888sport sign up bonusতে সতত তিনি

‘মাজহার, জেগে আছো? কথা বলা যাবে? অনেক দিন কথা হয় না!’

রাত বারোটা থেকে দুটার মধ্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের পাঠানো এমন অসংখ্য বার্তা এখনো আমার ফোনের ইনবক্সে জমা আছে। আমারও যখন কথা বলতে ইচ্ছে হতো, লিখতাম – ‘স্যার, জেগে আছেন? কথা বলতে চাই।’

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরতি মেসেজ – ‘আছি’, ‘ফোন করো।’

কখনো আবার মজা করে – ‘আভি!’

অতিমারির কাল থেকে এভাবেই স্যারের সঙ্গে বেশিরভাগ সময়ে কথা হতো, রাত বারোটার পর। প্রায় প্রতিদিন। আজ কতজন চলে গেলেন? দেশের কোভিড পরিস্থিতি কেমন? পরিচিত কে কে আক্রান্ত হলেন এবং তাদের সর্বশেষ আপডেট। এসব নানা বিষয়ের পাশাপাশি ভাবির জন্য অসম্ভব টেনশন করতেন স্যার। ভাবি ক্যান্সার সারভাইভাল বলে তিনি আক্রান্ত হলে কী অবস্থা হবে – এরকম রাজ্যের চিন্তায় স্যার উদ্বিগ্ন থাকতেন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই কথা হতো।

কোভিডের পরে গভীর রাতের আলাপচারিতা কিছুটা কমলেও সম্পর্কের উষ্ণতা একটুও কমেনি। প্রয়োজন হলে, আর প্রয়োজন না হলেও, মাঝেমধ্যেই স্যারের বার্তা আসত, অথবা আমিই লিখতাম।

রাতের নীরবতা ভেঙে স্যারের সেই পরিচিত গলা, আজো মনে হয়, যেন ঠিক শুনতে পাই।

স্যার রাত জেগে লিখতেন, ক্লাসের খাতা দেখতেন। বলতেন, ‘দিনে এসব কাজ করার সময় পাই না।’ আমারও লেখালেখি যৎসামান্য যা করি সেটা রাতেই। দিনে কোনো কাজে স্যারকে ফোন করলেও বলতেন, ‘মাজহার রাতে কথা বলি!’

যদি বলতাম, ‘স্যার বিষয়টি জরুরি। এখনই বলতে হবে।’ স্যার বলতেন, ‘বলো, দ্রুত বলো।’

দিন ছিল স্যারের মূল কাজের সময়। একটা মুহূর্ত তিনি বসে থাকতেন না। সব সময়ই থাকতেন একটা গতির মধ্যে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শিক্ষক এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রিয় ছাত্রকে 888sport app download for android করতে গিয়ে বলেন, ‘মনজুরের হাঁটা দেখলে মনে হয় সে একটা কাজ শেষ করে যেন আরেকটা কাজের জন্য ছুটে চলেছে।’

মেসেজ না দিয়ে সরাসরি কখনো স্যার বা আমি কেউই ফোন করতাম না একে অন্যকে, দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। অক্টোবরের পর স্যারের ফোন থেকে আর খুদে বার্তা আসে না। আর আমাদের ফোনে কথা হয় না।

৩ অক্টোবর রাত ১টা ১৬ মিনিটে খুদে বার্তা নয়, সরাসরি ফোন করলেন স্যার। খুবই এক্সাইটেড তিনি। প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ সেটা পেয়ে ফোন করে বলেন, ‘মাজহার, গুড নিউজ। আমি ওই কাগজগুলো পেয়েছি। কাল তোমাকে ফটোকপি করে দেব।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আমি এসে ফটোকপি করে আপনাকে অরিজিনালগুলো ফেরত দিয়ে যাব।’

স্যার বললেন, ‘না, আমি সকালে ইউল্যাবে যাব। আমাদের ওখানে ভালো ফটোকপির ব্যবস্থা আছে। আমি কপি করে এনে তোমাকে খবর দিলে এসে নিয়ে যেও।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। এরপর আরো কিছু বিষয় মিলিয়ে ছয় মিনিট কথা হয় সেদিন এবং এটাই যে আমাদের রাতের শেষ কথোপকথন হবে কে জানত!

দুই

৩ অক্টোবর, সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কমলের ফোনে জানলাম, মনজুর স্যার ইউল্যাব যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে ড্রাইভার সাতমসজিদ রোডের শেষ মাথায় একটা ক্লিনিকে নিয়ে এসেছে। কবি মারুফুল ইসলামও সেখানে আছেন। শুনে চকিতে মনে পড়ল, গতকালও স্যারের সঙ্গে একটা কাজে বসুন্ধরায় গেলাম। যাওয়া-আসার পথে গাড়িতে বসে কত কথা হলো। রাত ১টা ১৬ মিনিটে ছয় মিনিট কথা হলো স্যারের সঙ্গে। এর মধ্যে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর শুনে আমি হতভম্ব। দ্রুত ক্লিনিকের উদ্দেশে রওনা হলাম। আমার গাড়ির ড্রাইভার নেই। রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে ছুটে গেলাম ইমার্জেন্সিতে।

দেখলাম, ছোট্ট একটা রুমকে ইমার্জেন্সি বানানো হয়েছে। সেখানে একটাই বেড। স্যার আধশোয়া। শার্ট ভিজে গেছে ঘামে। বুকে এবং পিঠে ব্যথার কথা বলছেন। ডিউটি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলে জানালেন, হার্ট অ্যাটাকের কনফারমেশন পরীক্ষা করতে রক্ত পাঠিয়েছেন ল্যাবে। এখনো রিপোর্ট আসেনি। আমি বললাম, ‘ভাই একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিন প্লিজ। রিপোর্ট পজিটিভ এলেও তো এখানে কোনো চিকিৎসা হবে না। কার্ডিয়াক চিকিৎসা হয় এরকম কোনো হাসপাতালে দ্রুত এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে।’ ডিউটি ডাক্তার কোনো একজনকে ডেকে অ্যাম্বুলেন্সের কথা বললেন।

এবার স্যারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখেই মনে হলো তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘মাজহার, তুমি চলে এসেছ? শোনো, তোমার কার্ডিওলজিস্ট বন্ধুকে এখনই আসতে বলো।’

আমি বললাম, ‘স্যার ও এখানে এসে তো কিছুই করতে পারবে না। আমাদের দ্রুত বড় কোনো হাসপাতালে যেতে হবে।’ স্যারকে বললাম, ‘স্যার, ল্যাব এইডে যাবেন?’

সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘হ্যাঁ, ল্যাব এইডেই চলো। আর এখনই শামিমকে ফোন করো।’ ডা. শামিম ল্যাব এইডের এমডি। স্যারকে অসম্ভব 888sport apk download apk latest version করেন। স্যার ছোটখাটো সমস্যা হলে ল্যাব এইডেই যান। সে-কারণেই আমারও ল্যাব এইডের কথাই মনে হয়েছে প্রথম। তাছাড়া কার্ডিওলজিস্ট ডা. বরেণ চক্রবর্তীও সেখানে আছেন। পরিচিত আরো অনেকেই আছেন। সব থেকে বেশি যে-জিনিসটা ওই মুহূর্তে কাজ করেছে, সেটা হলো, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো যাবে। শুক্রবার অন্য কোথাও ইমার্জেন্সি সার্ভিস না-ও পেতে পারি।

আমার কাছে ডা. শামিমের ফোন নম্বর নেই। স্যার বললেন, ‘আমার মোবাইল থেকে ফোন করো।’ স্যারের ফোন ছিল হান্নানের কাছে। হান্নানও খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। পুরো নাম আবদুল হান্নান। ইংরেজি বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তিনি। স্যারের খুবই ঘনিষ্ঠ। তার কাছ থেকে ফোন এনে স্যারকে দিলাম। স্যার নিজেই ফোনের লক খুলে দিলেন। আমি ডা. শামিমের ফোন নম্বর বের করে তাকে ফোন করলাম। পরপর দুবার রিং হলো। ধরলেন না। আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। তৃতীয়বারে পেয়ে গেলাম ডা. শামিমকে। তিনি সব শুনেই বললেন, ‘দ্রুত স্যারকে নিয়ে আসুন। আমি এখনই হাসপাতালে বলে দিচ্ছি। কেউ একজন আপনাকে ফোন করবে।’ স্যারকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর অল্প সময়ের মধ্যেই ল্যাব এইডের উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাস্তা থেকে ফকরুল আলম উঠলেন অ্যাম্বুলেন্সে। খবর পেয়ে তিনিও আসছিলেন ক্লিনিকে।

ল্যাব এইডের কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে সব ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ছিল। ইসিজি করেই ডাক্তার জানালেন, ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। দ্রুত প্রোসিডিউরে যেতে হবে। প্রোসিডিউর মানে হচ্ছে এনজিওগ্রাম করে ব্লক ছাড়াতে হবে। ফ্যামিলি মেম্বার কে আছেন? কিছু কাগজপত্রে সাইন করাতে হবে।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন ডাক্তার এবং এটাও বললেন, এই পরিস্থিতিতে দুনিয়াজুড়ে এটাই ট্রিটমেন্ট প্রটোকল।

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কী বলছেন ডাক্তার এসব! গতকালের সুস্থ মানুষটার হার্ট অ্যাটাক? নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘ওনার ফ্যামিলি মেম্বার এই মুহূর্তে কেউ নেই। ভাবি কয়েকদিন আগে আমেরিকা গিয়েছেন একমাত্র পুত্রের সঙ্গে সময় কাটাতে। আমরাই এখন ফ্যামিলি মেম্বার।’ অধ্যাপক ফকরুল আলম পাশেই ছিলেন। স্যারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিই কাগজপত্রে স্বাক্ষর করলেন। দ্রুত সিসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো স্যারকে। এর মধ্যেই ইমার্জেন্সিতে থাকতেই স্যার আমাকে বললেন, ‘তোমার ভাবিকে কিন্তু জানাবে না।’

কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব! ভাবিকে তো অবশ্যই জানাতে হবে। এখন আমেরিকায় মধ্যরাত। আমি সাহস পেলাম না ভাবিকে ফোন করতে। এই খবর আমি কীভাবে দেব তাঁকে? ফকরুল ভাইকে ফোন করতে বললাম। তিনি ফোন করলেন। এত রাতে ফোন ধরার কথা নয়। সম্ভবত ফোন সাইলেন্ট করা এবং সেটাই স্বাভাবিক।

আমি স্যারের ফোন থেকে শাফাককে ফোন করলাম। শাফাক স্যারের একমাত্র পুত্র। শাফাককে পেয়ে গেলাম। আহা! মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে বাবার এই খবর না জানি ছেলেটাকে কতটা কষ্ট দিয়েছে। আমি যেন ওই মুহূর্তে ওর কষ্টটা অনুভব করছিলাম।

শাফাক মনোযোগ দিয়ে সব শুনল। ফোন রাখার আগে বলল, ‘আঙ্কেল, আমাকে আপডেট দেবেন। আমি জেগে আছি।’ ওর সঙ্গে কথা হলো, ভাবি যেহেতু অসুস্থ, কাজেই এত রাতে ওনাকে জাগিয়ে এই খবর না দেওয়াই ভালো হবে। সকালে শাফাক তাঁকে বলবে।

888sport appয় স্যারের একমাত্র বোন থাকেন। বেবি আপা। ফকরুলভাই এবং আমি দুজনেই তাঁকে ফোন করলাম। কিন্তু ফোন ধরছেন না। ড্রাইভার আব্বাস যেহেতু আপার বাসা চেনে, তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো আপাকে আনতে। পরে শুনেছি তিনি ফোন বাসায় রেখে বাইরে গিয়েছিলেন।

এর মধ্যে স্যারকে ক্যাথল্যাবে নিয়ে যাওয়া হলো। এনজিওগ্রাম শেষ করে সার্জন আমাদের ডেকে কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখালেন স্যারের মেইন আর্টারিতে একশ পার্সেন্ট ব্লক। একই আর্টারিতে আরো একটা ব্লক। সেটাও প্রায় ৭০ পার্সেন্ট। আমরা সম্মতি দিলে ব্লক ক্লিয়ার করে স্টেন্ট লাগাতে হবে। এই প্রসিডিওরে কী কী রিস্ক ফ্যাক্টর আছে সেগুলো ডাক্তার আমাদের জানালেন। যেমন ম্যাসিভ অ্যাটাকের ফলে হার্টের ফাংশন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। ক্রিয়েটিনিন বেশি। ব্লাডপ্রেসার কম। মেডিসিন দিয়ে ব্লাড প্রেসার বাড়ানো হয়েছে।

অন্য কোনো অপশন না থাকায় আমরা সম্মতি দিয়ে দিলাম। স্টেন্টিং হলো। শাফাককে কিছুক্ষণ পরপর আপডেট দিচ্ছিলাম। এর মধ্যে ভাবির ফোন। ভাবিকে বিষয়টা জানানো যে কতটা কষ্টকর সেটা লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। ফকরুলভাই এবং আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ পরপর কথা হতে থাকল। সারারাত ভাবি আর ঘুমাননি। ভাবি নিজেই অসুস্থ। এই অবস্থায় ঘুমাবেনই-বা কীভাবে? ভাবিকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লাম।

সফলভাবে স্টেন্টিং শেষ করে কার্ডিয়াক সার্জন আবার আমাদের কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখালেন। পাশাপাশি এটাও বললেন, আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। ব্লাডপ্রেসার কম। মেডিসিন দিয়ে বাড়িয়ে রাখা হয়েছে এবং ডাই দেওয়ার ফলে ক্রিয়েটিনিন বেড়ে গেছে। ভাবি এবং শাফাকের সঙ্গে কয়েক দফা কথা হলো। ভাবি উদ্বিগ্ন হয়ে বারবার বলছিলেন, তিনি দেশে নাই আর এমন একটা ঘটনা ঘটল। তিনি থাকলে হয়তো এটা ঘটত না। কী সান্ত্বনা দেব তাঁকে! এসব ক্ষেত্রে কোনো সান্ত্বনাই যে স্বস্তি আনতে পারে না সে-অভিজ্ঞতার ভেতর আমাকে তো অনেকবার যেতে হয়েছে।

এর মধ্যে বেবি আপা চলে এসেছেন। তাঁর চেহারার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। সবকিছু শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। চোখ ভেজা। আপা আসায় আমি কিছুটা স্বস্তি পেলাম।

করোনারি কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যাওয়ার পর গেলাম স্যারকে দেখতে। স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছেন। প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘তোমার ভাবিকে জানাওনি তো?’

আমি বললাম, ‘ভাবিকে জানিয়েছি।’

‘সানজিদাকে জানিয়েছ? তোমাকে তো আমি নিষেধ করেছিলাম মাজহার! এই কাজটা কেন করলে?’

‘স্যার, এত বড় একটা বিষয় ভাবিকে না জানালে কি হয়?’

স্যার এবার বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটাও কথা। কিন্তু তোমার ভাবিকে বলবে সে যেন চলে না আসে। মাত্র কদিন আগেই গিয়েছে। তুমি তো জানো ও নিজেই অসুস্থ।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আমি বলব। শাফাকের সঙ্গেও কথা হলো। এত লক্ষ্মী একটা ছেলে আপনাদের।’

স্যার খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি শাফাককেও জানিয়েছ?’

‘জি স্যার। ওকেও তো জানাতে হবে। তাছাড়া ভাবি জানলে তো শাফাক জানবেই।’

স্যার বুঝলেন বিষয়টা। এর মধ্যে ডা. বরেণ চক্রবর্তী চলে এলেন। স্যারের সঙ্গে কথা বললেন। সব ঠিক থাকলে দুদিন পরই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। শুনে স্যার খুবই খুশি হলেন। আমি বরেণদাকে একটু দূরে ডেকে বললাম, ‘ভাবি দেশে না আসা পর্যন্ত আমরা স্যারকে হাসপাতালেই রাখতে চাই। কেবিনে আরো দু-একদিন রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ হলে বাসায় নিতে চাই।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনারা চাইলে কেবিনে রেখে দেব।’

বেরিয়ে আসার আগে স্যার আবারো আমাকে বললেন, ‘তোমার ভাবি যেন চলে না আসে। বিষয়টি সিরিয়াসলি দেখবে।’

বেবি আপা, কায়সারভাই, ফকরুলভাই, মারুফভাই স্যারকে দেখে এলেন। ভাবি এবং শাফাকের সঙ্গে স্যার ফোনে কথা বললেন। সারাদিন ভালো থাকলেন। ডা. বরেণ কিছুক্ষণ পরপর আপডেট দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই ফোন করছেন। অনেকে আসছেন হাসপাতালে খোঁজখবর নিতে।

সন্ধ্যার পর আবার গেলাম দেখতে। রাতে স্যারের ভাতিজিজামাই নাজমুল এবং হান্নানভাই থাকবেন হাসপাতালে। বেবি আপাসহ আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না। রাত ১২টায় আবার একাই হাসপাতালে চলে গেলাম। আমার কিছুই করার নেই। তারপরও গেলাম। নাজমুল ও হান্নানের সঙ্গে বসে থাকলাম। নানা গল্প হলো। সব গল্পই ঘুরেফিরে স্যারকে নিয়ে। এর মধ্যে সিসিইউতে উঁকিঝুঁকি মেরে খোঁজখবর নিলাম। স্যার ভালো আছেন। ঘুমাচ্ছেন। রাত ৩টায় বাড়ি ফিরে এলাম।

পরদিন সকাল থেকে সামান্য কিছু কমপ্লিকেশন দেখা দিলো। ফুসফুসে পানি চলে এলো যা ম্যাসিভ অ্যাটাকের পর প্রধান কমপ্লিকেশন। এছাড়া ক্রিয়েটিনিনও আগের থেকে আরেকটু বেড়েছে। আমি, নাসের, কমল গেলাম দেখতে। স্যার খুব স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন। আবারো বললেন, ‘তোমার ভাবি যেন না আসে।’

দ্বিতীয় কথা হলো, ‘আমাকে বাসায় কখন নিয়ে যাবে?’ প্রথম প্রশ্নের উত্তর কী দেব? দ্বিতীয়টার উত্তর দিলাম। ‘স্যার, এই তো আর দুই-একটা দিন।’

৫ই অক্টোবর ফুসফুসের সংক্রমণ আরো বেড়ে গেল। নিয়মমাফিক কার্ডিওলজিস্টদের পাশাপাশি চেস্ট স্পেশালিস্ট এবং নেফ্রোলোজিস্ট দেখছেন। মনোচিকিৎসক এবং লেখক মোহিত কামাল প্রতিদিন সকাল-বিকেল স্যারকে দেখতে আসছেন। তিনি এই হাসপাতালেই বসেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘চেস্ট স্পেশালিস্ট আলী হোসেনকে দেখানো যায় কি না?’ আলী হোসেন খ্যাতিমান চিকিৎসক এবং মোহিত কামালের বন্ধু। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ফোন করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথা বললেন। ওইদিনই বিকেলে তিনি এসে দেখলেন। কিছু মেডিসিন যোগ-বিয়োগ করলেন। সমস্যা হলো, ক্রিয়েটিনিন বেশি এবং ব্লাড প্রেসার কম থাকায় অনেক মেডিসিন দেওয়া যাচ্ছিল না। আমার অনুরোধে সিনিয়র নেফ্রোলোজিস্ট ডা. রফিকুল আলমকেও ডাকা হলো। সার্বক্ষণিক তিনজন কার্ডিওলজিস্ট তো আছেনই। মোট সাতজন চিকিৎসক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হলেন। এর মধ্যে ভাবির এক ভাগ্নে ডা. মাহিন, ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালের সার্জন, তিনিও প্রতিদিন একবার করে দেখতে আসছেন এবং প্রধান কার্ডিওলজিস্ট ডা. মাহবুবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

দুপুরের দিকে অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে লাইফ সাপোর্টে নিতে হতে পারে – এরকম একটা ধারণা ডা. মাহবুব জানালেন। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। লাইফ সাপোর্ট কেন? ডা. মাহবুব এবং ডা. বরেণ ব্যাখ্যা করলেন। সেচুরেশন এবং ব্লাড প্রেসার কমে যাচ্ছে। যে-কোনো মুহূর্তে লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। আগে থেকেই সম্মতি দিয়ে রাখতে হবে। বেবি আপা সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করলেন। বিকেলে কিছু সময়ের জন্য বাসায় এসেছি। এর মধ্যে আপার ফোন। বললেন, ‘মাজহারভাই, আপনি কোথায়? দাদাইকে তো লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ প্রচণ্ড রকম ধাক্কা খেলাম। ছুটে গেলাম হাসপাতালে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, প্রিয়জন এবং স্যারের অগণিত ছাত্রছাত্রী খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। টেলিভিশন স্ক্রিনে স্ক্রল যাচ্ছে। পরদিন সব জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হলো, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লাইফ সাপোর্টে। এর মধ্যে ভাবি এবং শাফাক 888sport appর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

৬ই অক্টোবর সকাল থেকেই হাসপাতাল লোকে লোকারণ্য। বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, সাংবাদিক এবং অগণিত ছাত্রছাত্রী। সকাল ১১টায় মেডিক্যাল বোর্ড বসল। সেখানে বেবি আপা, আমি, স্যারের এক আত্মীয় এবং কায়সার হকসহ ডাক্তাররা উপস্থিত। ডা. মাহবুব এবং অন্যরা স্যারের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন। কী কী করেছেন এবং এ-অবস্থায় আর কী কী করা যেতে পারে। আমরা নীরবে সব শুনলাম। বাইরে অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছে মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত জানার জন্য।

সন্ধ্যায় ফোন করলেন কবি সরকার আমিন। সবার মতো তিনিও মনজুর স্যারকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। বললেন, ‘আমেরিকায় তাঁর পরিচিত একজন ডাক্তার আছেন। তাঁর নাম হুমায়ূন কবির। তিনি সেখানকার খুব নামকরা আইসিইউ বিশেষজ্ঞ, স্যারের চিকিৎসা বিষয়ে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ভাই, আমি তো ওনাকে চিনি! ঘুংঘুর নামে 888sport live footballপত্রিকা বের করেন। কিন্তু এত দূর থেকে সহযোগিতা করবেন কীভাবে?’

আমিনভাই হাসলেন, ‘আমি কথা বলেছি, উনি মঞ্জুর স্যারের পরিচিত, আপনাকেও চেনেন। আপনি এখনই ফোন করেন।’

ফোন করতেই ডা. হুমায়ূন কবিরকে পেয়ে গেলাম।

প্রাথমিক কথা শেষ করে আমি ছুটে গেলাম ডা. বরেণ চক্রবর্তীর রুমে। সব শুনে তিনি বললেন, ‘উনাকে আমাদের সিসিইউ স্পেশালিস্টের সঙ্গে কথা বলতে দিন। আমি বলে দিচ্ছি।’

তারপর আবার দৌড়ে গেলাম সিসিইউতে। ডা. বরেণ আমি পৌঁছানোর আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। আমি ফোন করে দুই চিকিৎসকের মধ্যে কথা বলিয়ে দিলাম। মূলত তিনি লাইফ সাপোর্ট মেশিনের বিভিন্ন প্যারামিটার এবং সর্বশেষ ‘ব্লাড গ্যাস’ সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ডা. কবির দীর্ঘ সময় নিয়ে মেশিনের সেটআপ এবং কী কী মেডিসিন পাচ্ছেন সেগুলো জানলেন। আইসিইউ স্পেশালিস্ট ডা. জিয়া লাইফ সাপোর্ট মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে সব প্যারামিটার জানাচ্ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুজনের বিস্তারিত আলাপ চলল।

ডাক্তারদের বসার জায়গার ঠিক বিপরীতে স্যারের ১২ নম্বর বেড। আমি সেখানে বসে স্যারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। বেডের চারপাশে নানা যন্ত্রপাতি। এসব সঙ্গে নিয়ে স্যার আরাম করে ঘুমিয়ে আছেন। দেখে মনে হলো, আহা! কতদিন আরাম করে ঘুমান না।

কথা শেষ হলে ডা. কবির আমাকে বললেন, ‘লাইফ সাপোর্ট মেশিনের বর্তমান প্যারামিটার ঠিক আছে, 888sport app ট্রিটমেন্টও ঠিকভাবেই চলছে। এর বাইরে এই মুহূর্তে কিছু করার প্রয়োজন নেই। ইনশা আল্লাহ স্যার ফিরে আসবেন। নতুন কোনো সমস্যা না দেখা দিলে শিগগির তাঁকে লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে।’ তাঁর কথায় যেন স্বস্তি ফিরে পেলাম।

মনজুরুর স্যার যে তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে কতটা প্রিয়, কতটা 888sport apk download apk latest versionর, সেটা হাসপাতালের সেই শ্বাসরুদ্ধকর সাত দিনে আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছি। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই যেন 888sport appর চারদিক থেকে ছাত্রছাত্রীরা ছুটে আসতে শুরু করে – কেউ প্রাক্তন, কেউ বর্তমান। নানা ব্যস্ততার মাঝেও চলে এসেছে শুধু প্রিয় শিক্ষকের খবর নেওয়ার জন্য।

কেউ ক্লাস শেষে এসেছে, কেউ আবার অফিস থেকে ছুটে। বসার জায়গা না থাকায় অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে – নিঃশব্দে, গভীর উদ্বেগে। তাদের চোখে যে উৎকণ্ঠা, যে আন্তরিক ভালোবাসা আর গভীর টান দেখেছি – তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।

কেউ এক কোনায় বসে দোয়া পড়ছেন, কেউ চুপচাপ চোখের পানি মুছছেন। কেউবা আমার কাছে এসে স্যারের সঙ্গে নিজের পুরনো 888sport sign up bonus বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন। তাদের প্রত্যেকের কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট – স্যারের ক্লাস শুধু ইংরেজি 888sport live football শেখার জায়গা ছিল না – তা ছিল নতুন চিন্তার জানালা খুলে দেওয়ার স্থান, ছিল জীবনের ভেতরের আলো দেখার এক পথ।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য – দেশের বাইরে থেকেও বহু শিক্ষার্থী প্রতিদিন ফোন করতেন। এদের অধিকাংশের সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না; তাদের কেউই সরাসরি আমাকে চেনেন না। কীভাবে তারা আমার ফোন নম্বর জোগাড় করেছেন, সেটাও জানি না। কিন্তু যেভাবে তারা ফোন করে উৎকণ্ঠর সঙ্গে বলতেন – ‘ভাইয়া, স্যারের শারীরিক অবস্থার সঠিক খবরটা বলবেন? আগের থেকে একটু ভালো আছেন তো?’

সেই সাত দিনের অভিজ্ঞতায় আমি জেনেছি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন হাজারো মানুষের অবলম্বন, অনুপ্রেরণা, স্বপ্ন, পথপ্রদর্শক।

ছাত্রছাত্রীদের বাইরেও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ফোন করতেন। লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, 888sport live chatী, সাংবাদিক, বন্ধু-স্বজন তো আছেনই। সকলের ফোন ধরা একপর্যায়ে আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ছুটে আসছেন হাসপাতালে।

ভাবি ও শাফাক এলেন আমেরিকা থেকে ৭ই অক্টোবর সকালে। তার আগের রাতেই সিঙ্গাপুর থেকে পৌঁছাল খোকন। আমি আর স্বর্ণা গেলাম এয়ারপোর্টে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ভাবিকে যেন এয়ারপোর্টের ঝক্কিঝামেলা সামলাতে না হয়, সেজন্য সব ব্যবস্থা করেছিলেন স্যারের ছাত্র সজল। সজল নিজেও লেখালেখি করেন, পাশাপাশি তিনি সরকারের একজন ডেপুটি সেক্রেটারি।

এয়ারপোর্টে ভাবির দিকে তাকাতে বুকের ভেতর কেঁপে উঠছিল। অসুস্থ শরীরে নির্ঘুম রাত আর দীর্ঘ বিমানযাত্রা তাঁকে আরো ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। চোখেমুখে ভর করেছিল এক গভীর শূন্যতা – যেন সব আলো নিভে গেছে হঠাৎ।

খোকনও সেখানে এসে যোগ দিলো। আমরা সবাই মিলে ভাবি ও শাফাককে নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হাসপাতালে রওনা হলাম। হাসপাতালে পৌঁছে করোনারি কেয়ার ইউনিটে গিয়ে স্যারের পাশে দাঁড়ালাম। তিনি তখন লাইফ সাপোর্টে।

আমি শাফাককে বললাম, বাবাকে ডাকতে – কথা বলতে। এ-অবস্থায় মানুষ কথা শুনতে পায়। শাফাক ধরা গলায় বলল, ‘বাপ, আমি আর মা চলে এসেছি। তুমি চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে বাপ।’ ওর কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছিল, বুকের ভেতর কতটা কষ্ট জমে আছে।

খোকনও কথা বললেন। আর ভাবি – তিনি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন দৃশ্য দেখবেন, এমন অবস্থায় স্যারকে দেখতে হবে – এই ভাবনাটা কি কোনো দিন তাঁর কল্পনার মধ্যেও এসেছিল?

দুপুরের পর থেকে স্যারের অবস্থার উন্নতি দেখা গেল। তাঁর প্রধান চিকিৎসক ডা. মাহবুব রহমানও আমাদের জানালেন উন্নতির কথা। তাঁরাও আশার আলো দেখছেন। বিকেল থেকে আস্তে আস্তে লাইফ সাপোর্ট মেশিন খুলে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। নতুন করে আমরা আশার আলো দেখলাম। সবার মধ্যেই দুশ্চিন্তা কেটে একধরনের প্রশান্তির ছায়া দেখা দিলো। বেবি আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন।

বেবি আপা সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত থাকেন। হান্নানও প্রায় সারাক্ষণই হাসপাতালে আছেন। রাতে স্যারের ভাইয়ের পুত্র সাদ্দু ও এবং কখনো হান্নান হাসপাতালে থাকেন। অন্যদিকে আমি ১১টায় হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আবার ১২টা সাড়ে ১২টায় চলে যাই। আমার কোনো কাজ নেই। তারপরও রাত দুটো-তিনটা পর্যন্ত বসে থাকি। সাদ্দুর কাছে চাচার নানা গল্প শুনি আর কিছুক্ষণ পরপর সিসিইউতে খবর নিই।

বিকেলের দিকে আমরা কয়েকজন বসে আছি। হঠাৎ দেখি ডা. বরেণ দ্রুতগতিতে হেঁটে আসছেন। কাছে এসে খুবই আবেগ-মেশানো উত্তেজনায় বললেন, ‘মাজহারভাই, তাড়াতাড়ি আসেন। স্যার চোখ খুলে তাকিয়েছেন। দেখতে চাইলে আমার সঙ্গে আসেন।’

সিসিইউতে ঢুকে দেখি স্যার তাকিয়ে আছেন। মুখে পাইপ থাকায় কথা পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না। ইশারায় কথা হলো। বললাম, ‘স্যার, মনের জোর রাখেন। ইনশা আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।’ স্যার মাথা নাড়লেন। ৭ই অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা পর লাইফ সাপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলেন স্যার। আমরা সকলে আশার আলো দেখতে পেলাম। শাফাক ও কমল স্যারকে দেখতে গেলে তাদের কাছে ইশারায়

কাগজ-কলম চাইলেন। কমল নার্সের কাছ থেকে কাগজ-কলম এনে দিলে স্যার কাঁপা হাতে লিখলেন, ‘I am very thirsty. Need water! Quit me.’

৮ই অক্টোবর সকাল থেকে স্যারের অবস্থার আরো কিছুটা উন্নতি হলো। ডা. মাহবুব ভাবি, শাফাক ও বেবি আপাকে নিয়ে সিসিইউতে গেলেন। স্যার সবাইকে চিনতে পারলেন। শাফাককে দেখিয়ে বললেন, ‘আমার পুত্র। আমেরিকায় থাকে।’ ভাবির নাম বললেন। ভুলে বেবি আপাকে বললেন বড় বোন। মুহূর্তেই নিজে আবার সংশোধন করলেন এভাবে, ‘আমার ছোট কিন্তু ও আমাকে শাসন করে। সেজন্য বড় বলেছি।’ সারাদিন এভাবে ভালোই কাটল।

সন্ধ্যার পর স্যারের বেড চেঞ্জ করে জানালার পাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি ও মারুফভাই গেলাম দেখা করতে। আবারো একই প্রশ্ন, ‘আমাকে বাসায় নিয়ে যাবে কবে?’

আমি বললাম, ‘স্যার, এই তো আর দু-একটা দিন। আশা করি তারপরই বাসায় চলে যাবেন।’

স্যার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি তো একই কথা প্রতিদিন বলো।’

আমি প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, ‘স্যার, এখন তো আপনি আকাশ আর রাস্তা দেখতে পাচ্ছেন।’ একই কথা কিছুক্ষণ আগে বেবি আপাও বলেছিলেন। স্যার গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলেন, ‘888sport app শহরের যানজট দেখে কী করব! এসব দেখতে ভালো লাগে না।’

কিছুক্ষণ পর তিনি মারুফভাইয়ের কাছে জানতে চাইলেন ক্রিকেটের স্কোর। সেদিন শারজায় আফগানিস্তানের সঙ্গে 888sport apps প্রথম ওডিআই ম্যাচ খেলছে। মারুফভাই স্কোর জানিয়ে বললেন, ‘এইমাত্র মিরাজ একটা ছয় মারল।’

মিরাজ স্যারের প্রিয় খেলোয়াড়। শুনে তিনি খুশি হলেন। এরপর আমাদের 888sport promo code ক্রিকেট দলের খেলার ফলাফলও জানতে চাইলেন। আমি ডিউটি ডাক্তারকে বললাম, ‘স্যার ক্রিকেট খুব পছন্দ করেন। সম্ভব হলে মাঝে মাঝে ওনাকে স্কোর জানাবেন।’

বেরিয়ে আসার আগে তিনি আবার বললেন, ‘ডাক্তার বরেণকে বলো, আমি বাসায় যেতে চাই।’

৯ই অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে হাসপাতালের ফোনে আমার ঘুম ভাঙল। সেখানে আমার আর বেবি আপার নম্বর দেওয়া ছিল। রাতে অথবা ভোরে হাসপাতালের ফোন মানেই আতঙ্ক কাজ করে। না জানি কী খবর! বুকের ভেতর কেঁপে উঠল – উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন ধরলাম। ফোনের অন্য প্রান্তে একজন নার্স। বললেন, ‘উনি খুব অস্থিরতা প্রকাশ করছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’

ফোন ধরতেই স্যার বললেন, ‘মাজহার, তুমি আসার সময় ডেইলি স্টার আর প্রথম আলো নিয়ে আসবে। আর সানজিদাকে বোলো আমাকে ফোন করতে।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে নার্সকে ভাবির নম্বর দিলাম এবং স্যারের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করলাম। এরপর ডিউটি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম – সারা রাতই স্যার ভীষণ অস্থির ছিলেন। সে-কারণেই তাঁকে আবার আগের জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। আগের বারো নম্বর বেডটি ডাক্তার স্টেশনের ঠিক সামনে, তাই তাঁদের পক্ষে মনিটর করতে সুবিধা হয়। স্যার যখন ভোর ৫টায় ভাবির সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন, তখনই আমি বুঝে গেছি আসলেই স্যারের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। দিন-রাতের হিসাব ঠিক নেই তাঁর।

সব কথা শুনে খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আর ঘুম হলো না। ভোর হতেই আমি আর স্বর্ণা হাসপাতালে রওনা হলাম। সেখানে ভাবি, শাফাক, বেবি আপা – আরো অনেকে আগে থেকেই ছিলেন।

রাউন্ড শেষে ডাক্তার এসে জানালেন, স্যারের ফুসফুসের সংক্রমণ আবার বেড়ে গেছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে। ব্লাড প্রেসার ঠিক রাখতে ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হয়েছে। ক্রিয়েটিনিন আরো বেড়েছে। সব মিলিয়ে অবস্থার উন্নতি নয়, বরং আবার সংকটের দিকেই যাচ্ছে।

বিকেল ৫টার দিকে আবার মেডিক্যাল বোর্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখানে ভাবি, বেবি আপা, শাফাক, ভাবির ভাগ্নে ডাক্তার মাহিন এবং আমি উপস্থিত থাকব। মেডিক্যাল বোর্ড কি কোনো স্বস্তির খবর দেবে? আসবে কি কোনো ইতিবাচক চিকিৎসার আপডেট? সামান্য হলেও কি শোনা যাবে আশার কথা? নাকি আমাদের আবার মুখোমুখি হতে হবে এক নির্মম, কঠিন বাস্তবতার? এই সব প্রশ্ন একটার পর একটা ভিড় করছে মাথার ভেতর।

মেডিক্যাল বোর্ডের সভা শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল ৫টায়, কিন্তু শুরু হলো সন্ধ্যা ৬টায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বর্তমান শারীরিক অবস্থার ব্যাখ্যা দিলেন তাঁর প্রধান চিকিৎসক ডা. মাহবুবুর রহমান। এরপর অন্য চিকিৎসকরাও তাঁদের মতামত তুলে ধরলেন।

চিকিৎসকদের বক্তব্য ছিল আশঙ্কাজনক। ফুসফুসের সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে, ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সবকিছু সমন্বয় করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সামগ্রিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। এ-অবস্থার উন্নতি না হলে আবার লাইফ সাপোর্টে নিতে হতে পারে – এ-কথাও জানালেন তাঁরা। তবে সবচেয়ে ভীতিকর কথাটি ছিল, এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার লাইফ সাপোর্টের ফলাফল খুব ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। কী জানাব তাদের? ডা. মাহবুবের শেষ কথাটি বারবার কানে বাজছিল – ‘দ্বিতীয়বার লাইফ সাপোর্টের ফলাফল ভালো হয় না।’

১০ই অক্টোবর। হাসপাতালের ফোনে জানলাম, ভোর সাড়ে ৫টায় লাইফ সাপোর্টে চলে গেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সকাল সাড়ে ৯টায় মোহিত কামাল ফোন করে জানালেন, অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। ব্লাড প্রেসার নোটেবল নয়। আমি চুপচাপ শুনলাম। কোনো প্রশ্ন না করে ফোন রেখে দিলাম। ডাক্তার মাহবুবের ওই কথাটাই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হাসপাতালে চলে গেলাম। শুক্রবার, ছুটির দিন। করোনারি কেয়ার ইউনিটের অনেকটা জায়গাজুড়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বার। ছুটির দিন হওয়ায় সব চেম্বার বন্ধ। রোগীর ভিড় নেই। বিশাল ফ্লোরজুড়ে শুধু আমরা কয়েকজন। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্যারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, লেখক এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করল। আমিও যাদের এই সময়ে পাশে থাকা প্রয়োজন এরকম অনেককেই ফোন করে হাসপাতালে আসতে বললাম। প্রচণ্ড অস্থিরতা কাজ করছে। ছুটির দিনেও ডাক্তার বরেণ হাসপাতালে। কিছুক্ষণ পরপর তিনি সিসিইউতে যাচ্ছেন।

এরই মধ্যে ভাবি আমাকে ও হান্নানকে ডেকে বললেন, ‘আমাদের তো কিছু প্ল্যান করতে হবে।’ আমি হতভম্ব হয়ে ভাবির দিকে একবার তাকালাম। তাঁর সমস্ত শরীর কাঁপছে। কিসের প্ল্যানের কথা বলছেন ভাবি? এরপর যা বললেন সেটা শোনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। তিনি বললেন, ‘এখান থেকে সোজা বারডেমে নিয়ে যাবে। কাল বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন।’

আমি বললাম, ‘ভাবি, এসব কী বলছেন? এখনো তো …।’ তিনি আমাকে কথা শেষ করতে দিলেন না, বললেন, ‘আমি যা যা বলেছি সেটার ব্যবস্থা করো।’

আমরা সকলেই জেনে গেছি কী ঘটবে এবং কত দ্রুত ঘটবে। কিন্তু এই সত্য কীভাবে মানব? ভাবির ইচ্ছার সবটা বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমার নেই। কবি সাজ্জাদ শরিফকে বললাম। তিনি দ্রুত শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে অনুমতির ব্যবস্থা করে ফেললেন। কবি ফরিদ কবির দায়িত্ব নিলেন বারডেমের। বিকেল ৪টার মধ্যে করোনারি কেয়ার ইউনিটের বিশাল ফ্লোর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।

বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে খবর এলো সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর নেই। সমস্ত পৃথিবী মুহূর্তে কেঁপে উঠল। চারদিকে হাহাকার, কান্নার শব্দ আর চোখের পানিতে ভারী হয়ে উঠল পরিবেশ।

তিন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় অন্যদিন পত্রিকার যাত্রা শুরু থেকেই। ১৯৯৬ সাল তখন। অন্যদিন ঈদ 888sport free betয় নিয়মিত লিখতেন তিনি। ১৯৯৯ সালে প্রবর্তন করা হয় ‘অন্যদিন-ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড’। আতিকুল হক চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জুয়েল আইচের সঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও ছিলেন জুরি বোর্ডে। অন্যদিন অফিসে জুরি বোর্ডের সদস্যরা একসঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা 888sport app download bdের জন্য বিবেচিত নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্র দেখতেন, গান শুনতেন এবং মূল্যায়ন করতেন। বেশ কয়েকদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলত। মূলত তখন থেকেই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়। কিন্তু তাঁর লেখালেখির সঙ্গে আমি পরিচিত অন্যদিন শুরুর আগে থেকেই। সংবাদের 888sport live footballপাতায় ‘অলস দিনের হাওয়া’ পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। আমি তখন 888sport app বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকতাম শহিদুল্লাহ হলে। সপ্তাহে ছয়দিন রাখা হতো ইত্তেফাক আর যেদিন 888sport live footballপাতা বের হতো সেদিন সংবাদ। এক রুমে আমরা ছয়-সাতজন থাকতাম। কাড়াকাড়ি লেগে যেত কে কার আগে ‘সংবাদ সাময়িকী’ পড়বে! মূলত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘অলস দিনের হাওয়া’র মাধ্যমেই বিদেশি 888sport live footballের সঙ্গে আমার পরিচয়।

‘অন্যপ্রকাশ’-এর যাত্রা শুরু হলো ১৯৯৭ সালে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রথম বই আমরা প্রকাশ করলাম ২০০৫ সালে, নাম প্রেম ও প্রার্থনার গল্প। এই বইয়ের দুই-তিনটা প্রচ্ছদ করানো হলো। কিন্তু স্যার কোনোটাই পছন্দ করলেন না। একদিন বিকেলে ফোন করে অন্যপ্রকাশে চলে এলেন। খ্যাতিমান 888sport live chatী মনিরুল ইসলামের পেইন্টিং অবলম্বনে গ্রাফিক ডিজাইনারের পাশে বসে নান্দনিক একটা প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেললেন, যদিও প্রচ্ছদ888sport live chatীর জায়গায় নিজের নাম দিতে দেননি। সে-বছর প্রেম ও প্রার্থনার গল্প প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের 888sport app download bd পেল।

এরপর আমাদের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। অন্যদিনের যে-কোনো আয়োজনেই স্যার আমাদের সঙ্গে থাকেন। একবার অন্যদিনের হয়ে হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও নিলেন। ধারাবাহিকভাবে ছাপা হলো তা। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অল্প সময়ের মধ্যে অন্যদিন এবং ‘অন্যপ্রকাশ’ পরিবারের একান্ত আপনজন হয়ে গেলেন। লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক থেকে জড়িয়ে গেলাম এক আত্মিক সম্পর্কে। মায়া ও ভালোবাসায় জড়ানো সেই সম্পর্ক খুব স্বল্প সময়ে পারস্পরিক নির্ভরতায় পরিণত হলো। স্যার হয়ে উঠলেন আমাদের অভিভাবক।

হুমায়ূন আহমেদ এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দুজনেই পরস্পরকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। মাঝেমধ্যেই দখিন হাওয়ায় আড্ডা দিতে আসতেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার চিকিৎসার সময় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সম্ভবত কোনো কাজে নিউইয়র্কে আসেন। সে-সময় বেশ কয়েকবার বেলভিউ হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে যান। একদিন পুত্র শাফাককেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন দীর্ঘ সময় হাসপাতালের কেবিনে আড্ডা হয়েছিল দুই খ্যাতিমান কথা888sport live chatীর।

২০১৫ সালে ‘এক্সিম ব্যাংক অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ 888sport live football 888sport app download bd’ প্রবর্তিত হয়। শুরু থেকেই সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এই 888sport app download bdের জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সভাপতি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ২০২০ সালে আনিসুজ্জামান স্যারের প্রয়াণের পর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জুরি বোর্ডের সভাপতি হন – একটি শর্তে : তিনি নিজে কখনো এই 888sport app download bd গ্রহণ করবেন না।

২০২১ সালের ৮ই মার্চ, অন্যদিন রজতজয়ন্তী পূর্তি উৎসবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে অন্যদিনে যোগ দেন। এটি ছিল অন্যদিন পরিবারের জন্য এক বড় অর্জন – এক গভীর গৌরব ও অপরিসীম আনন্দের মুহূর্ত।

888sport live football 888sport app download bdের জুরি বোর্ডের সভা হোক বা সম্পাদকীয় বৈঠক – বেশিরভাগ সময়ই তিনি ধানমন্ডির বাসা থেকে হেঁটে আসতেন। গাড়ি পাঠানোর কথা বললে বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, ‘পাঠাতে হবে না। আমি হেঁটে চলে আসব মাজহার। তুমি তো জানো, আমি হাঁটতে পছন্দ করি।’

দেশের বাইরে গেলেও তিনি একইভাবে হাঁটতেন। স্যারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটা তো দূরের কথা, আমাদের প্রায় দৌড়াতে হতো! তিনি হাঁটতেন এমন গতিতে, যেন নতুন শহরকে জানার তাড়ায় তাঁর পায়ের নিচে সব সময়ই এক অদৃশ্য টান কাজ করছে।

চার

একবার কলকাতায় অক্সফোর্ড বুকস্টোরের আয়োজনে এপিজে 888sport live football সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়েছিলাম – সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং আমি। ২০১৭ সালের মার্চ মাস। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে – এক অপূর্ব পরিবেশ, চারদিকে ইতিহাসের ছায়া, বাতাসে মিশে

থাকা বাংলা 888sport live football-সংস্কৃতির শতবর্ষী গন্ধ।

দুই দিনের সম্মেলনের উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। উদ্বোধক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। সমরেশ মজুমদার এবং প্রচেত গুপ্তের সঙ্গে আমিও বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলাম।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বক্তব্য শুরু হতেই শ্রোতাদের মাঝে নিস্তব্ধতা। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানুষের মধ্যে চিন্তার মুক্তি নিয়ে। যে সহজ ভাষায়, যে তীক্ষè উপলব্ধিতে তিনি কথা বলতেন, তা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে ফেলত। সেদিন হলোও তাই। গভীর মনোযোগ দিয়ে পিনপতন নীরবতার মধ্যে শ্রোতারা তাঁর কথা শুনলেন। দর্শকসারিতে কলকাতার
লেখক-বুদ্ধিজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।

জোড়াসাঁকোর সেই ঐতিহাসিক স্থান যেন তাঁর কথায় আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেল। সবাই বলছিলেন – ‘এমন কথা আজকাল খুব কমই শোনা যায়।’ তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, সংস্কৃতি কোনো জাদুঘরের বস্তু নয় – এটি জীবনের সম্পদ, যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, পথ দেখায়।

মজার বিষয় হলো, সেদিন জোড়াসাঁকোয় যে-কথাগুলো বলে তিনি সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন, ঠিক একইভাবে এ-বছরের ২৭শে সেপ্টেম্বর 888sport appর বিশ্ব888sport live football কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে আবু খালেদ পাঠান 888sport live football 888sport app download bd ২০২৫ বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন। এটি ছিল কোনো অনুষ্ঠানে তাঁর শেষ অংশগ্রহণ।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সেদিন বলেন, ‘দেখুন শিক্ষার একটা সংস্কৃতি আছে, সংস্কৃতির একটা শিক্ষা আছে। দুটো মেলে না। যেসব দেশে দুটো মিলে গেছে, সেসব দেশে উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার সংস্কৃতিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটা আলোকিত করে মানুষকে। আর সংস্কৃতির শিক্ষা হচ্ছে সবাইকে সবার সঙ্গে যুক্ত করা। এই প্রাণের সঙ্গে প্রাণ যুক্ত না হলে, মনের সঙ্গে মনের মিল না হলে সমাজে কলহ থাকে, সমাজে অসূয়া থাকে, নিন্দাবাদ চলতেই থাকে, এবং একসময় সেটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো আমরা সবাই পাই। তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভেতরে সংস্কৃতিটা কোথায় আমাদের? আলো জ্বালার সংস্কৃতি মনের ভেতর, জানার, একটা কৌতূহলের, উৎসাহের?’

রেনেসাঁসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে উনিশ শতকে সেটি ঘটেছে কিন্তু খুব ছোট পরিসরে। সেই রেনেসাঁস দেশকে জাগায়নি, একটা সম্প্রদায়কে জাগিয়েছে শুধু। অথচ মধ্যযুগে আলাওল লিখেছেন পদ্মাবতী। রেনেসাঁস এখানে, এই পূর্ববঙ্গে ঘটেছিল যখন আলাওল পদ্মাবতী লিখছেন, সেটি সবচেয়ে বড় রেনেসাঁসের ঘটনা। কারণ নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়া, অন্য সম্প্রদায়ের চিন্তাকে গ্রহণ করা, উনিশ শতকের কলকাতার সম্প্রদায়ে সেটি ছিল না। এটি ছিল মধ্যযুগের বাংলা 888sport live footballে, যার অনেক স্রষ্টা ছিলেন মুসলমান, যাঁরা নিজেদের ভাষা নিয়ে ভেবেছেন, ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি নিয়ে ভেবেছেন, উত্তরাধিকার নিয়ে ভেবেছেন, লোকায়ত চিন্তা এবং প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাবার কথা বলেছেন।’

কিন্তু কে জানত – এটাই হবে জনপরিসরে দেওয়া তাঁর জীবনের শেষ কোনো বক্তৃতা! সময় কখন যে নিঃশব্দে কাছে এসে দাঁড়ায় – আমরা টেরও পাই না।

আজ মনে হয়, জোড়াসাঁকো থেকে বিশ্ব888sport live football কেন্দ্র – এই দুই মঞ্চে তাঁর বক্তব্য যেন তাঁর জীবনের দুই আলোকরেখা, যা মিলেমিশে একই অর্থ বহন করে – সংস্কৃতি, শিক্ষার আলো এবং মানুষের প্রতি গভীর মানবিক দায়বদ্ধতার কথা।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম – একজন মানুষ, যিনি কথা দিয়ে পথ দেখাতে জানতেন। এবং সেই পথ আজো আলোকিত।

পাঁচ

২০১৬ সালে আমরা বড় একটি দল নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় গিয়েছিলাম – সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আবুল হাসনাত, শামসুজ্জামান খান, মারুফুল ইসলামসহ আরো অনেকে। দিনভর মেলায় ঘোরাঘুরি, বিখ্যাত স্টলগুলো দেখা, আলোচনায় অংশ নেওয়া – সবশেষে হোটেলে ফিরলেই জমে উঠত দীর্ঘ আড্ডা। 888sport live football, সংস্কৃতি, রাজনীতি – কোনো বিষয়ই বাদ যেত না।

সেই বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন মূল বক্তা। নিখুঁত, সাবলীল ইংরেজিতে ‘বাংলা 888sport live footballের বিশ্বায়ন কেন জরুরি’ – এই বিষয়ে তিনি যে বক্তৃতা দিলেন, তা সবাইকে অভিভূত করেছিল। তাঁর যুক্তি, বিশ্লেষণ, উদাহরণ – সব মিলিয়ে বক্তৃতাটি যেন এক জীবন্ত পাঠ।

বিভিন্ন দেশের লেখক, প্রকাশক ও ট্রেড ভিজিটররা গভীর মনোযোগে তাঁর কথা শুনলেন।

বইমেলা শেষ হলে আমরা কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলাম। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কবি মারুফুল ইসলাম, প্রবাসী লেখক শহিদ হোসেন খোকন এবং আমি গেলাম চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে রেন্ট-এ-কার নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম আমরা। প্রায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা – দুপুর দুটোয় যাত্রা শুরু করে রাত দশটার দিকে পৌঁছালাম প্রাগে।

সেদিন ছিল বইমেলার শেষ দিন। সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত মেলায় নানা কাজ – সব মিলিয়ে সবাই প্রচণ্ড ক্লান্ত। হোটেলে চেক-ইন করে রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতে প্রায় দশটা বেজে গেল। সিটি হল চত্বরে রাতের খাবার খেতে যাব। এগুলো সবই আমাদের চালক কাম গাইডের পরামর্শ। প্রাগ পৌঁছানোর আগে কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায়, দর্শনীয় স্থান কী কী আছে, সস্তায় ভালো শপিং কোথায় করা যায় – এসব বিষয়ে মোটামুটি নাতিদীর্ঘ এক বক্তৃতা দিয়েছে সে।

হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতেই রাতের প্রাগ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। খোকন তো ‘ওয়াও’ করে চিৎকার দিয়ে উঠল। কাছেই ট্রাম স্টেশন। গুগল ম্যাপ বলছে, সিটি হলে পায়ে হেঁটে গেলে ১৮ মিনিট সময় লাগবে। ট্রামে গেলে পাঁচ মিনিট। টিম লিডার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বললেন, ‘শোনো, সারা দিন তো গাড়িতে বসা ছিলাম। এখন ট্রাম কেন? নতুন কোনো শহরকে দেখতে হলে হাঁটতে হয়। ট্রামে উঠলে শহর আসলে দেখা হয় না। একটা শহরকে চিনতে, বুঝতে হলে নিজের পায়ের ওপর ভরসা করতে হয়। চলো, হাঁটতে শুরু করি।’

তাঁর কথাগুলো শুধু 888sport slot gameের উপদেশ ছিল না – ছিল এক ধরনের জীবনদর্শন। নতুন কোনো শহর, কোনো সমাজকে তিনি চিনতেন হাঁটার মধ্য দিয়েই। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। রাতের প্রাগ যেন এক জাদুকরী সাজে সেজেছিল – পাথরের রাস্তা, দুই ধারের উঁচু-নিচু পুরনো ভবন, জানালায় নরম হলুদ আলো, রাস্তায় হালকা ঠান্ডা হাওয়া আর দূরের কোথাও থেকে ভেসে আসা গিটারের সুর। মনে হচ্ছিল, শহরটাই যেন আমাদের সঙ্গে ধীরে ধীরে হাঁটছে।

স্যার হাঁটছেন সামনে, আমরা তিনজন পেছনে – মাঝেমধ্যে দৌড়ে দূরত্বের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমাতে হচ্ছে। হাঁটার গতি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন বহুদিন ধরে পরিচিত এই শহরের সঙ্গে আবার দেখা করতে এসেছেন। মাঝে মাঝে থামছেন, দূরের কোনো স্থাপনা দেখিয়ে বলছেন, ‘দেখো, এই শহরটা শতবর্ষ পুরনো ইতিহাস বয়ে বেড়ায়; এখানে প্রতিটি দেয়ালের নিজস্ব গল্প আছে।’

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম সিটি হল চত্বরে। জায়গাটা জনাকীর্ণ – চারদিকে রেস্তোরাঁ, ওপেন-এয়ার কফিশপ, রঙিন আলো, নানা দেশের পর্যটক, কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাসছে, কেউ নীরবে বসে সংগীত শুনছে।

খোকন বলল, ‘এ শহরটা যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য!’

স্যার হাসিমুখে বললেন, ‘ঠিক তাই। 888sport slot game মানে শুধু দেখা নয় – অনুভব করা। আর হাঁটা ছাড়া কোনো শহরকে অনুভব করা যায় না।’

একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম ঠিকই কিন্তু ‘হাঙ্গেরিয়ান গোলাস’ পেলাম না। আমাদের চালক কাম গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা এই ট্র্যাডিশনাল খাবার দিয়ে প্রাগে প্রথম রাতের ডিনার সারতে চেয়েছিলাম। ওয়েটার জানাল, রাত সাড়ে দশটার পর মেন্যুর সব খাবার পাওয়া যায় না।

রাতের খাবার শেষে বিশাল চত্বরে আরো কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আমরা আবারো হেঁটেই হোটেলের পথে রওনা দিলাম। রাত তখন প্রায় একটা বাজে। চারদিকের আলো ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় বদলে যাচ্ছিল, কিন্তু স্যারের হাঁটার উৎসাহে কোনো ক্লান্তি ছিল না।

হোটেলে ফিরে তিনি হেসে বললেন, ‘এই যে হাঁটলে, এখন রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আরাম করে ঘুমাতে পারবে।’

আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়লেও সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কখনো ক্লান্ত হতেন না। দেশে-বিদেশে যেখানেই একসঙ্গে গেছি, তিনি হাঁটতে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল একধরনের গতি – যা আসলে তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হতো। তিনি কোনো কাজ ফেলে রাখতেন না। সারাদিনই থাকতেন নানা কাজে ব্যস্ত, এক কাজ শেষ করেই তৎক্ষণাৎ ছুটে যেতেন অন্য কাজে।

ছয়

অজস্র মানুষের ভালোবাসা ও প্রার্থনায়ও আটকে রাখা গেল না সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে। ১০ই অক্টোবর তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে।

সানজিদা ভাবি আর শাফাকের নীরব, করুণ আর্তনাদ যেন আজো হাসপাতালের করিডরে প্রতিধ্বনি তোলে। সেই কান্না শোনা যায় না, তবু তা হৃদয়ের গভীরে অনেক দিন ধরে বয়ে চলে – চুপচাপ জমে থাকে এক অন্তহীন শোক হয়ে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নেই – এই কঠিন সত্য আজো মানতে কষ্ট হয়। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, তাঁর শূন্যতা ততই যেন গভীর হয়ে উঠছে। তিনি শুধু একজন মানুষ ছিলেন না – ছিলেন আশ্রয়, মানবিকতার এক নির্ভরযোগ্য আলোকবর্তিকা।

তাঁর স্নিগ্ধ উপস্থিতি, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর মমতাময় সাহচর্য এখনো আমাদের চারপাশে ভেসে বেড়ায় – নীরব বাতাসে, অদেখা আলোয়।

তিনি নেই, অথচ তাঁর আদর্শ, তাঁর স্পর্শ, তাঁর বিশ্বাস আমাদের ভেতরে প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয় – জীবনের প্রতি ভালোবাসা। তাঁর প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জীবনে, তাঁর বন্ধু, লেখক-সহকর্মীদের 888sport sign up bonusতে এবং অসংখ্য পাঠকের হৃদয়ে তিনি রয়ে গেছেন এক অপরিমেয় শক্তি হয়ে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নেই – তবু তিনি আছেন। আছেন আলো হয়ে। ভালোবাসা হয়ে। আছেন আমাদের প্রতিটি সকালে, প্রতিটি অন্ধকারে পথ দেখানো এক নীরব প্রদীপ হয়ে।