সবলসিংহপুর : খণ্ডচিত্র

মামাবাড়ি ঝামটিয়া আমার ব্রজভূমি হলেও অস্বীকার করতে পারব না যে সবলসিংহপুর ছিল মথুরা। এটা রাজধানী। ওটা বাগানবাড়ি বা বৃন্দাবন।

ঝামটিয়ায় খেলার সাথি সারাক্ষণের জন্য ছিল ছোট ভাইয়েরা। আর কলকাতা যাওয়ার আগে পেয়েছি মামাতো ভাই রেজাউল করিমকে। তিনি আমাদের কানাই। দলপতি। তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় পড়তে চলে গেলে আমরা হয়ে পড়লাম দলপতি ছাড়া। পরে আমার স্থান। কিন্তু বাকিরা এত ছোট যে, বড় কোনো খেলা সম্ভব ছিল না।

 তো সবলসিংহপুরের কথা। আমাদের পাড়ায় সমবয়সী ছিল একমাত্র সেকান্দার। ওরা চার ভাই। বড় করিমভাই বেশ বড়। মেজো সোলেমানভাই, তিনিও বড়র পর্যায়ে। তিন নম্বরে সেকান্দার, আমার সমবয়সী। ওর সঙ্গে আমার খুব দোস্তি ছিল। ও মাদ্রাসায় পড়ত। আমি ছাড়া-গরু। সময় কাটানো ছিল দায়।

 সেকান্দারের ছোটভাই রহিম। খুব সুন্দর দেখতে। চাচির মতো ফর্সা আর চাপা মুখশ্রী। একেবারে ব্রোঞ্জমূর্তির মতো। কিন্তু ও আমার ছোটভাইদের বয়সী। তাই ওকে আমি গ্রাহ্য করতাম না।

আর একজন ছিল মুন্সীপাড়ার কালো। সে নানাবাড়িতে থাকার কারণে আমাদের পাড়ার ছেলে। ও ছিল যেমন দেখতে নিগ্রো টাইপ, তেমনি থাবা। ওর বাবা ফসি মুন্সী কিন্তু পাতলা একহারা চেহারার হলেও দেখতে খারাপ বলা চলে না। কালোর নানা কুঁজো হয়ে চলতেন। বয়স হয়ে গেছে। মুখে সাদাপাকা দাড়ি। এক হাতের, সম্ভবত বাঁ হাতের, কড়ে আঙুল মাংসাশী ছিল। শুনেছিলাম তাঁর নাকি আঙুলহ্যাড়া হয়েছিল। নিশ্চয় কোনো ইনফেকশনে পুঁজ জমে এবং অপারেশন করে মাংস ফেলে দিতে হয়। ফলে শুধু নখ ও হাড় দেখা যেত। আমাদের গলি দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা হাসাহাসি করতাম – ছোটদের যা স্বভাব – বলতাম – পাখির ঠোঁট যাচ্ছে। মনে হয় সব অল্প বয়সের বালকদের মধ্যে ছেলেবেলার কানাই বা কানাহ্ বাস করে। অর্থাৎ চপলতা সহজ গতিতে চলে। ভগবান নারায়ণ বালক বয়সে অর্থাৎ কৃষক রূপে অনেক দুষ্টুমি করতেন। বিশেষ করে তাঁর পদবি হয়ে দাঁড়ায় মাখনচোর। অর্থাৎ মানুষের বাল্যকালের একশ ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। যে-নারায়ণ দুষ্টের দমনের জন্য ধরায় অবতীর্ণ হয়েছেন, বাল্যকালে তিনি বালকদের চপলমতির আদর্শ। ভগবান হলেন চোর। তা আবার পরের ঘরের সঙ্গে নিজের ঘরের মাখনও চুরি। মা খুঁটিতে বেঁধে যত মারে, কানাহ্’র এক কথা : আমি মাখন খাইনি।

ভারতীয় রাগসংগীতে এই কথা নিয়ে অনেক গৎ আছে। ম্যায় নেহি মাখন খায়া। যত বড় বড় ওস্তাদ এই গান গেয়ে আসর মাত করেন। আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। বেশ কিছুকাল আগের কথা। একটা কাজে গেছি দিল্লি। গ্রীষ্মকাল। দিল্লিতে গ্রীষ্ম … কল্পনা করা যায় না দিনের তাপমাত্রা। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। দিনটা পার করে দিলে সন্ধ্যাটা আবার খুব মোহনীয়। শীতল বাতাস। এটা মরু অঞ্চলের চরিত্র। দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা।

একদিন সন্ধ্যায় এক ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে নৈশনিমন্ত্রণ পেলাম। ধ্রুপদী সংগীতের আসর। আর গায়েন পণ্ডিত ভীমসেন যোশী। এ-সুযোগ কি ছাড়া যায়। বিনা পয়সায় শোনার দেখার সুযোগ।

দিল্লিতে নিজামউদ্দীন আউলিয়া, লাল কেল্লা … আরো কত দর্শনীয় স্থান আছে। মান্ডি হাউসে … 888sport live chatকলা একাডেমি … বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ … দেখার শেষ নেই। মাটির নিচে মার্কেট কনৌট-প্লেস সবই দেখার মতো। আর রাইসিনা হিল ও রাষ্ট্রপতি ভবন তো আছেই।

 তো রাতে অকুস্থলে পৌঁছাই। শতরঞ্চির ওপর সাদা চাদর বিছান হলো শ্রোতাদের আসন … কোলবালিশও উপস্থিত। একেবারে রাজকীয় বা জমিদারি কায়দা। মধ্যযুগের মোগল আমলের কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে ওস্তাদ তানসেনের কথা। রাত ন’টার দিকে 888sport live chatী ও সংগতকারগণ আসন গ্রহণ করলেন।

নানা রাগের পর ঠুমরি, বোল : ম্যায় নেহি মাখন খায়া … মা যশোদা যতই ছড়ি চালায় কানাহ্’র এক উত্তর ‘ম্যায় নেহি মাখন খায়া …’, 888sport live chatী মাঝে মাঝে গান থামিয়ে গল্পের উপস্থাপনা করছেন।

পণ্ডিত যশরাজ।

কত বড় গায়েন সেদিন সামনা-সামনি দেখলাম। গোটা দর্শককে মুগ্ধ করেছেন নানা রকম রাগসংগীতে।

রাত প্রায় শেষ।

আসর ভাঙতে আর দেরি নেই। এই সময় তিনি এই ঠুমরিটি ধরেন : ম্যায় নেহি মাখন খায়া।

লোকজন নড়ে বসেন।

একটা মজার লেনদেন শুরু হলো গায়েন ও শ্রোতাদের মধ্যে। পণ্ডিত যশরাজ বলছেন : এক চোর বন গ্যায়া ভগবান … দর্শকদের মধ্যে তুমুল গুঞ্জন।

আমার মনে হলো, কত সহজে তিনি কথাটা বলতে পারলেন! রসে টইটম্বুর না হলে এভাবে রসিকতা করা যায় না। কত ধরনের শ্রোতা আছে।

তো সিকান্দারের কথা। ও আমার একমাত্র সখা। বলরাম, সুদাম এরা কেউ সঙ্গে নেই। আমার ফনুচাচা বয়সে বেশ বড়। তাই ঠিক বন্ধুত্ব হয়নি। গুরুজন রয়ে গেছেন।

রায়মণির ডাঙ্গা থেকে নামলেই সামনে গ্রামের মধ্যপথ। এখানে একপাশে তালগাছ। এরপর বাঁশঝাড়। পাশে একটা ছোট জলাভূমি। বর্ষাকালে লাল শোল মাছের বাচ্চার ঝাক দেখেছি। চাচা বলতেন, এই বাচ্চার নিচে মা-শোল মাছটা আছে। পাহারায়। ছিপ দিয়ে ধরা যেতে পারে। এই ছিপ আমাদের গ্রামে উচ্চারণ হতো সিপ।

একবার সিকান্দারের সঙ্গে একটা বাজি ধরি। কথাটা হলো বৃষ্টি নিয়ে। সিকান্দার বলল, কাল বৃষ্টি হবে না।

আকাশের অবস্থা দেখে মেঘের আনাগোনা দেখে আমি বললাম : বৃষ্টি হবে।

: বাজি? বলল সিকান্দার

: ঠিক আছে বাজি।

সিকান্দার বলল : যে হারবে সে ছ-পয়সা দেবে।

তা-ই সাব্যস্ত হলো। পরদিন সারাদিন আমি মনে মনে গাইছি : আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই …

আকাশে মেঘ বারবার ঘনিয়ে আসে … আল্লা মেঘ দিলো, কিন্তু পানি দিলো না।

আমি হেরে গেলাম। পরদিন সকালে সিকান্দার হাজির।

– আমার ছ’পয়সা দাও।

– আমি পয়সা পাব কোথায়?

বলি : ঠিক আছে, জোগাড় করে দেব।

সেদিন মা’র কাছ থেকে দু-পয়সা আদায় করি, ঘ্যানঘ্যান করে। মা দুটো পয়সা দেয়। দু-পয়সার কয়েন। দু-পয়সা হতো অ্যালুমিনিয়ামের। এক পয়সা হতো তামার। আবার ফুটো পয়সাও ছিল। অর্থাৎ মাঝখানে গোল ছিদ্র।

বিকেলে সিকান্দারকে ডেকে দু-পয়সা দিই। বলি, আস্তে আস্তে পাবি। মায়ের কাছ থেকে পয়সা বের করা কঠিন। কেন নিচ্ছ, কী করবে – এ-রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আর যা বলি সবই মিথ্যে।

এখন বুঝতে পারছি মাখনচোর কৃষ্ণের বিপদের কথা। আমার মা মা-যশোদার চেয়ে কিছু কম ছিলেন না।

 শেষ পর্যন্ত দু-পয়সা দু-পয়সা করে অনেক কষ্টে মহাজন সিকান্দারের ঋণমুক্ত হই।

আজ এসব কথা ভাবলে শুধু মন খারাপ হয়। অপরাধের জন্যে নয় … সিকান্দারের কথা ভেবে। জানি না সে কি ইহজগতে আছে, না নেই। সেই ঋণ শোধের পর সিকান্দারের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

দেশভাগের পর করিমভাই মহম্মদপুরে থাকতেন শুনেছি। কিন্তু সোলেমানভাই, সেকান্দার আর রহিমের কোনো খোঁজ পাইনি। হয়তো ওরা মহম্মদপুরেই থাকত।

যোগাযোগ না থাকায় ওরা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

ওদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার কারণ আমরা হুগলি ছেড়ে গিয়ে পড়ি বাংলার শেষপ্রান্ত চট্টগ্রামে। ওখানে এক দশক কাটিয়ে আমরা 888sport appয় স্থিতি লাভ করি। ফলে ওদের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন।

স্থান আর কাল দু-ভাই যমজ। একটা ছাড়া আর একটা অস্তিত্বহীন।

এবার আসি একটা নতুন বিষয়ে। বিষয়টা খুব সুখজনক নয়। কারণ এটা হলো আমাদের গ্রামের ভাগাড়ের কথা। ভাগাড় মানে চিত হয়ে পড়ে থাকা গরু-ছাগলের পঞ্জরাস্থি।

কাক-চিল-শকুনের আনাগোনা। কাক-চিল প্রায় দেখা যায়। কিন্তু শকুন অনেক উঁচু আকাশ থেকে তীক্ষ্নদৃষ্টি রাখে কখন কোনো মৃত জন্তু বা পাখি বা হাঁস-মুরগি ভাগাড়ে পড়বে। অর্থাৎ ভাগাড় মানে প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে থাকার জায়গা। এখানে সৎকারে লাগবে কাক-চিল-শকুন। শকুন ওপর থেকে দল বেঁধে নজর রাখে। খাবারের দেখা পেলেই ওপর থেকে ডানা গুটিয়ে রকেটের বেগে নামতে থাকে। তারপর মাটি ছোঁবার আগে পাখা দুটো মেলে প্যারাসুটের কাজ করে নিরাপদে অবতরণ করে।

শকুনের এই তীব্রবেগে নিচে নামার চিত্রটা আমাকে খুব আনন্দ দিত। হয়তো অন্যদেরও দেয়!

এই ভাগাড়টা ছিল আমাদের ভিটের পাশের বাঁশবাগানের অদূরে আর একটা বাঁশবাগান ও 888sport app কয়েকটা গাছের মধ্যে। মাঝখানটা সামান্য ফাঁকা। ভাগাড়ের জন্য উপযুক্ত জায়গা। লোকজনের চোখকে পীড়া দেবে না।

এই ভাগাড়ের পাশে দু-একটা কুকুরকেও ঘুরতে দেখা যেত। মৃতদেহের ভাগিদার। কাক-চিল-শকুন এদের শত্রু। ওরা তেড়ে যায়। বাকিরা সামান্য দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। অনেক শকুন ঝাঁক বেঁধে এলে কুকুরও ভয় পায়।

আমাদের ভাগাড়টা আমাকে খুব টানত। একা একা ঘুরতাম – বাঁশপাতা মাড়িয়ে। কেমন একটা গা-ছমছম করা অনুভূতি জাগত। বরং আমার কবরস্থানে কোনো ভয় লাগত না। এমনটা কেন হয় তা বলতে পারব না।

এ-রকম ফাঁকা পাওয়া ছাড়া অন্য সময় দু-একটা কুকুরকে ঘুর ঘুর করতে দেখতাম। তারা রাউন্ড দিত। শুঁক শুঁক করে নিত ঘ্রাণ। আমরা যেমন শুঁটকি মাছের ঘ্রাণ নিই।

অবশ্য বলে রাখা ভালো, আমাদের অঞ্চলে শুঁটকির খুব কম চল ছিল। চারদিকে জলাভূমির অভাব। রাঢ় অঞ্চলের মধ্যে ভালো জায়গা হলেও মূল চরিত্রের বাইরে যায়নি। শুঁটকি পাওয়া যেত কম। দামও ছিল চড়া। তবে দেখতাম প্রায় ঘরে নোনা ইলিশ করে শুঁটকির বিকল্প কাজ চালাত।

গ্রামে বেশিরভাগ মানুষ কুঁচো চিংড়ি বা ঘুসে মাছের শুঁটকি খুব পছন্দ করত। শুঁটকি ভেজে নিয়ে সর্ষের তেল ও পেঁয়াজকুচি মাখিয়ে সুন্দর ভর্তা করত। আর এদিন সবাই ভাত টানত বেশি। বিশেষ করে দুপুরের খাবারে। রাতে সাধারণত শুঁটকি মাছ রান্না হয় না, গুরুপাক বলে। তো ভাগাড়ের গল্প। গ্রামের মাঝখানে বলে এটাকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারত না। গ্রামের মাঝখান দিয়ে গেলে এর পাশ দিয়ে যেতে হবে। আর টানতে হবে দুর্গন্ধময় বাতাস। অনেকে নাকে কাপড় চেপে জায়গাটি পার হয়।

একদিন আমি একা একা কড়ে ডাং হাতে ঘুরছি। খেলার সাথি কেউ নেই। ছোটভাইয়েরাও অনুপস্থিত। হাঁটতে হাঁটতে কখন ভাগাড়ের কাছে চলে এসেছি। দেখি কিছু একটা মরদেহ শকুন আর কুকুরে টানাটানি করছে। আমি কৌতুকবশে একটা ঢিল ছুড়ে মারি। আর তাক করে না মারলেও ঢিলটা কুকুরের মাথায় লাগে।

আর যাই কোথা! কুকুর খাবার ফেলে ঢিল মারার উৎস আমার দিকে তেড়ে আসে। আমিও দে দৌড়। কিন্তু কুকুরটা নাছোড়বান্দা, পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। আমি দেখলাম কম্ম কাবার। কুকুরেই করবে সাবাড়। সেই নজরুলের লিচু চোরের মতো। কুকুরটা খুব কাছে চলে এসেছে। প্রায় কামড় বসায় আর কি! আমি বাধ্য হয়ে হঠাৎ করে থেমে যাই। আর হাতের ডাংটা তুলে বলি, তবে রে শালা … আর ম্যাজিকের মতো কাজ করে প্রতিরোধ। কুকুরটা থেমে গেল। আর ভড়কে গিয়ে পিছু ফিরে ফেলে আসা আহারের লোভে উল্টো দৌড় দিলো।

 যেন প্রাণ এলো ধড়ে। আমি জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকি। আর নিজের বীরত্বে নিজেকে সাবাশি দিই। এটা আমার জীবনে একটা বড় শিক্ষা। বিপদে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধে যেতেই হবে। শত্রু যেমনই হোক।

অনেক দশক পর গ্রামে গিয়ে সেই ভাগাড়ের কোনো চিহ্ন পাইনি। সেখানে ঘন বসতি হয়ে গেছে। বাঁশঝাড়ও উধাও। বর্তমানে ভাগাড় কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে তার তথ্য নিতে ভুলে গেছি। কিন্তু আমার পেছনে কুকুরের সেই ছোটার দৃশ্য এখনো মনের মধ্যে গুল-পেরেকের মতো বিদ্ধ হয়ে আছে।

ফুটবল আমাদের গ্রামে খুব জনপ্রিয় খেলা ছিল। আমাদের রায়মণির ডাঙ্গা পার হয়েই মাদ্রাসার দিকে যেতে একটা বড় চাতাল ছিল। তার ডানে কিছু গাছপালা আর বাঁশঝাড়। এই ছোট ফাঁকা জায়গাটা ছিল অপেশাদার ছোটদের বল খেলার মাঠ।

আর বল?

টেনিস বল নয়। এমনকি রাবারের বলও নয়। তালপাতার বল। নিজ হাতে তৈরি। মানে আমাদের খেলোয়াড়দের হাতে তৈরি। তৈরি কথাটা ঠিক হলো না, হাতে বোনা। যেমন করে পাটি বোনে তেমন। আমার চাচা জিলানি জানতেন। অন্য বড়রাও এই বল তৈরি করতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বল গোল হতো না, হতো চারকোনা। লুডোর ছক্কার বড় সংস্করণ। চারকোনা নয় তো কী হয়েছে, তাতেই আমাদের হুল্লোড়।

আমি ছোট বলে সামনে খেলতে দেওয়া হতো না। আমি বেশিরভাগ হতাম গোলকিপার। খুব যে একটা দক্ষ ছিলাম তা নয়। তবে কাজ চলত।

খেলোয়াড়দের সবার নাম মনে পড়ছে না। জয়নাল, সোলেমানভাই, আমার চাচা জিলানি, মোজাম্মেল চাচা … আর সবার নাম মনে আসছে না। কত যুগ আগের কথা। আর এমনিতে আমার 888sport app download for androidশক্তি কম। 888sport app download for androidশক্তি প্রখর ছিল বাবার (888sport live footballিক শওকত ওসমান – আসল নাম শেখ আজিজুর রহমান)।

বাবা বিরাশি বছর বেঁচে ছিলেন। পঁচাত্তর বছর বয়সে আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন; রাহনাম শিরোনামে। দৈনিক জনকণ্ঠে প্রতি শুক্রবার 888sport live footballপাতায় ছাপা হতো। তিনি আত্মজীবনী শেষ করে যেতে পারেননি। লেখা অংশ ছাপা হয় দু-খণ্ডে। ৮০০ পৃষ্ঠার বই, কিন্তু তিনি ছেলেবেলা আর কলকাতার জীবন শেষ করে পূর্ববাংলায় বদলি হয়ে বাকি জীবনের কথা বলার সুযোগ পাননি। এত সূক্ষ্ম সব কথা বলে গেছেন যে, তাঁর মূল কর্মজীবন 888sport appsে প্রবেশ করতেই পারেননি। তাঁর জীবনী শেষ হলে বাংলার ইতিহাসের একটা ক্রান্তিকালের সব খবর পাওয়া যেত। আমরা সেই ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হলাম। বাল্যের 888sport sign up bonus তাঁর এত মনে জমা ছিল যে, দ্রুত এগোতে পারেননি।

তো বল খেলা। আমাদের সেই চারকোনা তালপাতার বল নিয়ে প্রবল উৎসাহে খেলা চলত। এখনো ভাবলে মনটা কেমন করে ওঠে সব সহখেলোয়াড়দের জন্য। তারা আজ কেউ এই ধরাধামে নেই। গোলকিপার হিসেবে আমি এখনো আছি, কিন্তু জালে বল প্রবেশ করানোর খেলোয়াড়রা সব অফসাইডে চলে গেছে। ভুল বললাম, সবাইকে লালকার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। রেফারি বড় বেশি কড়া।

গ্রামের দিঘির পশ্চিম পাড়ে জাকিরপাড়ার সামনে আর একটি ফুটবল মাঠ ছিল। এখানে বড় খেলাগুলো হতো। একবার দু-গ্রামের মধ্যে ফাইনাল খেলা হয়। সবলসিংপুর হারতে বসেছে তো ক্ষুব্ধ জনতা হুড়মুড় করে মাঠে ঢুকে পড়ে। খেলা পণ্ড হয়ে যায়। তখন থেকে আমাদের সবলসিংহপুরের আর একটি নামায়ন যুক্ত হয় : হুড়মো। অনেকে আমাদের গ্রামকে হুড়মো বলে ভালো চেনে।

বড়দের খেলা হলে আমি আর চাচা ওই মাঠে খেলা দেখতে যেতাম। তাদের খেলার পদ্ধতি দেখে শেখার চেষ্টা করতাম।

তো আমাদের সেই তালপাতার বলের খেলা : একদিন খেলার মধ্যে জয়নালের সঙ্গে কার যেন লেঙ্গি মারামারি হয়। জয়নাল মুন্সিপাড়ার ছেলে। চোখদুটো বড় বড়, রাগী চেহারা। সে খেলায় ভালো না করতে পেরে রাগের চোটে আমি গোলে বল ধরতে গেলে খুব জোরে আমার হাতে লাথি মারে। বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে লাগল। আমি যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠলাম। চাচা আর অন্যরা জয়নালকে বকাবকি করতে থাকে। ছোট ছেলের হাতে মারা …

এদিকে ওই সময় আমার মা রায়মণির ডাঙ্গায় মনে হয় বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি আমার কান্না শুনতে পান।

খেলা শেষ। আমি চাচার সঙ্গে ঘরে ফিরছি। রায়মণির ডাঙ্গায় মা আমাকে ধরলেন। কাঁদছিলি কেন? কড়া প্রশ্ন। আমি বলি সব বৃত্তান্ত। মা কড়া হুকুম দিলেন : বড়দের সঙ্গে তুমি খেলবে না।

এখানেই সবলসিংহপুরে আমার বল খেলার ইতি।

তবে চিকে খেলা বহাল ছিল। চিকে খেলা 888sport appsে হলো দাড়িয়াবান্ধা। শীতকাল এই খেলার উপযুক্ত সময়। অন্য সময় খেলা যায় না। বৃষ্টি-বাদলের জন্য। শুকনো সময় বলতে বাংলায় শীতকাল আদর্শ। এই সময় বাংলায় নানা রকম পিঠে-পার্বণ হয়। নতুন ধান, হৈমন্তি ধান ওঠে। কৃষিপ্রধান গ্রামগুলোয় আনন্দের সময়। নবান্ন উৎসব হয়। যত উৎসব এই সময়। পালাগান, যাত্রা – সারা রাত ধরে … হ্যাজাক বাতি জ্বলছে। অনেক মথ ও আলোয় উত্তেজিত হওয়া কীটপতঙ্গের প্রাণ বিসর্জন হতো। শীতকাল বাংলায় আদর্শ সময় সব রকম উৎসবের। আর সকালবেলা হ্যাজাক বাতির নিচে দেখা যেত হাজার কীটপতঙ্গের আত্মাহুতি। এ এক আজিব খেলা। আলোর আকর্ষণে কীটের প্রাণদান। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তবে মুক্তি। তফাৎ যাওয়ার উপায় নেই। এ এক অদ্ভুত নিয়তির খেলা।

আজ থেকে শ’দেড়েক বছর আগে বাংলার সর্বত্র বাঘের বিচরণ ছিল। আমাদের গ্রামেও বাঘ আসত। তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো বাঘমারির খালের অস্তিত্ব। এই খালের নাম হয়েছে বাঘ মারার ঘটনা নিয়ে। সে এক ট্র্যাজিক ঘটনা। বীরত্ব আছে বাঘ মারার। কিন্তু বলি দিতে হয়েছে তরতাজা ছয়টি প্রাণ। এরা ছিল সহোদর। এরা ছিল সাত ভাই। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধে ছ’জন প্রাণ হারান। এক ভাই এই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে বেঁচে ছিলেন। তাঁর মুখের এক পাশে বাঘের থাবার আঁচড় ছিল। তাই কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতেন। দাদির মুখে এই গল্প শুনেছি। বাবা 888sport live footballিক শওকত ওসমান এই ঘটনা নিয়ে একটি কিশোর উপযোগী গল্পও লেখেন।

গ্রামে ধান কাটার সময় এক ভাইকে বাঘ আক্রমণ করলে বাকি ছ’ভাই কাস্তে নিয়ে বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই লড়াইয়ে ভাইদের জিত। তবে ছ’ভাই বলি হয়ে যান। একজন গল্প বলার জন্যই বেঁচেছিলেন। এ যেন কলিঙ্গ যুদ্ধ। শত ভাইকে হত্যা করে অশোকের বিজয়।

গ্রামে বাঘ এলে তার পেছন লাগত সাহসী শেয়াল। তাকে বলা হয় ফেউ। এই ফেউ বাঘ এলে দীর্ঘ টানা শব্দ উচ্চারণ করে সবাইকে সতর্ক করতো। আমি দু-একবার ফেউয়ের ডাক শুনেছি। তবে বাঘের ভয় না পেলেও বুকে একটা কাঁপন অনুভব করতাম।

দাদি বলতেন, ওই শোন, ফেউ লাকডাচ্ছে – মানে রা কাড়ছে। গ্রামের ভাষা এভাবে তৈরি হয়। আমার দাদি লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু ছিলেন খুব ধীশক্তিসম্পন্না। তাঁর গর্ভেই তো জন্ম নিয়েছেন শওকত ওসমান। বাবা আমাদের বলেছিলেন, তাঁর জননী 888sport alternative linkে তাঁর নিজের মা-ই ছিলেন মহিলাদের সংগ্রামের প্রেরণা। দাদির অমলিন হাসিটুকু আমি আজো ভুলতে পারিনি। মনে হয় যেন এখনি ডাক দেবেন, দাদা, এটু শোনো … তিনি আমাকে দাদা বলতেন। আমি তাঁর বড়ভাই। অনেক সম্মান দিতেন এই পৌত্রকে। বড় পৌত্র। বংশের প্রথম ঢালি। কৃষিপ্রধান সমাজে মানুষ অনেক পুত্রসন্তান চাইত। জায়গাজমি রক্ষা করতে হবে। মারামারি লাগলে ঠেকাতে হবে। একজন পুত্রসন্তান মানে একজন সোলজার।

আমাদের গ্রামে এখন আর ফেউয়ের ডাক শোনা যায় না। তবে শেয়াল আছে। [ক্রমশ]