মমতাজউদদীন আহমদ : কালের দগ্ধীভূত উত্তপ্ত কথাকার

888sport appsের নাট্য-আন্দোলনকে যারা গতিশীল করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম মমতাজউদদীন আহমদ

(১৯৩৫-২০১৯)। তিনি একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। মঞ্চের জন্য মৌলিক ও রূপান্তর মিলিয়ে ৩০টির মতো এবং বেতার-টেলিভিশনের জন্য ৩৭টির বেশি নাটক লিখেছেন তিনি। শতাধিক নাটক-সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তাঁর রচিত নাটকগুলো মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনে যেমন ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে, তেমনি বাংলা 888sport live footballেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে বিবেচিত। শিশুদের জন্য লিখিত তাঁর নাটক দীর্ঘদিন ধরে দেশের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর নাটক পাঠ্য। থিয়েটার নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি আমৃত্যু
নাট্য-আন্দোলনকে জোরালো করেছেন। বাঙালির ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল। মমতাজউদদীন আহমদের নাটকগুলোতে প্রতিবাদী চেতনার কণ্ঠস্বর বিদ্যমান। বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখ,
শোষণ-বঞ্চনা, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে। ফলে, তাঁর নাটকগুলোর বিষয়, আঙ্গিক, চরিত্র, ভাষা ও লেখ্যরীতি হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যমুখী। মমতাজউদদীন আহমদ ২রা জুন ২০১৯ সালে পৃথিবীযাত্রা শেষ করেন। এ-আলোচনায় সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর রচিত নাটকগুলোতে কালের জীবনযন্ত্রণা, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিষয়ে আলোকপাতে প্রয়াসী হবো। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মধ্যে দিয়ে অসংগতি, অন্যায়, বৈষম্য-আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দীপ্যমান মমতাজউদদীন আহমদের প্রতিবাদী আলেখ্য, যা আমাদের নতুন 888sport apps গঠনের পথে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

মমতাজউদদীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে। পিতা কলিমুদ্দিন আহমদ ও মাতা সখিনা বেগম। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাজনের সময় তাঁর পরিবার পূর্ব বাংলায় চলে আসে। তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন আপাদমস্তক নাট্যপ্রেমী। শৈশবের 888sport sign up bonus রোমন্থন করতে গিয়ে জানান, মাঘী মেলায় মায়ের কোলে বসে নাটক দেখা, বাবা-চাচা-মামার অভিনয়, রাতদুপুরে নাটক দেখা শেষ করে মা কীভাবে বাড়ি ফিরছেন সেসব কথা। শৈশবেই দেখেছেন মামাকে রাম সেজে অভিনয় করতে, ঝরু পটুয়াকে নাটকের সিন আঁকতে। মমতাজউদদীন আহমদ প্রথম অভিনয় করেন পারিবারিক পরিমণ্ডলে, চাকর চরিত্রে। স্কুলের বার্ষিক নাটকে মন্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে অভিনয়ের তাত্ত্বিক পাঠ শুরু হয়। সেই দুরন্ত শৈশব থেকেই নাটক তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

মমতাজউদদীন আহমদের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময়। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। সে-সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতিও করতেন। তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে যেমন যুক্ত ছিলেন, তেমনি ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে লিফলেট বিলি থেকে শুরু করে মিটিং-মিছিলসহ নানা কাজে সক্রিয় ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কারণে তাঁকে নানা সময় কারাগারেও যেতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ-পথনাটকগুলোতে তিনি অভিনয় করতেন, নির্দেশনাও দিয়েছেন। অভিনেতা হিসেবে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন। সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। মমতাজউদদীন আহমদ নাটক লিখতে শুরু করেন ১৯৬০ সালে। শুরুতেই কলম ধরেন পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে।

তাঁর রচিত প্রথম নাটক বিবাহ। এ-নাটকে ফুটে ওঠে ভাষার দাবিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা। এ এক ট্র্যাজিক জীবনবাস্তবতা। নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সখিনা – যার বিয়ে ঠিক ছিল, যার অপেক্ষা ছিল মেহেদিরাঙা হাতে। কিন্তু সেই হাতে এসে পড়ে তার হবু বরের রক্তমাখা হাত। বিয়ের বাজার করতে 888sport appয় এলে ভাষা-আন্দোলনে পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় তার বর। সাদামাটা গল্প হলেও গল্পের অন্তঃস্পন্দনে রয়েছে গভীর রক্তক্ষরণ ও প্রতিবাদ। নাটকে প্রশ্ন করেছেন – ‘মালিক, হামার দেশ তো নদীর দেশ, সবুজ ধানের দেশ। তবুও হামরা এত দুঃখী কেন মালিক?’ ব্রিটিশ তাড়ালেও যে নতুন এক শোষক ভর করেছে বাংলার কাঁধে, তা তিনি দেখিয়েছেন। এ-সরকারও ব্রিটিশ ভিন্ন কিছু নয়। তাই লালু আক্ষেপ করে বলে –

নীলকর সাহেবদের মতো কথা – ওহে বঙ্গসন্তান তোমরা ধান বুনতে পারবে না। নীল বুনতে হবে হে নেটিভ সন্তান সকল। ও সাহেব, আমরা হতভাগ্য বাঙালি। ধান না হলে, আমরা কি খেয়ে বাঁচবো গো। তোমরা না খেয়ে মরবে হে বঙ্গদেশ।

নাট্যকার ‘বিবাহ’ প্রতীকে আনন্দের পরবির্তে বেদনাময়তায় রাজনীতির নানা উপাদানকে বিদ্রƒপ করেছেন।

১৯৬৪ সালে মমতাজউদদীন আহমদ চট্টগ্রাম কলেজে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তার আগে ছিলেন চট্টগ্রামের সরকারি কমার্স কলেজের শিক্ষক। তখন 888sport appsের রাজনীতি ছিল উত্তাল। পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। তিনিও পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। রাস্তায় রাস্তায় নাটক করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি লেখেন স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা। নাটকে মাত্র চারটি চরিত্র – নূর মোহাম্মদ, দলিলুর রহমান, আবদুল বাকের মণ্ডল ও জনৈক লোক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা এ-নাটকে স্পষ্ট সংলাপে নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ ‘স্বাধীনতা’ দাবি করেন – ‘হামরা এই নদীর দেশের মানুষ, একটু যুদ্ধ চাই মালিক, স্বাধীনতার যুদ্ধ।’

একটি অঙ্কের ছোট্ট এ-নাটকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অন্যায়-অবিচারে বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা। এবারের সংগ্রাম নাটকে ফুটে উঠেছে পাকিস্তানি শোষকদের নিপীড়নের চিত্র। এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের কয়েকদিন পরে লেখা। বাদশাহ, উজির, সিপাহসালার প্রভৃতি প্রতীকী চরিত্র ব্যঞ্জনায় পাকিস্তানি শোষক আর মানুষ চরিত্রে গণমানুষের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। নাটকটি ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে পথে-ঘাটে খোলামঞ্চে হাজারো মানুষের সামনে অভিনীত হতো।১০ নাটকটি প্রতিবাদী চেতনার স্ফুরণ। তাই নাটকের শেষে মানুষ চরিত্রটি বলে –

পালিয়ে যাবে কোথায়? এদেশের কোনো ঘরে তার আশ্রয় জুটবে না। মাইলকে মাইল মানুষের মিছিল নিয়ে এদেশের সবখানে ওর তল্লাশি চালাবে। খুঁজে বের করবই জুলুমবাজকে। আমার ছেলের রক্তের দাম আমি কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নেব। ভাই সব, সূর্যের আগুনে শরীরকে তাতিয়ে নাও। এস, ঘর ছেড়ে বাইরে এস, শ্যামল ঘাসের দেশে – এবারের সংগ্রাম, (ঐক্যবদ্ধভাবে) স্বাধীনতার সংগ্রাম।১১

নাটকগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার ও নৃশংসতার ভয়াবহতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। স্বাধীনতার সংগ্রাম নাটকটি ১৯৭১ সালের ২১শে মার্চ রচনা করেন তিনি। এতে বর্গীওয়ালা, হুকমত খাঁ, দুখু মিয়া, বৃদ্ধ, ফারুক, গায়ক, জহুরুল, ঝকড়ু প্রভৃতি সমকালীন চরিত্র নির্মাণ করেছেন। গণহত্যা
এ-নাটকের অঙ্গী। এটিও ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনকালে খোলামঞ্চে অভিনীত হতো।১২ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রচিত বর্ণচোরা নাটকে ফুটে উঠেছে যুদ্ধ-উত্তর মানুষের কষ্ট ও প্রতারণা। এই সেই কণ্ঠস্বর-এর মধ্যে শোষকের বিরুদ্ধে জাগরণী শক্তির বার্তা রয়েছে পরতে পরতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন 888sport promo code নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে কী চাহ শঙ্খচিল ও যার কেন্দ্রীয় চরিত্র রোশনারা। সেও নির্যাতিত প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

মমতাজউদদীনের যুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকগুলি দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে উদ্ধত 888sport live chatের অস্ত্র। শোষণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র কণ্ঠস্বর। বিপ্লবী নেতার মতোই মানুষকে নিয়ে চলে মুক্তির পথে। মমতাজউদদীন আহমদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি সামাজিক সংলাপ ও রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে শিকড় সন্ধানী এক সামান্য নাট্যকার। আমার কালকে যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি, তেমনি স্বদেশের দীর্ঘ সম্পদ ও শক্তিকেও সন্ধান করি। বিচ্ছিন্ন কোনো বোধ আমাকে তাড়িত করে না। বর্তমান ও অতীত আমার আয়ত্তে থাকলেই ভবিষ্যৎ আমার কাছে প্রদীপ্ত হবে। সেভাবেই আমার নাট্যসাধনা।’১৩

নব্বইয়ের দশকের গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত সাতঘাটের কানাকড়ি নাটকে ফুটে উঠেছে বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নানা দৃষ্টিকোণ থেকেই আধিপত্যবাদ, বুর্জোয়া শোষণ ও শ্রেণিসংগ্রাম, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাট্যীয় প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। নামকরণে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে। নাট্যকার প্রত্যাশা করেন দরিদ্রতা, বৈষম্যহীন, মুক্ত স্বাধীন জীবন। চরিত্রসৃষ্টিতে একধরনের নৈর্ব্যক্তিকতা বিদ্যমান। বিষয়গতভাবে মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করলেও সমাজ বাস্তবতার নানা অসংগতিও এ-নাটকের একটি প্রধান আশ্রয়। নাট্যকার যেন চান একটি স্বাধীন বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ।

দাসু। তুই? তুই তো আমাদের স্বাধীনতা।

জয়। হল না। আমি স্বাধীনতা না। আমি স্বাধীনতার লজ্জা।

দাসু। না তুই স্বাধীনতা। তুই, তুই আমাদের মায়ের এক মর্মান্তিক সন্তান।

বাসু। ভাইজান, তোমার কমিউনিজম কেমন চলছে, 888sport appsে তোমার সমাজতন্ত্র আর কতদিন পরে আসবে?

দাসু। এভাবে বলিস না বাসু, আমি বড় কষ্ট পাই। আমার বুকে ব্যথা হয়, আমার খুব লজ্জা হয়। (সকলে হো হো করে হেসে উঠল) হাসলি কেন? এই গাধারা, নির্বোধরা, অর্বাচীনরা – তোরা হো হো করে হাসলি কেন? দেখে নিস একদিন আমাদের সুন্দর সরল 888sport appsে নিশ্চয় সমাজতন্ত্র আসবে। আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হবে। আমাদের শিশুরা হাসবে।১৪

সাতঘাটের কানাকড়ি নাটকে সমাজের নানা রূপ শ্লেষাত্মকভাবে ফুটে উঠেছে। এতে কোনো রমরমা কাহিনির পরি888sport slot game নেই। মানুষের জীবনের জটিলতা নাটকের পরতে পরতে। বাঙালির সমাজব্যবস্থায় যে-সংগ্রাম তা এতে অনবদ্যভাবে রূপায়িত। ম্যাক্সিম গোর্কির মা যেমন সে-দেশের শোষিত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, এ-নাটকটিও বাঙালি জীবনের নিম্নবর্গীয় মানুষদের অধিকারসচেতন করে তোলে।

মা। তাহলে আমার ছেলে যুদ্ধ করল কেন? তাহলে আমার স্বামী জীবন দিল কেন? তাহলে আমি ইজ্জত লুটিয়ে ঘরে ফিরলাম কেন? কেনরে দাসু? আমি কী তোমার মা, নাকি আমি একটা বাজারের মেয়েরে দাসু? আমাকে লয়ে একি তামাশা? কইরে আমার ছেলেরা কইরে – বাবারা আমার – তোরা জিন্দা কি মুর্দা – কোথায় তোরা, আজ আবার মা তোমাদের আহ্বান করতেছে? বাসু, হাসু, কালু, নালু, মানু জয় – আমার, আয় তো একবারে পুনরায় একবার। (ছেলেরা এল)

সকলে। মাগো আমরা এসেছি।

মা। এইবার, এইবার যুদ্ধ।১৫

সাতঘাটের কানাকড়ি নাটক নিয়ে মমতাজউদদীন আহমদ বলেন – 888sport apps প্রচণ্ড আবেগের দেশ। সত্য ও সততাকে অবিরাম আহ্বান করার দেশ। কিন্তু অহরহ এ দেশকে, যার যেমন ইচ্ছা মিথ্যা ভূষণে নিন্দিত করে চলেছেন। … আমার দেশের সম্ভাবনা ও শক্তির জন্য আমি নিরপরাধ, সরল এবং খেটে-খাওয়া মানুষকে বেশি গণ্য করি। এরা কখনোই 888sport appsকে এবং দেশের পরিচয় ও শক্তিকে খাটো করেন না। … সাতঘাটের কানাকড়ি নাটকটি রচনার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য, আমার কালের দগ্ধীভূত উত্তপ্ত কথাগুলো বলা এবং কালের মানুষের ক্রোধ বা দহনকে প্রকাশ করা।১৬

রাজা অনুস্বারের পালা নাটকটি মমতাজউদদীন আহমদের ভিন্নধর্মী এক রচনা। 888sport appsের নাট্যচর্চায় এই নাটকটি ঐতিহ্যবাহী চর্চায় গুরুত্ববহ। মমতাজউদদীনের প্রায় প্রতিটি নাটকের মধ্যেই প্রতীক সর্বাধিক লক্ষ করা যায়। এ-নাটকটিও সেক্ষেত্রে খুব ব্যতিক্রম নয়। নাটকটি শুরু হয় আমাদের আবহমান ঐতিহ্যের পালার আদলে। নাট্যকার প্রথম দৃশ্যের শুরুতেই সূত্রধর চরিত্র তুলে ধরেন। মঞ্চে ছেলেমেয়ে নাচছিল আর গান বাজছিল – ‘ভালা কইরা বাজানরে দোতরা, সুন্দরী কমলা নাচে।’ এরই মধ্যে সূত্রধর প্রবেশ করে –

সূত্রধর। বন্ধ কর, বন্ধ কর তোমাদের পালাগান।

পুরুষ। আমরা সবেমাত্র গৌরচন্দ্রিকা করছিলাম শুরু।

মেয়ে। আমাদের পালা বড় সরেস পালা। শোনার জন্য সাত গ্রামের লোকজন এসে গেছে। রাজাবাহাদুর এলেই সখীনৃত্য শুরু করে দেব।

সূত্রধর। সখীনৃত্যের দরকার নাই। তোমাদের পালা চিরকালের জন্য স্থগিত করে দিতে হবে।

পুরুষ। চিরকালের জন্য?

মেয়ে। সহসা কি রহস্য এসে গেলরে অদৃষ্ট।

সূত্রধর। অনন্তকালের জন্য বন্ধ করে দিতে বলিনি সে হল আমার কণ্ঠনালীর হঠকারিতা। মহামান্য রাজা তোমাদের পালা দেখার জন্য নাগরিকের সামনে আর আসবে না।

পুরুষ। আমরা যে বড় আশা নিয়ে রঙ্গমঞ্চে এসেছি।

মেয়ে। তিনখানা নতুন গান আর নৃত্য বেঁধেছি, রাজা বাহাদুর তাই দেখে চমকে চমকে উঠবেন।১৭

চরিত্রের নামকরণে বিদ্রূপ আছে। বর্ণমালার রাজা অনুস্বারকে কেন্দ্র করে। রানীর নাম চন্দ্রবিন্দু। এই নামের মধ্য দিয়ে সমকালীন রাজনীতি-শাসন-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করেছেন নাট্যকার। যেমন – যুদ্ধমন্ত্রী, শরীরমন্ত্রী, পাদটিকা মানে গুপ্তচর, অভাবী, খোয়াবী, ভাগিনা, ভাতিজা ইত্যাদি। রাজ্যশাসনের প্রতিটি বিষয়েরই হাস্যকর অবস্থার মধ্য দিয়ে রাজনীতির গূঢ় বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করেছেন নাট্যকার।

শরীরমন্ত্রী। গবেষণা করতে বলে গেলেন। – লেগে যাই। ঝাড়ু দিতে বললে আমি ঝাড়ু দিতে পারি।

যুদ্ধমন্ত্রী। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গবেষণা করা ভালো, না শুয়ে শুয়ে ভালো?

ভাগিনা। গবেষণা কি? গবেষণার বাড়ি কোথায়?

ভাতিজা। গবেষণা যে করছি, বিষয় কী? লক্ষ্য কী? উদ্দেশ্য কী?

প্রধানমন্ত্রী। একজন গবেষণামন্ত্রী থাকা উচিত। আমি প্রধানমন্ত্রী গবেষণার মতো ক্ষুদ্র কাজে হয়রান হওয়া আমার অনুচিত।

শরীরমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কাজ কী?

প্রধানমন্ত্রী। গবেষণা নয়।

রাজা। দেখতে এলাম। সহসা আগমন, কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণ।

শরীরমন্ত্রী । মহামান্য রাজা, গবেষণা জিনিসটা আসলে কী?

রাজা। জান না। … আজ থেকে তুমিই আমার গবেষণামন্ত্রী।

শরীরমন্ত্রী। আমার মনে কৃষির কথা ছিল রাজা।

রাজা। পুনরায় যদি কথা বল, তাহলে তোমাকে আমার মহিলা মন্ত্রী করে দেব। আমার ঘোরতর স্বপ্নের ঘোরতর জটিল আবরণ তাহলে তোমাকেই উন্মোচন করতে হবে।১৮ 

বিষয়বস্তুগত জায়গা থেকে নাটকটি সমকালীন রাষ্ট্র-রাজনীতি-প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক সমালোচনা। অশ্বডিম্ব, কান্না, রাজার স্বপ্নদোষ, সপ্তদশ ব্যঞ্জন নানা রকমের শব্দ হাস্যরস তৈরি করেছে।

রাজা । … খাদ্য হাতে নিয়ে ছুটে এলাম। এখনো বক্ষ কম্পমান, চক্ষু ঝাপসা। ওহে মন্ত্রীরা, তোমরা জীবিত না মৃত?

খোয়াবী। রাজা বাবা।

রাজা। বাবা? প্রধানমন্ত্রী, অকস্মাৎ আমাকে বাবা ডাকল কে?

খোয়াবী। আমি খোয়াবী বাবা।

রাজা। যুদ্ধমন্ত্রী, ভাগিনী।

খোয়াবী। ওদের কথা শুনে শুনে আপনার কান বধির হয়ে গেছে রাজা বাবা। এবার আমার কথা শোনেন। আমার হতচ্ছাড়া স্বামী হারিয়ে গেছে তারে আমি খুঁজে পাচ্ছিনে।

রাজা। কোন রমণীর স্বামী সন্ধানের জন্য আমি রাজা হইনি।

খোয়াবী। তাহলে রাজার কাজ কী?

রাজা। রাজার কত কাজ। অজস্র কাজ। প্রধানমন্ত্রী আমার কী কাজ? বল, বলে দাও।

প্রধানমন্ত্রী। অনেক কাজ।

শরীরমন্ত্রী। লক্ষ লক্ষ কাজ।

যুদ্ধমন্ত্রী। কোটি কোটি কাজ।

খোয়াবী। কাকের মতো কা কা করতে হবে না। উদাহরণ চাই। গলাবাজি আর বক্তৃতা ঢের শুনেছি, এবার ফর্দ দাও। লক্ষ লক্ষ দরকার নেই, একশ’টা কাজের নাম বল।

রাজা। মন্ত্রীমণ্ডলী ফর্দ দাও, রাজা অনুস্বারের কী কাজ।

প্রধানমন্ত্রী । গবেষণা করতে হবে মহান রাজা।১৯

বাঙালির সং যাত্রার মতো হাসি-ঠাট্টায় প্রসেনিয়াম ধারার লেখা। রাজা একসময় তার রাজত্বে কাঁদা নিষেধ করে দেয়। মাত্র সতেরোটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে রূপাশ্রিতভাবে সমাজ-জীবন ও রাজনীতির বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন নাট্যকার। নাট্যরচনার স্টাইলেও ইউরোপীয় দৃশ্যপরম্পরা বিভাজন বিদ্যমান।

স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা নাটকটি বাকস্বাধীনতা নিয়ে। প্রকৃত লেখকরা কখনো ক্ষমতাশালীর অনুগত কেরানি হন না। জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে গেলেও একজন লেখক সত্যের কাছেই প্রতিশ্রুতিশীল। কারো অন্ধ গুণকীর্তন নয়, বিধ্বংসী প্রতিকূল বাস্তবতায়ও লেখক মানবমুক্তির পথেই হাঁটেন। নাটকটি ১৯৭৫ সালের দিকে রচনা করেন তিনি। নাটকের গল্প খুব সহজ-সরল হলেও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের প্রতীকী রূপের মধ্য দিয়ে যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে
যুগে-যুগে মুক্তচিন্তা অবদমনের কৌশল। নাটকে একজন লেখক ইতিহাসের দাসবিদ্রোহের প্রতিনিধি ‘স্পার্টাকাস’কে নিয়ে 888sport alternative link রচনা করতে বসেছেন। সূর্যকুণ্ড তা করতে দেবে না। লেখককে লিখতে হবে সূর্যকুণ্ডের জীবনী। সূর্যকুণ্ড ক্ষমতার কৌশলে বাধ্য করে। প্রথমে রাজি না হলেও লেখকের অন্ধবাবা, অসুখী মা, অপবিত্র প্রেমিকা শিউলির ভালোর জন্য ভয় ও লোভে লিখতে রাজি হন। ধীরে ধীরে লেখক বুঝতে পারেন, সূর্যকুণ্ড একপ্রকার আধিপত্যকামী পশু। নাটকে স্যাটায়ার ও ম্যাটাফোর যেন এক রেখায় অবস্থান করে। কী করবেন লেখক! সূর্যকুণ্ডের জীবনী লিখবেন, নাকি মানুষের জীবনের অধিকারের কথা লিখবেন?

মমতাজউদদীন আহমদের নাট্যরচনার মূল প্রবণতা ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা। তিনি আশ্রয় করেছেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক ভাষা। সমকালীন লোকজ ঐতিহ্যের আশ্রয়ও নিয়েছেন। মমতাজউদদীন আহমদ জীবনের শেষের দিকে কিছুদিন প্রবাস জীবন-যাপন করেছেন। সেখানে বসেও 888sport appsের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি লেখেন, ‘বাজারে শাক নেই, মাছ নেই। শিশু কাঁদে, মায়ের বুকে খাদ্য নাই। খাড়া খাটা মলাঢেলারা হাসে। ট্যাংরা-পুঁটিদের রমরমা ব্যবসা। খালি ককটেল। শামুকের গহ্বরে পলাতক নেতাদের ঠোঁটে মুচকি মুচকি হাসি। জবর খেলা চলে গৌড়সমতট বঙ্গে। রঙ্গ ভরা বঙ্গ দেশ। কেন এমন রঙ্গ? কারা করে এমন তামাশা? উত্তর নাই, জবাব নাই। প্রশ্ন অনেক, জবাব শূন্য। বিদেশীদের হিসাব ভণ্ডুল। প্রবাসীদের মুখে চোখে সন্ত্রাস, প্রশ্ন আর প্রশ্ন! শেষ কবে? আর নয়, আর নয়। বাংলার প্রকৃতি অন্তরে অন্তরে ক্ষিপ্ত। বাংলার নদীবৃক্ষ অস্থির। শাখামৃগদের রুচিহীন লম্ফঝম্প আর মুখপোড়া হনুমানদের খিচুনি দেখে দেখে শালতমালের বাংলা বড় রুদ্র। তামাসার তাণ্ডব বাংলা জুড়ে।’২০

অতএব দেখা যায়, নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল 888sport appsের সমাজজীবন। সমকালীন বিধি-ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অসারতা ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিপ্লবী। তাঁর রচিত ছোটদের জন্য নাটক ও কৌতুকনাট্যগুলোতেও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বরং পূর্ণাঙ্গ মঞ্চনাটকগুলোর চেয়েও বেশি নান্দনিক উৎকর্ষে জাজ¦ল্যমান শিশুনাটকগুলো। সবার আগে উল্লেখ করতে হয় বকুলপুরের স্বাধীনতা নাটকটির কথা। এটি শিশুদের জন্য শিশুতোষ ভাষা-সংলাপে রচিত হলেও প্রতীকী রূপে বকুলপুর নামক ভূখণ্ডের মুক্তির কথাই বলা হয়েছে এতে। স্বৈরাচারী শাসকের ঘূর্ণাবর্তে মানবসমাজের অসহায়ত্ব ও মুক্তির সংগ্রাম এ-নাটকের উপজীব্য। স্বৈরাচারী শাসক ‘বাদশাহ’ চরিত্রধারী এতই অত্যাচারী যে, প্রতিবাদী বা বিপ্লবীর কণ্ঠ ছিঁড়ে লোহার খাঁচায় বন্দি ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মুখে নিক্ষেপ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।২১ রাজা অত্যাচার ও খামখেয়ালিপনায় এতই মত্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, নিজেই দুঃস্বপ্নের আতঙ্ক থেকে মুক্তি চান। কিছুটা সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে সিনেমার রাজার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। রাজা রস্তম নামের এক বীরের শরণাপন্ন হন, যে বকুলপুরের বিদ্রোহ দমন করতে পারবে। কাজীর বিচারেও নিরীহ মানুষের রক্তের নদীতে রক্তস্নানের অভিযোগ ওঠে। সম্মিলিত শক্তি বা একতার মধ্য দিয়েই যে স্বৈরাচারের পতন হতে পারে – এমন ভাব শিশুর মনে গেঁথে দেন নাট্যকার। শিশুতোষ শব্দ-ভাষা, ব্যঙ্গাত্মক প্রতীকী শব্দ ও কল্পকাহিনির মতো হাস্যরসের মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তির কথাই উচ্চারণ করেছেন মমতাজউদদীন। সুখী মানুষ নাটকটি 888sport appsের শিশু শিক্ষাস্তরে দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্য। নীতিকথা হলেও সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতাই চিহ্নিত করেছেন এতে। অন্যের উপর অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ করে সুখী হওয়া যায় না। সুখী হতে হলে লোভ-লালসা পরিত্যাগ করতে হবে। সুবর্ণপুরের মোড়ল হাসু অন্যের গরু জোত জমি ধান কেড়ে নিয়ে আজ ধনী ও মোড়ল। সে মানুষের প্রতি এতই নৃশংস ছিল যে, মানুষের কান্না দেখলেই সে হাসতো। অত্যাচারের পরিণাম ভালো হয় না। আজ সে ভীষণ অসুখী। জোর করে অন্যের মুরগি জবাই করে খাওয়া, জোর-জবরদস্তি করা মোড়লের এখন বাঁচার আর্তি – ‘সুখ কোথায় পাব? আমাকে সুখ এনে দাও।’ ছোটদের নীতিশিক্ষা বিষয়ক ক্ষুদ্র নাটক হলেও তার মধ্যে ফুটে উঠেছে গভীরতর সমাজ বাস্তবতা। একইভাবে রাজার পালা নাটকেও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের ছলে

সমাজ-রাজনীতিকেই তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। শিশুতোষ নাটকগুলোর অধিকাংশ গল্পকাঠামোতে রূপকথার মতো রাজা-বাদশাহর কাহিনিকে আশ্রয় করেছেন, যাতে শিশুমনে আনন্দ সঞ্চারণের মধ্য দিয়ে যেন সমাজবাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। কৌতুকপূর্ণ ঘটনা হলেও জীবন নিয়ে কৌতুক করেননি, হাসির ছলে জীবনের বাস্তবতা অংকন করেছেন। এ-নাটকে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করেছেন নাট্যকার। ছাত্রদের শিক্ষক শেখাচ্ছেন – ‘মহামতি রাজার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কিংবদন্তিপুরে কোথাও কোনো কা নেই, সর্বত্রই শুধু হা।’২২

শিক্ষাব্যবস্থা মানে রাজার ক্ষমতা রক্ষার ব্যবস্থা। তাই শিক্ষক নিজেই উচ্চারণ করেন – ‘আমি একজন রাজানুগত শিক্ষক।’২৩ বালকের গান বন্ধ করে রাজা বিদ্রোহ দমন করে নিজের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখতে চান। বাউল বাঁশীর সুর নাটকে ফুটে উঠেছে পরিবারপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। পরিবার-সমাজে সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। সম্পদের সমবণ্টন হবে। সমকালীন 888sport appsের পারিবারিক জীবনের অন্তঃসারশূন্যতার স্বরূপ ধরা দিয়েছে নাটকে। কিন্তু তারপরেও মানুষ সুন্দর। মনুষ্যত্বের দিকে ফিরে যেতে হবে। তরুকে নিয়ে নাটক-এ গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাকে দেখিয়েছেন। প্রেত-ভূত-ধানক্ষেত নানা রূপকল্পে রাষ্ট্রযন্ত্রের চিত্রই তুলে ধরেছেন। শিশুদের ভূতের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। সংলাপে কখনো কখনো অন্ত্যমিলও তৈরি করেছেন। কাব্যিক বোধ সর্বত্র। মমতাজউদদীন আহমদের প্রতিটি নাটকের চরিত্রের নামগুলোও প্রতীকী, ব্যঙ্গাত্মক। ঘটনাগুলোও প্রতীকী, ব্যঙ্গরূপে হাস্যরসে পূর্ণ। তাই তরুকে নিয়ে নাটক-এর একাদশ দৃশ্যে দেখা যায় মন্ত্রী সেনাপতিকে বলছে ডাক্তারদের মুণ্ডু কেটে আনতে।

মমতাজউদদীন আহমদ আপাদমস্তক ছিলেন নাট্যপ্রেমী। নানা সমস্যা নিয়ে অকপটে প্রতিবাদ করতেন। গ্রুপ থিয়েটারকেন্দ্রিক নাট্যচর্চাকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ছিলেন। মমতাজউদদীন আহমদ বলতেন, ‘দেশে উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চ নেই বললেই চলে। যেহেতু নাটককে সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়, সে-কারণ তাদের জীবনের কাছাকাছি নাটককে নিয়ে যেতে হলে উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চ প্রয়োজন। কারণ জীবনঘেঁষা নাটক সৃষ্টির জন্য জীবনের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন।’২৪ তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ-দাবি তুলে এসেছেন। কিন্তু আমরা কী তা করতে পেরেছি?

মমতাজউদদীন আহমদের কৌতুক নাটকগুলোও প্রাণচঞ্চল। বিশ্ব888sport live football ভবন থেকে প্রকাশিত নির্বাচিত নাট্যসম্ভার সংকলনে কৌতুকধর্মী একাঙ্কিকাগুলোকে নামকরণ করেছেন ‘রগড়’ নাটক বলে। নামের মধ্যেই কৌতুক আছে। ‘রগড়’ মানেই কৌতুক বা হাস্য-রসাত্মক। এ-কৌতুক নাট্যগুলোও বিষয় বিন্যাসে নানা বৈচিত্র্যমুখী। ইন্টারভিউ নাটকে চাকরি সংক্রান্ত বাস্তবতা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রের যোগ্যতা বা গুণের প্রয়োজন নেই, দৈহিক সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ। 888sport promo codeর যোগ্যতা তার সৌন্দর্যে, জ্ঞান-দক্ষতা-প্রাজ্ঞতায় নয় – এমন বিদ্রƒপ করেছেন। আব্দুল যায় নাটকে দেখানো হয়েছে, একজন যথার্থ চাকরিজীবীর গোপন ইনকাম থাকতে হয়। গার্জেন নাটকে প্রেমকে বিদ্রƒপ করেছেন। যৌতুকের ভয়াবহতার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। ফকির নাটকে কৌতুকপূর্ণভাবে তুলে এসেছেন শেক্সপিয়রকে –

ম । আমার মনের মধ্যে খুব কনফ্লিক্ট চলছে।

ফ । কংক্রিট কিছুই চলবে না। সব ফেনা হয়ে উড়ে যাবে।

ম । ইংরেজি না বুঝে কথা বলো না। টু বী আর নট টু বী কথাটার মানে কী জান?

ফ । আমি তো আন্ধা এতিম। দুনিয়ার মধ্যে কেউ নেই। আখেরাতে কাউকে চিনতে পারব কি না, মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না। আপনার তো একটা টুবি হলেও আছে গো।

রঙ্গপঞ্চদশ শিরোনামের সংকলনে সব নাটকই হাস্যরসের। কোথাও রঙ্গ, কোথাও ব্যঙ্গ। সংলাপে সংলাপে মৃদু খোঁচা আছে।২৫ খোঁচাটি যার লাগে আসলে সে বোঝে। অন্যরা নাটকটিতে শুধু হাসি-তামাশা খুঁজে পাবে। ডিম্বকাব্য নাটকে রাজনীতি-রাজকবির চরিত্রকে তুলে ধরেছেন। ডিম্ব মানে ডিম – এর মধ্যেও কাব্য নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বিদ্রোহ আছে। ভোটরঙ্গ নাটকে ভোট বা নির্বাচন নিয়ে ক্যারিকেচার করা হয়েছে। সেয়ানে সেয়ানে, কেস, উল্টোপুরাণ, চড়, ভেবে দেখা, প্রশ্ন-উত্তর, অদ্ভুত রোগী, তিলকে তাল, যৌতুক সমাচার, কোকিল, ছহি বড় বাদশাহী কাব্য প্রতিটি নাটকেই সমাজ-মানুষের আচরণ, সমাজের রীতি-নীতি, রাজনীতিসহ নানা বিষয়কে দেখার একটি প্রবণতা রয়েছে, যা হাসির ছলে তুলে ধরেছেন মমতাজউদদীন আহমদ। তাঁর নাটকে সমকালকে যেভাবে পাওয়া যায় তা সমকালীন অন্য কোনো নাট্যকারের নাটকে পাওয়া যায় না। কালের নাট্যভাবনাই তাঁর নাটকের মুখ্য উদ্দেশ্য।২৬

মমতাজউদদীনের নাটকগুলো তাঁর সমকালকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও তা হয়ে উঠেছে চিরকালীন।

অন্যায়, অবিচার, শোষণ, অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদী বিদ্রƒপাত্মক কণ্ঠস্বর, যা 888sport appsের সমকালীন সমাজবাস্তবতায় অনুধাবন খুব জরুরি। দেড় বছর আগে ঘটে যাওয়া পরিবর্তিত 888sport appsে তাঁর নাটকের ভাবনাগুলো সমভাবে কার্যকর। সে পরিপ্রেক্ষিতে মমতাজউদদীন আহমদের নাটক পাঠ ও মঞ্চায়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

জীবনের শেষে এসে মমতাজউদদীন আহমদ আক্ষেপের সঙ্গে বলতেন, ‘এখনো আমার চূড়ান্ত নাটকটি লেখা হয়নি। লিখতে চাই বাংলার নাটক, স্বাধীনতার নাটক। তিন খণ্ডে লেখার পরিকল্পনা আছে। বাংলা থাকবে, থাকবে বাংলার মুক্তিযুদ্ধ। ছোট বড় 888sport promo code পুরুষ সবাই। লিখতে পারবো তো তেমন একটি দীর্ঘ নাটক। একটি কাব্যধর্মী লোকনাট্য যদি লিখে যেতে পারতাম, যদি মাটির নিচে শুয়ে সে নাটকের অভিনয় ধ্বনি শুনতে পেতাম, তাহলে জীবন মরণ ধন্য হতো।২৭ এ-আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, আপনি চূড়ান্ত নাটকই লিখতে পেরেছেন – বাংলা, বাংলার মানুষের মুক্তির কথা আপনার মতো আর কেউ বলতে পারেনি। আপনি যেখানেই গিয়ে থাকেন, আপনি দেখবেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের তরুণরা আপনার বিপ্লবী প্রতিবাদী বার্তা ধারণ করে সমাজ, মানুষ ও রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। আগামীর 888sport apps হয়ে উঠছে অভাব-দারিদ্র্য, শোষণ-বঞ্চনা-ফ্যাসিবাদহীন এক মানবিক বিশ্বসমাজ।

তথ্যসূত্র

১.      মমতাজউদদীন আহমদ, নির্বাচিত কিশোর সম্ভার, বিশ^888sport live football ভবন, 888sport app, ২০০১, পৃ ৬৫১।

২.      প্রাগুক্ত, পৃ ৬৫২।

৩.      প্রাগুক্ত, পৃ ৬৫৩।

৪.      অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, মমতাজউদদীন আহমদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা : আবেদ খান ও 888sport app, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, পৃ ২১।

৫.      ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে মমতাজউদদীন আহমদ কারাবরণ করেছিলেন।

৬.      স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা নাটক, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, পৃ ৭১।

৭.      দ্বিতীয় দৃশ্য, বিবাহ নাটক।

৮.      শ্রোতা : স্বাধীনতা আর বিবাহ কি এক হলো লালু মামা?

৯.      লালু : চোপ! বিবাহ কি এক গ্লাস পানি খাওয়া? শাদী কি তোমরা মন্ত্রী সাহেবদের জিহ্বার ফালতু জবান?

        [দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম দৃশ্য, বিবাহ]

১০.     স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা নাটক, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, পৃ ৭২।

১১.     মমতাজউদদীন আহমদ, আমার নাট্যভাবনা, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ২০০০, পৃ ২৬।

১২.     এবারের সংগ্রাম নাটক, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, পৃ ৯৫।

১৩.     মমতাজউদদীন আহমদ, আমার নাট্যভাবনা, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ২০০০, পৃ ২৬।

১৪.     মমতাজউদদীন আহমদ, আমার নাট্যভাবনা, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ২০০০, পৃ ২২।

১৫.     মমতাজউদদীন আহমদ, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ১৯৯৯, পৃ ২০৭।

১৬.     প্রাগুক্ত, পৃ ২৬৫।

১৭.     মমতাজউদদীন আহমদ, ‘নাট্যকারের কথা’, সাতঘাটের কানাকড়ি, মুক্তধারা ১৯৯১।

১৮.     মমতাজউদদীন আহমদ, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ১৯৯৯, পৃ ২৮৩।

১৯.     প্রাগুক্ত, পৃ ২৯৬।

২০.     প্রাগুক্ত, ১৯৯৯, পৃ ৩০৩।

২১.     মমতাজউদদীন আহমদ, সাম্প্রতিক বাংলার বিবিধ যন্ত্রণা এবং, বিশ^888sport live football ভবন, 888sport app, পৃ ১৩।

সংলাপ :

বাদশাহ। চোপ। শয়তান, বিচ্ছুর দল। আবার যদি দাও দাও কর, তাহলে তোমাদের কণ্ঠ ছিঁড়ে লোহার খাঁচায় বন্দী ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মুখে নিক্ষেপ করবো। আমার শরীর ও মন অবসন্ন। আমি চাই নিদ্রা, আমি চাই অবিচলিত শান্তি। সাহস কত? বাবাকে ফেরত চায়? তোদের বাবা কারাগারে বন্দী। [প্রথম দৃশ্য, বকুলপুরের স্বাধীনতা]

২২.     দ্বিতীয় দৃশ্য, রাজার পালা, মমতাজউদদীন আহমদ, নির্বাচিত নাট্যসম্ভার, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ১৯৯৯, পৃ ৮৯২।

২৩.     প্রাগুক্ত, পৃ ৮৯৩।

২৪.     মমতাজউদদীন আহমদ, আমার নাট্যভাবনা, বিশ্ব888sport live football ভবন, 888sport app, ২০০০, পৃ ৫১১।

২৫.     প্রাগুক্ত, পৃ ১৩১।

২৬.     প্রাগুক্ত, ভূমিকা অংশ।

২৭.     প্রাগুক্ত, পৃ ২৭।