মোস্তফা কামাল
মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল রাস্তার পাশে, হয়তো পার হওয়ার অপেক্ষায়। কেবলই কৈশোর পেরিয়েছে সে Ñ দেখে তেমনই মনে হচ্ছিল Ñ মুখজুড়ে এখনো কৈশোরের লাবণ্য ছড়ানো। চোখে কৌতূহল, হয়তো খানিকটা চপলতাও, ঠোঁটে মৃদু-মায়াময় হাসি। অথচ সিঁথিতে আঁকা গাঢ় সিঁদুর, আর কপালের লাল টকটকে টিপটি তার বিয়ের চিহ্নটিকেই প্রকাশ করছে যেন! এত অল্প বয়সে বিয়ে! চকিতে একবার এ-বিস্ময়ও বোধ হলো জামানের। কিন্তু এরকম তো হয়, অহরহ হয়! বিশেষ করে গ্রামে, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে, এমনকি শহুরে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারেও এমনটি হতে দেখেছে সে। হয়তো মেয়েটিও নিম্নবিত্ত পরিবারেরই। পরনের কমদামি সুতির শাড়িটি যেন সে-কথাই বলছে। যদিও খুব পরিপাটি করে পরেছে শাড়িটি, তবু খানিকটা মলিনতা Ñ বেশ কিছুদিন সাবান দিয়ে না ধোয়ার ফলে রয়ে যাওয়া মলিনতা চোখে বাজে। হয়তো বাবা অথবা স্বামী দিনমজুর বা এ-জাতীয় কিছু, নিত্যনতুন শাড়ি পরার বিলাসিতা নেই, এমনকি প্রতিদিন সাবান দিয়ে ধোয়ার মতো সামর্থ্যও নেই। তবে পরিপাটি করে পরার জন্য, অথবা কৈশোরোত্তীর্ণ সদ্য তরুণী-শরীরের সঙ্গে মিশে থাকার জন্যে এই সাধারণ শাড়িটিকেও কী যে মনোরম লাগছে! মেয়েটি হয়তো পার হওয়ার জন্যই দাঁড়িয়েছিল Ñ ফুটপাতে নয়, রাস্তার একপাশে Ñ কিন্তু রাস্তায় ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম, কূল নাই কিনার নাই জ্যাম। যতদূর চোখ যায়, নানা আকারের, নানা রঙের বিবিধ যানবাহন Ñ রিকশা, ট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ি, বাস, মাইক্রোবাস, ভ্যান, তেলবাহী গাড়ি Ñ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে। আগেপিছে দুটো গাড়ির মাঝখানে এমন কোনো ফাঁকা জায়গা নেই যে ফাঁক-ফোকর দিয়ে কেউ পার হয়ে যেতে পারবে! মেয়েটি সেই অকূল সমুদ্র সামনে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, যদিও ঠোঁটের হাসিটি ছিল অমলিন-অপরিবর্তিত, মুখে বিরক্তির ছায়া নেই, শরীরেও নেই তাড়াহুড়ার চিহ্ন। অনন্তবিস্তৃত জ্যামের ভেতর বসে থেকে এগুলো হয়তো ততোটা খুঁটিয়ে দেখেনি জামান; কিন্তু পরে ভাবতে গিয়ে এসব কথাই মনে এসেছিল তার। সত্যি কথা বলতে কী, এতকিছু দেখার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না, থাকে না কোনোদিনই। বরং ভীষণ বিরক্তিতে মন ছেয়ে থাকে, হতাশায় নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে, রাগে-ক্ষোভে চোখ লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু করার নেই, বসে থাকতেই হবে। অফিসে পৌঁছতে প্রতিদিনই দেরি হয়ে যাচ্ছে তার, ইমেজের বারোটা বাজছে, একসময়ের নিয়মানুবর্তিতার মডেল এখন হয়ে উঠেছে অনিয়মের উদাহরণ। কিন্তু সে কী-ইবা করতে পারে? আধাঘণ্টার পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য সে ঘণ্টাদুয়েক আগেই রওনা দেয় বাসা থেকে Ñ তারপরও যদি এ-অবস্থা হয়, কী করবে সে! জ্যামেরও কোনো মাথামুণ্ডুু নেই। পৈতৃকসূত্রে তাদের বাসাবাড়িটা রাজারবাগ, আর দুর্ভাগ্যক্রমে অফিসটা পড়েছে বারিধারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। বড়জোর ১০-১২ কিলোমিটার পথ। প্রায় সাত বছর ধরে সে এ-পথে যাতায়াত করছে। সবকিছু একরকম মুখস্থই হয়ে গেছে বলা যায়; এমনকি চোখ বুজে থাকলেও বুঝতে পারে Ñ এ-মুহূর্তে সে কোথায় আছে! নিয়মিত জ্যামগুলোও জানা হয়ে গেছে অনেক আগেই। বাসা থেকে বেরিয়ে মালিবাগ মোড় থেকে মৌচাক পর্যন্ত একটা নিয়মিত জ্যাম, তারপর রামপুরা-ওয়াপদা রোডের মোড়ে একটা ছোটখাটো জ্যাম, এরপর রামপুরা ব্রিজের কাছে আরেকটা, তারপর মধ্যবাড্ডা-লিংক রোডের আগেপরে একটা লম্বা জ্যাম, শেষে নদ্দা মোড়ে আরেকটা জ্যাম পেরোতে হয়। এ সবকিছু মাথায় নিয়েই বাসা থেকে বেরোয় সে। অল্পস্বল্প জ্যাম হলে ঘণ্টাখানেকের ভেতর পৌঁছে যেতে পারে সে, তবু ঘণ্টাদুয়েক হাতে নিয়ে বেরোয়। কিন্তু এখন ঠিক বোঝারই উপায় থাকে না Ñ আসলে জ্যামের কারণটা কী; আর কোথায়-কতটুকু-কতক্ষণের জ্যাম আছে! কোনো-কোনোদিন বাসা থেকে বেরোনোর পর জ্যাম শুরু হয়, শেষ হয় অফিসের কাছে গিয়ে। এই জ্যামের বর্ণনা শুনতে বা পড়তে যতটা ক্লান্তি লাগে, এর মধ্যে বসে থাকাটা এর চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্তিকর, বিশেষ করে যখন তাড়া থাকে আর অফিসে ইমেজের বারোটা বাজার আশঙ্কা থাকে। জামান সেই বিরক্তি নিয়েই বসেছিল। গাড়ির জানালা খুলে নিজের অজান্তেই অথবা অভ্যাসবশত কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই গালে হাত দিয়ে জ্যামের অকূল সমুদ্র দেখতে দেখতে ভাবছিল Ñ আজ বোধহয় সারাদিনেও পৌঁছানো যাবে না!। কিংবা হয়তো সে আসলে নির্দিষ্টভাবে কিছুই দেখছিল না। কী-ই বা দেখার আছে এই নিত্যদিনের একঘেয়ে পুরনো দৃশ্যের ভেতরে? হয়তো খানিকটা উদাসীন চোখেই সে মেয়েটিকে একবার দেখে নিয়েছিল, কিছু হয়তো ভেবেছিল কিংবা ভাবেনি, তবে সিঁদুর দেখে চকিতে মেয়েটির অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে বলে একটু বিস্মিত হয়েছিল, সেটা ঠিক উল্লেখ করার মতো পর্যবেক্ষণ নয়। এরকম অবস্থায় চিন্তারও কোনো আগামাথা থাকে না; কোনটা ছেড়ে কোনটা ভাবছে সেটা নিজেকে জিজ্ঞেস করেও জবাব পাওয়া যায় না! ফলে কখন যে তার গাড়ির আগেপিছে কিছুটা ফাঁকা জায়গা বেরিয়ে পড়েছিল সে ঠিক খেয়াল করে উঠতে পারেনি, যেমন বুঝে উঠতে পারেনি মেয়েটি ঠিক কখন তার কাছে এগিয়ে এসেছিল। রাস্তা পার হওয়ার জন্য গাড়ির সামনে অথবা পেছন দিয়ে চলে যাওয়াটাই সংগত; কিন্তু মেয়েটি এগিয়ে এসে তার প্রায় মুখের কাছে মুখ নামিয়ে আচমকা জিজ্ঞেস করে Ñ ‘দাদা আপনে কি কবি?’ সে প্রায় চমকে ওঠে। উত্তর দেওয়ার কথা তার মনে আসে না, তবে মেয়েটিকে একটু ভালো করে দেখার ইচ্ছা জাগে, কিন্তু তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই এবং উত্তরের অপেক্ষা না করেই গাড়ির পেছন দিয়ে রাস্তা পার হয়ে যায় সে! জামান পেছন ফিরে মেয়েটিকে এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে নানাভাবে দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়!
দুই
প্রশ্নটি তাকে এই বিরক্তিকর অপেক্ষা থেকে মুক্তি দিয়ে ভাবনাকাতর করে তুলতে সমর্থ হয়! মেয়েটি আচমকা প্রশ্ন করে উত্তর না শুনেই চলে গেল কেন? নাকি প্রশ্নটি হঠাৎ করে তার মনে আসেনি, অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছিল? উত্তরের প্রত্যাশা যে সে করেনি, সেটা তার আচরণ থেকেই বোঝা যায়। তাহলে কেন প্রশ্নটি করল সে? একটা কারণ হতে পারে, সে আসলে নিজের অনুভূতিটিই জানাতে চেয়েছিল; হয়তো এটি ঠিক প্রশ্ন নয়, একটি মন্তব্য মাত্র Ñ আপনাকে কবির মতো লাগছে! কিন্তু এরকম একটি মেয়ের কাছে প্রশ্নটি আদৌ প্রত্যাশিত নয়, দেখে খানিকটা গ্রাম্য ও দরিদ্র মনে হয়েছে তাকে; যদি শহুরে মেয়ে বলে মনে হতো, তবু ভেবে নেওয়া যেত যে, কোনো কবির সঙ্গে জামানের মিল পেয়েছে মেয়েটি, তাই এসে জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু শহুরে মেয়ে হলে প্রশ্নটা করেই চলে যেত না, একটা উত্তর পেতে চাইত। শহুরে মেয়েরা মনোযোগ কাড়তে চায়, এতটা উদাসীনতা তাদের ভেতরে থাকে না। মেয়েটির এমন প্রশ্ন বা মন্তব্যের কারণ তাহলে কী হতে পারে? তবে কি সেও কোনো কবির সঙ্গে পরিচিত ছিল? এমনও তো হতে পারে, মেয়েটির গ্রামে একজন কবি ছিল Ñ গ্রামে এরকম স্বভাবকবি তো থাকেই Ñ আর মেয়েটি তার ভেতরে ওই কবির ছায়া খুঁজে পেয়েছিল! তা কী করে সম্ভব? তার চেহারার ভেতরে কি কবিসুলভ কোনো ব্যাপার আছে? ধুর! নিজের মনেই হাসল সে। আর মেয়েটি যদি সেটা পায়ও Ñ জামানের ভাবনা শাখা বিস্তার করতে লাগল Ñ তাহলে সে প্রশ্নটি করে উত্তর না নিয়েই চলে গেল কেন? কেবল নিজের কথাটি জানানোর জন্য? মেয়েটি কি তবে ওই কবিকে Ñ যদি আদৌ তার অস্তিত্ব থেকে থাকে Ñ ভালোবাসত? ভালোবাসত, কিন্তু জানাতে পারেনি? বা জানানোর সাহস হয়নি? বা কবি তার স্বভাবসুলভ উদাসীনতা দিয়ে বালিকার প্রেমকে উপেক্ষা করেছেন? জানাতে পারেনি বলেই কি মেয়েটা তার প্রেমটিকে আজকে এক অচেনা-অকবি শহুরে মানুষকে সাক্ষী রেখে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে গেল? আহা, সে-কবি কী সৌভাগ্যবান Ñ জামান ধরেই নিল, এরকম একজন কবির অস্তিত্ব সত্যিই আছে, এমন একটা প্রেম সে পেয়েছিল। আর কী দুর্ভাগা দ্যাখো, এমন চমৎকার প্রেম পেয়েও সে গ্রহণ করেনি! কবিরা অবশ্য সবসময়ই এমন প্রেম পেয়ে থাকে। সে তো নিজের জীবনেই এর প্রমাণ পেয়েছে। মনে করতে না চাইলেও তার মনে পড়ে গেল নিজের অকবি-তুচ্ছ-আটপৌরে জীবনের বেদনাদায়ক সে-ঘটনাটি।
অন্তহীন ভাবনায় ডুবে ছিল সে, জ্যামের কথা ভুলেই গিয়েছিল, পথের কথাও! অফিসে পৌঁছে ড্রাইভার তাকে ডেকে সম্বিৎ ফেরানোর আগ পর্যন্ত সে টেরই পেল না কোনোকিছু!
তিন
অফিসে ঢুকেও ঘোর কাটল না জামানের! বসকে চেহারাটা দেখানো দরকার, সেটিও মনে পড়ল না; চারপাশের সহকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্যসূচক হাই-হ্যালোটুকুও বিনিময় করল না আজকে! নিজের ডেস্কে বসে কাজ করার নামে একদৃষ্টিতে কম্পিউটার-স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কিছুই দেখছিল না সে। তার চোখজুড়ে ছিল মেয়েটির প্রায়-না-দেখা মুখ; আহা, কেন যে আরেকটু ভালো করে তাকাইনি – ভাবছিল সে! ভাবছিল নিজের কথাও। কিছুই হলো না জীবনে – এমন একটা দুঃখবোধ জেগে উঠছিল মনে। যে-মেয়েটিকে ভালোবেসেছিল সে, সেও চলে গেছে অবলীলায়, হয়তো এতদিনে তার কথা ভুলেও গেছে পুরোপুরি। যদি আমি কবি হতাম, ভাবছিল জামান, সে কি ছেড়ে চলে যেতে পারত? কিংবা গেলেও কি এভাবে ভুলে থাকতে পারত? নাকি হঠাৎ কোনো এক আনমনা মানুষকে দেখে তারও মনে পড়ে যেত আমার কথা! কবিরা কী সৌভাগ্যবান, আহা! সে কি কখনো কবি হতে চেয়েছিল? না, চায়নি। ছোটবেলায় সবার মতোই দু-চার লাইন লিখেছে বটে, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘ভূত’ও ছেড়ে গেছে! বন্ধুরা কেউ-কেউ 888sport app download apk লিখত, তার মতো আরো অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে; আর যারা গোঁয়ারের মতো লেগেই ছিল তাদের অনেকেই কবিখ্যাতি পেয়েছে। মধ্য-তিরিশে পৌঁছেও এখনো তারা তরুণ কবি! ওদের সঙ্গে দেখা হয় মাঝে মাঝে, এলেবেলে-সাদামাটা কথা বলতে-বলতেই অলৌকিক দু-চারটে বাক্য বলে ফেলে ওরা! সে-কথাটি মাথায় গেঁথে থাকে, গেঁথে থাকে মনেও। সেজন্যেই কি কবিদের ভোলে না মেয়েরা? তিথি, তার ভালোবাসার মেয়েটি, তো 888sport app download apkর ঘোরতর পাঠক ছিল। শুধু 888sport app download apkর নয়, কবিদেরও অন্ধভক্ত ছিল সে। কবিদের সে গণ্য করত ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে। বয়সে অন্তত বছর-বিশেকের বড় এক কবির প্রায় প্রেমেই পড়ে গিয়েছিল তিথি। সবসময় তার 888sport app download apkর বই বুকে চেপে ঘুরে বেড়াত, কথায়-কথায় সে-কবির 888sport app download apkর উদ্ধৃতি দিত, সে-কবিকে দেখা যাবে এরকম কোনো অনুষ্ঠানে যে-কোনো মূল্যে হাজির থাকতে চাইত! এই মুগ্ধতাকে সহজভাবেই গ্রহণ করেছিল জামান। কতজনই তো এরকম অদ্ভুত প্রেমে পড়ে! কেউ নায়কের, কেউ গায়কের; আর তিথি তো পড়েছে কবি ও 888sport app download apkর! বিশুদ্ধ এই প্রেম, আপত্তির কিছু নেই এতে। কিন্তু কীভাবে যেন কবির সঙ্গে তার যোগাযোগ স্থাপিত হলো, আর তখন মুগ্ধতাবোধটা কেবল 888sport app download apk পর্যন্তই রইল না, রক্তমাংসের কবিও চলে এলেন তার জীবনে। এরকম একজন ঘোরগ্রস্ত সুন্দরী-তরুণী পাঠক পেয়ে নিশ্চয়ই তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন! অন্তত তিথির কথা থেকে সেটি বোঝা যেত! কী যে উচ্ছল হয়ে উঠত সে কবিকে নিয়ে কথা বলার সময়! তাতেও সমস্যা হয়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত না কবি নিজে তার এ-পাঠককে নানা জায়গায় নিমন্ত্রণ করতে লাগলেন, আর তিথি সবকিছু উপেক্ষা করে সেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে লাগল। একবারের কথা খুব মনে পড়ে জামানের! সে খুব শখ করে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিল তিথিকে পয়লা ফাল্গুনে পরবে বলে, সঙ্গে ছিল বাসন্তী সাজে সাজার 888sport app উপকরণও। সেদিন তারা দুজন সারাদিন একসঙ্গে থাকার পরিকল্পনা করে রেখেছিল মাসখানেক আগেই। আগের দিন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু ফাল্গুনের প্রথম সকালেই তিথি হঠাৎ ফোন করে বলে –
আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, সারাশরীরেও ব্যথা। এই শরীর নিয়ে বাইরে বেরোনো কি ঠিক হবে?
শুনে জামানের মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতদিনের পরিকল্পনা আর অপেক্ষা! জ্বর আসার আর সময় পেল না! কিন্তু সে কোনোদিনও অবিবেচক ছিল না। মনের কষ্ট চেপে রেখে বলে –
একটু রেস্ট নাও। কিছু খেয়ে একটা ওষুধ খেয়ে দ্যাখো। যদি একটু ভালো লাগে তাহলে না হয় দেরি করেই বেরিয়ো।
আচ্ছা, তাই করি। ভালো লাগলে তোমাকে জানাব – বাধ্য মেয়ের মতো বলে তিথি।
জামান অপেক্ষা করে আর আধঘণ্টার মধ্যে আবার তিথির ফোন পেয়ে মন খুশিতে নেচে ওঠে। তাহলে দিনটা মাটি হয়ে যাচ্ছে না! কিন্তু তিথি অন্য কথা বলে –
একটা কথা বলি, রাগ করো না!
কী কথা?
আগে বলো, রাগ করবে না।
বলোই না।
না বলো, রাগ করবে না!
আচ্ছা, করব না। বলো।
আজ বিকেলে কবি বাংলা একাডেমীতে 888sport app download apk পড়বেন, আমাকে যেতে বললেন। যাই ওখানে?
সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। বাংলা একাডেমীতে তারা যেতেই পারে, তাদের সারাদিনের ঘোরাঘুরিটা না হয় বিকেলে গিয়ে বইমেলাতেই থামল, কিন্তু তিথি তো তা ভাবছে না! যেতে চাইছে একা, সারাদিন দুজনের একসঙ্গে কাটানোর কথা সে যেন ভুলেই গেছে! সে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না; অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর – ‘এই তোমার কী হলো, কথা বলছ না কেন’ Ñ শুনে প্রায় শোনা যায় না এমন ভঙ্গিতে জামান বলে –
আমাদের দেখা হবে না?
বিকেলে তো অনুষ্ঠান। তুমি যদি সন্ধ্যার পর আসো, দেখা হতে পারে!
সে আর কিছু বলেনি। কী ভয়াবহ উপেক্ষা আর অবহেলা – ‘যদি আসো’ – নিজের কোনো আগ্রহই নেই যেন তিথির! সারাদিনে আর কোনো যোগাযোগও করেনি মেয়েটি। সারাদিন মন খারাপ করে বাসায় বসে থেকে বিকেলে জামান প্রায় ছুটে গিয়েছিল বাংলা একাডেমীতে। বাসন্তীরঙা আর কোনো মেয়ের দিকে সে সেদিন ফিরেও তাকায়নি, অনুষ্ঠানমঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেছিল, তিথি একেবারে সামনের সারিতে বসা – তারই দেওয়া শাড়িতে বাসন্তী রঙে সেজেছে সে! অপরূপা এক রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগছিল ওকে। একবার এগিয়ে যেতে চাইলেও ওর ঠোঁটের উজ্জ্বল-মায়াময় হাসিটি দেখে জামানের আর সাহস হয়নি তিথির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর। মনে হয়েছিল, সে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই ওই অপূর্বসুন্দর হাসিটি হারিয়ে যাবে, ফুটে উঠবে বিরক্তির ভ্রুকুটি! অনুষ্ঠান শেষ হয়, 888sport app কবির সঙ্গে তার প্রিয় কবিও নেমে আসেন, এবং অন্য কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তিথির কাছে এসে কিছু একটা বলেন! তার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে, সায় দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায় এবং উঠে দাঁড়িয়ে কবির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। জামানও প্রায় সারাক্ষণই তাদের অনুসরণ করে যায়! কাজটা খুব গর্হিত হচ্ছে জেনেও সে নিজেকে সামলাতে পারে না! দুজনে কী যে এত কথা বলছে, দূর থেকে সেটা বোঝার উপায় নেই! এ-মেয়েটি আজকে তার সঙ্গে এভাবেই থাকতে চেয়েছিল, ভাবতেই তার বুক ভেঙে আসে। দুজন অনেকক্ষণ একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, স্টলে গিয়ে একসঙ্গে বই দেখে, কবি তাঁর নিজের বই উপহার দেন তিথিকে, তারপর তার চারপাশে আস্তে-ধীরে লোকজনের ভিড় জমে উঠলে তিনি কিছু একটা বলেন তাকে। খানিকটা বিষণœতা নেমে আসে তিথির চোখেমুখে। একটু দূরে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ফোনটা হাতে তুলে নেয়। একটুক্ষণ পর জামানের ফোনে মেসেজের টোন বাজে। দ্যাখে তিথির মেসেজ Ñ ‘তুমি কি আসবে? অনেক ধুলো। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। তুমি না এলে বাসায় চলে যাব!’ পড়ে জামানের অভিমান আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। সে লেখে Ñ ‘আসতে পারব না বোধহয়! আমি আজকে ভালো নেই!’ লিখতে গিয়ে তার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। এতদিন পর সেটা ভাবতে গিয়ে আবার চোখ ভিজে উঠল তার! ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে, কিছুই দেখল না, কিছুই ভাবল না! না, তিথি ভুল করেনি Ñ একজন সম্ভাবনাময় তরুণ আমলার গলায় মালা পরিয়েছে সে যথাসময়ে। এমন নয় যে, ওইদিনের ঘটনার পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটেছিল Ñ তবে একটা সুতো কেটে গিয়েছিল, সেটা বোধহয় দুজনেই টের পেয়েছিল! এখন সে কেমন আছে, কোথায় আছে জামান জানে না। তবে তাকে যে তিথি মনে রাখেনি, এ-ব্যাপারে সে শতভাগ নিশ্চিত! মনে রাখার কোনো কারণও তো নেই Ñ সে তো 888sport app download apk লিখতে জানে না!
চার
দিনটা গেল ঘোরের ভেতরে। কোনো কাজই করা হলো না। তার আনমনা ভাব দেখে, বস পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলেন – ‘আপনার কি শরীর খারাপ, জামান? খুব খারাপ লাগলে বাসায় চলে যান!’ এমনকি, যে রূপসী সহকর্মীটিকে দেখে প্রায় নিয়মিতই তার ভেতরে প্রেম জেগে ওঠে, আজ তার দিকেও চোখ পড়ল না জামানের! বরং বিরক্ত বোধ হলো। মনে হলো প্রেম নয়, মেয়েটির জন্য তার ভেতরে যা জেগে ওঠে, তার নাম কামবোধ! মেয়েটি রূপসী তো বটেই, তারচেয়ে বেশি যৌন-আবেদনময়ী। এ-ধরনের মেয়েদের জন্য প্রেম তো জাগার কথা নয়, বরং বিছানায় পেতে ইচ্ছে করতে পারে। এতদিন পর মেয়েটি সম্বন্ধে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরে তার স্বস্তিবোধ হলো! মনে হলো, প্রেম একধরনের অনুভূতি, কামবোধ অন্যধরনের। দুটো বিষয় সবসময় একসঙ্গে যায় না! তার যখন প্রেম ছিল, তখন এতটা কামবোধ ছিল না। তিথিকে তার পেতে ইচ্ছে করত বটে, কিন্তু এমন আগ্রাসীভাবে নয়। বরং মনে হতো, জীবন তো পড়েই আছে; সারাজীবন ধরে যে পাশে থাকবে, তাকে নিয়ে এ-ধরনের চিন্তা করাটাও অন্যায়! কোনো লাভ হয়নি অবশ্য। তার এ পবিত্র অনুভূতিকে পায়ে মাড়িয়ে চলে যেতে দ্বিধা করেনি মেয়েটি। না, ওর ওপর কোনো রাগ নেই জামানের, বরং নিজের প্রতি আছে করুণাবোধ। জীবনে কিছুই হতে পারল না, অন্তত যেটুকু হলে একজন মানুষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়, তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি সে। সাদামাটা আটপৌরে জীবন, কোনোদিনই বাড়তি কোনো ’গুণ’ ছিল না তার, সাদাকালো জীবনে এক পোচ রংও লাগেনি কখনো। হয়তো সেজন্যেই তিথি থাকেনি তার জীবনে, তার হয়ে!
এসব দুঃখবোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল আজ। বাসায় ফেরার পথেও দীর্ঘ জ্যাম; কিন্তু কোনো বিকার দেখা গেল না তার ভেতরে। প্রতিদিন ফেরার সময় ক্লান্তি দূর করার জন্য একটু ঝিমিয়ে নেয় সে। সারাদিন কাজ শেষে অবসাদগ্রস্ত শরীর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির আরামদায়ক পরিবেশ, দক্ষ ড্রাইভারের সযতœ গাড়ি চালানো, এই অবর্ণনীয় যানজট, অজয় চক্রবর্তীর মধুকণ্ঠের গান Ñ সবই ঘুমের জন্য খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আজকে সে এসি না ছেড়ে জানালা খুলে অপলক চোখ মেলে তাকিয়ে রইল দূরে, হয়তো মনের ভেতরে মেয়েটিকে আবার দেখার সাধ জেগে উঠেছিল তার, কিন্তু কখন যে রাস্তা ফুরায় বুঝতেও পারে না সে। বাসায় ফিরেও সে-ঘোর কাটে না জামানের। সাধারণত, প্রতিদিন ১০টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ১১টার মধ্যে বিছানায় যায় সে, কিন্তু আজ খাওয়ার পর অভ্যাসমতো বিছানায় না গিয়ে বহুদিন পর টেবিলে গিয়ে বসল। টেবিল মানে, পড়ার টেবিল। পড়াশোনার পাট চুকিয়েছে সেই কবে, তবু টেবিলটা রয়ে গেছে। বসা হয় না বটে, কিন্তু কিছু 888sport free bet login সাজানো আছে। একসময় বই পড়ার বেশ অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, প্রধানত তিথির অনুপ্রেরণায়, একটা বড়সড় বুকশেলফভর্তি বই এখনো পড়ে আছে, শুধু পড়ার অভ্যাসটাই প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। এতদিন পর বসে বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখল সে, যেন হারিয়ে ফেলা আপনজনের স্পর্শ ফিরে পেল বহুদিন পর; কাগজ-কলম টেনে কিছুক্ষণ আঁকিবুঁকি করল, তারপর নিজের অজান্তে লিখে ফেলল কিছু লাইন। ঘোরের ভেতরে লেখা, লেখার পর পড়ে লজ্জা পেল, ছিঁড়ে কুটিকুটি করে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলো। তারপর শেলফ থেকে গোটা কয়েক 888sport app download apkর বই নামিয়ে আবারো এসে বসল টেবিলে। পৃষ্ঠা উলটে 888sport app download apk পড়ল কিছুক্ষণ, তারপর আবার কাগজ-কলম টেনে নিয়ে লিখে চলল। এভাবে চলল অনেকক্ষণ, যে পর্যন্ত না মা এসে বললেন Ñ ‘এত রাত হয়ে গেছে, ঘুমাসনি এখনো?’ মাকে কিছু না বলে বিছানায় গেল সে, কিন্তু ঘুম এলো না। অন্ধকারে তাকিয়ে রইল প্রায় সারারাত। কী যে হলো তার, নিজেই বুঝতে পারছে না। কেন সবকিছু এমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে? কেন নিজেকে কিছুতেই স্থির করতে পারছে না? সে তো এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, মেনে নিয়েছিল সবকিছু। কিছু হতে পারেনি Ñ সেই দুঃখ তো কবেই চাপা দিয়ে ফেলেছিল; আর কিছু হওয়ার নেই Ñ এ-সত্য মেনে নিয়ে! এমনকি এই মধ্য-তিরিশেও বিয়ে করে সংসার করার কথা তার মনে আসেনি কখনো, এই নিঃসঙ্গতাটুকু ভালো লাগে বলে! মা-বাবার অবশ্য এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই, ভাইবোনরাও প্রায়ই এ নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সে কখনো সাড়া দেয়নি। না, তিথির জন্য তার এ-বৈরাগ্য নয়। সে আসলে নিজেকে প্রস্তুতই করতে পারেনি ঘরের ভেতরে আরেকজন সঙ্গীকে পাওয়ার জন্য। এই একাকিত্ব, নিজের ঘরের এই নির্জনতাটুকু খুব উপভোগ করে সে। বিয়ে করলে যদি নির্জনতাটুকু খুন হয়ে যায়! তার চেয়ে এই-ই ভালো। দরকার কী, চলে যাচ্ছে তো! এই ছিল তার বরাবরের ভাবনা। আজকে হঠাৎ করে নিঃসঙ্গতাটা চেপে বসেছে, তিথিকে বারবার মনে পড়ছে। কিছু হওয়া হলো না আমার Ñ ভেবে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। এসব ভেবে-ভেবে ভোর হলো। এবার উঠতে হবে। যথাযথভাবে প্রস্তুত হয়ে অফিসে যেতে হবে! মরো আর বাঁচো, চাকরি তোমাকে রেহাই দেবে না। চাকরি! চাকরের বৃত্তি! হাহ!
ইচ্ছে করলে যাওয়ার পথে গাড়িতেই ঘুমিয়ে নিতে পারত সে কিছুক্ষণ, কিন্তু তার চোখ ঘুমোতে রাজি হলো না। রামপুরা ব্রিজ থেকে আবার জ্যাম, তার চোখ এবার বিরক্ত হওয়ার বদলে চঞ্চল হয়ে উঠল, যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় কোনো মুখ, প্রিয় কোনো কণ্ঠস্বর, কিংবা অলৌকিক এক বাক্য Ñ ‘দাদা, আপনে কি কবি?’ না, আমি কবি নই, আমি কিছুই নই, হতে পারিনি, কিন্তু আমি সম্ভবত একজন কবিই হতে চেয়েছি! চেয়েছি, অন্তত একজন কেউ মনে রাখুক আমাকে, একজন কেউ পয়লা ফাল্গুনে ঘুরে বেড়াক আমার সঙ্গে, একজন কেউ লাজুক মুখে বলে উঠুক – ভালোবাসি! কিন্তু সেদিন কংক্রিটের রাস্তাজুড়ে কেবল যান্ত্রিক দানব, কোনো ফুল ফুটে নেই রাস্তার পাশে, কোনো কোমল কণ্ঠস্বর বেজে ওঠে না কানের কাছে। তার মন তবু উৎকর্ণ হয়েই থাকে। সেদিনও অফিসে মন বসে না, বস একটু বিরক্ত স্বরে বলেন, ‘শরীর খারাপ নিয়ে রোজ-রোজ আসেন কেন, কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে রেস্ট নিন। এত বছর হয়ে গেল, একদিনও তো ছুটি কাটালেন না!’ কিন্তু সে রাজি হলো না। ভাবলেশহীন মুখে বলল, ‘ছুটি নিলেও আমাকে অফিসে আসতে হবে স্যার। বাসায় বসে কী করব? আর আমার যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই। ছুটির দিনটা যে কী যন্ত্রণায় কাটে!’ এরকম অদ্ভুত উত্তর পেয়ে বসের মুখে আর কোনো কথা জোটে না, আর কোনো জেরাটেরাও করেন না তিনি, শান্তস্বরে বলেন – ‘ঠিক আছে যান, কাজ করেন!’ কাজ আর হয় না। যৌন-আবেদনময়ী মেয়েটি তার ভরাট শরীর নিয়ে, উপচেপড়া স্তন নিয়ে, শরীরের নানারকম ভাঁজ উন্মুক্ত করে গলায় মধু ঢেলে – ‘আপনার কী হয়েছে, জামান ভাই’ – জিজ্ঞেস করলে সে মনে-মনে গাল দিয়ে ওঠে – ‘বেশ্যামাগী!’ তারপর নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিতে থাকে! ছি! ছিহ! তার এতটা পতন ঘটে গেছে! হ্যাঁ, গেছে, তাতে হয়েছেটা কী? ভালোমানুষ দিয়ে কচু হয়! ঘণ্টা হয়! ধুলোবালি ছাইয়ের চেয়ে অধিক কোনো মর্যাদা নেই এরকম নির্বিরোধ ভালোমানুষের! মনের ভেতর থেকে সে অনুভব করে উঠল – তার বদল ঘটে যাচ্ছে! খানিকটা পাগলামি চাপল মাথায়, এক বন্ধুকে ফোন করে বলল –
আমাকে এক বোতল মদ জোগাড় করে দিতে পারবি?
হ্যাঁ, পারব না কেন? কী মদ? হুইস্কি, ভদকা, জিন না ব্র্যান্ডি?
হলেই হয় একটা।
এটা কোনো কথা হলো? কী খাবি বলবি তো!
হুইস্কি বা ভদকা।
কী ব্র্যান্ড? ব্ল্যাক লেভেল, রেড লেভেল, শিবাস রিগ্যাল, হান্ড্রেড পাইপার্স, টিচারস, স্মিরনফ…?
বললাম না, একটা হলেই হয়!
তা বললে তো হবে না, একেকটার একেকরকম দাম।
দাম নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না!
আচ্ছা ঠিক আছে, অফিস থেকে ফেরার পথে আমাকে তুলে নিস, কিনে দেব তোকে!
এমন নয় যে, এই প্রথম সে মদ খাওয়ার আয়োজন করেছে। বন্ধুদের সঙ্গে বহুবারই খাওয়া হয়েছে তার। কিন্তু তিথির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর, এবং বিষয়টি জেনে ফেলার পর সে তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল – এই জিনিস আর খাওয়া যাবে না! কে কার প্রতিজ্ঞা রাখে! হাহ! তুমি পয়লা ফাল্গুনে কবির সঙ্গে ঘুরে বেড়াও, আর আমি মদ খেলেই দোষ? ফেরার সময় সে মদ নিয়েই বাসায় ফিরল এবং যথারীতি খাওয়ার পর বিছানায় না গিয়ে টেবিলে গিয়ে বসল সেদিনও। টেনে নিল কাগজ ও কলম। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সঙ্গে যুক্ত হলো মদ। প্রায় সারারাত ধরে মদ খেতে-খেতে লিখে চলল সে। কী লিখছে, কেন লিখছে, সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই।
সেই শুরু। তারপর থেকে প্রতি রাতেই সে বসতে লাগল টেবিলে, লিখে চলল অজস্র পঙ্ক্তি, তার কিছু রাখল, কিছু ছিঁড়ে ফেলল টুকরো-টুকরো করে। সঙ্গে চলল বিরামহীন 888sport app download apk পড়া। তার স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হলো তাতে – অফিসে ফাঁকিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে বদনাম ছড়াল তার, চেহারায় দেখা দিলো উদ্ভ্রান্ত ভাব, চুল বেড়ে ঘাড় ছাড়ানোর উপক্রম হলো, প্রতিদিন শেভ করার বদলে প্রায়ই দু-চারদিন করে বিরতি পড়তে লাগল, খাওয়া-দাওয়া-ঘুম সবই অনিয়মিত হয়ে গেল। অবশেষে অনেকদিন পর, তার মনে হলো Ñ এতদিনে 888sport app download apk তাকে ধরা দিয়েছে, তার এখনকার লেখা পঙ্ক্তিগুলো 888sport app download apk হয়ে উঠছে!
পরদিন সকালে উঠে যতœ করে শেভ করল সে, গোসল সেরে চুলগুলো যথাসম্ভব পরিপাটি করে আঁচড়াল, সুন্দর পোশাক পরে ফিটফাট হয়ে অফিসের উদ্দেশে বেরোল। যেতে-যেতে টের পেল, আজ পয়লা ফাল্গুন। পথে বাসন্তীরঙা তরুণীদের ভিড়। তার চোখ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল এতসব রঙের আসর। কিন্তু সেই মুগ্ধতাবোধ বেশিক্ষণ রইল না। রামপুরা ব্রিজ পার হতে-না-হতে একটা বিতিকিচ্ছিরি জটলার মুখোমুখি হলো সে। দেখল একটা বাস জ্বলছে দাউদাউ করে, ক্ষিপ্ত-উত্তেজিত লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে নেমে পড়েছে পথে, ইচ্ছামতো গাড়ি ভাঙছে। ফেরার উপায় নেই, পেছনেও বিপুল জ্যাম পড়ে গেছে। সে তাই আর কিছু ভাবতে চাইল না, যা হওয়ার হোক – এ-ভঙ্গিতে বসে রইল। আর একসময় – ‘কী হয়েছে দেখে আসি’ Ñ বলে ড্রাইভারের আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এগিয়ে গেল সামনে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানল, বাসচাপায় মারা গেছে একটা মেয়ে। মেয়েটি রাস্তা পার হচ্ছিল। জ্যাম ছিল বলে হয়তো ততটা তাড়াহুড়া ছিল না তার। বাসের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই বাসটি চলতে শুরু করে, ধাক্কা লেগে মেয়েটি পড়ে যায় রাস্তায়, তার শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে যায় বাসের চাকার সঙ্গে। বাসটি যদি থেমে যেত, তাহলে মেয়েটি মরত না; কিন্তু ড্রাইভার সেটি না করে এলোপাতাড়ি চালাতে শুরু করলে মেয়েটির শরীর রাস্তায় ঘষতে-ঘষতে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যায়। লোকজনের ধাওয়ায় বাসটা যখন থামে, ততক্ষণে মেয়েটি মারা গেছে। সে এমনিতেই ধাক্কা খেয়েছিল ঘটনাটি শুনে, কোনো এক অমোঘ কৌতূহলে সে রাস্তার পাশে শুইয়ে রাখা লাশটির কাছে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির মুখ দেখে চমকে ওঠে! এ তো সেই মেয়ে, যে তাকে কবি বলে ডেকেছিল! এই একজনই, সারা পৃথিবীতে এই একজনই তাকে চিনতে পেরেছিল! তার সমস্ত পৃথিবী দুলে ওঠে! কোনোরকমে ফিরে এসে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলে – অফিসে যাব না, তুমি লালমাটিয়ার দিকে যাও। ড্রাইভার কিছু বুঝতে পারে না, কিন্তু কথা না বাড়িয়ে রাস্তার হট্টগোল একটু কমে এলে সুযোগ বুঝে গাড়ি ঘুরিয়ে বাসায় চলে আসে। তারপর জামানকে ধরে নামিয়ে বলে – ‘স্যার, এখন একটু রেস্ট নেন, আমি একটু পরই আপনাকে লালমাটিয়ায় নিয়ে যাব।’ লালমাটিয়ায় কেন যাবে, সেটা ততক্ষণে ভুলে গিয়েছিল সে, এখন মনে পড়ে। সে আসলে যেতে চাইছিল সেই কবির বাসায়, সে শুনেছিল – কবি লালমাটিয়ায় থাকেন। গিয়ে বলতে চেয়েছিল – ‘আপনি আমার জীবন থেকে সমস্ত ফাল্গুন কেড়ে নিয়েছেন। অন্তত একটি দিন ফেরত দিন আমাকে! মাত্র একটি দিন।’ এখন মনে পড়তে তার হাসি পেল তার, আর ড্রাইভারের কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করল। সে কেন যাবে কবির কাছে, সে কি ভিখারি?
পাঁচ
সারাদিন আর বাইরে বেরোল না জামান, বাসায় গুম হয়ে বসে রইল। কিছুই করল না, কিছুই ভাবল না, বাসার কেউ তাকে ঘাঁটালও না। এমনকি, রাতে লিখতেও বসল না সে। জানালা ধরে বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল অনির্দিষ্ট সময় ধরে। অজয় চক্রবর্তী তাঁর করুণ-মধুর আর অসহনীয় বেদনাভরা কণ্ঠে একটানা গেয়ে চললেন একটিমাত্র গান – ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে, কুঞ্জে এখনও কুহু কুজনে মাতে – যেন বিশ্বচরাচরজুড়ে বেজে চলেছে একটিমাত্র পঙ্ক্তি – ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে… ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে… ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে…। তারপর, রাত গভীর হয়ে এলে সে টেবিলে বসে মাত্র একটা লাইন লিখল – ‘বাইরে সীমাহীন আকাশ, অজস্র নক্ষত্র, প্রেম অথবা মৃত্যু – ডাকছে আমাকে, যাই!’
তারপর দরজা খুলে, আবার যতœ করে বন্ধ করে, বাইরে বেরিয়ে এলো।
আর কোনোদিন তাকে কোথাও খুঁজে পেল না কেউ।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.