আটলান্টিকের এপার বা ওপার যেখানেই হোক না কেন, ২০০৩ সালের সেরা
বইয়ের তালিকায় একজন বাঙালি লেখিকার নাম অনিবার্যভাবে উপস্থিত। তিনি মণিকা আলি। তার প্রথম 888sport alternative link ব্রিক লেন নিউইয়র্ক টাইমসের সেরা বইয়ের তালিকায় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার তালিকায়। আবার ২০০৪ সালের প্রথম যে বেস্ট সেলারের তালিকা, তাতেও দেখছি একজন বাঙালি লেখিকা : ঝুম্পা লাহিড়ি এবং তার প্রথম 888sport alternative link নেমসেইক। গত বছরের শেষ থেকে তিনি সে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, এখনো সেখানেই রয়েছেন। এই দুই বাঙালি যখন পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হচ্ছেন, তখন আরেক বাঙালি, মণিকা ইউনুস, নিউইয়র্কের সেরা মঞ্চে জার্মান অপেরায় সোপরানো 888sport live chatী হিসেবে অবতীর্ণ হচ্ছেন। আরো আশ্চর্যের কথা শুনুন, ২০০৪ সালের নতুন বইয়ের যে তালিকা আমার হাতে এসেছে, তাতেও দেখছি আরেক দক্ষিণ এশীয় লেখিকা, নাম সামিনা আলি, তার প্রথম 888sport alternative link মাদ্রাজ অন রেইনি ডেইজ ।
ঝুম্পা লাহিড়ির বইখানা পড়া হয়নি, ফলে তা নিয়ে মন্তব্য করতে পারব না। কিন্তু ব্রিক লেন পড়ে এবং ইউরোপ-আমেরিকায় তার অভ্যর্থনা দেখে আমি একটু ভড়কে গেছি, এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি ঠিক এরকম একটি গত্বাঁধা পূর্ব-নির্ধারিত গল্প নিয়ে নির্মিত এই কষ্টকৃত গ্রন্থকে বছরের সেরা 888sport alternative linkের এই মর্যাদা কেন দেওয়া হচ্ছে। একটা কারণ সম্ভবত ‘গুড টাইমিং’। বইটা বাজারে এমন সময় ছাড়া হয়েছে যখন মুসলমানদের নিয়ে, বিশেষত মুসলমান মেয়েদের নিয়ে, পশ্চিমে প্রবল আগ্রহ। তো, মুসলমান মেয়েদেরই গল্প লিখেছেন মণিকা, তবে তারা 888sport appsের মুসলমান মেয়ে। পাঠক হিসেবে আমাদের আগ্রহের সেটি একটি বাড়তি কারণ। দুই বোনের গল্প লিখেছেন মণিকা, তাদের একজন দেশে, আরেকজন বিলেতে। আহা রে, দুজনেরই কি কষ্ট কি কষ্ট! বড় বোন নাজনিন, সে পড়ে ছিল কোথায় সেই ময়মনসিংহে। তার চেয়ে বিশ বছরের বড় এক লন্ডনি বরের সাথে তার বিয়ে দেওয়া হলো। তারপর যা হবার তাই। সে বর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হলে কি হবে, বৌ মানে প্রজনন ও রন্ধন, এর বাইরে সংসারে তার আর কোনো দায়-দায়িত্ব থাকতে পারে, তার কোনো ভূমিকা থাকতে পারে, সে ধারণা পর্যন্ত তার নেই। বৌ পেয়ে সে খুশি, কারণ যেমন বৌ তার কাম্য, নাজনিন ঠিক তেমনি হয়েছে, হোক না গ্রাম থেকে উঠে আসা। সে শান্ত, সুশীল। তিন চড়ে রা করে না। সে না বেঁটে, না লম্বা। না সুন্দর, না কুৎসিত। তার পাছা একটু সরু, কিন্তু সন্তান ধারণের জন্যে তা যথেষ্ট প্রশস্ত।
‘সবচেয়ে বড় কথা, ঘরের কাজ-কম্মে সে একদম পাক্কা। ঘর ধোয়া- মোছা, রান্না-বান্না, এই সব। আমার একমাত্র আপত্তি, মেয়েটা আমার ফাইলগুলো ঠিক মতো গুছিয়ে রাখতে পারে না। পারবে কি করে, ইংরেজি জানে না যে। তাতে অবশ্য আমার কোনো অভিযোগ নেই। আগেই তো বলেছি, গ্রাম থেকে আসা মেয়ে, একদম পরিষ্কার, কোনো ভেজাল নেই।’
একই ঘরে স্বামী-স্ত্রী বাস করে, অথচ তারা যেন দুটি অচেনা মানুষ। দিন আসে রাত যায়। স্বামীর ইচ্ছে হলে রমণ করে, আর স্ত্রী মাঝে মাঝে জানালা খুলে আকাশ দেখে। বাইরের পৃথিবী মানে টেলিভিশন। যে দেশে সে বাস করে তার সাথে কোনো পরিচয় নেই, নেই কোনো সংশ্রব। তার এই যে জীবন সেখানে ভালোবাসার স্থান কোথায়? স্বামীর কাছ থেকে তা পাবার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বিয়ের অনেক বছর পর, নাজনিনের মেয়ে শাহানা তাকে প্রশ্ন করে, ‘মা, বাবাকে কখনো কি তুমি ভালোবেসেছ?’ জবাবে নাজনিন বলে, ‘তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ, অনেক ভাগ্যে এমন স্বামী পেয়েছি।’ ‘ভাগ্য বলতে বলছো সে তোমাকে পেটায় না, তাই তো?’ ঝটপট প্রশ্ন করে শাহানা।
নাজনিনের জীবন যদি হয় একঘেয়ে, নিরানন্দ ও ভালোবাসাহীন, তার ছোট বোন হাসিনা, তার জীবন আরো নির্মম। কি রূপসীই না সে ছিল। ভালোবেসে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বিয়ে করল, কিন্তু এমনি ভাগ্য, বিয়ের সুখ তো তার কপালে জুটলই না, শেষ পর্যন্ত কিনা প্রাণ ধরে রাখতে বেশ্যাবৃত্তিতে নামতে হলো। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে নিজের অভিশপ্ত জীবনের কাহিনী দীর্ঘ বিস্তারিত চিঠিতে লিখে জানায় বিলেতে থাকা বোনকে। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, সে নিজে সুখী নয় তাতে কি, বড় বোন তো সুখী হয়েছে। (নাজনিন ইয়েস নো-ভেরি গুড-এর বাইরে ইংরেজি জানে না। হাসিনারও জানার কথা নয়। তবুও তাকে কেন ভাঙা ভাঙা, কখনো কখনো অর্থহীন ইংরেজিতে চিঠি লিখতে হয়, সে মিস্ট্রি আমার পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।)
মুসলমান মেয়ে বলতে আটলান্টিকের এপারে বা ওপারে যা বোঝানো হয়, মণিকা আলির বইতে তার প্রতিটি উপাদানই উপস্থিত। আমি বলছি না তিনি এর সবই বানিয়ে বানিয়ে লিখেছেন। মোটের ওপর কাহিনীটি তো সত্য। মুসলমান মেয়ে মাত্রই তো অধিকারহীন, তা সে ময়মনসিংহে বাস করুক বা বিলেতে। কিন্তু আমরা ফিকশান কি পড়ি কাহিনী কতোটা সত্য তা যাচাই করার জন্যে, না সে কাহিনী থেকে মানবিক অভিজ্ঞতার একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা-তার ইন্টারপ্রিটেশন—জানার জন্যে? ইঙ্গ-মার্কিন পাঠক এ বই পড়ে এত আনন্দ কেন পেয়েছে, তা বোঝা মোটেই কষ্টকর নয়। তাদের মাথার মধ্যে মুসলমানদের একটি ছবি রয়েছে। সে ছবির একটি মাত্র রং, একটি মাত্র মাত্রা, একটি মাত্র কোণ। মণিকা আলি সে ছবিটিই বহু যত্ন করে এঁকেছেন, প্রবল দক্ষতার সাথে এঁকেছেন। মাথার মধ্যে ঢোকানো ঐ ছবিটির সাথে এই ছবির মিল পেয়ে তারা যা জানতেন তার পূর্ণ প্রত্যয়ন পাওয়া গেল জেনে মহা আনন্দিত হয়েছেন। ফলে মণিকা আলিকে ‘অথেন্টিক’ বলে সনদপত্র দিয়ে অভিনন্দিত করতে দ্বিধা করেনি বিলেতের গার্ডিয়ান বা নিউইয়র্কের টাইমস। শুধু মুসলমানদের কথা নয়, অভিবাসী মুসলমানদের বিষয়েও মণিকা আমাদের ইঙ্গ-মার্কিন পাঠক-সমালোচককে খুশি করার বিস্তর মাল-মশল্লা দিয়েছেন। তিন দশক ধরে বিলেতে থাকলে কি হবে, ব্রিক লেনের বাঙালিরা তাদের ঐ দেড় হাত পৃথিবীর বাইরে একপা বাড়াতেও নারাজ। ঐ দেড় হাতের পরেই যে আশ্চর্য সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় জগৎ রয়েছে, এমনি কুপমণ্ডুক এই ইমিগ্রান্ট বাঙালিরা যে তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক গড়তে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী তারা। তাদের মাথার মধ্যে এখনো সেই 888sport apps, হাতে কোরান। শ্বেত সভ্যতার বিজয়ের সামনে তারা অসহায়, কিন্তু সে অসহায়ত্ব তারা ঢাকে এক ধরনের কৃত্রিম উচ্চম্মনতা দিয়ে। তাদের অনেকেই মুখে বলে ফিরে যাব, ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু কখনোই ফিরে যায় না। এদের ছেলেমেয়েরা, যারা এখানে বেড়ে ওঠে শেকড়হীন, সংহতির নামে তারা আশ্রয় খোঁজে মৌলবাদে ও সহিংসতায়। টিভির পর্দা থেকে সংগ্রহ করা তথ্য নিয়ে অভিবাসীদের এই যে গৎবাঁধা জীবনকাহিনী এসব দেশে প্রচলিত, মণিকার এই 888sport alternative linkে তার বাইরে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয়নি। একজন ভারতীয় সমালোচক মণিকার 888sport alternative linkকে বলেছেন, ক্লিশে ভরা। আমি বলি ‘প্রেডিকটেবল’।
অন্য আর যে কারণে এই 888sport alternative linkটি সাদা মানুষদের কাছে অভিনন্দিত হয়েছে তা হলো তাদের সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে মণিকার দ্বিধাহীন উচ্চারণ। তার বয়ানে নাজনিনের মতো সুন্দর-নিরীহ মেয়ের জীবনেও যে শেষ পর্যন্ত প্রেম আসে, আসে মুক্তির সম্ভাবনা, তার কারণ এক মুক্ত পৃথিবীতে তার অবতরণ। এই মুক্তি অথবা প্রেম, হোক না তা পরকীয়া সম্পর্কের ভেতর দিয়ে, 888sport appsে নাজনিনের জীবনে কখনোই সম্ভব ছিল না। করিম নামে যে যুবকটির সাথে তার দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা তাকে নৈতিক দ্বন্দ্বে নিক্ষেপ করে বটে, কিন্তু সম্ভাবনার যে অনুদ্ভাসিত প্রদেশটি তার সামনে এর ফলে উন্মুক্ত হয়, এক প্রবল ঝড়ো হাওয়ার মতো তার বিশ্বাস ও অনুভূতির ভিতকে তা নাড়িয়ে দেয়। আহা, এখানে জীবন কত সুন্দর! এমনকি আইস স্কেটিংয়ের নিত্যনৈমিত্তিক ক্রীড়া অভিজ্ঞতার মধ্যেও মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেখে নাজনিন। “This is England, anything is possible,’ তার 888sport alternative linkের প্রায় শেষ পাতায়, যেন তার অভিসন্দর্ভের উপসংহার উচ্চারিত হচ্ছে, এই ভাবে কথাটি লেখেন মণিকা। আর সে উপসংহার পড়ে নিউইয়র্ক টাইমসের বিজ্ঞ পুস্তক সমালোচক জেনেট মেসলিন আনন্দিত হয়ে লেখেন, হ্যাঁ, এই ভাবেই, এই ভাবেই নাজনিন তার নিরাসক্ত চেতনাকে দুমড়ে মুচড়ে নিয়ে যায় যে প্রবল শক্তি, তার অস্তিত্বের উপস্থিতি টের পেতে থাকে।
এরপর শুধু বাকি থাকে দুহাত তুলে চেঁচিয়ে বলা, হালেলুইয়া!
এই ধরনের বইকে এদেশে বলা হয় অভিবাসী অভিজ্ঞতার বয়ান। এর আগে ভারতী মুখার্জীকে দেখেছি, তিনিও ইমিগ্রান্ট এক্সপেরিয়েন্স’-এর নামে কতকগুলি প্রচলিত ধারণাকে পোক্ত করতে সাহায্য করেছেন। তার জেসমিন 888sport alternative linkকে বিল ময়ার্সের মতো নামজাদা বুদ্ধিজীবী ‘আলটিমেট ইমিগ্রান্ট এক্সপেরিয়েন্স’ বলে অভিনন্দিত করেছেন। সেখানেও দেখেছি, অধিকারহীন, অভাগী ও নিগৃহীতা এক পাঞ্জাবি পল্লীবালা আমেরিকায় এসে কিভাবে আত্মসম্মান অর্জন করে তার তেলেসমাতি গল্প। অথবা তার ছোটগল্প সংগ্রহ দি মিডলম্যান অ্যান্ড আদার স্টোরিস -এর সর্বত্রই দেখি অভিবাসী রমণীর কঠোর দুর্ভোগের কাহিনী এবং শ্বেত সভ্যতার হাত ধরে তার জীবনে মুক্তি স্ফূর্তি ও হিল্লোল কিভাবে উদয় হয়, তার দীর্ঘ বর্ণনা।
কেউ কেউ মণিকা আলির গ্রন্থটিকে জাডি স্মিথের 888sport alternative link হোয়াইট টিথ- এর সাথে তুলনা করেছেন। জামাইকার অভিবাসী স্মিথের লেখা সে বইয়ে কেন্দ্রেও বিলেতে বাঙালি অভিবাসীদের কাহিনী, সেখানেও শেকড়হীন জীবনের অহর্নিশ বৈপরীত্যের বিবরণ। কিন্তু মণিকার 888sport alternative linkের সাথে তার যে কোনো তুলনা শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্রসমূহের উৎসগত সমান্তরালতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যে তারা একেবারেই একে অপরের বিপরীত। মণিকার বইটি যদি ‘ডেলিবারেটলি আইডিওলজিকাল’ মনে হয় তো জাড়ি স্মিথের বই ‘ডেলিবারেটলি অ্যান্টি-আইডিওলজিকাল’। মণিকার 888sport alternative linkটি বাঙালি মুসলমান মেয়েদের গল্প, সে গল্পের একাংশ 888sport appsে, আরেক অংশ বিলেতে। স্মিথের 888sport alternative link বহু-সাংস্কৃতিক, মালটি-কালচারাল, পূর্ব- নির্ধারিত কোনো মোড়কেই তাকে ফেলা অসম্ভব। বিলেতের রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পাশাপাশি বসবাসরত তিনটি পরিবারের অভিজ্ঞতার একদম মৌলিক একটি কাহিনী। আজকের বিলেত, অন্ততপক্ষে তার একাংশ একটি শংকর সভ্যতা। যে কোনো শংকর অভিজ্ঞতার প্রধান বৈশিষ্ট্য বৈপরীতা কন্ট্রাডিকশন। বাবা শখ করে ছেলের নাম রেখেছেন মাগিদ মাহফুজ মুরশেদ ইকবাল, কিন্তু ছেলে সে নাম কেটেছেঁটে করতে চায় মার্ক স্মিথ। বাবা চায় ছেলেকে নিয়ে হজে যেতে, ছেলে চায় স্কুলে যেতে, হজে যাবার সময় নেই তার। বাবা প্রকাশ্যে সারাক্ষণ আল্লাহ-রসুলের নাম জপছেন, কিন্তু সুন্দরী শ্বেত রমণী দেখলে তার রমণ-ইচ্ছা জেগে ওঠে। ইংরেজিকে অসভ্য বলে সারাক্ষণ শাপ-শাপান্ত করছেন তিনি, কিন্তু নিজে দেশে না ফিরে জোর করে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন তার প্রতিভাবান বড় ছেলেটিকে। আর তার মতো বাঙালি বানাবেন ভেবে যে পুত্রটিকে নিজের কাছে রেখে দিলেন, বড় হয়ে সে হয়ে উঠল আন্ত এক মৌলবাদী শুয়োর। দেশে ফিরে গেল যে পুত্র, বড় হয়ে বিলেতে সে ফিরে এল পাক্কা সাহেব হয়ে। অভিজ্ঞতার এই বিপরীতমুখী ধারা, তার সার্বক্ষণিক আকস্মিকতা ও নিরীহ ঔৎসুক্যের কারণে হোয়াইট টিথ আমাদের কামড়ে ধরে রাখে। তাছাড়া জাডি-র 888sport alternative linkের আসল প্রাণশক্তি তার পরিহাসবোধ, তার আইরোনি, এবং পাশাপাশি তার বিষণ্ণতা। অভিবাসে স্বপ্ন জন্ম নেয় না, সেখানে ক্রমশ স্বপ্ন মৃত্যুবরণ করে। কোথাও সেকথা উচ্চারণ না করে সেই স্বপ্নমৃত্যুর কাহিনী লেখেন জাড়ি। দমফাটানো হাসির গল্প ‘হোয়াইট টিথ ‘ অথচ তার প্রতিটি পাতায় অশ্রুর লবণদানা। ব্রিক লেনের সাথে তার প্রধান তফাৎ এইখানেই। জাড়ি কোথাও তার উদ্ভট অভিবাসী চরিত্রসমূহের জন্যে সহানুভূতি ভিক্ষা করেন না। অন্যদিকে মণিকা তার পাঠককে ডেকে বলেন, দেখো দেখো, এরা কি কষ্টে আছে, প্লিজ, এদের একটু দয়া করো।
দুই
২০০৩ সালের কোনো তালিকাতেই যে বইটি বেস্ট সেলার হয়নি—যদিও কোনো সমালোচকই যাকে উপেক্ষা করতে পারেননি—তা হলো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের 888sport sign up bonusকথার প্রথম পর্ব, লিভিং টু টেল দ্য টেল । বইটির জন্যে আমরা অনেকদিন অধীরভাবে অপেক্ষায় থেকেছি। আমরা জানি মার্কেজ ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বভাবতই উদ্বিগ্ন আমরা তার জন্যে, কিন্তু তার পরেও স্বার্থপরের মতো তার প্রত্যাশিত 888sport sign up bonusকথার জন্যে আন্তরিকভাবে তার সুস্থতা প্রার্থনা করেছি। কি আশ্চর্য, প্রার্থনার ফল যে কখনো কখনো মেলে, তার প্রমাণ এই বই।
নামেই 888sport sign up bonusকথা, আসলে এটি মার্কেজের আরেকটি সেরা ফিকশান। কাগজে-কলমে মার্কেজের জীবনের প্রথম ৩০ বছরের কাহিনী হলেও আসলে এটি একজন শক্তিমান লেখকের-তিনি মার্কেজ বা অন্য যে কেউই হতে পারেন- আত্ম-আবিষ্কার ও স্ফুরণের প্রামাণিক বৃত্তান্ত। সবচেয়ে বড় কথা, মার্কেজের সেরা 888sport alternative link শতবর্ষের নির্জনতা-র পেছনে আসল শক্তি ও সঞ্চয় যে আরাকাতাকা নামের একটি গ্রাম, এই গ্রন্থে রয়েছে তার প্রথম নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা। শতবর্ষের নির্জনতায় আমরা মাকোন্দো নামে একটি অঞ্চলের ও তার মানুষের সাথে পরিচিত হই। এটি যে কোনো কাল্পনিক গ্রাম নয়, মার্কেজের 888sport sign up bonusতে তা দীর্ঘদিন জীবনযাপনের ঘামে মাখা, তা আমরা আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু এই প্রথম স্বয়ং লেখক নিজে আমাদের জানালেন কিভাবে তিনি সেই গ্রামটিকে তার চেতনার বিশ্ব হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন। তবে সেকথা বলার আগে মার্কেজের জন্মকথা জানা দরকার, সেটিও কল্পনা ও বাস্তবের রসদে নির্মিত এই 888sport sign up bonusকথনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার পিতা-মাতার প্রণয় ও বিবাহ, যার বিবরণ লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা 888sport alternative linkে মার্কেজ নিজেই দিয়েছেন, লিভিং টু টেল দ্য টেল –এ আমাদের আরেকবার ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি। আরাকাতাকা গ্রামের সর্বশেষ গোষ্ঠীপতি কর্নেল মার্কেজ তার অতি রূপসী নাতনি লুইসা সান্তিয়াগো-কে এক নগণ্য টেলিগ্রাফ অপারেটর গাব্রিয়েল এলিজিও-র সাথে বিবাহে কখনোই রাজি ছিলেন না। তার বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও সে বিবাহ সম্পন্ন হলে লুইসা বা সান্তিয়াগো কাউকেই তিনি তার ঘরে আশ্রয় দেননি। শুরু হলো একটি অঘোষিত যুদ্ধ। সে অবস্থার পরিবর্তন হলো যখন এই দুজনের সংসারে একটি সন্তানের আগমনবার্তা ঘোষিত হলো:
তাদের বিয়ের দুমাস পর হুয়ান দে দিওস এই মর্মে একটি টেলিগ্রাম পেলেন যে, লুইসা সান্তিয়াগো সন্তানসম্ভবা। অবিলম্বে সে সংবাদ পৌঁছে গেল আরাকাতাকা গ্রামে। সে খবর (কর্নেল মার্কেজের) পরিবারের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিল। (বিনানুমতিতে বিবাহের ফলে সৃষ্ট) তিক্ততা মিনা তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তা সত্ত্বেও সে এবং কর্নেল তাদের অস্ত্র সম্বরণে সম্মত হলেন, যাতে করে নবদম্পতি তাদের গৃহে এসে উঠতে পারে। ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। কয়েক মাস ধরে ভালোমানুষী ও যুক্তিযুক্ত প্রতিরোধের পর গাব্রিয়েল এলিজিও সবশেষে সম্মত হলেন যে তার স্ত্রী তার বাবা- মায়ের কাছে এসে সন্তান প্রসব করবে।
গার্সিয়া মার্কেজ, যাকে তার বন্ধুরা সপ্রেমে ‘গাবো’ বলে ডাকেন, আরাকাতাকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ। মোট ১১ ভাই- বোনের মধ্যে তিনিই প্রথম। তার জন্মের দিন ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। জন্মগ্রন্থি কাটতে যেয়ে তার পরিবারের পুরনো ধাই সান্তোস ভিয়েরো-র হাতে সেদিনই তিনি প্রায় মারা যাচ্ছিলেন। এখন ঠিক কি করা উচিত, বুড়ি ধাই ঠাহর করতে পারছিলেন না। আর তার খালা ফ্রান্সিসকো তখন রাস্তার দিকে দৌড়ে এভাবে পাগলের মতো ‘ছেলে হয়েছে, ছেলে হয়েছে’ বলে চিৎকার করছিলেন যে লোকে ভাবছিল সে বাসায় বুঝি আগুন লেগেছে। তারপর, যেন বিপদ ঘণ্টা বাজাচ্ছেন, এভাবে খালা বললেন, ‘ছেলে, কিন্তু গলায় ফাঁস লেগে সে মরতে বসেছে।’
মার্কেজ তার শিশুকাল কাটিয়েছেন এই আরাকাতাকা গ্রামে, তার বিচিত্র পিতামহের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে। কর্নেল মার্কেজের জীবনের সবকিছুই ছিল অতি- বর্ণিল। তার সাহসের কাহিনী, তার প্রণয়ের কাহিনী, তার ক্রোধের কাহিনী সবই বাহুল্যে রঞ্জিত। নিজের তিনটি সন্তান ছাড়াও আরো নয়টি অবৈধ সন্তানের জন্মদাতা তিনি, যাদের প্রত্যেককেই তার স্ত্রী মাতার স্নেহে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই দুজনের নৈকট্য ও স্নেহের প্রাবল্যে গ্রামে যে শিশুকাল অতিবাহিত করেন মার্কেজ, অর্ধশতাব্দী পরে তা-ই মাকোন্দো গ্রাম হয়ে ফিরে আসে শতবর্ষের নির্জনতায়। কর্নেল মার্কেজ রূপান্তরিত হন কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ায়। মার্কেজ নিজেই সেই পুনরুদ্ধারের কাহিনী বলেছেন এই 888sport sign up bonusকথায়। তার পিতা-মাতার মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর পৈতৃক বাটি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে আরাকাতাকায় ফিরে আসেন লুইসা, সাথে জ্যেষ্ঠ পুত্র মার্কেজ। মাতার সাথে সেই 888sport slot gameের বর্ণনা দিয়েই তার 888sport sign up bonusকথার শুরু। এই উদ্বোধনের একটি কারণ এই যে ঠিক এই আরাকাতাকায় এসেই যুবক মার্কেজ নিশ্চিত হন লেখক হওয়া ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। তার পক্ষে অন্য আর কোনো পেশা গ্রহণ অসম্ভব। মাকে সে কথা 888sport slot gameকালেই তিনি জানিয়েছিলেন। লুইসা তাতে কেবল বিস্মিতই হননি, ক্রুদ্ধও হয়েছিলেন। গাবোর পিতা অনেকবারই যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, যেমন সব পিতাই বলেন, বেঁচে থাকার জন্যে কোনো একটা পেশা চাই, চাই কোনো বিষয়ে একটা ডিগ্রি। পুত্রকে সে কথা 888sport app download for android করিয়ে দিয়েছেন মা, তারপর সে যুক্তির পক্ষে সমর্থন আদায় করতে যেয়ে এমন এক বৃদ্ধকে তিনি সাক্ষী মানলেন যিনি উল্টো আবেগ ও যুক্তির প্রাবল্যে গাবোর সে সিদ্ধান্তকে এভাবে সমর্থন দিয়ে বসলেন যে মাতার পক্ষে প্রতিরোধের শক্তি আর অবশিষ্ট থাকল না।
সেই বৃদ্ধই বলেছিলেন, ভালোবাসার শক্তির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে একমাত্র লেখকের কল্পনার শক্তি। মার্কেজের প্রতিটি লেখায় আমরা সেকথারই প্রমাণ পেয়েছি।
আরাকাতাকায় এসে গাবো বুঝেছিলেন তার এই গ্রামের মাটিতে কান পাতলেই তিনি শুধু তার দেশ নয়, তার মহাদেশের শতবর্ষের কাহিনীর সন্ধান পেয়ে যাবেন। কিন্তু তাই বলে কেউ যদি শতবর্ষের নির্জনতায় সত্যি সত্যি বইয়ে পড়া ইতিহাস খুঁজতে যান, তাহলে ভীষণ ঠকে যাবেন। তিনি 888sport sign up bonus খুঁড়ে যাপিত জীবনের ভিত্তিতে নির্মাণ করছেন এমন একটি সম্পূর্ণ নতুন পৃথিবী, যেখানে সত্য ও কল্পনা পাশাপাশি বাস করে, যেখানে সম্ভব ও অসম্ভবে কোনো ফারাক নেই, যেখানে কঠিন বাস্তব ও শুদ্ধ রূপকথা অভিন্ন অর্থ বহন করে। শতবর্ষের নির্জনতা সেরকম একটি 888sport alternative link। তার 888sport sign up bonusচারণেও দেখি সেই একই ন্যারেটিভ টেকনিক। কখন বাস্তব শেষ হয়ে কল্পনা শুরু হয়, কোনটা মেমোয়ার্স, কোনটা ফিকশান, সে কথা বোঝা দুঃসাধ্য। আর সে কারণেই লিভিং টু টেল এ টেল অন্য আর যে কোনো 888sport sign up bonusকথা থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। মার্কেজ এখানে আমাদের জানিয়েছেন, তার পিতামহ ও মাতামহের কাছ থেকে শোনা গল্পই লেখক হিসেবে তার আসল পুঁজি। তারা দুজনেই দারুণ গল্প বলতে পারতেন। এক গল্প বলতে গিয়ে তারা কখন অন্য গল্পে চলে গেছেন, কখন প্রকৃত চরিত্রের সাথে রূপকথা জড়িয়ে ফেলেছেন, তা বোঝা অসম্ভব ছিল। (এটা মোটেই বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার নয় যে মার্কেজ অন্যত্র লিখেছেন, কর্নেল মার্কেজ মারা যাবার পর তার জীবনে ‘ইন্টারেস্টিং’ কিছুই ঘটেনি।) এই দাদা ও দাদিমার গল্প বলার ধরনটাই ফিকশান লিখতে গিয়ে ধার নিয়ে বসলেন মার্কেজ। এই সেই টেকনিক, যাকে পৃথিবীর মানুষ গভীর ভালোবাসায় জাদুবাস্তবতা নামে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু তার দীক্ষাগুরু যে সেই দাদিমা, তা কি আগে আমরা জানতাম ?
মার্কেজের 888sport alternative linkের ব্যাখ্যায় পেরুর লেখক মারিও ভারগাস ইয়োসা লিখেছিলেন, তার প্রতিটি 888sport alternative link আসলে একসাথে একাধিক-প্লুরাল। একে অপরের বিপরীত বলে আমরা যা ভাবি, তা সেখান নির্বিবাদে পাশাপাশি অবস্থান নেয়। তার ফিকশান তাই একদিকে ঐতিহ্যিক, আবার অন্যদিকে আধুনিক; তা একদিকে আঞ্চলিক, আবার অন্যদিকে বিশ্বজনীন; তা কাল্পনিক ও বাস্তবধর্মী। লিভিং টু টেল এ টেল সে নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে শুধু কল্পনার জোরে কাহিনী ফেঁদে বসেন মার্কেজ। প্রকৃতপক্ষে লেখক হবার জন্যে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নিত্যদিনের দারিদ্র্যর মুখোমুখি হতে হয়েছে, হতাশার মোকাবিলা করতে হয়েছে। কল্পনা তার প্রধান আশ্রয়, তা ঠিক, কিন্তু সে কল্পনাকে পোক্ত করেছে ‘বই, বই আর বই’। শুধু তার নিজের মহাদেশের নয়, উত্তর আমেরিকার ও বিশেষত ইউরোপের অনেক লেখকই তার প্রিয়। সফোক্লিস, ফকনার, জয়েস, কাফকা ও দস্তয়েভস্কি, এঁরা তার প্রিয় লেখকদের তালিকায় সর্বাগ্রে। এই 888sport sign up bonusকথায় তাঁদের সবার প্রতি ঋণের স্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। অন্যত্র মার্কেজ লিখেছেন, প্রতিটি নতুন ভাবনার পেছনে রয়েছে শতবর্ষের 888sport live football। অগ্রজ লেখকদের প্রতি তার স্বীকৃতি থেকেই বোঝা যায় তার এ কথার অর্থ।
এই গ্রন্থের শুরু লেখক হিসেবে তার অঙ্কুরোদগম থেকে। তা শেষ হয় লেখক হবার নিবেদিত বাসনায় তার ইউরোপ যাত্রা দিয়ে। মাত্র ৫০০ পাতার বই। আমরা অপেক্ষায় থাকব আরো ১৫০০ পাতা পড়বার জন্যে, তার সে যাত্রার বিবরণ পড়বার জন্যে।
তিন
কিন্তু যে বইটি ২০০৩ সালে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি সাড়া তুলেছে তা 888sport alternative linkও নয়, 888sport sign up bonusকথাও নয়। সেটি একটি রাজনৈতিক স্যাটায়ার, আল ফ্রাঙ্কেনের লাইস অ্যান্ড দি লাইং লায়ার্স হু টেল দেম: এ ফেয়ার অ্যান্ড ব্যালান্সড লুক অ্যাট দি রাইট (Lies and the Lying Liars Who Tell Them: A Fair and Balanced Look at the Right ) । ৪০০ পাতার দম ফাটানো হাসির বই, কিন্তু হাসতে হাসতে যে কথাগুলো ফ্রাঙ্কেন বলেন, তা মোটেই হাসির নয়।
এক সময় বলা হতো আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে উদারনৈতিক বা বামপন্থী সাংবাদিকদের 888sport free betধিক্য রয়েছে। দেশের মানুষ যতোটা মধ্যপন্থী বা ডানঘেঁষা, সাংবাদিকেরা ততোটা নন। কিন্তু গত তিন বছরে, জর্জ বুশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকে, এ দেশে তথ্যব্যবস্থা বিস্ময়কর রকম দক্ষিণমুখী হয়েছে। সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা এখন পরস্পরের মিত্র, অংশীদার, একথা নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সিএনএন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি তথাকথিত মূলধারার সংবাদমাধ্যম সম্বন্ধে বলা যায়। সাংবাদিকের জন্যে তার পেশাদারিত্বের চেয়ে দেশপ্রেম অধিক জরুরি, একথা তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকেরা (যেমন টাইমসের জুডিথ মিলার) এখন কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই বলছেন। পেশাদারিত্বকে খরচার খাতায় ফেলে এই দেশপ্রেমকে গলার মালা বানাতে দেখি ইরাক যুদ্ধের প্রশ্নে। সে যুদ্ধ জায়েজের লক্ষ্যে সরকার যে দাবি করছে তা সত্য কি মিথ্যা তা যাচাইয়ের পরিবর্তে উল্টো তা প্রতিষ্ঠিত করতে সাংবাদিকদের সচেতন আগ্রহ দেখে বিস্মিতই হয়েছি। আমি প্রান্তবর্তী বা ফ্রিঞ্জা সংবাদ-মাধ্যমের কথা বলছি না, বলছি মূলধারার কথা। এই মিথ্যাচারে সবচেয়ে বেশি যারা লিপ্ত তারা হলো এদেশের রেডিও টক-শো ও টিভি টক- শো সমূহ। আল ফ্রাঙ্কেন-এর এই অতি সময়োপযোগী বইটিতে সে কথা কাগজে-কলমে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
ফ্রাঙ্কেনের প্রধান পরিচয় কমেডিয়ান হিসেবে। এদেশে অতি জনপ্রিয় টিভি শো ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ অনুষ্ঠানে তিনি একসময় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। দক্ষিণপন্থী লেখক-সাংবাদিকেরা বিল ক্লিনটনকে তাদের আদর্শগত প্ল্যাটফর্ম থেকে আক্রমণ শুরু করলে ফ্রাঙ্কেন কলম ধরেন। এটি তার পঞ্চম রাজনৈতিক স্যাটায়ার। এখানে ফ্রাঙ্কেনের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ফক্স নিউজ টিভি এবং এদেশের কতিপয় গোঁড়া কলাম লেখক। এরা টিভির পর্দায়, রেডিওর মাইকে বা সংবাদপত্রের পাতায় যে কথা সত্য বলে দাবি করেন, অনেক সময় তা হয় আদর্শগতভাবে প্রণোদিত বা সরাসরি মিথ্যাচার। তার গ্রন্থের একটি বড় অংশই ফ্রাঙ্কেন ব্যয় করেছেন ফক্স নিউজের মুখ্য হোস্ট বিল ও’ রাইলি-কে ঘিরে। ইরাক নিয়ে, ডেমোক্রাটদের নিয়ে এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ও’ রাইলির মিথ্যাচারের একটি ক্যাটালগ পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। ইরাকে মারণাস্ত্র প্রসঙ্গে বা ইসলামি সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে এদেশের সরকারি ভাষ্যের সাথে ও’ রাইলির বিবরণের কোনো ফারাক নেই। এ কথা মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে এই ভাষ্যকারের কাজ প্রতিটি সরকারি দাবির ওপর সিলমোহর জুড়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। ও’ রাইলি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধকে জায়েজ করতে এক সময় মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরান-কে হিটলারের আত্মজীবনী মাইন কেম্পফ-এর সাথে তুলনা করেছিলেন। পরে অবশ্য রাইলি দাবি করেছিলেন তিনি সেকথা বলেননি। আর তাই নিয়ে এক প্রকাশ্য সভায় আল ও বিলের হাতাহাতির কথা এদেশে সর্বজনবিদিত। এই গ্রন্থে সে বিতর্কে ফিরে গেছেন ফ্রাঙ্কেন। বিল ও’ রাইলি যে কত বড় মিথ্যাচারী তা প্রমাণের জন্যে ফ্রাঙ্কেন তার ব্যক্তিগত ক্রেডেনশিয়াল নিয়েও টান দিয়েছেন। সাংবাদিকতায় সাফল্যের জন্যে তিনি দুটি প্রধান 888sport app download bdের দাবি করেছেন। ফ্রাঙ্কেন প্রমাণ করে ছেড়েছেন, আসলে তিনি পেয়েছেন একটি। ও’ রাইলির অসংখ্য উদ্ধৃতি যে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ফ্রাঙ্কেন তার ভুরি ভুরি প্রমাণও দিয়েছেন।
শুধু ও’ রাইলি কেন, রক্ষণশীল ভাষ্যকার অ্যান কুলটার ও টিভি টক-শো হোস্ট শন হানিটি-কেও নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন ফ্রাঙ্কেন। একাধিক রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ও খোদ প্রেসিডেন্ট বুশও তার রোষ থেকে পরিত্রাণ পাননি। প্রকৃতপক্ষে, তার আক্রমণের আসল লক্ষ্যই হলেন জর্জ বুশ। গ্রন্থটি শুরুই করেছেন ঈশ্বর তাকে কিভাবে সরাসরি এই বইটি লিখতে নির্দেশ দিলেন তা নিয়ে। কাল্পনিক সে কথোপকথন-মাধ্যমে ছোড়া বর্শাটি যে আসলে বুশের ঈশ্বরভক্তির দিকে নির্দেশিত, তাতে অবশ্য কোনো রাখঢাক নেই। মিনেসোটার জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ সিনেটর পল ওয়েলস্টোনের মৃত্যুর পর তার শোকসভার বিবরণ নিয়ে ডান ও কোনো কোনো মধ্যপন্থী তথ্যমাধ্যমে যে বাড়াবাড়ি হয়, তারও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন তিনি। ফ্রাঙ্কেনের গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্য হলো এসবই তিনি করেন হাসি-ঠাট্টার ভেতর দিয়ে। কখনো কখনো তার ভাষা স্কুলতায় পর্যবসিত হয়, কিন্তু এদেশের রাজনৈতিক এন্টারটেইনমেন্টের সাথে যারা কমবেশি পরিচিত, তাদের চমকাবার মতো কিছু নেই। তার প্রতিটি তথ্য যাচাই করবার জন্যে ফ্রাঙ্কেন হার্ভার্ড বিশ্ব দ্যালয়ের একদল ছাত্রকে পেয়েছিলেন। তাদের কাজই ছিল ইন্টারনেট ও পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে তথ্য-প্রমাণ হাজির করা। রক্ষণশীল ভাষ্যকারেরা কি দাবি করেছেন, আর সাওলে কি ঘটছে, ফুটনোটসহ তার তথ্য-প্রমাণ হাজির করায় তাদের হাঁড়ি হাটের মাঝখানেই ভেঙে দিয়েছেন ফ্রাঙ্কেন এই গ্রন্থে, এ কথা বলা যায়।
বইটির খ্যাতির অবশ্য অন্য আরেকটি কারণ রয়েছে। ফক্স নিউজ দাবি করেছিল, তারা তাদের খবরকে ‘ফেয়ার অ্যান্ড ব্যালান্সড’ বলে যে স্লোগান ব্যবহার করে, ফ্রাঙ্কেন তা চুরি করেছেন। এই নিয়ে এক মামলা ঠুকে দিয়েছিল তারা। আর তা নিয়ে এদেশের পত্র-পত্রিকায় মহা হাসাহাসি। শেষ পর্যন্ত ফক্স নিউজ অবশ্য সে মামলা তুলে নেয়, কিন্তু ততদিনে ফ্রাঙ্কেনের বই এদেশে বেষ্ট সেলার।
ফ্রাঙ্কেনের বই উচ্চকণ্ঠ, স্কুল, কখনো কখনো কদর্য ভাষায় লেখা, অতি অবান্তর বিষয়েও তিনি পাতার পর পাতা ব্যয় করেন। তার বিরুদ্ধে তোলা এসব অভিযোগের সবকিছুই সত্য, কিন্তু তারপরেও এতে আমি আশার লক্ষণ দেখতে পাই। কারণ ফ্রাঙ্কেন প্রতিবাদ করতে ভীত হয়নি। আজকের যে আমেরিকা, তা অনেক সুস্থ মানুষকেই ভীত-সন্ত্রস্ত করেছে। যে রক্ষণশীল চক্র আজ এদেশে ক্ষমতায় বসে, তাদের আক্রমণের লক্ষ্য কেবল মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়া নয়। নিজ দেশের ভেতরেই এক ধরনের আগ্রাসন চলছে। এই আগ্রাসনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এদেশের নাগরিক অধিকারের ভিত। ১৯৬৮ থেকে নিয়ে ২০০০ সালে শেষ হওয়া বিল ক্লিনটনের আট বছরে এদেশে নাগরিক অধিকার ক্ষেত্রে যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল তার অনেকটাই আজ হারাতে বসেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে একের পর এক নাগরিক অধিকার বিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কার্যত এদেশে কেউই আজ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। তথাকথিত প্যাট্রিয়ট অ্যাক্টের মাধ্যমে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণের আইনগত অধিকার সরকার রাখেন। টেলিফোনে আড়িপাতা থেকে ই-মেইল বার্তা পরীক্ষা করা তো আছেই, এমনকি পাঠাগার থেকে কি বই নিয়ে এসে পড়ছে, তা তদারকির অধিকার পর্যন্ত গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। জর্জ সরোস পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা ধনকুবের, সম্প্রতি তার লেখা দি বাবল অব আমেরিকান সুপ্রিমেসি (পাবলিক এফেয়ার্স, ডিসেম্বর ২০০৩) গ্রন্থে বিষণ্ণ কণ্ঠে তাই লিখেছেন, এই সেই আমেরিকা নয় যাকে আমি নিজ দেশ বলে গ্রহণ করেছিলাম।
নাগরিক অধিকারের ওপর এই আক্রমণ, যা সম্পূর্ণভাবে একটি আদর্শগত এজেন্ডা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তার উল্লম্ফন সম্ভব হয়েছে প্রধানত এদেশের তথ্যব্যবস্থার শর্তহীন আনুগত্যের ফলে। গত বিশ বছরে এদেশের তথ্যব্যবস্থা একটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র—এই তিনটিই এখন এই কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রণাধীন। একই করপোরেশন একই সাথে পত্রিকা, টিভি নেটওয়ার্ক ও কয়েক ডজন রেডিও স্টেশনের মালিক। তাদের আসল আগ্রহ ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফা রক্ষায়। আমেরিকায় সরকার ও বিগ বিজনেস একই হাতের কড়ে আঙুল আর বুড়ো আঙুল। ফলে এই তথ্যসাম্রাজ্যের হাতে নাগরিকের তথ্য অধিকার যে মার খাবে সেটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। ইরাক যুদ্ধের সময় তার প্রমাণ মিলল হাতেনাতে। স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের বদলে সামরিক কমান্ডের সাথে জুড়ে দেওয়া হলো সাংবাদিককে। সামরিক বাহিনীর চোখ দিয়েই আমরা তাদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিবরণ পেলাম। সেনাবাহিনীর হতাহতের খবর পাওয়া গেলেও এইসব ‘এমবেডেড’ সাংবাদিকের কাছ থেকে কখনো বেসামরিক জনতার হতাহতের খবর পাইনি। ইরাক যুদ্ধের যে কোনো বর্ণনায় তারা অনুপস্থিত। সামরিক বিভাগের প্রপাগান্ডা হিসেবে নির্মিত যে তথ্যচিত্র, তাকেও ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধান্বিত নয় এই সব সাংবাদিক, সংবাদ মাধ্যম। প্রমাণ : জেসিকা লিঞ্চের কাহিনী। ইরাকে যুদ্ধের সময় দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে জেসিকা ইরাকি হাসপাতালে আশ্রয় পেয়েছিলেন। অথচ ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসীম সাহসে যুদ্ধ করে অবশেষে তিনি বন্দি হয়েছেন, তার সাথে ইরাকি সেনা কর্মকর্তারা নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, এমন এক দাবি করে সেনাবাহিনী থেকে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে সাংবাদিকদের দেওয়া হয়। সে তথ্যচিত্রের ভিত্তিতে জেসিকার অকুতোভয় অভিযানের গল্প প্রথম পাতায় ছাপেনি, তা টিভির পর্দায় দেখায়নি, এমন একটি তথ্যমাধ্যমও পাওয়া যাবে না এদেশে। বিবিসি টিভি সে দাবি মিথ্যা বলে প্রচার করার আগ পর্যন্ত এদেশের মানুষ জেসিকাকে এক বীর সৈনিক এবং ইরাকিদের বর্বর আক্রমণকারীই ভেবে এসেছে। একজন সাংবাদিকও তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। চারদিকে যখন এই নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার, সে সময় আল ফ্রাঙ্কেনের বইটিকে আমার কাছে একটি স্পষ্ট, সরাসরি প্রতিবাদ মনে হয়েছে, মনে হয়েছে সামান্য হলেও আলোর একটু দ্যুতি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.