সাপ কিলবিল করে ডাঙ্গা ছেড়ে ছুটে যাচ্ছে জলের দিকে। পাশ থেকে কে একজন বলল, আরে এটা তো ‘ওয়েস্টার্ন হুইপ স্নেক’। মারাত্মক বিষধর! আদ্রিয়ানা অস্ফুট স্বরে বলল, হুইপ স্নেকই বটে! একেবারে কুচকুচে কালো। লম্বা চাবুকের মতো। জনৈক পথচারী বলল, কদিন আগে এ-বনে নাকি একটি মাদামি ভালুক দেখা গেছে। আদ্রিয়ানা বলল, বাপ রে! কী ভয়ানক কথা। তাহলে তো এদিকে ঘেঁষা যাবে না আর। আদ্রিয়ানা মনে মনে ভাবল, এবার তাহলে বাড়ি ফেরা দরকার।

দুই

সকাল দশটা নাগাদ আদ্রিয়ানা দোকানে এসে পৌঁছায়। পিয়েরো নামে যে-ছেলেটি দোকানে কাজ করে সে ঘণ্টাখানেক আগে এসে ধুলোবালি সাফসুতরো করে দোকানটি একেবারে ঝকঝকে করে তুলেছে। ছেলেটি বড় কাজের। বছর-দুয়েক ধরে কাজ করছে এখানে।

পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে দোকানে ঢুকতে দেখে হাত তুলে বলল, বনজোরনো – সুপ্রভাত। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বলল, বনজোরনো। কেমন আছো পিয়েরো? সব ঠিক আছে তো। পিয়েরো বারদুয়েক কেশে বললো – ভালোই। তবে দেখুন না কী ভয়ানক ঠান্ডা পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন হাড়-মাংস সব জমে যাবে। বলেই পুনরায় দু-তিনবার কাশল সে।

– সে তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। জানুয়ারির মাঝামাঝি ঠান্ডা তো পড়বেই। ভাগ্য খারাপ হলে তুষারপাতও হতে পারে। পিয়েরো নিজের টেবিল-চেয়ার ছেড়ে আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে এসে বসে। সকালের দিকে দোকানে খদ্দের তেমন একটা আসে না। দু-একজন যাওবা আসে মধ্যাহ্নের পর। বেশিরভাগ সকালই দুজন গল্প করে কাটিয়ে দেয়। পিয়েরো চেয়ারটা আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে টেনে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো – আমাদের বড় কর্তা আসবে কখন। পুরনো কাপড় দিয়ে টেবিলের উপরিভাগ মুছতে মুছতে আদ্রিয়ানা বললো, বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আসতে দেরি হবে। হয়তো দুপুরের দিকে আসবে।

পিয়েরো হঠাৎ চেঁচিয়ে বললো, আদ্রিয়ানা ওই দেখুন, আপনার জুতোর সঙ্গে একদলা কাদা লেগে আছে। আদ্রিয়ানা ট্রেইনারের দিকে তাকিয়ে বললো – আরে যা! তাই তো, এ কী অবস্থা! সকালে মর্নিংওয়াক করতে গিয়ে লেগেছে হয়তো। পিয়েরো ঠোঁটে একচিলতে হাসি তুলে বললো, আপনার বুঝি নাইকি ব্র্যান্ডের ট্রেইনার পছন্দ? আদ্রিয়ানা বললো, হুম! জানো তো গ্রিক মিথোলজিতে নাইকি হচ্ছে ‘গডেস অব ভিক্টোরি’ অর্থাৎ বিজয়ীর দেবী। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে জুতা কোম্পানিটি যে একজন দেবীর নামে এই ব্র্যান্ডের নামকরণ করেছে এই-বা কম কী। এজন্য এ-ব্র্যান্ডের জুতাই আমি পরি সবসময়।

পিয়েরো সোৎসাহে বললো, একটা বিষয় খেয়াল করেছেন আদ্রিয়ানা, চারপাশ ভীষণ ঠান্ডা হলেও বাইরে কিন্তু ঝলমলে রোদ।

– তাই তো দেখছি, কাঁচা সোনারঙা রোদ্দুর কচি পাতার ওপর কেমন চকচক করছে। আঙুল তুলে দূরে নির্দেশ করে আদ্রিয়ানা বললো, দেখেছো পিয়েরো, চাপা ফুলের মতো সূর্যের আলো দূরের সেরিও নদীতে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একরাশ আলোর মালা ক্রমশ দোল খাচ্ছে নদীতে। শীতে নদীটা কেমন শুকিয়ে যায়, অথচ ভরা বর্ষায় এই একই নদী তরুণীর উচ্ছ্বসিত আবেগঘন অশ্রুরাশির মতো চারদিকে ছলছল করে।

– তা বেশ বলেছেন আদ্রিয়ানা। আমি খেয়াল করে দেখেছি 888sport live footballের ছাত্রী বলেই হয়তো আপনার মুখ দিয়ে এত সুন্দর সব কথা বের হয় সবসময়।

বেলা গড়িয়ে যায় কিন্তু খদ্দেরের দেখা নেই। অখণ্ড অবসর। আদ্রিয়ানা তার টেবিলের দেরাজ থেকে দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যগ্রন্থটি বের করে চোখ বুলাতে থাকে। দৈনন্দিন হস্তস্পর্শে মলিন হয়ে উঠেছে বইটি। পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, আপনি 888sport app download apkর বই নিয়ে বসলেন? কী বই এটা, দান্তের?

বই থেকে মুখ না ফিরিয়েই আদ্রিয়ানা বললো, হুম, দান্তের লা দিভিনা কোম্মেদিয়া। জানো তো পিয়েরো, ইংরেজদের যেমন শেক্সপিয়র, ফরাসিদের ভিক্তর হুগো, জার্মানদের গে্যঁটে, রুশদের তলস্তয় আমাদেরও ঠিক তেমনি দান্তে। লা দিভিনা কোম্মেদিয়া হচ্ছে বিশ্ব888sport live footballের এক অমূল্য সম্পদ।

আদ্রিয়ানা কৌতূহলী কণ্ঠে পিয়েরোকে জিজ্ঞেস করলো – তুমি কি ইংরেজ কবি শেলি, বায়রন, এলিয়টদের নাম শুনেছো? পিয়েরো তার পিঙ্গল বর্ণের বর্তুল চোখদুটোতে বিস্ময় তুলে বললো, না শুনিনি।

আদ্রিয়ানা বিজ্ঞের মতো বললো, দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যটি ইতালিয়ান ছন্দ ‘টারজা রাইমায়’ রচিত। এটি দান্তেরই আবিষ্কৃত ছন্দ। শেলি, বায়রন, এলিয়ট এঁরা সবাই দান্তের উদ্ভাবিত ছন্দই ব্যবহার করেছেন তাঁদের 888sport app download apkয়।

আদ্রিয়ানা বললো, বুঝেছো পিয়েরো, ডিভাইন কমেডি হচ্ছে দান্তের কল্পনায় নরক, স্তব্ধলোক ও স্বর্গে 888sport slot gameের বিবরণ। দান্তে যখন নরকে প্রবেশ করছেন, তখন তাঁর পথপ্রদর্শক হচ্ছেন তাঁর অতিপ্রিয় রোমান কবি ভার্জিল। ভার্জিল তাঁকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন, তারপর তাঁকে নিয়ে চললেন নরকের প্রবেশপথের দিকে। দান্তের কাব্যে নরক বা ইনফারনোর আকার দেখতে অনেকটা কলার মোচার মতো।

কলার মোচা দেখেছো কখনো, আদ্রিয়ানা জিজ্ঞেস করলো পিয়েরোকে। পিয়েরো প্রত্যুত্তরে বললো, হ্যাঁ বেশ দেখেছি। আদ্রিয়ানা বললো, তো মোচার মতো সেই নরকের বহিরাঙ্গনে দেখা গেল অসংখ্য প্রেতাত্মার ভিড়। ভিমরুলজাতীয় বড় বড় পোকার দংশনে তাদের শরীর হতে রক্ত ঝরে পড়ছে। ভীরু এবং দোদুল্যমান চিত্ত মানুষকে মৃত্যুর পর এরকম শাস্তি পেতে হয়। সেই মোচাকৃতি জায়গার শুরুতেই নরক। তো সেই নরকের প্রথম বৃত্তে দেখা গেল হোমার, ওভিদ, হোরেস প্রমুখের মতো লেখককে, যাঁরা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের সুযোগ পাননি। তাঁরা নানা সদ্গুণের অধিকারী হলেও যিশুর কৃপালাভ থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে নরকের প্রথম বৃত্তেই স্থান হয়েছে তাঁদের। অর্থাৎ তাঁদের পাপী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বটে কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে নরকের শুরু নিম্নাভিমুখী মোচাকৃতির দ্বিতীয় বৃত্ত থেকে। যারা কামজ প্রেমে মত্ত হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়েছে, তারা এখানে লুটোপুটি খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মুহূর্তের জন্য তাদের শান্তি নেই। দান্তে এদের মধ্যে দেখতে পেলেন ইতালির রাভেল্লা শহরের পাওলো ও ফ্রান্সেসকে, যাঁদের করুণ অবৈধ প্রেমের কাহিনি দান্তে প্রথম বিবৃত করেছেন এবং তারপর সেগুলো বহু গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। নরকের তৃতীয় বৃত্তে দান্তে পেলেন পেটুকদের। ভোজন ছিল এদের একমাত্র আনন্দ। শাস্তির জন্য এদের রাখা হয়েছে কর্দমের স্রোতে। এদের ওপর লক্ষ রাখছে এক ত্রিমুণ্ডধারী ভীষণাকৃতি পাহারাদার। পরের বৃত্তে দেখা গেল কৃপণদের। তাদের শাস্তি একটা প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যাওয়া। ভার্জিল এবার দান্তেকে নিয়ে গেলেন পঞ্চম বৃত্তে। তারপর ষষ্ঠ, সপ্তম এবং এভাবে অষ্টম ও নবম বৃত্তে পৌঁছালেন দান্তে। অষ্টম ও নবম চক্রে শাস্তিভোগ করে সেসব পাপী, যারা বুদ্ধিবিচারের অপব্যবহার করেছে। মর্তের সব জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই যুক্তি-বুদ্ধি-বিচারের ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর-প্রদত্ত সেই শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার যারা অপব্যবহার করে, পাপীদের মধ্যে তারা সবচেয়ে অধম।

পিয়েরো চোখদুটো বড় বড় করে বললো, ওরেব্বাস! এ তো বিশাল কাহিনি। কিন্তু কাহিনিটা বেশ অন্যরকম।

আদ্রিয়ানা উৎসাহ পেয়ে বললো, তুমি কি জানো পিয়েরো, এই যে সামনে সেরিও নদীটা দেখছো এটাকে কিন্তু আমি মোটেও সেরিও নামে ডাকি না। এটা আমার কাছে সেই বিখ্যাত লিথি নদী। পিয়েরো ভ্রু কুঁচকে বলল, লিথি নদী? এ আবার কোন নদী? আদ্রিয়ানা মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, নরক 888sport slot gameশেষে দান্তে পৌঁছলেন পুর্গাতোরিও। পুর্গাতোরিও অর্থ কি সেটা জানো তো নিশ্চয়ই?

– হ্যাঁ। পুর্গতোরিও মানে তো শুদ্ধলোক। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। শুদ্ধলোক, অর্থাৎ মানুষ নরক ভোগ করার পর শুদ্ধলোকে এসে পরিশুদ্ধ হয়ে তারপর প্রবেশ করে স্বর্গে। তো হয়েছে কী – নরক 888sport slot game শেষ করে শুদ্ধলোক পরি888sport slot gameশেষে দান্তে গেলেন লিথি নদীতে স্নান করতে। স্নান সেরে উঠতেই বিস্মৃত হলেন অতীতের সব 888sport sign up bonus। তাঁর আত্মা পরিশুদ্ধ হলো। এবার যাত্রা মূল স্বর্গের পথে। ভার্জিলের যাত্রা এখানেই শেষ হলো। ভার্জিল এখান থেকেই ফিরে গেলেন। দান্তের সেই ভুবনখ্যাত প্রণয়িনী বিয়াত্রিচ হলেন স্বর্গে তাঁর পথপ্রদর্শক। 

দান্তের ডিভাইন কমেডি নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে মধ্যাহ্ন পার হয়ে পশ্চিম আকাশ জবাফুলের মতো রং ধারণ করেছে দুজনের কেউই টের পায়নি। মাঝখানে অবশ্য দুপুর নাগাদ আদ্রিয়ানার লাঞ্চ বক্স থেকে দুজন দুটো করে এগ স্যান্ডউইচ খেয়েছে শুধু। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। দোকানের সামনের সড়ক দিয়ে দূরের মাঠ ও খামার থেকে ট্রাকবোঝাই ডালিম, ডুমুর ও পেস্তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। আর পাকা আঙুরবোঝাই গাড়িগুলো যাচ্ছে চোলাইয়ের কারখানায়। সেই আঙুর পচিয়ে তৈরি হবে উৎকৃষ্ট ওয়াইন।

এমন সময় মারিও এসে ঢুকলো দোকানে। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো সমস্বরে অভিবাদন জানালো – ‘বুয়ানা ছেরা’ – শুভ সন্ধ্যা। মারিও-ও কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বললো, বুয়ানা ছেরা। মারিওকে দেখতে বেশ অসুস্থ ও বিধ্বস্ত লাগছে। মনে হচ্ছে যেন ঝড়ে পতনোন্মুখ একটা গাছকে কোনোরকমে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললো, বাবা তোমাকে তো বেশ অসুস্থ দেখাচ্ছে, আজ না এলেও তো পারতে। মারিও চেয়ারে বসতে বসতে বললো – এ আর এমন কী অসুস্থতা। কাল রাতে ঘুম হয়নি। এজন্য সকালের দিকে শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল।

মারিও আদ্রিয়ানাকে লক্ষ করে বললো, কী রে তোর হাতে কী বই ওটা? আদ্রিয়ানা ঈষৎ বিরক্ত কণ্ঠে বললো, বাবা তুমি কী অন্ধ। দেখতে পাচ্ছো না এটা দান্তের ডিভাইন কমেডি। এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে মারিও অবাক হলো। সে মলিন কণ্ঠে বললো, আমি তো অন্ধই। অন্ধকে অন্ধ আর খঞ্জকে খঞ্জ কি আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়। আদ্রিয়ানা ভীষণ লজ্জা পেল। সে বেশ অপ্রস্তুত ও অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলো। আদ্রিয়ানার মনেই ছিল না যে তার পিতার একটা চোখ অন্ধ। আদ্রিয়ানার মতো মারিও দিনিও শৈশবে মা হারিয়েছে। জন্মের পরে মারিওকে এক স্তন্যদাত্রী ধাত্রীর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুকাল পরে দেখা গেল মারিওর চোখদুটি অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আসল রোগ চোখের নয়। যে স্তন্যদাত্রীর স্তন্য পান করে মারিও বড় হচ্ছিলো তিনি গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত। সেজন্য চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে দিনকে দিন। বাড়ি এনে অনেক চিকিৎসা করা হলো। একটি চোখ প্রায় গেছে বলা যেতে পারে। গলগণ্ডকে তখন বলা হতো রাজব্যাধি। লোকজনের মধ্যে কুসংস্কার ছিল, রাজা বা রানী যদি রোগীকে স্পর্শ করে দেন তাহলে রোগ ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসায় যখন কিছু হলো না, তখন সিদ্ধান্ত হলো ছোট্ট মারিওকে নিয়ে যাওয়া হবে কোনো রাজা কিংবা রানীর আরোগ্যস্পর্শের জন্য। মারিওর বয়স তখন বছর আড়াই। কিন্তু রাজা-রানী পাওয়া যাবে কোথায়? এই চিন্তায় সবাই অস্থির। ইতালিতে কোনো রাজা-রানী নেই। বিপ্লবীরা ফ্রান্সে রাজা-রানীকে গিলোটিনে শিরñেদ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে রিপাবলিক। ইংল্যান্ডে অবশ্য রানী এলিজাবেথ সবেই সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু ব্রিটেন তো অনেক দূরের পথ। খায়-খরচাও আকাশচুম্বী। তাছাড়া আড়াই বছরের শিশুকে এতদূর নিয়ে যাওয়াও সমস্যা। খোঁজখবর করে দেখা গেল, রানী এলিজাবেথের শাশুড়ি অর্থাৎ প্রিন্স ফিলিপের মা রানী এলিস গ্রিসের একটা চার্চের ধর্ম-প্রচারিকা। ইতালির নেপলস থেকে এথেন্স জাহাজে তিন-চারদিনের পথ। খরচও তেমন নয়। অবশেষে মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি ছেলেকে নিয়ে রওনা হলেন এথেন্সে। রানি এলিসকে দেখে তো আলবের্তোর ভিরমি খাওয়ার মতো অবস্থা। কে বলবে যে ইনি গ্রিস ও ডেনমার্কের রানি। হতদরিদ্র চেহারা। মলিন পোশাক। গলায় ক্রুশের মালা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছাড়া এটাকে আর কী বা বলা যায়। এথেন্সের একটা কনভেন্টের বেশ কিছু সেবিকার দেখাশোনা করেন রানী এলিস। কথায়  কথায় রানির এই দুর্দশার কারণ জানা গেল। কনিষ্ঠ পুত্র হয়েও শৈশবে মায়ের কাছ থেকে এতটুকু ভালোবাসা পাননি ফিলিপ। উপরন্তু প্রতিনিয়ত জুটেছে নিগৃহ ও রূঢ় ব্যবহার। সেজন্য মায়ের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই প্রিন্স ফিলিপের। এমনকি জীবনে একটি ফুটোকড়িও পাঠাননি মায়ের জন্য। যা হোক রানী সযত্নে শিশুকে কোলে বসিয়ে গলায় মাদুলি ঝুলিয়ে দিলেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, রানীর সস্নেহ স্পর্শ মারিওর বাঁ-চোখটিকে রক্ষা করতে পারেনি। ওই চোখটিকে হারাতে হলো চিরদিনের জন্য।

আদ্রিয়ানা বললো, বাবা আমি সত্যি দুঃখিত। ওভাবে বলিনি আমি। তুমি মনে কষ্ট নিও না। ‘ইস্কুজামি’ – আমাকে ক্ষমা করে দাও। উদ্ভূত পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করার জন্যই বোধহয় পিয়েরো দুজনকে উদ্দেশ করে বললো, শুনেছেন নাকি চীনের উহান প্রদেশে করোনা নামে একটা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। আদ্রিয়ানা ও মারিও দুজনেই মাথা নেড়ে বললো, বিগত এক সপ্তাহ ধরে তো শুধু চীনে মৃত্যুর খবরই পাচ্ছি। কী ভয়ংকর অবস্থা! মৃতের 888sport free bet নাকি এক হাজার ছাড়িয়েছে। আদ্রিয়ানা আফসোস করে বললো, আহা কী হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। মারিও বললো, উহানে নিশ্চয়ই এখন হাজার হাজার কফিন বিক্রি হচ্ছে? তাই না রে আদ্রিয়ানা। অথচ দেখো আমাদের এখানে কফিন বিক্রির কী করুণ অবস্থা। আদ্রিয়ানা কণ্ঠে উষ্মা তুলে বললো, বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে। কী চাও তুমি, আমাদের এখানেও এ-ধরনের মড়ক শুরু হোক, যাতে করে হুড়হুড় করে কফিন বিক্রি হয়। তোমার এই কফিন বিক্রির জন্য কি এখন এদেশের মানুষগুলোকে মরতে হবে সব। বিপন্নের মতো হাত-দুটো কচলে মারিও বললো, এত রাগ করছিস কেন। দেখছিস না বিক্রিবাট্টার কী অবস্থা। সপ্তাহে দু-চারটের বেশি কফিন বিক্রি হয় না। ওদিকে বাড়িটার মর্টগেজের টাকা শোধ করতে হয় প্রতি মাসে এত এত। সংসারের খরচ, তোর পড়াশোনা এসব না হয় না-ই বললাম। কফিন বিক্রি না হলে কীভাবে চলা যায় বল তো দেখি।

আদ্রিয়ানা চোখ-দুটো বড় বড় করে বললো, তাই বলে তুমি মানুষের মৃত্যু কামনা করবে। এ কেমন কথা। এ-কাজ যদি না পোষায় তবে অন্য পেশা খুঁজে নাও। কিন্তু তাই বলে …।

ফিলিওলা – মাই চাইল্ড, আমার কথায় রাগ করিস না। এ-কথা আমি অনেক কষ্টে বলেছি। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য কত কিছুই না করেছি। জীবনটা অনেক কঠিন রে মা। এ-পেশায় আসব না বলেই তো জীবনের বারোটা বছর নষ্ট করেছি। অর্থকড়ি আয়-রোজগার করতে পারিনি বটে, কিন্তু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি। সবকিছু করে ব্যর্থ হয়ে তবেই এসেছি এ-পেশায়। আমার বয়স তখন উনিশ কি কুড়ি। গায়ে-গতরে ও চোখেমুখে তারুণ্যের ঝিলিক। মাথায় কী যে খেয়াল চাপল বলতে পারব না। মনে হলো নৌকর্মী হয়ে পৃথিবী ঘুরবো। চলে গেলাম ভেনিসে। সেখান থেকে বড় বড় সব জাহাজ যায় উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, জাপান, ভারত, সিংহল কত কত দেশে। আমার আত্মীয়পরিজন বাধা দিয়ে বললো, সমুদ্রযাত্রা! সে তো ভীষণ বিপদসংকুল। ওখানে গিয়ে লাভ কী বাপু। কুলি-কামিনগিরি করে খাও, তবু নিজ দেশ ভালো। তারা আক্ষেপ করে বললেন, সমুদ্র-মন্থন করে কী এমন হীরে- জহরত তুলে আনবে যে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছো। আমি মুখে কিছুই বলি না, তবে মনে মনে ভাবি, বড় হবো আমি তাই জীবনের আবর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আমাকে। মনে মনে ভাবি, ঠুলিবাঁধা বলদের মতো একই বৃত্তে ঘুরে মরাই কি আমার ললাটলিপি। কুলগৌরব নেই তো কী হয়েছে ঈষৎ অর্থগৌরব যদি অর্জন করা যায় তবে জীবনটা নিশ্চিন্তে চলে যাবে। পারিবারিকভাবে বিত্তশালী না হলে কী হবে, প্রাণপ্রাচুর্যে উচ্ছল মানুষ আমি। প্রতিনিয়ত আমার ভাবনা, নিরানন্দ, নিঃসঙ্গ ও বৈচিত্র্যহীন এ-জীবন প্রাণপ্রাচুর্য ও ঐশ্বর্যে যে করেই হোক ভরিয়ে তুলতেই হবে আমাকে। সমস্যা হচ্ছে ব্যক্তিগত বেদনার নিরাভরণ এই প্রকাশকে কেউ মূল্য দিতে চায় না।

‘রেজিনা ডেল সারে’ নামক একটি জাহাজে উঠে পড়লাম। তবে নৌকর্মী হিসেবে নয়, জাহাজের পাচকের সাহায্যকারী হিসেবে। আমার একটি চোখ নষ্ট বলে নৌকর্মী হিসেবে  কেউ নিতে রাজি হলো না। তবে আমার সব কথা শুনে জাহাজের পাচক পদে নিতে রাজি হলো। কোনো এক অনির্দেশ লক্ষ্যের মোহে তন্ময় হয়ে ভেসে পড়লাম সমুদ্রে।

‘রোজিনা ডেল সারে’ অর্থাৎ ‘সমুদ্রের রানি’ নামের সেই জাহাজটি যাচ্ছিল ভারত ও সিংহল হয়ে চীনে। আফিম আর গন্ধকের বিনিময়ে ইতালি রফতানি করে গাড়ি ও গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ। মারিও দিনি বললো, আমাদের সময় প্রচলিত একটি প্রথা ছিল আফিম খেয়ে নেশা করা। সে-সময় আফিম বিক্রির ছোট ছোট দোকানে আফিম বিক্রি হতো। এমনকি মুদিদোকানেও পাওয়া যেত আফিম। আর গন্ধক ব্যবহৃত হতো দেশলাই তৈরির কাজে। যা হোক জীবনের মূল্যবান বারোটি বছর কাটিয়েছি সমুদ্রে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, চীন, জাপান, ভারত – কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছি। কত কত অভিজ্ঞতা। তাইওয়ানে গিয়ে একটি মজার জিনিস দেখেছিলাম। সেখানে কিছু মানুষের রুচি অনুযায়ী ঝিনুকের খোল চূর্ণ করে তৈরি হয় কফিন। আবার জাপানে কিছু মানুষ এতই সৌখিন যে, মৃত্যুর পরও যাতে তাদের সৌখিনতা অক্ষুণ্ন থাকে সেজন্য তারা কফিনের গায়ে সুন্দর সুন্দর সব ছবি আঁকে। যেমন ধরো সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের ছবি। কেউ কেউ আঁকে অরণ্য, গাছপালা, বৃক্ষরাজি। কেউ ফুল-ফল-পাখি। আবার হয়তো দেখা যায় কোনো দেশপ্রেমিক কফিনে আঁকে নিজ দেশের পতাকা। চীন ও জাপানিদের আরেকটি সৌখিন বিষয় আমার নজর কেড়েছে। ওরা অনেক সময় সিপ্রেস সুগা, থুজা প্রভৃতি সুগন্ধি ও অপচনশীল কাঠ ব্যবহার করে কফিন তৈরিতে।

সিংহলে আমি কাটিয়েছিলাম বছরখানেক। সেখানে দেখেছি চীন, জাপানের ঠিক উলটো চিত্র। মৃতের সৎকার যত সস্তায় করা যায়, সেটাই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেখানে অতিসস্তা কাঠের তৈরি কফিনে মৃত মানুষকে সমাহিত করা হয়। সেখানে কফিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ছাতিম গাছের কাঠ। আদ্রিয়ানা ভ্রু কুঁচকে বললো – ছাতিম গাছ? মারিও হেসে বললো, ওই তো আমাদের ‘এলস্টনিয়া স্কলারিস’। স্কলারিস শব্দটির সঙ্গে বিদ্যা অর্থাৎ লেখাপড়ার যোগ আছে। এ-ধরনের নামকরণের কারণ ছাতিমের নরম কাঠ থেকে পেনসিল ও সেøট তৈরি হয়। মারিও এবার গল্প থামিয়ে বললো, দেখ তো আদ্রিয়ানা সময় কত হলো। দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে বোধহয়। আদ্রিয়ানা ঘড়ি দেখে বললো, সন্ধ্যা সাতটা।

– দোকানপাট বন্ধ করে এবার বাড়ি ফেরা যাক তাহলে।

আদ্রিয়ানা পিয়েরোর দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করলো দোকানের  ভেতরের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে-গাছিয়ে দোকান বন্ধ করতে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে জনৈক এক খদ্দের প্রবেশ করলো দোকানে। সেই খদ্দের মারিও দিনিকে উদ্দেশ করে বললেন, ইস্কুজামি – অনুগ্রহ করে আমায় ক্ষমা করবেন। আপনারা বোধহয় দোকান বন্ধ করছিলেন কিন্তু আমার একটি কফিন প্রয়োজন। মারিও দিনি বললো, সে তো বুঝলাম কিন্তু কী ধরনের কফিন চাই আপনার। সস্তা, নাকি দামি কাঠের। জনৈক সেই ক্রেতা বললেন, সস্তাও নয় আবার বেশি দামিও নয়; মোটামুটি গোছের একটা হলেই চলবে। মারিও কফিন ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললো, পাইন কাঠের কফিনগুলো সবচেয়ে সস্তা। ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে চারশো ইউরো। ওক কাঠ আরেকটু দামি, ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে ছয়শো ইউরো। চেরি কাঠের কফিনের দাম এক হাজার। মেহগনি কাঠের দাম …। আগন্তুক মারিওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার অত দামি কাঠের কফিন প্রয়োজন নেই। ওক কাঠের একটা হলেই চলবে। আদ্রিয়ানা বসেছিল একটু দূরে। সে একটি 888sport app download apk ভাজতে লাগলো গুনগুন করে।

একদা চমৎকার একটি পিতৃভূমি ছিল আমার নিজের

ওক বৃক্ষের সারি, আমি যতদূর মনে করতে পারি ॥

লম্বা হয়ে জন্মাতো সেখানে, এবং

ফুটতো মিষ্টি ভায়োলেট ফুলগুলো

এটা আমার স্বপ্ন, হয়তো।

পিয়েরো অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, এটা কার 888sport app download apk? আদ্রিয়ানা ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি তুলে বললো, বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের। ক্রেতা লোকটা ওক কাঠের কফিনের কথা বললো বলে 888sport app download apkটির কথা মনে পড়লো।

মারিওকে উদ্দেশ করে ক্রেতা বললো, শুনুন আমার মা খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। ডাক্তার আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, যে-কোনো সময় তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে। সেজন্যই কফিনটা তৈরির ফরমাশ দিতে এলাম।

মারিও আশ্বস্তের সুরে বললো, আপনাকে ফরমাশ দিতে হবে কেন? ওক কাঠের কফিন আমাদের দোকানের পেছনে যে-পণ্যাগারটি আছে ওখানেই তো আছে বেশ কয়েকটা। আপনি পছন্দ করে নিয়ে নিন না যেটা আপনার পছন্দ।

আগন্তুক বললো, আপনার তৈরি করা কফিন তো আমি নিতে পারবো না। মারিও দিনি আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললো, কেন? সমস্যা কোথায়?

– আমি যে-কফিনটা নিতে চাচ্ছি সেটাতে কোনো ধাতব বস্তু থাকা চলবে না। এই যেমন ধরুন লোহার হাতল কিংবা পেরেক ইত্যাদি। মারিও ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললো, কিছু মনে করবেন না, আপনি কি ইহুদি?

– কী করে বুঝলেন?

– কী যে বলেন। এতদিন ধরে কফিনের ব্যবসা করছি। আপনিই বুঝি প্রথম ইহুদি যে কি না আমার দোকান থেকে কফিন নিচ্ছে। আপনার আগেও বহু ইহুদি আমার কাছ থেকে কফিন নিয়েছে। আপনার কফিন তো তাহলে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কোনো ধাতব বস্তু না থাকে। কফিনের হাতলগুলোও তৈরি করতে হবে কাঠ দিয়ে। আর লোহার পেরেকের বদলে ব্যবহার করতে হবে কাঠের গোঁজ। তাই তো?

– হ্যাঁ। আপনি ঠিক-ই ধরেছেন। তবে আগামীকালের মধ্যেই যদি কফিনটা তৈরি করা যায় তাহলে উপকৃত হই। বলা তো যায় না কখন …।

– আপনি কফিনের দামটা অ্যাডভান্স করে যান। আমি চেষ্টা করব কাল না হয় পরশু আপনি কফিন অবশ্যই পেয়ে যাবেন।

আগন্তুক কফিনের টাকা অগ্রিম জমা করে চলে যেতেই আদ্রিয়ানা তার বাবাকে উদ্দেশ করে বললো, ইহুদিদের কফিনে ধাতব বস্তু ব্যবহার নিষেধ কেন বাবা?

– তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। তবে ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সৎকারের জন্য খুবই সাধারণ জিনিস ব্যবহার করে। ধনী, গরিব, উঁচু-নিচু সব মানুষের জন্য একই ধরনের সাধারণ শবাচ্ছাদন বস্ত্র ব্যবহৃত হয়। তবে আমার কাছে অবাক লাগে, যখন দেখি খ্রিষ্টান ধর্মের কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও তাদের জেল্লা-জৌলুস দেখাতে কুণ্ঠা বোধ করে না। তাদের কফিনগুলো তৈরি হয় অনেক মূল্যবান কাঠ কিংবা ধাতু দিয়ে। পারলে তো অনেকে হীরে-জহরত দিয়েই তাদের কফিনগুলো তৈরি করে। তোমরা শুনে অবাক হবে যে, সেই ১৯৬২ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি কেনেডির কফিন কেনা হয়েছিল চার হাজার ডলার দিয়ে। এখনকার মূল্যমানে যা চার লাখ ইউরোর সমান। ভাবা যায়! তবে হিন্দুধর্মের মধ্যেও এই ধরনের প্রথা কিছুটা বিদ্যমান। আমি বোধহয় খবরেই দেখেছিলাম নাকি পত্রিকায় পড়েছিলাম মনে নেই, ১৯৮৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে যখন শিখ আততায়ীরা হত্যা করে, তাঁর

শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তাঁকে পোড়ানো হয়েছিল অতি উচ্চমূল্যের সুগন্ধি চন্দন কাঠ দিয়ে। কথা শেষ করে মারিও বললো – ও মাই গড। সাতটা পেরিয়ে গেছে সেই কখন, চলো চলো এবার ওঠা যাক।

তিন

সকালের দিকে কফিনের দোকানটি সবে খোলা হয়েছে। মারিও, আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এমন সময় হুড়মুড় করে দোকানে প্রবেশ করে লুকা। লুকাকে দেখেই আদ্রিয়ানা বলে উঠলো, আরে লুকা যে। এত সকাল সকাল দোকানে এসে হাজির হলে। জরুরি কিছু? আমাদের তো আজ সন্ধ্যার পরে দেখা হওয়ার কথা ছিল, ইস্ট্রাত্তস ক্যাফেতে। লুকা আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, খবর শুনেছো কিছু। ইতালিতে তো করোনার অবস্থা ভয়াবহ! মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যে আক্রান্তের 888sport free bet দশ হাজার। এর মধ্যে আমাদের এই লোম্বার্দিয়া প্রদেশে আট হাজার আক্রান্ত। গতকাল পর্যন্ত শুধু ক্রেমা শহরেই মারা গেছে শখানেক। পার্শ্ববর্তী শহর লোদি, ব্রেসিয়া ক্রোমোনিয়া, মিলান প্রভৃতি মিলে মৃতের 888sport free bet পাঁচ শতাধিক। কী যে হচ্ছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সরকার লকডাউনের আদেশ করলো অথচ শহরের মেয়র তাতে রাজি হলো না। এখন দেখো তো কী অবস্থা!

মারিও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো, লুকা তুমি ঠিকই বলেছো। চীন দেশের করোনা এখানেও যে এভাবে ছড়িয়ে পড়বে আমরা তো কেউ কল্পনাই করতে পারিনি। লোকজন তো সব মিলানোর সানছিরো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নশিপ লিগকেই এর জন্য দায়ী করছে। সরকার তো লকডাউনের আদেশ দিয়েছিল কিন্তু মিলানোর মেয়র সে-আদেশ উপেক্ষা করে কীভাবে ফুটবল খেলার অনুমতি দিলো? এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ কীভাবে হয়। আদ্রিয়ানা বললো, যেখানে চীনে করোনার ভয়াবহ চিত্র আমরা রোজ দেখতে পাচ্ছিলাম, সেখানে আমাদের কিন্তু বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। লুকা চুকচুক করে বললো, এখন কী যে হবে ঈশ্বরই জানেন। পিয়েরো লুকাকে উদ্দেশ করে বললো, আচ্ছা লুকা, ক্রেমা শহরে লোক মারা গেছে শখানেক? কিন্তু আমরা তো কফিন তৈরির ফরমাশ পেলাম মাত্র দশখানার। বাকি নব্বইটা কফিন কে সাপ্লাই দিচ্ছে? আদ্রিয়ানা ধমক দিয়ে পিয়েরোকে থামিয়ে দিলো, কী বলছো পিয়েরো এসব! এই শহরে কি কফিনের দোকান আর নেই। লুকাও বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে পিয়েরোর দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আদ্রিয়ানা লুকাকে লক্ষ করে বললো, চলো নদীর ধারটায় একটু হেঁটে আসি দুজন। দুপুরে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ সেরে তারপর যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে দুজন পৌঁছে যায় সেরিনা নদীর তীরঘেঁষে বৃক্ষঘেরা ছায়াচ্ছন্ন অরণ্যে। বার্চ গাছের নিচে দুজন জুত করে বসে পা-দুটো এলিয়ে দিয়ে। লুকা আলতো করে আদ্রিয়ানার হাতের আঙুলগুলো স্পর্শ করে। চোখ দিয়ে ইশারা করে ঠোঁট দিয়ে তার ঠোঁটে উষ্ণ স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বললো, দেখতে পাচ্ছো না এখন করোনা কাল চলছে। এসব নিষিদ্ধ এখন। দূরে গিয়ে বসো। ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখো। চুম্বনের মাদকতার অন্তরালে আদ্রিয়ানা যেন স্পষ্ট শুনতে পায় মৃত্যুর বিদ্রƒপাত্মক হাসি। প্রিয়তমের আদিম আহ্বানে তার সামনে ভেসে ওঠে রক্তমাংসহীন কংকালসার মৃত্যুমুখের দৃশ্য। লুকা আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে বললো, আমার কি করোনা হয়েছে নাকি যে দূরে গিয়ে বসতে হবে! আচ্ছা তোমার হাতে ওটা কী বই? আদ্রিয়ানা সহাস্যে বলল, দান্তের ডিভাইন কমেডি।

– সপ্তাহখানেক ধরে দেখছি তুমি এই বইটাই পড়ছো। ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো।

– ব্যাপার আবার কী? অনেকদিন আগে পড়েছিলাম একবার। এখন আবার নতুন করে পড়ছি। এটা তো বারবার পড়ার মতোই বই। তাই নয় কি?

– হ্যাঁ, সে তো ঠিক আছে। আমি নিজেও পড়েছি একবার কিন্তু এটা তো চিরায়ত 888sport live football, ক্ল্যাসিক, পাঁচশো বছর আগের লেখা কাব্য, আধুনিক 888sport live footballের বইটই তোমার কিছু পড়া উচিত। তুমি আলবার্তো মোরাভিয়া পড়েছো?

– পড়েছি, কেন পড়ব না। তুমি ভুলে যাচ্ছো যে আমি 888sport live footballের ছাত্রী। আমার তো ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্যই ছিল মোরাভিয়া। তবে ওঁর লেখায় যৌনচিত্র বড্ড বেশি। লুকা কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ করে বললো, কী বলছো এসব! মোরাভিয়ার রচনায় যৌনচিত্রের আধিক্য থাকলেও এটাই তাঁর একমাত্র অবলম্বন নয়। তাঁর রচনার প্রধান গুণ গল্প বলার সাবলীল ভঙ্গি। ভাষা সংযত ও সরল। আঙ্গিক খোঁজার নাম করে ভাষার কান মুচড়ে সেটাকে অস্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করেননি মোরাভিয়া। এজন্যই গল্পপিপাসু পাঠকদের কাছে ওঁর লেখা এতটা প্রিয়।

– দান্তের কাব্য প্রকাশের রীতিও তো সাবলীল। বিশেষ করে দান্তের সচ্ছল ও সংযত ভাষা পাঠকদের প্রথম থেকেই আকৃষ্ট করে রাখে। লুকা তুমি শুনে অবাক হবে যে, দান্তের ডিভাইন কমেডিতে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান 888sport live footballিক ও দার্শনিকরা যেমন এসেছেন, ঠিক তেমনি দান্তের পরলোক ভাবনার সঙ্গে ভারতীয় দর্শন ও পুরাণের ভাবনার কিছু কিছু মিল পাওয়া যায়। মহাভারতে যুধিষ্ঠির যে নরক দেখেছেন সেসব বর্ণনার সঙ্গে দান্তের নরকের সাদৃশ্য দেখা যায়।

– এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। আদ্রিয়ানা তুমি জানো কি না জানি না। গে্যঁটে, নিটশে, শোপেনহাওয়ার প্রমুখ মনীষী ভারতীয় চিন্তাধারা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। শোপেনহাওয়ার তো বেশ জোর দিয়েই বলেছেন যে, ভারতীয় দর্শনের এক পৃষ্ঠায় যতটা সারবস্তু পাওয়া যায়, কান্টের দশখানা দর্শনের বইয়ের মধ্যেও তা নেই। তাছাড়া তুমি নিশ্চয়ই জানো চারজন বিদেশি লেখক ভারতবর্ষ নিয়ে লিখে নোবেল পেয়েছেন। কিপলিং, কার্ল গেলেরুপের, টমাস মান ও হেরমান হেসে।

– তাই নাকি? দারুণ তো! আচ্ছা লুকা তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো বলো তো। ধরো আমি দান্তের প্রেমিকা বিয়াত্রিচ আর তুমি দান্তে। আমাদের যদি বিয়ে না হয়। তুমি কি পারবে আমার কথা ভেবে ভেবে সমস্ত জীবন পার করতে? তোমার সমস্ত কাব্য-888sport app download apkয় থাকবো শুধু আমি।

– কী বলছো এসব আবোল-তাবোল। আমি কীভাবে দান্তে হবো। আমি তো কিছু লিখতেই জানি না। কোথায় মহামানব দান্তে আর কোথায় এই আমি চুনোপুঁটি লুকা।

– একটিবার ভেবে দেখো লুকা, দুজনের মধ্যে কী দুর্দান্ত ভালোবাসা। কী অসামান্য প্রেম। দান্তে বিয়াত্রিচকে জীবনে শুধু দুবার দেখেছিলেন। একবার নয় বছর বয়সে, আরেকবার আঠারো বছর বয়সে। অথচ জীবনে কখনো বিয়াত্রিচকে ভুলতে পারেননি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ভিটানোভার কাহিনি তো মূলত দান্তের নিজেরই জীবনের কথা। এ-কাব্যে তিনি বর্ণনা করেছেন কেমন করে বালক বয়সে বিয়াত্রিচ নামে এক ফুটফুটে পরীর মতো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, কীভাবে তিনি অলক্ষ্যে ও অজান্তে বিয়াত্রিচকে ভালোবেসেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কি জানো লুকা – দান্তের সেই ভালোবাসার মধ্যে কামজলিপ্সা ছিল না একবিন্দু।

লুকা অট্টহাসি হেসে বললো, আমি বিশ্বাস করি না এসব গালগল্প। শারীরিক আকর্ষণই তো প্রেমের চালিকাশক্তি। – সবাই কি তোমার মতো। দেহ? সে তো মনের ইশারাতেই চলে। বাতাস ছাড়া যেমন গাছের পাতা নড়ে না। ঠিক তেমনি মন না চাইলে শরীরও জাগে না।

– আমি পৃথিবীর সবার মতো। আমি তোমার এসব কথা মানি না।

– লুকা তুমি বিশ্বাস করো বা না করো এটাই সত্যি। পৃথিবীতে দু-একজন ব্যতিক্রমও হয়। আমি বিশ্বাস করি দেহাতীত, ইন্দ্রিয়াতীত, কামগন্ধহীন সেই অপূর্ব প্রেমের মাধুর্যে নিশ্চয়ই নিষিক্ত হয়ে উঠতো দান্তের মন। এই গোপন প্রেমের অনুভূতিকে সম্বল করেই দান্তে শুরু করেছিলেন তাঁর কাব্যসাধনা। বাস্তব বিদায় নিয়ে বিয়াত্রিচ এবার দৃঢ়ভাবে আসন গেড়ে বসলো তাঁর হৃদয়বেদিতে। বিয়াত্রিচ গৌরবান্বিত হলেন দান্তের লেখায়। একটি বিষয় লক্ষ করেছো লুকা?

– কোন বিষয়ের কথা বলছো! খুলে না বললে বুঝবো কীভাবে?

– ওই যে ডিভাইন কমেডি কাব্যে দান্তে কী দারুণ মহিমায় সম্মানিত করেছেন বিয়াত্রিচকে। শুদ্ধলোক থেকে স্বর্গে ঢোকার প্রবেশমুখে দান্তে কবি ভার্জিলকে ফিরিয়ে দিলেন। এবার সঙ্গী হলেন তাঁর আরাধ্য মানস প্রণয়িনী বিয়াত্রিচ। বিয়াত্রিচ দান্তেকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন, এখন আপনি অমৃতলোকে উপস্থিত হয়েছেন। বিশুদ্ধ আত্মা যখন ঈশ্বর দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়, তখনই কেবল এখানে আসা সম্ভব। দান্তের কল্পিত ও বর্ণিত স্বর্গ কিন্তু মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যায় ও ধর্মতত্ত্বে নির্দেশিত স্বর্গলোকের কথাই 888sport app download for android করিয়ে দেয়। মধ্যযুগে ধারণা করা হতো, চন্দ্রসহ নয়টি গ্রহলোকের ঊর্ধ্বে স্বর্গলোক অবস্থিত। বিয়াত্রিচ দান্তেকে সঙ্গে করে প্রথমেই দুজনে এসে উপস্থিত হলেন চন্দ্রগ্রহে। এর অধিপতি চন্দ্র। বিয়াত্রিচ   তাঁর    প্রজ্ঞাময়        আলোচনার  মাধ্যমে দান্তেকে বোঝালেন চন্দ্র ও নক্ষত্রের অতীন্দ্রিয় রহস্যের কথা। ঈশ্বরের করুণালাভে যাঁরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছেন তাঁদের কয়েকজনকে দেখা গেল স্বর্গের এ-স্তরে। এরপর বুধরাজ্যে …। এভাবে নয়টি স্তরের সবগুলোতেই সঙ্গী হলেন বিয়াত্রিচ। জানো লুকা, একলোক থেকে অন্যলোকে যেতে যেতে বিয়াত্রিচের ঐশী সৌন্দর্যও ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে লাগলো।

লুকা অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললো, তোমার এসব প্রেমজাতীয় লেকচার অন্য একদিন শুনবো। দুপুর হয়ে গেছে, ক্ষুধায় পেট

চো-চো করছে। লাঞ্চ যদি করাতে চাও তো চলো, না হয় আমি চললাম।

আদ্রিয়ানা ফিক করে হেসে বললো, আমি জানি তুমি ক্ষুধা সহ্য করতে পারো না। ঈশ্বর যদি তোমাকে এখন স্বর্গেও পাঠাতে চায় তুমি রাজি হবে না। তুমি অমøানবদনে বলবে, আগে লাঞ্চ সেরে নিই তারপর যাবো।

দুজনই একসঙ্গে হেসে উঠলো, তারপর রওনা হলো দোকানের দিকে।

চার

করোনা ভাইরাসটি যে এমন মহামড়ক হিসেবে আবির্ভূত হবে সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। এযাবৎ মৃতের 888sport free bet পনেরো হাজার ছাড়িয়েছে। তার মধ্যে এই লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের অবস্থাই সবচেয়ে বেশি করুণ। এখানেই মারা গেছে প্রায় হাজারদশেক মানুষ। সর্বনাশা দুর্যোগটি যে এভাবে হানা দেবে সেটা চিন্তারও অতীত। এমন দুর্দৈব মহামারি ইতালির মানুষ কেন, পৃথিবীর মানুষও নিকট অতীতে দেখেনি। ‘আলতিমো সেলুট্যো’ নামক এই দোকানটির এমন রমরমা অবস্থা যে, ভাবাই যায় না। দিনে এক থেকে দুশো কফিন সাপ্লাই দিয়েও কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। চাহিদা আসছে আরো বেশি বেশি কফিনের। আরো দুজন নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে মারিও দিনি। এদের মধ্যে আন্দ্রেয়া পিতো, পেশায় ছুতার। সে কাঠের কাজকর্ম মোটামুটি ভালোই জানে। কিন্তু মার্কো ছেলেটি বয়সেও তরুণ, কাজেরও পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সুবিধা একটাই, তাকে দিয়ে মাল ডেলিভারির কাজটা ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায়। দোকানের সবাই এখন ভীষণ ব্যস্ত। অনিবার্যভাবে সবাইকে মুখে মাস্ক পরতে হয়েছে, হাতে গ্লাভস। দেখে মনে হয় যেন এটা কফিনের দোকান নয় বরং হাসপাতাল। দুপুরের দিকে সবাই যখন আহারে ব্যস্ত। আদ্রিয়ানা লক্ষ করল মার্কো কিছুই খাচ্ছে না। সে চিবুকে হাত রেখে কী যেন ভাবছে। আদ্রিয়ানা অনুসন্ধিৎসু কণ্ঠে মার্কোকে বলল, কী ভায়া, তুমি কিছু খাচ্ছো না যে? কী এত ভাবছ? মার্কো দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললো, চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে। ভাবছি আমিও কি আক্রান্ত হতে পারি না করোনায়? আদ্রিয়ানা বললো, আরে এত চিন্তার কী আছে। তুমি বয়সে তরুণ। করোনায় তো বয়স্ক লোকজনই মারা যাচ্ছে বেশি। তাছাড়া ঈশ্বর যদি তোমার মৃত্যু এভাবে লিখে রাখে সেটা কেউ তো আর খণ্ডাতে পারবে না।

মারিও দিনি বড় প্লেটভর্তি এক প্লেট স্প্যাগেটি নিয়ে বসেছে। সে মার্কোকে বললো, বৎস, তোমার বয়স অনেক কম। করোনা তোমাকে আক্রান্ত করবে না। করোনার কিন্তু আমার মতো বৃদ্ধলোক পছন্দ। সে হিসেবে তোমাদের সকলের মধ্যে মৃত্যুর সারিতে আমিই প্রথম। আদ্রিয়ানা খাওয়া থামিয়ে বললো, তুমি থামবে বাবা, এমন অলক্ষুণে কথা তোমার মুখ দিয়ে কীভাবে বেরোয় বুঝি না আমি। মার্কো আদ্রিয়ানাকে বললো, আচ্ছা আদ্রিয়ানা, দু-একদিন ধরে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ভাবছিলাম। আদ্রিয়ানা বললো, বলো কী জানতে চাও? মার্কো বললো, আচ্ছা দোকানের পেছন দিকটায় আপনাদের যে মালগুদাম ঘরটা আছে ওখানে গিটারসদৃশ কাঠের বড় একটি বাক্স দেখলাম। ওটা কী জিনিস? আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বললো – ওরে পাগল, ওটা বাক্স নয় গিটার কফিন।

– গিটার কফিন? এ আবার কী জিনিস?

– ক্রেমা শহরের এক 888sport live chatীর ভ্রাতা এই গিটার কফিনটার ফরমাশ করে গেছে। দু-চারদিনের মধ্যেই হয়তো নিয়ে যাবে। ওই 888sport live chatীর মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করা হবে এই গিটার কফিনে।

মার্কো সাগ্রহে বললো, এমন অদ্ভুত জিনিস আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মারিও দিনি থালার শেষ স্প্যাগেটিটুকু মুখে তুলে চিবুতে চিবুতে বললো, দেখো বাছা, তোমার বয়স অল্প। এখনো অনেককিছু দেখার বাকি। আমি বছর কুড়ি আগে একবার গিয়েছিলাম আফ্রিকার দেশ ঘানায়। সেখানে দেখলাম এক অদ্ভুত জিনিস। যে ব্যক্তি গান করে অর্থাৎ গায়ক বা 888sport live chatী যাই বলো না কেন, সে-লোকটিকে সমাহিত করা হচ্ছে কাঠের তৈরি গিটার কিংবা মাইক্রোফোনের মতো কফিনে। আবার যে-লোকটা হয়তো মদের দোকানে কাজ করতো তার জন্য মদের বোতলসদৃশ কফিন। যে ব্যক্তিটি গাড়ি ব্যবসায়ী তাকে কবর দেওয়া হচ্ছে গাড়ি আকৃতির কফিনে।

এভাবে যে যে-ব্যবসা কিংবা পেশায় যুক্ত তার জন্য হুবহু সে-ধরনের কফিন। বন্দুক ব্যবসায়ীর জন্য বন্দুক কফিন। ক্যামেরাম্যানের জন্য ক্যামেরা কফিন। ব্যক্তিজীবনে হয়তো যে-মানুষটি ছিল প্রচণ্ড রাগী ও বদমেজাজি তার জন্য লাল টুকটুকে মরিচ কফিন। ঘানায় এসব দেখে আমার মাথায় হঠাৎ একটি ব্যবসায়িক বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলাম লোম্বার্দিয়া অঞ্চলেও কি এ-ধরনের সংস্কৃতি চালু করা যায় না? তাহলে তো বেশ ভালোই হয়। তারপর যখন এ-ধরনের কফিন বানানো শুরু করলাম, বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, মানুষের মধ্যে এ-ধরনের কফিনের চাহিদা অসামান্য। তো বিশ বছর আগে যে-প্রথা চালু করেছিলাম আজ সেটা ফুলেফেঁপে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। শুধু লোম্বার্দিয়াতেই নয়, ইতালির সমস্ত উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আমার চালু করা এই সংস্কৃতি। এবার বুঝেছো?

মারিও যখন মার্কোকে এসব বোঝাচ্ছিল, তখন দোকানে এসে ঢুকলো বয়স্কমতো এক খদ্দের। বুওন পমেরিজ্জো – শুভ অপরাহ্ণ। মারিও ওই ভদ্রলোকের শুভাশিসের উত্তরে বললো, বুওন পমেরিজ্জো – শুভ অপরাহ্ণ। খদ্দের বেচারা লকডাউনের কারণে হয়তো অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন। ঈষৎ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমার একটি কফিন প্রয়োজন। তবে কফিনটি তৈরি করতে হবে ইয়ুবৃক্ষের কাঠ দিয়ে। মারিও বিস্ফারিত নেত্রে বললো – ইয়ুকাঠ? সে তো বেশ খরচার জিনিস। ইয়ুকাঠের কফিন বানাতে কিন্তু দাম পড়বে অনেক। কম করে হলেও দু-হাজার ইউরো। মারিও লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো, হঠাৎ ইয়ুকাঠের কফিন চাচ্ছেন কেন? হাজারখানেক ইউরোর মধ্যেই তো ভালো কফিন পাচ্ছেন।

আগন্তুক খদ্দের বললেন, আসলে হয়েছে কী জানেন, আমার বাবা হচ্ছেন একটি চার্চের পাদ্রি। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ। তার জীবনের শেষ ইচ্ছা তাকে যেন ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয়। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ইয়ুকাঠ কতটা পবিত্র। মারিও নির্লিপ্তভাবে বললো, সে তো জানি কিন্তু প্রথমত, ইয়ুকাঠ জোগাড় করা খুব কষ্টসাধ্য হবে এ মুহূর্তে। আর দ্বিতীয়ত, দেখছেন তো চারদিকে কী অবস্থা! আমরা গড়ে দেড়-দুশো কফিন সরবরাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছি। আপনার চাহিদামাফিক এ-ধরনের কফিন তৈরি করা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আগন্তুক ক্রেতা বললেন, সে আপনি সময় নিন না দু-এক সপ্তাহ। কিন্তু কফিনটার দাম আমার কাছে একটু বেশি মনে হচ্ছে। মাসচারেক আগে আমি অন্য আরেকটি দোকানে খোঁজখবর নিয়েছিলাম। ওরা আমাকে ধারণা দিয়েছিল যে, পনেরশো ইউরোর মতো দাম পড়বে কফিনটার। মারিও বললো, সে আপনি ঠিকই বলেছেন। চার মাস পূর্বে আমিও হয়তো আপনাকে ওই মূল্যেই দিতে পারতাম। কিন্তু আপনারও তো নিশ্চয়ই জানা আছে দু-মাস আগে সপ্তাহব্যাপী ১৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়বৃষ্টিতে এক কোটি চল্লিশ লাখ গাছ ধ্বংস হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার এনটিনো, ভেনেতো ও লোম্বার্দিয়া এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ঝড়ে। ঝড়ে আল্পস এলাকায় পাইন, রেড ওক, ইয়ু প্রভৃতি বৃক্ষ দেশলাইয়ের কাঠির মতো সারি ধরে ভেঙে পড়েছে। সেজন্য এখন কাঠের ভীষণ অভাব।

টাকা-পয়সার ঘাটতি থাকলে আপনি অন্য একটি কাজও কিন্তু করতে পারেন। সাধারণ কফিনের ভেতর ইয়ুগাছের ডালপালা ভরে দিয়েও তাকে সমাধিস্থ করা যেতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফজিলত কিন্তু সেই একই। আমি অনেককেই দেখেছি এমন করতে।

খদ্দের মাথা নেড়ে বললেন, আমার বাবা আমাকে লালনপালন করেছেন। আমাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন। আমি যে করেই হোক বাবার শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে চাই। হোক দাম দু-হাজার ইউরো। আপনি কবে নাগাদ ডেলিভারি দিতে পারবেন সেটা বলুন? মারিও বললো, আচ্ছা তাহলে এক হাজার ইউরো অ্যাডভান্স করে যান, বাকিটা ডেলিভারির সময় দেবেন। সময় লাগবে কিন্তু কুড়ি দিনের মতো।

আগন্তুক পকেট থেকে টাকা বের করে মারিওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, কফিনের ভেতরের বিছানা যেন নরম ও আরামদায়ক হয়। আর ভেতরের কাপড়টা হওয়া চাই কিন্তু টার্কিশ সিল্ক।

মারিও টাকা গুনতে গুনতে বললো, সে আপনি ভাববেন না। সবকিছু আপনার রুচি ও পছন্দ মাফিকই হবে। খদ্দের মারিওকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে প্রস্থান করতেই মার্কো ছেলেটা মারিওকে বললো, আচ্ছা মারিও, ইয়ুকাঠের মাহাত্ম্যটা তো বুঝলাম না। মার্কোর কাঁচা বয়স বলেই হয়তো সবকিছুতে তার আগ্রহ প্রবল। মারিও বললো – দেখো বাছা, সারাবছর ধরে সবুজ থাকে এমন একটি দেবদারু জাতের গাছ হচ্ছে এই ইয়ু। যেটি হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। অনেকেই এই গাছটিতে পুনর্জন্ম এবং অনন্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেন। এর কারণ, এই গাছের ভেঙে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ডালপালা থেকে নতুন গাছের জন্ম হতে পারে। এমনকি পুরনো গাছের গুঁড়ির ভেতর থেকেও নতুন একটি ইয়ুগাছের জন্ম হতে পারে। তাই অনেকে একে পুনর্জন্মের উদাহরণ হিসেবেও মনে করেন। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইয়ু একটি প্রতীকী গাছ। মারা যাওয়া স্বজনদের ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয় কিংবা ইয়ুগাছের অঙ্কুর দেওয়া হয় কফিনের ভেতর। অনেক চার্চের পাশে এই গাছটি দেখা যায়। তবে খ্রিষ্টান ধর্মেরও বহু পূর্ব থেকে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী এই গাছটিকে পূজা করে আসছে। তারা তাদের প্রার্থনার স্থান নির্বাচন করতো ইয়ুগাছের নিচে। মার্কোকে উদ্দেশ করে মারিও বললো, এবার বুঝেছো বৎস ইয়ুকাঠের মাহাত্ম্য। মার্কো মাথা নেড়ে বললো – হুম, বুঝেছি।

আদ্রিয়ানার দিকে তাকিয়ে মারিও বললো, তোকে আমার মনের একটা কথা বলি আদ্রিয়ানা। ঈশ্বর যদি আমাকে অনেক ধনী করতেন, তবে আমি আমার মরদেহকে কবর দিতে দিতাম না। লেনিন, মাও সে তুং এবং হো চি মিনদের মরদেহ যেভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে, আমার দেহটিকেও সেভাবে সংরক্ষিত করতাম। আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো, ওঁদের মরদেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে বাবা? মারিও বললো, তোরা এত এত লেখাপড়া করেছিস আর এসব তথ্য তোদের কাছে নেই? ওঁদের মরদেহগুলোকে মমি করে রাখা হয়েছে গ্লাসের কফিনে। লেনিনেরটা আছে মস্কোর রেড স্কয়ারে, মাও সে তুংয়েরটা চীনের তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে। আর হো চি মিনেরটা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের হো চি মিন জাদুঘরে। প্রতিবছর হাজার হাজার অনুসারী তাদের এই মহান নেতাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়।

আদ্রিয়ানা বললো, কিন্তু বাবা, তুমি তো আর নেতা কিংবা বড় কোনো কেউকেটা নও যে তোমায় মমি করা গ্লাসের কফিন মানুষ লাইন ধরে দেখবে। মারিও সকৌতুকে বললো, কী বলিস? আমি সাধারণ আমজনতা বলেই তো সাধারণ মানুষ আসবে আমাকে দেখতে। বলবে এই দেখো, একজন সাধারণ মানুষ যাকে মমি করে রাখা হয়েছে সুদৃশ্য কাচের কফিনে।

গল্পগুজব চলছিল ভালোই কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বড় একটি ট্রাক দোকানের সামনে এসে হাজির। মারিও শশব্যস্ত হয়ে বললো, ওরে আন্দ্রেয়া, মার্কো, পিয়েরো তোরা সবাই মিলে কফিনগুলো সব ট্রাকে তুলে দে। আর মার্কো তুই যা মালগুলোর সঙ্গে। আমার শরীরটাও বেশি ভালো নেই, জ্বরজ্বর লাগছে। বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।

পাঁচ

সকালের টুকিটাকি কাজকর্ম সেরে চায়ের পেয়ালা হাতে দরজার সামনে পড়ে থাকা পত্রিকাটি হাতে তুলে নেয় আদ্রিয়ানা। পত্রিকার পাতা ওলটাতে গিয়ে তার চোখ পড়ে লাল অক্ষরে লেখা বড় হেডিংটার ওপর – ‘করোনায় মৃতের 888sport free bet বিশ হাজার’। অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানা বলে ওঠে – হায় ঈশ্বর! কী যে হবে! দেশের মানুষগুলো কি সবই মারা যাবে করোনায়! ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে অনেক কিন্তু বাবার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভেজানো দরজাটা ঈষৎ ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে আদ্রিয়ানা। দুদিন ধরে মারিও জ্বরে আক্রান্ত। এরই মধ্যে একেবারে শয্যালগ্ন হয়ে পড়েছে বেচারা।

বিছানায় বসে কপালে হাত দিতেই চমকে ওঠে আদ্রিয়ানা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।  আদ্রিয়ানা বললো, বাবা তোমার তো ভীষণ জ্বর। মারিও গোঙানির মতো শব্দ করে বললো – জ্বর, সে তো আছেই। মাঝরাত থেকে প্রচণ্ড গলাব্যথা। একবার ভাবলাম তোকে ডেকে তুলি। আবার মনে হলো তোকে ডেকেই বা কী লাভ। সকাল থেকে শ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। আদ্রিয়ানা বললো, বাবা শোনো, আর দেরি করা চলে না। তোমাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। আদ্রিয়ানা দ্রুত কল করে একটি অ্যাম্বুলেন্স ডাকলো। তারপর চটপট রেডি হয়ে দু-চারটি জিনিসপত্র ব্যাগে গুঁজে মারিওকে নিয়ে ছুটলো হাসপাতালে।

মনে মনে যা ভেবেছিল আদ্রিয়ানা হয়েছে আসলে সেটাই। ডাক্তার রক্ত ও সিরাম পরীক্ষা করে জানালেন মারিও করোনায় আক্রান্ত। আদ্রিয়ানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। ছোটবেলায় সে মাকে হারিয়েছে, এখন যদি …। তবে তো দুনিয়াতে আপন বলে তার আর কেউ রইবে না। খবর পেয়ে লুকা ছুটে এলো। লুকা আদ্রিয়ানাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ভয়ের কিছু নেই। মাত্র দশ শতাংশ মানুষই মারা যায় এ-রোগে। বাকি লোকজন সব সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরে। চিন্তার কিছু নেই। ভালো করে চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে মারিও। আদ্রিয়ানা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, এমন এক রোগ হলো, যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাবার পাশে বসে যে বাবাকে সেবা-শুশ্রƒষা করে সারিয়ে তুলবো সে-সুযোগও সুদূরপরাহত।

এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল দেখতে দেখতে। অবস্থার উন্নতি কিংবা অবনতি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মূর্তিমতী শোকের মতো কাচের দেয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ নেত্রে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ানা। শৈশব থেকে স্নেহ-ভালোবাসাবঞ্চিত এই মানুষটি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে মেয়ের শোকাচ্ছন্ন মূর্তি দেখে কি একটু হলেও শান্তি পাচ্ছে? কে জানে।

ডাক্তার আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললেন – আশ্চর্য! এমন ভঙ্গুর দেহেও এমন দুর্দমনীয় প্রাণশক্তি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও মারিও নাকি বারবার স্বগতোক্তি করছিল – আমাকে বাঁচতে হবে। যে করেই হোক আমাকে আমার মেয়ের জন্য হলেও বাঁচতে হবে।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

যমে-মানুষে টানাটানি চললো আরো চারদিন। ভেন্টিলেটর দিয়েও বাঁচানো গেল না। সমস্ত প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো মারিও। আদ্রিয়ানা পিয়েরোকে সঙ্গে নিয়ে এলো কফিনের দোকানে। ওয়্যারহাউজে যে-কফিনগুলো তৈরি আছে, সেখান থেকেই যে-কোনো একটা কফিন দ্রুত নিয়ে ফিরে যেতে হবে হাসপাতালে। তারপর মর্গ থেকে শবদেহটা তুলে সমাহিত করা হবে ক্রেমা গোরস্তানে। ডজন-দুয়েক কফিন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মালগুদাম ঘরটায়। হঠাৎ একটি কফিনে চোখ আটকে গেল আদ্রিয়ানার। মেহগনি কাঠের বাদামি কফিন। চকচকে-তকতকে। সুন্দর করে পলিশ করা। আরেকটু কাছে যেতেই চমকে উঠলো সে। দেখা গেল কফিনটার শরীরজুড়ে করোনা ভাইরাসটি কদম ফুলের মতো খোদাই করে ক্রাফ্ট করা। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো জাত888sport live chatী কফিনের প্রতিটি জায়গায় নিপুণ হাতে নকশা কেটেছেন করোনা ভাইরাসের। আশ্চর্য! এই কফিন তো আগে চোখে পড়েনি আদ্রিয়ানার। চোখদুটো কপালে তুলে পিয়েরো বললো, কই আমিও তো দেখিনি এটা আগে। তন্নতন্ন করে রেজিস্টার বই খুঁজেও পাওয়া গেল না এর ফরমাশদাতাকে। তবে কে অর্ডার করেছে এমন একটি কফিন। তাহলে কি বাবাই …। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো দুজনেই বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো অদ্ভুত কফিনটার দিকে।