বাঙালি কে? এই প্রশ্নটি যদি আজ করা হয় তাহলে অনেকেই হয়তো হেসে উঠবেন। কিন্তু প্রশ্নটি কি নিতান্তই অবান্তর? আমজনতা বলবেন : যিনি বাংলায় কথা বলেন, যাঁর মাতৃভাষা বাংলা তিনিই – তো বাঙালি। তখনই হয়তো প্রশ্ন উঠবে, শিক্ষিত বাঙালি সমাজের অনেকেই আজ এ-ভাষায় দক্ষতা অর্জনে কি গৌরব বোধ করবেন, স্বস্তিবোধ করছেন? আজ থেকে কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে ব্যবহারের/ প্রয়োগের নির্দেশ জারি করে এর অন্যথায় শাস্তির বিধান রাখা হলেও আজ বোধ হয় রাষ্ট্রই সে-ব্যাপারে সবচেয়ে দ্বিধান্বিত। বিশেষত সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে, শিক্ষাদীক্ষায়-সংস্কৃতিতে অনগ্রসর একটি নব্য ধনিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি-পটু করার এক উদগ্র বাসনা গত দশকে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাঁরা ভাবছেন, বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষা। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানেও বর্তমানে বাংলা প্রায় পরিত্যাজ্য। উদাহরণস্বরূপ 888sport app বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা-প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি কিছু কিছু কলেজের কথাও বলা চলে (ইংরেজি-মাধ্যম ব্যয়বহুল স্কুলগুলোর কথা বাদই দিলাম) যেখানে বাংলার প্রবেশাধিকারই নেই। অতিসম্প্রতি শ্রেণিকক্ষে বাংলা বলায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন প্রভাষকের চাকরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও 888sport appsের উচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ভাষা ইংরেজি; ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা যখন রায় হাতে পান, তখন তাঁরা বুঝতে পারেন না সেখানে কী লেখা রয়েছে। অনেক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও বিদগ্ধ আইনজীবী মতপ্রকাশ করেছেন, উচ্চ আদালতের ভাষা অবিলম্বে বাংলা করা প্রয়োজন, জনগণের স্বার্থে। তাঁরা এও অভিযোগ করেছেন, ইংরেজিতে লেখা বিচারিক রায়ের ভাষা অনেক সময় ভুলে কণ্টকাকীর্ণ থাকে, অধুনা বিচারকদের ইংরেজি-জ্ঞানের অভাবের কারণে। এই অবস্থা যে কেবল 888sport appsে বিরাজ করছে তা নয়। বাংলা-ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গেও বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষায় পরিণত হচ্ছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সেখানে হিন্দির উৎপাত বেড়েছিল, কিন্তু হিন্দির আক্রমণ বাংলার অগ্রগতি ও বিকাশকে রুদ্ধ বা ব্যাহত করতে পারেনি। মনস্বী ব্যক্তিরা সে-সময় তাঁদের মনীষার, মননের স্বাক্ষর বাংলায় রাখতে দ্বিধা করেননি। রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য কথা888sport live football, 888sport alternative link ও ছোটগল্প। কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজি কেবল শিক্ষাদীক্ষারই মাধ্যম নয়, উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের জীবনচর্চার বাহনও হয়ে উঠেছে। এর একটা বড় কারণ বিশ্বায়নের ফলে ইংরেজির সর্বভারতীয়-ভাষা হয়ে ওঠা।
বিশ্বজুড়ে বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আজ তাদের বহুবিধ পণ্যের বিপণন ও
প্রচার-প্রসারের সঙ্গে তার বাহন হিসেবে ইংরেজিকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব ভারতের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে প্রকট হচ্ছে, কারণ বহুজাতিক সংস্থাগুলো দেশটিকে তাদের পণ্যপ্রবাহ ও বিপণনের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একইসঙ্গে তাদের সহকারী হিসেবে কিছু ভারতীয় বহুজাতিক কোম্পানি বা সংস্থাও গড়ে উঠেছে। এরাও নিজেদের পুঁজি ও পণ্যের বাহন করেছে স্বাভাবিকভাবে ইংরেজিকেই। এরই ক্রমপ্রসারমান ফল ও প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মেরও এক পরম কাক্সিক্ষত বা আরাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠেছে
ইংরেজি-জানা এবং ইংরেজি-বলা, যা জীবন-ক্ষেত্রে এগোনোর পাথেয় হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এই প্রজন্মের কাছে বাংলা মুখের ভাষা হলেও, মাতৃভাষা হলেও, তা-কে তারা জীবনের সঙ্গী করতে পারছে না, সেভাবে ভাবছেও না। মৌখিক ইংরেজি চর্চার ফলে একটা কৃত্রিম বা পরজীবী আবহ ধীরে ধীরে তাদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বাংলা ভাষা জীবনের চর্চার ক্ষেত্র থেকে বিচ্যুত হওয়ায় এ-ভাষায় যে-বিরাট ও মহৎ-সৃষ্টিসমূহ রয়েছে তার সঙ্গে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অধুনা আমার বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের ছেলেমেয়ে যারা স্কুল-কলেজ-জীবনে কৃতী ছাত্রছাত্রীর গৌরব অর্জন করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর অথবা অন্য কোনো মহৎ বাঙালি লেখকের লেখা তারা পড়েনি; এমনকি, পড়ার কোনো আগ্রহও তাদের নেই। মৌল ইংরেজি নয়, মৌখিক ইংরেজিরই চর্চা করে এরা। তাই কথ্য ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করলেও ইংরেজি বা বিশ্বের 888sport app ভাষার মহৎ লেখকদের রচনার সঙ্গে তাদের পরিচিতি নেই বললেই চলে। ফল হচ্ছে এই, জীবনের গভীর উপলব্ধির ক্ষেত্রটা তাদের কাছে প্রান্তবর্তী থেকে যাচ্ছে। প্রায় একই আলেখ্য আমরা নব্বই-পরবর্তী 888sport appsেও দেখতে পাচ্ছি। এখানে এর ভিত্তিটা আরো কিছুটা স্থূল, তা আগেই উল্লেখ করেছি। এখানে পরভৃত ইংরেজি-সংস্কৃতির বাহক হলো নব্য ধনজীবীরা; তাঁদের অনেকে ধন অর্জন করেছেন অনেকটা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এঁদের ধনের বড় একটা অংশ হলো আত্মসাৎকৃত ব্যাংক-ঋণ, অসৎ ব্যবসাও এঁদের ধনের উৎস, যেমন, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং, শ্রমিক শোষণ ইত্যাদি। এঁরা প্রকৃত অর্থে 888sport live chat-উদ্যোক্তা বা বাণিজ্য-উদ্যোক্তা (entrepreneur) নন। শুমপেটার যাঁকে entrepreneur বলেছেন, এঁরা কখনো তা নন। নিজেদের পুঁজি নিয়ে, ঝুঁকি নিয়ে এগোননি এঁরা। রাষ্ট্র যে
ব্যাংক-ঋণ দিয়েছে পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের জন্য, তারই বিরাট অংশ আত্মসাৎ করে তাঁরা বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও যোগসাজশের মাধ্যমেই তাঁদের এ-বিত্ত অর্জন। এঁদের অনেকেরই শিক্ষা ও সংস্কৃতির মান ন্যূনতম পর্যায়ের। বাঙালির শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার যে-বহুবিস্তৃত-শেকড় রয়েছে, তার সঙ্গে এঁদের কোনো আত্মিক যোগ নেই বললেই চলে।
দুই
বাংলা ও বাঙালি-সংস্কৃতির উৎসে যদি আমরা যাই তাহলে দেখব, বাংলা ভাষা প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন। কিন্তু জাতিসত্তা হিসেবে বাঙালির বয়স কয়েক হাজার বছর। এখানে বিভিন্ন জাতি-উপজাতির আগমনের ফলে, নানা বর্ণ ও জাতির মিশ্রণে বাঙালি একটা মিশ্র জাতিসত্তা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। ককেশীয়, ভোটচিন, অস্ট্রিক, নিগ্রোইড ইত্যাদি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিশ্রণেই বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডে। উভয় বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানববসতির প্রমাণ ও উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে। এসবের বিশদ আলোচনায় না-গিয়েও বলা চলে, যখন ইতিহাসের যবনিকা উন্মোচিত হলো সে-সময়ও বিভিন্ন উপজাতিগোষ্ঠীর নামানুসারে বাংলায় বেশকিছু জনপদের পরিচয় আমরা প্রাচীন আর্যগ্রন্থসমূহ যেমন রামায়ণ, মহাভারত ও 888sport app আদিগ্রন্থ যেমন কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পাচ্ছি। পুণ্ড্র, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গৌড়, হরিকেল ইত্যাদি নাম যেমন জনপদের তেমনি বিভিন্ন কৌম বা উপজাতির। আজ এসব কৌমের আলাদা পরিচয় আর নেই। এরা সবাই এক হয়ে মিশে গিয়ে বাঙালি নাম নিয়েছে, বাঙালি হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। বাংলা এদের সবার মুখের ভাষা। বাংলা ভাষার আদিরূপ কী ছিল তার পরিচয় আমরা আজ ভাষাবিদদের গবেষণা থেকে জানি। বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে প্রাকৃত, মাগধী-প্রাকৃত ও মাগধী-অপভ্রংশ থেকে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা ভাষা প্রায় হাজার বছরের। বৌদ্ধ চর্যা ও দোঁহা তার প্রাচীনতম নিদর্শন। প্রকৃতই প্রাকৃতজনের ভাষা এই ভাষা। নিষাদ, শবর, ডোম, চণ্ডালের জীবনগাথাই বারবার ফুটে উঠেছে বাংলা ভাষার এই আদিরূপে।
প্রাচীন বাংলায়, এমনকি পাল ও সেন আমলে রাজসভার ভাষা বাংলা ছিল না, তা ছিল মুখ্যত সংস্কৃত, পালি ও সংস্কৃত-প্রাকৃত। ব্যাখ্যার জন্য বলা যায়, সংস্কৃতের সঙ্গে তুলনা চলে আজকের প্রমিত বাংলার আর সংস্কৃত-প্রাকৃত হতে পারে নোয়াখালী, কুমিল্লা বা 888sport appর কথ্যভাষা, অভিজাত পুরুষরা সংস্কৃত বললেও অভিজাত মেয়েরা বলতেন প্রাকৃত। সংস্কৃত কেবল যে বাংলার অভিজাতবর্গের বা রাজসভার ভাষা ছিল তা নয়, এটি ছিল অভিজাত শ্রেণির সর্বভারতীয় ভাষা। যেমন পরবর্তীকালে ফারসিই ছিল সর্বভারতীয় অভিজাত ভাষা। কারণ ফারসি ছিল রাজসভার ভাষা, রাজকার্য পরিচালনার ভাষা। একাদশ শতক পর্যন্ত সংস্কৃত প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতের বিদ্বজ্জনের ভাষা ছিল। এখানে উল্লেখ করা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না, দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ইয়োরোপজুড়ে বিদ্বজ্জনের ভাষা ছিল লাতিন। ইংল্যান্ডের একজন পণ্ডিত সে-সময় অনায়াসেই স্পেনের কোনো বিদ্বান ব্যক্তির সঙ্গে লাতিনে কথাবার্তা বলতে, ভাব-বিনিময় করতে পারতেন। লাতিন ছিল সর্ব-ইয়োরোপীয় জ্ঞানচর্চার বাহন। ইয়োরোপে বিভিন্ন লৌকিক ভাষার বিকাশ শুরু হয় ভারতীয় উপমহাদেশে লৌকিক ভাষাগুলোর বিকাশের প্রায় সমকালেই, পঞ্চম থেকে দশম শতকে। চতুর্দশ শতকে দান্তে তাঁর ডিভাইন কমেডি রচনা করেন লৌকিক ইতালীয় ভাষায়। একই লৌকিক ভাষায় চতুর্দশ শতকে সনেট রচনা করেন পেত্রার্ক। রেনেসাঁসের সময় বা ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশে লৌকিক ভাষা হিসেবে ফরাসি, জার্মান ও ইংরেজির পরিপূর্ণতা ঘটতে থাকে। এভাবেই ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা এবং পরবর্তীকালে তারই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্য দিয়ে সেসব দেশে জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়।
বাঙালির যে আদিতম ভাষা বৌদ্ধ চর্যা ও দোঁহা, তাকে নিজেদের ভাষার আদিতম উৎস হিসেবে দাবি করেছেন অসমিয়া ও উড়িয়া ভাষাভাষীরাও। এমনকি হিন্দিও চর্যাপদ ও দোঁহাকে তার পূর্বসূরি হিসেবে দাবি করছে – এটা হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ এদের মধ্যে বেশ কিছু মিলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু সুনীতি চ্যাটার্জি প্রমুখ পণ্ডিত নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছেন, চর্যাপদগুলো বাঙালিরই সৃষ্টি এবং তা বাংলারই আদিম নিদর্শন। বাংলা ভাষার যে নিজস্ব একটা রূপ ছিল এবং তা ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল, তা এমনকি বাংলার রাজসভার রাজকবিদের সংস্কৃত ভাষায় রচিত কাব্যে ও লেখায়ও পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। সংস্কৃত ভাষায় ছন্দের শক্তি ব্যঞ্জনবর্ণের মিল বা অনুপ্রাসে নিহিত নয়। কালিদাসের মেঘদূত-এ আমরা পদবিন্যাসে যে-ছন্দ পাই, তার একটি উদাহরণ দিলে তা বোঝা যাবে :
তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী
মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভিঃ।
শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং
যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিরাদ্যেব ধাতুঃ।
কিন্তু জয়দেবের গীতগোবিন্দের ছন্দের প্রাণই হলো ব্যঞ্জনবর্ণের মিল বা অন্ত-অনুপ্রাস।
যেমন : চল সখী কুঞ্জম্/ সতিমির পুঞ্জম্।
অথবা –
বসতি বিপিনবিতানে ত্যজতি ললিতধাম,
লুটতি ধরণীতলে বহু বিলপতি তব নাম।
বিভক্তি চিহ্নগুলো বাদ দিলে এই পদগুলোকে অনায়াসে বাংলায় রূপান্তর করা যায়। বস্তুত জয়দেব বাংলার আপন ঘরের ছন্দই নিয়ে গিয়েছিলেন সংস্কৃত ছন্দে, সংস্কৃতের ছন্দ আনেননি গীতগোবিন্দে।১ আরো যেটা লক্ষণীয়, গীতগোবিন্দ আসলে গান, প্রতিটি পদই রাগরাগিণীতে স্থাপিত। চর্যাপদও গান এবং তাও রাগরাগিণী-আশ্রিত। বাঙালি গানের মধ্যেই তার ভাষার স্বতঃস্ফূর্ততা খুঁজে পেয়েছিল এবং অনুপ্রাসেই তা প্রাণিত-স্পন্দিত হয়েছে। গীতগোবিন্দের পদগুলোর মতো প্রায় সব চর্যাপদেই রয়েছে অন্ত্যানুপ্রাস যেমন, ‘কা তরুবর পঞ্চবি ডাল/ চঞ্চল চিএ পৈঠ কাল’ ইত্যাদি।
বাঙালির ছড়ার ছন্দও বাঙালির মুখের ভাষা। খনার বচন, ডাকের বচন ইত্যাদির মধ্যেও আমরা বাঙালির মুখের ভাষার পরিচয় পাই, যদিও এদের বর্তমান রূপটি হলো মার্জিত, পরবর্তীকালের পরিমার্জনার সৃষ্টি। বাংলা ভাষার আদি প্রাণস্পন্দন প্রাকৃতজনের মধ্যেই, বাংলার গ্রামের নিভৃত কন্দরেই মূর্ত হয়েছিল।
তিন
অষ্টম শতকে পাল রাজাদের রাজত্ব শুরুর ৩০০-৪০০ বছর আগে থেকেই বর্তমানে যাকে আমরা বঙ্গভূমি বলি (অর্থাৎ প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, হরিকেল, বঙ্গ, রাঢ় ইত্যাদি), সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৌম সমাজ ভেঙে গ্রামের প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল। বিভিন্ন কৌম বা উপজাতি-গোষ্ঠী বনজঙ্গল কেটে স্থায়ীভাবে গ্রামের গোড়াপত্তন ঘটাচ্ছিল। এইসব গ্রাম এবং গ্রামীণ-কৃষিজীবী ও গ্রামীণ-কারিগরের উৎপাদনের উদ্বৃত্ত অংশবিশেষের উপর ভিত্তি করেই বিশাল পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। পাল রাজবংশের প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাসের পুরো সময়ব্যাপী গ্রাম প্রতিষ্ঠা চলেছিল। কেবল বাংলায় নয়, উত্তর ভারতজুড়ে এভাবে গ্রাম প্রতিষ্ঠার এক অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক বিবরণ আমরা দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বির ইতিহাসচর্চার মধ্যে পাই। মৌর্য-পূর্ব যুগে শুরু হয়ে এই প্রক্রিয়া প্রায় হাজার বছর ধরে বাংলায় চলেছে; এমনকি ব্রিটিশ আমলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে গ্রামের প্রতিষ্ঠা চলেছে। পাল শাসনের আগে বিভিন্ন কৌমগোষ্ঠী বাংলার বিভিন্ন জায়গায় তাদের বসতি স্থাপন করেছিল (আর এদের নামেই এসব জনপদের নামকরণ হয়, এটা আগেই উল্লেখ করেছি যেমন, বঙ্গ, পুণ্ড্র, রাঢ় ইত্যাদি)। কালের প্রবাহে অবশ্য তাদের কৌম নাম বি888sport sign up bonusর গর্ভে হারিয়ে গেছে। এই সব জনপদে সমৃদ্ধ নগরও গড়ে উঠেছিল – মহাস্থানগড়, কর্ণসুবর্ণ, রামাবতি, লক্ষ্মণাবতি, গৌড়, তাম্রলিপ্তি ইত্যাদি, ইতিহাস যার নিদর্শন ও 888sport sign up bonus বহন করছে।
এই বক্তব্যও হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, পাল-পূর্ব যুগে যেভাবে বিভিন্ন নগর-বিকাশের উল্লেখ আমরা পাই পরবর্তীকালে তা প্রায় সুর্নিরীক্ষ্য। এর একটি বড় কারণ হল, পাল-পূর্ব যুগে ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে প্রাচীন রোম, গ্রিস, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বাইজানটিয়াম, মিশর ইত্যাদির যে-বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং তার ফলে বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে নগর-বিকাশের যে-সূচনা হয়েছিল পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে বিশাল রোমান সাম্রাজ্যের পতনে বাঙালির সেই সমুদ্র-বাণিজ্যের বিকাশ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পাল যুগে 888sport apps একটি সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর, প্রায়-বাণিজ্যহীন জনপদে পরিণত হয়। এই জনপদের বৈশিষ্ট্য ছিল নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবন (বাংলায় বাণিজ্যের বিকাশ অনেক পরে, ষোড়শ শতক থেকে আবার জোরালোভাবে শুরু হয়)।
বাংলার এই গ্রামীণ জনপদের বা গ্রামের বৈশিষ্ট্য এভাবে বর্ণনা করা যায় : গ্রামের মুখ্য অধিবাসী ছিল কৃষিজীবী ও গ্রামীণ কারিগরশ্রেণী, পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 888sport app পেশার কিছু লোক যেমন, শিক্ষক, পুরোহিত, পণ্ডিত, ঢালী, ঢুলী ইত্যাদি। প্রত্যেক গ্রামেই ছিল নিজস্ব কারিগরশ্রেণী অর্থাৎ কামার-কুমোর, ছুতোর, তাঁতি, নাপিত, ধোপা প্রমুখ। কৃষক-গৃহস্থ ও 888sport app গৃহস্থের সারা বৎসরের কারুকর্মের চাহিদা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় দা, খন্তা, লাঙল, লাঙলের ফলা, হাঁড়ি-কুড়ি, ঝুড়ি, পরিধেয় বস্ত্র ইত্যাদির প্রয়োজন এরাই মেটাত। প্রতিদানে এরা গ্রাম থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ও কৃষকের উৎপাদনের উদ্বৃত্তের অংশবিশেষ পেত। গ্রামগুলোকে নিজের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে সচরাচর বাইরের মুখাপেক্ষী হতে হতো না। লোহা, তামা, সোনা, রুপো ইত্যাদি ধাতু ও লবণই কেবলমাত্র গ্রামের বাইরে থেকে আসত। স্বনির্ভর এসব গ্রাম প্রায় হাজার বছর ধরে এইভাবে আপন অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। এইসব গ্রামের নিস্তরঙ্গ প্রবাহ গ্রামীণ কৃষক ও গ্রামীণ কারিগরকে শান্তিময় জীবন দিয়েছিল, যদিও এই-জীবনে নগর-জীবনের বহুমুখী ব্যঞ্জনা ও উল্লাস ছিল না। গ্রামীণ উৎসব ও বারো মাসে তেরো পার্বণ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ছিল নিতান্ত একঘেয়ে ও বর্ণহীন। এর মধ্যে নগরের বৈচিত্র্য, বৈভব ও বৈদগ্ধ্যের ছিল একান্ত অভাব।
পরবর্তীকালে মুসলিম শাসনামলে রাষ্ট্রশক্তিতে যে পরিবর্তন আসে তার ফলে বাংলার সমাজজীবনের উপরিস্তরে নানাবিধ পরিবর্তন ও রূপান্তর সূচিত হলেও গ্রামীণ লৌকিক স্তরে তার ছোঁয়া লাগেনি। একই ধরনের গ্রাম ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। চার্লস মেটকাফ এই গ্রামগুলোকেই ‘গ্রাম প্রজাতন্ত্র’ বা ‘Village Republic’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এরই বর্ণনা আমরা পাই মার্কসের ‘ভারতীয় গ্রামের’ বিবরণীতে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে আমরা পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান গ্রামের যে-বর্ণনা পাই আচারগত এবং বর্ণভেদের কিছুটা পার্থক্য থাকলেও অর্থনীতির মূল-কাঠামো ছিল এই দু-গ্রামে প্রায় একই। এ-থেকে অবশ্য একথা ভাবলে ভুল হবে যে, গত তেরশো/ চৌদ্দশো বছরের বাংলার রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবন ছিল পরিবর্তনহীন। এখানে নানা পরিবর্তন ঘটেছে জীবনের বহিরঙ্গনে – পরিধেয় বস্ত্রে, আচার-ব্যবহারে, ভব্যতা ও সম্ভাষণের ক্ষেত্রে, কাব্য ও 888sport live chat-সংস্কৃতির জগতে, স্থাপত্য-রীতিতে, এমনকি রন্ধনপ্রণালি ও খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে, পিঠা-পুলির বৈচিত্র্যে। কিন্তু জীবনের মৌল অর্থনীতি বা গ্রামীণ কাঠামোর অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমিতে তেমন কোনো বৃহৎ আলোড়ন হয়নি,
যে-ধরনের আলোড়ন আমরা পশ্চিম ইয়োরোপের বিগত এক হাজার বছরের ইতিহাসে দেখতে পাই। এখানে বৃহৎ কোনো সামন্ত-কৃষক বা সামন্ত-ভূমিদাস সংঘাত গ্রামীণ জীবনকে সহিংস, বিক্ষুব্ধ বা প্রচণ্ডভাবে আন্দোলিত-আলোড়িত করেনি। এখানে ভূমির উপর কৃষকের মৌলিক অধিকারে সামন্তপ্রভু কখনো তার থাবা বিস্তার করেনি। রাষ্ট্রের বা রাজশক্তির পক্ষ থেকে যাঁদের খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাঁদের অধিকার খাজনা-আদায়ে বা কৃষকের উৎপাদনের উদ্বৃত্ত আহরণেই সীমাবদ্ধ ছিল, কৃষককে কখনো তা জমিচ্যুত করেনি। কৃষক সম্প্রদায় বংশানুক্রমে তাদের জমি নিজ দখলে রেখে আবাদ করে উৎপাদনের কিছু অংশ রাষ্ট্র বা রাজশক্তিকে খাজনা হিসেবে দিয়ে গেছে।
এই চিত্র উপমহাদেশব্যাপী অনেকটা একরকমের হলেও লৌকিক বৈচিত্র্য অবশ্যই তার মধ্যে ছিল। পূর্ব ভারতের, যেমন 888sport apps এবং আসামের গ্রামগুলো ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই উত্তর ভারতের গ্রামগুলো থেকে ভিন্ন ছিল। উত্তর ভারতের গ্রামগুলোতে আমরা দেখি কৃষকদের থাকার জায়গাগুলো গুচ্ছবদ্ধ (cluster of homes), অনেকগুলো ঘরের অবস্থিতি একসঙ্গে। অনেক সময় ঘরগুলো তৈরি করা হতো এবং এখনো করা হয় কয়েকটি কুয়ো বা একটি বড় বদ্ধ জলাশয়ের চারপাশে। বসতবাড়িগুলোকে ঘিরেই থাকে বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি। এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের ভিন্নতা বা পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। কিন্তু বাংলার গ্রাম সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বসতবাড়িগুলোর অবস্থান গড়ে উঠেছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। প্রায় সব গৃহস্থের ছিল এবং এখনো অনেকের রয়েছে নিজস্ব পুকুর বা জলাশয়। গ্রামের পাশ দিয়ে, ভেতর দিয়ে বহমান ছিল বহু নদী-নালা-খাল-বিল, যা সংবৎসর কৃষকের, গৃহস্থের আমিষের জোগান দিত। এজন্যই প্রবাদ হয়েছিল ‘মাছে-ভাতে-বাঙালি’। (গ্রামের মধ্যে বর্ণ ও পেশাভিত্তিক পাড়া ছিল, কিন্তু তার চরিত্র উত্তর বা দক্ষিণ ভারতের গ্রামের মতো ছিল না বা এখনো নয়)।
এটা বললে হয়তো অসংগত হবে না, বাংলার গ্রামই বাঙালির সত্তা, বাঙালির মানস ও বাঙালির পরিচয়কে গড়ে তুলেছে হাজার বছর ধরে। প্রাক্-ব্রিটিশ বাংলার 888sport live football-সংস্কৃতি মুখ্যত বাংলার গ্রামেরই সৃষ্টি, গণমানুষের নন্দনতাত্ত্বিক চর্চার ফসল। বাঙালির আদিতম 888sport live football চর্যা ও দোঁহা যাঁরা রচনা করেছেন তাঁরা রাজসভা থেকে বহুদূরে নিভৃত গ্রামের লোকজ জীবনাচারের কথাই বলেছেন। তাই তাঁদের লেখায় হাঁড়ি, ডোম, কৈবর্ত, ব্যাধ, শবর-শবরীর কথা, অপাঙ্ক্তেয় মানুষের কথা বাস্তব হয়ে উঠে এসেছে। তাঁরাই বলেছেন, ‘ভূষক বাঙালি ভৈলি’। প্রাকৃতে এবং অপভ্রংশে লিখেছেন মনের কথা, সংস্কৃতে নয়; উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে, সংস্কৃত জীবনাচরণের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ মূর্ত হয়েছে এ-সব লেখায়। বাংলার ইতিহাসে আমরা দেখি, এইসব মানুষ কখনো কখনো সংঘবদ্ধ হয়ে রাজসিংহাসনও দখল করেছে। পাল আমলের প্রায় শেষভাগে দিব্যোক ও ভীমের ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
চার
চতুর্দশ শতকের শেষে বা পঞ্চদশ শতকের শুরুতে বাংলা ভাষা তার প্রায়-বর্তমান রূপ পেয়েছিল। এসময়েই একদিকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন অন্যদিকে বৈষ্ণব পদাবলী রচিত হয়েছিল মুখ্যত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে অবলম্বন করে। এই কৃষ্ণ মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবতগীতা বা ভাগবত-এর কৃষ্ণ নন যথার্থ অর্থে। এই কৃষ্ণ একটু স্থূলভাবে বললে বলা যায় একজন প্রেমিক বাঙালি, যার প্রথম অভিনব প্রকাশ আমরা দেখি বাংলা-সংস্কৃত গীতগোবিন্দে। বড়ু চণ্ডীদাসের আদি-বাংলায় লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মধ্যে দু’জন নর-888sport promo codeর দৈহিক প্রেমের কথাই কিছুটা গ্রাম্য স্থূলতার সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে, যদিও মাঝে মাঝে কবিত্বশক্তির কিছু কিছু স্ফুরণ চকিত বিদ্যুতের মতো তাতে মূর্ত। বৈষ্ণব পদাবলীতেই প্রেম এক ‘অসাধারণ রূপ’ পরিগ্রহ করেছিল, বিশেষভাবে বিদ্যাপতি (ব্রজবুলী), দ্বিজ চণ্ডীদাস, গোবিন্দ দাস, জ্ঞান দাস প্রমুখের গীতি888sport app download apkয়। রেনেসাঁস কবিদের মতোই দেহাতীত প্রেমের অনন্য কাব্যরূপ সৃষ্টি করেছিলেন এঁরা। চণ্ডীদাসের ‘সখী, বলিতে বিদরে হিয়া আমারি বঁধুয়া আন্ বাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া’ অথবা ‘আমারো পরাণ যেমতি করিছে। তেমতি হউক সে’, অথবা ‘রামীর প্রেম নিকষিত হেম/ কামগন্ধ নাহি তায়’ বা বিদ্যাপতির ‘লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু/ তবু হিয়ে জুড়নো ন’ গেল’ প্রভৃতি চিরায়ত অমর প্রেমের 888sport app download apk। চণ্ডীদাসই অসাধারণ ভাষায় লিখেছিলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই/সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে, কী করে এইসব কবি ইয়োরোপীয় রেনেসাঁসের মর্মবাণী : মানুষই সবার উপরে, মানুষই সবকিছুর নিয়ন্তা, পরিমাপক এই উপলব্ধিতে বাংলার নিভৃত পল্লিতে বসেই উপনীত হয়েছিলেন। অনস্বীকার্য, এই সময় বাংলায় এক অপূর্ণ রেনেসাঁসের সূচনা হয়েছিল। বৈষ্ণব কবিরা, শ্রীচৈতন্য ও সুফি কবিরা প্রায় সমবেতভাবে এই মানবতাবাদের, বা ‘প্রেমই সবকিছুর উপরে’ এই বাণী প্রচার করেছিলেন বাংলা-জুড়ে।
মনে রাখা প্রয়োজন, সময়টা ছিল স্বাধীন সুলতানদের আমল। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, নসরত শাহ, ছুটি খাঁ, পরাগল খাঁ প্রমুখের পৃষ্ঠপোষকতা বাংলা 888sport live footballের বিকাশকে যে অনিরুদ্ধ করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শাহ্ মুহম্মদ সগীর, আলাওল, দৌলত উজির বহরম খাঁ, সৈয়দ সুলতান, কোরেশী মাগন ঠাকুর প্রমুখ মুসলমান কবির লেখা আখ্যানকাব্য (যেগুলো ছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক) এবং মঙ্গলকাব্য এই সময়ই বাংলা 888sport live footballকে নবরূপ দিয়েছিল। মঙ্গলকাব্য অনেকেই লিখেছেন, এঁদের মধ্যে নারায়ণ দত্ত এবং বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল বিশেষভাবে উল্লেখ্য। মনসামঙ্গল একান্তই গ্রামবাংলার সর্পভীত মানুষের কাব্য, কিন্তু তবুও এতে আমরা চাঁদ সদাগরের মতো এমন একজন অসাধারণ চরিত্রের দেখা পাই, যিনি শত প্রতিকূলতা ও বিপদের মধ্যেও কুটিল কুচক্রী মনসা দেবীর কাছে মাথা নত করেন না। এই অনম্য মেরুদণ্ডী চরিত্র আমাদের প্রমিথিউস বা পরবর্তীকালের মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণকে মনে করিয়ে দেয়। এ-ধরনের দু-একটি চরিত্র (যেমন কালকেতু) মঙ্গলকাব্যে থাকলেও এর পরিমণ্ডল মুখ্যত গ্রামের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ। এই কাব্যগুলোতে কোনো বৃহৎ বা মহৎ কথা নেই, অজেয় মানুষের কথা নেই, সমাজের শৃঙ্খল দীর্ণ করার বা ভাঙার কথা নেই ইয়োরোপীয় রেনেসাঁস-888sport live footballের মুখ্য বাণী। বাঙালি সংস্কৃতি ও কাব্যচেতনা পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে নানাভাবে বিকশিত হলেও তা যে বাঙালিকে তার পল্লীর ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারেনি ইয়োরোপীয় রেনেসাঁস যেভাবে পেরেছিল, তার কারণ এই সমাজের বিকাশের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই দেখা যাবে। ইয়োরোপীয় রেনেসাঁস বিকশিত হয়েছিল বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি এবং স্বায়ত্তশাসিত নগর-বিকাশের পটভূমিতে; নব উন্মেষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানের নানা দিগন্ত উন্মোচনের ফলে। বাঙালির শিক্ষা তখন টোলে-পাঠশালায়, মাদ্রাসা ও মক্তবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ক্ষুদ্রতার বৃত্ত থেকে তা বেরুতে পারেনি। বাংলার পাল আমলে ও তার আগে এবং আরব বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যেসব বিশ্ববিদ্যালয় একসময় গড়ে উঠেছিল, বহু আগেই সেগুলোর প্রাণশক্তি নিঃশেষিত হয়েছিল। ফলে জ্ঞান এবং চিত্ত পল্লির স্বাভাবিক প্রাণরসে সঞ্জীবিত হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যেই ঘুরে মরেছে। কিছু কিছু ব্যক্তি তাঁদের ব্যক্তিজীবনের অসাধারণতায় তা অতিক্রম করতে পারলেও সাধারণ জনচিত্তে তার কোনো বড় তরঙ্গাভিঘাত ঘটেনি।
পাঁচ
ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধ থেকে সপ্তদশ শতক পুরো ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমাধ পর্যন্ত ইয়োরোপীয় বণিক কোম্পানিগুলোর সংস্পর্শে এসে বাংলায় অবশ্য এক অভূতপূর্ব বাণিজ্যের উন্মেষ ঘটেছিল। 888sport live chat বিকাশেরও বৃহৎ সূচনা হয়েছিল।২ বাংলা ইয়োরোপের (সুতি ও রেশমি) বস্ত্র আহরণের অন্যতম মুখ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশি-বিদেশি বণিকরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আড়ত বা বস্ত্র আহরণের অনেক কেন্দ্র খোলা শুরু করে। একপর্যায়ে বস্ত্র-888sport live chatী বা শ্রমিকদের একটি আচ্ছাদনের তলায় নিয়ে এসে কারখানার প্রারম্ভও হয়েছিল, যাকে পুঁজিবাদ বিকাশের প্রাক্-প্রস্তুতি বলা চলে। কিন্তু তা পূর্ণতা পাওয়ার আগে উপমহাদেশে বাংলা-ই প্রথম ঔপনিবেশিক শোষণের নিগড়ে আবদ্ধ হল। এ-সময় বাংলার মাথাপিছু আয় ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে কম ছিল না (বার্নিয়ার, ট্যাভার্নিয়ার ও মানুচির বর্ণনা দ্রষ্টব্য)। কিন্তু বাংলার স্বাধীন সুলতানরা আকবরের কাছে হেরে যাওয়ার ফলে মুঘল শাসনের প্রায় দ্বিশতাধিক বছরে 888sport apps থেকে বড় ধরনের সম্পদ উত্তর ও পশ্চিম ভারতে স্থানান্তরিত হয় (অবশ্য তা সত্ত্বেও সুবা বাংলাই ছিল সারা ভারতের সবচেয়ে ধনী অঞ্চল)। এ-সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও 888sport live chatের অসাধারণ স্ফুরণের ফলে মুর্শিদাবাদ, 888sport app, হুগলি, চন্দননগর ইত্যাদি অনেকগুলো শহর ও নগরের বিকাশ হয় বাংলায়। এছাড়া আরো বহু ছোটখাটো গঞ্জেরও পত্তন ঘটেছিল। মুর্শিদাবাদ, 888sport app প্রভৃতি শহর যে-বিরাট ব্যাপ্তি ও ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েছিল তা ঔজ্জ্বল্য ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেকালের প্যারিস ও লন্ডনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, একথা ইয়োরোপীয় বণিক ও পর্যটকরা লিখেছেন। রবার্ট ক্লাইভ নিজেই মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধির এই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। 888sport appsের বণিকদের, বিশেষত কয়েকটি পরিবারে এসময় পুঁজির বিশাল সঞ্চয়ও হয়েছিল। এইসব পুঁজির মালিকরা বিভিন্ন ইয়োরোপীয় বণিক কোম্পানিকেও টাকা ধার দিত, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলায় বা এই উপমহাদেশের কোথাও যথার্থ অর্থে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেনি; পুঁজিবাদের অনেকগুলো প্রাক-শর্তের বিকাশ সত্ত্বেও।
এই সময় সর্বভারতীয় এবং বাংলার রাজভাষা ছিল মুখ্যত ফারসি। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমাজের উচ্চশ্রেণি ফারসির চর্চাই করেছেন রাজানুগ্রহ বা রাজচাকরি পাওয়ার জন্য। অবশ্য সাধারণ মানুষের জীবনচর্চার ভাষা ছিল বাংলা, হিন্দু-মুসলমান উভয়ের। সন্দ্বীপের মুসলমান কবি তাই উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন, বাঙালি-মুসলমান তার মনের ভাব, আকুতি প্রকাশ করবে বাংলাতেই। বাংলাকে উপেক্ষা করে যারা অন্য ভাষার চর্চা করতে চায়, তাদের বাঙালি পরিচয় নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’
888sport appsের এই সময়ের শহরগুলো এবং তারও আগে পুণ্ড্রবর্ধন, তাম্রলিপ্তি, কর্ণসুবর্ণ, রামাবতী, লক্ষ্মণাবতী, গৌড়, পান্ডুয়া ইত্যাদি নগর প্রশাসনিক-কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে সমৃদ্ধি অর্জন করলেও প্রকৃত অর্থে লোকজ সংস্কৃতির, লৌকিক বা বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখেনি। পাল, সেন, সুলতানি ও মুঘল আমলের রাজভাষা বা প্রশাসনের ভাষা ছিল যথাক্রমে সংস্কৃত, পালি ও ফারসি (পরবর্তী ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি)। প্রাকৃতজন, অর্থাৎ বাঙালির মুখের ভাষা কোনোদিন রাজভাষা না হওয়ায় বাংলা সেকালের উচ্চ ও মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি-চর্চার মুখ্য বাহনে বা মাধ্যমে পরিণতি লাভ করে ভাষাভিত্তিক জাতীয় চৈতন্যের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়নি। এখানেই, ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতক থেকে জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা যে-ভূমিকা নিতে পেরেছিল তার অভাব বাংলায় এবং উপমহাদেশের 888sport app অঞ্চলে আমরা দেখতে পাই। নরমান বিজয়ের ফলে ইংল্যান্ডের রাজভাষা প্রায় তিনশো বছর ধরে (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দ-১৩৬২ খ্রিষ্টাব্দ) ফরাসি ছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ শতকেই ধীরে ধীরে ফরাসির পরিবর্তে ইংরেজি ইংল্যান্ডের রাজভাষার রূপ নিতে শুরু করে। অবশ্য এর পেছনে বুর্জোয়া বিকাশের একটা বড় ভূমিকা ছিল। জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, স্পেন ও স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোয় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশেরও প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ধনতন্ত্র; তারই পরোক্ষ ফল হিসেবে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শ্রেণীর অধিকার আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে গণতন্ত্রের বিকাশ জাতীয়তাবাদের উন্মেষে প্রেরণা জুগিয়েছিল। এই উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তা হয়নি, হয়নি 888sport appsেও। এর প্রধান কারণ, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলার গণজীবনে বিচ্ছিন্ন ও প্রায়-স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামগুলোর বিরাট প্রভাব। এই গ্রামগুলো প্রায় নিস্তরঙ্গ জীবনের নীড় ছিল। এখানে কোনো অধিকার-আন্দোলন জনচিত্তকে বিক্ষুব্ধ ও ব্যাকুল করে শ্রেণী-অধিকার বা জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটায়নি; বর্ণ, কুল ও গ্রামীণ চেতনার বাইরে মানুষের ভাবনা তেমনভাবে প্রসারিত হয়নি, হওয়ার প্রয়োজনও হয়নি। আমরা আগেই দেখেছি, ভাষা-ভাবনা ছিল, ভাষা নিয়ে এক ধরনের গর্ববোধও বাংলায় ছিল। সেই ভাষায় 888sport live footballচর্চা, মুখ্যত কাব্যচর্চা হয়েছে; সেই কাব্যচেতনায় প্রতিভা ও 888sport live chatশ্রীর স্ফুরণও দেখা গেছে, কিন্তু তা প্রকৃত জাতীয় চৈতন্যে রূপ নেয়নি। ফলে জাতীয় চৈতন্যের মুখ্য বাহন গদ্যের বিকাশও তেমনভাবে ঘটেনি।
ছয়
বাঙালির জাতীয়তাবাদের বিকাশের জন্য ইংরেজি শাসনের অভিঘাতের প্রয়োজন হয়েছিল। ইংরেজ অধিকারে এসেই ইংরেজি ভাষা শিখে, ঔপনিবেশিক-অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নের শিকার হয়েই বাঙালি তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়। বাঙালির সংস্কৃতিজীবনে আমরা দু’টি রেনেসাঁস বা নবজাগরণের দেখা পাই। একটির কেন্দ্র ছিল উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের কোলকাতা। এই রেনেসাঁসের বিকাশের সময়কাল প্রায় সাত দশক, উনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত। দ্বিতীয় রেনেসাঁসের উজ্জীবনের কেন্দ্র ছিল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের 888sport app; এর সময়কালও প্রায় অর্ধশতাব্দী, বিংশ শতাব্দীর পঞ্চম দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত। প্রথম রেনেসাঁসটি সম্পর্কে বহু আলোচনা হয়েছে, তাই এর বিশদ আলোচনার এখানে তেমন প্রয়োজন নেই। খালি একথাটি মনে রাখা দরকার, এই সময়কালেই বাংলা গদ্যের যথার্থ বিকাশ ঘটেছিল এবং সেই বিকাশে ইংরেজ শাসনের, বিশেষত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের একটা অবদান রয়েছে। ইয়োরোপের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতির অপূরণীয় ধ্বংস সাধন করেছে। উত্তর আমেরিকার প্রায় সব উপজাতীয় বা লৌকিক ভাষা (Ethnic Language) বিলুপ্ত হয়েছে। ওই মহাদেশের মুখ্য ভাষা বর্তমানে ইংরেজি, ফরাসি ও স্পেনীয়। দক্ষিণ আমেরিকায়ও অনেক লৌকিক ভাষা সম্পূর্ণভাবে বি888sport sign up bonusর অতলে তলিয়ে গেছে, আর তার স্থান নিয়েছে স্পেনীয় ও পর্তুগিজ। অবশ্য কিছু লৌকিক ভাষা এখনো ওই মহাদেশে নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রাম টিকিয়ে রেখেছে।
এশিয়া মহাদেশে ঔপনিবেশিক শোষকরা বিজিত দেশগুলোর ভাষাকে নির্জিত করতে সক্ষম হয়নি। এর কারণ, এইসব দেশের সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ভাষার ঐশ্বর্য (সমৃদ্ধ গদ্য না থাকলেও) ইয়োরোপ থেকে খুব বেশি দীন বা ন্যূন ছিল না। বিভিন্ন ভাষাভাষী লোকের 888sport free betও অনেকক্ষেত্রে ছিল বিরাট। তাই উপনিবেশের ভাষাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা না-করে তাকেই ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসন ও শোষণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (যদিও মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতিগত-ইংরেজ আমলাদের শিক্ষিত করা) এবং বাংলা গদ্যের বিকাশে রাজানুগ্রহ এরই ফলশ্রুতি (অবশ্য ১৮৩৭ সালের পর থেকে ফারসির বদলে ইংরেজিই হয়েছিল প্রশাসনের ভাষা)। এটা দেখা গেছে, যখনই দুটি উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে সংঘাত বা মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে, তখন দুটোরই বা কোনো একটির মধ্যে এক ধরনের গতিবেগের সঞ্চার হয়েছে। ইয়োরোপীয় সংস্কৃতি, বিশেষভাবে ষোড়শ শতক থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত ইংরেজের 888sport live football, সংস্কৃতি ও সামাজিক অর্থনীতির যে বিপুল বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল তার সংস্পর্শে এসে বাঙালি মধ্যবিত্তের, বিশেষভাবে যাঁরা ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা ঘটে। রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই নবজাগরণ-বোধে উদ্বুদ্ধ হয়েই মানুষের বিশেষত বাঙালির মনুষ্যত্ব ও অধিকারবোধকে নবচেতনায় জাগ্রত করেছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল এই-বোধেই সঞ্জাত।
বাঙালি জনগোষ্ঠী হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাইকে নিয়েই গঠিত। এর মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় দুটিই 888sport free betগরিষ্ঠ। প্রায় আটশো বছর ধরে এরা পাশাপাশি বাস করে এসেছে বাংলার নিভৃত পল্লিতে। শহর-নগরগুলোতে এরা পরস্পরের প্রতিবেশী ছিল। সেই ষোড়শ শতকেই মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে পাশাপাশি অবস্থিত হিন্দু ও মুসলমান গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান দু’টো সমাজই অসংখ্য স্তরে বিভক্ত। নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই তারা নানাভাবে শোষিত ও নিয়ন্ত্রিত। উভয় সম্প্রদায়েরই সবচেয়ে বড় শোষিত গোষ্ঠী হল সাধারণ কৃষক ও গ্রামীণ কারিগর। এককথায়, শোষিত শ্রেণি হিসেবে বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু কৃষকের মধ্যে অর্থাৎ 888sport free betগরিষ্ঠ বাঙালির মধ্যে তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। তবুও, সম্প্রদায়গত রেষারেষি বা দ্বেষ অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে communalism, একেবারেই ছিল না বলাটা বোধ হয় সত্যের অপলাপ হবে। প্রাচীন বিশ্বে (এমনকি অধুনা জগতেও) আমরা দু’টি বড় বিভেদের দেখা পাই। একটি হল, জাতি-উপজাতিগত (tribal) ও বর্ণগত (racial); অন্যটি ধর্মের বিভাজন (religious), এমনকি একই ধর্মের মধ্যে পন্থা বা ফেরকা নিয়েও বিভেদ।
এই উপমহাদেশে আর্যদের যখন অনুপ্রবেশ ঘটেছিল তখন অনার্য সম্প্রদায় তাদের দ্বারা বিজিত হয়ে শোষণের শিকার হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পণ্ডিতদের অনুমান, সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে
বর্ণ-বিভাজন বা বর্ণভেদ প্রথা এর থেকেই জাত। 888sport app দেশেও আমরা বিজয়ী উপজাতি পুরো বিজিত উপজাতিকে ক্রীতদাসে পরিণত করেছে বা নানাভাবে শোষণ করেছে তার 888sport free betতীত উদাহরণ দেখি। আজও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখ্য কারণ tribal বা উপজাতীয় সংঘাত। সাম্প্রতিককালেও সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, নাইজেরিয়া ইত্যাদি দেশ এই ধরনের সংঘাতে বিদীর্ণ। বাংলা যখন তুর্কি শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই বিজয়ী জাতি বিজিত স্থানীয়দের উপর কিছুটা হলেও অত্যাচার করেছিল, একথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একসময় এই দেশকেই তারা নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছে, এই দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার, তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করেছে শাসক হিসেবে। বিশেষভাবে সুলতানি আমলে হোসেন শাহ, নসরত শাহ, পরাগল খাঁ, ছুটি খাঁ প্রমুখ নরপতি লৌকিক ভাষা বাংলাকে অভূতপূর্ব পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছেন। এঁদের রাজসভার ভাষা তুর্কি বা ফারসি হলেও এঁরা নিজেরা বলা চলে অনেকটা বাঙালিই হয়ে উঠেছিলেন, বাংলা ভাষা চর্চার মাধ্যমে বাঙালির জীবনাচরণকে প্রায় আপন করে নিয়েছিলেন। এরই ফলে, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে বাংলা ভাষা ও 888sport live footballের এক অভূতপূর্ব বিকাশ হয়েছিল, যাকে আমরা আগেই অপরিণত রেনেসাঁস আখ্যায়িত করেছি। এই সময়ই সারা বাংলায় বৈষ্ণব ও সুফি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশ্য মুঘল শাসনাধীন হওয়ার পর বাংলায় শাসক-পরিপোষিত এ-ধরনের কোনো দেশজ-সংস্কৃতির বিকাশ বা চর্চা আমরা লক্ষ করি না, এমনকি 888sport app, মুর্শিদাবাদ বা রাজমহলের মতো প্রশাসন কেন্দ্রগুলোতেও নয়।
সাত
উনবিংশ শতাব্দীতে মূলত ইংরেজ প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য যে-নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছিল তা চরিত্রগতভাবে প্রাক-ব্রিটিশ মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের অগ্রবর্তী অংশই প্রধান ভূমিকা নেয়।
এই শ্রেণিটি অতি সহজেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ এঁরাই, এডামের education despatch থেকে জানতে পারি; ইতিপূর্বে ফারসির চর্চা করেছিলেন। এডাম জানাচ্ছেন, অষ্টাদশ শতকের শেষে ও ঊনবিংশ শতকের শুরুতে, ফারসি চর্চারত হিন্দুর 888sport free bet ফারসি চর্চারত মুসলমানের চেয়ে বেশি ছিল। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন পদ, বিশেষত রাজস্ব বিভাগ এঁদেরই করায়ত্ত ছিল। তাই ফারসির বদলে ইংরেজিকে গ্রহণ করতে এই গোষ্ঠীর তেমন কোনো অসুবিধে হয়নি। প্রশাসনের উচ্চস্তরে (মুখ্যত অবাঙালি) মুসলমানরাই অধিষ্ঠিত ছিলেন। শাসনচ্যুত হয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই শাসক অংশ যাঁরা উত্তর ভারত থেকে আসায় আশরাফ বলে গণ্য হতেন, ইংরেজি শিক্ষাকে প্রথমে গ্রহণ করেননি। পরবর্তীকালে যখন এই অভিজাত মুসলমানরা ইংরেজিকে গ্রহণ করলেন, তখনো তাঁরা বাংলাকে পরিত্যাজ্যই ভাবলেন, অনভিজাতের বা ব্রাত্যজনের ভাষা হওয়ায়। এ কারণেই নবাব আবদুল লতিফ বলেছিলেন, মুসলিম উচ্চশ্রেণির জন্য শিক্ষার বাহন হবে ইংরেজি এবং উর্দু, বাংলা বা vernacular হবে নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের শিক্ষার মাধ্যম।
বলা বাহুল্য, হাজার বছরের বাংলা মুসলমান-হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সমৃদ্ধ হয়েছে। আবদুল করিম 888sport live footballবিশারদ দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষায় মুসলমান সম্প্রদায়ের অবদান কী বিরাট ও গভীর। সারা মধ্যযুগে আখ্যায়িকা-কাব্যে মুসলমান কবিরা অফুরন্ত অবদান রেখেছেন। এই কাব্যে তাঁরাই পথিকৃৎ। এই কাব্যধারার বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষ ও এক ধরনের রোমান্সকাব্য, যেখানে পাত্রপাত্রীর প্রেম-বিরহই কবি-কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করেছে। অষ্টাদশ শতকে বাংলার প্রান্তবর্তী সুদূর আরাকান রাজসভায় বসে আলাওল যে-কাব্য রচনা করলেন, তার শৈল্পিক বা 888sport live footballিক অবদান অতুলনীয়। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে এবং বাংলাকে অভিজাত শ্রেণি অবহেলা করায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি রেনেসাঁসে মুসলমান সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ সেভাবে হলো না।
বাঙালি মুসলমানের রেনেসাঁসের সূচনা হলো, আগেই উল্লেখ করেছি, বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে, সেও আরেকটি ঔপনিবেশিক আঘাতেরই ফলে। এই আঘাত ছিল অত্যন্ত তীব্র। পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি ঘোষণা করেছিল, ‘সারা পাকিস্তানে এমনকি পূর্ব পাকিস্তানেরও রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’, বাংলা নয়, যদিও বাংলাই ছিল পাকিস্তানের অধিকাংশ লোকের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের এই বক্তব্যের সঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দিন প্রমুখ প্রাক্তন শাসক-শ্রেণী-প্রতিনিধি এবং এদেশীয় কিছু সুবিধাভোগী একাত্মতা জানিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও নব-উন্মেষিত ও বিকাশমান বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উর্দুকে বাঙালির উপর চাপিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা কেবলমাত্র একটি সাংস্কৃতিক আঘাতই ছিল না, এটি ছিল অর্থনৈতিক আঘাতও। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর মুখের ভাষা ছিল উর্দু। 888sport appsের বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণী অনুভব করেছিল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে জীবনের সব পেশার ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দু-ভাষীরা এগিয়ে যাবে, পিছিয়ে পড়বে বাঙালি; এছাড়াও মাতৃভাষায় নিজেকে প্রকাশ করার মধ্যে যে-আকুতি, সাবলীলতা ও ঐকান্তিকতা প্রকাশ পায়, অন্যভাষায় তা প্রায় অসম্ভব। ১৯৪৮-এ ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়ে ১৯৫২-তে যখন তা চূড়ান্ত পরিণতি পেল এই আন্দোলনে তাই তখন একই সঙ্গে মূর্ত হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক আকৃতি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা। ভাষা আন্দোলনেই বাঙালির স্বাধীনতা-আন্দোলন বা মুক্তি-সংগ্রামের বীজ উপ্ত হয়েছিল। বদরুদ্দিন উমর এই আন্দোলনকে যথাযথভাবেই বলেছেন ‘বাঙালির ঘরে ফেরা’।
পঞ্চাশের দশকে বাঙালি-মুসলমান বাংলা 888sport alternative link, ছোটগল্প, 888sport app download apk, নাটক, 888sport liveে যে-বিপুল সৃষ্টির সম্ভার শুরু করে তা স্বাধীনতা-উত্তরকালে আরো গতিবেগ অর্জন করে পুরো নব্বই দশক পর্যন্ত বহমান রইল। আজ এই সৃষ্টিশীলতার স্রোতে ভাটার লক্ষণ যেন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বলিষ্ঠ চিন্তার ক্ষেত্রে নানা দৌর্বল্য দেখা দিচ্ছে। পঞ্চাশের দশকে যে-রেনেসাঁসের সূচনা হয়েছিল তার প্রবাহে গতিহীনতা বাঙালির মানস-ঐশ্বর্যে এখন দৈন্যের রেখাকেই মূর্ত করে তুলছে। এর কারণ 888sport liveের সূচনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে। তা হলো, স্বাধীনতা-উত্তরকালে মধ্যবিত্তের বিরাট বিকাশ হয়েছে সত্যি, কিন্তু অধুনা বিশেষত আশির দশক থেকে মধ্যবিত্ত-সামাজিক-অর্থনীতি বা তৎ-সঞ্জাত ঋদ্ধ মধ্যবিত্ত-সংস্কৃতি বাঙালি সমাজের অনুপ্রেরণার উৎস নয়। আজ 888sport appsের লুটেরা ঋণখেলাপি-সংস্কৃতি-সঞ্জাত এক নব্য-ধনিকশ্রেণি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সহায়তায় সমাজের চালিকাশক্তি হয়েছে। বাংলা ভাষা এবং তার বিরাট 888sport live football-সম্ভার ও সংস্কৃতি এদের কাছে আদরের বা গর্বের নয়, বরং ব্রাত্য ও পরিত্যাজ্য। এরা তার গভীরে ঢুকতে পারে না, ঢোকার শক্তিও রাখে না। এরা কথ্য ইংরেজির চর্চা করে এবং তার মধ্যেই জীবনের উচ্চাকাক্সক্ষার চরিতার্থতা খোঁজে। ইংরেজি ভাষা বা ইয়োরোপীয় 888sport live footballের গভীরে বা তার ঐশ্বর্যের মর্মমূলে প্রবেশের জন্য যে-গভীর প্রস্তুতি ও সামর্থ্য জরুরি, এদের তা নেই। কারণ নিজের ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে ঢুকতে যে অসমর্থ বা অপারগ, সে তো অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে প্রকৃত সহমর্মিতা অর্জন করতে পারে না, পারে না তার গভীরে ঢুকতে। তাই আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে 888sport appsের এবং আগেই উল্লেখ করেছি, পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক উন্মার্গ জীবনাদর্শ ও সংস্কৃতির (rootless culture) সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশজ-সংস্কৃতির শেকড়ছিন্ন এই পরভূত-সংস্কৃতি-বিকাশে তথাকথিত বিশ্বায়নের প্রভাবও বিরাট।
আগেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, এই বিশ্বায়নের প্রধান বাহন পরাজাতিক সংস্থাগুলো (transnational corporation)। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, কোকাকোলা, পেপসি, ইউনিলিভার, শেভরন, শেল, সনি, টয়োটা, মাইক্রোসফট, আইবিএম, বোয়িং এবং অধুনা টাটা, হিউন্দাই ইত্যাদির কাছে সারাবিশ্বই বিচরণক্ষেত্র এবং তার মুখ্য বাহন হলো ইংরেজি। বর্তমানে ইংরেজিই একশ কোটি লোকের কথ্যভাষা, যত বিকৃতই হোক না, Hindish, Banglsih প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত; সাম্প্রতিক সময়ে রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও ভাষা-বিকৃতির এক উল্লেখ্য উদাহরণ। তাই ইংরেজি কথ্যভাষায় অধিকার অর্জনই আজকের বিশ্বায়ন-বিশ্বে ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিক উন্নয়নের প্রধান সোপান। এখানে প্রকৃত শিক্ষা বা সংস্কৃতির প্রশ্ন গৌণ। জীবনের গভীর উপলব্ধি বা জীবনকে রূপে-রসে-বর্ণে-গন্ধে-সংগীতে-চিত্রকলায় ও ভাস্কর্যের নান্দনিক আনন্দে ভরে তোলার সব আর্তিই এখানে অনুপস্থিত। আদর্শেরও কোনো স্থান নেই। মানুষের প্রতি মানুষের, বিশেষত বঞ্চিতজনের প্রতি মমত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের উন্নয়নের জন্য জীবনের কিছুটা সময় দেওয়ার চিন্তাও আজ তাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে নেই। চারিদিকে কেবল কীভাবে একে অন্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে তারই প্রতিযোগিতা। নব্বইয়ের দশকে সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে আজকের এককেন্দ্রিক বিশ্বে জীবনের প্রধান স্লোগান, ‘ব্যষ্টির এগুনোর মধ্য দিয়েই এগুবে সমষ্টি’। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির চেষ্টা হতে হবে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া, আর তার মধ্য দিয়েই এগোবে দেশ-জাতি সবাই। এই স্লোগান ব্যক্তি-সর্বস্ব দর্শন, ব্যক্তির মুক্তির দর্শন নয়। এটি স্বার্থপরতার দর্শন, পরার্থপরতা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।
888sport appsে নতুন প্রজন্ম মনে হচ্ছে এ-আত্মঘাতী দর্শনে প্রায়-সম্পূর্ণ নিমজ্জিত। তাই বাঙালি আজ তার বাঙালিত্ব ভুলছে, আবার যথার্থ অর্থে বিশ্ব-নাগরিকও হতে পারছে না, কারণ তার সেই যোগ্যতা নেই, যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টাও নেই। একজন মানুষ নিজের দেশের হয়েই সারাবিশ্বের হয়। নিজ সংস্কৃতির মর্মমূলে পৌঁছুতে পারলেই তার পক্ষে বিশ্বের নাগরিক হওয়ার অভিজ্ঞান-অর্জন সম্ভব হয়।
সারাবিশ্বে বাংলা-ভাষাভাষী বাঙালির 888sport free bet প্রায় ২৭ কোটি। 888sport free betগরিষ্ঠতার বিচারে বিশ্বের পঞ্চম ভাষা বাংলা। এই ভাষার সমৃদ্ধি ও গভীরতা বিরাট ও অতলান্ত। ভাষা নিয়ে দু’তিন দশক আগেও বাঙালির গর্বের সীমা ছিল না। সর্বপ্রথম এই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীই প্রাণ দিয়েছে ভাষার জন্য। ভাষা যে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম, তা প্রমাণ করেছে। ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দিয়েই বিশ্ব-সমাজ আজ 888sport cricket BPL rateে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে বিশ্বের সব ভাষার বাঁচার অধিকারকে মেনে নিয়েছে, সব ভাষার অনন্যতা স্বীকার করেছে।
বিশ্বের বহু ক্ষুদ্র ও অনগ্রসর ভাষাভাষী জনগণ নিজের ভাষায় জীবনচর্চা করছে। প্রায় প্রতিটি আরব-ভাষী দেশ, ইরান, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, চিন, জাপান, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশের চলমান-জীবন, প্রশাসন ও উচ্চশিক্ষার ভাষা মাতৃভাষা। মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করেই জাপান আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, চীন তৃতীয়। এক্ষেত্রে আমরা কেন দৈন্যের পরিচয় দিচ্ছি? তা কি দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের পরোক্ষ ফল? আমরা কি তার প্রভাব, তার hangover এখনো কাটাতে পারলাম না? উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে একবার, আবার বিশ শতকের শেষার্ধে আমাদের যে দু’টি নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল, যে-গভীর জাতীয়তাবোধ ও দেশাত্মবোধের উন্মেষ ঘটেছিল তা কি এখনই মেঘাবৃত? বিশ্বায়নের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আমাদের জীবনে-সমাজে-সংস্কৃতিতে আবার কি আঁধার নেমে আসছে?
আট
বিশ্বায়নের ফলে, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সারাবিশ্বই একটি সূত্র বা সুতোয় বাঁধা পড়েছে। এ সূত্রের একপ্রান্তে রয়েছে পরাজাতিক করপোরেশনগুলো, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি প্রভৃতি বিশ্বায়নের প্রবক্তা সংস্থা, অন্যপ্রান্তে সারাবিশ্বের সাধারণ মানুষ, আমজনতা। বিশালকায় পরাজাতিক সংস্থাগুলো গত অর্ধশতাব্দী জুড়ে যে-অমিত-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে, তা অনেকটা তৃতীয় বিশ্বের শোষণের ওপরেই গড়া। অবশ্য, উন্নত বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির বঞ্চনাও এ-সম্পদ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে প্রায় এক দশক আগে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিল গেটসের একার সম্পদের পরিমাণ খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দশ কোটি নিম্নবিত্তজীবী মানুষের আয়ের সমান। চীন ও ভারত এ-দুটি দেশের জিডিপির প্রায় কাছাকাছি কয়েকটি পরাজাতিক সংস্থার সম্পদের পরিমাণ (এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখা যেতে পারে লেখকের 888sport apps : রাষ্ট্র ও সমাজ গ্রন্থে), যদিও ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টের হিসেব মতে, দেশদুটি পি. পি. পি. (purchasing power parity) বিচারে বিশ্বে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ ধনী দেশ। তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। ফরচুন ম্যাগাজিনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম পঞ্চাশটি করপোরেশনের আয় যদি যোগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদ (assets) এবং ৮০ শতাংশ আয় (শ্রমিকদের আয়সুদ্ধ) এদেরই করায়ত্ত। এ কর্পোরেশনগুলোর অধিকাংশেরই অবস্থান উন্নত বিশ্বে – যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে ইত্যাদি দেশে। বৃহত্তর কর্পোরেশনগুলোর নামের তালিকায় ইদানীং বিক্ষিপ্তভাবে চিন ও ভারতের কয়েকটি সংস্থার নামও (এদের বেশ ক’টি রাষ্ট্র-মালিকানার অন্তর্ভুক্ত) চোখে পড়ে। বিশালাকার এ-মান্টিন্যাশনাল করপোরেশনগুলো তাবৎ দুনিয়ার মুখ্য পণ্যসমূহের নির্মাতা ও বিক্রেতা বা বাজার নিয়ন্তা। এমনকি, ইদানীং এরা ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীর কৃষি ব্যবস্থাকেও নিজেদের বৃহৎ থাবার নিচে নিয়ে আসছে। বিভিন্ন শস্যের বীজের উৎপাদনও ক্রমে ক্রমে এই পরাজাতিক সংস্থাগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মুনাফার স্বার্থ মানুষের জীবনের উপরও জয়ী হতে চলেছে। অধিকতর মুনাফার প্রয়োজনে এরা বিশ্বকে খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে উৎপন্ন খাদ্যশস্যকে জৈব-জ্বালানি (bio-fuel) বা 888sport app 888sport live chat-সামগ্রীতে রূপান্তর করতে দ্বিধাবোধ করছে না। বিশ্বের অধিকাংশ খনিজ সম্পদের মালিকানাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৃহৎ পরাজাতিক সংস্থাগুলোরই নিয়ন্ত্রণে।
নব্য-ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদদের মতে, সারাবিশ্বকে মুক্তবাজার-অর্থনীতি বা এসব বহুজাতিক সংস্থার চারণক্ষেত্রে পরিণত করলেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হবে। গত দেড় দশক ধরে, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে এ-বক্তব্যটি এখন যেন একটি ধ্রুব-সত্যে পরিণত হতে চলেছে। প্রচলিত অর্থনীতিতে এর বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য বর্তমানে নেই বললেই চলে। এই মুক্তবাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন-অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ধারক ও বাহক ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি প্রভৃতি সংস্থা।
কিন্তু প্রকৃত সত্য বা বাস্তবতা কী? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এ প্রসঙ্গে কী বলছে? সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকান-জাপানি ইতিহাসবিদ ফুকায়ামা ঘোষণা করেছিলেন, ধনতন্ত্রের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর এই ঘোষণার অব্যবহিত পরেই প্রথমে জাপান ও পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পুঁজিবাদ এক বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। জাপানের বিপর্যয়টি এসেছিল মুনাফার পেছনে পুঁজির অযৌক্তিকভাবে ধাবমান হবার কারণে। এরই ফলে জাপানের টোকিও শহরের রিয়েল এস্টেটের মূল্য সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেটের মূল্যের প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (In 1989, the peak year of Japan’s Property bubble, the value of Tokyo was estimated to be equal to that of the entire United states. The value of the property, particularly in down town commercial districts has now dropped by by 80 per percent.” Newsweek, July 27, 1998; দ্রষ্টব্য লেখকের গ্রন্থ, 888sport apps : রাষ্ট্র ও সমাজ, পৃষ্ঠা ৯৯-১৫১)। মুনাফার লোভে পুঁজির কী বিচিত্র গতি। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে জাপানের অর্থনীতিতে যে-মন্দা শুরু হয় তা এখনো কাটেনি। জাপানকে এই মন্দা থেকে বের করে আনতে জাপান রাষ্ট্র যে কী ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে, বিশ্ব-অর্থনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের কাছে তা অবিদিত নেই।
১৯৯৭-এ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে (থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে) যে-বৃহৎ মন্দার সূচনা হয়েছিল, তারও উৎসে ছিল পুঁজির অযৌক্তিক মুনাফার সন্ধান। এসব দেশের বিভিন্ন 888sport live chat ও ব্যবসাক্ষেত্রে বিশ্ব পুঁজি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কারণ সেসময় এ-সব দেশে
পণ্য-উৎপাদন-ব্যয় 888sport live chatোন্নত দেশগুলো থেকে অনেক কম ছিল, শ্রমের মূল্য সস্তা হওয়ায়। জাপানের উদ্বৃত্ত পুঁজির এক বিরাট অংশের পাশাপাশি 888sport app উন্নত দেশের পুঁজি এ-কারণে এসব দেশের 888sport live chat ও শেয়ারবাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে বিনিয়োগ হতে থাকে মুনাফার লোভে, যার ফলে প্রতিটি 888sport live chatে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত উৎপাদন-ক্ষমতা (excess production capacity) সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিকভাবেই অনেক 888sport live chat তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে অসমর্থ হলে অতি দ্রুত মুনাফালোভী পুঁজি প্রত্যাহৃত হওয়া শুরু হয়। ফল হয়, দেশগুলোর মুদ্রামানের হ্রাস এবং অবিক্রীত পণ্যের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে ওঠা, ধস নামে শেয়ারবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এই ধসে বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ভীত হয়ে কেবলমাত্র পূর্ব বা দক্ষিণ এশিয়ার বিকাশমান বাজার থেকেই নয়, ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান বাজার থেকেও লগ্নিপুঁজির প্রত্যাহার শুরু হয়। এসব দেশের অর্থনীতি এবং বাজারগুলোকে রক্ষা করতে অনন্যোপায় হয়েই বিশ্ব পুঁজিবাদের অন্যতম খুঁটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফকে এগিয়ে আসতে হয় এবং বিপর্যয়ের প্রথম বছরেই প্রায় দেড়শ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক আপৎকালীন ঋণ হিসেবে এ-সব দেশকে দিতে হয়। এই দেশগুলোর 888sport live chat-বাণিজ্য-আর্থিক সংস্থাসমূহের ঋণের আয় এত বিশাল ছিল যে বেসরকারি বা ব্যক্তি-পুঁজির পক্ষে তার ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব ছিল। ঋণের পরিমাণ কী বিশাল ছিল তা একটি উদাহরণ দিলেই অনুধাবন হংকংয়ের Deusche Bank-এর হিসেব মতে, এ অঞ্চলের চারটি বিপন্ন অর্থনীতি – থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার গড় ঋণের অনুপাত ছিল দেশজ উৎপাদনের ২৩০ শতাংশ। (লেখকের 888sport apps : রাষ্ট্র ও সমাজ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৯৯-১৫১-এ বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দা ও তা-থেকে উত্তরণ বিষয়ে)।
পুঁজির মুনাফা অন্বেষণ আজো যে কী-বিপুল-লোভাতুর ও কতখানি অযৌক্তিক, তার বড় প্রমাণ বর্তমান বিশ্বে পুঁজির হঠাৎ বিরাট সংকোচন (Credit Crunch)। এই সংকোচনের উৎস পুঁজিবাদের সর্ববৃহৎ ক্ষেত্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ’৯০ দশকের জাপানের মতো আজ (২০০৭-২০০৮ সালে) সেখানে গৃহায়ণ ও নির্মাণ খাতে এত
অযৌক্তিক-বেপরোয়াভাবে পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে যে, সেই পুঁজির এক বিরাট অংশ আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অতিরিক্ত মুনাফা বা লাভের আশায় বিশাল বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, ব্যাংকগুলো পরস্পরের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে অসংখ্য ব্যক্তিকে অজস্র ধারায় ঋণ দিয়েছে, ব্যক্তির সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বা সামর্থ্যকে বিবেচনায়
না-এনে। ফল হযেছে, অসংখ্য ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান কয়েকশো বিলিয়ন, এমনকি ট্রিলিয়ন ডলার পুঁজি হারিয়েছে। পরিণামে কেবলমাত্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, ইয়োরোপের অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বিশাল পুঁজি-ঘাটতিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে এক বিরাট ঋণ-সংকট দেখা দিয়েছে
(sub-prime credit crunch)। এই ঋণ সংকটের ফলে মার্কিন ও ইয়োরোপের অর্থনীতিতে যে-মন্দা সৃষ্টি হয়েছে, তা ত্রিশের দশকের মতো মহামন্দায় (great depression) রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
নয়
বাঙালির বাঙালি-সত্তা আলোচনা প্রসঙ্গে বিশ্ব-অর্থনীতির চলমান গতি প্রবাহের এই আলোচনার উৎসে বা মূলে রয়েছে বাঙালি সত্তার উপর, বাঙালি মানসের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব উপলব্ধি-করা। সারাবিশ্বই আজ বিশ্বায়নের আওতাভুক্ত।
মান্টিন্যাশনাল করপোরেশনগুলোর পুঁজির শাসনাধীন সবাই। কোনো দেশ বা জাতি এদের প্রভাব থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে বা স্বাধীন-স্বতন্ত্র-সত্তা হিসেবে টিকে থাকতে পারে না, পারছে না। এদের ইচ্ছেয় এবং কখনো কখনো আগ্রাসনে দেশে দেশে রাষ্ট্রশক্তিরও নানা ধরনের বিপর্যয় বা উত্থান-পতন ঘটে। জাতির ভাগ্যে নেমে আসে অমানিশা। তাই এসব পরাজাতিক সংস্থাগুলোর বিকাশ ও পরিণতি আলোচনা আমাদের জাতিসত্তার আলোচনার সঙ্গেই সম্পৃক্ত। আমাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বও এদের কাছে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, আমরা যদি-না সে সুতোকে ছিঁড়ে ফেলি।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব পরাজাতিক সংস্থা (এবং তাদের বিশাল পুঁজি) কোথায় যায়, কোথায় যাচ্ছে? আমরা দেখছি, মুনাফার খোঁজে বিশাল পুঁজি বিশ্বজুড়ে বারবার এমন অযৌক্তিকভাবে ছুটছে যে তা নিজেই নিজেকে বিপন্ন করছে। এই বিপন্ন-পুঁজিকে রক্ষা করতে রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহকে এগিয়ে আসতে হচ্ছে। বর্তমানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়োরোপের বহু ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও 888sport live chat সংস্থা ভয়ানক বিপন্ন হওয়ায় ও অস্তিত্বের সংকটে পড়ায় তাদের রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র-কংগ্রেস সাতশো বিলিয়ন ডলারের রক্ষা-তহবিল ও ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এই বিশাল রাষ্ট্রীয় তহবিলের, যার মালিক জনগণ, মুখ্য অংশ ব্যয় করা হবে এই সব বিপন্ন-সংস্থার অংশ ক্রয় করতে। এই-ক্রয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র বা জনগণ এই সব সংস্থায় মালিকানা অর্জন করছে। অর্থনীতি বিপন্ন হওয়ায় রাষ্ট্রকে এই সব সংস্থাকে এইভাবে আংশিক রাষ্ট্রীয়করণ (nationalization) করে রক্ষা করতে হচ্ছে। পুঁজি সম্পর্কে বিশদ আলোচনার সুযোগ এখানে না-থাকলেও ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে না পারলে পুঁজি যে বিপন্ন হবে, এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপন্ন করবে, তা বোঝা প্রয়োজন। পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধি নির্ভর করে ক্রমবর্ধমান হারে পণ্য-প্রবাহ বাড়ার উপর। এজন্য পণ্য-উৎপাদন ও তার পুনরুৎপাদনের প্রয়োজনে বিশ্বের নবায়নযোগ্য নয় এমনসব সম্পদ ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হলেও, প্রকৃতির আপন ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার, নিজেকে নবায়ন করার ক্ষমতা নিঃশেষ হলেও, কে তার তোয়াক্কা করে? বেপরোয়া মুনাফালোভী বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে পণ্যই পরম আরাধ্য, মুনাফাই মুখ্য, মানুষ নয়। বিশ্ব আজ ভুলতে বসেছে যে, পণ্য মানুষেরই জন্য, মানুষ পণ্যের জন্য নয়। প্রাক্-পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ যে-বস্তুসমূহ তৈরি করত, তার প্রয়োজনাতিরিক্ত উদ্বৃত্ত অংশই কেবল পণ্যে পরিণত হতো। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল বস্তু-সৃষ্টি, মানুষের প্রয়োজনে। পুঁজিবাদী সমাজে বা পুঁজিবাদে (এবং এই পরাজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে) উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্যই হলো বাজারে বিক্রির (exchange value) জন্য উৎপাদন। মানুষের প্রয়োজনে বস্তু উৎপাদন নয়, use value সৃষ্টি নয়। পুঁজির লোভ, আমরা বারবার দেখি, তার নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের
সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ধ্বংস, বিকৃতি এবং বিলয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পুঁজির এই বারবার বিপন্ন হওয়ার মধ্যেই কিন্তু জন্ম নিচ্ছে মানুষের শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা, পুঁজির পরাভবের উৎস।
বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী সংস্থাগুলোর মধ্যে আমরা এক বিরাট বৈপরীত্য (contradiction) দেখতে পাই। এ বৈপরীত্য হল, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার বৈপরীত্য। বিশাল এই কর্পোরেশন বা পরাজাতিক সংস্থাগুলোর শাখা-প্রশাখা
দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এক বিরাট কর্মীগোষ্ঠী ও কর্পোরেট আমলাতন্ত্র। মালিক এরা নয়, মালিকানা এদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং (শেয়ারের মাধ্যমে) বহু বিস্তৃত। এসব সংস্থার আমলা-কর্মীগোষ্ঠী ও পরিচালকরা ছোটে মুনাফার পেছনে, কারণ তারা জানে, তাদের অর্থনৈতিক সত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গেই অবিনাভাবে যুক্ত। সংস্থার মুনাফার মধ্যেই রয়েছে তাদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অস্তিত্ব। মুনাফার জন্য কোনোরকম ঝুঁকি নিতে তাই তারা দ্বিধা করে না, মানুষ ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করতেও কুণ্ঠিত হয় না।
তাই, সমাজ বা রাষ্ট্র যদি এগিয়ে এসে এই বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মালিকানা নিজের কাছে তুলে নেয়, তাহলে ক’জন ধনকুবের আর্থিক ক্ষতির শিকার হলেও মানব সমাজ, মানব সভ্যতা, বিশ্ব-প্রকৃতি রক্ষা পাবে। আজকের বিশ্বকে, বিশ্বের মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্র্য এবং সর্বোপরি জীবনকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্র বা সমাজকে এই সহজ কাজটি করতে হবে। বহুজাতিক সংস্থাগুলোর সামাজিকীকরণ (socialization) বা রাষ্ট্রীয়করণ (nationalization) আজ না হলেও অদূরভবিষ্যতে অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে। সব মানুষকে সমাজের সব সম্পত্তির মালিকানা দিতে হবে। তাহলেই ব্যক্তি পুঁজি আর অযৌক্তিক মুনাফার খোঁজে সারাবিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপন্ন করবে না। বিশ্বপ্রকৃতিকে ও তার সব সম্পদকে বিলয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে না। এই রাষ্ট্রীয়করণ যে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হতে হবে, তা আবশ্যিক নয়, কারণ সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল পুঁজিবাদের অবিকশিত-সামাজিক-সভা থেকে। সেহেতু, সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তরাধিকারসূত্রে
যে-রাষ্ট্রযন্ত্র পেয়েছিল, লেনিন বলেছিলেন, সেই রাষ্ট্রযন্ত্র (state apparatus/ bureaucratic apparatus) ছিল বিকৃত, ত্রুটিপূর্ণ। লেনিন আরো বলেছিলেন, সোভিয়েত সমাজের প্রকৃত সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটাতে হলে তার বিদ্যমান রাষ্ট্রসত্তার চরিত্র পাল্টাতে হবে; অনেকগুলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে যেতে হবে তার শ্রেণি-রূপের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির জন্য। ত্রিশের দশকে যে-বৃহৎ-মহামন্দা ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে নানা প্রকৃতির নাতি-বৃহৎ-মন্দা দেখা দিয়েছিল, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেখানে পুঁজিবাদকে রক্ষা করতে, উৎপাদনব্যবস্থাকে সচল ও পুনরুজ্জীবিত করতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতির ও কর্পোরেট আমলার অপরিণামদর্শী ও লোভী-পদক্ষেপের মাশুল গুনতে হয়েছিল পুরো সমাজকে এবং সমাজের প্রতিভূ হিসেবে রাষ্ট্রকেই এই অবিমৃশ্যকারিতার পথ থেকে উৎপাদন ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে বারবার সাধারণ জনগোষ্ঠীর, নাগরিকের অর্থকে বিনিয়োগ করতে হয়েছিল; এখনো করতে হচ্ছে বিপুলভাবে।
উৎপাদনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ উৎপাদনকে ব্যাহত করে মর্মে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের যে-বক্তব্য, পুঁজিবাদের বিপন্নতার সময় রাষ্ট্রের বারবার এগিয়ে আসাই কি তার অসারতা প্রমাণ করে না? তাই বিশ্বজুড়ে পুঁজির চরম বিপন্নতার সময়ে একদিন সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে সার্বিক উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রণভার নিতে, সমাজকে রক্ষা করতে। আপাতদৃষ্টিতে সেই সমাজ বা দিন খুব দূরবর্তী মনে হলেও 888sport cricket BPL rate শতক শেষ হওয়ার আগেই তা আসবে, কারণ অন্যথা অযৌক্তিক ও অত্যধিক মুনাফার স্বার্থে পুঁজিবাদ এই বিশ্বপ্রকৃতিকে, তার অনবায়নযোগ্য ও নবায়নযোগ্য প্রায় সব সম্পদকেই ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে। পুঁজির অন্ধতাড়না ও উন্মাদনার বিরুদ্ধে আজ পৃথিবীব্যাপী নানা প্রতিবাদে যেমন, গ্রিন মুভমেন্ট, অ্যান্টি গ্লোবালাইজেশন মুভমেন্ট ইত্যাদিতে কি তারই আভাস নেই?
বিশ্বজুড়ে পুঁজির অবাধ প্রবাহ এবং পরাজাতিক সংস্থাগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ও অদম্য আগ্রাসন কেবলমাত্র প্রকৃতি এবং
প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদকেই ধ্বংস করছে না, তাবৎ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের সমাজ-সভ্যতা ও কৃষ্টিকেও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে নানাভাবে। প্রতিটি জাতিসত্তার লোকজ সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। বহুজাতিক সংস্থাগুলো কেবলমাত্র তাদের বিবিধ এবং বিচিত্র পণ্যই বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে না, সেই পণ্যের বাহন একমাত্রিক সংস্কৃতিকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা আগেই উল্লেখ করেছি এই জীবনাদর্শের ধারক ও বাহক হলো ইংরেজি ভাষা ও এমন এক একমাত্রিক (one dimensional) সংস্কৃতি যা প্রকৃত ও চিরায়ত ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির গভীরতাকে স্পর্শ করে না। এই সংস্কৃতি ভোগবাদী দর্শনের ধারক ও বাহক, খুব কম ক্ষেত্রেই তা জীবনের গভীরগাহী। দেশে-দেশে অসংখ্য বলিউড, টালিউড, টিভি ও 888sport app মাধ্যম এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই লঘু-সংস্কৃতির ধাক্কা থেকে আজ সমাজতান্ত্রিক চিনও রেহাই পাচ্ছে না। বলা প্রয়োজন, লঘু-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ আমার নেই, কারুর থাকতেও পারে না। প্রতিটি দেশের সংস্কৃতির একটি লঘু দিক আছে, হালকা হাসি-ঠাট্টা-বিনোদনের দিক আছে। মানুষকে মৃদু আনন্দে ভরিয়ে তোলার দিক আছে। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে তার রূপটি হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ লঘু-সংস্কৃতিকে ভালোবাসতেই পারে। শঙ্কার মুখ্য কারণটি অন্যত্র। আজ বিশ্বজুড়ে যে-লঘু-সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো হচ্ছে প্রকৃত অর্থে তা লঘুও নয়, সংস্কৃতিও নয়, তা নিছক বিভিন্ন বিকৃতি-সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তির বা দ্রষ্টার মনজয়ের চেষ্টা। এই বিকৃতিরও, পরাজাতিক সংস্থাগুলোর অবদানে, বিশ্বজুড়ে এক বিশেষ রূপ যে ফুটে উঠেছে, তা কাউকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না। যদি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলো ভালোভাবে লক্ষ করা যায়, তাহলে বোঝা যাবে এই মাধ্যমগুলোতে যে গান-বাজনা, সঙ্গীত-নাটক, আলাপ-সংলাপ প্রচারিত হয়, তার উদ্দেশ্য দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে একই ধরনের এক মানস-জগৎ, ভোগের স্পৃহার জগৎ-সৃষ্টি করা। ব্যক্তি অনেক সময় নিজেই টের পায় না তার মনোজগতের কীভাবে রূপান্তর হচ্ছে, কীভাবে সেখানে দেশজ-সংস্কৃতির আবেদনের ক্ষয় হচ্ছে। নতুন প্রজন্মসমূহের উপর এর প্রভাব খুব গভীর। সারা বিশ্বজুড়ে, এইভাবে বহুজাতিক সংস্থাগুলো একমাত্রিক মানুষ গড়ে তুলছে। এর প্রভাব থেকে পল্লির সাধারণ মানুষও আজ রক্ষা পাচ্ছে না। এ কারণেই আজ পশ্চিমবঙ্গে বা 888sport appsে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, প্রকৃত পল্লিগীতি বা বাউল গানের আবেদন নেই উঠতি প্রজন্মের কাছে।
সুতরাং আমাদের বাঙালি সত্তাকে রক্ষা করতে হলে, আমাদের আদি-অন্তে বাঙালি হতে হলে বিশ্ব পুঁজিবাদের আগ্রাসন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আমাদের মানস পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ঠেকাতে হবে। এদের মূল উদ্দেশ্য জীবনকে পণ্যাশ্রয়ী করা, পণ্যে পরিণত করা; অবশ্য তা-থেকে ফেরার চেষ্টাও চলছে আজ বিশ্বব্যাপী। বারবার পুঁজির বিপন্নতার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ নিজেই তার দৌর্বল্যকে বিশ্বের নিপীড়িত, নিগৃহীত মানুষের কাছে তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে। এরই মধ্য দিয়ে দেশে দেশে এই সত্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে – পণ্য নয়, মানুষের যা প্রয়োজন, মানুষ তা নিজেকে পণ্যে পরিণত করে পাবে না। পণ্যের বন্ধন থেকে তাকে মুক্ত হতে হবে। পণ্যকে তার বশে আনতে হবে। Exchange Value-এর পরিবর্তে বস্তুর Use Value-কে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্ব প্রকৃতি আমাদের যা দিচ্ছে তাকে নিরবচ্ছিন্ন পণ্যপ্রবাহে রূপান্তর না করে আমাদের জীবনের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করতে হবে। আর তা করার জন্যই এই পরাজাতিক সংস্থাগুলো এবং তাদের বাহক ও পরিতোষক সংস্কৃতির বিলোপ ঘটাতে হবে। একমাত্রিক যান্ত্রিক (robotized one-dimensional) মানুষের বদলে প্রাণোচ্ছল বহুমাত্রিক সৃজনশীল মানুষের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দশ
বাঙালির জীবনে আজ যে-অন্ধকার, যে-দৈন্য তা ক্ষণিকের বলেই আমি বিশ্বাস করি। বাঙালি আবার উঠবে, জাগবে, কারণ তার সংস্কৃতিতে, তার জীবনবোধে সেই গভীর প্রত্যয় রয়েছে। আদি-অন্ত বাঙালি হয়েই বাঙালিকে বিশ্বসভায় তার আত্মশক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য যা প্রয়োজন, তা হলো নতুন প্রজন্মের কাছে তার হাজার বছরের সংস্কৃতির দিকগুলো, ঐশ্বর্যের দিকগুলো তুলে ধরা, তার উপলব্ধিতে সর্বমানবের মুক্তি-সংগ্রামকে জাগ্রত করা। বাঙালিকে বিশ্বের সব সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে এক হয়েই এগোতে হবে তার বন্ধন-মুক্তির জন্য, তার আত্মসত্তার, বাঙালি সত্তার পূর্ণবিকাশের জন্য। এর জন্য তার পাথেয়র অভাব নেই। এই পাথেয় সে অর্জন করেছিল ১৯৭১-এর মুক্তি সংগ্রামে। এই সংগ্রাম কেবলমাত্র বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না, প্রকৃত অর্থেই ছিল মুক্তির সংগ্রাম।
সেই-মুক্তির সংগ্রামের দর্শনকে রূপ দেওয়া হয়েছিল ১৯৭২-এ রচিত সংবিধানে। এই সংবিধান অঙ্গীকার করেছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার।
রাষ্ট্র-পরিচালনার মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের আদর্শকেও মূর্ত করা হয়েছিল জোরালোভাবে; ঘোষণা করা হয়েছিল, ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ।’ আরো বলা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় : –
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার।’
এছাড়াও রাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছিল, ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ 888sport app পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্যলাভের অধিকার।’
আজ রাষ্ট্র সংবিধানে প্রদত্ত এসব অঙ্গীকার-পালন থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে; বি888sport sign up bonusতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে
এই-প্রতিশ্রুতিও, ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, 888sport live football ও 888sport live chatকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’
১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান ‘মানবসত্তার-মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি 888sport apk download apk latest versionবোধ নিশ্চিত করার’ যে-দৃপ্ত-ঘোষণা দিয়েছিল, আজ থেকে প্রায় অর্ধ-সহস্র বছর আগেই সেই-888sport apk download apk latest versionবোধ জানিয়ে বাঙালি কবি উদাত্ত কণ্ঠে বিশ্বের
সব-মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এই বলে, ‘শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
এটা অনস্বীকার্য, প্রকৃত-বাঙালি হতে হবে বিশ্ব নাগরিক হয়েই; নিজের মানব-সত্তার পূর্ণতা-দেওয়ার-সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মানবসত্তার পূর্ণতা-দেওয়ার প্রতিজ্ঞা যুক্ত করেই। বাঙালির এই সংগ্রাম এখনো অপূর্ণ, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে তাকে আরো বহু-পথ হাঁটতে হবে। এই পথ-চলায় তার পাথেয় হবে নিজের হাজার বছরের ঋদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, তার মুক্তি-সংগ্রামের অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র
১. দ্রষ্টব্য : শশাঙ্কমোহন সেন, ‘বাংলা ছন্দ’ প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার আষাঢ়, ১৩২১, 888sport free betয়; উদ্ধৃত করা হয়েছে, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে।
২. এই সময় বাংলা তথা উপমহাদেশে মুদ্রার সঞ্চালনও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই মুদ্রার উৎসে ছিল দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা থেকে লুণ্ঠিত সোনা ও রুপো; এই সোনা ও রুপো ইউরোপে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করে
888sport live chat-উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করেছিল, পুঁজিবাদের সূচনা করেছিল। বাংলার বন্ত্রের বিনিময়ে বাংলায়ও বৃহৎ-পুঁজি গড়ে উঠেছিল, কিন্তু তা পুঁজিবাদের জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়। মনে রাখা প্রযোজন, কেবলমাত্র সোনা-রুপোর বৃহৎ-সঞ্চয় কোনো দেশকে ধনী কবে না, যদি তা দেশের উৎপাদন শক্তিতে পরিণত না হয়। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে স্পেন ও পর্তুগালে সোনা-রুপোর লুণ্ঠিত সঞ্চয় সৃষ্টি হলেও তা এই দুটি দেশকে তখন পুঁজিবাদী দেশে পরিণত করেনি।
* বাংলা একাডেমির ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রদত্ত বক্তৃতা, ৩রা ডিসেম্বর-২০০৮ ‘আদি-অন্ত বাঙালি’-এই শিরোনামটির জন্য আমি 888sport appsের প্রখ্যাত ও মহৎ কথা888sport live footballিক হাসান আজিজুল হকের কাছে ঋণী। ৎ
[লেখাটি ২০১৪ সালে প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা-প্রকাশিত
বাঙালি-মনন, বাঙালি-সংস্কৃতি : সাতটি বক্তৃতা গ্রন্থে সংকলিত]


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.