পরিচয়ের সংকট

মানুষের ভালোবাসা আসলে একটি মুখোশ। তা না হলে অসীম আবেগে যখন সে তার প্রিয় মানুষকে জড়িয়ে ধরে, তখন হয়তো তার পায়ে একটা পিঁপড়া থেঁতলে গেল। সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। খুনি সন্তানের প্রতি অযৌক্তিক পক্ষপাত একই জিনিসের সাক্ষ্য দেয়। ফলে মানুষকে নিরপেক্ষ, সভ্য ইত্যাদি অভিধায় ডাকার পক্ষপাতী আমি নই। পিঁপড়া কি আপনাকে সভ্য বলেছে? কিংবা পিঁপড়া কি আপনার চেয়ে কম নিরপেক্ষ? আপনার নিরপেক্ষতার মাপকাঠি কী? পিঁপড়া কি সেটা মানে? তাহলে আপনি সভ্য বা নিরপেক্ষ – কোনোটাই নন।

তবে হ্যাঁ, একটা ক্ষেত্রে আপনি আমার সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন, তবে আমি টলস্টয়ের সঙ্গে একমত, প্রত্যেক মানুষ তার নিজের মতো দুঃখী। দুঃখের জায়গাটায় যখন আমরা গিয়ে দাঁড়াই, আশপাশে তাকাই, বুঝতে পারি এত তুমি, এত তোমরা, আপনারা – কেউ নেই। কেবল একজন; আমি, কেবল আমি। শীতরাতে কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে চলা এক পথিক – মিলন।

হ্যাঁ, মিলনের কথাই ধরা যাক। সে কারো সন্তান। ধরলাম তার বাবা নেই অথবা কে বাবা তা জানা নেই। ধরা যাক যে 888sport promo code কোনো পুরুষের স্পর্শে আসেনি সে তারই সন্তান। তাহলে কী করে তার জন্ম হলো? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। সেই 888sport promo code হয়তো শুক্রাণু লাগা কোনো পুরুষের টাওয়েল দিয়ে জননেন্দ্রিয় মুছেছিল। সেই থেকে কতগুলো ভ্রƒণ তার ভেতর প্রবেশ করে এবং মিলনবিহীন ডিম্বাণুতে ভ্রƒণ হয়ে অনুপ্রবেশ করে মিলন।

এই পৃথিবীতে আসার আগে যখন মিলন তার মায়ের পেটে বিছের মতো কুঁকড়ে ঘুমিয়ে, তখন সে জানতেও পারে না, কী পরিমাণ প্রতিকূলতার দিকে সে ধাবিত হতে যাচ্ছে। সেটা ধীরে ধীরে টের পায় তার মা।

দুই

ভ্রƒণটি যখন পরিণত। মায়ের পেটে বসে পৃথিবীর দিকে লাথি ছুড়ছে, তখন সালেহা পরিবারচ্যুত, সমাজচ্যুত হয়ে একটা পোড়ো ভিটার শনের ঘরের আশ্রিত। জনপদের বাইরে বনঘেঁষা এই ভিটা।

‘ভূতের মা’ খ্যাত নিঃসন্তান বুড়ি করিমনের বাড়ি। কত যুগ ধরে যে এখানে তার বাস, তা কেউ কোনোদিন খাতাকলম করেনি। তবে গায়ের বৃদ্ধরা তাদের মরচেপড়া হাতের কড় হিসাব করে বলে, না, ঠিক হিসাবটা করা যাইতাছে না। হইব হয়তো শখানেক বচ্ছর।

স্বামী-সন্তানহীন করিমনের খাবারের উৎস ভিক্ষা; এক আদি পেশা। আর দশটা পেশা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। মানুষ ছোট করে দেখলেও একজনের কোলা থেকে এক মুঠি চাল অথবা তার ট্যাঁক থেকে একটা টাকা বের করা অত সোজা কাজ নয়। একজন পুরুষের পক্ষে যতটা সোজা একজন অবুঝ 888sport promo codeকে

ভুলিয়ে-ভালিয়ে গর্ভবতী করে ফেলা।

তৃতীয় বিশ্বের এসব দেশের ঘটনাগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে এমনই বাস্তবতা। ঘটনাবহুল। কাফকাদের মতো রূপকথার এক দেশে নিয়ে মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের মতো নয়। এখানে কেবল ঘটনা। ঘটনা তার ঘটনা, তার ঘটনা এবং তার ঘটনা; অতঃপর আবার ঘটনা, ঘটনা ঘটনা ঘটনা … শেষ নেই এই ঘটনার ঘনঘটার।

সালেহা যখন গর্ভবতী হয়ে পড়ে, নিজের ঔরসজাত সন্তানদের আশু ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মমতাময়ী মা এটাকে তুরুপের তাস হিসেবে নেন। সালেহাকে মোক্ষম সময় বুঝে তুরুপের এক চালে বাড়িছাড়া করেন তার সৎসন্তান। বেশ্যার ভাত নেই এই বাড়িতে। সৎমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমরাও বলি, হ্যাঁ, বেশ্যাদের ভাত এই সমাজে নেই।

সৎমা তাতে আরো উৎসাহ পান, হয় এই বেশ্যা থাকব তর বাড়ি, নয় আমি। ওর লগে আর একটা নিশ্বাসও আমি নিতে চাই না।

কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে সালেহার বাপের দিকে আঙুল শাসাতে শাসাতে তেড়ে আসেন সালেহার সৎমা। সালেহা তখন মাটিতে পড়ে কাঁদছে। তার শরীরে যেন শেকড় গজিয়েছে – এভাবে সে-মাটির সঙ্গে লেপটে আছে, উঠতে পারে না।

দিন আনে দিন খায় আছল আলী। মেয়ে নিয়ে তার যন্ত্রণার শেষ নেই। কালো, পেঁচার মতো চোখ, তার ওপর টেরা। আজ পর্যন্ত কেউ বিয়ের প্রস্তাবও দেয় নাই। কেউ যদি যৌতুকের বিনিময়েও নিতে চাইত, তাও না হয় বোঝা যেত। তাও কেউ বলেনি। অবশ্য যৌতুক দেওয়ার ক্ষমতা আছল আলীর নেই তা তো সবার জানা। টাকা থাকলে পৃথিবীর বদমাশতম ধনকুবেরও যে লাইন দিত, এতে কেউ সন্দেহ করবে না। সবমিলিয়ে বাড়ি থেকে দূর করার ছুতা কম খোঁজেনি সালেহার বাপ আছল আলীও। এত অশান্তি তার ভালো লাগে না। তার সব সময় মনে হয়েছে, সালেহাকে সরালেই তার মাগিটার অন্তর জুড়ায়! তাতে পরিবারটায় যদি শান্তি ফিরে আসে। এতদিন লোকলজ্জার ভয় ছিল। এখন তো তা-ও নেই। কে কথা বলবে এক বেশ্যার পক্ষে?

সালেহার পিঠটা যেন আছল আলীর ঢোল। পর্দার আড়াল থেকে চোখের ইশারায় তাল ঠিক করছে সৎমা। চুন থেকে পান খসছে তো পিঠের ওপর ধুপধুপ। চাল ধোয়ার সময় আঙুলের ফাঁকে দুটা চাল খসেছে তো ধুপধুপ। উঠানে বাঁশের আড়ে জামা শুকাতে দেওয়া, বাতাসে পড়েছে কি অমনি ধুপধুপ। পাকের ঘরে খেতে বসে পানি পড়েছে-কি-পড়ে নাই অমনি ধুপধুপ। পিঠের ওপর পড়ছে আর জলদগম্ভীর সুর বেজে উঠছে – ধুপধুপ, ধুপধুপ। এই যখন অবস্থা, এর মধ্যে ঘটল এই অঘটন। সত্যটা হলো, উত্তরপাড়ার ঘোড়ার গাড়িওয়ালার দুঃসম্পর্কের এক শালা বেড়াতে এসেছিল। সে-ই ফুঁসলে-ফাঁসলে এই করে গেছে।

বিদেশি কী এক চকলেটের সঙ্গে তুলনা করল লোকটা, খুব দামি সে-চকলেট! সালেহা ভাবে, কী সব বলছে? সব মিছা কথা। পরক্ষণেই খেয়াল করে, কথাগুলো তার ভাবতে ভালো লাগছে। মনের মধ্যে কেমন একটা ভালো লাগা কাজ করছে। ঠিক যেন রোমের ওপর দিয়ে পালকের ছোঁয়া। তথাপি সালেহা সন্দেহ প্রকাশ করে, এহ্!

আরে না, সত্যি তাই। এই বলে সালেহার ক্যাডবেরি চকলেটের মতো ঘন আর গাঢ় তলপেটের ভাঁজে সে তার ঘোড়াগাড়ি চর্চিত খসখসে হাত চালিয়ে দেয়। আলতো থেকে জোরে জোরে ঘষে, ঘষতে থাকে। তলপেট থেকে একটু ওপরের দিকে উঠে আলতো থেকে মৃদু চাপ দেয়। সালেহার পাগল পাগল লাগে। লোকটার হাত ধূর্ত সাপের মতো বিভিন্ন খাঁজে আর ভাঁজে ভাঁজে স্বপ্নছোঁয়া দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সালেহা আগ্নেয়গিরির মতো জ¦লে ওঠে। সে-আগুনে পৃথিবীর সবকিছু পুড়ে খাক্ হয়।

বলা চলে বুনো লতাগুল্মের দঙ্গলে জন্মানো এক অনাবিষ্কৃত কলি – যার পাপড়ি এখনো পৃথিবীর আলোয় পাখা মেলেনি। একেই বুঝি বলে অঙ্কুরেই বিনাশ। ঘোড়াগাড়িওয়ালার সঙ্গে পরপর কয়েকবার এসব হওয়ার পর অনেকদিন চলে গেছে। ঘোড়াগাড়িওয়ালা কোথায় চলে গেছে, সে জানে না। সেসব রাতে কী ঘটেছিল সালেহা কাউকে বলেনি। গাড়িওয়ালা মানা করেছে। বললে অনেক ঝামেলা হবে নাকি। ঘোড়াওয়ালাকে মারবে, সঙ্গে সালেহাও ছাড় পাবে না। অথচ না বললে কিছুই হবে না। সালেহা ঘোড়াওয়ালাকে বিশ্বাস করতে চেয়েছে। ভেবেছে, এমনিতেই ঝামেলার অন্ত নাই, তাতে আবার কে ঝামেলা বাড়ায়! তার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। তাছাড়া ওসব তো সালেহা ভুলে যেতেই চায়। কী হয়েছিল সেসব রাতে তা সে মনে রাখতে চায় না। সে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে চায়, যখন তার শরীরে ঘোড়সওয়ারের খসখসে হাতের করাল থাবা পড়েনি। যখন সে ছিল অনেক প্রতিবন্ধকতার পরও দুরন্ত এক কিশোরী। সালেহা একা একা ভাবে আর মুখ বুজে কাঁদে। গাঁয়ের এক অনাথ মেয়ের এ যে কী সর্বনাশ হয়ে গেছে, সে তা বুঝতে পেরেছে। এখন তার কিছুই করার নাই!

সে কয়েকবার গলায় দড়ি দেওয়ার চিন্তাও করেছে। বাড়ির পেছনের নিঝুম বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা পিতরাজ গাছের কাছে সে গিয়েওছিল। কিন্তু গাছ তাকে ফেরত দিয়েছে। হ্যাঁ, গাছ ফেরত দিয়েছে। সালেহা একটা গরু বাঁধার দড়ি নিয়ে গাছের নিচে গেছে। তার মনে হলো, কে যেন বলল, সালেহা, ফিরে যা। সালেহা ফিরে এলো। এরই মধ্যে সালেহার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। অচিরেই তা লক্ষগোচর হবে। তবু সে তা ঢাকতে আপ্রাণ।

কিন্তু যেদিন ওয়াক্ ওয়াক্ করে সালেহা বিছানায় শুয়ে পড়ল। বলল পেট ব্যথা। বাবা পিঠে ধুপধুপ ঢোল বাজিয়েও তুলতে পারল না। তারপর থেকে মাঝে মধ্যেই বমি-বমি ভাব হয়। দিন যায়, পরিবর্তনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এ এমন এক সত্য, যাকে দুটো রাতের ভুল বলে এড়িয়ে যেতে চায় না সমাজ। আবার ঘোড়াওয়ালাকেও খোঁজ করে না। সে আছে তার মতো দিব্যি, কোথায় আছে কে জানে? কে রাখে কার খোঁজ। সে তো এক পুরুষ। দুদিন মজা লুটে ভেগেছে। তার তো সংসার আছে, স্ত্রী-সন্তান আছে। তার কী দোষ! দোষ যত এই মাগির! একে ধর।

বাবা আছল আলী চুল ধরে টেনে যেদিন সালেহাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল, সেদিন ছিল তিনশো পঁয়ষট্টি দিনেরই কোনো একটা দিন। কী বার, কত তারিখ – এসবের কোনো হিসাব স্বাভাবিক কারণেই আমাদের কাছে নেই। কারণ ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পর, একটু বিনোদনের জন্য আমরা যেহেতু একটা গল্প পড়তে বসি, তাতেও যদি এত হ্যাপা দেন তাহলে তো গল্পের মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়! না না, বাদ দিবেন না। এগোন। আপনাকে সালেহার দুঃসহ গল্পটি যতটা রসিয়ে মজা করে বলল। আশা করি আপনি হতাশ হবেন না। তো, চলুন – হ্যাঁ, সেদিনের তারিখ আমাদের জানা নেই। তবে অঝরে বৃষ্টি ঝরছিল। দুপুর গড়িয়ে পিলপিল পায়ে এগোচ্ছে সময়। রাতের উদরে পড়তে বেশ কয়েক পা বাকি। কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। বিজলি চমকাচ্ছে। গুরু গুরু শব্দে বাজ পড়ছে কোথাও। মানুষ, পশু, পাখি – সবাই আশ্রয় নিয়েছে যে যার নীড়ে। সেই তখন সালেহা আশ্রয়চ্যুত হলো। অবশ্য দিনক্ষণ দেখে তো কেউ কাউকে আশ্রয়চ্যুত করে না।

সালেহা অবাক হয় ছিলিমা, নাসিমা, তাবিবাদের ব্যবহার দেখে। সবাই ইদানীং তাকে এড়িয়ে চলত। অথচ কত পাশা খেলেছে ওদের সঙ্গে। প্রায় মাসখানেক হলো কোনো কথাই কয় না তারা। তাকে দেখলে এড়িয়ে যায়। চোখ বড় করে চায় – যেন চোখেই ফুটো করে ফেলবে। কেনরে বাবা, সালেহা তোর কী ক্ষতিটা করেছে! না লেচু ছিঁড়েছে, না নেবুর পাতা।

একটা আমগাছের তলে বৃষ্টি বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে সালেহা এসব ভাবে। কিন্তু বাবা কোথায় গেল? আসে না কেন? বলে গেল এই আসছি বলে। এমন একটা জঙ্গলে কেউ এভাবে একা ফেলে যায়! সালেহা পোঁটলাটা বুকের ভেতর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, যাতে পোঁটলাটা কিছুতেই না ভেজে। বাবা যে – মারবে না হয়!

এর মধ্যেও সালেহার রোমাঞ্চ হয়, জীবনে এই প্রথম সে বাসে উঠেছে। আরেকটা কী বলল বাবা, নসিমন। যেমনি প্রশ্ন করেছে অমনি বলেছে বাবা, নসিমন। বাবা আসলে তাকে আদর করে, সালেহা তা বোঝে। মায়ের কারণে কিছু বলতে পারে না এই যা। তবে আর যা-ই বলুক ভ্যান দিয়ে চলতে চলতে পাছা ব্যথা হয়ে গেছে তার – মনে হতে হাসি আসে তার। পাছার নিচে হাত দিয়ে বসেছিল সে। হা হা হা। তারপর তো হাঁটার অন্ত নেই। এত হাঁটতে পারে বাবা। বাবার সঙ্গে কী হেঁটে পারা যায়! তার মধ্যে শরীরে এত মারের ব্যথা! অতঃপর এই এখানে, এই বনের মধ্যে এসে পৌঁছাল। বৃষ্টি আসি আসি করছে, তখন বলল, এখানে দাঁড়া, আমি আসছি। আর এইটা রাখ। বলে এতক্ষণ তার হাতে থাকা পোঁটলাটা সালেহার হাতে দিলো।

বাবা, তাড়াতাড়ি এসো। বনের মধ্যে আমার একা ভয় করে।

বাবা পেছন ফিরে একবার সালেহাকে দেখল। ঘাড় ঘুরিয়ে ফের হাঁটা শুরু করল। এত দ্রুত যে গাছগাছড়ার আড়ালে সালেহা তাকে আর দেখতে পেল না।

আমগাছের নিচে ঘোর বৃষ্টিতে নিজেকে আর কতটা রক্ষা করা যায়। ভিজে একসা। ভয়ও করছে। মড়াৎ করে একটা ডাল ভেঙে পড়ল। সালেহার মনে হলো হৃৎপিণ্ডটা গলায় চলে এসেছে। সে খুব আস্তে করে ডাকল, বাবা! বাবা! চিৎকার করে ডাকল, বাবা! বাবা!! বাবা!!! কথাগুলো গাছে গাছে বাড়ি খেয়ে একটা আরেকটার সঙ্গে পেঁচিয়ে এমন এক ভৌতিক আবহ তৈরি করল, মনে হলো যেন কেউ সালেহার বুকের ওপর চেপে বসেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

বাবা যেদিকে উধাও হয়ে গেল সেদিকে পা বাড়াল সালেহা। কয়েক পা গিয়ে পিছলে ধুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। উঠে আবার হাঁটা দিল। রাতভর বৃষ্টিতে ভিজে সালেহা হাঁটতে লাগল। গাছের গা চেটে বৃষ্টির পানি খেল। আবার হাঁটতে শুরু করল।

হাঁটলে কষ্ট হয়। কিন্তু এখান থেকে সরতে হলে তো হাঁটতে হবে। হেঁটে হেঁটে অনেক দূর যেতে হবে। বাবা কোথায় খুঁজে বের করতে হবে। পেটে ক্ষুধা। পেটের ভেতরে অদ্ভুত কী যেন একটা নড়ছে।

তবু সালেহা হাঁটে। আছাড় খায়, মুখ থুবড়ে পড়ে, তবু সালেহা থামে না। বৃষ্টি পড়ে, বিজলি চমকায়, সালেহা হাঁটে। পৃথিবীর প্রাণিকুলের প্রকৃতি অনুযায়ী সে ক্লান্ত হয়, ক্লান্তিতে ভেঙে আসে শরীর। তবু সে হাঁটে। এক ধরনের নেশার মতো, কী এক ঘোরে সালেহা হাঁটতেই থাকে। চেতনায় একটা একটা পর্দা পড়ে সব ঝাপসা হয়ে আসে, তবু সে হাঁটে।

একদা সে নিজেকে একটা নদীর পাড়ে দেখতে পায়। নদীর পাড় ধরে হাঁটে। পেটে কিছু নেই। হাতের তল্পিটা যেন কোথায় পড়ে গেছে, যাতে যাত্রাপথে এক ফাঁকে কিছু খাবার ভরে দিয়েছিল বাবা। প্রচণ্ড ক্ষুধা, তবু নিজেকে ভারমুক্ত মনে হয় তার। জুঁই কামিনী বেলি ইত্যাকার ফুলের গন্ধ এসে তার চারপাশে ভিড় করে।

সে বেলিকে বলে, তুমি কী সুন্দর! তোমাকে গানের মতো লাগে। কামিনী, আমার মেয়ে হলে তোমার সঙ্গে বান্ধবী পাতিয়ে দেব আর জুঁই, যদি আমার ছেলে হয় তোমার সঙ্গে বিয়ে দেব। হা হা হা। কী মজা হবে না! হঠাৎ তার মনে হলো একটা নৌকা ডুবে যাচ্ছে মাঝনদীতে – বাঁচার জন্য শত শত হাত পানির ওপর হাঁসফাঁস করছে; সেখানে বুঝি সালেহার হাতও দেখা যাচ্ছে। তারপর আর কিছু মনে নেই তার।

গ্রামের শেষে একটা বন, বনের পর একটা বিল, বিলের ধারে ভূতের মায়ের ভিটা। এই পথে করিমন বিবি ওরফে ভূতের মা ভিক্ষা করে বাড়ি ফেরে। সেদিনও ফিরছিল, যদিও এবার হিসাব অনুযায়ী আজ তার দক্ষিণপাড়ায় যাওয়ার কথা। সেটা বেশি দূর তাতে আবার বৃষ্টিবর্ষার কাল বলে আজ আর ওদিকে যায়নি। বন পেরিয়ে কিছুটা পতিত জমি পার হলেই উত্তরপাড়া, তাছাড়া শরীরটাও ইদানীং ভালো যাচ্ছে না, তাই উত্তরপাড়ায় যাওয়া। দক্ষিণপাড়া হলে কামাল মুন্সির বাড়ির পেছন দিয়ে কিলো দুয়েক হেঁটে, বন-বিল পেরিয়ে, তারপর বাড়ি।

সেই তুলনায় উত্তরপাড়া অনেক কাছে। যদিও সচরাচর এই পথে মানুষের দেখা তেমন একটা মেলে না। মানুষের প্রয়োজন নেই তা এদিক কেন আসবে? আসার মধ্যে আসে ওই করিমনই। তার প্রয়োজন, সে ভিক্ষা করে বাড়ি ফেরে। এই বৃষ্টিবাদল দিয়ে পথিমধ্যে, বিলের ধারে করিমন ওরফে ভূতের মা সালেহাকে একটা কাশঝোপের আড়ালে আবিষ্কার করে।

এখানে এসে ভূতের মা একটা শব্দ শুনতে পায়। প্রথম ভেবেছিল কোনো জন্তুটন্তু হবে হয়তো। তাই একবার সিদ্ধান্ত নেয় – চলেই যাবে। পরে ভাবে, দেখেই যাওয়া যাক না কী! যদি বনমোরগের দুটো-একটা ছানা পাওয়া যায় মন্দ হয় না। কৌতূহল আর কিছুটা লোভের বশে কাশের ঝোপে উঁকি দিয়ে তো তার চক্ষু চড়কগাছ।

বিস্রস্ত একটা মেয়ে ‘দ’ হয়ে পড়ে আছে। গলা থেকে মুরগির বাচ্চার মতো ‘চিঁ চিঁ’ একটা শব্দ বেরুচ্ছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখে জ¦রে গা পুড়ে যাচ্ছে।

তিন

জন্ম পরম্পরা নিভে যাওয়া ভূতের মায়ের ভিটাতে জন্ম হলো এক নবজাতকের। একটা কালো মোরগ জবাই দিয়ে নাম রাখা হলো মিলন। মোরগের পালকের মতো কুচকুচে তার গায়ের রং। এ গায়ের রং সে কোথা থেকে পেল, কেউ জানে না। শঙ্কর জাতি বলে যে কথিত আছে, এ বোধহয় তারই একটি নমুনা। তামাটে জাতির ঘরে এক কালো সন্তান! বড় বড় চোখ, কিছুটা লক্ষ্মীট্যারা গোছের। তাকালে কখনো মনে হয় ঠিক আছে, আবার পরেই মনে হয় একটা সামান্য ঝামেলা আছে – সেভাবে ধরা যাচ্ছে না। হাতগুলো গোল গোল। পা-দুটো আবার গুবরে পোকার পিঠের মতো ফোলা আর সাদা। ভূতের মা বলে জন্মদাগ।

দুজন নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত 888sport promo codeর মাঝে বড় হতে থাকে মিলন। কুচকুচে কালো শরীর, ধবধবে সাদা পা আর টলটলে এক জোড়া চোখে সে ভূতের মায়ের ভিটায় চড়ে বেড়ায়। মাঝে মধ্যে চলে যায় বনে। প্রজাপতি, পাখি, সাপ, ব্যাঙদের সঙ্গে খেলে। সাপদের দেখে ব্যাঙ খেতে, ব্যাঙদের দেখে প্রজাপতি খেতে। এক অদ্ভুত সৃষ্টিচক্রের জ্ঞান লাভ হয় তার। সে অবাক হয়ে লক্ষ করে, একটা কেঁচো মাটিতে বুক ঘষটে কীভাবে ছোট হয়, বড় হয়, আর এগিয়ে যায়। সে দেখে প্রকৃতির কোনো একটা পদার্থ থেমে নেই। সব চলছে, সামনের দিকে যাওয়ার এক আপ্রাণ ঝোঁক সবার।

বন-জঙ্গল, খাল, বিল বইয়ের মতো সে পাঠ করে চলে। অতঃপর সে অদ্ভুততর এক জ্ঞান অর্জন করে এই প্রকৃতি থেকে। সেদিন ছিল চৈত্রের প্রথম দিন। ঠা-ঠা রোদ। গাছের পাতায় মরচে ধরা, ধুলায় ধূসর পথ। ভূতের মা গেছে ভিক্ষায়। মা গোবর দিয়ে জ¦ালানি তৈরিতে ব্যস্ত। হেঁটে হেঁটে সে একটা পুরনো ডোবার ধারে এসে থামে। পাড়ে বসে সে নিজের পায়ে কালো মাটি মাখছিল। মাটি মাখার পর মনে হলো, পাটা যেন তার শরীরের রঙের সঙ্গে মিলে গেছে।

ডোবায় একটা ব্যাঙ পানিতে মাথা ভাসিয়ে টুলটুল করে তাকিয়ে আছে। সামনের পা শূন্যে তুলে মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে ব্যাঙটা সই করে গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে একটা ঢিল ছুড়তেই ঝুপ করে একটা শব্দ হলো। বৃত্তাকার ঢেউ তৈরি হলো। ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল অনেক দূর পর্যন্ত। এর মধ্যে একটা সরসর শব্দ তার কানে এলো ভাঁটঝোপের দিক থেকে। শব্দটার উৎস দেখতে গিয়ে মিলন সেই দৃশ্যটি দেখল, অবচেতনে যা মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে যায়। যা অবচেতনে একটা দর্শনের ওপর মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয়।

একটা কুচকুচে কালো সাপ, একটা ডোরাকাটা সাপকে গিলে ফেলছে। অর্ধেকটা পেটে চলে গেছে, বাকিটা মুখের বাইরে কুঁকড়ে আছে। বাইরেরটুকুও আস্তে আস্তে ভেতরে চলে গেল, শুধু লেজের কাছে এসে যেন আটকে গেল। ডোরাওয়ালা সাপটার লেজ কালো সাপটার মুখের ডানকষে এসে এমনভাবে বেঁকে গেল, সেটুকু গেলা সহজে হলো না। বেশ কিছু সময় গড়ালে লেজটা বোধহয় দুর্বল হয়ে গেল, এই ফাঁকে বাকিটাও গিলে ফেলে। সাপ খেল সাপ!

দৃশ্যটি দাঁড়িয়ে দেখল মিলন। ডোবার ধারে পিতরাজ গাছটার নিচে গিয়ে কতগুলো বিচি সংগ্রহ করে চারদিকে ছুড়তে ছুড়তে চলে এলো।

চার

রাতে মা আর ভূতের মায়ের মাঝে শুয়ে ভাবছিল ডোবার ধারের দৃশ্যটি নিয়ে। ঘরের ছাউনির ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রমালা ঝিকমিক করছে। মা অন্যদিকে পাশ ফিরে শুল। ভূতের মা টেনে বুকে জড়িয়ে নিতে গেলে মিলন নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।

ছাড় বুড়ি।

ও, এহনও ঘুমাস নাই বুঝি, পাজি।

আচ্ছা দাদি?

ক।

আমি আজকা যা দেখছি, হেইডা হুনবি?

হুম।

ওই ডুবার পাড়ে দেখি কী, কথাটা বলে মিলন থামে, ঢোক গিলে আবার বলে, দেখি কী একটা সাপ আরেকটা সাপরে খায়!

তা …?

কিছু না। উত্তর দেয় মিলন। বিরক্ত হয়। তার থেকে কেমন বুড়ি-বুড়ি একটা গন্ধ নাকে এসে লাগে।

আরে ছেমড়া, বাঁইচা থাকার জন্য সাপ ক্যান, মানুষও মানুষ খায়। যদি …

মানুষ মানুষ খায়?

আরে হ, মানুষ মানুষ খায়, যদি বাঁচতে হয় এভাবেই বাঁচতে হয়। কারণ তোমার মনে রাখতে হইব দাদা, এই পৃথিবীতে সবাই তোমার মা সালেহা না, সবাই ভূতের মা করিমন বিবি না। এইরেই কয় জীবন। গোলাপের গন্ধে তোমার পেট ভরব না, বুঝলি কী কই! বুঝবি বুঝবি, আরেকটু বড় হ, সব বুঝবি। বয়স হইতাছে মানুষের সবচেয়ে বড় গুরু।

এ-সময় সালেহা চিল্লিয়ে ওঠে,

থামাবা তোমাগোর কেচ্ছা? অত জ্ঞান দেওন লাগব না। এহন এট্টু ঘুমাও। সারাদিনের এত ঝক্কি সামলায়া তুমি ক্যামনে পারো? তুমি বুড়ি এট্টু বেশি বকো। নিজের দিকে একটু চাও কী হইতাছ। সারা গা চাইছা তো এক ছটাক মাংসও পাওন যাইব না। হুকায়া কাঠ হইছ, হুকনা কাঠেও যে রস আছে, তোমার শরীর চিপলেও তো সেটুকু মিলবো না। সারাদিন পরিশ্রম কইরা যদি এট্টু না ঘুমাও, বাঁচবা?

তরা বাঁচলেই আমি বাঁচিরে, পাগুন্নি। বুড়ি সালেহার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মিলনের মা চুপ করে সেই আদর উপভোগ করে। মিলন বুড়ির হাতের কারণে বিরক্ত হয়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। সে ভূতের মায়ের হাত ঠেলে সরিয়ে দেয়।

পাঁচ

বুড়ি মিলনকে একদিন ভিক্ষা করতে নিয়ে যাবে বলে কথা দিয়েছিল। সালেহার বাধায় এতদিন ধরে নিতে পারেনি। মিলনের মা তার ছেলেকে দিয়ে ভিক্ষা করাবে না। ভূতের মায়ের কথা হচ্ছে, আহা যাক না। ছোট্ট মানুষ, এক জায়গায় বসে থাকলে ওর ভালো লাগে? কতজন কত কী খেতে দেয়, সঙ্গে থাকলে একটু মুখে দিতে পারবে। আজ সেই মোক্ষম সময়টা পাওয়া গেছে। সালেহা সারাদিন ব্যস্ত থাকে। মিলন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়, তার খোঁজ থাকে না। গতকাল হাতটা কেটে নিয়ে এসেছে। অনেক রক্ত পড়ল। আজ যখন ভূতের মা বলল, সালেহা সহজেই রাজি হয়ে গেল –

যাও নিয়া ওই অত্যাচারটারে। কই কই থাকে, তার চায়া তোমার সঙ্গে থাকা ভালা।

কীরে ছেমড়া! কই তুই?

এই যে দাদি, চোখে দেহ না?

অমন সুন্দর পুতুলটারে আবার না দেহি। ও মিলন মাও, মাথায় এট্টু তেলটেল দিয়া দে না।

পারুম না। এমনি নিয়া যাও। মিলনের মা গজগজ করতে থাকে। ছেলেকে ভিক্ষা করতে নিয়ে যাচ্ছে – এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

ভূতের মা বলে, তাইলে তো হইলই। ওয়, আয় ছেড়া!

সালেহা মুখে না বললেও তেল নিয়ে আসে। মিলনের মাথায় জবজব করে সর্ষের তেল মেখে দেয়। ভূতের মায়ের কুড়িয়ে পাওয়া দুই-তৃতীয়াংশ দাঁত ছাড়া চিরুনি দিয়ে মিলনের সজারুর কাঁটার মতো চুলগুলো বাগে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে চুল আঁচড়ানোতে ক্ষান্তি দিয়ে বকে ওঠে –

আরে চুল না তো, তারকাটার ঝাড়! যা হইছে হইছে, এবার যা। ওই যে বুড়ি দেখ আমারে চোখ ফুটায়া বইসা আছে। এখনই গিলা ফেলল বইলা, যা যা।

নারে, গিলবি তরা। আমি আর কয়টা গিলমু।

আমি মনে অয় কিছুই করি না। সারাদিন বাড়ি বইয়া থাকি? তোমার যত কাম কইরা দেই, তায় পেটে-ভাতে যে কেউ রাখব।

হেইডা কইস না, মা। নিজের বাপই তো রাখে না, আর মাইনসে!

মাইনসে রাখত না, তায়লে তুমি রাখলা ক্যান?

তর মাও যে তাই জুন্য।

এবার সালেহা আর কথা বলতে পারে না। তার তর্কের ক্ষমতা লোপ পায়। চোখ পানিতে ভরে যায়। সে কাজের ছুতোয় মুখ লুকায়।

বুড়ি মিলনকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

মিলন বুড়ির আগে আগে

এটা-ওটার সঙ্গে খেলা করে চলে। বুড়ি পেছন থেকে ‘না না’ করে খবরদারি করে যায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

বিল পেরিয়ে বন পেরিয়ে কী আছে রে দাদি? ওইখানে কী দুনিয়া নাই? থাকলে কেমন? কোনো দিন তো মিলন এদিক আসেনি। এই নিয়ে কত প্রশ্ন তার মনে। প্রশ্নের দুয়ার একের পর এক যেন হঠাৎ এক জাদুতে খুলে যাচ্ছে। ছোট্ট একগুচ্ছ বলের মতোই লাফিয়ে লাফিলে বেরিয়ে আসছে।

বন পেরুলেই মিন্নত হাজির বাড়ি। হাজিবাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঘটিয়ে বসল এক কাণ্ড। কাশফুল তুলতে গিয়ে হাতটাই কেটে ফেলল। বুড়ি হায়-হায় করে দৌড়ে এলো। হাতটা টাটকা কাঁচা রক্তে রঞ্জিত।

আজকা শনিরে সঙ্গে কইরা নিয়া আইছি। দুইটা চালের জোগাড় করুম, না তরে নিয়াই ব্যস্ত থাকুম, রে ছেমড়া!

মিলন নিজের হাতের দিকে চেয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। তারই ভেতরে এত সুন্দর রং! ধারণাতেও ছিল না। কী টকটক করছে। চোখ জুড়িয়ে যায়। সে বাঁ-হাতের আঙুলে নিয়ে জিবের ডগায় লাগায় – কেমন নোনতা একটা স্বাদ।

ভূতের মা রক্ত খেতে বলে, নিজের এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কেন অযথা নষ্ট করবি। বেরিয়েছে যখন খা।

তায়লে কি গুও খামু? মিলন জিজ্ঞেস করে।

বুড়ি তড়বড় করে করে চিল্লিয়ে ওঠে, আমারে খা, হারামজাদা।

গালিটাও কেমন মজা লাগে মিলনের। হারামজাদা। সে এটা মনে রেখে দেয়। কাউকে দেবে সুযোগ হলে।

বুড়ি মিন্নত হাজির ছেলেবউর কাছ থেকে একটা ত্যানা চেয়ে নেয়। কিছুটা দূর্বাঘাস চিবিয়ে বেঁধে দিয়ে বলে, যা কমু তার বিরুদ্ধে তর একটা কথা কওন লাগবই, তাই না?

বকোস ক্যান বুড়ি? নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে বুড়িকে শাসায় মিলন। তুই যা কইলি আমিও তো তাই কইলাম।

এই যে মদ্দা পণ্ডিত, চুপ কর। ভিক্ষা করতে আইসা এত পণ্ডিতির কাজ নাই।

পরের বাড়ির বাইরে থেকেই ভূতের মা হাঁক দেয়, দিবেন গো চাইট্টা চাইল? আল্লা আপনে গো দিব!

নড়বড়ে টিনের গেট, গ্রামের মানুষ যাকে দেউরি-বেড়া বলে, সেখান দিয়ে বাড়ির ভেতরে এসে আরেকটা হাঁক দেয়, দিবেন গো দুইডা ভিক্ষা!

দুটা ঘরের দুটা বারান্দা খা-খা করছে। কোনো মানুষের সাড়াশব্দ নাই। উঠানের বাঁশের আড়ে কাপড় শুকাতে দেওয়া – সেখানে রোদ লেগে কিছু ছায়া সৃষ্টি করেছে। সেই ছায়ায় নাতি নিয়ে ভূতের মা দাঁড়ায়।

পশ্চিমমুখী টিনের ঘর ভেতর থেকে লাগানো। দক্ষিণমুখী ঘরটার দুয়ার খোলা। এত হাঁকডাকের পরও কোনো সাড়া নেই। বুড়ি আবার হাঁক দেয়। তারপর বেরিয়ে আসে। দেউরি-বেড়া থেকে বেরুতেই টিনের ঘরটি থেকে একজন পুরুষ আর একজন 888sport promo codeর খিলখিল হাসির শব্দ স্রোতের মতো বুড়ির পিছু ধাওয়া করে। নাতি নিয়ে সে দ্রুত অন্য বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

ঝাঁ দুপুরের কাঠফাটা রোদে বুড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে মিলন বলে, মনে হইল লোক নাই, ওই যে কথা কয়, হাসে। হুনছ?

ছোকরার কথা শুনে বুড়ির হাসি পায়, পরের কোলা থেকে দুই মুঠা চাইল বাইর করা এত সোজা নারে সোনা। নাতিকে সবক দেয় ভূতের মা। সবাই বলে ভিক্ষা ভিক্ষা! কইরা দেখ না – খায়া বাঁচা লাগব না, হুহ্!

মিলন ভূতের মায়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, কী বলে এসব বুড়ি!

লোক নাই তোরে কে কইছে? লোক আছে, সবই আছে। থাকলেই কী? তরে দিতে হইব? কেউ তরে দিবে নারে ছেমড়া। নিতে হইব। জোর খাটায়া নিতে হইব। পারবি?

পারুম!

উম! কচু। হইত মরজিদের মুষ্টিওয়ালা, দেখতি পিলপিল কইরা বাইরায়া আইসা দিয়া যাইত। না হইলে তো সমাজ রক্ষা অয় না। তার চায়াও বড় কথা, কোরবানির ঈদের গোস্তের ভাগাটা থাইকা যে বঞ্চিত হইতে হইব। আমরা তো ভাই গরিব মানুষ। ভিক্ষা কইরা খাই। এদের না দিলে সমাজের তো দায় নাই। তাই আপদ আইলে তারা এইভাবে চুপ কইরা থাকে। চুপ কইরা থাকলেই কী! তোমারেও চুপ কইরা ওত পাইতা থাকতে হইব, বুঝলা সোনার চান। বাইরাইলে অমনি ছাই দিয়া ধরতে হইব – দে মা, দে। দে কইলাম। হ্যাঁ, এভাবেই আদায় করতে অয়।

বুড়ি একবার নাতির মুখের দিতে তাকায়। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

চল আজ ওত পাইতা থাকতে পারুম না। অন্য বাড়ি যাই। এই বাড়িতে পাওয়া যাইব। এরাও যে গরিব।

গরিব, তায়লে এরা দিব ক্যান?

কারণ ওরা গরিব। ওরা মিসকিনের দুঃখ বোঝে। নাতির ডানা ধরে বুড়ি পরের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

কিন্তু এরই মধ্যে ভূতের মা বলে ফেলে এমন এক সত্য, যাকে বলে গভীর বোধ। এটা কিন্তু সাধারণ কোনো কথা নয়, গভীর উপলব্ধি। একে বলা যায় সক্রেটিসীয় উপলব্ধি; পৃথিবীর সর্বোচ্চ বোধ। এর ওপরে কিছু হয় না। এই বোধ থাকে প্রকৃতিতে, বোধিসমুদ্রের গহিনতম অন্দরে। জীবন যা ভূতের মাকে শিখিয়েছে, কেতাবি জ্ঞান যেখানে হয়তো অক্ষম। একমুঠি চাল যখন ঝরঝর শব্দ তুলে ভিক্ষার ঝুলিতে পড়ে, এই উপলব্ধি সেখান থেকে ওঠে আসা।

পরের বাড়িটা সামর্থ্যবানের। তিনদিকে তিনটা টিনের ঘর।

বাথরুম-টয়লেট পাকা করা। বাড়ির পশ্চিমপাশে লোহার ভারি গেট। সে-বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ভূতের মা।

এই বাড়ি চল, দাদা। ধনী আছে। কিছু খাবারও পাওয়া যাইতে পারে। দুইটা পোলা বিদেশ থাকে। বাবার বাজারে মুদির দোকান। দুই দুইটা সমত্ত পোলা থাকলে আবার দোকান লাগে? তাও বুইড়া হারা দিন দোকানে পইড়া থাকে। আর আমার, এই ভূতের মার মরলেও দেখার মানুষ নাই।

তাইলে আমি আমার মায় তর কেউ না?

তুই? তুই তো আমার মানিক রে দাদা। বড় হ, মায়ের কষ্টটা দূর করলেই হইব। আমার কিছু লাগব না। ততদিনে মইরা কই যামু তার উদ্দিশ আছে! তরা ভালা থাকলেই আমি খুশি। লাল টুকটুক দেখে একটা বউ আনবি। সে তর মায়ের লগে রাঁনব। সবাই মিলা মজা কইরা খাবি। আমি আক্কাশ থিকা দেইখা কত্ত খুশি হমু!

আচ্ছা, ঠিক আছে। আমাকে আর কয়টা দিন সময় দেও। তুমিও মইরো না। আমিই তোমারে আর মায়েরে রোজগার কইরা খাওয়ামু। তখন এদের ভারি শিক্ষা হইব। তুমি আসবা না, এরা আমাদের ভিক্ষাও দিতে পারব না।

একদম ঠিক কইস সোনা আমার।

এটা কিসের আওয়াজ?

বেহুলা-লখিন্দরের পালা অয়। সামনের কয়েক বাড়ি পরে।

তাহলে চলো ওই বাড়ি যাই।

এই কয় বাড়ি শেষ কইরা যাই।

উহু! এখনই যাইতে হইব। চল।

বুড়ির আঁচল ধরে টেনে টেনে মিলন সুরের উৎসের দিকে দৌড়ে চলে।

নারে, জ¦ালাইলি। এরম কইরা বাড়ি গেলে পেটে ভাত জুটব?

একদিন না খাইয়াই থাকুম। চল তো!

বুড়িকে টেনে নিয়ে মিলন পেছনবাড়ির বাউ-বেড়ার ফাঁক দিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়ে। পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। উঠানের একদিকে চারটা জলচৌকি পেতে স্টেজ করা। রঙিন কাপড়ের চান্দা দেওয়া উপরে, চারদিকে কুচি দেওয়া ঝালর। পেছনটা সেই মতো কাপড়ে মোড়ানো। সামনে খড়ের বিছানা দেওয়া দর্শনার্থীদের বসার জন্য।

বাড়িময় হই-হুল্লোড়। আয়োজনের সাজ-সাজ রব। উঠানের একদিকে মাটি কেটে চুলা করা হয়েছে। চুলায় টগবগ করে ফুটছে
মাংস-খিচুড়ি। মহিলাদের কেউ মশলা পিষছে। কেউ চুলা থেকে রান্না নামাচ্ছে। কেউ নতুন করে কোনোটা চুলায় বসাচ্ছে। আনন্দের ধারা বয়ে যাচ্ছে বাড়িটা জুড়ে। গমগম করছে চারদিক। দূর থেকে মনে হচ্ছে নির্জন বনের ভেতর ঝুমঝুম করে বয়ে যাওয়া ঝরনা; কাছে গেলে যা মহাকল্লোলে চারপাশ এলোমেলো করে দিচ্ছে।

লালপেড়ে শাড়ি-পরা এক মহিলা সব তদারকি শেষে মাংসের পাতিলে চামচ নাড়ছে। ঘামে ভেজা তার লাল ব্লাউজ। মাথার সামনের দিকে একগুচ্ছ চুল তার পাকা। ভদ্রমহিলা চামচে করে একটা মাংস বাড়িয়ে দিলো সামনে এসে দাঁড়ানো মাঝবয়সী এক লোকের দিকে। পরনে তার সাদা পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি। লোকটা চামচ থেকে ধোঁয়া-ওঠা মাংসটা নিয়ে সুরুৎ করে মুখে পুড়ে দেয়। মুখের ভেতর নিয়ে জিবের আগায় একটু নাড়ায়-চাড়ায়, লোফালুফি করে। ফাঁকে দুই-তিন চিবানি দিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে – আর একটু জ্বাল হইব। তবে বেসম্ভব মজা হইছে।

লোকটার মন্তব্য শুনে কতগুলো পোলাপান দৌড়ে আসে, আমরাও চাখুম। নুন ঠিক আছে কি না দেখুম!

দয়াময় চেহারার ঘামে ভেজা তামাটে মহিলা কপাল কুঁচকে বলে, তরারও দেহন লাগব?

ছেলেমেয়ের হাতে একটা করে মাংস দেয়। এই দেখে মিলনেরও খুব ইচ্ছে হয়, দাদি, আমিও খামু।

তোমার চাখতে হইব না।

ঝাল-নুন ঠিকই আছে। রাতে আইজ খেতে পারবা। এহন তরে দিলে দুনিয়ার পোলাপান আইসা জুটব। তার কি কাম আছে, পরে আসিস। আর ভূতের মাও! যাও যাও! জ্বালায়ো না। শ্বাস ফেলার সুযোগ পাইতাছি না, ভিক্ষা দেই কী কইরা কও? মাফ করো আইজকা।

দুইটা চাইল দেও, মা। নয় যে আমাগো উপাস দিতে হইব।

দেওগা উপাস! আমারে জ¦ালায়ো না। পরে আইসো। ভদ্রমহিলা চিল্লিয়ে ওঠে। দয়ামাখা তার মুখ হঠাৎ রূঢ় হয়ে ওঠে।

মিলন বুঝতে পারে। দাদিকে বলে, দাদি, চল যাইগা।

বুড়ি মিলনের হাতে ধরে উৎসবমুখর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। মিলনের চোখে পানি চলে আসে। এত আদুরে চেহারা! তার মনে পড়ে মায়ের ছেঁড়া কাপড়ে মোড়ানো মুখটা, যে সবসময় তাকে বকে, গোসল করিয়ে দেয়, মাথায় তেল দিয়ে দেয়, ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দেয় আর বকে; আর রাতের বেলা বুকে জড়িয়ে ঘুমায়। দিন হলে আবার বকে।

ভিক্ষার চার রকম চাল খেয়ে মানুষ মিলন। মনে হয়, এই ভূতের মা আর তার পেত্নির মতো মা-ই তার জন্য সেরা। ওইসব মায়াময় চেহারার মানুষগুলো তার কেউ না। মায়ের কথা মনে হতে মিলনের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি গড়াতে থাকে। বুড়ি তার ময়লা, তেল চিটচিটে আঁচলে সেই অশ্রু মুছে দেয়।

চল দাদা পরের বাড়ি। আজকা বোধ হয় তরারে না খাওয়া রাখতে হইব রে!

বুড়ির বুক ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মিলনের হাত ধরে বুড়ি গিয়ে ঢোকে পরের বাড়ি। লোকে বলে পাতিলচোরার বাড়ি। কোনোকালে খুব অভাবের সময় নাকি কার পাতিলের ভাত চুরি করেছিল। সেই থেকে এই নাম তার। এখন বেশ সচ্ছল হলেও সেই নাম তার ঘুচে নাই। পৃথিবীর এই এক অদ্ভুত বিচার, সারা পৃথিবীকে চুরি করে খেয়ে ফেলছে যারা তাদের বলছ বীর। অন্যদিকে যে ক্ষুধায় কারো বাড়ি থেকে একবেলা ভাত চুরি করে খেয়েছে, তার নামের পাশে চিরতরে বসিয়ে দিয়েছে চোর।

দুটা মাটির ঘরের মাঝ দিয়ে পথ। উঠানে পৌঁছাতেই বাড়ির ছোটবউ ডাকল, ভূতের মা, এদিক আহো।

মিলনের হাত ধরে বুড়ি ছোটবউয়ের ঘরের বারান্দায় বসল। খা-খা রোদের মধ্যে বারান্দার ঠান্ডা মাটিতে বসেই মিলনের আরামে শুয়ে পড়তে মন চাইল,

আমি শুই।

শুবি? না। মাইসের বাড়িতে শুইতে হয় না। নিজের বাড়ি গিয়ে শুবা দাদা।

এর মধ্যে ছোটবউ নারকেল তেলের আধসেরের টিনের মগে করে চাল নিয়ে আসে। মগের মাথা থেকে চাল উঁকি দিচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে বেশ ক’টা চাল। দেখেই বুড়ির মন খুশিতে ভরে যায়। বুড়ি ঝোলায় চাল ঢালতে ঢালতে ছোটবউকে দোয়া দেয়, আল্লাহ, মায়ের কোল সোনার টুকরায় ভরায়া দেও গো, আল্লাহ। ছোটবউ নিঃসন্তান – ভূতের মায়ের তা জানা আছে। কত বদ্যি-কবিরাজ করা হয়েছে, কিছুতেই কিছু হয় না।

ভূতের মায়ের দোয়া ছোটবউয়ের কতটা কাজে দেবে জানা নেই, তবে তাৎক্ষণিক কাজে দেয় খোদ নিজের। ছোটবউ আবার ঘরে গিয়ে ফিরে আসে হাতে দুটা ডিম নিয়ে, ভূতের মা, দোয়া কইরো। আল্লায় যেন আমার দিকে একটু দয়ার দিষ্টি দেয়।

বুড়ি ডিম দুটা ঝোলায় ভরে বলে, আল্লায় তোমার কোল ঝি-ছোকরায় ভরায়া দেউক, হেই দোয়া করি।

পরের বাড়িটা এলাকার জোতদারের। হাফ বিল্ডিং বাড়ি। লোহার গেট। গেটের মধ্যে আবার আরেকটা গেট; পকেট গেট। সেটা দিয়ে বুড়ির পেছনে পেছনে ঢোকে মিলন। কেমন ভয় করে তার। বুড়ি হাঁক দেয়, দেইন গো আল্লার ওয়াস্তে দুইটা!

ভূতের মায়ের হাঁকে আরো ঘাবড়ে যায় মিলন। আঁচল চেপে ধরে বুড়ির গা-ঘেঁষে দাঁড়ায়।

ভূতের মায়ের ডাকে বাড়ির কর্ত্রী বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। হাতে একটা টাকা, ‘ভূতের মা, একটু খাড়াও।’ কর্ত্রী ফের ঘরে ঢুকে দুটা মিষ্টি নিয়ে বেরিয়ে আসে, ভূতের মা, দোয়া কইর। আমার ছোট পোলার সরকারি চাকরি হইছে। ইস্টিশন মাস্টার।

বুড়ি একটা মিষ্টি মিলনকে খেতে দিয়ে আরেকটা একটা কাগজে পেঁচিয়ে ঝোলায় ভরে বলে, ইসটি না কী কইলা, অত ত আমরা বুঝি না। তয় যা অইছে ভালাই ত অইছে, যা অয় তার যেন ভালাই অয়।

বুড়ি হাত তুলে দোয়া করে মিলনকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে।

বুড়ির পাশে হাঁটতে হাঁটতে মিলন ভাবতে থাকে, সবাই যদি স্টেশন মাস্টার হতো! একসময় মনের কথা বলেই ফেলে, দাদি, সবাই যদি ওইগুলা হইত, তায়লে আমি মেলা মিষ্টি খাইতে পারতাম, তাই না।

হ। তার চায়া ভালা কি জানো দাদা?

কি?

ভালো হয় তুই নিজে ওইডা অয়া যদি প্রতিদিন মিষ্টি খাস। আর ওইডা অইলে তো প্রতিদিন মিষ্টি তুই খাইতে পারবিই।

সত্যি?

হ রে ছেমড়া।

তয় আমার কি করণ লাগব?

ইশকুলে পড়তে হবো।

বিলপারে ওই যে ইটের বাড়িটা, সামনে মেলা বড় মাঠ; পোলাপাইনরা মিলা খেলে?

হ হ হ … বুড়ি মিলনের উত্তর দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠে, এইবার চল, বাড়ি ফিরি। তর মা পথ চায়া বইসা আছে।

তরে কইছে! মা, গুবর হুকাইতাছে। বলছে এবার আমারে নতুন একটা গেঞ্জি কিনা দিব।

তাই নাকি?

আরে হ-অ-অ বুড়ি।

তয় দ্রুত চল।

চলো, বলে মিলন এমন দ্রুত হাঁটতে শুরু করে ভূতের মা পেরে ওঠে না। এবার বুড়ি চিল্লায়, আরে আস্তে ছেমড়া কোনানকার।

বুড়ির ডাকে মিলন তার পায়ের গতি কমিয়ে আনে। এরই মধ্যে কাছাকাছি এসে বুড়ি মিলনের হাত পাকড়ে ফেলে বলে, আস্তে যা ছেমড়া, দৌড়াও যে, একা বাড়ি যাইতে পারবি? হারায়া যাবি।

ছয়

অনেক বড় ইশকুল। খুব নামডাক। তবে সমস্যা হলো দূর বেশি। তাই প্রথমে ভূতের মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। অনেক বলেকয়ে ভূতের মাকে রাজি করিয়েছে সালেহা। বুড়ি কিছুতেই অতদূরে পড়তে যেতে দিতে রাজি না। শেষে সালেহার পীড়াপীড়িতে রাজি হয়েছে।

মিলনের প্রথম স্কুলে যাওয়াটা তেমন মধুর ছিল না। সবাই তার থেকে ছোট ছোট, কিন্তু তার চেয়ে বেশি জানা। সে তো একদম

অ-আ-ক-খও জানে না। সেটা সে পুষিয়ে নিল জলা-জঙ্গলের গল্প দিয়ে। সবাই তো ওর বন-জঙ্গলে, জলে-জাঙ্গালের গল্প শুনে মুগ্ধ। প্রথমদিনই সে অনেক মাতিয়ে দিলো। জুটিয়ে ফেলল কতগুলো বন্ধু। যারা ওর সঙ্গে বনে বা জলায় যেতে চায়। সে-ও বলেছে নিয়ে যাবে। তাতে তাদের মধ্যেকার ভাবটা আরো পোক্ত হয়েছে।

তবে মূল সংকট দেখা দিলো ক্লাসের পরিচিতি পর্বে।

মা বলে দিয়েছে যে, বাবার নাম মৃত মোক্তার হোসেন বলতে। নামটা সে মনে মনে বারবার উচ্চারণ করে। শুধু মনে হচ্ছে ভুলে যাবে সে। এর মধ্যে তার ডাক –

হ্যাঁ, তুমি বলো।

আমার বাবার নাম মৃত মোক্তার হোসেন।

আরে আগে তোমার নাম বলো। স্যার শুধরে দেন।

মিলন।

খালি?

জি।

তোমার নাম আজ থেকে মিলন মেলা।

স্যারের কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। সবাইকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়ে স্যার বলেন, এবার বাবার নাম বলো, কী বললে মৃত?

জি।

কীভাবে মারা গেছে?

এটা তো মা বলে দেয়নি। কী উত্তর দেবে এই ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ মুখ থেকে ফুরুত করে চড়ুই পাখির মতো উত্তরটা বেরিয়ে যায়, সড়ক দুর্ঘটনায়।

 আহা-হা! আচ্ছা আচ্ছা, তুমি বসো।

মিলন বসে যায়। বসতে গিয়ে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে যায়। পাশের জন পেছনে আঙুল দিয়ে ছিল।

কী হলো আবার?

কিছু না, স্যার। মিলন বসতে বসতে পাশের জনের দিকে তাকায়। গোলগাল মুখের নাদুস-নুদুস এক ছোকরা।

সাত

বিচিত্র ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মিলনের প্রাইমারি শেষ পর্যায়ে। কিন্তু ঝামেলা তো অন্যখানে। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য জন্ম নিবন্ধনের সনদ লাগে। সনদ তো নেই। এবার সনদ তুলতে গিয়ে দেখা গেল সেই সংকট; যার পিতৃপরিচয় নেই সে-ই কেবল তেমন সংকটে পড়তে পারে।

সালেহা সেই সংকটে পড়ে নাজেহাল। সে একবার সন্তানের দিকে দেখে, একবার দালালের দিকে। গুঁফো দালালের পানের রসে রাঙানো ঠোঁটের কোণে অনিশ্চয়তার হাতছানি, হলে বলো করে দিই। না হলে আমার কিছু করার নেই। আর বোঝই তো আমি ছাড়া আর কেউ এখান থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারবে না। কি, রাজি?

সালেহা চুপ করে বসে থাকে। মিলনের দিকে চোখ পড়তেই তার বুক কেঁপে ওঠে।

হলে বলো। একটা কানাকড়িও আমি নিব না। আর অত ভাব কিসের তোমার? এত সাধু সেজে কী হবে?

সালেহা মিলনের দিকে চেয়ে থাকে। ইউনিয়ন অফিসের বারান্দার হেলনা বেঞ্চে বসে সে পা দোলাচ্ছে। কোনো চিন্তা নেই। নিছক নির্দোষ শিশুর আনন্দ যেমন হয়, সে তার পা দোলানোর খেলায় ডুবে আছে।

তাহলে কেন? সব তো আগেই শেষ হয়ে গেছে সালেহার। এখন আর নতুন কী! এ না-হয় শেষেরও শেষ। তাতে কী! এই নিষ্পাপ ছেলেটা যদি তাতে বেঁচে যায়? তার জন্য তো সে নিজের যা আছে সব অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারে। সালেহার ভাবনাটা এভাবে তৈরি হতে থাকে।

 কী, কিছু বলছ না যে? আমার অত সময় নেই। এক কথায় বলো, হ্যাঁ বা না। অতকিছু শোনার আমার ধৈর্য নেই।

আমি তো কিছুই বললাম না। অত কী পেলেন আপনি?

তো বলো?

হ্যাঁ।

ইউনিয়ন অফিস থেকে সালেহা নিজের সন্তানের হাত ধরে বেরিয়ে আসে। হাঁটতে থাকে। হাতে ধরা সন্তান, চোখ দূর দিগন্তে স্থাপন করা। ট্র্যাজিক নাটকের শেষ দৃশ্যে সব হারানো নায়িকার অন্তর্ধানের মতো তার হাঁটার গতিভঙ্গি। বেদনায় পুড়তে পুড়তে উড়তে থাকা যেন কোনো চিঠি, যার লেখা কেউ কোনো দিন পড়েনি। নিজেকে মনে হয় নিরস মৃত একটা ঘাসবিচালি। এই মাত্র বুঝি কারো কাছে সে তার আত্মাটা বিক্রি করে এলো। সঙ্গে জীবনের সমস্ত অতীতকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো। সে তার হাতের ছোট্ট আর কোমল হাতটিকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। এ হাত কিছুতেই ছাড়া যাবে না।