ছোট গল্প
-
জাঁকড়
নাহার মনিকা রাস্তার ওপর বেড়াটা দেখলে ময়নার মন কোঁকড়া হয়, যেন একটা সুচ-বসানো সুতার গোল্লা, কেউ কোনো নেড়িকুত্তাকে – ‘আ তু তু, দে দৌড়’ – বলে সুতার বলটা ছুড়ে দিলো, অমনি গড়িয়ে গড়িয়ে কিছুটা খুলে, কিছুটা জট পাকিয়ে ঢালের কাছে গিয়ে ঝুপ। তারপর ঢাল থেকে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েই রাস্তার সঙ্গে একাট্টা, তারপর পার হওয়ার…
-
বাজ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আয়াজের বাবা যখন পা রাখেন আটিরচরে, যমুনা খুব দয়ালু ছিল বড় এই চরটার প্রতি। প্রতি বছর এর আয়তন বাড়ত; চরের মানুষ কিছু ধান, কলাই বাদাম ফলিয়ে গরু চরিয়ে বেশ চালিয়ে দিত দিনকাল। রাজাপুর থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক লাগত আটিরচরে পৌঁছাতে। তারপরও ব্যবসায়ীরা দলবেঁধে আসত। আয়াজের বাবা বলতেন আয়াজকে, এই বছর সাতেক আগেও, নদী…
-
দেহাবশেষ
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত প্লাবন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় Ñ রেখেও যায় কিছু, ফিরিয়েও দেয় কিছু কখনো। বর্ষায় ফুঁসে ওঠা, গ্রীষ্মে ক্ষীণতোয়ার শরীর যখন নিরাভরণ, তখন দেখা যায়। গভীর জলাশয়ের সব সম্পদ নদীতে ফিরে গেলেও পলিতে গাঁথা থাকে তস্কর প্লাবনের লুণ্ঠিত কিছু সামগ্রী। তবে ঠিক যেমনভাবে তাকে নিয়ে গেছিল, তেমন করে ফিরিয়ে দেয় না, সেই চেহারায়ও নয়।…
-
হরকিশোরবাবু
হরিশংকর জলদাস সেদিন সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে হরকিশোরবাবু মারা গেলেন। বইচাপা পড়েই মারা গেলেন তিনি। তাঁর মারা যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। বয়স তাঁর ৫৫ হলেও শরীরে কোনো রোগবালাই ছিল না। প্রেসার ছিল নরমাল, ডায়াবেটিস, ক্ষুধামান্দ্য, মাথা ঝিমঝিম, হাঁটতে কষ্ট – কোনোটাই ছিল না হরকিশোরবাবুর। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির হরকিশোরবাবুর শরীর ছিল সুঠাম, শুধু গলার…
-
পায়রা হামার লদীটো! – কুথা কুন্ঠে বটে তু?
আবুবকর সিদ্দিক চোতবোশেখের নিদয়া রোদে সীসা গলে আসমান ঝলসায় নদীতে আগুন লাগে। দূরে পায়রা নদীতে তপ্ত লাভা ঝলকায়। ওপারে ধোঁয়া ধোঁয়া ঝাপসা আমবাগান। তারো পারে দিগন্ত তামাপোড়া। লয়াগন্জের চক ওটা। এপারে এটা খোজাপুরের দিয়াড়। এখানে গ্রামগুলো গায়ে গায়ে হুমড়ি খেয়ে : নোনাডাঙ্গা, ক্যাশরডাঙ্গা, ঢুলিগাতী, হোসেনগন্জ যেন মায়ের পেটের ভাইবোন। দেখেশুনে একটা শেঁয়াকুলঝোপের আড়াল নিয়ে আরাম…
-
কাছে দূরের গান
প্রশান্ত মৃধা রেণুকা এসেছে! ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দামতন চিলতে জায়গাটায় বিরজাবালা নাতি কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই অপেক্ষা করছে, ছেলে নিখিল কখন আসে। সেই সকালবেলা যায় নিখিল, একটা বড়োসড়ো গাড়ি আসে নিতে, তারপর নাকি কোথায় কোথায় ঘোরে; বলে, ফিল্ডে কাজ। তাই সন্ধ্যার আগে আগে, না তাও সবদিন নয়, কোনো কোনো দিন বিকেলের আলো সামনের বাড়িগুলোর গা থেকে…
-
জয়নাল মাস্টার
দিলওয়ার হাসান আজ থেকে বছর দুয়েক আগে নেতার সঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছিলেন মালঞ্চ গ্রামের যে-চার কৃষক, নেতার আগমন সংবাদ শুনে যারপরনাই খুশি হলেন। সাব্যস্ত করলেন কাল নেতার মিটিংয়ে যাবেন জেলা শহরে। নেতার কথা উঠতেই জয়নাল মাস্টারের কথাও মনে এলো তাদের। কারণ, জয়নাল তাদের এলাকার নেতা। তার বাড়িতেই নেতার সঙ্গে তারা পাত পেতে খেয়েছিলেন। জয়নালের স্ত্রীর…
-
মহিমের জোড়া বলদ
মাহবুব রেজা গঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মরা খালের কাছে এসে দাঁড়ায় সে। অনেকক্ষণ হলো ছাইরঙা সন্ধে উতরে অন্ধকার নেমেছে। অন্ধকার এখনো তেমন জমাট হয়নি। তবে অন্ধকারটা জমাট বাঁধবো-বাঁধবো করছে। কচুরিপানা এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অন্ধকারের ভেতর কচুরিপানাগুলোকে অধিকতর অন্ধকার বলে ভ্রম হয়। কচুরিপানার পাশে বাঁধা লতাপাতা দিয়ে জাংলার মতো করে বানিয়ে অনেকটা জায়গা দখল করে…
-
একটি অশোকগাছ কিংবা কমলারঙের রোদ
রাশেদ রহমান আমার একটি গল্পের চরিত্র হতে চায় নূরুল ইসলাম বাদল। বাদলভাই পদ্মমণি পুকুরের জলের মতো সবার জন্য নিবেদিত – শহরের কোন সাংস্কৃতিক কর্মী অসুস্থ, হাসপাতালে নিতে হবে; কার স্কুলের বেতন বাকি, দিতে পারছে না – কার কাছে গেলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে; বিরাম নেই বাদলভাইয়ের। সেই ছেলেবেলা থেকে সংগঠন করছে; এখনো করে – বউ-বাচ্চা…
-
শঙ্কা
বদরুন নাহার দেশের জনগণ একবার এক মহাআবুলকে চিহ্নিত করে তার পদত্যাগ দাবি করে বসল। অতঃপর নিজেরাই আবুল বনে গেল! সরকার ক্যাছলিং করে মন্ত্রীর রদবদল ঘটালেন। সাপও মরল আবার লাঠিও ভাঙল না! আসলে সাপও মরেনি, কেবল ফণা তোলার বদলে হিস-হিস করে চলতে লাগল। এই হিসহিসানির সময় ফিসফিস করে মানুষ কেবল যানবাহনের হিসাব কষতে লাগল। গরুর গাড়ির…
-
তেরোতম ভুল
মালেকা পারভীন ‘সাগুফতা…’ বলে স্যার চুপ হয়ে গেলেন। আমি তাঁর ঘনঘন নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। যেন কেউ ড্রাম পেটাচ্ছে। যেন আফ্রিকার জেম্বে ড্রামিং রিদম। এত জোরে, কারো নিশ্বাস পড়ার আওয়াজ আমি আগে কখনো শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। আমার ভেতরে কেমন একটা শিহরণ টের পেলাম। সেটা ভয় না অন্য কিছু ঠাহর করতে না পেরে…
-
আদিগন্ত ধূলিঝড়
আবু হেনা মোস্তফা এনাম প্যারালাইজড ওউল্ড হ্যাগার্ডের মৃত্যুসংবাদে চিত্রার্পিত মাছের নির্বাক চোখে চৈতালি প্রজাপতি বিভ্রম সৃষ্টি করলে আলো অথবা রঙের বিক্ষিপ্ত বিন্যাসে মৌমি বিষণœ হয়ে ওঠে। অতঃপর সহসা সমস্ত আলো, রং ও কান্নার ক্রাউডি বিষাদের মধ্যে নীরবতা নামে। তখন ছড়ানো রংপেনসিল, কাগজ, ম্যাজিক মাউন্টেনের উড্ডীন হরিদ্রাভ পৃষ্ঠা, সেলাইয়ের লাল-নীল-আসমানি-হলুদ সুতা এবং এলোমেলো বালিশের মধ্যে তন্দ্রা…
