রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মভাবনা : পিতৃনামের প্রতীক-শৃঙ্খলা

‘বিশ্বজগতের ঐক্য তার সত্তায় নয়, তার বস্তুময়তায়|… দর্শন ও প্রাকৃতিক 888sport apkের দীর্ঘ ও দুরূহ অগ্রগতির মধ্য থেকে তার প্রমাণ মিলবে|… গতিই হলো বস্তুর অস্তিত্বের রূপ| গতিহীন বস্তু অথবা বস্তুবিচ্ছিন্ন গতি কোথাও ছিল না, থাকতেও পারে না|… মনুষ্য মস্তিষ্কের সৃষ্টি চূড়ান্ত বিবেচনায় প্রকৃতিরই সৃষ্টি হওয়ায় তা অবশিষ্ট প্রাকৃতিক সম্পর্কগুলির বিরোধী নয়, বরং তদানুযায়ী|’ (ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, Diatec lies of Nature)
‘জগতে কোনো প্রাণই তো একটি সংকীর্ণ সীমার মধ্যে, নিজের মধ্যে আবদ্ধ নয়| সমস্ত জগতের প্রাণের সঙ্গে তার যোগ, আমার এই শরীরের মধ্যে যে প্রাণের চেষ্টা চলছে সে তো কেবলমাত্র এই শরীরের নয়| জগৎজোড়া আকর্ষণ-বিকর্ষণ, জগৎজোড়া রাসায়নিক শক্তি, জল, বাতাস, আলোক ও উত্তাপ একে মিলিত প্রাণের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে| বিশ্বের প্রত্যেক অণু-পরমাণুর মধ্যেও যে অবিশ্রাম চেষ্টা আছে আমার এই শরীরের চেষ্টাও সেই বিরাট প্রাণেরই একটি মাত্রা| সেই জন্যই উপনিষদ বলেছেন — যদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ প্রজাতি নিরসৃতম; বিশ্বে এই যা-কিছু চলছে সমস্তই প্রাণ হতে নিঃসৃত হয়ে প্রাণেই স্পন্দিত হচ্ছে| এই প্রাণের স্পন্দন দূরতম নক্ষত্রেও যেমন আমার হৃদপিণ্ডেও তেমনি, ঠিক একই সুরে একই তারে|’ (রবীন্দ্রনাথ, চতুর্দশ খণ্ড : ৪২৫ : রবীন্দ্র-রচনাবলী, বিশ্বভারতী)
ওপরের উদ্ধৃতি দুটি একদিকে একই অর্থজ্ঞাপক আবার অন্যদিকে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে আলাদা| এঙ্গেলস সেখানে বস্তুবাদী দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে প্রাণ/আত্মার দিক থেকে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন| কোন বিন্দুতে বক্তব্যদুটি মিলে যায় তার সন্ধান করলে দেখা যাবে আমরা রবীন্দ্র-ভাবনার পথ ধরে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের মুখোমুখি হই| ব্রহ্ম অত্যন্ত ভাববাদী শব্দ, ধর্মে ও দর্শনে ভাববাদের যে বিশাল প্রবাহ চলমান, যার বিপরীতে বস্তুবাদের স্পর্ধিত বিকাশ সেখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটিকে ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ব্যাখ্যা করার অবকাশ আছে| কালের বিবর্তনে ব্রহ্ম আর ঈশ্বর এক হয়ে গেছে| কিন্তু উৎসমূলে ব্রহ্মের অর্থ কী ছিল? সেদিকে তাকানো যেতে পারে|
বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ মতে, (কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী-সম্পাদিত, ১৪১৭) ব্রহ্ম হচ্ছে ‘আবর্তনশীল অতিবাহীর নামকরণ-অনকরণের (বা রহস্যরূপের) জওয়ন বিষয়ক মনন যাহাতে|’ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ বাইশ রকম অর্থ দিয়েছে| সংসদ অভিধান বলছে, নির্গুণ পরমাত্মা, পরমপুরুষ, অদ্বিতীয়, পরমেশ্বর ইত্যাদি| শব্দটি কর্তৃবাচ্য, বৃন&হ (বৃংহ) + মনন (মনিন&) ব্রহ্ম শব্দের আর একটি হচ্ছে ‘শব্দ’ (ওঙ্কার) অতি ব্যাপক, চিরন্তন, অব্যক্ত অর্থও বহন করে শব্দটি| আবার এটি সৃষ্টি ও 888sport sign up bonusর কর্তাও| নির্গুণ ব্রহ্মকেই ‘শূন্যতা’ ভাবা হয়; সেই শূন্যতা ভরিয়ে তোলার অন্তশ্চাপেই রূপকের পর রূপক ˆতরি করা হয়| মনে রাখা দরকার, মহাবিশ্ব ব্রহ্ম নয়, মহাবিশ্ব হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড, অর্থাৎ ব্রহ্মের অণ্ড| এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন : ‘বিশ্বকে বুদ্ধির গণ্ডীর মধ্যে আঁটিতে পারে, মানুষের অসীম ব্যক্তিত্বের এই বিশেষত্ব|’ অর্থাৎ ব্রহ্ম যত বিশালই হোক বা অদৃশ্যমান হোক মানুষ নামক জীবটির মস্তিষ্কে ব্রহ্মকে, ব্রহ্মাণ্ডসহ পুরে ফেলা যায়| যায় বলেই আমরা ব্রহ্ম সম্পর্কে আলোচনা করতে পারছি|
জগতে প্রত্যেক বস্তুর নিজ ¯^ভাব বা প্রকৃতি রয়েছে| সেই প্রকৃতি অনুযায়ী তার পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটে| এই বিকাশে আবর্তন-নিয়ম কাজ করে; ফলে তাতে গুণ বা পরিমাণগত বৃদ্ধি ঘটে থাকে| এক থেকে বহুতে পরিণত হওয়াকে বলে পাক বা আবর্তন, তেমন শস্যবীজ থেকে অসংখ্য শস্যের ফসল| বস্তুর প্রকৃতি জেনে নিয়ে তাকে আবর্তিত করে নিতে পারলে বস্তুটির যে পরিবৃদ্ধি ঘটে সেই বর্ধিতকরণের নাম — বঙ্গীয় শব্দার্থকোষের মতে, বন&হ॥ মনে মনে এক-কে একশ দিয়ে গুণ করার মতো| এই ‘গুণ করা’ হচ্ছে (বুন&হ) মনন করা| অর্থাৎ বস্তু বা বিষয়ের অভ্যন্তরস্থ প্রকৃতি বা ¯^ভাব জেনে তার বৃদ্ধিসাধন করার অর্থই হচ্ছে ব্রহ্ম| ব্রহ্মের অর্থ দাঁড়াচ্ছে বিষয়কে, প্রকৃতিকে বা বস্তুকে উদ্ভাবন করা, তাকে আবিষ্কার করে তার বৃদ্ধি ঘটানো| যেমন, রবীন্দ্রমন হচ্ছে প্রকৃতি/বস্তু/বিষয়, তাঁর চিন্তনের ব্রহ্ম হচ্ছে বুদ্ধিশীলতা| তাহলে বলা চলে যে, বস্তুর বা বিষয়ের মূল ¯^ভাবানুযায়ী বৃদ্ধি বা পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতা মানুষের করায়ত্ত| এবার ওই মূল ¯^ভাবের কারণটি জানলেই ব্রহ্মকে জানা হয়| ব্রহ্ম অর্থ মূল ¯^ভাব আছে বলেই জগৎ অস্তিময়, অন্যথায় জগৎ থাকত না| তাই বলা হয়ে থাকে, ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা| এখানে 888sport app download for android রাখতে হবে যে, বেদে কিংবা ব্রাহ্মণে ‘ব্রহ্মা’ শব্দটি নেই, পরিবর্তে আছে হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতি| কৃত্তিবাসের রামায়ণে ব্রহ্মের রূপ সামাজিক, যিনি ‘পড়াই বালকগণে লঙ্কাতে আপুনি’॥ এবং যিনি ‘কাটিয়া আনেন তাঁর ঘোটকের ঘাস॥’
প্রতীচ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, ‘প্লেটোর আইডিয়া থেকে শুরু করে হুসেরলের Intension পর্যন্ত যে চিন্তন তার কোনোটাই epersonal affair নয় বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লভ্য নয়|’ (অমল বন্দোপাধ্যায়, পৃ ১৭০, ১৪১৭) অর্থাৎ একে যদি জাক লাকাঁর ভাষায় মানুষের বাসনা (desire) বলি যা epersonal affair নয় তবে তা একটি empty category মাত্র| কারণ এই বাসনা ব্যক্তিক নয়, তা বিশ্বব্যাপী ছড়ানো| এখানে আমরা ফ্রয়েডের কামনা বা libido-র কথা বলছি না| বলছি লাকাঁর বাসনা বা desire-এর কথা|
রবীন্দ্রনাথের বাসনাজগৎও ব্যক্তিক নয় জগৎব্যাপ্ত — যদিও তাঁর ঈশ্বর একান্তই তাঁর সৃষ্ট, কিন্তু ব্রহ্ম একান্ত বা প্রগতিস্বিক নয়| তার মধ্যে যেমন আছে উপনিষদের চিন্তন-ভাবাদর্শ, তেমনি আছে প্রতীচ্যের ত্রিত্ব ঈশ্বর তথা ত্রয়ীশক্তি ত্রিস্বরূপের কথা তথা Irinity of God ধারণাটি, ভারতীয় ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর — এই ত্রয়ী নানা রূপেরও মিশেল| ব্রহ্মারই নানাত্ব বস্তুকে পৃথকীকরণ থেকে অভেদে ধারণ করে থাকে, এই নানাত্বকে রবীন্দ্রনাথ একটি মাত্রায় পিতৃ নামের প্রতীকে গ্রহণ করেছেন| এবং প্রতীকটির মধ্যে খ্রিস্টীয় এড়ফ ঃযব ঋধঃযবৎ-এর অনুপ্রাণনা আছে| তাই ইয়েটস গীতাঞ্জলি পাঠ করে অতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিপর্যয়ের সংকাটাপন্ন প্রতীচ্যও সাড়া দিয়েছিল তাদের বিশ্বাসী প্রাণের সাযুজ্যেই| তদুপরি ইয়েটসের God the Father-এর অনুপ্রাণনা আছে| তাই ইয়েট&স গীতাঞ্জলি পাঠ করে অতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিপর্যয়ের সংকাটাপন্ন প্রতীচ্যও সাড়া দিয়েছিল তাদের বিশ্বাসী প্রাণের সাযুজ্যেই| তদুপরি ইয়েটসের Great mind-এর অনুপ্ররণা আছে। তাই অনুকম্পেই রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাঁর ঐতিহ্যিক দর্শনস্নাত ভাষায়; যার নিবিড়তায় ব্রহ্মের নির্যাস নিহিত :
মনেরও প্রাণ আছে| মনের মধ্যেও চেষ্টা আছে| মন চলছে, মন বাড়ছে, মনের ভাঙাগড়া পরিবর্তন হচ্ছে| এই স্পন্দিত তরঙ্গিত মন কখনোই কেবল আমার ক্ষুদ্র বেড়াটির মধ্যে আবদ্ধ নয়| ওই বর্তমান প্রাণের সঙ্গেই হাত ধরাধরি করে নিখিলবিশ্বে সে আন্দোলিত হচ্ছে, নইলে আমি তাকে কোনোমতেই পেতে পারতুম না| মনের দ্বারা আমি সমস্ত জগতের মনের সঙ্গেই যুক্ত|’ (চতুর্দশ খণ্ড, ৪২৫ : বিশ্বভারতী)|
ফ্রয়েডীয় তত্ত্বানুযায়ী শিশু অবচেতনাশ্রয়ী নয়, অবদমনের মধ্য দিয়ে সে সভ্যতার কাঠামোতে তথা সামাজিক নেটওয়ার্কে লগ্ন হয়| পরে এই সত্যটি ˆজবিক আকাঙ্ক্ষার ও তা নিবারণের নানা তুচ্ছতা ও অন্যের ওপর নির্ভরতার মধ্য দিয়ে অখণ্ড অবচেতন থেকে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার ফলে হয়ে ওঠে খণ্ডিত| সে চেতন ও অবচেতনের মাঝখানে দোলায়মানতার মধ্য দিয়ে, অবদমনের মধ্য দিয়ে বড় হতে থাকে| তবে ওই অবচেতন যে-কোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং তাকে উপদ্রব করতে পারে| তাই সে তার খণ্ডিত প্রাণকে/ মনকে ঐকতায় বাঁধতে চায়| এ সূত্রেই বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথও মানুষ হিসেবে নিজের খণ্ডিত চেতনাকে বারংবার বিশ্ব ঐক্য, মানব ঐক্যের মধ্যে দিয়ে যেতে চেয়েছেন|
এই মন কীভাবে নিখিলবিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকে? ভাষার মাধ্যমে বা ভাষাই মন| রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেন ‘অনন্ত কারণের সঙ্গে’| প্রতিমুহূর্তে বিশ্বকারণ থেকে প্রাণচৈতন্য ধীশক্তি লাভ করে| এই বিশ্ব কারণই হচ্ছে ব্রহ্ম| যেহেতু পৃথিবীর প্রতিটি শক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকে আগামীর সম্ভাবনা — Inner contradiction রূপে| সেহেতু ব্রহ্মও এক অপার সম্ভাবনার শক্তিময়তায় তেজোময়| আমরা এই তেজোময় ব্রহ্মের নান্দনিক প্রকাশ দেখি রবীন্দ্রনাথের পত্রপুট কাব্যে — জীবনের শেষ পর্যায়ে|
পিতার স¤^ন্ধসূত্রে ব্রহ্ম কেন প্রতীকায়িত হয় তার মনস্তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, রয়েছে দেহপ্রাণের দ্বাদ্বিকতাও, সর্বোপরি আর্টিস্ট হিসেবে ভাষার লীলাময়তা|
আত্মজীবনে পিতার প্রবল উপস্থিতি ও প্রভাবের কথা ¯^য়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবন 888sport sign up bonus রচনায় প্রকাশ করেছেন| মানসিক দীক্ষা ও মননের বিকাশশীলতা, চিন্তন প্রক্রিয়ায় উপনিষদের — যা পিতার সান্নিধ্যে লব্ধ হয়েছিল, নান্দনিক দিকটি বিশেষভাবে ক্রিয়া করেছে, আর প্রতীক্ষের উদার মানবতাবাদ ও বেন্থাম-মিলের উপযোগবাদ তাতে বিন্দুবদ্ধ হয়েছে| ব্রাহ্ম ধর্মের মধ্যে যে এক ঈশ্বরের বন্দনাগীতের প্রবর্তনা ছিল, যেসব গীত রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সেই নিজেও রচনা করেছেন, সেই ঈশ্বর ছিল পিতার মতোই কর্তা, ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের শক্তি ও বলদাতা, ত্রাতা, কর্মগুণের উদারতা, সম্পূর্ণ এক পরমপুরুষ| সংগীতের মাধ্যমে তাঁর উপাসনার যে চল তাতে একজন আর্টিস্টের তৃষ্ণাও নিবারিত হতো| অর্থাৎ বাসনা, ভাষা ও আর্টিস্টের রসতৃষ্ণা-রূপসৃজনীপ্রজ্ঞা একীভূত হতে পেরেছিল এই ‘ব্রহ্ম’ প্রতীকে|
রবীন্দ্রনাথের 888sport live chatীসত্তা কীভাবে ব্রহ্ম তথা ঐক্যকে পায়? আমরা জানি, 888sport live chatের সৌন্দর্য বা সত্য (রবীন্দ্রমতের সত্য) উপলব্ধ হয় 888sport live chatবস্তু থেকে, যেমন করে ব্রহ্মের উপলব্ধি হয় জগৎবস্তুর নিচয়ে| সে-অর্থে ˆশল্পিক সৌন্দর্য নিত্যবস্তু এবং চিরন্তন সত্য — যেহেতু বস্তুসমূহের মূল কারণ¯^রূপ ব্রহ্ম চিরসত্য| রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘Creative Unity’ 888sport liveে এবং ১৩৩১-এর বঙ্গবাণীতে প্রকাশিত ‘তথ্য ও সত্য’ 888sport liveে মত প্রকাশ করেন যে, তিনি এই সত্যের সন্ধান পেয়েছেন যে ঐক্যের ভিতর রয়েছে সৌন্দর্য ও রস| কাজে, চিত্রে, গীতে আমরা পরিপূর্ণ ‘এক’কে চরমরূপে দেখি এবং আমাদের অন্তরাত্মার একের সঙ্গে বহির্লোকের একের মিলন হয়|
The joy of Unity within ourselves, seeking expression, becomes creative, whereas our desire for the fulfillment our needs is Coustmetive.
অর্থাৎ প্রকাশ এখনই সৃষ্টিশীল ও বর্ধিত হয় যখন তা ঐক্যের আনন্দকে সৃষ্টির মধ্যে প্রকাশ করে| আর প্রাপ্তির মধ্যে বৃহৎ জগতের সঙ্গে অন্তরের চাপ বা মিলন হলে অখণ্ড একের ¯^ার্থক প্রকাশ ঘটে| এই এককেই বলা হচ্ছে ব্রহ্ম| ব্রহ্মের সঙ্গে এই যোগকে রবীন্দ্রনাথ বলেন :
… এই যোগ উপলব্ধি করবার একটি সহজ মন্ত্র হচ্ছে — পিতা নোহসি, তুমি আমাদের পিতা| যিনি অনন্ত সত্য তাঁকে আমাদের আপন সত্য করবার এই একটি মন্ত্র : তুমি আমাদের পিতা| (চতুর্দশ খণ্ড, ৪২১) পিতৃনামে ব্রহ্মার উপলব্ধির মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ও রাষ্ট্রকাঠামো অবশ্যই রয়েছে| আর রয়েছে নানা স¤^ন্ধের আকরণে ব্রহ্মকে প্রতীকায়িত করার মানবচিন্তন-ক্রিয়া| আমরা যে-কোনো কিছুকেই স¤^ন্ধ-রূপের বাঁধনে বাঁধি — ঈশ্বরকেও|
আমরাও যে-সকল স¤^ন্ধ দিয়ে ঈশ্বরকে ধরব তা একরকম নয়| আমরা তাঁকে পিতা ভাবেও আশ্রয় করতে পারি, প্রভুভাবেও পারি, বন্ধুভাবেও পারি, বন্ধুভাবেও পারি|… সব স¤^ন্ধের মধ্যে প্রথম স¤^ন্ধ হচ্ছে পিতাপুত্রের স¤^ন্ধ| পিতা যত বড়োই হোন আর পুত্র যত ছোটোই হোক, উভয়ের মধ্যে শক্তির যতই ˆবষম্য থাক| তবু উভয়ের মধ্যে গভীরতর ঐক্য আছে| সেই ঐক্যটির যোগেই এতটুকু ছেলে এতো বড়ো বাপকে লাভ করে| (চতুর্দশ খণ্ড, তদেব)
ভারতবর্ষীয় মাতৃদেবীর যেসব প্রতীক-রূপকত্বে ঠাসা রয়েছে নৃতত্ত্ব ধর্মশাস্ত্র, দর্শনবিধি তার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ পিতৃপ্রতীক শৃঙ্খলায় ভাবিত হন| তবে মাতৃপ্রতীক কী রূপে ও কী তাৎপর্যে তাঁর ব্রহ্ম-ভাবনায় অন্তর্নিহিত হয়ে আছে তা কতিপয় ব্রহ্মসংগীতে প্রকাশ পেয়েছে| সে প্রসঙ্গ বারান্তরে| বর্তমানে আমাদের উদ্দীষ্ট পিতৃতন্ত্রের আকরণে ব্রহ্মের উপস্থাপনা, যার পশ্চাতে আছে — যা আমরা আগেই বলেছি libido বা desire. এই desire বা বাসনার মূলে আছে অন্যের উপস্থিতি| বাসনার অর্থ শুধু অন্যের বা অন্যকে বাসনা করাই নয়; বাসনা একই সঙ্গে অন্যের ঈপ্সিত বস্তুরও বাসনা| অর্থাৎ মানুষী বাসনা মাত্রে অণ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত — পিতার/প্রেমিকের/জননীর| এর ফলে ব্যক্তির অস্তিত্ব এই ‘অন্যের’ কারণে নিজের সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব বিচ্ছিন্নতায় ভোগে| আমরা এই বিচ্ছিন্নতার অনিবারণীয় বহুবিধ লীলাময় বিরহ রূপটি দেখি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিতে| অন্যের জাজ্জ্বল্যমান উপস্থিতি তাই এত প্রগাঢ় হয়ে রবীন্দ্রসৃষ্টিকে প্রভুর প্রভৃত্ব/ ব্রহ্মের ব্রহ্মত্বকে অর্থপূর্ণ করে তোলে| কেননা, ব্রহ্মত্ব অর্থহীন যতক্ষণ না তা ¯^ীকৃতি পায় সৃষ্টির সৃষ্টিত্ব দ্বারা| এই অন্যের বহু আবির্ভাবেরই একটি হলো পিতা|
পিতা-কর্তৃক বাস্তব অথবা অবাস্তব নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী জীবনের সকল ঊর্ধ্বতন অনুশাসনের প্রতীক এবং এই পিতৃতান্ত্রিক বিধিকে ¯^ীকরণ করে ব্যক্তি গড়ে তুলতে শুরু করে তার মনের সেই স্তর যাকে ফ্রয়েড বলেন সুপার ইগো|
আবার এই অন্যের চাপে, পিতার চাপে নিজের ব্যক্তিসত্তা যাতে অদৃশ্য হয়ে না যায় (কারণ অদৃশ্য হলে কবি কিছুই সৃষ্টি করতে পারবেন না) সে-কারণে রবীন্দ্রনাথ ভাষার আশ্রয়ে সুরের গীতলতায় ব্যক্তিসত্তাকে সদা অস্তিত্ববান করে রাখেন| এই ভাষা তাঁর জন্মের পূর্বেই নির্মিত ও ব্রহ্মত্ব/ পিতৃত্ব শব্দ নামে পদ্ধতিবদ্ধ, তাই কবির ভাবনা ওই শব্দ নামের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত ও চালিত| এতে এটাও ঘটে যে, যে-ব্যক্তিসত্তার কথা আমরা বলছি, যাকে রক্ষা করতে চাইছি শূন্যতা থেকে তা বহির্জাগতিক ভাষামাধ্যম মাত্র, অতএব ব্যক্তিসত্তার নিজ¯^ কোনো প্রাতি¯ি^ক চরিত্র নেই|’ (অমল, পৃ ১২৬, ১৪১১) তাছাড়াও রবীন্দ্রনাথ তীব্র আত্মসচেতনতার মুহূর্তে উত্তরিত-সত্তা হয়ে পিতৃনামে ঐকাত্ম্য হন নিজের মূলীভূত শূন্যতাকে ভরিয়ে তোলার জন্যে| যে-শূন্যতার জন্ম লাকাঁর মতে বর্জন থেকে| আত্ম-বাসনাকে জগৎব্যাপ্ত কওে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বর্জন করে ব্রহ্মকল্পে রূপাšি^ত হয়ে যান| এই নিজ¯^ বর্জনের মধ্য দিয়ে ভাষার নিয়ন্ত্রণকেই আরেকভাবে তিনি বলেন ‘জীবনদেবতা’ — ‘অন্তরমাঝে বসি অহরহ/ মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,/ মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ/ মিশায়ে আপন সুরে|’ ‘তুমি যা বল বলি তাই/ সংগীত স্রোতে কূল নাহি পাই/ কোথা ভেসে যাই দূরে|’ (‘অন্তর্যামী’, চিত্রা) এই বহির্বাসী ভাষার মধ্যে কবিসত্তার জন্ম :

তুমি সে ভাষারে দহিয়া অনলে
ডুবায়ে ভাসায়ে নয়নের জলে
নবীন প্রতিমা নব কৌশলে
গড়িলে মনের মতো| (তদেব)
বস্তুত মানুষের ˆচতন্যই প্রতীকী-শৃঙ্খলার মধ্যে ভাষা দিয়ে প্রবেশ করে| এই ভাষার যে নান্দনিক প্রকাশ রবীন্দ্রনাথে তা একশ চুয়াল্লিশটি ব্রহ্মসংগীতে অভিব্যক্ত| যদিও গীতবিতানের এসব ব্রহ্মসংগীতে পিতৃনামের প্রতীকী গান নেই, সেসব আছে পূজা ও প্রার্থনার গানে|
আরো একটি দিক থেকে ব্যক্তিগত ব্রহ্মের সৃষ্টি হয় ও তাকে জগৎময়-রূপে ভাবা হয়| মানুষের অনড় কোনো ব্যক্তিসত্তা নেই, ধ্রুব চরিত্র নেই — যার কাব্যিক রূপ লক্ষ করি ‘শেষ লেখা’ (১৯৪১) কাব্যের ‘প্রথম দিনের সূর্য’ 888sport app download apkটি যেখানে ব্যক্তিসত্তা কি তার উত্তর মেলেনি, এই ব্যক্তিসত্তা মূলত সামাজিক-সংস্কৃতিবিধি ও ˆনতিক বিধিনিষেধের প্রত্যাদেশে গঠিত| তাই প্রতিমুহূর্তে সামাজিক প্রাণী তার নিজত্বের কাছে অচেনা ও বিচ্ছিন্ন, আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা ও ধনতান্ত্রিক সমাজ তাকে শুধু অস্তিত্বশূন্যই করেনি তাকে অবপ্রাণী বা পোকায় রূপান্তরিত করেছে| (কাফকা দ্রষ্টব্য) ওই শূন্যতায় বিকল্প কিছু না পাওয়ায়| কারণ আধুনিককালে ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটে গেছে বলে ঘোষিত হয়েছে| রবীন্দ্রনাথ শুধুই বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে নয় তাঁর নিজত্বের অন্তশ্চাপেও ব্রহ্মবাদী হয়েছেন এবং পিতৃস¤^ন্ধের শৃঙ্খলায় গিয়েছেন, এবং জগৎযুক্ততায় সম্প্রসারিত হয়েছেন| ব্রহ্মের সঙ্গে মিলনের লক্ষ্যে এক জ্যোতির্ময় তীব্র দ্যুতির মধ্যে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্রকে এক ও অভিন্ন করে তুলেছেন| এ সূত্রেই রবীন্দ্রসৃষ্টিতে বিশ্বপ্রকৃতি, আলো ও বস্তুজগৎ এত তীব্রতায় তাঁর সঙ্গে আত্মিক মিলনে যুক্ত থাকে| এক অধিবিদ্যক উপস্থিতি (Meta physical presence) অনিবার্য হয়ে ওঠে জগৎযুক্ততার কারণেই| প্রতীকেরও সৃষ্টি করে|
যে প্রতীকী-শৃঙ্খলার কথা বলা হচ্ছে, তা সভ্যতার আদি যুগ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন বস্তুর আদান-প্রদানের মাধ্যমে| পরে তার ব্যবহারিক মূল্য লোপ পায় এবং ধীরে-ধীরে বস্তুগুলি প্রতীকে পরিণত হয়| ভাষাও বহুদিনের ব্যাপারে প্রতীকী হয়ে ওঠে এবং ধারণা বা Concept-এ রূপান্তরিত হয়| আমাদের এই আলোচনার শুরুতে কর্তৃবাচ্যের যে ব্রহ্মের ধারণা দেওয়া হয়েছে তা ক্রমাš^য়ে ধারণায় পর্যবসিত হয়; রবীন্দ্রনাথ এই ধারণা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত| লাকাঁর মতে, মানুষের ভাষা-প্রতীকই তাকে মানুষ হিসেবে নির্মাণ করেছে| রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা যাকে আমরা বলছি বিচ্ছিন্নতাক্রান্ত ও প্রতিমুহূর্তে শূন্যতা-অতিক্রমী হতে আকাঙ্ক্ষী তা ব্রহ্মসংগীতের মধ্যে নিজেকে পরিপূর্ণ করার সাধনা করেছে, কাজেই সভ্যতার নিয়মেই, ভাষার আকরণ ও প্রতীকের কারণেই নিজের নাম যেমন পিতৃপ্রদত্ত, নিজের শূন্যতাও তেমনি ব্রহ্মের পিতৃ-প্রতীকে সমর্পিত ও অবিচ্ছিন্ন থাকতে চেয়েছে|
মোটামুটিভাবে গীতবিতানের ‘পূজা ও প্রার্থনা’ পর্যায়ের সাতটি গানে সরাসরি পিতৃবন্দনা রয়েছে| ৩ ন¤^র গানে কবি নিজেকেসহ সকলের মধ্যে শিশুত্ব ও মনের ক্ষুদ্রত্ব দেখছেন, বিভ্রান্তি ও চরণস্খলনও দেখছেন| এ হচ্ছে লাঁকা-কথিত মুকুর ধাপ (Mirror stage) যখন শিশু নিজেকেই দেখে আত্মরূপে, সম্পূর্ণরূপে, কিন্তু এই সম্পূর্ণ রূপটি বাস্তবে স্খলিত, বহুধাবিভক্ত, ছিন্নবিচ্ছিন্ন| শিশুত্ব মুখোমুখি হয় সমাজের/ পিতার আচরণবিধির অনুশাসনের, — রুদ্রমূল কেন তবে|/ দেখাও মোদের সবে|/ কেন হেরি মাঝে মাঝে ভ্রূকুটি ভীষণ|’ এই রোষের কারণ শিশু ‘পৃথ্বীর ধূলিতে অন্ধ মোদের নয়ন|’ ধূলি এখানে ছিন্নবিচ্ছিন্ন খণ্ড-খণ্ড আত্মতা ও ভ্রান্তি| সংসার-সমাজ বিধি বা ˆনতিকতার বিধান সম্পর্কে শিশুর অজ্ঞতা বা ভ্রম তাকে দুর্বল করে রাখে| এখানে রবীন্দ্রনাথ সমাজসত্তার কাঠামোর মধ্যে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার প্রার্থনা জানাচ্ছেন পিতার কাছে| অর্থাৎ এতে কবির ব্যক্তিসত্তা ঢুকে যাচ্ছে সমাজনির্দিষ্ট প্রতীক-শৃঙ্খলার মধ্যে, এটি আর্কেটাইপ্যানও বটে|
ব্রহ্ম ঊর্ধ্বতন শক্তি, বিশ্বপিতার আসনে সমাসীন| ৪ ন¤^র গানে দেখি ব্রহ্মের প্রতীক-ভাষা আয়ত্তের সাধনা করছেন কবি — যে- ভাষা ব্রহ্মের রচিত ছন্দে মহান বিশ্বের গীত॥’ কবিসত্তা যুক্ত হতে চাইছে ব্রহ্মের ভাষাগীতের সঙ্গে, আপন ক্ষুদ্রত্ব দূরীভূত করতে চাইছে,’ মর্তের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কণ্ঠ লয়ে আমিও দুয়ারে বের হয়েছি উপনীত|’ আগের গানটিতে ছিল বহুবচন ‘আমরা’, এখানে কবি একা, কারণ ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি|’ রবীন্দ্রনাথ নিজ কবিসত্তার এই অমিত্ব প্রতিভাদীপ্তি নিয়ে দেদীপ্যমান হতে চাইছেন জগৎপিতার সন্নিধানে ‘তোমারে শুনাব গীত’| পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তিবাদী ব্রহ্মভাবনা দ্বারা কবি উদ্দীপিত, সঙ্গে মিশিয়েছেন নিজ সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞা| এই সৃষ্টিশীলতা আকাশ-রবি-শশীর সঙ্গে যুক্ততায় উত্তীর্ণ হয় এবং বহু গুণাšি^ত করে ¯^ীয় মননকে| শিশুর প্রতীকে নিজ ক্ষুদ্রত্ব, অহংকে বর্জন করে উত্তরিত (transcendence) হওবার বাসনাই ব্রহ্মসংগীতের মূল আবেদন|’ ঊর্ধ্বসত্তায় লীন হওয়ার এই পরিকল্পে অবশ্যই রয়েছে যুগ্মবৈতারীত্যের সামাজিক-রাজনৈতিক বিধান — পিতা/ পুত্র/, ঊর্ধ্ব/ নিম্ন, বৃহৎ/ ক্ষুদ্র, ক্ষমতাভোগী/ ক্ষমতাহীন| কবি ‘কী কথা জাগিছে প্রাণে কেমনে প্রকাশিত কর’ — এই আবেদনে-বাসনায় যে সৌন্দর্যপ্রবাহ বয় জগৎজুড়ে তাতে পরিস্নাত হতে চাচ্ছেন|
৯ ন¤^র গানটিতে ব্রাহ্মধর্মের উপাসনা মডেলের রাবীন্দ্রিক প্রতিন্যাস রচিত হয়েছে| এখানেও ‘আমরা’ বহুবচন, আপন সম্প্রদায়ের সকল মানুষ, এমনকি বিশ্বজনও| পিতৃভবনকে বলা হচ্ছে ‘অমৃতসদন’, একই সঙ্গে ‘আনন্দের নিকেতন’| আত্মমুণি তুরিয়ানন্দ নয়, আকাশলোক ও জগৎলোক নিয়ে আমাদের যেসব অধিবিদ্যক ভাষা বিরাজমান রবীন্দ্রনাথ সেই ভাষায়ই কথা বলছেন ‘দেবলোকে উঠিয়াছে জয়গান গাহো সবে একতান/ বলো সবে জয়-জয়’॥ এখানে দীর্ঘপোষিত সংস্কারের দেবলোক এসে মাঝখানে যুক্ত হচ্ছে| যে-ব্রহ্ম জগৎকারণ তার গুণবৃদ্ধি-করণে জগৎকে অমৃতসদন ও আনন্দনিকেতনে পরিণত করেন কবি| এটাই তাঁর ˆনতিকতা, বাসনার ঊর্ধ্বায়ন ও সৃষ্টিশীলতার বৃদ্ধিকরণ বস্তুত| আদিকাল থেকে চেতনা বিবর্তনের ধাপে-ধাপে মানুষকে প্রকৃতির তাণ্ডব থেকে মুক্ত হতে হয়েছে| নিজেকে রক্ষা করতে হয়েছে যার পরিণাম এই পরিবার ও আত্মীয়তাবন্ধন| এবং এর মধ্যে নিজের বাসনাকেও সংকুচিত বা ঊর্ধ্বায়িত করতে হয়েছে| পিতৃনামের কাঠামোতে তা পেয়েছে যাথার্থ্য| বাসনাকে সংকোচনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কী করেন? 888sport app download for androidীয় সেই বিশিষ্ট গানটি, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপনে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে|’ ব্রহ্মের কাছেই নিজেকে বঞ্চিত/ বর্জন করার আকুলতা প্রকাশ পায়| এ যেন আত্মতার অবদমনও, যে-কারণে বলা হয় ব্রহ্মে লীন হওয়াটাও এক ধরনের যৌনানন্দ| শিলা সৃষ্টির মধ্যেও এই আনন্দ বর্তমান, যা মনস্তত্ত্ববিদরা নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন|
আমরা এই 888sport live chatীসত্তাটিকেই পিতৃনামের প্রতীক-শৃঙ্খলায় ব্যঞ্জনায়িতরূপে দেখছি| এ এক সাধনাও বটে, অবশ্যই তা হৃদয়সাধনা, বাইরের আচারসব¯র্^তায় বন্দি নয়, ‘দিবারাত্রি করিয়া যতন/ হৃদয়েতে রচেছি আসন — |’ দিনানুদিন ˆজবিক জীবনযাত্রায় বি888sport app download for android ঘটে, কিন্তু প্রতিনিয়ত পিতার দৃষ্টি পুত্রের প্রতি নিবদ্ধ থাকে| দোষত্রুটি স্খলন-পতন, নিজত্বকে বড়ো করে তোলার অভীপ্সা বৃথা সময়ক্ষেপণ — সকল কিছু থেকে কবি মুক্তি ও দয়া ভিক্ষা করেন পিতার কাছে| স্নেহময় পিতা ‘সদা আছ কাছে|’ সার্বক্ষণিক এই প্রতীক একই সঙ্গে দয়া ও স্নেহের আকর| ভারতীয় দর্শনে ও ধর্মে পুরুষ-দেবতার শাসনত্রাস সঞ্চার যেমন আছে, বিপরীতে আছে 888sport promo codeদেবতার সকরুণ আশ্রয়-শরণ| রবীন্দ্রনাথ পরমপুরুষকে পাল্টে দিচ্ছেন ক্ষমাকারী ও দয়ালু রূপের মধ্যে| একটি শব্দ লক্ষণীয় — পিতার স্নেহ ‘পুলকে পুরিছে দেহ’ — এখানে ‘দেহ’ শব্দটি গভীর তাৎপর্যবহ| তাঁর এই ব্রহ্মসংগীত যে সামাজিক প্রথাগত ব্রহ্মবন্দনা নয়, তা যে নবসৃষ্টি ও আবিষ্কৃত এক বহুগুণের বৃদ্ধিকারক সৃষ্টিশীলতা তা-ই প্রমাণ হয় শব্দটির যোজনায়| ব্রহ্মের সঙ্গে লীন হলে দেহ ও পুলকে উদ্বসিত হয়, ভরে ওঠে| পঞ্চেন্দ্রিয়বিশিষ্ট এই দেবেন্দনা রবীন্দ্রচেতনার আরেক তাৎপর্যময় দিক, নানা চিন্তা কণিকায়, প্রতীকে-রূপকে দেহ তাঁর রচনায় আকীর্ণ হয়ে আছে| এর নেপথ্যে আছে পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভোগবাদী রক্তীয় ঐতিহ্যের পরম্পরাগত অস্তিত্ব| রবীন্দ্রনাথে এই ভোগাসক্তি এক ধরনের কঠিন লড়াই করেছে পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তিবাদ ও ত্যাগধর্মী মানসিকতার উত্তরাধিকারত্বের সঙ্গে| কখনো এই লড়াই মনস্তাত্ত্বিক কূটত্বেরও সৃষ্টি করেছে|
যদিও হিন্দুধর্মের সাকাররূপী দেবতাদের মতোই ব্রহ্মের রূপক কল্পিত ও রচিত হয়েছে গানগুলিতে, যেমন, ‘ওই-যে নেহারি মুখ অতুল স্নেহের|’ কারণ এই ব্রহ্ম বিশ্বপ্রকৃতির ও বস্তুরূপের আদিকরণ এবং বিমূর্ত কল্পনা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই পিতৃরূপ আরোপিত — ‘ওই যে নয়নে তব অরুণ-কিরণ নব,/ বিমল চরণতলে ফুল ফুটে প্রভাতের|’ আর সর্বদাই রবীন্দ্রনাথ একটি ‘আসন’ কল্পনা করছেন যেখানে ব্রহ্ম/ পিতা আসীন| তাতে পূজার ভঙ্গি ফুটেছে, কিন্তু গীতরস এই আসন বা স্থিরতাকে ফুল ফোটার নিভৃতির সঙ্গে একাত্মক করে দিচ্ছে| কবির গানগুলি ব্রহ্মের ‘প্রসাদসলিলে’ পবিত্র ও বিমল হবে| অর্থাৎ পিতা তাঁর 888sport live chatের শুদ্ধতা ও পবিত্রতাকে রক্ষা করেন| এখানে আর ‘অন্তযার্মী’র কৌতুকময়ীর মতো কোনো 888sport promo codeসত্তার উপস্থিতি ঘটছে না|
সবচেয়ে গভীর অন্তর্প্লাবী গানটি হচ্ছে ১৮ ন¤^র — অকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা|’ সকল মানুষের ক্ষুদ্র আশা, হারানোর শঙ্কা, মরীচিকায় ভ্রান্তি — ইত্যাকার জাগতিক বিভ্রম থেকে পিতাই রক্ষা করেন পুত্রকে| এ হচ্ছে শিক্ষণের মধ্যে দিয়ে ˆনতিকতায় দীক্ষালাভ| কবি গানটিতে দ্বিমুখী ˆবপরীত্য তুলে ধরেছেন, সুখ/ মরীচিকা, ত্রাস/ শান্তি, কান্না/ আশা, বেলা/ খেলা ইত্যাদি| মোট দশটি পঙ&ক্তিতে আবর্তিত হয়েছে জাগতিক ব্যত্যয়, মানুষের সব প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতা| শেষত পিতার ˆনকট্যে ও তাঁর মধ্যে লীন হয়ে যাওয়ার আশাই জেগে থাকে — ‘তোমারে দাও, আশা পুরাও, তুমি এসো কাছে|’ ব্রহ্মের সত্তাকে নিজ বাসনার জগতে দান হিসেবে পেতে চাইছেন কবি| ‘তোমারে দাও’ বাক্যাংশটি ব্যক্ত করছে ব্রহ্মের অস্তিত্ব, আসলে বস্তুপ্রাণের সম্মিলনেই সত্য হয়| এখানে ব্রহ্ম মানুষের অস্তিত্ব আসলে বস্তুপ্রাণের সম্মিলনেই সত্য নয়| এখানে ব্রহ্ম মানুষের প্রাণে নিজত্বকে দান করে মানুষকেই ব্রহ্ম করে তুলছে| রবীন্দ্রচেতনায় ব্রহ্ম-ভাবনা শেষাবধি যে মানবব্রহ্মে রূপ নেবে তার ইঙ্গিত এই ‘তোমারে দাও’-এর মধ্যেই সংকেতিত| বস্তুত, একদিকে ত্রাস আত্মভয়, হতাশা-অশান্তির কলরবের বিপরীতে বিশ্ববস্তুর গতিশীল বৃদ্ধিময়তাকে কবি আনন্দময় নান্দনিক ক্রিয়া রূপেই দেখছেন|
বিশ্ব যখন তার রূপময় বস্তুসত্তাকে ‘কলরবে’ ভরিয়ে তোলে, তখনই সকলের প্রাণসত্তা জেগে ওঠে যত সাধ আছে সেসব মেটানোর জন্যে| এখানে এসে ১৯ ন¤^র গানে রবীন্দ্রনাথ প্রেমের দেখা পেলেন — ‘ভাই বন্ধু সবে মিলি করিতেছে কোলাকুলি, মাতিয়াছে প্রেমের উৎসবে|’ পিতার প্রেম অফুরন্ত, প্রেমের বৃদ্ধিশীলতার ধারা অব্যাহত| কবির মনন প্রেমের গুণবাচকতা — যে-গুণের নাম হতে পারে সৌন্দর্য, বিকাশ ঘটিয়ে চলে ‘স¤^ৎসর’ ধরে| আনন্দের ধারা থেকে শেষ পর্যন্ত প্রেমস¤^ন্ধের মধ্যে পিতৃনামের প্রতীকটিকে স্থিতি দান করেন, যে প্রেম তাঁর জীবনদর্শনের পরাকাষ্ঠাও বটে| ‘হৃদয়ের থালে’ ‘রাশি-রাশি প্রেমফুল’ আর ‘প্রেমের অমৃত তাঁরি’/ পিতার অসীম ধনরতনের সকলেই অধিকারী| — এই দুই বাক্যাংশে প্রেমস¤^ন্ধে উত্তরিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ কঠোর কঠিন শাসক পিতার আকরণ ভেঙে দিয়ে মঙ্গলময় দয়াময় করুণার সাগররূপী পিতার রূপক ˆতরি করলেন| তাঁর সৃজনক্ষমতা, আননন্দবোধ, সৌন্দর্যতৃষ্ণা আর প্রেমের সঙ্গে ব্রহ্মপিতাকে জড়িয়ে নিয়ে পিতৃনামের প্রতীকতা রক্ষা করতে বদলে দিচ্ছেন এর সংস্কারবিধিভুক্ত কঠিন পিতাকে| মাতৃনামের রূপকতা এক ˆজবিক ও জাগতিক সত্য যার ব্যত্যয় নেই, যার বিকল্পও নেই| কিন্তু পিতার প্রতীক পরিবার কাঠামোর সৃষ্টি যার মধ্যে সংশয়ও কাজ করে| এই সংসয় দূর করার মানসেই যেন রবীন্দ্রমনস্তত্ত্ব পিতার কনসেস্প বদলে দিয়ে তাকে ব্রহ্মের প্রতীকে রূপদান করলেন|