নদী কারো নয়

৪৪
রাত এখন কত নির্ণয় নাই, ভোর হতেই বা কত বাকি তারও ঠাহর নাই| মৃত্যু এমনই হয়, আমাদের সময় ধারণাকে গিলে খায়| এই ছিলো, এই নাই! এর চেয়ে ¯^াভাবিক আর কিছু নাই, মানুষ তবু চমকিত হয় মৃত্যু যখন তার কালো চাদরে আমাদের বোধশক্তিকে অকস্মাৎ আচ্ছাদিত করে| ভালো করে তাকিয়ে দেখি জলেশ^রীর আকাশে তখনো দৃপ্ত প্রতাপে তারাসকল জ্বলজ্বল করছে| আধকোশার পানির লহরে কুলুকুলু নাদ| কিন্তু দূরে কোথাও অতিদূর থেকে একটা হাহাকারও যেন থেকে-থেকে হানা দিচ্ছে — হানা দেয় বাংলাবাড়ির বারান্দায় নদীমুখো একা বসে থাকা ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেনকে| সে কান পাতে| এই হাহাকার কি তার কন্যা প্রিয়লির বুক থেকে উঠে আসা, যে বাবার ঘর থেকে পালিয়ে এক পাষণ্ডের হাত ধরে বেরিয়ে গিয়েছিলো? পাষণ্ড সে তখন বোঝে নাই প্রিয়লি| আহ, আহ, গভীর যন্ত্রণায় মকবুল মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে| আজ দুপুর রাতেই সে প্রিয়লির ফোন পেয়েছে — বাবা, তুমি কোথায়? — জলেশ্বরীতে| — জলেশ^রী? — তোর বাবার দেশ, তোর দাদার দেশ| — সেখানে কেন তুমি? — জলেশ^রীর পাশ দিয়ে আধকোশা নদী, সেই নদীতে ডুবে তোর দাদা চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়! শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো প্রিয়লি| — কিংবা আত্মহত্যা করে| — বলো কি তুমি? — প্রিয়লি, এই নদীর ভাঙন ঠেকাতে তোর দাদা সারাজীবন পাগলের মতো দোরে-দোরে ঘুরে বেড়িয়েছে| এই নদী হিন্দুস্থানে চলে যায়, আবার পাকিস্তানে ফিরে আসে| আমার বুক ভেঙে যায়| ভাঙা বাংলার শোক আমি এতদিনে বুকের ভেতরে টের পাই| তোর দাদা সারা শহর চষে বেড়ায় উন্মত্ত চিৎকার করতে-করতে — নদী কারো নয়! নদী কারো নয়! প্রিয়লি, দেশভাগের সেই পাগল সময়ের কথা তোর জানা নাই|
অতঃপর এই বাংলাবাড়ির বাবুর্চি আলাউদ্দিনের কাছে শোনা সেই গল্পটি প্রিয়লিকে ফোনে বলে যায় মকবুল| মানিকগঞ্জের সেই জমিদারবাড়ি, তিনটি টগবগে ঘোড়া, দেশ ছেড়ে হিন্দুস্থানে যাবার আগে মেজকুমার নিজ হাতে বন্দুকের গুলিতে ঘোড়া তিনটিকে হত্যা করে যায়| বড় শৌখিন নাম ছিলো ঘোড়া তিনটির — ঝড়, ঝঞ্ঝা আর বিদ্যুৎ, আর এই নাম রেখেছিলো জমিদারের মেজকুমার সত্যেন্দ্রনারায়ণ| বিহারে হরিহরছত্রের মেলা থেকে একলপ্তে ঘোড়া তিনটি কেনা হয়| তখন কী উদ্দাম বুনো ছিলো, সহজে কি বাগ মানতে চায়, পোষ করাতেই মাসাবধি লেগে যায়| জমিদারবাড়ির মাঠে যখন তাদের নিয়ে পোষ মানাবার তদ্বির চলতো, গাঁয়ের মানুষ দূর থেকে সেই তামাশা দেখতো আর সভয়ে ছোটাছুটি করতো যে, এই বুঝি ঘোড়া এসে তাদের ওপর হামলে পড়ে| কিন্তু সহজে ছাড়বার পাত্র নয় সত্যেন্দ্র| বড় কুমার রণেন্দ্র হাঁক দিয়ে বলতো, ও বনের ঘোড়া, বিদায় করে দে| কিন্তু হাল ছাড়ে নাই সত্যেন্দ্র| — না, দাদা, দাপটে তোমার বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, তুমি সবুর করো, তোমার পায়ের কাছে এসে নাক ঘষবে| হলোও তাই| মাসাবধি কালের মধ্যে শান্ত-সুবোধ হয়ে গেলো প্রাণী তিনটি| রণেন্দ্র প্রথম যেদিন চড়লো ঘোড়ার পিঠে, হ্রেষা তুলে ¯^াগত করলো তাকে, তারপর দুলকি চালে গাঁ ঘুরিয়ে আনলো| ঘোড়া তিনটিকে সত্যেন্দ্র স্নেহ করতো সন্তানের মতো, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের নিত্য ভোরের দলাইমলাই তদারক করতো, নিজহাতে দানা খাওয়াতো| সত্যেন্দ্রর নিজ ঘোড়াটি ছিলো বিদ্যুৎ, ঝঞ্ঝা ছিলো ছোট কুমার রমেন্দ্রর, আর ঝড় ছিলো বড় কুমার রণেন্দ্রর| রণেন্দ্র ঘোড়ার পিঠে বড় বিশেষ উঠতেন না, তার ছিলো পালকি, কালেভদ্রে মানিকগঞ্জে যাওয়া পড়লে সে পালকিতেই যাতায়াত করতো| ছোট কুমার নামেই ঝঞ্ঝার মালিক, গায়ে-পিঠে হাত বুলাতো, পুণ্যাহর দিনে নিজ হাতে সাজপোশাক পরিয়ে দিতো ঘোড়ার, ক্বচিৎ তার পিঠে উঠতো| কিন্তু সত্যেন্দ্র ছিলো ঘোড়ার সওয়ারি, ভোরে একবার, বিকেলে আরেকবার বিদ্যুতের পিঠে তার ওঠা চাই, মানুষ অচিরে তাকে ঘোড়ার পিঠে ভিন্ন 888sport app download for androidে আর গাঁথে নাই| আজো মানিকগঞ্জের তেওতার মানুষেরা সত্যেন্দ্রর ছবি ঘোড়ার পিঠে সওয়ারিরূপেই কল্পনা করে ওঠে|
গুলি তো নয় ঘোড়ার শরীরে, সেদিন মেজকুমার সতেন্দ্রনারায়ণের বুকের ভেতরেই তিনটি ছিদ্র হয়ে যায়| মকবুল যেন দেখে ওঠে আজো সেই ছিদ্রত্রয়ী থেকে গলগল করে রক্ত ঝরে পড়ছে| মকবুল অতঃপর প্রিয়লিকে বলে হরিচরণের কথা| কেয়ারটেকার সোলেমানের কাছে সে শুনেছে, দেশভাগ হয়ে যাবার পর, পাকিস্তানের ভাগে জলেশ^রী এসে যাবার পর, হিন্দুরা যখন দলে-দলে হিন্দুস্থানে চলে যাচ্ছে, তখন যুবক হরিচরণ ঝকঝকে রামদা হাতে তার নিজ বাড়ির চৌহদ্দিতে বসে থাকে| সেই রামদা, যে-রামদা দিয়ে সে দেবীর চরণে বলি দিতো, এক কোপে বলবান মহিষের ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে যার জুড়ি ছিলো না মান্দারবাড়ি হস্তিবাড়ি বুড়িরচর কি গোটা জলেশ^রীতেই — আজ পাঁঠা নয়, মহিষ নয়, মানুষ, মানুষই তার রামদা খুঁজে বেড়ায়| — না, মুই এ দ্যাশ ছাড়ি যাবার নও| আগান না বাহে! খবোদ্দার! আসিলে কাঁইও জমির দখল নিতে তার গলায় দেমো কোপ! বিহার কটিহার থেকে দলে-দলে বিহারিরা আসে পাকিস্তানে, তারা সন্ধান করে ফেরে জমি জায়গা বাড়ি — বিশেষ করে হিন্দুর বাড়ি| হরিচরণের রামদায়ে ঝলসে ওঠে সূর্যের আলো| মুখে ওঠে ফেনা| বুকে শ^াসকষ্ট দেখা দেয় একদিন| তার ছেলেটা বিয়ের বছরখানেকের মাথায় সর্পাঘাতে প্রাণ দেয়| সর্প! ইতিহাসই কি সর্প আসলে? মকবুল এই প্রতীকটি নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠে| ইতিহাস কখনো-কখনো সর্প হয়ে আমাদের দংশায়| কলার মান্দাসে তখন আমাদের লাশ নদী দিয়ে যাত্রা করে, গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে যায়, কালের পর কাল, যদি কেউ সর্পাঘাতে নীল হয়ে যাওয়া শবটিকে জীবন ফিরে দেয়| আলো স্তিমিত হয়ে যায়| হরিচরণ উন্মাদের মতো দিবাভাগেও অন্ধকার দেখে ওঠে, চিৎকার করে| মকবুল যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের পাগলা মেহেরের চিৎকার শুনে ওঠে — তফাৎ যাও! তফাৎ যাও! সব ঝুট হ্যয়! — বাবা আমি আসছি! — আসবি? তুই আসবি? আয় তুই, আমার বুকে ফিরে আয়| অন্ধকার চ্ছলচ্ছল নদীর কলতান তার আয়-আয় উচ্চারণটিকে সংগীতের ফোঁপানি জড়িয়ে দেয়|
কিন্তু কে ফিরে আসে বুকে? মৃতের উত্থান নাই| ইতিহাসেরও উজান নাই| ইতিহাস এগিয়েই চলে| বাস্তবতা এই যে, পাকিস্তান হিন্দুস্থান হয়েছে, তার ফিরে যাওয়া নাই| তবে, এক অর্থে ফিরে যাওয়াও তো ঘটেছে পরে, খণ্ডিতভাবে হলেও ফিরেছে ˆবকি — পাকিস্তানের বুক চিরে 888sport appsের উত্থান ঘটেছে| মুক্তিযুদ্ধের 888sport apps, হিন্দু মুসলমানের ঊর্ধ্বে 888sport apps, ধর্মনিরপেক্ষ 888sport apps, হিন্দুর নয় মুসলমানের নয় বাঙালির 888sport apps, মানুষের দেশ| আর এই 888sport appsেই আজ রাতে আমরা দুটি লাশ পাই — একটি হিন্দুর, একটি মুসলমানের| কুসমির ঘরে হরিচরণের লাশ, রেললাইনের ঝোপের পাশে হাফেজ আবুল কাশেম বলরামপুরীর লাশ|
বহু-বহু বৎসর পর্যন্ত এই দুটি মানুষের — এক হিন্দু আরেক মুসলমানের একই রাতে মৃত্যু এক গল্পকথা হয়ে থাকবে জলেশ^রীতে| মানুষেরা তাদের নিয়ে বলাবলি করবে, মানুষের 888sport sign up bonusকথায় ক্রমে কিংবদন্তি হয়ে যাবে হরিচরণ ও বলরামপুরী| হিন্দু আর মুসলমান, কত শত বৎসর তাদের পাশাপাশি বাস অথচ যেন দেয়ালের ব্যবধানেই উভয়ে| এই দেয়ালটিকে ভেঙে ফেলার কোনোরকম চেষ্টা দূরে থাক, ব্রিটিশ যখন বিদায় নিলো ভারতবর্ষ থেকে, তারা ¯^ীকৃতি দিয়ে গেলো দেয়াল ছিলো, দেয়াল আছে ও দেয়াল থাকবে! শুধু কি ব্রিটিশেরই কারণ ছিলো ওটি? আমাদের হিন্দু-মুসলমান নেতারাও তো তার জন্যে সমভাগে দায়ী, কিংবা ওই নেতারাই — ওই গান্ধী, ওই জিন্নাহ, ওই নেহেরু, ওই প্যাটেলই ছিলো মূল দায়ী| গান্ধীর কি মুখে ছিলো এক, মনে আরেক? জিন্নাহ কি পাকিস্তান জিতে নিয়েছিলেন যেমন বহু আদালতে বহু কঠিন মামলায় তিনি জিতে যেতেন, চড়া ফিস নিতেন, আর ভুলে যেতেন মামলাটির কথা?
সাতচল্লিশে হয়ে গেলো পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান, যেন এত দিনে একটা সুরাহা হলো, ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই, এবার যে যার ঘরে| কিন্তু না, দুই জাতিতত্ত্বের ভুল শোধরাতে পাকিস্তানের বুক চিরে জন্ম নিলো 888sport apps — ধর্মনিরপেক্ষ 888sport apps| এতেও কি ¯^র্গ পাওয়া গেলো হাতে? ভাই আবার ভাই হয়ে গেলো? হায়, দুরাশা| অচিরেই হত্যা করা হলো জাতির জনককে, ক্ষমতা দখল করলো এক ˆ¯^রশাসক, তারপরে আরেক ˆ¯^রশাসক এলো, মুক্তিযুদ্ধজাত 888sport appsের সংবিধানে আনা হলো পরিবর্তন, ইসলামকে ঘোষণা করা হলো রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে| মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লাথি মেরে ˆ¯^র-কলমের এক খোঁচায় হিন্দুকে আবার হিন্দু নির্ণয় করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হলো|
বহু বহু বৎসর পরে এই ভূখণ্ডে রাষ্ট্রিক কত পরিবর্তন আসবে, আসতেই হবে — পৃথিবীতে রাষ্ট্রগঠন ও ভাঙনের ইতিহাসে দেখেছি — দেখি নাই কি? — কোনো মানচিত্রই স্থির নয়| কিন্তু সে দেখে যাওয়া আমাদের সামান্য আয়ুষ্কালে সম্ভব হবে না — আগামীর মানুষ সে সকল প্রত্যক্ষ করবে, কিংবা তারাই রচনা করবে| হ্যাঁ, আমরা চলে যাবো, নতুন মানুষ আসবে, তারা নতুনতর ইতিহাস রচনা করবে| এই ভারত, এই 888sport apps — এর দিকে তাকিয়ে আমরা এখনই বলতে পারি — ইতিহাস এক বেগবান নদী, অবিরাম তার অগ্রসরণ, কত বাঁক ভেঙে ও কত বাঁক রচনা করেই না কালসমুদ্রের দিকে তার যাত্রা — জলেশ^রীর পাশ দিয়ে বহে যাওয়া বর্ষায় উন্মত্ত নদীর মতোই তার চলন ও ভাঙন, ভাঙন ও গড়ন| হ্যাঁ, আমরা এখনই বলতে পারি, ভাঙবে এবং আবার গড়বে| মানুষকে মানুষ বলেই দেখে উঠতে চাইবে মানুষ, নতুন নেতা আসবে, রাষ্ট্রবিধায়ক আসবে, নতুন ইতিহাসের কারিগর হয়ে উঠবে তারা| আমরা সামান্য মানুষ, অধিক আমরা দেখে উঠতে পারি না, আমাদের দৃষ্টিভূমি বিস্তার অধিক নয়, আমাদের দৃষ্টিপথ শুধু এই বাংলা মায়ের সবুজ আঁচলটিতে পড়ে আছে| আমাদের কি এমতো আশা হতে পারে না যে, একদিন ওই দূর আগামীর নতুন মানুষেরা দেয়াল মানবে না, হিন্দুকে হিন্দু নয়, মুসলমানকে মুসলমান নয়, বাঙালি বলেই দেখে উঠবে, পটের বুকে নতুন রেখাপাত করবে তারা, সোনার বাংলা ব্যাপক ও বিস্তৃততর করে তুলবে — দূরকল্পনায় এখনই আমরা বলতে পারি যে, মানুষ রূপেই তারা এই মর্ত্যে ¯^র্গ রচনা করতে চাইবে|
কিন্তু এসবই অনেক পরের কথা| আমরা এখন কাহিনিতে ফিরে যাই| আমরা হরিচরণের লাশের পাশে দাঁড়াই| এই মানুষটিই তো আধকোশা পাড়ের এই বিস্তৃত জমির মালিক ছিলো, সাতচল্লিশে দেশভাগ হয়েছিলো, পাকিস্তান হয়েছিলো, জিন্নাহর হাতে মুসলমানের রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিলো, কত হিন্দু তখন জলেশ^রী ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, কিন্তু হিন্দু যে হরিচরণ সেই হরিচরণ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায় নাই| এখানেই সে মাটি কামড়ে পড়েছিলো| এখানেই সে বীরদর্পে রামদা হাতে দাঁড়িয়েছিলো| — কোনঠে যামো? কোন দ্যাশে যামো? সেই দ্যাশে হামার আছে কাঁই? হেথায় হামার নাড়ি পোঁতা আছে| নাড়ির টান ছাড়িয়া কোনঠে যাবার কন হামাকে? — নাড়ির টান? এখানেই তার নাড়ি পোঁতা তবে? নদীর পাড়ে এই ফসলের জমিতে, এই বাঁশবনের কোন নিভৃতে তার নাড়ি? আমাদের নাভি হচ্ছে মায়ের সঙ্গে সংযোগের চিহ্ন বটে| জন্মের মুহূর্তে আমরা মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হই বটে, কিন্তু আমরা বড় হই, বৃদ্ধ হই, থেকে যায় আমাদের নাভিস্থলে সেই ক্ষতচিহ্ন যা একদিন ভ্রুণ আমাদের যুক্ত রেখেছিলো গর্ভধারিণীর সঙ্গে| এখানেই বুঝি টান লাগে, এই শুষ্ক ক্ষতটাতেই!
লোকেরা যদি এমন ভাবে, জমির মায়াতেই হরিচরণ ভারতে যায় নাই, থেকে গেছে পাকিস্তানেই, তাহলে তাকিয়ে দেখি সেই জমিও এমন কিছু মূল্যবান ছিলো না তখন| তখন শুধু ধানের জমি আর বাঁশবন ঝাউবন মাত্র| জমির মায়া যদি বলা হয়, তবে 888sport apps হবার পরপরই কেবল এই জমি মূল্যবান হয়ে ওঠে যখন জলেশ^রী শহর বড় হতে থাকে, যখন আধকোশা নদীতে বাঁধ দেয়া হয়, নদীপাড়ের এই জমি তখন ভাঙনের হাত থেকে বেঁচে যায়, এখানে শহরতলি গড়ে উঠতে থাকে, বাড়ি তোলার উপযুক্ত হয় নদীর পাড়, নদীর পাড়ে পার্ক রচিত হয়, বাজার বসে যায়, খেয়া নৌকার বদলে যখন পারাপারের জন্যে এনজিনচালিত ফেরি বোট এসে যায়| ততদিনে হরিচরণ প্রবল শ^াসকষ্টে জর্জরিত হয়ে থুত্থুরে বুড়ো, তার ছেলে সর্পাঘাতে মারা গেছে, তার ছেলের ছেলে শ্রীচরণকে তার মা কুসমি কুচবিহারে মামাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে সাবালক হয়ে ওঠার জন্যে| জমির দাম শতগুণ বেড়ে যাবার এ সকল সংবাদ হরিচরণ পায় কি পায় না, বিধবা পুত্রবধূ কুসমি তাকে এ-বিষয়ে অবহিত করে কি করে না, তার চেয়ে বড়, এই মাটিতেই জন্ম হরিচরণের এই মাটিতেই সে মৃত্যুর অপেক্ষা করে, এর চেয়ে ¯^াভাবিক তার কাছে আর কিছু নয়| জমি আছে জমিতেই, তার মূল্য নিয়ে হরিচরণের মাথাব্যথা নাই, তবে হ্যাঁ, সে চায় শ্রীচরণ বড় হয়ে কুচবিহার থেকে একদিন ফিরে আসবে, এই জমিতে সে তার সংসার গড়ে তুলবে, আর যখন মৃত্যু হবে হরিচরণের মুখাগ্নি সে করবে|
শ্রীচরণের মা কুসমি, বিধবা সে, সেও এই আশাতেই আছে যে, উত্তরাধিকারসূত্রে শ্রীচরণ একদিন এই জমির মালিক হবে, তার জন্যেই নদীপাড়ের এই বিশাল জমি দখলে রাখবার জন্যে সে সতর্ক বাঘিনীর মতো দিবসরাত্রি হামা দিয়ে আছে| বিশেষ করে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানকেই তার ভয়| লোকটা এর মধ্যে জমির অনেকখানি নিজ দখলে নিয়ে নিয়েছে, ঘর তুলেছে, দোকানপাট বসিয়েছে| এ সকল কথা জলেশ^রীর মানুষের মুখে মুখে| তারা বলাবলি করে, কুসমিকে একদিন নিকা করবে সাইদুর রহমান, আর সেই সূত্রেই নিজ দখল সে পাকা করবে| আজ রাতে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান যে কুসমির ঘরে এসেছে সে-কথাও জলেশ^রীর মানুষের কাছে অজানা নয়| তারা রাতের গভীরে স্ত্রীর পাশে শুয়ে গল্পকথা জুড়ে দেয় — দেখিস, তাঁই উয়াকে মোছলমান করিয়া নিকা করিবে| তারা এমনও বলে — আর যদি সে বেটি মোছলমান হইতে রাজি না হয় কি নিকা বসিবার না চায়, তবে শোন শুনিয়া রাখ, কুসমির শ^শুরকে তাঁই জানে মারি ফেলাইবে| একটা দুইটা খুন কন্ট্রাক্টরের কাছে কিছু নয়| হ্যাঁ, সাইদুর রহমানের খ্যাতি এমনটাই — সম্পত্তির লোভে লোকটা না করতে পারে এমন কিছু নাই|
আজ রাতে হরিচরণের মৃত্যু তাই জলেশ^রীর মানুষজনের কাছে হত্যা বলেই রটে যায়| বাজারে-বাজারে এ কথা লোকের মুখে-মুখে ফেরে| হরিচরণ যে বহুদিন থেকে দারুণ শ^াসকষ্টে শয্যাশায়ী, যেকোনো দিন তার মৃত্যু হতে পারে, লোকেরা এটা আমলেই আনে না| তারা বলে — আইজের রাইতে কন্ট্রাক্টর কুসমির ঘরে গেইছে একটা হেস্তনেস্ত আইজের রাইতেই করিতে| তারা এমনও বলে, কুসমিকে তাঁই জোর করি ধম্মনাশ করিতে চায়, হাফেজকে ডাকিয়া আনে মোছলমান করিতে, কুসমি রাজি না হইলে উয়াকে ন্যাংটা করি চড়াও হয়! লোকেরা বলে, 888sport promo code রাজি না হইলে কি 888sport promo codeর শরীরে প্রবেশ করা যায়! পাছরাপাছরিই সার হয়| অবশেষে গতিক না পায়া কন্ট্রাক্টর কুসমির শ^শুর বুড়া হরিচরণের গলা চিপি ধরে| তবে নে শালা, জমির দখল দিবু না তো তোর জানের দখল হামার! এই দিলোম তোকে শ্যাষ করি|
একটা খুনের ঘটনা হিসেবেই হরিচরণের মৃত্যু পল্লবিত হতে থাকে শহরে| দারোগার আনাগোনাও তারা লক্ষ করে সাইদুর রহমানের বাড়িতে| দারোগাকে তারা দেখে বড় হাসিহাসি মুখে সাইদুর রহমানের নাশতা উপভোগ করছে| মিষ্টি আসে, চা আসে, পান আসে, দারোগা বড় তৃপ্ত হয়ে হাত কচলাতে কচলাতে সাইদুর রহমানের বাড়ি থেকে জিপে উঠে চলে যায়| লোকেরা বলে, লাখো টাকার ঘুষ দিছে! ঘুষ না দিলে খুনের মামলা মিটি যায়? পাগলা মেহের চিৎকার করে — তফাৎ যাও! সব ঝুট হ্যয়! কিন্তু জলেশ^রীর মানুষ ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ পড়ে নাই| ঝুট তারা অনুভব করে নাই| তাদের কাছে প্রত্যক্ষ এখন শুধু হিন্দুর লাশ, মুসলমানের লাশ — হরিচরণের লাশ আর হাফেজ আবুল কাশেম বলরামপুরীর লাশ| (চলবে)