ছোট গল্প
-
ডিপফ্রিজে মুণ্ডুটা কার
আন্দালিব রাশদী আমার এপিএস আবুল হুসসাম জানে আমার ডিপফ্রিজে কাটা মুণ্ডুটা কার। এপিএস মানে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রাইভেট সেক্রেটারি – সহকারী একান্ত সচিব। তাকে গোপনীয় অনেক কিছু জানতেই হয়, কিংবা সে গোপনীয় অনেক কিছু জানে বলেই তাকে এপিএস করা হয়। পিএস জানে না। তাকে না জানলেও চলে। কারণ আমি তার ওপর খুব একটা নির্ভর করি না। আমার…
-
হরিণের মাংস
আহমেদ মুনির কদিন ধরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। আমি বাসায় ফিরে দেখছি ঘরদোর পরিপাটি করে গোছানো। বিছানা, এলোমেলো বইয়ের তাক সব ঠিকঠাক। প্রথমে ভাবলাম, না – এটা আমারই ভুল। হয়তো বেরোনোর আগে নিজেই সব গুছিয়েছি। হিসাব করলাম তিনদিন ধরে এমনটা ঘটছে। অথবা বলা যায়, আমার এই বিভ্রম দিন তিনেকের পুরনো। রহমতগঞ্জে তিন রুমের ব্যাচেলর কোয়ার্টারে…
-
দ্বন্দ্বের মাঝখানে
প্রশান্ত মৃধা জাহেদ দেখল, নয়াবাড়ির কেয়ারটেকার বুড়োমেয়া একটা ঝাঁকায় কী যেন ঢেকে নিয়ে যাচ্ছে। বুড়োমেয়ার মুখটা উলটোদিকে ঘোরানো। হতে পারে, জাহেদ যে তাকে দেখছে, সেটা সে বুঝতে দিতে চায় না। হতে পারে, সে যে জাহেদকে দেখেছে, এটাও যেন ঘটেনি। তাই জাহেদ যখন দাঁত ব্রাশ করতে করতে কলেজের পোলের ওপর দাঁড়িয়ে, সে-সময়ে বুড়োমেয়ার রিকশা হঠাৎ তার…
-
থুতু
হরিশংকর জলদাস চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে সারিবদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে। তাদের প্রত্যেকের হাতে প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে নানা কথা লেখা – ‘একাত্তরের রাজাকার এখন যে দেশদরদি, ওদের হাতে মরেছিল বাবা এবং বড়দি।’ ‘আর কিছু নয় চাইছি বিচার দেশজনতা বাদী ফাঁসির মঞ্চে ঝুলে থাকুক যুদ্ধাপরাধী।’ মাথার ওপর ভাদ্রের কড়া রোদ। দরদর করে ঘামছে মানুষগুলো। বয়সীরা পকেট থেকে রুমাল বের করে…
-
গোশত
পাপড়ি রহমান গেলবার শাহ আলমের হালের একটা গরু ধপ করে মরে গেল। অথচ গরুটার রোগবালাই-টালাই কিচ্ছু ছিল না। তখন নিদারুণ চৈত্রমাস। মাথার তালু ফাটিয়ে দেওয়া রোদ্দুর ঢুকে পড়েছিল একেবারে মগজের ভেতর। শাহ আলমের হাতে লাঙলের ফলা, বীজ বোনার আগে চৈত্রমাসের শেষ লাঙল দিচ্ছিল সে-জমিতে। তখুনি কিনা হঠাৎ করে একটা গরু বেকদমে চলতে শুরু করলো। ঘাড়ে…
-
১৯৫৩
আনিসুল হক হেমন্তকাল। হাটখোলার সরুপথে রিকশায় চলেছেন মুজিব। সকালবেলা। রোদ উঠেছে মিষ্টি। রাস্তায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ে আছে, পাঁচিল ডিঙিয়ে মাথা বের করা শিউলিঝাড়ে পড়েছে সকালবেলার রোদ। শেখ মুজিব যাচ্ছেন এ কে ফজলুল হকের কাছে। কেএম দাস লেনের বাড়িটির গেট খোলাই ছিল। তিনি ভেতরে ঢুকে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘নানা, আছেন নাকি।’ বিশালদেহী ৮১…
-
অনুরক্ত তমাশা
রেজাউর রহমান দিন-সপ্তাহ-মাস পেরিয়ে অন্তরা যখন হাসপাতালের পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সান্ধ্য আকাশে চাঁদ ছিল না, তারা ছিল না, ছিল না কোনো রংও। আকাশে কোনো রং থাকে না, এমন দৃশ্য তার বিশ-বাইশ বছরের জীবনে কোনোদিন দেখেনি। তারপরও সে ভাবে, মানুষের ভুল-ভ্রান্তি হয় না? হতেও পারে। সে হয়তো এমনটা দেখে থাকবে কোনোদিন, যা আজ তার…
-
কলকাতার কাক
বুলবন ওসমান মৈত্রেয়ী অ্যাপার্টমেন্টের দোতলার ব্যালকনিতে বসে সুহাস অগ্রহায়ণের সকালের রোদ পোহাচ্ছিল। সামনে দৈনিক পত্রিকাগুলো শায়িত। দেখা প্রায় শেষ। এবার হয়তো এক কাপ চা পাঠাবে ভাদ্রবধূ বেলি। কলকাতার এই ট্যাংরা এলাকাটা বেশ পুরনো। চারদিকে এখনো গাছ-গাছালি ও ঝোপঝাড় আছে। জায়গাটা তেমন সরল-সমতল নয়। বেশ উঁচু-নিচু। মৈত্রেয়ী পার হয়ে সামান্য ডানে গেলে একতা অ্যাপার্টমেন্ট। বছর দুয়েক…
-
সালিশের মানুষ
হাসনাত আবদুল হাই জইতুনের স্বামী জব্বর যখন আর একটা বিয়ে করে অন্য গ্রামে গিয়ে নতুন সংসার পেতে বসলো তখন তার মাথায় বাজ পড়ার মতো হলো। তার স্বামী জব্বর যে সৎ মানুষ না সেটা জইতুন বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছে। গঞ্জ থেকে দেরি করে বাড়ি ফেরে, হেরে গলায় গান গায়, কিছু বললে খিস্তি তোলে, এমনকি কুৎসিত গালও…
-
চতুষ্কোণ
রেজা নুর সকালবেলার এই সময় জানালা খুলে বাইরে তাকায় মিনি। ছোট্ট জানালা। বাইরের খুব সামান্য দৃশ্য ভেসে ওঠে। ওপরে তাকালে আকাশটার এক কোনা চোখে পড়ে। সেই কোনায় আকাশ নীল ঘুড়ি হয়ে ঝুলে থাকে যেন। মাঝে-মাঝে মিনির ওড়নার মতো একটুকরো মেঘ এসে দাঁড়ায়। সরে যায়। আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর চোখ যায় পাশের সরু গরুগাড়ির রাস্তার…
-
জিনের মোহর ও ল্যালহা
নীহারুল ইসলাম ল্যালহা ভোর-ভোর কালিপালের ডিহিতে ঝাড়া-ফিরতে আসে। গাঁ ছেড়ে মাঠের আল ধরে একটু হাঁটতে হয় ঠিকই, তবে জায়গাটা নির্জন। ঝোপঝাড় আছে। নানা ধরনের পাখি দেখা যায়। তাদের কলরব ভেসে আসে। এখানে এলে শরীরের সঙ্গে তার মনটাও বেশি খোলসা হয়। তেমন খোলসা শরীর-মন নিয়ে সে হেঁটে বেড়াচ্ছে ডিহির ওপর। গেল রাতে কখন বৃষ্টি হয়েছে, টের…
-
বিহঙ্গ পুরাণের অন্তিম পরিচ্ছেদ
হুমায়ূন মালিক দীপ্রর খুব পাখি ধরার সাধ; কিন্তু সে না পারে পাখি ধরতে, না পাখি তারে ধরা দেয়। আসলে ও পাখি ধরতে চায় না পাখির ওড়াউড়ি নাকি ওদের বুনো জীবন! কারণ তার জন্য একটা গাড়ি কিনে আনা হলে প্রথমে সে দেখে চাকা ঘুরে ছুটছে গাড়ি, তারপরই সে একে একে গাড়ির চাকা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুলে খোঁজে কোথায়…
