আমাদের বাল্যবন্ধু শোভন আশরাফ রতন হারিয়ে গেছে, না মারা গেছে, নাকি গুম হয়েছে, তা আমরা ঠিক করে বলতে পারি না; তবে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন এবং বলা যায় অবিরাম তাকে নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছি। এমন না যে তার সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বা সকাল-সন্ধ্যা আড্ডা দিতাম। মাঝে মাঝে সে উদয় হতো কোনো ভূমিকা ছাড়াই এবং আমাদের মনে হতো না যে, আমরা বহুদিন মিলিত হইনি। মনে হতো, এই তো কদিন আগেই আমরা যেন একসঙ্গে সিকান্দারভাইয়ের দোকানে পুরনো লাল হয়ে যাওয়া দুধের বটের আঠার মতো আদাসহযোগে চা খেয়েছি। তার হাসিমুখ দেখে মনে হতো, আমাদের 888sport sign up bonus যেন সকালের রোদ্দুরের মতো তাজা। তো সে চা খায় আর পুরনো সব গল্প করে। সেই সব গল্পের কোনো মাথামুণ্ডু নেই, সে গল্প ধারাবাহিক নয়, আবার কোনো একটা প্রসঙ্গে সে স্থিরও থাকতে পারে না। তাকে থামাতো রফিক, সেও খানিকটা বাচাল, তবে সে মানুষের বিরক্তির চিহ্নগুলো বুঝতে পারতো, যা রতনের পারার কথা নয়। কারণ সে মানুষের ভালোমন্দ বুঝলেও কারো মানসিক অস্বস্তি কীভাবে চোখে-মুুখে ফুটে ওঠে তা জানতো না।
এত বড় শহরে কোথায় রতনকে আমি বা আমরা খুঁজবো? তার বউ মানে আমাদের আনোয়ারা ভাবি আমাদের কোনো তথ্য দিতে পারে না, তার বালকপুত্র মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে থাকে। সে ছাদের দিকে অহেতুক তাকায়, দেয়ালে ঝোলানো বাবরি চুলের বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকায়; ভুলভাল কথা বলে, বাপের কথাই সে বলে তবে তা অস্পষ্ট। রতন নিখোঁজ হওয়ার পর আমি রফিকের সঙ্গে কয়েকবার ওর ছাতিমতলার বাসায় গিয়েছি। কোনো কূলকিনারা পাইনি, আনোয়ারাকে বিধবা বিধবা মনে হচ্ছে। তার মুখে রক্ত নেই, চুনের মতো সাদা দুই ঠোঁট, কপালে একটা অযথা চিকন জোঁকের মতো ভাঁজ পড়ে আছে কেন আল্লাহই জানে, রাত জেগে হতে পারে, কান্নাকাটির জন্য হতে পারে, কোনো রোগের কারণেও হতে পারে, তবে আমরা মালুম করতে পারি না। রফিক অবশ্য একটু গলা নরম করে বলে, ‘তা তোমার এত ভেঙে পড়লে চলবে? ছেলেটাকে তো দেখে রাখতে হবে, নাকি? মুখখানা মাকড়সার মতো করে রেখেছো কেন?’ কেন সে আনোয়ারার মুখকে মাকড়সার সঙ্গে তুলনা করলো তা আমি মেলাতে পারি না, তাকে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে গোপন করলাম আপাতত। আনোয়ারা উত্তর দেওয়ার অবস্থায় সাধারণত থাকে না। তবু স্বামীর বন্ধু বলে সংক্ষেপে দু-একটা কথা বলে। সে বারান্দায় একটা প্লাস্টিকের মোড়ার ওপর বসে ছিল, আমাদের অবশ্য দুটো চেয়ার দিয়েছিল বসার জন্য। সে বলে, ‘আপনারা পারলে কিছু করেন, আমার শরীর কেমন, মন কেমন, আমার ছেলে কেমন – এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।’ রফিককে একটু পরাজিত মনে হয় সে-সময়, সে আর কথা বাড়ায় না। আমি বলি, ‘ভাবি আমরা যাই।’ পলাশের দিকে ঈশারা করে হাত নাড়িয়ে বলি, ‘ভালো থেকো বাবা।’ আমি জানি কথাটা ঘুরে এসে আমার বুকে ধাক্কা দিলো, তবু খানিকটা অভিনেতার মতো বললাম। আরো কিছু হয়তো বলা উচিত ছিল। কিন্তু কিছুই না বলে হনহন করে দুজন বের হয়ে এলাম। পলাশ আমাদের দিকে তাকালো না, আনোয়ারা তাকালো আলোহীন চোখে, যা কিছুই মুদ্রিত করে না।
করোনায় বেঁচে যাওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম আর সহজে মরছি না, এত বড় মহামারি থেকে বেঁচে গিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, বড় বিপদে আর পড়ছি না, তবে করোনায় তেমন কোনো বড় ক্ষতি না হলেও এখন দেখছি যে, আমাদের বেঁচে থাকার সব অবলম্বন হারিয়ে গেছে। রতন হারিয়ে যাওয়ারও বহু আগে থেকেই আমাদের এই অবস্থা। রফিক 888sport app download apk লিখতো, গল্প লিখতো, বই রিভিউ করতো, সব বাদ দিয়েছে। পত্রিকার সম্পাদক ওকে ফোন করে লেখা দেওয়ার জন্য, ও বলে ‘লিখতে পারলে দেব’। সে লিখতে পারে না। একটা লেখা শুরু করে শেষ করতে পারে না, অল্প একটু লিখে কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে পড়ে। এখনো ল্যাপটপ ব্যবহার করতে পারে না বলে সে কোনো আফসোস করে না, বরং বিরুদ্ধে মতামত দেয়। আমি বারবার বলি, ‘এই সময়ে হাতে লেখা মানে একটা ঝামেলার ব্যাপার, তিনগুণ খাটুনি।’ সে আমার দিকে তার পুরনো এক ডাঁটভাঙা চশমা ডানে কাত করে তাকিয়ে উত্তর দিতে একটু সময় নেয়। আমি আবার কিছু শুরু করার আগেই সে বলে, ‘একদিন দেখিস সবাই আবার খাতা-কলমে ফিরে আসবে, তোর ল্যাপটপের সব জিনিসপত্র নষ্ট হবে, ডিজিটাল মানেই ভুয়া একটা ব্যাপার। এই যে কলম এই যে খাতা এর সঙ্গে সম্পর্কিত না হলে লেখার আসল রস তো খুঁজে পাওয়া যায় না। এর মজাটাই তো বুঝতে পারিস না।’ আমি আর তর্ক বাড়াই না, এমনিতে সে বিপাকে আছে লেখালেখি নিয়ে। পুরনো গল্পগুলো নিয়ে একটা বই করতে চেয়েছিল। পরিচিত প্রকাশক ওকে যা বলেছে আমার সামনে তাতে ওর লেখালেখি ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমি ভেবেছিলাম রফিক কিছু শুনিয়ে দেবে প্রকাশককে, তো দেখলাম সে নিশ্চুপ। আমি বললাম, ‘তোর কিছুই বলার নেই? সে হতাশার সুরে বলল, ‘না! কী বলবো। দেখলি না কীভাবে বলল। কীভাবে ব্যাখ্যা দিলো। কথা বাড়িয়ে লাভ কি? পুরো জাতি মেধাহীন 888sport live chatহীন রুচিহীন সংস্কৃতিহীন হয়ে যাচ্ছে, জাতির মনন নষ্ট হয়ে গেছে। যেখানে মস্তিষ্ক কাজ করে না সেখানে বই পড়বে কেন? লেখাপড়া ছড়াই সবাই নিজেকে পণ্ডিত ভেবে নিয়ে নতুন নতুন রাস্তা দেখাচ্ছে, রঙিন রাস্তা, ফানুসের রাস্তা, তারা কেন বই পড়বে? তাদের কথাই সবাই হা করে গিলছে। আমি ভাবছি একেবারে লেখালেখি ছেড়ে দেব। এদেশে এর কোনো দরকার নেই। চল, চা খাই।’ আমরা প্যারিদাস রোড থেকে বের হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের কাছে এসে চায়ের একটা দোকানে বসলাম। ভাঙা নড়বড়ে একটা বেঞ্চ, যে-কোনো সময় ড্রেনের মধ্যে পড়ে যাবে, তবু তার ওপর বসলাম, ওপারে চায়ের চুলার নিচে চাপাতির কয়েক বছরের স্তূপ পড়ে আছে। সেখানে ময়লা দেয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে চাওয়ালা চা বানাচ্ছে। তার মুখে একটা আধখানা জ্বলন্ত কম দামি সিগারেট, পান খেয়ে একটু আগে শেষ করেছে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ঠোঁটের লাল রং দেখে।
এ-দোকানে তেমন কোনো খাবার-দাবার নেই, তবু মশা-মাছি ভনভন করছে, বাসগুলোর অবিরাম চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সেই পলেস্তারাহীন দেয়ালে লাল কালিতে লেখা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বেশ উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। আমরা খানিকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দু-কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসলাম। যদিও দুপুরের মতো খিদে পেটে, তবু শুধু চা খাচ্ছি। বাড়িতে গেলে ভাত পাবো – এই আশায় এখন শুধু চা। আমি বললাম, ‘এই জায়গাটাতে ফুটপাতে একসময় প্রচুর ভালো ভালো বই পাওয়া যেত, তোর কি মনে আছে? আমি অনেক বই এখান থেকে কিনেছি। রমাপদ চৌধুরীর সাদা দেয়াল বইটার কথা মনে পড়ছে। আরো অনেক বই কিনেছি এখান থেকে।’ রফিক আমার কথা শুনছে বলে মনে হয় না। সে কোনো উত্তর দেয় না, অন্য কথা বলে, ‘লালনের একটা গান আছে না, কোন পথে যাবি মনা ঠিক হইলো না। শুনেছিস?’ আমি বললাম, ‘শুনেছি।’ রফিক বলে, ‘আমাদের দেশের অবস্থা ওই গানে লালন বাতলে দিয়েছেন। আমরা সত্যি জানি না কোন দিকে যাবো।’
চা খেতে খেতে আমরা ঠিক করে ফেলি কীভাবে রতনকে খুঁজবো। প্রথমত ভাবি, অন্য বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে নিয়মিত, ওর প্রতিদিনের চলাফেরার একটা তালিকা করতে হবে কাছের মানুষের কাছে তথ্য নিয়ে। আমরা যা জানি তার সঙ্গে ওদের তথ্য যোগ করে আপডেট করতে হবে। আনোয়ারা ভাবি এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ধানমন্ডি থানায় একটা ডায়েরি করা দরকার। রফিক আনিসের সঙ্গে কথা বলল ফোনে। আনিস থাকে আরামবাগে। সে বলল, ‘উত্তরায় একজনকে গাছের সঙ্গে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাবলিকে, চানখাঁরপুলে গোটাছয়েক মানুষের লাশ পাওয়া গেছে, আশুলিয়ায় গাজীপুরে ভয়াবহ সব খবর পাওয়া গেছে, তোরা ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারিস।’ রফিক বলে, ‘রতনকে পাবলিক বা পুলিশ খুন করবে কেন? আমি তো কোনো কারণ দেখি না।’ আমি বললাম, ‘তুই কোন গ্রহে বাস করিস, এখানে এখন সবই সম্ভব, খুন করার জন্য, পিটিয়ে মেরে ফেলার জন্য, গুম করার জন্য কোনো কারণ লাগে তোকে কে বলল?’ আনিস অবশ্য আরো একটা তথ্য দিলো : নীলক্ষেত থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে হাঁটতে হাঁটতে রতন প্রায়ই বুড়িগঙ্গার ধারে যেত, সেদিকে যাওয়ার পথে লোকজনকে জিজ্ঞেস করা যায়। আমি বললাম, ‘আনিসের কথায় যুক্তি আছে বুঝলাম, তবে এভাবে ওকে পাওয়া যাবে না। উত্তরা বা চানখাঁরপুলে কেন সব জায়গাতে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে, তাদের চেহারা দেখার সুযোগ তো আমাদের নেই। আমরা তো ডিবি অফিসেও ঢুকতে পারবো না, আর ঢুকতে পারলেও আমাদের কোনো তথ্য তারা দেবে না। ’ রফিক বলল, ‘চল তাহলে বংশাল দিয়ে ঢুকি, কাউকে জিজ্ঞেস করি ওর ছবি দেখিয়ে।’ আমি কোনো কথা না বলে ওর পেছনে উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা বংশাল রোডের কাছে এসে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সরু রাস্তায় হাঁটার উপায় নেই, এত ভিড়। কত রকমের যানবাহন ঠেলাঠেলি করে এগোচ্ছে কচ্ছপের মতো ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে তার ইয়ত্তা নেই। সবাই চিৎকার করছে সামনে যেতে না পেরে, গাল দিচ্ছে কষে, কে কাকে গাল দিচ্ছে বোঝা মুশকিল। এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে দেখে মনে হয় এরা কোনোভাবে দেশ নিয়ে ভাবে না, অথচ তারাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের শ্রম দিয়ে। এই ভিড় ঠেলে আমরা একটু একটু করে এগোতে থাকি। বিসমিল্লাহ নামে একটা বড় স্টেশনারি দোকানের মালিককে রতনের ছবি দেখিয়ে রফিক জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই, এই মানুষটাকে দেখেছেন কখনো এদিকে, আমরা কয়েক মাস ধরে ওকে পাচ্ছি না।’ দোকানদার পানের পিক ফেলল একটা মাটির ডিব্বায়, তারপর আমাদের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকালো। ‘আপনেরা কি পুলিশের লোক?’ রফিক বলল, ‘না।’ সে বলল, ‘আমারে জিগান ক্যান, আমি কেমতে কমু। আর কত্ত মানুষ প্রতিদিন নিখোঁজ হইতাছে, একজন নিখোঁজ হইলে এত্ত ফাল পাড়নের কি আছে?’ রফিক আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় আমি ওকে থামালাম। আমি ওকে টেনে বাইরে আনি, মুখে বলি, ‘এভাবে খুঁজে কিছু হবে না। আমাদের ভিন্ন পথ দেখতে হবে।’ সে বলে, ‘পথ কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’ আমি বললাম, ‘কাজটা তো সোজা না, বন্ধু। এই শহরে ধরো দুই কোটি লোক বাস করে, কত গলি কত রাস্তা কত বাড়ি কত আস্তানা কোথায় পাবে তাকে? কে কখন কীভাবে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে তুমি কীভাবে বুঝবে? আমরা কষ্ট পাচ্ছি তবে তাতে কারো কিচ্ছু
আসে-যায় না, তাও তোমার মনে রাখতে হবে।’
দুজনের মোবাইলের স্ক্রিনে রতনের বড় একটা ছবি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম, ওই দোকানদারের কথায় বিরক্ত হওয়ার পরও অনেককে বলেছি। বিচিত্ররকম প্রতিক্রিয়া পেয়েছি মানুষের। মানুষ আসলে মোটাদাগে নিজেকে কীভাবে দেখে, অন্যকে কীভাবে দেখে, তা আমাদের জানা নেই, তবে একটা আভাস পাচ্ছি। মানবিক গুণাবলি নামে একটা ব্যাপার ছিল, এখন বোধহয় তা নিঃস্ব হতে চলেছে। গুলিস্তানের কাছে এসে আমরা একটা বাসে উঠে জিগাতলা যাবো ঠিক করলাম।
বাসে এক পা দিয়েছি এমন সময় রফিক আমার ডান হাত ধরে টান দিয়ে বলল, ‘নিচে নেমে আয়। এখন বাড়ি যাবো না।’ আমি অগত্যা নামলাম। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে পুরনো 888sport appতেই ভালো করে খোঁজা উচিত। তোর খুব খিদে পেলে তোকে কিছু খাওয়াবো।’ আমার একটু রাগ হলো। ওদিকে বাসের হেলপার বেশ জোরেশোরে আমাদের একটা 888sport appইয়া গালি দিলো। আমি না শোনার ভান করলাম। রফিকের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। আমি বললাম, ‘বাড়ি যেতে হবে না?’ সে বলল, ‘যাবো, পরে। হাঁট আমার সঙ্গে।’ আমি ওকে অনুসরণ করি। সে কোথায় যাচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারি না। তবে অনেকক্ষণ হাঁটার পর বুঝলাম সে পুরনো কারাগারের পাশ দিয়ে হাঁটছে। আরো কিছু সময় পর একটা জায়গায় এসে সে দাঁড়ালো। বলল, ‘কিছু খাবি।’ আমি বললাম, ‘না।’ ‘তাহলে চল।’ আমি ওকে আগের মতো অনুসরণ করি। কাজের কাজ যে কিছু হচ্ছে না সেটা আমরা ভালো করে বুঝি। একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে আমরা কীভাবে খুঁজে বের করব, সে জীবিত কি না তাও জানি না। সে নিজে কোনো যোগাযোগ করবে না – সেটাও জানি, তাহলে আমরা হেঁটে হেঁটে আসলে নিজেদের মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু করতে পারছি না। রফিক একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে হয়ে এসেছে। পেটের কথা রফিকের মনে আছে বলে মনে হচ্ছে না। সে বলে, ‘এই বাড়িটা দেখে চিনতে পারছিস?’ আমি বলি, ‘না।’ সে বলে, ‘খোন্দকার মোশতাকের বাড়ি।’ আমি বলি, ‘এ-বাড়ি কেউ ভাঙেনি?’ সে বলে, ‘না, কেন ভাঙবে? এরাই তো এখন জাতীয় বীর।’ আমি খানিকটা চিনতে পারি এখন, সাদা বাড়ি, তবে রংহীন। একদিন সন্ধ্যায় দেখেছিলাম সবাই বাড়িমুখো দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করছে। রফিককে বললাম, ‘এখানে কেন এসেছিস?’ সে বলে, ‘ঘুরতে ঘুরতে রাস্তা ভুলে।’ ডান দিকে চলতে চলতে একটা ছোট্ট ছাপড়া হোটেল পেলাম। রফিক বলে, ‘চল এখন কিছু খাই।’ আমি কিছু না বললে সে ছাপড়ার ভেতরে গিয়ে বসল। পিচ্চি একটা ছেলে বলল, ‘খানা নাই। পুরি আছে।’ রফিক আমার দিকে ঈশারা করে। আমি বোধহয় হ্যাঁ-এর মতো চোখ পাকালাম। পিচ্ছি চারটে পুরি দুটো প্লাস্টিকের বাটিতে করে দিলো। রফিক ছেলেটাকে রতনের ছবি দেখালো। ছেলেটা অদ্ভুত ভাব নিয়ে বলল, ‘হ, দেখচি মনে হইতাছে।’ আমি বলি, ‘কবে?’ সে বলে, ‘ঠিক মনে করতে পারতাছি না।’ রফিক দুটো পুরি একসঙ্গে ভাঁজ করে গরুর মাংসের পাতলা ঝোলে ডুবিয়ে খেতে লাগল অমৃতের মতো। আমিও খেতে শুরু করলাম। ছেলেটা বলে, ‘আর কিচু দিমু বাই।’ রফিক হাত ঈশারা করে। আমি বলি, ‘রফিক, এই ছোড়ার কথা তোর বিশ্বাস হয়?’ সে বলে, ‘কীভাবে হবে? রতনের চেহারা তো সাধারণ, এরকম চেহারা শত শত মানুষের আছে। কাজেই সে গল্প দিয়েছে একটা।’ পানি ও চা খেয়ে রফিক বলে, ‘এখন বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত হাঁটবো।’ আমি বলি, ‘শুধু শুধু হেঁটে লাভ কি, আর মানুষকে জিজ্ঞেস করেই বা কি লাভ? শোন, আমরা তো কম খুঁজিনি। এখন চল থানায় একটা ডায়েরি করে আনোয়ারাকে বলি সব খুলে।’ সে বোধহয় এই প্রথম খুব ক্লান্ত হয়ে একটা জোরে হাই তুললো। ‘আচ্ছা চল’ বলে সে রাজি হলো।
পরের তিনদিন আমরা আনিস ও অন্যদের কথামতো সম্ভাব্য জায়গাতে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করেও কোনো কূলকিনারা পেলাম না। পাবো যে না সেটা আমরা আগেই আন্দাজ করেছিলাম। এতবড় শহরে একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের মন মানে না। আমাদের শান্তশিষ্ট খানিকটা গোবেচারা রতনকে কেন নিখোঁজ হতে হবে, তার কেউ শত্রু আছে বলে তো আমরা জানি না। কে তাকে টার্গেট করলো। পুলিশ আমাদের কোনো সাহায্য করবে না জানতাম, তবু আমরা দু-তিনটে থানায় গিয়েছি। থানা কিছু করে না, এখন তো থানার অবস্থা ছন্নছাড়া। পুলিশ নিজেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, নিখোঁজ হচ্ছে, যারা আছে তারা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। ধানমন্ডি থানার একজন অফিসারগোছের লোকের সঙ্গে আমরা বেশ কথা বলতে পেরেছিলাম। তাকে একটু আপন আর সাধারণ মানুষ মনে হয়েছিল। সে আমাদের বলেছিল, ‘আপনারা বৃথা চেষ্টা করছেন। বুঝেছি মানুষটা নিরীহ, তবে নিরীহ মানুষরাই তো মারা পড়ে, চালাক লোকজন তো কেটে পড়ে সুযোগমতো। আপনাদের বন্ধু কোনো গণ কেসে ফেঁসে গেছে। কাজেই কিছু আশা না করাই ভালো।’
তবু আমরা আশা করি। আশা করি একদিন র্যাবের অফিসে যাবো, ডিবির অফিসে যাবো, দরকার হয় যমুনায় যাবো, আমরা আমাদের মনের আকুতির কাছে পরাজিত, আমরা পরাজিত আনোয়ারার কাছে, ওর অসুস্থ ছেলে পলাশের কাছে পরাজিত। রবীন্দ্র সরোবরের কাছে একটা বেঞ্চে বসে আমরা আকাশ-পাতাল ভাবি। ভাবি যদি সত্যি ফোন করলে রতন ধরত, কি আনন্দই না হতো। যদি ওর ভাঙাচোরা স্যামসাং মোবাইল থেকে রিং টোনের সেই গানটা একবার শুনতে পেতাম। আগে যেমন বাজত – ‘পথে-ঘাটে জল জমেছে, আমার ফোনটা বিকল, তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয় না বহুকাল।’ রফিক যেন কান্নার মতো করে বলে, ‘রতন তুই কোথায় আছিস, কেমন আছিস, বেশি করে চিনি দিয়ে রং চা খাচ্ছিস, খেজুরের গুড় দিয়ে মায়ের হাতের নাড়ু খাচ্ছিস তো।’ আমরা পশ্চিম দিকে তাকাতেই দেখি বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। বিপ্লবের জুলাই-আগস্ট পার হয়ে এখন অক্টোবর শুরু হয়েছে, তবু বৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই গোটা শহরের অবস্থা খারাপ। আর বৃষ্টি অবস্থা আরো খারাপ করে দেবে। আমরা বৃষ্টির দিকে তাকাই রতনের দুই অভাগা বন্ধু, যাদের মুখ ব্যাদান করে রাস্তায় রাস্তায় রতনকে খোঁজা ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা নেই। এই দেশে আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। বন্ধুরা যারা শোনে তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। আমরা ক্ষমতা উৎপাদন করতে শিখিনি। রফিক ডানে কাত হয়ে আমার দিকে তাকায়, ঠিক সেই সময় মেঘের আড়াল থেকে সূর্যের দেখা মেলে, ওর বহুদিনের গোমড়া মুখটা একটু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বলে, ‘অনেকদিন পর বৃষ্টিস্নাত সূর্য দেখলাম, এই বৃষ্টি এই সূর্য কি আমাদের সব গ্লানি মুছে দিতে পারবে?’ আমি বললাম, ‘তুই 888sport app download apk থেকে অবসর নিলেও তোর মধ্যে এখনো 888sport app download apk পুরোপুরি চলে যায়নি বোঝা যাাচ্ছে। বাস্তবতা বড় কঠিন। যে রাহু আমাদের ওপর ভর করেছে তার হাত থেকে সহজে আমাদের মুক্তি হবে না। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে এই লক্ষণ সহজে দূর হবে না। নতুন নতুন রং আসবে, মনে হবে নতুন, আসলে কারসাজি।’ সে বলল, ‘তুই খুব ইমোশনাল হয়ে গেছিস।’
আমাদের সামনের রাস্তা দিয়ে অজস্র মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। এ-সময় এখানে প্রচুর মানুষ হাঁটে। আমরা মানুষের দিকে তাকাই, গভীরভাবে তাকাই, জামাকাপড় দেখি, মুখ দেখি, চোখ দেখি, চশমা দেখি, কাউকে চিনতে পারি না, এর মধ্যে একজন রতন হতে পারে না? হঠাৎ রতন এসে বলতে পারে না, ‘তোরা এখন বসে বসে কি মুণ্ডু করিস, চল এক কাপ কফি খাই।’ রতন হয়তো কখনো আসবে না, কে বা কারা তাকে কোথায় নিয়ে গেছে আমরা হয়তো আর কিছুই জানতে পারবো না, তবু আমরা তাকে খুঁজতে থাকবো। কারণ এটাই আমাদের এখন একমাত্র কাজ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.