আলবার্ট আইনস্টাইন ও নিলস বোর, বিশ শতকের পদার্থবিদ্যার এই দুই দিকপাল প্রায় সারাজীবন ধরে সম্পূর্ণ বিপরীত দুই বিশ্বদৃষ্টি পোষণ করে গেছেন। প্রথমজনের কাছে জগৎ ছিল চূড়ান্ত বিচারে যৌক্তিক, যেখানে সবকিছুরই যথার্থ একটি অর্থ রয়েছে। আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রাপ্ত বাস্তবতার গভীর অভ্যন্তরে কার্যকারণ সম্পর্কের যৌক্তিক শৃঙ্খল দিয়ে এটি পরিমাপযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য। কিন্তু দ্বিতীয়জনের মতে, এরকম একটি যৌক্তিকতা বা বিন্যাস আশা করা আমাদের উচিত নয়। প্রকৃতির গভীর অভ্যন্তরে আমাদের আশানুরূপ একটি যৌক্তিক বিন্যাস এবং নিয়তিবাদ বা পরিণামবাদ (determinism) বলতে কিছু নেই। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রত্যক্ষ করা গাছ, পাথর, মাছ, পাখি, সাইকেল, মোটরগাড়ির জগৎ থেকে যখনই আমরা আণুবীক্ষণিক জগতে প্রবেশ করব, তখনই আমাদের দাবা খেলার অভ্যস্ত নিয়মটি পাল্টে যাবে। তাই নিলস বোর এ-জগৎকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন – একটি আমাদের পরিচিত ধ্রুপদী জগৎ এবং অন্যটি আমাদের অপরিচিত কোয়ান্টাম জগৎ। অবশ্যই এই দুটি জগৎ একে অন্যের পরিপূরক, তবে জগৎ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধর্মসংবলিত।
বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে এই দুজন খ্যাতনামা পদার্থ888sport apkী অন্তত চারটি দশক ধরেই একে অন্যের সঙ্গে ‘ভদ্রজনোচিত কলহ’ করে গেছেন। আর তাঁদের এ-দড়ি টানাটানিতে দুজনের পাশেই সমবেত হয়ে যোগ দিয়েছেন আরো কিছু জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ – আইনস্টাইনের দলে ছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সূচনাকারী ম্যাক্স প্লাঙ্ক, এরউইন শ্রোডিঙ্গার, লুই দ্য ব্রগলি, ডেভিড বোহ্ম প্রমুখ। অন্যদিকে বোরের অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন অনিশ্চয়তা তত্ত্বের প্রণেতা ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, ম্যাক্স বর্ন, উলফগ্যাং পাউলি, পল ডিরাক প্রমুখ মহারথী। আর খুবই আশ্চর্যের কথা এই যে, বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি নিয়ে যুযুধান দুই দল পদার্থবিদের এই দড়ি টানাটানি এখনো চলছে এবং এ-বিষয়টি এখনো সর্বজনসম্মতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
কোয়ান্টাম বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে পদার্থবিদদের মতদ্বৈততার এই বিবরণ ও ইতিহাস উঠে এসেছে সিয়ান ক্যারোল ও কার্লো রোভেলির সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি বইয়ে। মার্সেলো গ্লেইসারও তাঁর The Island of Knowledge বইয়ে এই বিতর্কের সারবস্তু তুলে ধরেছেন – বোরের কথা অনুসারে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সমীকরণ কি আসলে আমাদের পরীক্ষায় প্রাপ্ত বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে শুধু একটি গাণিতিক হাতিয়ার, নাকি আইনস্টাইনের কথামতো কোয়ান্টাম বাস্তবতার একটি বাস্তব প্রতিনিধি? অন্য কথায়, কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমীকরণগুলো কি শুধু সাহায্যকারী মানচিত্র, নাকি প্রকৃত অবস্থান বা জায়গা?
বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, অন্তত সেটিকে আইনস্টাইন মনে করতেন যে, আণুবীক্ষণিক জগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি একটি অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা। এ-জগতের প্রকৃত বাস্তবতার এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যা আমাদের এখনো অজানা এবং এটি জানতে পারলে কোয়ান্টাম জগতের রহস্যময় বা ভৌতিক আচরণের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা আমরা অবশ্যই পেয়ে যাব। খ্যাতিমান পদার্থবিদ দ্য ব্রগলি এবং পরে ডেভিড বোহ্ম এই ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করতে এগিয়ে আসেন এবং প্রস্তাব করেন Hidden Variable Theory। এই তত্ত্ব অনুসারে দূরবর্তী ঘটনাসমূহ কখনো স্থানীয় ঘটনাসমূহের ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। তাৎক্ষণিক ঘটনাসমূহ সবসময়ই কিছু লুক্কায়িত স্থানীয় চলকের (hidden variables) ফসল। একটি যৌক্তিক ও পূর্বানুমানযোগ্য জগতের জন্য আইনস্টাইনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে এটি ছিল একটি উজ্জ্বল ও সাহসী প্রচেষ্টা; কিন্তু এর মূল্য বিশাল – কারণ প্রতিটি পরমাণু ও কোয়ান্টাম বস্তুর চরিত্র নির্ধারণ করতে সমস্ত মহাবিশ্বকে এতে অংশগ্রহণ করতে হবে।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে পদার্থবিদ জন বেল এই আইডিয়াটিকেই পরীক্ষার আওতায় নিয়ে এলেন। আর এর ফলে সত্তরের দশকে একগুচ্ছ পরীক্ষা, যার অনেকগুলো এখনো চলছে, ব্রগলি-বোহ্ম প্রকল্পকে অকার্যকর প্রমাণ করল। পদার্থবিদরা যাকে ডাকেন non locality বলে, এটিকে গ্রহণ করে নেওয়া তাঁদের কাছেই কষ্টকর হয়ে উঠল। কিন্তু এটি সত্ত্বেও ‘superposition’ নামক কোয়ান্টাম প্রপঞ্চ ঘিরে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার রহস্যময়তা বজায় রইল। এটি নিচের বর্ণনাকৃত চিত্রটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
মনে করা যাক যে, আপনি একটি কক্ষে বসে আছেন বিভিন্ন রঙের অনেকগুলো জামা নিয়ে, যেগুলোর মধ্যে পার্থক্য শুধু রঙে। এই কক্ষের একটি রহস্য হচ্ছে যে, আপনি এতে নানা রঙের জামা পরে অনেকগুলো ভিন্ন সত্তায় রূপান্তরিত হবেন। এসব সত্তার একটিতে আপনি লাল জামা, অন্যটিতে নীল, সাদা, সবুজ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন রঙের জামা পরে ভিন্ন সত্তায় অবস্থান করবেন। কিন্তু কেউ যখন কক্ষের দরজা খুলবে, অথবা আপনি নিজে দরজা খুলে বেরিয়ে আসবেন, তখন এই বিভিন্ন সত্তা থেকে মাত্র একটি সত্তাই বেরিয়ে আসবে, যার গায়ের জামাটি হবে একটি মাত্র রঙের। কক্ষের মধ্যে আপনি বিভিন্ন রঙের জামা পরে আপনার অন্য সত্তাগুলোর সঙ্গে একটি ‘সুপার পজিশনে’ রয়েছেন – কিন্তু ‘বাস্তব’ জগতে আপনার একটি মাত্র সত্তা বা কপি অস্তিত্বমান, যার গায়ের জামাটিও একটি মাত্র রঙের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাস্তব জীবনে আপনার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে সুপারপজিশনে থাকা নানা রঙের জামা পরা সত্তাও কি একইরকম ‘বাস্তব’?
আইনস্টাইনের কাছে চূড়ান্ত বিচারে জগৎ হচ্ছে যৌক্তিক, আর বোরের মতে – জগতের কাছে এরকম যৌক্তিকতা বা শৃঙ্খলা (order) আশা করার অধিকার আমাদের নেই। আইনস্টাইনের অনুসারী আধুনিক পদার্থবিদরা বলেন যে, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সমীকরণগুলো আমাদের বাস্তব জীবনে যা ঘটছে তার সত্যিকার বর্ণনা। তারা যদি সুপারপজিশনকে পূর্বানুমান করে, তবে তা-ই সত্য। সুপারপজিশনকে বর্ণনা করা হচ্ছে তথাকথিত তরঙ্গ ফাংশন দিয়ে (wave function), যা ভৌত বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার একটি অবশ্য প্রয়োজনীয় অংশ। এটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য উত্তম উপায় হচ্ছে ‘বহু-বিশ্ব অধিব্যাখ্যা’ (many world interpretation)। এই অধিব্যাখ্যা অনুসারে বাস্তবতা আরো অদ্ভুতুড়ে (weirder) – যেখানে কক্ষের একটি মাত্র নয়, বরং রয়েছে বহু দরজা। আপনি যখনই কক্ষটি থেকে দরজা খুলে বের হয়ে আসবেন, তখন আপনার সব সত্তাই একই সঙ্গে নানা দরজা দিয়ে বের হয়ে আসবে – আর তা ঘটবে সমান্তরাল অসংখ্য মহাবিশ্বে (Parallel Worlds)। যদি কেউ আপনাকে একটি বিশ্বে নীল জামা পরা অবস্থায় দেখে, অন্য একজন অন্য বিশ্বে আপনাকে লাল জামা পরা অবস্থায় দেখবে। অর্থাৎ আপনার সুপারপজিশনকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন বহু মহাবিশ্বের ধারণা, যে-ধারণাটি সুপারপজিশনের ধারণার চেয়েও অদ্ভুতুড়ে।
ডেভিড বোহ্মের দল এভাবেই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করেন – যে-কোনো একটি রঙের জামা পরে কক্ষ থেকে বের হয়ে আসা আপনি বহু বাস্তবতার মধ্য থেকে একটি বাস্তবতা। কিন্তু অনেক রঙের জামা পরে কক্ষে অবস্থান করা সুপারপজিশনে থাকে লুক্কায়িত বাস্তবতা। রভেলির মতে, যখনই আমি আপনাকে কোনো একটি রঙের জামা পরা অবস্থায় দেখে ফেলব, তখন আমি আপনার ওই নির্দিষ্ট জামাটির সঙ্গে ‘বিজড়িত’ (Entengaled) হয়ে যাব। এটিকে বলা হয় মিথস্ক্রিয়া (Interaction)। এই বিজড়িতকরণ বা মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই বস্তুর ধর্মটি ‘বাস্তব’ হয়ে ওঠে।
আমরা নানা তত্ত্ব তৈরি করি, যেগুলো অনেকটা মানচিত্রের মতো। এসব তত্ত্ব আমাদের সাহায্য করে বাস্তবতাকে অনুভব করতে। তবে আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই যে, তত্ত্ব ও মডেল মূল প্রকৃতি নয়, বরং এগুলো হচ্ছে প্রকৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সত্তা।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.