টোকিও থেকে জাপানি ঐতিহ্যের নোহ নাটক

১৩৩৩ সাল থেকে শুরু করে আড়াইশ বছরের কিছু কম সময় ধরে বিস্তৃতকাল জাপানের ইতিহাসে ‘মুরোমাচি-জিদাই’ বা ‘মুরোমাচি যুগ’ নামে পরিচিত। আশিগাকা শোগুন-পরিবার সেই সময় রাজধানী কিয়োতো থেকে দেশের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে সর্বময় কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। আশিগাকা-পরিবার শুরুতে কিয়োতোর যে-জায়গায় তাদের মূল দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে, সেই মুরোমাচি পরগনা থেকে যুগের নামের উৎপত্তি।

জাপানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে চীনের প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ার কাল হিসেবেও এই মুরোমাচি যুগ পরিচিত। বেশকিছু সময়ের বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সে-সময় আবারও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় চী888sport promo codeতির প্রচলনও তখন থেকেই অনেক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, 888sport live chatকলায় এর আগে পর্যন্ত অগ্রবর্তী ধারা হিসেবে বিবেচিত ভাস্কর্যকে স্থানচ্যুত করে দিয়ে চী888sport promo codeতির কালিতে আঁকা ছবির ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা।

মুরোমাচি যুগ অন্যদিকে আবার ছিল গৃহযুদ্ধেরও সময়, উত্তর ও দক্ষিণের প্রভাবশালী সামন্তপ্রভুরা যখন আধিপত্য-বিস্তারের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে যুদ্ধ আর আধিপত্যের লড়াই সত্ত্বেও 888sport live chatকলার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিকাশের কাল হিসেবে এই যুগ চিহ্নিত। জৈন বুদ্ধ ধর্মের সম্প্রসারণের পাশাপাশি হস্ত888sport live chat ও চীনামাটির পাত্রের প্রসার ওই সময় লক্ষ করা যায়। জাপানের ঐতিহ্যবাহী চা-পরিবেশনার আনুষ্ঠানিকতাও এই মুরোমাচি যুগের শেষদিক থেকে শুরু। তবে 888sport live chatকলার ক্ষেত্রে মুরোমাচি যুগের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে নোহ নাটক। মুরোমাচি শোগুন আধিপত্যের শেষ সময় নায়ক আশিগাকা ইয়োশিয়াকিকে কিওতো থেকে বিতাড়িত করে ১৫৬৮ সালে আরেক সমরনায়ক ওদা নোবুনাগার নেতৃত্বে শুরু হয় জাপানের ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত আযুচি-মোমোইয়ামা যুগ। তবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসের বিভিন্ন দিকে মুরোমাচির স্থায়ী ছাপ ততদিনেঅমোচনীয়ভাবে দাগ কেটে যায়, যার অগ্রভাগে আজও পর্যন্ত স্থায়ীভাবে আসনগ্রহণ করে আছে জাপানের ঐতিহ্যবাহী নাট্যকলা – নোহ।

মুরোমাচি যুগে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়কে জাপানে নোহ নাটকের উৎপত্তি আর বিকাশের সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নোহ নাটক যেন জনপ্রিয় 888sport live chatকলায় পরিণত হতে পারে, তা নিশ্চিত করে নিতে নোহ-র ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব তৎকালীন প্রশাসন আরোপ করেছিল। এর কারণ হিসেবে চীনা সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাবে জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতির জনপ্রিয় এক ধারায় হারিয়ে না যাওয়ায় রাষ্ট্রের কর্ণধারদের আগ্রহকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নোহ-র আবির্ভাব ঘটলেও নোহ নাটকের কাহিনীগত মূল উপাদান কিন্তু দশম ও একাদশ শতাব্দীর জাপানি 888sport live footballের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দশম শতাব্দীতে রচিত জাপানের বিখ্যাত দুই 888sport alternative link গেনজি কাহিনী ও ইসসে কাহিনী এবং সেই সঙ্গে একাদশ শতাব্দীর সৃষ্টি হেইকে কাহিনীতে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনার মঞ্চে উপস্থাপনা নোহ নাটকে দেখা যায়। দেশজ ঐতিহ্যের সঙ্গে নাটকের এই গভীর সম্পর্কের কারণেই সম্ভবত মুরোমাচি যুগের শাসকরা নোহকে জাতীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটানো ললিতকলা হিসেবে চিহ্নিত করে এর পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীসময়ে দীর্ঘকাল ধরে নোহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ভোগ করে যাওয়ায় সেই অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়, যদিও এদো যুগে বুনরাকু পুতুল নাচ ও কাবুকি নাটকের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয় জাপানের প্রাচীন এই সাংস্কৃতিক ধারাকে।

কাহিনীর বিন্যাসের দিক থেকে প্রধানত দুই ধরনের নোহ নাটকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। প্রথমত রয়েছে বাস্তব ঘটনাভিত্তিক কাহিনী, জাপানের ইতিহাস হচ্ছে যার মূল উপাদান। দ্বিতীয় বিভাজনে আছে ঐশ্বরিক বিভিন্ন চরিত্রের আবির্ভাবে ঘটনার ধারাকে প্রভাবিত করে যাওয়ার নাটক, বিভিন্ন দেবতা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে মানবজীবনে সুখের দেখা পাওয়ার বর্ণনা যেখানে সাধারণত তুলে ধরা হয়। বাস্তব ঘটনাবলির আলোকে মঞ্চ-উপস্থাপনার নোহ নাটকে বুশি বা বীর যোদ্ধাদের বীরত্ব আর মর্মান্তিক পরিণতির কাহিনীর পাশাপাশি রমণীর অশরীরী উপস্থিতি ও সেই সূত্রে প্রেম আর ভালোবাসার উপাখ্যানও সমানভাবে উপস্থিত। শেষোক্ত এই নোহ নাটকে সংলাপের বাচনভঙ্গি সাধারণত অতীতকালভিত্তিক হয়ে থাকে। 888sport slot gameরত এক পুরোহিত যেমন পথে একবার এক রমণীর আবার সাক্ষাৎ পান, যে তার কাছে বর্ণনা করে যায় নিজের বিরহের করুণ কাহিনী। আবার একসময় শূন্যে মিলিয়ে গেলে পুরোহিত বুঝতে পারেন পুরো দৃশ্যাবলি বাস্তবে নয়, বরং স্বপ্নে তার চোখে ধরা দিয়েছে।

বর্তমানকালের বচনভিত্তিক সংলাপে পরিপূর্ণ আরেক ধরনের নোহ নাটকে রয়েছে সন্তানের সঙ্গে মায়ের বিচ্ছেদ এবং পরবর্তীসময়ে পুনরায় মিলিত হতে পারার বর্ণনা। ইসসে কাহিনীভিত্তিক এ-রকম নাটক হচ্ছে বিচ্ছেদ আর মিলনের উপাখ্যান।

 নোহ নাটককে পাশ্চাত্যের কোনো কোনো 888sport live chat-সমালোচক 888sport live chatের রহস্যময় একটি ধারা হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। অপেক্ষাকৃত ধীরগতির এই মঞ্চনাটকে সবকিছুই ঘটে ভিন্ন একতালে। বর্ণাঢ্য নানারকম পোশাকে মঞ্চে উপস্থিত হওয়া অভিনেতাদের কারো কারো মুখ 888sport app থাকে মুখোশে। কুশীলবদের ছকবাঁধা নিয়ম অনুসরণ করা গতি থেকে শুরু করে মঞ্চের দৃশ্যপট – সবটাই হচ্ছে ধারণার প্রকাশমাত্র, প্রকৃত উপস্থাপনা নয়। প্রচলিত কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে যেসব নাটক মঞ্চে উপস্থিত করা হয়, এমনকি সেখানেও কিন্তু অভিনেতাদের মুখে বলে-যাওয়া সংলাপের মধ্য দিয়ে নয়, বরং সমবেত কণ্ঠে সুরেলা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হয়। দ্রুততার সঙ্গে কোনোকিছু মঞ্চে ঘটে না, সবটাই হচ্ছে ধীরগতির উন্মোচন। গতি কখনো কখনো এতটাই মন্থর হতে পারে যে, অপরিচিত দর্শকদের হয়তো মনে হবে আদৌ কোনোকিছু নাটকে বোধহয় ঘটছে না। অপেক্ষাকৃত জটিল কাব্যিক ভাষায় রচিত নাটকের ধারাবর্ণনা ঢোল আর বাঁশির সুরের তালে আবৃত্তি অথবা সমবেত কণ্ঠে গাওয়া স্তুতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

দর্শক-আসন থেকে কিছুটা উঁচুতে তৈরি তিন দিকে খোলা এক মঞ্চে চলে নোহ নাটকের অভিনয়। জাপানি ভাষায় ‘বুতাই’ নামে পরিচিত সেই মঞ্চ আবার বাঁ-দিক দিয়ে যাওয়া খোলা এক করিডরে ড্রেসিং রুমের সঙ্গে যুক্ত। মঞ্চের একমাত্র বন্ধ দিক পেছনের পর্দায় সাধারণত থাকে পাইন গাছের শাখার ছবি। সাদামাটা সেই মঞ্চসজ্জা অন্যদিকে আবার অভিনেতাদের সাজপোশাক আর চলাচলে এনে দেয় বাড়তি গুরুত্ব। অভিনেতারা শুরুতে ড্রেসিং-রুম থেকে সরাসরি মঞ্চে উপস্থিত না হয়ে সামনের দিকে সংযুক্ত তিনধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি ভেঙে মঞ্চে উঠে আসেন।

ঐতিহ্যগতভাবে নোহ নাটকের সকল অভিনেতা হচ্ছেন পুরুষ। একক কোনো নাটকে সাধারণত প্রধান অভিনেতা ও তার সহকারী, দুজনেই যারা ক্ষেত্রবিশেষে মুখোশ ব্যবহার করেন এবং মুখোশহীন 888sport app একাধিক অভিনেতা থাকেন। দুই অংশে বিভক্ত নাটকের শুরুতে ‘ওয়াকি’ নামে পরিচিত এই শেষোক্ত দলের অভিনেতারা মঞ্চে উপস্থিত হয়ে গানের মধ্য দিয়ে কাহিনীর কাঠামোর বর্ণনা দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন। এরপর মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে প্রধান অভিনেতা ও তার সহকারীর, স্তুতি আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে ঘটনার ধারাকে যারা এগিয়ে নেন। সেই সঙ্গে থাকে নাচ ও সংশ্লিষ্ট 888sport app দেহভঙ্গি।

দ্বিতীয় অংশে প্রধান অভিনেতা আর ওয়াকির মধ্যে চলা কথোপকথন ও সেই সঙ্গে নাচ আর গান নাটকের কাহিনীকে নিয়ে যায় এর চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রধান অভিনেতা ড্রেসিং-রুমের সঙ্গে সংযুক্ত করিডর দিয়ে মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলে ভাঁড় মঞ্চে উঠে এসে সাধারণ ভাষায় বর্ণনা করে যায় নাটকের কাহিনী। সবশেষে ভিন্ন সাজে প্রধান অভিনেতা আবারও মঞ্চে উঠে আসেন এবং দ্রুত তালে নেচে সবশেষে অশরীরী কোনো আবার শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার মতো ধীরগতিতে করিডর দিয়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন।

জাপানে বর্তমানে নোহ নাটকের যে বেশ কয়েকটি ধারার স্কুলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হচ্ছে কানযে স্কুল। কানযে স্কুলের মূল চালিকাশক্তির ভূমিকা এখন যিনি পালন করছেন তিনি হলেন বিখ্যাত নোহ-অভিনেতা ওতোশিগে সাকাই। নোহ-র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও এর সমকালীন অবস্থানের ব্যাখ্যা তিনি কিছুদিন আগে টোকিওতে আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠানে জাপানে অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া সাংবাদিকদের জন্য এর বাইরে অতিরিক্ত পাওনা ছিল নোহ-র কয়েকটি নাটকের অংশবিশেষের অভিনয় দেখা এবং মঞ্চ ও আশেপাশে উপস্থিত থেকে ছবি তোলার সুযোগলাভ করা। ওতোশিগে সাকাই বংশানুক্রমিকভাবে নোহ নাটকের অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পিতাও একসময়ে ছিলেন কানযে স্কুলের গুরু। নিজের দুই পুত্রকেও সাকাই গড়ে তুলেছেন নোহ-র অভিনেতা হিসেবে, পিতার সঙ্গে মঞ্চে নোহ-র অভিনয়ে সেদিন যারা যোগ দিয়েছিল।২০০১ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, 888sport apk ও সংস্কৃতি-সংস্থা ইউনেস্কো জাপানের এই নোহ নাটককে বোধগম্য মানব-ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং গতবছর সেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রচার করা হয়। দূর-অতীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া জাপানের আধুনিক যুগে নোহ অনেকটা অবহেলিত এক সংস্কৃতি-ধারায় পরিণত হয়েছিল। জাপানের সেই সময়ের নেতারা দেশকে পশ্চিমের অগ্রসর রাষ্ট্রের সমতুল্য করে তোলার চেষ্টায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত রকম দৃষ্টিপাত করায় নোহ নাটকের মতো সনাতনী কোনো সংস্কৃতি-ধারার দিকে মনযোগী হওয়ার সময় কিংবা মানসিকতা কোনোটিই তাদের ছিল না। তবে বর্তমানে আবারও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নোহ ধীরে হলেও ফিরে পেতে শুরু করেছে এর ঐতিহ্যগত অবস্থান। জাপানের ললিতকলার একমাত্র শাখা হিসেবে বিশ্ব-ঐতিহ্য-তালিকায় নোহ-র অন্তর্ভুক্তি এর প্রমাণ রাখার পাশাপাশি তাই ওতোশিগে সাকাইয়ের জন্য নিয়ে এসেছে মস্ত এক স্বস্তি।