April
-

শরফুন ও এক শহরের বৃত্তান্ত
ধরমপুর-দোয়ালিয়া রেললাইন ধরে সরকারি নিচু জমি। বর্ষাকাল বাদেও সারাবছর জল ধরে রাখে এক হাঁটু। ধরমপুর কোর্ট ইস্টিশনের কাছে যেখানে শহিদবেদি দম্ভ নিয়ে দাঁড়ানো, তার পেছনে বেশ কয়েকটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ। চৈত-ফাগুনের হাওয়ায় আগুনমুখার ফুল জলে সাঁতার কাটে। মায়ের কাছে শুনেছিল শরফুন, টাকি মাছের ঝাঁক এমন লালপানা হয়ে শ্যাওলার বুকে আতিপাতি করে মুখ ডোবায়। তাই দেখে সে…
-

লকডাউন
মহল্লাটাই যেন একটা গোরস্তান। চারপাশে কোনো শব্দই নেই। বাসাবাড়িতে সবাই ঝিমুচ্ছে, না-হয় রান্নায় ব্যস্ত। কাকটা ডেকে উঠল। ঠিক দুপুর। পাশেই ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টানদের কবরস্থান। সেগুন, মেহগনি আর শিরিষের ডালে বসে আছে ওরা। স্বরে ক্লান্তি নেমেছে। ভয়-ধরানো স্বরে ডেকে চুপ মেরে আছে। এ-কদিনে ওদের কোনো ডাক শোনা যায়নি। মনে হয় কোনো নতুন লাশ নামছে। গত চারদিন যাবত…
-

খোয়ানোর উৎসবে
থমথমে বাড়িটাতে কান পাতলে সামান্য বিরতিতে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ। উঠোনের শেষপ্রান্তে বেড়ার পাঁচিলটা বাইরের দিকে নুয়ে পড়েছে। হয়তো কঞ্চিগুলোর দুর্বলতা নয়তো বাঁধনের তারে জং ধরে পড়েছে ছিঁড়ে। পাঁচিলটা উঠিয়ে ঠিক করার তাগিদ নেই কারো – মোল্লাবাড়ির কারো তো নয়ই, ভাঙা পাঁচিলের পাশে উঠোনের এককোণে যে-খোদেজা বেগম তার তিনটা ছাগলসমেত আশ্রয় নিয়েছে, তারও নয়। পাঁচিলের…
-

লকডাউনের পর
আমরা ভুলে গিয়েছিলাম এই শহর যে শুধু মানুষের নয়। চারশো বছরের প্রাচীন এই শহরকে তিলে তিলে করে তোলা হয় মেগাশহর। একশ চৌত্রিশ বর্গমাইলের এই মহানগরীকে ভরিয়ে তোলা হয়েছিল মানুষে মানুষে। যেদিকেই চোখ যেত কেবল মানুষ আর মানুষ। রাস্তায় বেরোলেই আমরা ভাসতে থাকতাম মানবস্রোতে। রাস্তাগুলো ঢেকে থাকত কফ-থুতু আর আবর্জনায়। বাতাসে ভাসত ধুলা আর ধুলা, সিসা…
-

ঠগিবাজ তৈফুর
হোটেল দিলশাদে এসে প্রথমে মনে পড়ল সারাতুনের কথা, সে ব্যাংক কর্মকর্তা, ভালো পরামর্শক হতে পারে। তারপর কালবিলম্ব না করে ছুটবে মেয়েকে আনতে কুমারখালি। হোটেল দিলশাদ তার পছন্দের হোটেল কারণ এখানে নিজের মতো বাস করতে পারে – পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আন্তরিক পরিবেশ। বস্তুত নোংরা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ খুবই অপছন্দ তার। প্রতিদিন দুবার স্নানে ঘণ্টাখানেক এই কাজে ব্যয় চিত্তে আনন্দ…
-

দেবমানব
কয়েক মাস ধরেই বদরুল্লাহর আঁধারপ্রীতি জন্মেছিল। সেই প্রেমে সাড়া দিয়েই হয়তো ভাগের অটোরিকশা থেকে নেমে তাঁর বাসা পর্যন্ত হেঁটে আসার পথে অর্ধেকের কাছাকাছি সরকারি আলোকস্তম্ভ নষ্ট। কাজেই একবার রাস্তার এপার আরেকবার ওপার করে অন্ধকার বাতির নিচ দিয়েই হাঁটেন তিনি। আঁধারপ্রেমিক হওয়ার কারণেই হোক আর সামাজিক বাস্তবতার খাতিরেই হোক, জৈষ্ঠ্যের এক স্যাঁতসেঁতে-অস্বস্তিকর রাতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেন।…
-

মোহনলালের চা
মামা আর এক কাপ চা দাও তো। মোহনলাল এই বাক্যটা শোনার জন্য সারাজীবন এভাবে মগ্ন হয়ে চা বানিয়ে যেতে চায়। বাস করতে চায়, এই শহরের মানুষের জীবনের চায়ের স্বাদ হয়ে। হিন্দু-মুসলমান ভাবনা তো পরের কথা, ‘মামা’ ডাকটা শুনলেই মনে হয় এ-শহরের সবাই ক্যামেলিয়া অথবা তার মায়ের সহোদর! মনে হয়, সে মোহনলাল নয়, ‘ক্যামেলিয়া’র ডাকা ‘মোহন’।…
-

চিরকুট
ছোট্ট জংশনটিতে গালিব ছাড়া আরো যারা নামল তাদের বেশিরভাগ শ্রমিক শ্রেণির। সম্ভবত আশেপাশে বড় কোনো ফ্যাক্টরি রয়েছে। জংশনটি খুব একটা বদলায়নি আর বদলালেও সেসব খেয়াল করে না গালিব। রিকশা না নিয়ে হেঁটে হনহন করে বাড়ির পথ ধরে। ছোট ছোট চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া যুবকদের কেউ কেউ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে গালিবের দিকে। প্রায় ছয় ফুট…
-

একটু যদি খোলা আকাশ
পা ফেলতে থাকি। উদ্ভ্রান্ত পথিকের ইচ্ছেমাফিক দৃষ্টি কিংবা দৃষ্টির বিভ্রম নিয়ে থানার ঘাটে গাভীর দুধ চায়ে চুকচুক করতে থাকি। একটা প্রশ্ন মন থেকে কিছুতেই তাড়ানো যাচ্ছে না। কাল রাতে আমি কি স্বপ্ন দেখেছিলাম? স্বপ্ন, নাকি স্বপ্নবিভ্রম? জেগে জেগে নির্ঘুমে অবিকল বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একজন কিশোরীর রাঙা লাজুক মুখের ওপর থোকা থোকা রক্তজবা পড়েছিল কি? রক্তজবাগুলো পালটে…
-

ঝরা পাতা
পঁচিশ বছর পর আমেরিকা থেকে দেশে ফিরছি। উদ্দেশ্য ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে আমাদের ব্যাচের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা। শুধু এজন্যেই দেশে ফেরা। বাবা-মা কেউ আর বেঁচে নেই। ভাইবোনরাও পৃথিবীর নানান দেশে ছড়ানো-ছিটানো। স্কুলজীবনের বান্ধবী শেফালী সবাইকে ধরেবেঁধে এক করাচ্ছে। শেফালী এ-বছরই 888sport app বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিল। মনো888sport apkের শিক্ষক বলে হয়তো মনস্তত্ত্ব বুঝে…
-

গন্তব্য
খুব ভোরে ঘুম ভাঙে অর্পিতার। যৌবনের পুরনো আলস্য একেবারে ঝেড়েমুছে বিদায় করেছে গত এক দশক আগে। গৃহকর্মী এক মগ ঈষদুষ্ণ জলে লেবুর রস মিশিয়ে টেবিলে রেখেছে, এইটুকু পান করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বড় মনোরম হেমন্তের সকাল। ভোরের কোমল মিঠে রোদ চারদিকে ঝলমল করছে। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতায় মৃদু কাঁপন। দোতলার বারান্দা ছেড়ে বাড়ির আঙিনায় এসে…
-

যতিচিহ্নের খোঁজে
মেয়েটা তার বাঁ-ভ্রু খানিকটা কাঁপিয়ে চোখটা বাইরে আকাশের দিকে ফেরালে যে-দৃশ্যটার জন্ম হয় তার ব্যাখ্যা হাবিব দিতে পারে না; অনুভব করে, বুকের মধ্যে একটা হাহাকার জাতীয় স্বরহীন শব্দ হয় – খানিকটা উত্তেজনাও একে বলা যায়। বাঁ-চোখের তারার মধ্যে যে-সৌন্দর্যময় রং খেলা করছে বিদ্যুৎপ্রভার মতো, তাকে সে কী বলবে? পঞ্চাশের পরে খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জীবন অতিবাহিত…
