ইয়াফেস ওসমান
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম ও কাজের সঙ্গে পরিচিত নন, এমন স্থপতি 888sport appsে পাওয়া যাবে না। স্বদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বহু দেশেও তিনি ছিলেন একজন সুপরিচিত নাম। আমরা তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের উঁচু ক্লাসের ছাত্র। ইসলাম সাহেব মাঝে মাঝে ফ্যাকাল্টিতে আসতেন লেকচার দিতে। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ফিলসফিক্যাল ভাষা আমাদের অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য বলে মনে হতো। এমনই একদিনের কথা মনে পড়ছে – ইসলাম সাহেব লেকচার দিতে দিতে হঠাৎ পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, বন্ধু বাবর চৌধুরী অন্যমনস্ক হয়ে পাশের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন। ইসলাম সাহেব বক্তৃতা থামিয়ে বাবরকে উদ্দেশ করে বললেন – ‘কী বাবর সাহেব, কথা মাথায় ঢুকছে না?’ বাবর চৌধুরীর উত্তর ছিল, ‘স্যার, মাথার একটু ওপর দিয়ে যাচ্ছে।’ ইসলাম সাহেব লেকচার বন্ধ করে বললেন – ‘থাক, তাহলে আর নয়।’ যেই কথা সেই কাজ। আসলে তিনি ছিলেন এমন স্বভাবেরই মানুষ।
আমার বাবা, কথা888sport live footballিক শওকত ওসমানের কাছে একটা গল্প শুনেছিলাম। ইসলাম সাহেবের স্ত্রী বেবী চাচি নাকি তাঁদের পারিবারিক বন্ধু তৎকালীন 888sport live football পত্রিকা সমকালের সম্পাদক আবু জাফর শামসুদ্দিন সাহেবকে ফোন করে জানান, ‘ইসলাম সাহেবের জ্বর। বোধহয় ডাক্তার ডাকতে হবে।’ উত্তরে জাফর সাহেব নাকি বলেছিলেন – ‘এমনিতেই গরম, তার ওপর আবার জ্বর, আপনি বরঞ্চ ফায়ার সার্ভিসে খবর দিন।’
ছাত্রাবস্থায় ইসলাম সাহেবের সঙ্গে একটু দূরত্ব বজায় রেখেই চলতাম। যদিও আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে সখ্যের কোনো অভাব ছিল না। আমাদের ফ্যাকাল্টির অনেক ছাত্রই ইসলাম সাহেবের ‘বাস্তুকলাবিদে’ও কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে স্থপতি রবিউল হুসাইন, মরহুম আলমগীর কবির ও সামসুল ওয়ারেসের নাম উল্লেখ্য। শিক্ষকদের দু-চারজনও বাস্তুকলাবিদে পার্টটাইম কাজ করতেন। তৎকালীন ফ্যাকাল্টিতে শিক্ষকদের নিয়ে একটা কথা খুব চালু ছিল। তাঁদের কেউ কেউ নাকি ইসলাম সাহেবের কাছে বকা খেয়ে এসে তা আমাদের ওপর ঝাড়তেন, যার মধ্যে পাঁঠা বলে সম্বোধনটিও বাদ যেত না!
স্বাধীনতার পরের কথা, ততদিনে স্থপতি হয়ে বেরিয়েছি। ১৯৭২ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ডাইরেক্টরেটে ওয়ার্কচার্জ জুনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে জয়েন করেছি। আমরা বলতাম ডব্লিউ সি আর্কিটেক্ট অর্থাৎ ফ্লাশ করলেই আউট।
পাকিস্তান স্থপতি ইনস্টিটিউট বাতিল করে 888sport apps স্থপতি ইনস্টিটিউট গড়তে হবে। ছাত্রজীবনে বুয়েটে ইউকসুর সহ-সভাপতি আবার মুক্তিযোদ্ধা স্থপতি। বোধহয় এ-কারণেই ইসলাম সাহেবের কাছ থেকে ডাক পড়ল। আমরা নতুন ইনস্টিটিউট গড়ে তোলায় মনোযোগী হলাম। ইসলাম সাহেব প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। এভাবেই ইসলাম সাহেবকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার যাত্রা শুরু। পেশার প্রতি তাঁর ছিল অফুরন্ত 888sport apk download apk latest version ও ভালোবাসা। উদয়াস্ত ইনস্টিটিউটের কাজে খাটতেন, একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। অতি স্বল্প সময়েই আমাদের ইনস্টিটিউট (আইএবি) বিশ্বের অনেক আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করে। এসব ক্ষেত্রে ইসলাম সাহেবের ব্যক্তিগত যোগাযোগই ছিল মুখ্য।
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে আমাদের সংসদ ভবনের স্থপতি বিশ্বখ্যাত লুই আই কানের চারটি লেকচারের ব্যবস্থা করা হয় বুয়েটের স্থাপত্য অনুষদে, যাতে ছাত্ররাও উপকৃত হতে পারে। এমনই একটি লেকচার দানকালে স্থপতি লুই আই কান দাঁড়িয়ে বুকে হাত রেখে ইসলাম সাহেবকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘এই অঞ্চলে স্থাপত্যকর্মে যাঁরা বিশেষ অবদান রাখছেন মাজহারুল ইসলাম তাঁদের অন্যতম।’ সেদিন একজন পরিতৃপ্ত মানুষের স্বর শুনেছিলাম ইসলাম সাহেবের কণ্ঠে। তিনি বলেছিলেন, ‘এরপর কে কী বলল তাতে কিছু যায়-আসে না।’ এখানে উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে মাজহারুল ইসলাম সাহেবকে সংসদ ভবন ডিজাইন করার অফার দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু দেশের স্বার্থে তিনি প্রফেসর লুই আই কানকে ডিজাইনের কাজটা পাইয়ে দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পর ইনস্টিটিউটের পূর্ণ চেষ্টা ছিল কীভাবে দেশটিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়। আমাদের স্বপ্ন ছিল, এত রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া দেশটার প্রতিটি ত্রিমাত্রিক স্থাপনাই হবে সুপরিকল্পিত। দিনরাত খেটে আমরা একটা রিপোর্ট তৈরি করি। ফিজিক্যাল প্ল্যানিং মন্ত্রণালয় স্থাপনের স্বার্থে। যেখানে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিগণের চিন্তার ঐকমত্যের ফসল হবে পরিকল্পনার মূল দর্শন। একটি উন্নত সমাজের যা কিছু প্রয়োজন সব হবে সুবিন্যস্ত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সময় নিয়ে পুরো বিষয়টি ইসলাম সাহেব বর্ণনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু আগ্রহ নিয়ে শুনলেন। তারপর তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কীভাবে করা যায় সেটার ব্যবস্থা নিতে। ড. রেহমান সোবহান কয়েকটি মিটিংও করেছিলেন স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে। কিন্তু বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পেরে তৎকালীন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মরহুম প্রকৌশলী ময়নুল হোসেন বাদ সাধলেন। তারপরও আমরা হাল না ছেড়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনা, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। আর এগোনো সম্ভব হয়নি। এই শোকাবহ অন্যায় ঘটনার প্রতিবাদে বাবা 888sport live footballিক শওকত ওসমান, স্থপতি মাজহারুল ইসলামরা দেশান্তরী হলেন। ফলে বেশ কিছুকালের জন্য তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। শুনেছি লন্ডনে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ সভায় ইসলাম সাহেব যোগ দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমিও ’৭৬ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তান আমলের পরিত্যক্ত আর্কিটেকচারাল ফার্ম ‘থারিআনি’ যার নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছিল ‘স্থাপত্য 888sport live chat’, সেই ফার্মে ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করি। ধানমণ্ডি পাঁচ নম্বর সড়কে বাবার বন্ধু জয়নাল আবেদীন চাচার দোতলা বাড়ির একতলায় ছিল আমাদের অফিস। মরহুম স্থপতি আলমগীর কবীর ছিলেন ফার্মের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, যিনি একসময় বাস্তুকলাবিদে কাজ করতেন। সালটা বোধহয় ’৮০-৮১-র প্রথম দিকে হবে। মাজহারুল ইসলাম সাহেব প্রবাসের পালা চুকিয়ে দেশে ফিরলেন। বহুদিন দেশের বাইরে, ‘বাস্তুকলাবিদের‘ কাজকর্মও বন্ধ, নতুন করে কাজ পাওয়ার চেষ্টা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সন্দিহান। একদিন হঠাৎ দেখি ইসলাম সাহেব আমাদের ফার্মে এসে হাজির। অনেকটা সময় কেটে গেল নানান আলাপচারিতায়। আমরা বললাম, আপনি ইচ্ছা করলে এখানে বসেও কাজ করতে পারেন। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। ইসলাম সাহেব প্রতিদিন নিয়মিত অফিসে আসতেন। দুপুরে আমাদের সঙ্গে অফিসে রান্না করা খাবার খেতেন। অফিস সেরে ক্যারম খেলার আসরেও যোগ দিতেন। দেখলাম খোলসে ঢুকে যাওয়া মানুষটা আস্তে আস্তে নিজ রূপে প্রকাশিত হচ্ছেন। হয়তো ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন ছিলেন, আমাদের দুই ফার্ম ‘বাস্তুকলাবিদ’ আর ‘স্থাপত্য 888sport live chat’ মিলিতভাবে 888sport apps মাইন্স অ্যান্ড মিনারেল করপোরেশনের অধীন জয়পুরহাট ‘সিমেন্ট ফ্যাক্টরি টাউনশিপ’ প্রকল্পের কনসালট্যান্সি পেয়ে যায়। প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যান তৈরি হলো। মূলত জ্যামিতিক ফর্ম ধরে। করপোরেশনের ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মরহুম প্রকৌশলী জামিল আহমেদ সাহেব খুবই সরল প্রকৃতির কিন্তু অত্যন্ত পরিশ্রমী লোক ছিলেন। সিদ্ধান্ত দিতে মোটেই সময় নিতেন না। ইসলাম সাহেবকে স্যার বলে সম্বোধন করতেন, যার ফলে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ইসলাম সাহেব প্রতিটি ইউনিটের বেসিক ফর্ম ঠিক করে দিতেন। আমাকে ফাংশন বসিয়ে সলভ করতে হতো। আবার দুজনে বসে ফাইনাল করতাম। আমাকে প্রায়ই জয়পুরহাট যেতে হতো নির্মাণ কাজ সুপারভিশন করার জন্য। মাঝেমধ্যে ইসলাম সাহেবও সঙ্গী হতেন। তখনকার কিছু কিছু ছোট্ট ঘটনা আমার কাছে তাঁর বাহ্যিক রূপ ছাপিয়ে ভেতরের একজন সরল মানুষকে প্রকাশিত করে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, এই প্রকল্পটিই ছিল মাজহারুল ইসলাম সাহেবের জীবনের সর্বশেষ বৃহৎ স্থাপত্য 888sport live chatকর্ম। ‘জয়পুরহাট সিমেন্ট ফ্যাক্টরি টাউনশিপ’ নান্দনিক স্থাপত্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া একটি প্রসিদ্ধ স্থাপত্য 888sport live chatকর্ম।
তখন তো আর বন্ধবন্ধু সেতু হয়নি, আরিচা-নগরবাড়ী ফেরি পার হয়ে কষ্ট করেই জয়পুরহাট যেতে হতো। ইসলাম সাহেব ফেরিতে উঠলে ফেরির লোকজনের সঙ্গে গল্প করে দেশের খবরাখবর নিতে ভালোবাসতেন। একদিন তিনি সারেংকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এখন পানির গভীরতা কেমন, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? সারেংয়ের সোজাসাপটা উত্তর ছিল, বেশ কিছুদিন যাবৎ একই উচ্চতায় আছে ‘অ্যাভেলেবল’। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ইসলাম সাহেব হেসে বললেন, ‘তোমার কথাটা ঠিক হয়নি, ওটা ‘একই লেভেল’। দেখলাম আমরা কেউ হলে ঠাট্টা করে অনেক কথাই শোনাতেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবহার। ভালোই লাগল।
আরেক দিনের কথা, নগরবাড়ী ঘাটের অস্থায়ী খাবারের দোকানগুলোতে টাটকা রকমারি মাছের লোভ কোনোদিনই সামলাতে পারতাম না। তখন আজকের মতো ফরমালিনের ভয়ও ছিল না। প্রতিবারই ভাত-মাছ তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সেবার ইসলাম সাহেব সঙ্গে ছিলেন, তাতে কী – আমি দোকানে ঢুকে ভাত-মাছের অর্ডার দিলাম। একটু পরে দেখি ইসলাম সাহেবও দোকানে ঢুকে আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘যা অবস্থা দেখছি, নির্ঘাত কলেরায় ভোগার ব্যবস্থা করছ।’ আমি বললাম, ‘কিছু হবে না। এটা তো আমার নতুন নয়।’ একটুখানি ভেবে নিয়ে তিনি বয়কে বললেন, ‘পেন্টটা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ভাত দে!’ বুঝতে বাকি ছিল না, চোখে লজ্জা থাকলেও পেটের খিদারই জয় হলো।
আমার খাওয়া শেষ। আমি পন্টুনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফেরি ভিড়তে বেশ কিছুটা সময় দেরি আছে। ওখানে দুটো কুলি ছেলে, ফেরি বাঁধার লোহার পোলের মাথায় ছক এঁকে ষোলো ঘুঁটি বা বাঘবন্দি খেলছে। পন্টুনে সর্বসাকল্যে আমরা তিনটি প্রাণী। একটু পরে ইসলাম সাহেব পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী করছ?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘ওদের খেলা দেখছি।’ তিনি কিছুক্ষণ খেলা দেখে একটা ছেলেকে দেখিয়ে বললেন – ‘এটা একটা পাঁঠা। ওর আইকিউ বলতে কিছু নেই।’ ছেলেটাকে ‘সর’ বলে সরিয়ে দিয়ে, ভেবেচিন্তে ঘুঁটি চাল দিলেন। সর্বনাশ, ওপারের ছেলেটা পরপর দুটো ঘুঁটি খেয়ে বসল। আমি প্রমাদ গুনলাম। ধীরপায়ে পন্টুন ছেড়ে ডাঙায় গিয়ে উঠলাম, ভাবখানা কিছুই দেখিনি।
আমার চোখে ইসলাম সাহেব ছিলেন একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, খাঁটি বাঙালি। একই সঙ্গে সময়ের বিচারেও আধুনিকমনস্ক একজন পারফেকশনিস্ট মানুষ। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তিনি এদেশের সকল স্থপতির কাছে নমস্য ব্যক্তি হিসেবেই বেঁচে থাকবেন। বেঁচে থাকবেন অগণিত গুণগ্রাহীর মাঝে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.