এক
ফ্লাইওভার এই তল্লাটে নতুন এসেছে।
ফ্লাইওভার আসার আগে এখানে শুধু রাস্তা ছিল – মাটির ওপর দিয়ে চলা একটা সরল জিনিস, যেখানে হাঁটতে গেলে পা লাগত মাটিতে, চোখ পড়ত সামনে, আর মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হতো প্রায় সমান উচ্চতায়; কিন্তু ফ্লাইওভার মানে হলো মাথার ওপর দিয়ে চলা রাস্তা, যেখানে আয়েশ করে হাঁটা যায় না, এমন কিছু যা নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ছায়া দিয়ে, শব্দ দিয়ে, আর একধরনের শীতলতা দিয়ে, যা ধীরে ধীরে মানুষের মাথার ভেতরেও ঢুকে পড়ে, ঘুমের ভেতর ঢোকে, স্বপ্নের কাঠামো বদলে দেয়, কথা বলার ফাঁকে ঢুকে পড়ে এমনভাবে যে মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন তার চিন্তার ভঙ্গি বদলে গেছে।
প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এই এলাকায় যন্ত্রণা চলেছে, ফ্লাইওভারের কল্যাণে একের পর এক যন্ত্রণা ঢুকেছে, প্রথমে শব্দ ঢুকেছে – ড্রিলের শব্দ, পিলার বসানোর শব্দ, লোহার ঘষাঘষি, ক্রেনের শব্দ, ভারী যানবাহন চলাচলের রাজকীয় শব্দ। শব্দের কোনো হিসাব নেই, কারণ শব্দ এখানে আর আলাদা কোনো ঘটনা নয়, শব্দ এখানে দিনভর থাকে, রাতভর থাকে, শব্দের ভেতরে আবার শব্দ জন্ম নেয়, মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়েও যখন একটা গাড়ি চলে আর হর্ন বাজে, তখন কেউ জানে না কেন বাজে, কেউ কেউ বলে ড্রাইভার ঘুমাতে চায় না, তাই শব্দ করে নিজেকে জাগায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটা আসলে খুব ছোট, কারণ শব্দ শুধু ড্রাইভারকে জাগায় না, শব্দ পুরো তল্লাটকে জাগিয়ে রাখে, জাগিয়ে রাখে এমনভাবে যে মানুষ আর রাতের গভীরে যেতে পারে না।
শব্দের পরে ধুলা ঢুকেছে – সাদা ধুলা, ধূসর ধুলা, কালো ধুলা, এমন ধুলা যা চোখে দেখা যায়, আবার এমন ধুলা যা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। ধুলা আগে ছিল, এখন নেই – এমন নয়; বরং ধুলা এখন নিয়মিত, অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, মানুষের দিনের শুরুই হয় জানালা মুছতে মুছতে, তারপর আবার ধুলা জমে, দুপুরে আবার মোছে, সন্ধ্যায় আবার, আর রাতে মানুষ হাল ছেড়ে দেয়, কারণ রাতের ধুলা আলাদা – রাতের ধুলা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সকালে তার উপস্থিতি এমনভাবে ধরা পড়ে, যেন কেউ ঘরটার ভেতরে ধুলা দিয়ে গোপনে রাতভর খেলা করে গেছে।
ফ্লাইওভারের সঙ্গে সঙ্গে এ-তল্লাটে শব্দ ঢুকেছে, ধুলা ঢুকেছে, কিন্তু আলো বেরিয়ে গেছে, কোনো নাটকীয় বিদায়ের মতো নয়, বরং ধীরে ধীরে, এমনভাবে যে মানুষ প্রথমে খেয়ালই করেনি, কবে শেষবার সে সরাসরি সূর্যের আলোয় দাঁড়িয়েছিল। আগে আকাশটা অন্যরকম ছিল, নিচু হলেও চাপা ছিল না, সূর্য দেখা যেত, দুপুরে একতলার ছাদে দাঁড়িয়ে মানুষ গায়ে রোদ মেখে দিনের গভীরতা পরিমাপ করত; কিন্তু এখন আর তা হয় না, কারণ আকাশের জায়গাটা দখল হয়ে গেছে। যারা তিনতলা পর্যন্ত থাকে, তারা সবচেয়ে বেশি বোঝে এই পরিবর্তন, কারণ তাদের সকাল হয় ঠিকই, কিন্তু আলো আসে না, দুপুর হয়, কিন্তু সূর্য কোন দিকে আছে তা বোঝা যায় না, শুধু একটা স্থির ছায়া থাকে, যে-ছায়া কোনো কিছুর সঙ্গে নড়ে না, আর এই না-নড়া ছায়াটাই ধীরে ধীরে দেয়ালের মতো হয়ে যায়, দেয়ালের মতো মানুষের ভেতরেও দাঁড়িয়ে পড়ে।
এই শব্দ, ধুলা, আলোহীন অন্ধকার, সবকিছুর ভেতর দিয়েই সখেলা বিবির সময় চলে, যদিও তিনি জানেন না, ফ্লাইওভার শুধু বাইরের একটা কাঠামো নয়, এটা ধীরে ধীরে তার নিজের জীবনের ভেতরেও কংক্রিটের একটা কাঠামো তৈরি করছে।
দুই
মফিজ সাহেবের বাড়িটা যে আগে একতলা ছিল, এই বিষয়টা সখেলা বিবির মনে আজো স্পষ্ট, কারণ সেই একতলা সময়টার সঙ্গে তাঁর শরীরের 888sport sign up bonusগুলো খুব শক্তভাবে জড়িয়ে আছে। দুপুরে রান্নাঘরে আলো ঢুকত, ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা খুললে ভাপের সঙ্গে আলোও ভেসে উঠত, আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে তিনি একধরনের নিশ্চয়তা অনুভব করতেন, যেন এই ঘর, এই মানুষ, এই জীবন, সবকিছু একই রেখায় এগোচ্ছে।
ফ্লাইওভারের পিলারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৌচাক মার্কেটের উল্টো দিকে মফিজ সাহেবের বাড়িটা একতলা থেকে দোতলা হয়, তারপর দোতলা থেকে তিনতলা। সখেলা বিবিরও উন্নতি হয়, তিনি নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠেন, কিন্তু দোতলা থেকে তিনতলায় উঠতে গেলেই বিপত্তি বাধে। মফিজ সাহেব বলেন, ‘আরে ছাদের নিচে অনেক গরম। তুমি সইতে পারবে না।’ বিয়ের বারো বছর পেরিয়ে গেলেও স্বামীর এমন ভালোবাসা আর দরদ পেয়ে চোখের জলে ভাসেন সখেলা বিবি।
সখেলা বিবি দোতলায় আটকে গেলেন। এই সময় থেকেই তিনি লক্ষ করতে শুরু করেন, আলো কমছে, শব্দ বাড়ছে, আর তার নিজের শরীরের ভেতরে একধরনের অদ্ভুত টান তৈরি হচ্ছে, যেন শরীরটা নিজের জায়গায় ঠিকমতো বসে নেই; কিন্তু তিনি তখনো ভাবেননি, এই অস্বস্তির সঙ্গে সন্তানের না হওয়ার বিষয়টা একদিন এমনভাবে জড়িয়ে যাবে যে তা জমে ধুলার আস্তরণের মতো অনবরত ঘষামাজা করেও আলাদা করা যাবে না।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথাটা প্রথম তুলেছিলেন মফিজ সাহেবই, খুব স্বাভাবিকভাবে, এমনভাবে যেন এটা কোনো অভিযোগ নয়, বরং দায়িত্ব; সখেলা বিবি তখন লজ্জা পেয়েছিলেন; কিন্তু লজ্জাটাকে তিনি নিজের দোষ বলে মেনে নিয়েছিলেন, কারণ সমাজে এটাই শেখানো হয় – সন্তান না হলে প্রথম প্রশ্নটা মেয়েদের দিকেই যায়।
রিপোর্টগুলো আসত সাদা কাগজে, কালো অক্ষরে, আর সেই অক্ষরগুলোর ভেতরে কোনো অনুভূতি ছিল না, কোনো ব্যাখ্যা ছিল না, শুধু 888sport free betর মতো কিছু তথ্য, যেগুলো পড়তে পড়তে সখেলা বিবির মনে হতো, তার শরীরটা যেন ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে সরে গিয়ে একটা আলাদা বস্তু হয়ে যাচ্ছে, যেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কিন্তু যার শরীর তার মতামত কেউ জানতে চাচ্ছে না।
মফিজ সাহেব রিপোর্টগুলো হাতে নিয়ে খুব বেশি কথা বলতেন না, শুধু বলতেন, ‘দেখি’, অথবা ‘সময় লাগবে’, আর এই সময় লাগার ভেতরেই সখেলা বিবির মাথার ভেতর একটা অন্য সময় তৈরি হতে থাকে, যেখানে তিনি বারবার ভাবেন, হয়তো তার শরীরটাই যথেষ্ট নয়, হয়তো তিনি পরিপূর্ণ 888sport promo code হতে পারেননি, হয়তো এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য ফ্লাইওভার তৈরির মতো একটা বড় কিছু করতে হবে। এই ‘একটা বড় কিছু’ ঠিক কী, সেটা তখনো স্পষ্ট ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, মফিজ সাহেবের নীরবতার ভেতরে একটা পরিকল্পনা জমে উঠছে, ঠিক যেমন ফ্লাইওভার বানানোর সময় প্রথমে শুধু পিলারের গর্ত খোঁড়া হয়, তারপর ধীরে ধীরে পুরো কাঠামো দাঁড়ায়।
সোহেল যখন তার বাসায় প্রথম আসে, তখন সে সখেলা বিবির প্রতি মফিজ সাহেবের স্বাভাবিক দায়িত্বে প্রতিনিধিত্বকারী এক যুবক – বাজার আনা, ওষুধ আনা, কথা বলা, গল্প করা, আরো কত কিছু, যেসবের জন্য পুরুষের প্রয়োজনীয়তা আমাদের সমাজে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। সোহেলের শব্দময়, ধুলামাখা, আলোহীন সেই গল্পগুলোর ভেতরে এমন কিছু ছিল, যা সখেলা বিবির বহুদিনের জমে থাকা নিঃসঙ্গতার সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছিল। তিনি তখনো ভাবেননি, এই ছেলেটার উপস্থিতি তাঁর শরীরের জন্য কোনো সিদ্ধান্তের অংশ হতে পারে।
কিন্তু ধীরে ধীরে সোহেলের আসাটা নিয়ম হয়ে যায়, আর নিয়ম মানেই হলো স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া, এমনকি এমন কিছুও স্বাভাবিক হয়ে যায়, যা আসলে হওয়ার কথা নয়; সখেলা বিবি একসময় খেয়াল করেন, মফিজ সাহেব যখন বাসায় থাকেন না, তখনই সোহেল বেশি আসে, আর এই সমাপতনটাকে তিনি প্রথমে কাকতালীয় বলে ধরে নেন, কারণ সন্দেহ করার মতো শক্তি তখন তার ভেতরে অবশিষ্ট ছিল না।
একদিন, খুব সাধারণ একটা বিকেলে, যখন বাইরে ফ্লাইওভারের উপরে-নিচে গাড়ির শব্দ চলছিল আর ঘরের ভেতরে আলো কম ছিল, তখনই সম্পর্কের সীমারেখাটা ধুলায় ঢেকে যায় – সোহেলের গল্পের এক অংশ তাঁর শরীরে ঢুকে পড়ে, শব্দ স্পর্শে রূপ নেয়, আর সখেলা বিবি হঠাৎ করে বুঝতে পারেন, তিনি কোনো পরিস্থিতির অংশ নন, তিনি নিজেই সেই পরিস্থিতি, যেটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই মুহূর্তে তাঁর মাথার ভেতরে একসঙ্গে অনেক সময় চলে আসে – মফিজ সাহেবের তিনতলায় একা থাকা, সখেলা বিবির দোতলার আলাদা জগতের আড়াল, অফুরন্ত অবসরের ফাঁকে সোহেলের অবাধ গমনাগমন, ডাক্তারের কাগজ, মফিজ সাহেবের ‘দেখি’, আর এই সবকিছুর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ফ্লাইওভার, একটা বিকল্প রাস্তা, যেটা অবশেষে তার শরীরের ওপর দিয়েই বানানো হচ্ছে।
‘কেউ জানবে না, কেউ না, বাসায় কেউ আসবে না, কেউ জানতে পারবে না’ – এরকম শব্দের চাপে সোহেলের কান ছিঁড়ে ফেলা সখেলা বিবির কামড়টাকে শুধু প্রতিরোধ বললে ভুল বলা হবে। তাঁর কামড়টা ছিল এই পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার শরীরের শেষ কথা, আর দাঁত দিয়ে সোহেলের কানটা আলাদা করে ফেলার মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি আর কোনো বিকল্প হতে রাজি নন।
এরপর সবকিছু থেমে যায় – সোহেল আর আসে না, মানুষের শব্দ কমে যায়, গাড়ির শব্দ কমে না। আর মফিজ সাহেবের সঙ্গে তাঁর দূরত্বটা এমনভাবে তৈরি হয়, যেন মাঝখানে অদৃশ্য একটা ফ্লাইওভার দাঁড়িয়ে গেছে, পরিকল্পনাহীন একটা ফ্লাইওভার, সংযোগহীনতার কারণে যেটা দিয়ে আর একে অপরের কাছে পৌঁছানো যায় না। মফিজ সাহেবের দূরে সরে যাওয়া খুব নাটকীয় ছিল না, বরং খুবই নীরব, এমন নীরবতা যেখানে অভিযোগ নেই, ঝগড়া নেই, শুধু ধীরে ধীরে কথার ফাঁক বাড়ে, দৃষ্টির ফাঁক বাড়ে, আর সেই ফাঁকগুলো একসময় স্থায়ী দূরত্বে পরিণত হয়। সখেলা বিবি তখন বুঝতে শুরু করেন, নীরবতাও একধরনের সিদ্ধান্ত, আর এই সিদ্ধান্তটা তাঁর পক্ষে নয়।
কয়েক মাসের মধ্যে নতুন বিয়ের খবরটা যখন আসে, তখন তিনি অবাক হন না, কারণ তাঁর কাছে এটা আর কোনো ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং একই কাঠামোর পরের ধাপ, যেখানে প্রথম বিকল্প ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় বিকল্পে যাওয়া হয়, আর এই দ্বিতীয় বিকল্প এবার সামাজিকভাবে বৈধ, প্রকাশ্য, আলোয় ভরা, ঠিক যেমন ফ্লাইওভারের ওপরের দিকটা সব সময় আলো পায়। এই উপলব্ধির সঙ্গে তিনি বুঝতে শুরু করেন, ফ্লাইওভার আসলে শুধু রাস্তার সমাধান নয়, ফ্লাইওভার হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে নিচে পড়ে থাকা কষ্টগুলোকে দেখা হয় না, কারণ সবাই ওপরে উঠতে ব্যস্ত।
তিন
মফিজ সাহেব তিনতলায় নতুন সংসার গড়েন, যে-সংসারের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে রোমেনা বিবি, অল্পবয়সী মেয়ে, দুনিয়ার সবকিছু কমই বোঝে, তাই তো খালি হাসে, তার হাসির সঙ্গে শরীর কাঁপে, রাস্তা থেকে ভেসে আসা ধুলা শরীরে বসতে পারে না। বউয়ের চকচকে, ধুলাহীন শরীরে মজে থাকেন মফিজ সাহেব। রোমেনা বিবির হাসির শব্দে চাপা পড়ে ফ্লাইওভার থেকে ভেসে আসা গাড়ির শব্দ। মফিজ সাহেবের সারাদিনের কষ্টগুলো চাপা পড়ে রোমেনা বিবির হাসিতে, আপত্তিহীন স্পর্শে।
রোমেনা বিবি একদিন আপত্তি করে, ‘ফ্লাইওভার থেকে লোকজন শুধু আমার দিকে চেয়ে থাকে। তুমি বাসাটা পাঁচতলা করে দাও যাতে ওপরে তাকাতে গেলে পাবলিকের ঘাড় ভেঙে যায়।’ মফিজ সাহেব রোমেনা বিবির দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি লেগে থাকে, ভাবেন, এই অল্পবয়সী মেয়েটা ‘তুমি’ করে ডাকলে শরীরের কোণে কোণে খুশির হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। সেই খুশির হাওয়া টিকিয়ে রাখতে মফিজ সাহেব সেদিনই ছাদে মিস্ত্রি আনেন। পরদিন থেকেই পুরোদমে কাজে লেগে যান। কয়েক মাসের ব্যবধানে রোমেনা বিবি ফ্লাইওভার থেকে অনেক ওপরে পাঁচতলার জানালায় বসে নিচে থুথু ফেলে।
রোমেনা বিবির চার আর পাঁচতলার ডুপ্লেক্স বাসার নিচে ফাঁকা তিনতলা। সখেলা বিবির দোতলা থেকে তিনতলায় ওঠা প্রায় অবধারিত থাকলেও রোমেনা বিবির আপত্তির কারণে তা আর হয়ে ওঠে না। সেখানে বড় আকারের ডাইনিং টেবিল বসে, বাকি রুমগুলো শুধু রোমেনা বিবির আত্মীয়স্বজনের জন্য গেস্টরুম হিসেবে বরাদ্দ থাকে।
সখেলা বিবি সশরীরে দোতলায় আটকে থাকেন। কিন্তু তাঁর চলাচল পুরো বাসাজুড়ে, তিনি কখনো দোতলায়, কখনো তিনতলায়, আবার কখনো একতলার পুরনো 888sport sign up bonusর ভেতরে, যেখানে আলো ছিল সরাসরি, শব্দ ছিল সহনীয়, আর মানুষ নিজের জায়গাটা ঠিক করে চিনতে পারত। তিনি শব্দ শোনেন, কিন্তু দেখেন না। এই দেখেন না কথাটার ভেতরে শুধু চোখের সীমাবদ্ধতা নেই, আছে তাঁর অবস্থানের সারাংশ, কারণ ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে ওপরে তাকালে যেমন শুধু শব্দ শোনা যায়, গাড়ির গতি বোঝা যায়, কিন্তু গাড়ির ভেতরের মানুষদের দেখা যায় না, তেমনি সখেলা বিবিও এখন নিজের জীবনের ওপর দিয়ে কীভাবে সিদ্ধান্তগুলো চলে যাচ্ছে, তার শব্দটা শুধু শুনতে পান, দৃশ্যটা আর ধরতে পারেন না।
ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে শব্দগুলো দৌড়ে যায়, সরলরেখার মতো সব শব্দ। আর সেই দৌড়ানোর সঙ্গে তার ভেতরের সময়ও দৌড়ায়, কখনো সামনে, কখনো পেছনে, কখনো একেবারে থেমে গিয়ে, কারণ সময় এখানে আর সোজা রেখা মেনে চলে না। লিফটের টুংটাং শব্দটা তাঁর কানে লাগে বিশেষভাবে, কারণ এই শব্দের সঙ্গে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা জড়িয়ে থাকে, এই বুঝি থামবে দোতলায়, এই বুঝি দরজা খুলবে, এই বুঝি ওপরে থাকা কেউ নিচে নামবে। সখেলা বিবি মাঝে মাঝে কাঠের দরজায় কান লাগিয়ে থাকেন, কিন্তু প্রত্যেকবারই তাঁর কানের পাশ ঘেঁষে লম্বভাবে উঠে পাঁচতলায় গিয়ে টুংটাং করে, আবার লম্বভাবে নিচে নেমে গিয়ে টুংটাং করে, লিফট দোতলায় থামে না, মফিজ সাহেবও আসেন না।
শুক্রবার সকালে লিফট থামে দোতলায়, ড্রাইভার আসে, বাজার দিয়ে যায়। তার এই আসা-যাওয়াটা এতটাই নিয়মিত যে এর ভেতরে আর কোনো মানবিক যোগাযোগের অবকাশ থাকে না। বাজারের ব্যাগগুলো যেমন দরজার ভেতরে ঢুকে পড়ে, তেমনি সখেলা বিবির দিনগুলোও ঢুকে পড়ে রান্না, নামাজ, টিভি সিরিয়াল আর অপেক্ষার মধ্যে, আর রাতগুলো আসে ভার হয়ে, এমন ভার নিয়ে আসে যে, বিছানায় শুয়ে থাকলেও মনে হয় বুকের ওপর কেউ বসে আছে।
সোহেলের 888sport sign up bonusটা এখন আর একক কোনো ঘটনার মতো নয়, সেটা ছড়িয়ে আছে অনেক মুহূর্তে, তার কথার ভঙ্গিতে, তার হাসির অস্বস্তিতে, তার উপস্থিতির অতিরিক্ত স্বাভাবিকতায় এবং এই ছড়িয়ে থাকার ভেতরেই সখেলা বিবি সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েন, কারণ তিনি বুঝতে পারেন, ঘটনাটা যতটা না হঠাৎ, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ছিল, এমন পরিকল্পনা যেখানে তার সম্মতির জায়গাটা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল।
রোমেনা বিবির নামটা প্রথমে শুধু একটা নাম ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নামের সঙ্গে জুড়ে যায় হাসির শব্দ, ওপরে ওঠার শব্দ, নতুন তলার শব্দ, আর এই সব শব্দের ভেতর দিয়ে মফিজ সাহেবের অবস্থান বদলে যেতে থাকে, তিনি নিচের তলা থেকে ওপরে উঠে যান, ক্ষমতার দিক থেকে, সিদ্ধান্তের দিক থেকে, আর নৈতিকতার দায় থেকেও। মফিজ সাহেবের বাসায় না থাকার বেলায় তিনতলার গেস্টরুম থেকে সোহেলের হাসির শব্দও ভেসে আসে প্রায়ই। সঙ্গে রোমেনা বিবিরও। মাঝে মাঝে সখেলা বিবির মনে হয় ওপরে গিয়ে দেখে আসতে, কান ছাড়া সোহেলকে কেমন দেখায়!
চার
রোমেনা বিবির নামটা এখন বাতাসে ভাসে, তার গর্ভধারণের গল্পও ভাসে, মফিজ সাহেবের সফলতার গল্পও ভাসে, সেটা সরাসরি কোনো ঘোষণার মতো ছিল না, বরং ফ্লাইওভারের নিচে ছড়িয়ে পড়া শব্দের মতো, কেউ নিশ্চিত জানে না, কিন্তু সবাই ধরে নেয়, আর এই ধরে নেওয়ার ভেতরেই সখেলা বিবির বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়, কারণ তিনি বুঝতে পারেন, এখন আর তার অভিজ্ঞতাকে কেউ প্রশ্ন করবে না, এখন সব ব্যাখ্যা একটাই, দেখো, সমস্যা তোমারই ছিল। কিন্তু এই গল্পগুলো সখেলা বিবির ভেতরে আর আবেগের আলোড়ন তোলে না, কারণ তিনি বুঝে গেছেন, এই সফলতার ভেতরে কোনো নৈতিক শান্তি নেই, আছে শুধু কাঠামোর জয়, আর কাঠামো জিতলে মানুষ হারে, এই সত্যটা তিনি এখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
রোমেনা বিবি যখন তিন, চার আর পাঁচতলা মিলে রাজত্ব করেন, সখেলা বিবি তখন নিচে বসে শব্দ শোনেন, ফ্লাইওভারের শব্দ, লিফটের শব্দ, সোহেলের শব্দ, আর নিজের ভেতরের সেই প্রশ্নগুলো, যেগুলোর কোনো উত্তর নেই, কারণ এই ব্যবস্থায় প্রশ্ন করার জায়গাটা নিচে রাখা হয়নি; প্রশ্নগুলো উপরে ওঠে না, সখেলা বিবির শরীরের মতোই দোতলার এক কোণে আটকে থাকে। তিনি বুঝতে শুরু করেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা বাইরের কারো সঙ্গে নয়, বরং সেই সব ব্যাখ্যার সঙ্গে, যেগুলো এতো দিন তাঁকে বোঝানো হয়েছে, আর যেগুলো তিনি নিজেও একসময় মেনে নিয়েছিলেন। এই ব্যাখ্যাগুলোর একটা ছিল, সবকিছু পরিস্থিতির দাবি, আর পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে সন্তান না হলে সংসার টেকে না, তাহলে বিকল্প খোঁজাটাই বুদ্ধিমানের কাজ; এই যুক্তিটা তিনি বহুদিন ধরে শুনে এসেছেন, কখনো সরাসরি, কখনো ইঙ্গিতে, কখনো ডাক্তারের কণ্ঠে, কখনো আত্মীয়দের প্রশ্নে, আর কখনো নিজের ভেতরের অপরাধবোধের ভাষায়, আর ঠিক এই যুক্তির ওপর দিয়েই প্রথম ফ্লাইওভারটা তাঁর জীবনে উঠেছিল।
এখন তিনি সেই ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকান, আর দেখতে পান, কীভাবে একটার পর একটা সিদ্ধান্ত তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে চলে গেছে, কীভাবে তাঁকে বোঝানো হয়েছে, এইটা তোমার জন্যই, এইটা সংসারের জন্য, এইটা ভবিষ্যতের জন্য, আর এই ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটার ভেতরে তাঁর নিজের অস্তিত্বটা কখনোই ছিল না, ছিল শুধু সম্ভাব্য সন্তানের মুখ, যে-মুখকে সামনে রেখে সব নৈতিক প্রশ্নকে চাপা দেওয়া হয়েছে।
সখেলা বিবির দিনগুলো কোনোরকমে কেটে যায়। বিপত্তি বাঁধে রাত নিয়ে, নিঃসঙ্গ রাতগুলো বুকের ওপর চেপে বসে, তাই তো বিছানায় শুয়ে-বসে টিভিতে সিনেমা দেখেন, শাকিব খানের সিনেমা। তাতেও ক্লান্তি পেয়ে বসলে মাঝরাতে জানালা খুলে বাইরে তাকান, তেমন কিছুই চোখে পড়ে না, বাধ্য হয়ে ফ্লাইওভারের পিলারে আটকে থাকা সিনেমার পোস্টার দেখেন, এখানেও নতুন কিছু নাই, ঘুরেফিরে একই মুখ, শাকিব খান, নায়িকা পরিবর্তন হয় মাঝে মাঝে, কখনো অপু, কখনো বুবলি, কখনো পূজা চেরি, কখনোবা কলকাতার নায়িকা।
সিনেমার পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হয়, এই মুখগুলো, নায়ক, নায়িকা, ভিলেন, পার্শ্ব-অভিনেতা, পার্শ্ব-অভিনেত্রী, সবাই যেন এক ধরনের মুখস্থ পুনরাবৃত্তি, কারণ তারা বদলায় না, তারা একইভাবে হাসে, একইভাবে কাঁদে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের গল্পে সমস্যার সমাধান থাকে; কিন্তু সখেলা বিবির নিজের জীবনে কোনো সমাধান নেই, শুধু বিকল্প আছে, আর সেই বিকল্পগুলো সব সময়ই তাঁর শরীরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।
পুরনো এসব মুখের ভিড়ে রাস্তায় নতুন একটা কথা ভাসে। গর্ত খোঁড়া হবে, নতুন আরো একটা ফ্লাইওভার হবে এই তল্লাটে। সখেলা বিবির চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, শরীরের ওপরে জমে থাকা ধুলা এক ঝটকায় ফেলে দেন, তারপর পা দুটো শক্ত করে চেপে ধরে শাড়ির আঁচলের অংশ কোমরে গুঁজে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘জীবন থাকতে আর কাউকে গর্ত খুঁড়তে দেবো না।’


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.