আবুল আহসান চৌধুরী
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) কত গান রচনা করেছিলেন তার কোনো লেখাজোখা নেই। এ-বিষয়ে একেকজন একেক ধরনের হিসাব দিয়েছেন। অসুস্থতার আগে নজরুলের যেসব গানের বই বেরিয়েছিল তাতে তাঁর রচিত গানের অল্পই সংকলিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরেই তাঁর গানের একত্র-সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ গৃহীত হয় এবং সেই সঙ্গে তাঁর গানের তালিকা প্রস্ত্ততের কাজেও কেউ কেউ হাত দেন।
রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের আদলে কলকাতার হরফ প্রকাশনী থেকে আবদুল আজিজ আল আমানের সম্পাদনায় প্রথম বের হয় নজরুলগীতি অখন্ড (সেপ্টেম্বর ১৯৭৮)। এতে গানের 888sport free bet ছিল ২১১১। ওই নজরুলগীতি অখন্ডের প্রথম সংস্করণে (জুলাই ১৯৮১) গানের 888sport free bet বেড়ে দাঁড়ায় ২১৮৩-তে। হরফের নজরুলগীতি অখন্ডের তৃতীয় সংস্করণ (জানুয়ারি ২০০৪) সম্পাদনা করেন ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, এতে গানের 888sport free bet ছিল ২৫০৪। রফিকুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘প্রেম’, ‘প্রেম ও প্রকৃতি’ এবং ‘উদ্দীপনা ও মুসলমানি’ শীর্ষক নজরুলের গানের তিনটি খন্ড গীতি সংকলন নামে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে (ভাদ্র ১৩৯১, জ্যৈষ্ঠ ১৩৯২, পৌষ ১৩৯২)। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে রশিদুন্ নবীর সম্পাদনায় ৩১৬৩টি গান নিয়ে প্রকাশ পায় নজরুলসঙ্গীত সমগ্র (অক্টোবর ২০০৬)। নজরুলসঙ্গীত সংগ্রহ নামে ওই বইয়ের প্রথম সংস্করণে (ফেব্রুয়ারি ২০১১) নজরুলের আরো এগারোটি গান যুক্ত হয়ে 888sport free bet বেড়ে হয় ৩১৭৪।
নজরুলসংগীতের তালিকাগ্রন্থেও গানের মুখ ও 888sport free bet পাওয়া যায়। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয় আবদুস সাত্তারের নজরুল সঙ্গীত অভিধান (মে ১৯৯৩) – এতে গানের 888sport free bet নির্দেশিত হয় ৩০৮৬। ব্রহ্মমোহন ঠাকুরের নজরুল সঙ্গীতকোষে (কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৯৪) গানের 888sport free bet ২৬৯৮। বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত করুণাময় গোস্বামীর নজরুলসঙ্গীতের তালিকায় পাওয়া যায় ২৮৯৯টি গানের হদিস। কল্পতরু সেনগুপ্ত-সংকলিত ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত আকাদেমি-প্রকাশিত নজরুলগীতি সহায়িকা (জুন ১৯৯৭) বইয়ে নজরুলের ৩০৯২টি গানের উল্লেখ আছে। এ-যাবৎ প্রকাশিত নজরুলসংগীতের সংকলন ও তালিকাগ্রন্থ কোনোটিই নির্ভুল ও প্রামাণ্য নয়। এসব বইয়ে অন্য গীতিকারের অনেক গানের যেমন অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তেমনি একই গান অনেক ক্ষেত্রে দুবার ছাপা হয়ে গানের 888sport free bet বৃদ্ধি পেয়েছে। সঠিক 888sport free bet জানা না গেলেও এইসব পরি888sport free betন থেকে সহজেই ধারণা করা যায়, নজরুল নিঃসন্দেহে তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছিলেন। সব গান প্রকাশ পায়নি, রেকর্ডেও ধারণ করা হয়নি। এমন অনেক গানের হদিস ক্রমে মিলছে। তবে বহু গান যে হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে গেছে – বিলুপ্ত সেসব গান আর কোনোদিনও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দুই
নজরুলের গান রচনার সময়-অসময় ছিল না। যে-কোনো বিষয় নিয়ে তিনি যে-কোনো পরিবেশে গান লিখে তাৎক্ষণিক তাতে সুরযোজনার প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। একসময় তিনি অনর্গল গান রচনা করেছেন – বিশেষ করে গ্রামোফোন কোম্পানির চাহিদা মেটাতে – প্রথমে হিজ মাস্টার্স ভয়েস, পরে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি, শেষে আবার ওই হিজ মাস্টার্স ভয়েসে। এছাড়া টুইন, কলম্বিয়া, রিগ্যাল, অ্যাঞ্জেল রেকর্ড, ভিয়েল-ও-ফোন, সেনোলা রেকর্ড, পাইওনিয়ার কিংবা হিন্দুস্থান রেকর্ডও তাঁর আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হয়নি। রেকর্ড কোম্পানিতে তাঁর নিজের ঘরে বা রিহার্সেল রুমে বেশিরভাগ সময়েই রুলটানা এক্সারসাইজ খাতায় তিনি গান লিখতেন – সেসব খাতা আবার সেখানেই পড়ে থাকতো – কিছুবা বেহাতও হয়ে যেতো। আর সেই সময়ের নজরুল-প্রভাবিত দু-একজন তরুণ গীতিকারের নামে নজরুলের কোনো কোনো গান প্রচারিত হয়েছে। আবার দু-এক ক্ষেত্রে উল্টোটাও ঘটেছে। নজরুল তাঁর গানের ব্যাপারে ছিলেন উদার ও উদাসীন। তাঁর অনেক খাতা নানাজনে রেকর্ড কোম্পানির রিহার্সেল রুম বা তাঁর বাড়ি থেকে নিয়ে গেছেন। সেসব খাতা আর ফিরে আসেনি। কিছু খাতা রেকর্ড কোম্পানিতেই থেকে যায়। তাঁর গানে যাঁরা সুরারোপ করতেন প্রয়োজনের তাগিদে খাতা তাঁদের কাছেও থাকতো। আবার যাঁদের তিনি আলাদা করে গান শেখাতেন তাঁদের খাতাতেও হামেশাই গান লিখে দিতেন। আবার শিক্ষার্থী-সুরকারদের সুবিধার জন্যে খাতার একাধিক নকলও করতে হতো তাঁকে। নজরুলের এমন গানের দুখানা খাতা দেখেছি মেগাফোন কোম্পানির কমলকুমার ঘোষের সৌজন্যে, রেকর্ড-সংগ্রাহক সুরাজলাল মুখোপাধ্যায় (হারুবাবু) সংগৃহীত নজরুলের নিজের হাতে লেখা গানের খাতাও দেখার সুযোগ মিলেছে সুরাজ-শ্রুতি-সদনের অমিত গুহর কল্যাণে, 888sport live chatী ফিরোজা বেগম দেখিয়েছেন কমল দাশগুপ্তের সংগ্রহের খাতা, শিক্ষার্থী কলকাতার সিঁথির মায়া ভট্টাচার্যের খাতা ভরে গান লিখে দিয়েছিলেন নজরুল, তাঁর পুত্র পার্থসারথি ভট্টাচার্যের সূত্রে এ-তথ্য জেনেছি। রিহার্সেল রুমে থেকে-যাওয়া নজরুলের অরক্ষিত গানের খাতা সম্পর্কে আববাসউদ্দীন আহমদ তাঁর 888sport sign up bonusকথায় জানিয়েছেন :
গ্রামোফোন কোম্পানীর জন্য অজস্র গান লিখেছেন তিনি [নজরুল]। গানের খাতাগুলো সাধারণতঃ কোম্পানীর রিহার্সেল রুমেই রেখে যেতেন। কোন এক কবি তখন গ্রামোফোন কোম্পানীতে নতুন গান দেওয়া শুরু করেছেন এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ দু’একজন 888sport live chatীর কণ্ঠে তাঁর রচিত গান গীত হয়ে রচয়িতা হিসাবে পরিচিত হচ্ছেন। এহেন কবি কাজিদার সেইসব গানের খাতা থেকে 888sport app download apkর বিষয়বস্ত্তই নয়, লাইনকে লাইন হুবহু নকল করে তার গানের ফাঁকে ফাঁকে চালাতে আরম্ভ করে দিয়েছেন। সুর888sport live chatী কমল দাশগুপ্ত একদিন কাজিদাকে বললেন, ‘কাজিদা আপনি এভাবে গানের খাতাগুলো এখানে রেখে বাড়ীতে যান, কিন্তু এমন কবিও এখানে উদয় হয়েছেন যারা আপনার এইসব খাতা থেকে 888sport app download apkর শুধু ভাবই নয় বরং লাইনকে লাইন তাদের রচনার ভেতর চালিয়ে যাচ্ছে।’
কাজিদা একথা শুনে প্রথমতঃ একটু গম্ভীর হলেন, তারপর তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বলে উঠলেন, ‘আরে পাগল মহাসমুদ্র থেকে কয় কলসী আর নেবে?’
(আমার 888sport live chatী জীবনের কথা, সৃষ্টি প্রকাশন সংস্করণ, কলকাতা, বইমেলা ২০০১, পৃ ১১১-১১২)
তিন
অসুস্থ হওয়ার আগে যেসব বই বের হয় তাতে নজরুলের রচিত মোট গানের অতি অল্পই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর অনেক গান পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়, যা গ্রন্থভুক্ত হয়নি – খাতার গানের ক্ষেত্রে কিংবা অনুলিপি না-রেখে প্রার্থীকে গান দেওয়ার বেলাতেও এ-কথা প্রযোজ্য। ফলে তাঁর গান আরো নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বা আছে। তাঁর এইসব অজ্ঞাত বা হারিয়ে যাওয়া গানের সন্ধান শুরু হয় প্রকৃতপক্ষে তাঁর মৌন-মূক হওয়া ও মৃত্যুর পর থেকে। নজরুলের গানের সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে আবদুল কাদির, আবদুল আজিজ আল আমান, রফিকুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, আসাদুল হক, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, সেলিনা বাহার জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রশিদুন্ নবী এবং আরো কারো কারো নামের উল্লেখ করতে হয়। আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ-বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে বাংলা একাডেমি, নজরুল একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। নিরন্তর অনুসন্ধানের ফলে এখনো নজরুলের গানের খাতা, অপ্রকাশিত বা অগ্রন্থিত গান আবিষ্কৃত হচ্ছে। সম্ভবত সংগ্রহের এই ধারা আরো অনেককাল অব্যাহত থাকবে। এই নিবিড় অন্বেষণের ফলে সম্প্রতি নজরুলের একটি অজ্ঞাত-অগ্রন্থিত গানের সন্ধান মিলেছে কাঙাল হরিনাথের (১৮৩৩-৯৬) পৌত্র বৈদ্যনাথ মজুমদারের (জন্ম ১৯২৪) সৌজন্যে।
চার
সেকালের নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কুমারখালীতে ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শ্রীশ্রীমদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতি’। এর ‘পৃষ্ঠপোষকগণের’ মধ্যে প্রথম নামটি ছিল ‘কবি নজরুল ইসলামে’র। এই সমিতির মূল প্রেরণা উদ্যোক্তারা পেয়েছিলেন সাধক-সমাজহিতৈষী-888sport live footballসেবী ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের কাছ থেকে এবং এই সংগঠন গড়ে তোলার পেছনে কাঙাল-পরিবারের সদস্যদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। এই ‘সংকীর্ত্তন সমিতির সপ্তম বার্ষিক উৎসব’ (১৩৪৯) উপলক্ষে যে-দশ পাতার একটি অনুষ্ঠান-পুস্তিকা প্রকাশিত হয় তাতে দেখা যায়, পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে কাঙাল হরিনাথের পুত্র সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, জ্ঞাতি-ভ্রাতুষ্পুত্র ভোলানাথ মজুমদার এবং সেইসঙ্গে ‘কুমারখালি কাঙ্গাল 888sport live football ও সঙ্গীতসমাজে’র নামও আছে। সুহৃদবৃন্দের মধ্যেও হরিনাথের আত্মীয়স্বজনের নাম পাওয়া যায়। এই ‘সংকীর্ত্তন সমিতি’র সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন কাঙালের দুই পৌত্র অতুলকৃষ্ণ মজুমদার ও বিশ্বনাথ মজুমদার। পর্ষদের আরো অনেকেই ছিলেন কাঙাল-পরিবারের সদস্য। অনুষ্ঠান-পুস্তিকায় ‘প্রণাম’ শিরোনামে কাঙাল হরিনাথের প্রতি 888sport apk download apk latest version নিবেদন করা হয়েছে এইভাবে :
কাঙ্গাল হরিনাথের প্রচেষ্টাই কুমারখালির বুকে সঙ্গীত-মুখরতার কারণ। তাঁহার বিরাট কর্ম্ম-জীবন বাঙ্গালী সমাজে এক নূতন প্রেরণা দিয়াছে। আজিকার এই শুভ তিথির পুণ্য উৎসবে সেই মহাপুরুষের শ্রীচরণে আমাদের কোটি কোটি প্রণাম।
কাজী নজরুল ইসলাম কুমারখালীর ‘মদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতি’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এই সম্পৃক্ততার একটি অতীত সূত্রও আছে। ১৯২৯-এর ফেব্রুয়ারির একেবারে শেষপ্রান্তে নজরুল ইসলামকে কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত যতীন্দ্রমোহন হলে (পরিমল থিয়েটারগৃহ) নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর পরপরই কুমারখালীতেও নজরুল-সংবর্ধনার আয়োজন হয়। এই অনুষ্ঠানের শেষে নজরুল কাঙাল হরিনাথের নাম-পরিচয় জানতে পেরে কাঙাল-কুটির পরিদর্শনে যান। এ-বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য এইরকম :
কুমারখালীতে নজরুল আর-এক সমাজবিপ্লবী 888sport live footballসাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের […] প্রতি 888sport apk download apk latest version-নিবেদনের জন্যে কাঙাল-কুটিরে গিয়েছিলেন বলে কাঙাল-পৌত্র অতুলকৃষ্ণ মজুমদারের সূত্রে জানা যায়। এই যোগাযোগ হয়েছিল মূলত কাঙালের জ্ঞাতি-ভ্রাতুষ্পুত্র ও কুমারখালীতে নজরুল-সংবর্ধনার অন্যতম উদ্যোক্তা ভোলানাথ মজুমদারের আগ্রহ ও প্রচেষ্টায়।
(অজ্ঞাত নজরুলের সন্ধানে, আবুল আহসান চৌধুরী, 888sport app, 888sport cricket BPL rateে বইমেলা ২০১৩, পৃ ৮০)।
এখানে এসে তিনি কাঙাল হরিনাথ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা অর্জন করেন এবং মন্তব্য-বইতে তাঁর 888sport apk download apk latest version-ভাষ্যও লিখে দেন। সংবর্ধনা এবং কাঙাল-কুটিরে আসার ফলে কাঙাল-পরিবারের ভোলানাথ মজুমদার ও বিশ্বনাথ মজুমদারের সঙ্গে তাঁর যে-সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা অক্ষুণ্ণ রয়ে যায়। সেই সূত্র ধরেই নজরুলের সঙ্গে কুমারখালীর ‘মদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতি’র সম্পর্ক রচিত হয়।
পাঁচ
নজরুলের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবের প্রভাব এই ‘সংকীর্ত্তন সমিতি’র কারো কারো ওপরে যে ভালোভাবেই পড়েছিল তা বেশ বোঝা যায় এঁদের বক্তব্যের ভাব ও ভাষা থেকে। ‘সমিতি’র সম্পাদক উৎসবের কথা বলতে গিয়ে স্পষ্টই বলেছেন :
…পরাধীনতার সুযোগ নিয়ে এদের উৎসবের মাঝেও প্রবেশলাভ করেছে সবর্বনাশা কীট। উৎসবীদের তাই সবর্বাধিক কর্ত্তব্য সমস্ত প্রয়োগে জাতীয় স্বাধীনতা গ্রহণ করা।… পরাধীন থাকতে ভারতীয় উৎসব মজবে না – উৎসবের প্রকৃত স্বরূপ কিছুতেই প্রকাশ পাবে না। ভারতের সকল উৎসবের সঙ্গেই ভারতের স্বাধীনতার সম্বন্ধ রয়েছে পাখীর সাথে তার পাখার সম্বন্ধ যেমন। বন্দেমাতরম্!
নজরুল ‘মদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতি’র অনুরোধে তাদের অনুষ্ঠানের জন্যে একটি দীর্ঘ কীর্তনাঙ্গের গান রচনা করে দেন – ‘(এল) যুগল-মিলন-তিথি এল ব্রজধাম/ (ধরায়) এল ব্রজধাম’। ‘সংকীর্ত্তন সমিতি’র অনুষ্ঠানে অপর যে-কীর্তনটি পরিবেশিত হয়, কাঙাল হরিনাথের পৌত্র বৈদ্যনাথ মজুমদার (বয়স ৯১) তার মুখটুকু 888sport app download for android করতে পারেন, তা এইরকম : ‘আজি ফুলদোলে,/ দোলে দোলে আজি কিশোরী কিশোর’। নজরুলের ও সেইসঙ্গে অপর গান – দুটিতেই সুরযোজনা করেন কুমারখালীরই সংগীত888sport live chatী অজিতকুমার কুন্ডু।
‘আমাদের কথা’ শিরোনামে সমিতির সম্পাদক বিশ্বনাথ মজুমদার ‘গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন’ শীর্ষক উপশিরোনামে নজরুলের এই গানটি সম্পর্কে বলেছেন :
বর্ত্তমান বঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নজরুল ইসলাম মহাশয় সমিতির দীন সখ্য সাদরে গ্রহণ করিয়া আমাদের বিশেষ আনন্দ দিয়াছেন। তাঁহাকে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। গত ফুলদোল সঙ্গীত ও বিষ্ণুপদী সংক্রান্তির এই সঙ্গীতটি তিনি আমাদের সমিতির জন্য বিশেষভাবে রচনা করিয়া দিয়াছেন। তাঁহাকে অন্তরের গভীর 888sport apk download apk latest version নিবেদন করিতেছি। নদীয়ার সুপরিচিত শ্রীযুক্ত অজিতকুমার কুন্ডু মহাশয় সঙ্গীত দুইটির সুর দান করিয়াছেন।
ছয়
‘সংকীর্ত্তন সমিতি’র অনুষ্ঠান-পুস্তিকার প্রথম পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে :
বৈশাখী সঙ্গীত
কথা : কবি নজরুল ইসলাম
সুর : অজিতকুমার কুন্ডু
এই কীর্তন-গানটি ‘শ্রীশ্রীমদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতি’র সপ্তম বার্ষিক উৎসবে বিষ্ণুপদী সংক্রান্তি ১৩৪৯-এ নদীয়ার কুমারখালীতে পরিবেশিত হয়। ১৩৪৯ অর্থাৎ ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন, অনুমান করা চলে তারই কিছু আগে এই ‘সমিতি’র অনুরোধে কীর্তনাঙ্গের এই গানটি রচিত হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের এই অজ্ঞাত-দুষ্প্রাপ্য-অগ্রন্থিত গানটি অনুষ্ঠানপত্র থেকে এখানে অবিকল সম্পূর্ণ উদ্ধার করে দিলাম :
কুমারখালি বিষ্ণুপদী সংক্রান্তির
সান্ধ্য-সম্মেলনে –
কুমারখালি শ্রীশ্রীমদনমোহন সংকীর্ত্তন সমিতির
বৈশাখী-সঙ্গীত
(এল) যুগল-মিলন-তিথি এল ব্রজধাম
(ধরায়) এল ব্রজধাম \
(বল) শ্রীরাধা গোবিন্দ শ্রীরাধা শ্যাম \
(আগে) রাধা নাম বল রে,
রাধা নামের অনুরাগে অনুরাধা হবে মন, রাধা নাম বল রে \
তারপরে বল শ্যাম
(শ্যাম)-সুন্দর নামের গুণে হৃদি হবে ব্রজধাঁম,
বল কৃষ্ণ কৃষ্ণ শ্যাম নাম \
মিলনের তিথি এল, বেণুকার গীতি এল,
প্রেম ও প্রীতি এল পৃথিবীতে গো,
আনন্দ-যমুনায় ঢেউ উথলি’ যায়,
যে যত পার নাও ভ’রে গাগরীতে গো।
(হৃদি)-গাগরীতে নিলে রস নাগরী হবে গো !
গোরী-রাধা-রস এই বিগলিত যমুনা
গাগরীতে নিলে রস নাগরী হবে গো \
রস-কদস্ব-তরু বেন শ্যাম শ্রীরাধা তাহাতে ফুল,
যমুনা-প্রবাহ শ্রীচরণ-তলে কেঁদে কেঁদে আকুল।
(যেন) গোপীদের প্রেম ঐ যমুনা-তরঙ্গ
কেঁদে কেঁদে আকুল
(কুলে) কালি দিয়ে হয়েছে কালিন্দী জল গো
কেঁদে কেঁদে আকুল \
দ্বাদশ কুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জে, ফুলদল ফুটেছে মধুকর গুঞ্জে
(তারা) মাধুকরী চায় গো! ফুলে ফুলে বু’লে বু’লে
মাধুকরী চায় গো !
(বলে) মধু দাও সুরভি দাও শ্রীরাধামাধবে –
মাধুকরী চায় গো \
বৃন্দাবনের ধূলি চন্দন-রেণু হ’ল মধুর যুগল মূরতি হেরি
হেরি রাধা-বল্লভ কাঁপে লতা পল্লব, মেঘ এল আকাশ
ঘেরি’।
(রাধা)-শ্যামে দেখিতে এল বৈশাখী ঝড়,
(ও) ঝড় নয় ঝড় নয়, উমা-শঙ্কর!
কৈলাস এল ব্রজে ম’জে প্রেম-রসে রে !
এল শিব-সুন্দর নাগর সেজে রে
প্রেম-রসে ম’জে রে !!
(আজ) জ্যোৎস্না জড়াল যেন সুনীল আকাশে,
(আজ) আনন্দ ধরে না স্থলে জলে বাতাসে।
রাধা শ্যামে ধরেছে
তাই আনন্দ ধরে না !
শ্যাম রাধার আধারে এল
সব অাঁধার দুরে গেল
তাই আনন্দ ধরে না !
বলে – মধুরম্ মধুরম্ মধুরম্ !
বলে – শ্রীরাধা মাধব শ্রীরাধা শ্যাম
মধুরম্ মধুরম্ মধুরম্ !
সাত
নজরুলের এই অজ্ঞাত-অগ্রন্থিত কীর্তনাঙ্গের গানটি সম্পর্কে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা নিবেদন করতে হয় :
ক. নজরুল যে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত ছিলেন তার নিদর্শন এই গানটি।
খ. হিন্দুশাস্ত্র ও পুরাণ সম্পর্কে নজরুলের অপরিসীম আগ্রহ ও অসামান্য অধিকারের স্মারক এই কীর্তনাঙ্গের গানটি।
গ. সৌজন্যপ্রিয় নজরুল প্রত্যন্ত পল্লির হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুরোধ রক্ষার জন্যে স্বল্প পরিচয়ের সম্পর্ক সত্ত্বেও গানটি রচনা করেন।
ঘ. এতো দীর্ঘ পরিসরের গান নজরুল বোধহয় আর কখনো রচনা করেননি।
ঙ. নজরুলের কীর্তনাঙ্গের এই গানটি এতদিন সহৃদয় পাঠক-গবেষকের অগোচরেই ছিল। গানটি নজরুলের কোনো সংগীতসংগ্রহ পুস্তক কিংবা উত্তরকালে সংকলিত নজরুলসংগীতের সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
চ. নজরুলের এই দুর্লভ গানটি পেয়েছি বীরভূমের বোলপুরনিবাসী কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের একমাত্র জীবিত পৌত্র বৈদ্যনাথ মজুমদারের সৌজন্যে। সংগ্রহকাজে সহায়তা করেছেন ইছাপুর কলকাতা সাকিনের কবিবন্ধু করুণাপ্রসাদ দে। ২০ মার্চ ২০১৫ শুক্রবার বোলপুর গিয়ে বৈদ্যনাথ মজুমদারের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করি এবং প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্যের সুলুক-সন্ধান পাই। এই প্রসঙ্গে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুন্ নবীর কথাও উল্লেখ করতে হয়। বৈদ্যনাথ মজুমদারের কথা দিয়ে শেষ করি : ‘কবি নজরুল রচিত এই কীর্তনগানখানি আসরে-বাসরে কুমারখালির সংগীতপ্রিয় মানুষকে এক গভীর ধর্মভাবে মাতিয়ে তুলেছিল।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.