হোয়াইট চ্যাপেল মেট্রো স্টেশন থেকে দুটো রাস্তা পেরিয়েই জেসমিনদের অফিস। ব্রিটিশ স্বাস্থ্য দফতরের অধীনে এক বড় হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওদের অফিসে ওরা যে ছয়জন অ-ডাক্তার কর্মচারী রয়েছে তাদের অফিসিয়াল নাম হচ্ছে ‘লিংক অফিসার’। ওদের কাজ হচ্ছে এশীয়, বিশেষ করে এই উপমহাদেশ, মানে ভারত, পাকিস্তান, 888sport apps ও শ্রীলঙ্কার কিছুটা পিছিয়ে পড়া যেসব পরিবার ইস্ট লন্ডনে রয়েছে, তাদের দেখভাল করা। বিশেষ করে সেইসব পরিবারের সদস্যদের, যারা ইংরেজি ভাষায় তেমন দড় নয়। তাদের শারীরিক বা 888sport app সমস্যা ইংরেজ ডাক্তারদের কাছে বুঝিয়ে বলার ক্ষেত্রে এসব লিংক অফিসার দোভাষীর ভূমিকা রাখে। তবে কেবল স্বাস্থ্যগত নয়, এসব পরিবারের 888sport app অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে বলার ক্ষেত্রে এসব লিংক অফিসারকে নানা রকম ভূমিকা রাখতে হয়। জেসমিন প্রায় বারো বছর ধরে এ-চাকরিটা করে আসছে এবং এই কাজটা ও বেশ ভালোই উপভোগ করে।
তবে আজকের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। খুব গুরুত্বপূর্ণও। সে-কারণেই হয়তো তাদের অফিসের বস মিসেস জিলিয়ান নিজে সকালে ফোন করে জেসমিনকে জরুরিভাবে অফিসে আসতে বলেছিল। জিলিয়ান অ্যান্ডারসন হচ্ছে তাদের লিংক অফিসের প্রধান কর্তা। বছর পঞ্চাশেকের মিসেস জিলিয়ানের এ-ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা বিস্তর। একসময় জিলিয়ান বসনিয়ার উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করেছে। কাজ করেছে রুয়ান্ডাতেও। তবে বস হিসেবে মিসেস জিলিয়ান বেশ বন্ধুবৎসল। তাঁর অধীনস্থ লিংক অফিসারদের সুখে-দুঃখে সে পাশে থাকে। কখনো নিজের গাড়িতে তাদের হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে লিফটও দেয়। আর জেসমিনের সঙ্গে জিলিয়ানের সর্ম্পকটা তো খুবই ভালো। দুজনের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। জেসমিন বুঝতে পারে জিলিয়ান তাকে বেশ পছন্দই করে।
বেশ তড়িঘড়ি করেই অফিসে ঢোকে জেসমিন। তারপর জিলিয়ানের রুমে ঢুকে এরকম জরুরি তলবের কারণটা সে জানতে পারে। হ্যাঁ, কারণটা বেশ জরুরি ও জটিলও।
প্রায় এক বছর আগে হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনের পেছনের এক অন্ধকার রাস্তায় রেস্টুরেন্টের কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে শীতের এক নির্জন রাতে খাদিজা নামে এক অবিবাহিত 888sport appsি তরুণী ধর্ষিতা হয়। ধর্ষণটা করেছিল দুজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। তাদের অবশ্য ধরা যায়নি। তবে সিসিটিভির ফুটেজ ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি থেকে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, অপরাধী এই দুজনই। আর দুজনেই দাগী আসামি। তাদের মধ্যে একজন ঘটনার মাত্র তিনদিন আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপারটা হলো, এই ধর্ষণের ঘটনার ফলে খাদিজা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং মেয়েটা এক গভীর বিষণ্নতায় ভুগতে থাকে। ওর পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে ও দেখা-সাক্ষাৎ, এমনকি যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়। ডাক্তার-নার্স এবং জেসমিনদের অফিসের লিংক অফিসারদের নানা পরামর্শ সত্ত্বেও খাদিজা গর্ভপাত করাতে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে এবং কয়েক মাসের মধ্যেই ওর গর্ভের বাচ্চাটা এতই বড় হয়ে যায় যে একপর্যায়ে এসে গর্ভপাত করা আর সম্ভব নয় বলে ডাক্তাররা জানিয়ে দেন।
গত দু-মাস হলো খাদিজার শিশুটি হয়েছে। নাদুস-নুদুস কৃষ্ণাঙ্গ একটা ছেলে শিশু। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খাদিজা শিশুটাকে ছোঁয় না। দুধ খাওয়ায় না, এমনকি শিশুটার দিকে তেমন তাকায়ও না।
খাদিজার নানা রকম মানসিক চিকিৎসা চলছিল। এমন কী ওদের হাসপাতালের বাইরে থেকে মনস্তত্ত্ববিদ আনিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ কাউন্সেলিংও করা হলো। রোগী 888sport appsি বলে জেসমিনই দৌড়ঝাঁপ করে সব কাজ করেছে। কিন্তু খাদিজার মাঝে কোনোই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। বাচ্চাটাকে ও কখনোই কোলে নেয় না। ছুঁয়েও দেখে না, আর শিশুটাকে ওর বুকের দুধ খাওয়ানোর তো চেষ্টাই করে না। এভাবেই চলে আসছিল গত কয়েক সপ্তাহ।
কিন্তু সম্প্রতি ওদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, খাদিজার শিশুটাকে ওরা কোনো এতিমখানায় বা এক নিঃসন্তান পরিবারকে দত্তক দিয়ে দেবে। এ ব্যাপারে ইস্ট লন্ডন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমতিও পাওয়া গেছে। জেসমিনকেই এ-ব্যাপারে নানা জায়গায় যোগাযোগ করতে হচ্ছিল। মাঝে মাঝে খাদিজার সামনেও এ-বিষয়ে আলাপ হয়েছে। জেসমিন লক্ষ করে দেখেছে, বাচ্চাটার অন্য কোনো ব্যাপারে খাদিজার কোনো আগ্রহ না থাকলেও বাচ্চাটাকে কোনো এতিমখানায় বা কোনো দম্পতিকে দত্তক দেওয়া হবে – এ-কথাটা আলোচনার সময় খাদিজা যেন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। অপাঙ্গে বাচ্চাটার দিকে একবার যেন তাকায়ও।
খাদিজার শিশুটাকে দত্তক দেওয়ার জন্যে একটা ভালো দম্পতিও পাওয়া গেছে। মধ্যবয়সী এক আইরিশ পরিবার। ম্যানচেস্টারে থাকে। স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই শিক্ষকতা করে। নিঃসন্তান এ-দম্পতির মাঝে কোনোই বর্ণবাদ নেই আর তারা খুব আগ্রহের সঙ্গেই খাদিজার এই কৃষ্ণাঙ্গ শিশুটাকে দত্তক নিতে ইচ্ছুক। নানা দিক বিবেচনা করে এবং ওই দম্পতির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে ওদের হোয়াইট চ্যাপেল স্বাস্থ্য অফিস খাদিজার বাচ্চাটাকে এই দম্পত্তির হাতেই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আজ সোমবার সেই হস্তান্তর দিবস। শিশুটাকে দত্তক নেবে বলে সেই আইরিশ দম্পতি ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনে গতকাল চলেও এসেছে। জিলিয়ান সকালে অফিসে জেসমিনের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। জেসমিন অফিসে ঢুকলেই বলল : ‘চলো যাই। অনেক কাগজপত্র সই করতে হবে। আমাদের সাক্ষীও হতে হবে।’ তারপর কিছুটা মৃদু হেসে বলেছিল : ‘আমার তো দেখতে দেখতে এ-ব্যাপারে কম অভিজ্ঞতা হয়নি। রুয়ান্ডা আর বসনিয়াতে তো কম শিশুকে আমরা দত্তক দিইনি।’ পরে গাড়ি চালাতে চালাতে জিলিয়ান শিশু দত্তকের সুবিধা-অসুবিধা, শ্বেতাঙ্গ পরিবারে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর মানুষ হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক নানা সমস্যা – এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলাপ করছিল।
হাসপাতালের ম্যাটারনিটি বিভাগের সামনে গাড়ি পার্ক করে জিলিয়ান ও জেসমিন যখন ভেতরে এলো, তখন রিসেপশনে জেনির সঙ্গে ওদের দেখা হয়ে গেল। তরুণী নার্স জেনি ক্যাম্পবেল সারামুখে কেমন একটা বিহ্বল ভাব নিয়ে ওদের অপেক্ষায় রিসেপশনে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দেখে কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘শুনেছ কিছু?’ ‘না’, ওরা দুজন প্রায় একসঙ্গেই বলে উঠল। তারপর হাসপাতালের লম্বা করিডোরটা ও লিফটে উঠতে উঠতে জেনি ক্যাম্পবেল ওদের যা জানাল তা হচ্ছে, বাচ্চাটাকে আজ দত্তক দেওয়া হবে বলে যখন একজন ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ডবয় সকালে শিশুদের ওয়ার্ডটাতে ঢোকে ওরা অবাক বিস্ময়ে দেখে আর সব বাচ্চাই ঠিক আছে, কেবল খাদিজার বাচ্চাটা নেই। নেই তো নেই! ওরা তখন খাদিজার রুমে যায় এবং আরো বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে যে, খাদিজাও নেই। গোটা হাসপাতাল তন্নতন্ন করে তাদের খোঁজা হয়েছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, শিশুটাকে নিয়ে খাদিজা হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে। জেনি বলল, ‘হয়তো খুবই ভোরে খাদিজা এ-কাজটা করেছে, যখন হাসপাতালের জেনিটাররাও ঠিকমতো ডিউটি শুরু করতে পারেনি।’
এরপর সারা সকাল খোঁজ চলেছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে। পুলিশ খাদিজার বাবা-মায়ের বাড়িতে খোঁজ করেছে। না, ওখানে ওরা নেই। নিকট আত্মীয়-স্বজন ও খাদিজার বন্ধু-বান্ধবীদের কাছেও খোঁজ চাওয়া হয়েছে। না, খাদিজা আর ওর বাচ্চাটা কোথাও নেই! হয়তো খাদিজা শিশুটাকে নিয়ে ট্রেনে চেপে অন্য কোনো শহরে চলে গেছে। অথবা লন্ডনেরই কোনো এক কোণে ঘাপটি মেরে রয়েছে। পুলিশ অবশ্য বেশ জোরেশোরেই সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সব জায়গাতে খাদিজা আর ওর শিশুটাকে খুঁজে চলেছে।
জিলিয়ান আর জেসমিনকে নিয়ে যাওয়া হলো এই হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান ডাক্তার স্যাটক্লিফের ঘরে। প্রবীণ এই অধ্যাপক শুধু একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারই নন, একজন জীবনাভিজ্ঞ মানুষও। ওদের সঙ্গে আলাপে জানালেন, ওই আইরিশ দম্পতি গতকাল লন্ডনে পৌঁছে আজ সকালে ওদের অফিসে চলে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। ওদেরকে জানানো হয়েছে যে, অনিবার্য কারণবশত শিশুটাকে আজ দত্তক দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওদেরকে পরে এ-বিষয়ে জানানো হবে।
ডা. স্যাটক্লিফের অফিসে বসেই প্রায় দিনটা কাটল জেসমিনদের। নানা জায়গাতে খোঁজ করা হলো খাদিজার। না, খাদিজা আর ওর বাচ্চাটা কোথাও নেই। দুশ্চিন্তায় আর কাজের চাপে লাঞ্চ খেতেও ভুলে গিয়েছিল ওরা। বিকেলের দিকে যখন বোঝা গেল খুব দ্রুত এ-সমস্যার কোনো সমধান হচ্ছে না, তখন জিলিয়ান বলল : ‘আজ আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। খাদিজার কোনো খবর পেলে এঁরা তো জানাবেনই। চলো, তোমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিই। বাড়ি যাও এখন। কাল আমরা আবার দেখব।’ দুজনে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে। দুজনেই মানসিকভাবে কিছুটা ক্লান্ত, বিপর্যস্তও।
হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনের দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে জিলিয়ান জেসমিনকে বলল : ‘আমি রুয়ান্ডাতেও এরকম একটা কেস দেখেছি। সে-মেয়েটাও ছিল রেপ ভিকটিম।’ তারপর স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে মৃদু হেসে জিলিয়ান বলল : ‘আসলে কি জানো, দিনের শেষে মায়েরা তো মা-ই।’ বলে জেসমিনের দিকে চেয়ে হাসিটা প্রগাঢ় করল জিলিয়ান। কথাটা শুনে জেসমিনও সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল। এবং সম্মিত মুখেই।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.