প্রকৃতির স্বর্ণরেণুর খোঁজে বালিদ্বীপে

888sport slot gameে মানুষের জিজ্ঞাসার জট খোলে। অজানাকে জানা যায়। প্রশান্তি তো আছেই। প্রকৃতির কোন উপকরণ 888sport slot gameপিপাসুকে বেশি টানে – সে-বিষয়টি 888sport slot gameের স্থান নির্ধারণের নির্ণায়ক শক্তি। অনেক সময় দ্বিধাতেও জড়াতে হয় স্থান নির্ধারণে। তবে বোধকরি অসীমের প্রাণে চলা জলরাশির সমুদ্র 888sport slot game মানুষকে টানে বেশি। সেই সমুদ্র যদি হয় মহাসমুদ্রের সৈকত, তবে কে না চাইবে তার সারথি হতে!

ইন্দোনেশিয়ার বালি প্রশান্ত মহাসাগরবেষ্টিত স্থলভাগ। বালির জলরাশি অকটেনের মতো নীলাভ, যা প্রকৃতিতে কমই চোখে পড়ে। সাদা বালি ও নুড়ি পাথরের সৈকত বলেই হয়তো এখানকার জলরাশি অপরূপ নীল। বালির বৈচিত্র্য বা ভার্সেটাইল ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন দুর্লভ। একাধিক রকমারি সমুদ্রসৈকত, বন-বনানী, রাইস টেরেস, কফি প্লান্ট, ভলকানো, পুরনো সব মন্দির – সব মিলিয়ে মনমোহনী।

সহস্র দ্বীপের দেশ ইন্দোনেশিয়া। পরি888sport free betন বলে প্রায় দুই হাজার দ্বীপ আছে দেশটিতে। অর্ধেক দ্বীপের কোনো নামই নেই। হাজার দ্বীপে আবার মানুষের বসতি নেই। দ্বীপের মধ্যে সব বিচারে সেরার তকমা ধারণ করে আছে বালি। পুরো বালি গাড়িতে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে পাড়ি দেওয়া যায়। যেদিকেই যাবেন কিছুটা পথ চললেই সমুদ্র দীপ্যমান হবে – এ যেন উঁকি দেওয়ার জন্যই উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বালির বহুত্ববাদী রূপ দেখতে আপনার মনকে প্রকৃতির সঙ্গে থিতু করতে হবে। সাউথ বালিতে রোদের তেজে গা পুড়ে যায় এমনটা বোধ হলেও নর্থ বালিতে সোয়েটার পরার মতো ঠান্ডা। এ যেন সৃষ্টির আরেক মহিমা। বালির উবুদ, নুসাদুয়া, নুসাপেনিডা – সব শহরেই পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে প্রকৃতির থরে থরে সাজানো উপকরণ।

প্রাচীন বালিতে পসুপ্ত, ভৈরব, শিব সিদ্ধান্ত, বৈষ্ণব, ব্রহ্মা, ঋষি, সরা ও গণপতি – এ আট হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান আবাস ছিল। এসব সম্প্রদায়ের লোক তাদের নির্দিষ্ট দেবতার পূজা করতেন। ফলে বালির সংস্কৃতি ভারতীয় সনাতনী সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। তবে নিজস্বতায় ভারতীয় সংস্কৃতিকে আত্তীকরণ করেছে। দোকানে দোকানে সকালে পুষ্পমঞ্জরির পূজা ও সন্ধায় সান্ধ্য-অঞ্জলির প্রদীপশিখা জ্বালানোর ভারতীয় রীতি বিদ্যমান। তবে শাঁখা-সিঁদুরের রেওয়াজ চোখে পড়েনি। রাস্তাঘাটে যত্রতত্র দেব-দেবীদের মূর্তি। রাম-লক্ষ্মণ, গণেশ থেকে আরো অনেকেই সমাসীন। নুসাদুয়া সিটিতে সমুদ্রের পানি তীরে বোম করে ৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত উপরে ওঠে। এটা দেখতে পর্যটকদের গুনতে হয় জনপ্রতি এক হাজার থেকে বারোশো 888sport appsি টাকার সমপরিমাণ অর্থ। এই আকর্ষণীয় স্থান দেখতে প্রবেশপথে রাম-লক্ষ্মণের উঁচু মনুমেন্ট পেরিয়ে যেতে হয়। তীর-ধনুক নিয়ে ভ্রাতৃদ্বয় দাঁড়িয়ে আছে যেন আপনাকে স্বাগত জানাতে।

বালি দ্বীপের পরিমণ্ডল পর্যটন উপযোগী। তবে সাবধান, টাউট-বাটপার চিনে নিতে হয়। বালির অবকাঠামো ইউরোপের মতো চকচচে ঝকমকে না হলেও ছিমছাম – একটা শৈল্পিক বিন্যাস রয়েছে। স্থানীয় জনগণের স্বোপার্জিত সংস্কৃতি লক্ষণীয়। রাস্তাঘাটে কেউ পলিথিন বা ময়লা ফেলে না, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্ক করে না। তবে পর্যটকদের পকেট কীভাবে জোরজবরদস্তি নয়, বরং কায়দা করে খসাতে হয় – সে ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত।

এখানকার কফি প্লান্টে গেলে তরুণীরা স্বাগত জানিয়ে অনর্গল প্লান্টের আদ্যোপান্ত বলতে থাকবে। সবকিছু স্মিতহাসি সহযোগে বলে আপনাকে প্রীত করে বিনে পয়সায় ১২ রকম স্বাদের কফি প্রাকৃতিক উপত্যকার ঝুলবারান্দায় বসিয়ে খাওয়াবে। ফেরার পথে তাদের সেলস সেন্টারে নিয়ে যাবে। আপনি তখন অবধারিতভাবে এ রকম এন্টারটেইন পেয়ে উচ্চমূল্যে কফি কিনতে বাধ্য হবেন। এটাই বিজনেস পলিসি। বালি 888sport slot gameে গেলে পূর্বে একটু জেনে গেলে রাজ্যের আনন্দ নিয়ে অনেক কিছু অবলোকন করা যাবে। সাদা চোখে দেখলে অনেককিছু অধরা থেকে যাবে। দেখতে হবে গহিনের দৃষ্টি দিয়ে। তবেই দেখা মিলবে বালিনিজ হিন্দু সংস্কৃতির, যা ভারতীয় ও স্থানীয় প্রাচীন সংস্কৃতির মিশেলে দ্রবীভূত এক নতুন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। এখানকার সনাতনী ধ্রুপদী সংগীত ও নৃত্যের স্মারক শুধু রাস্তার পাশে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েই নেই – সুযোগ আছে পর্যটকদের দেখার। বালির লোককাহিনি সমুদ্র সফেনে স্নাত হয়ে প্রাচীনত্বকে বহন করে বিদ্যমান। এখানে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বের অস্টোনেশীয়রা যে সংস্কৃতির গোড়াপত্তন করেছিল, তা ১৪ শতকে জাভানিজ রাজ্য হিসেবে মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতীয়ও একই সঙ্গে কিছুটা চীনা সংস্কৃতির প্রভাবের প্রলেপ পায়। এজন্য খাদ্যাভাসে ও চেহারায় চীনাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এখানকার রেস্তোরাঁর খাবার টেবিলে লেটুস পাতা, পাতাকফির কাঁচাপাতাসহ নানা পাতা দেওয়া হয়। ক্লোল্ড কফির ব্যাপক প্রচলন আছে। বালিতে শীতকাল নেই – কেবল গ্রীষ্ম ও বর্ষা।

বালির সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে হিন্দুধর্মের মতাদর্শী হলেও বালিনিজ নিজস্ব সংস্কৃতি-আশ্রয়ী মন্দিরগুলোর কালচারে বিষয়টি পরিস্ফুট। স্থানীয় জনগণের যাপিত জীবনে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মিলিত প্রভাবের সঙ্গে স্থানীয় লোককাহিনিনির্ভর মিথের প্রভাব। সেখানে অ্যানিমিজম (আত্মাবাদী বিশ্বাস) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘লেয়ক’ হলো বালির মানুষের মধ্যে প্রচলিত মিথের প্রধান চরিত্র। বালির হিন্দুরা বিশ্বাস করে, ‘লেয়ক’ এক ধরনের আত্মা বা জাদুকর। পক্ষান্তরে ‘বারং’ হলো লেয়কের শক্র একটি আত্মা, এটা ভালো আত্মা বা রক্ষক দেবতাকে প্রতিনিধিত্ব করে। এসব মিথ বালির হিন্দু ধর্মের লোকাচারের সঙ্গে মিশে এক নতুন ধর্মীয় সংস্কৃতি তৈরি করেছে। বালির মানুষ হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পূর্বে অ্যানিমিজম বা পূর্বপুরুষের আত্মাকে বিশ্বাস করতো – যা এখনো প্রতিফলিত। আবার এখানকার হিন্দুরা বুদ্ধকে পূজনীয় হিসেবে মান্য করে এবং বৌদ্ধধর্মের রীতি-রেওয়াজও তাদের জীবনপ্রবাহে কিছুটা অভিযোজিত হয়েছে।

প্রতিটি সমাজ তার নিজস্ব পরিমণ্ডল, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা আবর্তিত। এই কথার সাক্ষ্য মেলে বালিতেও। বালিতে প্রচুর লাল ও সাদা কাঠগোলাপ ফুল পাওয়া যায়। এজন্য পূজা থেকে পর্যটক বরণে কাঠগোলাপ আবশ্যিক।

স্থানীয় ঘরবাড়ির গঠন ও উপাদানে চীনাদের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। ভূকম্পন ঝুঁকির এলাকা বিবেচনায় উঁচু দালান বালিতে কম। প্রান্তিকের মানুষের বাড়ি টালির চালের, চীনা ধাঁচের। প্রায় প্রতিটি বাড়ি ঘিরে মন্দির রয়েছে। তবে মন্দিরগুলোর গঠন ভারতীয় মন্দিরের মতো নয়, বরং বৌদ্ধদের উপাসনালয়ের সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে।

মাটি, পানি, আবহাওয়া প্রতিটি এলাকায় ফসল, ফল, মানুষের গঠন এমনকি আচার-ব্যবহারে পর্যন্ত প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। নীল পানির প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল এই অঞ্চলের মানুষ স্বল্পভাষী ও সহযোগী মনের। এখানকার ডাবের সুমিষ্ট পানি, স্টিকি রাইস ও হরেকরকম চা, কফি, মসলার সুনাম বিশ্বময়। বালি দেখার সঙ্গে এসব উপকরণও আপনার জন্য উপভোগ্য হবে। বিশেষত ভ্যানিলা কফি, কোকোয়া কফি, অ্যাবকাড কফি, জিং স্যান কফি, বালি কফির সঙ্গে টারমারিক টি, জিং স্যান টি তো রয়েছেই। সংযুক্ত হতে পারে স্টিকি রাইস, সাচো ইত্যাদি। বালি দ্বীপে প্রায় পক্ষকাল অবস্থানে একটা বিষয় মনে বারবার ঘুরপাক খেয়েছে, পরিচর্যা করলে অনেক কিছু আমাদের দেশেও গড়ে তোলা যায়। বালির যে রাইস টেয়ার বা ঐতিহ্যবাহী ধানক্ষেত আছে, তা আমাদের পার্বত্য জেলায় অনায়াসে গড়ে তোলা যায়। স্থানীয়ভাবে বালিতে ৮০০ বছরের পুরনো সেচব্যবস্থা বা সুবাক (SVBAK) একটা প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে ভারসাম্য ও নির্ভরতা রয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, ব্যবস্থাটি বালিনিজ ট্রাই হিতা কারানা দর্শনের প্রতীক। বালির মানুষ বিশ্বাস করে, এই ব্যবস্থা প্রকৃতি ও ঈশ্বরের মধ্যে সুষম সম্পর্ক বজায় রাখার বন্দ্যোবস্তকে প্রতিফলিত করে।

বালির উবুদ অঞ্চলে এই জাতীয় রাইস টেয়ারের দেখা মেলে। উঁচু পাহাড়ের নিচে ঢালু জমিতে সিঁড়ি কেটে ছোট ছোট ধানক্ষেত তৈরি হয়। পাহাড়ের গা বেয়ে যে ঝরনাধারা আছে সেখান থেকে জল নিয়ে নালা করে বিভিন্ন ক্ষেতে সরবরাহ করা হয়। পর্যটকরা উঁচু পাহাড়ের ঝুলবারান্দায় বসে পাহাড় ঘেরা রাইস টেয়ার দেখে কফির চুমুকে বুঁদ হন – এ যেন চর্মচোখে স্বর্গদর্শন। রাইস টেয়ারকে আকর্ষণীয় করতে উঁচু নারিকেল গাছে রশি বেঁধে দোলনার ব্যবস্থাও করা আছে। তবে এখানে দোল খেতে গেলে গুনতে হবে মোটা টাকা। রাইস টেয়ারকে অধিক লোকপ্রিয় করতে পর্যটকদের জন্য হরেকরকম রাইড যুক্ত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে রাইস টেয়ারের আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য।

বালির স্থানীয় লোকজন কোলাহল ও জটলা পছন্দ করে না। প্রান্তিক এলাকার বাড়িঘরের বাইরে বারান্দায় ও রাস্তায় মানুষের সমাগম কম। বাড়ির সীমানাপ্রাচীর সড়ক থেকে উঁচু ও প্রশস্ত পাথরের। নতুন বাড়িঘর খুব কম। দেখে মনে হবে শতায়ু নিয়ে ঘরবাড়িগুলো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রান্তিক এলাকায় কম মানুষ বসবাস করে। ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি কম। যত্রতত্র সিগন্যাল লাইটও নেই। তবে সর্বত্র ট্রাফিক আইন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানার একটা রেওয়াজ আছে। এখানে দোকানে পণ্য কিনলে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে দেয়; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় রাস্তায় কেউ পলিথিন ফেলে না। জীবনাচরণে কিছু বিষয় উদ্যোগী হয়ে মানা হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ যে উপযোগী থাকে, তা বালিতে এসে আবার বুঝলাম।

888sport slot gameে নতুন পরিবেশে বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোজন করতে হয়। খাদ্য ও যানবাহন একটা বড় প্রতিপাদ্য। তবে বালির খাবারে খুব একটা অসুবিধা হয় না। ভাত, সবজি, মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া কেএফসি, ম্যাগডোনাল্ডস তো রয়েছেই। বালির মানুষের জনপ্রিয় খাবার নাসি ক্যাম্পুর (NASI CAM PUR), নাসি গোরে (NASI GORENA) ও বাউলিং বাঙালির মুখে খুব একটা স্বাদের না। এসব খাবারে রাইস, সবজি, ডিম ও মাংস থাকে। তবে
সাবধান-সতর্ক না করলে আপনাকে শূকরের মাংস খাইয়ে দেবে। বালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে চীন ও স্থানীয় ভূমিজ প্রভাবকে টপকে ভারতীয় সংস্কৃতি সামনে আছে। মানুষকে স্বাগত জানাতে ‘করজোড়ে’ অভিবাদন। রন্ধনশৈলীতে ও মসলার ব্যবহারে ভারতীয় রীতি। উৎসবে দেবতার নৈবেদ্য হিসেবে বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়।

বালির ছোট-বড় হোটেল-মোটেলে সুইমিংপুল একটা কমন বিষয়। বেড ও ব্রেকফাস্ট কমবেশি সকল হোটেলে থাকলেও মানভেদে ভিন্নতা আছে। উবুদে তিন তারকা হোটেলে সুইমিংপুলের পাশে বসে ৫০ পদ দিয়ে সকালের বাহারি নাস্তা খেলেও নুসাপেনিদা গিয়ে জুটেছে কেবল এক পিস পাউরুটি, ডিম ও চা। নুসাপেনিদা বালির একটা ছোট আইল্যান্ড। মূল ভূভাগ থেকে সাগরে দ্রুতগতির বড় স্পিডবোটে এক ঘণ্টার রাস্তা। সানু হারবাল থেকে যেতে হয়। নুসাপেনিদাতে বসতি কম। পর্যটকদের জন্য রয়েছে জগৎসেরা সমুদ্রসৈকত। হলিউড ও বলিউডের সিনেমার সেলুলয়েডের ফিতায় যেসব সৈকত দেখানো হয়, তার অনেকগুলো এখানে। উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে ৩০০-৫০০ ফুট নিচে সৈকত দেখা যায়। পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে কখনো বা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা যায়। সৈকতগুলোর অনতিদূরে ছোট ছোট পাহাড় সমুদ্রের মাঝে যেন ঠায় বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুদূর থেকে ধেয়ে আসা নীলাভ পানির বান পাথুরে পাহাড়গুলোকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করে চলেছে।

বালি দ্বীপে এখানে অনেকটা সুনসান নীরবতা বিরাজমান। হাজার বছর পূর্বে এখানে বসতি নগণ্য ছিল। সমুদ্রের পানির প্রবাহও যে অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠত – সেই বিষয়টির সাক্ষ্য দেয় আজো সমুদ্র পাড়ের পাহাড়ের গায়ে সহস্র বছরের প্রাচীন লোনা পানিতে সৃষ্টি হওয়া পানির খাঁজ। দ্বীপের নৈসর্গিক পরিবেশে এখানে বোধকরি দেব-দেবী, সাধু-সন্ন্যাসীদের নির্জন আবাস ছিল একসময়। পৌরাণিক আখ্যান ও মন্দির বালিতে প্রচুর। হিন্দুদের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মন্দির এখানে রয়েছে। বালির একটি জীবন্ত হিন্দুতীর্থ ‘তানাহ লট মন্দির’। বলা হয়ে থাকে, সমুদ্রের মাঝে একটা বিশাল পাথরখণ্ডের ওপর এই মন্দির। ষোড়শ শতাব্দীতে তৈরি। সনাতনী বিশ্বাসমতে, সমুদ্রের দেব-দেবীদের নীরব উপাসনার জন্য পবিত্র ও শান্ত স্থান বলেই এটি নির্মিত। বালিতে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনির অনেক বিষয় এই ‘তানাহ লট মন্দির’কে কেন্দ্র করে। মন্দিরটি একটি দৈত্য সাপ দ্বারা মন্দ আত্মাদের অনুপ্রবেশ থেকে মন্দিরকে রক্ষা করে – এমন বিশ্বাস পূজারিদের।

এই মন্দিরের রেওয়াজ-রীতি ভারতীয় মন্দিরের থেকে খানিকটা ভিন্ন। মূলত বালিনিজ হিন্দুধর্ম ভারতীয় হিন্দুধর্মের পাশাপাশি স্থানীয় বিশ্বাস যেমন সর্বপ্রাণবাদ, পূর্বপুরুষ পূজা এবং বোধিসত্বের সংমিশ্রণ। আত্মাদের প্রতি নৈবেদ্য এখানকার একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ। বৌদ্ধরা 888sport free betয় নগণ্য হলেও বালিতে বৌদ্ধদের সাংস্কৃতিক প্রভাব আছে। বালির পাশের জাভা দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধমন্দির ‘বোরো বুদুর’। বোরো মানে ‘বড়’ আর ‘বুদুর’ মানে ‘বুদ্ধ’। বালিতেও রয়েছে বৌদ্ধমন্দির ‘ব্রহ্মবিহার আরাম’। তবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এখানে ছোট-বড় বিশ হাজারের বেশি হিন্দু মন্দির রয়েছে।

হিন্দু মন্দিরগুলোর মধ্যে বেসাকিহ মন্দির (BESAKIN TEMPLE) যাকে বালির মাতৃমন্দির হিসেবে মান্য করা হয়। আগুর পর্বতের ঢালে অবস্থিত এটি একটি মন্দির কমপ্লেক্স।

ছোট-বড় ৮৬টি মন্দির সিরিজ রয়েছে এখানে। বালির মন্দিরগুলোর বিশেষত্ব হলো, বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাস অনুসারে ধর্মীয় কার্যক্রম চলে। যেমন : ধর্মীয় শিক্ষা, ঈশ্বরের সঙ্গে চুক্তি, পবিত্র শপথ, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নিবেদনের মতো কাজগুলি করা যায়।

ইন্দোনেশিয়ার হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে বালি রাজ্যে প্রতিবেশী জাভানিজ দ্বীপের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এখানকার ভাষা, 888sport live chat, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে চীন, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়াসহ নিকটবর্তী দেশের প্রভাব প্রযুক্ত। পনেরো শতকে জাভার মুসলিম অধিনায়ক দেমাক সুলতানের পতনের পর হিন্দু মজপহিং সভাসদ, অভিজাত শ্রেণি, পুরোহিত এখানে আশ্রয় নেন। কালেতে এদের 888sport free betধিক্যে নতুন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে। এই ধারা বিবর্তনের মাধ্যমে আজো বহমান। বালি দ্বীপের মধ্যে রয়েছে বিচ্ছিন্ন কিছু দ্বীপ। এগুলোর মধ্যেও বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।

বালির উবুদ শহরে উবুদ সেন্টারের পাশের জাদুঘরে গেলে বালির ইতিহাসের বেশকিছু স্মারকের সন্ধান মিলবে। দেখা মিলবে সানুর শহরে প্রাপ্ত ৯১৪ সালের বেলানজং স্তম্ভের শিলালিপি, অষ্টম শতাব্দীর বৌদ্ধধর্মলিপি সংবলিত পুস্তিকা।

বালিতে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক গড়ে ওঠার বড় কারণ – পার্শ্ববর্তী জাভা থেকে আসা অভিজাত পুরোহিতরা স্থানীয়দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শৈলী ও সৌকর্যে প্রভাব ফেলেছিলেন, যা এখনো গ্রামের বাড়িঘর ও মন্দিরের স্থাপত্য দেখলে বোঝা যায়। বালির ভেতর ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর রাজসভায় মহাপহিৎ রাজসভার বহুমান্য পুথি যেমন – নগরকৃতগামা, সুতাসোমা, পরারতন ইত্যাদি সংরক্ষিত ছিল, যার কিছু অংশের এখনো দেখা মেলে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের এই অঞ্চলে অনেক আগে থেকে ডাচ, ফরাসি, ইংরেজদের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ ছিল। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পাল তোলা জাহাজ নোঙর ফেলতো এখানে, ফলে পণ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটেছে সহজাতভাবে। নুসাপেনিদার ব্রোকেন বিচের বাতিঘর এখনো সাবেকি আমলের সেই যোগাযোগের দিকে নির্দেশ করে।

বালিতে অনেক সমুদ্রসৈকত থাকলেও সব সৈকতের পানিতে নামা পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নয়। তাই উপযোগী হওয়ার কারণে নুসাপেনিদা ক্রিস্টাল বিচের ছোট পরিসরেও পর্যটকদের ভিড়। এখানকার নীলাভ স্বচ্ছ পানির নিচের নুড়ি-পাথর, কোরাল দৃষ্টিনন্দন। বিশেষ করে দুর্লভ নীল কোরাল পাওয়া যায় এখানে। সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখতে এখানে মশগুল হয় স্বল্পবসনা তরুণ-তরুণীরা। অনেকে ছোট নৌকায় ভেসে সাঁঝের বেলা যাপন করে সঙ্গীকে নিয়ে। সমুদ্রে দুই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে পড়ন্ত সূর্যের লাল আভা যখন আবির মাখায় সমুদ্রের নীল জলে, তখন কূলে দাঁড়িয়ে মনে হয় সে-দৃশ্য স্বর্গসম।

বিবিধ প্রকৃতির উপকরণে বালি সমৃদ্ধ। এজন্যই বালির সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যটি ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়ে আছে। বালির মাঝে সমুদ্র উপকূলঘেঁষে শহরতলিতে রয়েছে বেশ কিছু ব্যয়সাশ্রয়ী কটেজ। কোলাহলমুক্ত। কেউ আপনার খোঁজ নেবে না – আপনি না চাইলে। নুসাদুয়া শহরে The Tree House – এরকম এক কটেজে পরিচয় হলো স্কটিশ যুবক মারসের সঙ্গে। প্রায় তিন মাস সে এখানে আছে। কটেজের রান্নাঘরে স্বপাকে খাবার তৈরি করে। কিচেনে ওভেন থেকে ফ্রিজসহ সব সুবিধা আছে। যখন মন চায় রান্না করে, কোনোদিন সকালে, কখনো বা মাঝরাতে। অনেকটা বেলা আয়েশ করে ঘুমিয়ে মারস Tree House-এর ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করে, সুইমিংপুলে গোসল করে। তারপর ভরদুপুরে হোন্ডা নিয়ে ভোঁ-ভোঁ শব্দ করে বেরিয়ে যায়। মারসের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, চার মাসের জন্য দুনিয়া থেকে ছুটি নিয়েছে। কোনো ধরনের জাগতিক সংযুক্ততায় না থাকতে বালির নুসাদুয়া চলে এসেছে। Tree House-এর নীরবতা, রাতের জোৎস্নার সঙ্গে বিজলি বাতির মিটিমিটি আলো বড় উপভোগ করে সে। সত্যই Tree House–এ আমার রুমের লবিতে বসে দেখেছি, এখানে বাস করা পর্যটকরা অন্যের বিরক্তি ঘটে – এমন বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেন। কটেজের ভেতর সরু রাস্তায় সবাই চলে পিনপতন নীরবতায়। দুনিয়ায় কিছু সময় প্রকৃতির মাঝে ডুবে থাকতে এমন কটেজের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পর্যটকদের মানুষ নয়, প্রাকৃতিক উপকরণের সঙ্গে সময় যাপনের জন্য। কটেজের কর্মীরা কেবল আপনি ডাকলেই সাড়া দেবেন, নচেৎ আপনার খোঁজও নেবেন না।

বালি কেন এত পর্যটককে টানে – এমন জিজ্ঞাসা আমারও ছিল। অবলোকন করে অনুভব হলো, রকমারি প্রাকৃতির উপকরণ এখানে পরস্পর জড়িয়ে আছে। আছে প্রকৃতির ভিন্ন রূপের বৈভবে হৃদয়গ্রাহী আকর্ষণ। আপনি বালির আদ্যোপ্রান্ত ঘুরে যেদিন ইন্তামিনে অবস্থিত বালির সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট আগুং-এ জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখবেন, তখন মনটা দেখার আনন্দে ভরে যাবে। ইন্তামিনের পাহাড়ের উপর উঠে সামান্য দূরে মাউন্ট আগুং-এর ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখবেন – এ এক দুর্লভ চিত্র। মাউন্ট আগুং ১০৩২৮ ফুট উঁচু। সারা দিন আগ্নেয়গিরি থেকে ধোঁয়া উঠলেও ভোরে বেশি হয়। অনেক সময় ধোঁয়ার মাত্রা বেশি হলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। জীবন্ত মাউন্ট আগুং আগ্নেয়গিরির চারপাশটা মনোমোহনী। পর্বতের গা বেয়ে চলছে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বয়ে আসা ক্যানেল। চারপাশ পাহাড়, বন-বনানীতে ঘেরা। ক্যানেলে চলছে ছোট ছোট নৌযান নীল পানি ভেদ করে। হালকা শীতের ঝিরঝিরে বাতাস সত্যিই সুধাময়।

বালির সবকিছু দৃষ্টি জুড়ে দেখার, আর অনুভব করার। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমি বিধাতার সৃষ্টি কোন সুন্দরকে অস্বীকার করবো!