বাস থেকে নেমে রায়হান অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখল। রাস্তার মোড়ে একটা পাগল একগুচ্ছ প্লাস্টিকের ফুলের তোড়ায় খুব যত্ন করে ড্রেনের নোংরা পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘তৃষ্ণা লেগেছে তাই নারে সোনা? নে একটু পানি খা।’ রায়হান দাঁড়িয়ে থেকে কিছু সময় সেই দৃশ্য দেখে হাঁটা শুরু করে। মনের ভেতর একটা ভাবনা ঘুরপাক খায়, একজন সুস্থ-সবল মানুষও কি মৃত 888sport sign up bonusতে ভাবনার পানি ঢেলে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে না? পাগলের আর দোষ কী?
রায়হান সচরাচর আবেগপ্রবণ হয় না। কিন্তু আজ মনের মধ্যে ক্ষোভ-অভিমান
আর হতাশার তাণ্ডব চলছে। মাসখানেক ধরে দিন-রাত খেটেখুটে বানানো প্রেজেন্টেশন আজ শুধু মাঠে মারা যায়নি, বরং কর্তাব্যক্তিদের গোলটেবিলকে মনে হয়েছিল আধুনিক গিলোটিন। প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনের সময় বসদের ছুড়ে দেওয়া একেকটা বাক্য তাকে চোখা তীরের মতো বিদ্ধ করছিল। এদেশের ব্রাঞ্চ অফিসকর্মীরা মেইন ফ্রেমের কাছে ডামি ভেরিয়েবল ছাড়া কিছু নয়। যারা সারাবছর গাধার মতো খেটেও কখনো কোম্পানির সফলতার ভাগিদার হতে পারে না, বরং তাদের ব্যর্থতার আসামি হয়ে সওয়াল-জবাবের মুখোমুখি হতে হয়। একরাশ গ্লানির বোঝা কাঁধে নিয়ে বনানীর সেই ঝাঁ-চকচকে করপোরেট করিডোর দিয়ে সে প্রায় পালিয়ে এসেছিল। তারপর দৌড়ে একটা বাসে ওঠে।
বনানী থেকে শান্তিনগর পর্যন্ত দীর্ঘ জ্যামে সে কী নাজেহাল অবস্থা! 888sport app তো আর শহর নেই, বরং একটা বিশাল ‘এনট্রপি’! চরম বিশৃঙ্খলার পরিমাপক! করপোরেট চাকরের লেবাসে রায়হান আপাদমস্তকে একজন কবি। চারপাশের চলন্ত জীবন থেকে সে যা কিছু গ্রহণ করে তার সারাংশ 888sport app download apk হয়ে ওঠে। কিন্তু এই শহর, স্থবির হয়ে থাকা বাসের ভেতর হকারদের চিৎকার, যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া আর পাশের সিটের যাত্রীর শরীরে থাকা ঘামের তীব্র গন্ধ – সব মিলে রায়হানের কবিসত্তাকে প্রতিনিয়ত পিষছে। নিত্যকারের ভয়াবহ এই জ্যাম আসলে কী কোনো স্থবিরতা, নাকি টাইম লুপ! সময়ের গোলকধাঁধা! যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড লোহালক্কড়ের ঘর্ষণে আত্মাহুতি দিয়ে যাচ্ছে।
যাকগে! এত ভেবেই বা কী হবে? শ্রান্ত পায়ে রায়হান হাঁটতে হাঁটতে বাসার গলিতে ঢোকে। গলির হলদেটে ম্রিয়মাণ আলোয় চারপাশটা কেমন বিভ্রম লাগছে। সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠে বুঝতে পারে, আজ বুয়া আসেনি। দরজার পাশে রাখা ময়লাভর্তি বালতি থেকে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। কদিন ধরে রায়হান বাসায় একা। আশিক আর নোমান সিলেটে গেছে ট্যুরে। রায়হানের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রেজেন্টেশনের জন্যই যেতে পারেনি। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে। ভেবেছিল ঘরে ঢুকেই বুয়াকে এক কাপ চা বানাতে বলবে। গরম ভাত খাবে বেগুন ভাজা আর আর মরিচপোড়া দিয়ে। শালা, সব খারাপ ঘটনা একদিনে ঘটার দরকার ছিল? এখন রান্না করার শক্তি নেই, আবার পকেটও গড়ের মাঠ! কিছু অর্ডার করে খাবার উপায় নেই। নিচে নামার প্রশ্নই ওঠে না।
স্যুট-কোটের নিচে রায়হানের শরীরটা ভিজে-নেয়ে উঠেছে। সে কোটটা খুলে বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে। টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সারাদিনের ক্লান্ত বিধ্বস্ত রায়হানকে দেখে গুলচন্দ হেসে উঠলো। উপহাসের হাসি। গুলচন্দ ইদানীং বেশ উপহাস করতে শিখেছে।
রায়হান গুলচন্দের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘তুমি তো দিব্যি আছো, সালোকসংশ্লেষণ করে নিজের খাবার নিজেই বানাচ্ছো, আমার কথা একবার ভাবো তো? বুয়া আসেনি বলে আজ আমার চুলায় আগুন জ্বলবে না। তোমার ওই ক্লোরোফিল কি আমাকে একথালা ভাত দিতে পারবে গুলচন্দ?’
অন্ধকারে গুলচন্দের পাতাগুলো ঝিরঝির করে উঠলো। সে যেন বলছে, ‘আমি তো বাতাস থেকে পুষ্টি নিই, তুমি কেন 888sport sign up bonusর ছাই খেয়ে পেট ভরার চেষ্টা করো না, রায়হান?’
রায়হান বহুকালের পুরনো ইজিচেয়ারটাতে ধপাস করে বসে সামনের দিকে পা-দুটো ছড়িয়ে দেয়। এই চেয়ারটি তার বাবার ছিল। বাবার একমাত্র 888sport sign up bonus। মা আগেই চলে গিয়েছিলেন। বাবা যাওয়ার পর ভাইদের কাছে এর বেশি আর কিছু পাওয়ার ছিল না। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই ভাইদের সঙ্গে বন্ধন শিথিল হয়ে এসেছিল। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উপশেকড়গুলোর গা থেকে মাটি ধীরে ধীরে সরে প্রায় উলঙ্গ হয়ে গেল। সেখানে অনেক পোকামাকড়ের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে রায়হান নিজেই নিজের মূল উপড়ে চলে এসেছে।
রায়হানের পরিবার বলতে এখন এই ব্যাচেলর বাসার একটা রুম, শৌখিন একটুকরা বারান্দা, ইজিচেয়ার, আর গুলচন্দ। ‘গুলচন্দ’ একটি গন্ধরাজ ফুলগাছ। অথচ ইদানীং সে রায়হানের ঘরে ফেরার উপলক্ষ হয়ে উঠছে। গুলমোহরের সঙ্গে মিল রেখে গন্ধরাজটির নাম গুলচন্দ দিয়েছে রায়হান। কিন্তু গুলমোহরের সঙ্গে তার কোন যোগসূত্রে এই নামকরণ – সেটার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই।
অন্যমনস্কভাবে কখন যেন সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে রায়হান। পাশে টিপয়ে রাখা দামি ক্রিস্টালের ছাইদানিতে ছাই ঝাড়তে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে ওঠে সে। রায়হানের কোনো এক জন্মদিনে গুলমোহর উপহার দিয়েছিল এটি। রায়হানের স্মোকিংয়ের বিষয়ে গুলমোহর ছিল জিরো টলারেন্স। ওর সামনে স্মোক করতে পারেনি কখনো। অথচ সেই রায়হানকে অবাক করে দিয়ে এত নান্দনিক ছাইদানি উপহার দিয়ে হেসে বলেছিল, ‘এটা কিন্তু জাস্ট একটা শোপিস, বুঝেছ? ঘরে সাজিয়ে রাখবে। যখন ওটার দিকে চোখ পড়বে আমাকে মনে পড়বেই পড়বে।’ ‘মনে পড়বেই পড়বে’ – মনে মনে হাসে রায়হান। মনের মধ্যেই যদি সবসময় কেউ বসে থাকে তাকে আবার মনে পড়ে কীভাবে?
গুলমোহর বিহারি মেয়ে। মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পে আটকেপড়া পাকিস্তানি পরিবারের একজন সদস্য। একবার বিহারি ক্যাম্পে মহররমের তাজিয়া দেখতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল। প্রবল দেশপ্রেমিক রায়হানের মনটাকে পাকিস্তানি মেয়ে গুলমোহর কীভাবে দেউলিয়া করে দিয়েছিল সেটা বড় বিস্ময়! প্রায় সাড়ে তিন বছর রায়হান গুলমোহর নামক শরাবের সমুদ্রে ডুবে ছিল। একসময় সেই সমুদ্রে ভাটা শুরু হয়। একদিন লক্ষ করলো সমুদ্রটি শুকিয়ে গেছে। গুলমোহর নামক শরাব একফোঁটা আর অবশিষ্ট নেই। রায়হান শুকনো ডাঙায় ছুড়ে ফেলা মৃতপ্রায় মাছ!
গুলমোহরের সঙ্গে শেষপর্বটা অতটা সুখের ছিল না, বরং বেশ গ্লানিকর। তার জন্য অবশ্য রায়হানই দায়ী। সে গুলমোহরকে অদৃশ্য রশি দিয়ে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চেয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
একজন মানুষের অক্সিজেন কি আরেকজন মানুষ সরবরাহ করতে পারে? মনে হয় পারে, নাহলে গুলমোহরকে হারানোর ভয়ে রায়হানের কেন সাফোকেশন হতো? কেন গুলমোহর তার জীবনে নেই – এই ভাবনাটা ভাবতেই শরীরের প্রতিটি পশম পর্যন্ত নিজের সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করত। তারা অসাড় হয়ে যেত। আর সেই ভয় থেকে রায়হান গুলমোহরকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরেছিল। রায়হানের ধারণা ছিল, গুলমোহর ছাড়া সে হয়তো পৃথিবীর বুকে কোনোভাবেই সারভাইভ করতে পারবে না। গুলমোহরকে বলেছেও সে-কথা অনেকবার। গুলমোহর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলত, ‘উফ রায়হান, তুমিও সেকেলে মজনু লাইক প্রেমিক হয়ে গেলে দেখছি। ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না’ – এই কথাটি যদি সত্যি হতো তাহলে পৃথিবীর নিরানব্বই ভাগ মানুষই আরেকজনের অভাবে মারা যেত।’ ঠিকই তো! গুলমোহর তার জীবন থেকে চলে গেছে আজ দুই বছর হলো। কিন্তু সে তো দিব্বি বেঁচে আছে। অফিস করছে, খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে।
রায়হান হাত বাড়িয়ে গুলচন্দের শরীর স্পর্শ করে, বেশ চেঁচিয়ে বলে, ‘ওহে গুলচন্দ, সত্যি কি রায়হান বেঁচে আছে? এই শরীরটাতে কেবল প্রাণের স্পন্দন থাকাকেই কি বেঁচে থাকা বলে?’
মনে হলো গুলচন্দ বিচলিত হয়ে উঠল। সে পাতার হালকা স্পর্শে রায়হানকে প্রবোধ দিতে চাইল। কিন্তু রায়হান সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে গুলচন্দকে বিদ্রূপ করে, ‘এই গুলচন্দ তুমি নাকি শুভ্রতার প্রতীক, খুব পরিচ্ছন্ন সুগন্ধময়? অথচ দেখো, তোমার পাতায় পাতায় কেমন ধুলো জমেছে। ঠিক যেমন অবহেলা জমেছিল আমার আর গুলমোহরের দিনগুলোতে। তুমিও কি শেষে আমাদের মতোই পাংশু আর বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছো?’
গুলচন্দ নিশ্চুপ। বাতাসের দোলায় তার একটি ডাল রায়হানের কনুই স্পর্শ করতে চাইছে। রায়হান ক্ষেপে যায়, ‘এই যে আদর দেখাচ্ছো, এটা কি মায়া নাকি অভিনয়? গুলমোহর এভাবেই চুলে বিলি কেটে বলত – ‘তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।’ অথচ আজ তার ঠিকানায় আমি নেই। আমার ঠিকানাতেও সে নেই। তোমরা অত্যন্ত স্বার্থপর গুলচন্দ! সৌন্দর্য আর সুঘ্রাণে মানুষকে কেবল মাতাল করতে পারো তাদেরকে অনুভবে রাখতে পারো না।’
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। গুলচন্দ পুরো শরীর নিয়ে প্রবলবেগে নড়ছে। রায়হান জানে খুব রেগে গিয়েছে গুলচন্দ। সে চিৎকার করে বলতে চাইছে, ‘উফ! গুলমোহর, গুলমোহর আর গুলমোহর! তুমি এই নাম জপতে জপতে আমাকে পাগল করে দেবে নাকি কবি? সারাদিন তুমি আমার যত্ন নাও, পানি দাও – সেটা কি আমার জন্য? নাকি আমার মাঝেই তোমার প্রাক্তনকে খুঁজে পাও বলে? এই যে তুমি আমাকে ‘গুলচন্দ’ বলে ডাকো, এটা কি আমার প্রতি ভালোবাসা, নাকি তাকে মনে করে পুরনো ক্ষতের ওপর প্রলেপ লাগানো?’
রায়হান গুলচন্দের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আলতো করে ময়লা পাতাগুলো স্পর্শ করে। হাসতে হাসতে বলে, ‘এহ তুমি বড্ড ময়লা হয়ে গেছো গুলু! সরি তোমার খেয়াল রাখা হয়নি। সকালে তোমাকে গোসল করিয়ে দেব, এখন যাই। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।’
গুলচন্দ শাখা নাড়িয়ে বলে, ‘নাহ, কেন যাবে? আর একটু বসো। সারাদিন আমার একা একা ভালো লাগে না।’
‘আচ্ছা গুলচন্দ, তুমি কি আমার প্রেমে পড়ে গেলে?
হা-হা-হা! গাছের আবার একা আর দোকা কী?’
‘ছি রায়হান! আমি কি কেবল গাছই? যাও। ঠিক আছে, তোমার ঘরে চলে যাও। আমার কাছে আর আসবে না খবরদার!’
‘হা-হা-হা! তোমার এই অভিমান আমাকে ওর কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তোমাকে একটা পরামর্শ দিই গুলু। কাউকে ভালোবেসো না। জাস্ট দেউলিয়া হয়ে যাবে। আমাকে দেখে বুঝতে পারো না?’
‘বাহ! আমি তো গাছ। আমার ক্ষমতা আছে কাউকে ভালোবাসার? আর তুমি তো মানুষ। ভালোবাসা, ঘৃণা, অভিমান, মায়া সবই তোমাদের দখলে।’
‘হুম, বুঝেছি আজ বেশি রেগে গেছো। আচ্ছা গুলু তুমি থাকো, সত্যি আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। শুভরাত।’
রায়হান ঘরের দিকে যাচ্ছিল, তখনই টুপ করে একটি ফুল রায়হানের পায়ের কাছে পড়ে। রায়হান ফুলটি হাতে তুলে নাকের কাছে ধরে। প্রতিরাতেই গুলচন্দ রায়হানকে এভাবে একটি করে ফুল উপহার দেয়। প্রতিটি ফুলেই রায়হান গুলমোহরের শরীরের গন্ধ পায়। তার মনে হয়, গুলমোহরের দুই স্তনের মধ্যখানে সে নাক ডুবিয়ে রেখেছে। ভাগ্যিস! গুলচন্দ এই খবর জানে না। জানলে কখনো সে ফুল ঝরিয়ে দিত না।
রায়হান না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। তার স্বপ্নের ভেতর মিশে যেতে লাগল ক্লোরোফিলের সবুজ আর অফিসের অডিট সেকশনের লাল কালির হিসাব। সে দেখল, গন্ধরাজ গাছটি তার প্রতিটি কোষ বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে গুলমোহরের ফেলে যাওয়া 888sport sign up bonusগুলোকে নতুন করে বুনছে।
দুই
ইদানীং গুলচন্দকে নিয়ে বেশ ভালো রকমের ভাবনায় পড়ে গেছে রায়হান। গুলচন্দের সঙ্গে তার একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটা গন্ধরাজ ফুলগাছ কীভাবে তার আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে! এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে? নাকি রায়হানের মানসিক প্রবলেম? রায়হান স্পষ্টই গুলচন্দের অভিমান, খুশি, বেদনা সব টের পায়। এমনকি গুলচন্দ কখন কী বলছে সবই শুনতে পায়। রায়হান তার পালটা জবাব দেয়।
গুলমোহরের প্রতি অত্যধিক আসক্তি কি গুলচন্দের বিষয়ে অবাস্তব ভাবনা ভাবাচ্ছে? অন্য আর দশজন মানুষের মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রায়হান গুলমোহরকে ভালোবেসেছিল। গুলমোহর শুধু অত্যধিক সুন্দরী নয়, বরং কথা দিয়ে তার পাশের মানুষটিকে সে হিপনোটাইজ করে রাখার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে রায়হান খুবই সাধারণ মানের, সাধারণ চেহারার একজন অন্তর্মুখী পুরুষ। শিক্ষা, সৌন্দর্য, সামাজিক-আর্থিক অবস্থান, সকল দিক দিয়ে তাদের মধ্যে বিশাল একটা ফারাক ছিল।
সম্ভবত এই ফারাকের কারণেই ক্রমে রায়হানের মনে গুলমোহরকে হারানোর তীব্র একটা ভয় আসন গেড়ে বসে। নানা ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। গুলমোহরের প্রতিটি বিষয়ে সে অত্যধিক খবরদারি করা শুরু করেছিল। এমনকি তার ফেসবুক আইডি, ইনস্টাগ্রামের পাসওয়ার্ড পর্যন্ত দখল করেছিল। গুলমোহর নির্দ্বিধায় পাসওয়ার্ড দিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু তাতেও রায়হানের মন থেকে সন্দেহ দূর হয়নি। রায়হানের অত্যধিক অবসেস গুলমোহরকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। গুলমোহর বলতো, ‘রায়হান, এটা তোমার ভালোবাসা নয়, অসুখ! আমার শ্বাস আটকে আসছে। দেখো আমি একদিন পালাব।’
গুলমোহর শেষ পর্যন্ত পালিয়েছে। তাকে হারিয়ে রায়হান এখন বুঝতে পারে, সে আসলে ‘অবসেসিভ লাভ ডিসঅর্ডারে’ ভুগছিল। প্রেমিকাকে জীবনের সর্বস্ব ভেবে নিজের সত্তাকে মানুষটার ভেতরে বিলীন করে দিয়েছিল।
শেষবার যখন গুলমোহর কোনোভাবেই আর যোগাযোগ রাখতে চাচ্ছিল না, তখন রায়হান প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। অনেক অনুরোধ করে গুলমোহরকে একবারের জন্য দেখা করতে বলেছিল। এক সন্ধ্যায় রমনা পার্কে গুলমোহর দেখা করতেও এসেছিল। সেদিন ওর পরনে ছিল ফিনফিনে সাদা সুতির শাড়ি। সঙ্গে ছিল গন্ধরাজ ফুলগাছের একটি চারা। রমনার আবছা আলো-আঁধারে তাকে অপার্থিব লাগছিল। রায়হান নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কথায় কথায় তার উত্তপ্ত মস্তিষ্ক ফেটে পড়ে। গুলমোহরকে যাচ্ছেতাই গালাগাল করে অপমান করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাকে মারতে উদ্যত হয়।
গুলমোহর এর বিপরীতে কোনো প্রতিবাদ করেনি, বরং রায়হানের দিকে একটি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লেকের দিকে হাঁটা শুরু করেছিল। গুলমোহরের সেই দৃষ্টি রায়হান আজীবন মনে রাখবে। যে-চোখে সে এতকাল প্রেমের গোলাপ ফুল দেখে এসেছে, সেখানে তীব্র ঘৃণা বিচ্ছুরিত হয়ে রায়হানকে ভয়ানকভাবে বিষাক্ত করে ফেলেছিল। রায়হান ওর পেছনে যাওয়ার সাহস পায়নি। বহুক্ষণ বাদে রমনার সিকিউরিটির লোকজন যখন বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে কাছে এসে বলল, ‘স্যার, টাইম শেষ, বের হতে হবে।’ তখন সম্বিৎ ফিরে পায়। বুঝতে পারে, আজ থেকে আজীবনের জন্য সে গুলমোহরকে হারালো। ততক্ষণে রমনার ঘন বৃক্ষতলায় ঘোর অন্ধকার। পাশেই সিমেন্টের বেঞ্চে গুলমোহরের আনা গন্ধরাজ ফুলের চারা। গুলমোহরই বলেছিল, ‘এটা গন্ধরাজ। বারান্দায় রেখে দিও। যত্ন নিলে ফুল ফুটবে। সুগন্ধে তোমার বারন্দা-ঘর ভরিয়ে তুলবে। তোমার মনকেও।’ গুলমোহর সেদিন গন্ধরাজ ফুলের চারা কেন এনেছিল জানা হয়নি।
মানুষ যখন পরাজয় মেনে নেয় তখন এক প্রকার স্বাধীন হয়ে যায়। তার মানসিকতা চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে গিয়ে মৌন হয়ে যায়। রায়হান একদম মৌন হয়ে গিয়েছিল। আর কখনো গুলমোহরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। গুলমোহরের দেওয়া গন্ধরাজ ফুলের চারাটিকে সে বারান্দার টবে লাগিয়ে দিয়েছিল। চারাটিকে সে কীভাবে একটা সুস্থ-সবল গাছে পরিণত করবে তার জন্য ইন্টারনেট ঘেঁটে সে নানাভাবে পরিচর্যা করে। একদিন এই গাছে গন্ধরাজ ফুলের কুঁড়ি দেখা দিলো, সেদিন রায়হান এত এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিল যে, মেসের সবাইকে বিরিয়ানি খাইয়েছিল। গভীর রাতে ফুলের কুঁড়ির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে গভীর কণ্ঠে বলে উঠেছিল, ‘গুলচন্দ, তুমি আমার গুলমোহর হবে?’ সেই থেকে গন্ধরাজ ফুলগাছটি ‘গুলচন্দ’।
মূলত সেদিন থেকেই গুলচন্দের সঙ্গে রায়হানের কথোপকথন শুরু হয়। প্রথম প্রথম অফিস থেকে ফিরে রায়হান একাই গাছটির পাশে বসে 888sport app download apk পড়ত, বকবক করত, যার বেশিরভাগ ছিল গুলমোহর সংক্রান্ত। একসময় মনে হলো গুলচন্দ তার কথায় নানাভাবে সাড়া দিচ্ছে। একদিন রায়হান বারান্দা থেকে ঘরে ফেরার সময় মনে হলো কেউ পেছন থেকে অবিকল গুলমোহরের মতো করে ডাকছে, ‘আর একটু বসে যাও রায়হান!’ রায়হান এতটাই অবাক হয়েছিল যে, আর একবার কথা শোনার জন্য সারারাত গুলচন্দের পাশে বসে ছিল। দিনে দিনে কথা বাড়তে থাকে। গুলচন্দ কখনো লাস্যময়ী প্রেমিকা! রোমাঞ্চকর কথাবার্তা বলে নিজেকে রায়হানের কাছে নিবেদন করে, কখনো রাগে চেঁচায়, আবার কখনো অভিমানে ভেঙে পড়ে। রায়হানেরও গুলচন্দের জন্য দ্রুত ঘরে ফেরার তাড়া থাকে। গুলচন্দের জন্য অন্য কোথাও রাত কাটানো বন্ধ করে দিয়েছে রায়হান। কিন্তু ইদানীং মনে হচ্ছে গুলচন্দের অভিমান প্রচণ্ড বেড়েছে। গুলমোহরের নাম শুনতেই পারে না। অথচ গুলমোহর ছাড়া রায়হানের কোনো গল্প বলার নেই।
অফিস থেকে আজ আগেভাগে বাসায় চলে এলো রায়হান। এক কাপ চা হাতে করে বারান্দায় গুলচন্দের পাশে গিয়ে বসে। ওর গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলে, ‘কেমন আছো গুলু?’ আদর করে রায়হান মাঝেমধ্যে গুলু সম্বোধন করে। গুলচন্দ মৃদুমন্দ দোল খায়। আজ তাকে খুশি খুশি লাগছে। রায়হান একটা পাতা স্পর্শ করে মোলায়েম কণ্ঠে বলে, ‘দেখো গুলচন্দ, তোমার শিরা-উপশিরাগুলো ঠিক যেন মানচিত্রের মতো। গুলমোহরের হাতের তালুর রেখাগুলোও ঠিক এমন ছিল। সুন্দর স্পষ্ট। আমি সেই রেখায় আমার নাম খুঁজেছিলাম, কিন্তু …’
রায়হান কথা শেষ করতে পারে না। গাছটি তীব্রবেগে নিজেকে এমনভাবে দোলায় যেন প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে। ডালগুলি সশব্দে একে অপরের সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নিজেকে তারা নিজেই ধ্বংস করতে চায়। রায়হান অস্থির হয়ে ওঠে। চিৎকার করে বলে, ‘কী হচ্ছে গুলচন্দ, থামো। কী করেছি আমি?’
গাছটি চিৎকার করে বলছে, ‘কী হয়নি? কী ভেবেছো আমাকে? আমি কি শুধুই তোমার 888sport sign up bonusর প্রতিচ্ছবি? আমার কি নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই? আমি প্রতিদিন তোমার এই বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাসগুলো গিলে নিয়ে তোমাকে অক্সিজেন দিই, আর তুমি আমাকে অন্য এক 888sport promo codeর ছায়ায় বন্দি করে রাখো?’
রায়হান স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে ভাবছে, এটা কি তার ভ্রম,
নাকি দীর্ঘদিনের একাকিত্ব তাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে?
সে বিড়বিড় করে বলল, ‘এত রাগ কেন গুলচন্দ? আমাকে খোঁটা দিচ্ছো? গুলমোহর আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। না থাকুক আমার জীবনে, আমি তো আছি তার সঙ্গেই। তুমি দিনের আলোয় কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন দাও। কিন্তু আমার ভেতরে যে বিষাক্ত 888sport sign up bonusর ধোঁয়া, সেটাকে রূপান্তর করার ক্ষমতা কি কোনো 888sport apkের আছে? তোমার আছে?’
গুলচন্দের শাখার আন্দোলন থামেনি। মাথার মধ্যে ভাবনার প্রচণ্ড বোঝা নিয়ে রায়হান ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করে।
তিন
অফিসে রাজ্যের কাজ। রায়হান ছাড়া আর কেউ যেন অফিসের বেতন-ভাতা ভোগ করে না। যত জটিল অডিট সব রায়হানকেই করতে হয়। অনেকদিন ধরে 888sport app download apk লেখা হয় না। পড়ার জন্য সময়েও কুলাচ্ছে না। বাসায় বসে রাতভর অফিসের কাজ করতে হয়। জীবন তো চালাতে হবে। খেতে হবে, পরতে হবে। ব্যস্ততার কারণে বারান্দায় বেশ কিছুদিন ধরে বসা হয় না তেমন। অল্প যতটুকু সময় বসে গুলচন্দের সঙ্গে কথা বলা হয় না। জাস্ট সিগারেট শেষ করার তাড়া থাকে। গুলচন্দও কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে রায়হান দেখল, গন্ধরাজ গাছটির পাতাগুলো কেমন হলদেটে হয়ে গেছে। গাছটিকে খুবই ম্রিয়মাণ দেখাচ্ছে। একজন হতাশাগ্রস্ত মানুষকে যেমন দেখায়। কিন্তু রায়হানের মনে সেসব দাগ কাটল না। বরং বিরক্ত লাগছে। সে তিক্তস্বরে বলল, ‘কী ব্যাপার গুলচন্দ? তোমারও কি এখন বিলাসিতা শুরু হলো? চাল-ডালের পাশাপাশি বাজারে সারের দামও অনেক বেড়েছে, আর আমার বেতনটা ঠিক ওখানেই আটকে আছে, যেখানে দু-বছর আগে গুলমোহর আমাকে আটকে রেখেছিল।’
এত কিছু বললেও রায়হান জানে গুলচন্দের এই অবস্থার জন্য সে নিজে দায়ী। কারণ, বহুদিন সে তাকে ঠিকমতো
সার-পানি দেয়নি। কিন্তু রায়হান দুনিয়াবি নানা আক্রোশের ঝাল যেন আজ গুলচন্দের ওপর ঝাড়তে চাইছে।
মাসের অর্ধেক চলে গেছে, এখনো অফিস থেকে বেতন হয়নি। প্রতিমাসেই এই অবস্থা। রায়হানের পকেটে এখন মাত্র কয়েকটা খুচরো টাকা পড়ে আছে। নিজের খাবার কিনবে, সিগারেট, নাকি গাছটির জন্য একটু আয়রনসমৃদ্ধ সার? সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে গাছটির দিকে আবার তাকায়। ওর প্রতি কিছুটা মায়া হয়। শান্ত স্বরে এলোমেলোভাবে বলে, ‘জানো গুলচন্দ, গুলমোহর চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম আমি ‘ডেড ম্যাটার’। কিন্তু 888sport apkের এই থার্মোডাইনামিকস বলে – শক্তি কখনো ধ্বংস হয় না, শুধু রূপান্তর ঘটে। আজ বুঝতে পারছি, আমার ভালোবাসা ধ্বংস হয়নি, সেটা তোমার এই শিকড় আর পাতার রসায়নে রূপান্তরিত হয়েছে।’
গুলচন্দ শাখা নাড়িয়ে কিছু একটা হয়তো বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু রায়হান খুব অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রুতপায়ে সে ঘরে ঢোকে। বিড়বিড় করে। এসব হচ্ছে কি তার সঙ্গে? একটা গন্ধরাজ ফুল তাকে দিনে দিনে গিলে ফেলছে! রায়হান কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?
রাত বাজে বারোটা। আশিক বা নোমান কেউ বাসায় ফেরেনি। ফিরবে কি না জানে না রায়হান। ফোন করে জানা যায়, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। এই মেসটাইপ বাসায় কেউ কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না। রায়হান প্রায়ই একটি মেয়েকে মাস্ক পরে রোমানের ঘরে ঢুকতে দেখে। কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে মাস্ক পরে আবার বেরিয়ে যায়। রায়হান কখনো জিজ্ঞেস করেনি, কে? আদলে রায়হান বোঝে, একই মেয়ে। সুতরাং নোমানের গার্লফ্রেন্ডই হবে। গুলমোহর অনেকবার রুমে এসেছে। তুলকালামভাবে অনেক একান্ত সময় কাটিয়েছে তারা। মেসের সবাই অবশ্য গুলমোহরের বিষয়টা জানে। আশিক মাঝেমধ্যে মজা করে, ‘তাকে আর কেন দেখি না রায়হান? সেই সুন্দরী রূপবতী 888sport promo code, যার আগমনে আমাদের এই অন্ধকার কুটিরটি আলোকিত হতো?’ রায়হান মুচকি হেসে এড়িয়ে যায়।
ঘরে ঢুকে রায়হান দ্রুত ল্যাপটপ খুলে বসে। গুলচন্দের বিষয়টি ক্রমেই মাথায় ভার হয়ে চেপে বসেছে। এর একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। এই শহরে তার তেমন কোনো বন্ধু নেই। গুলমোহর ছাড়া কেউ ছিল না জীবনে। সে থাকলে হয়তো গুলচন্দের বিষয়টা শেয়ার করা যেত। অন্য যে কাউকে বললে তারা নির্ঘাত রায়হানকে পাগল ভাববে।
আজকাল চ্যাটজিপিটিই মানুষের বড় বন্ধু। রায়হান চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চাইল, গাছ তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে কি না। চ্যাটজিপিটি রাজ্যের ইনফরমেশন, উদাহরণ দিয়ে বলল, ষাটের দশকে ক্লিভ ব্যাকস্টার নামে এক বিশেষজ্ঞ পলিগ্রাফ মেশিনের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, গাছ মানুষের আবেগ এবং চিন্তার প্রতি সংবেদনশীল। মানুষ যখন খুব বেশি বিষণ্ন বাকরুদ্ধ থাকে, তখন গাছটি তার কোষের স্তরে সেই কম্পন অনুভব করতে পারে। এটি কেবল কল্পনা নয়, 888sport apkের একটি বিতর্কিত কিন্তু জনপ্রিয় তত্ত্ব।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গাছ মানুষের কণ্ঠস্বরের কম্পন অনুভব করতে পারে। গাছের স্নায়ুতন্ত্র নেই, কিন্তু তাদের মধ্যে এক ধরনের বৈদ্যুতিক প্রবাহ থাকে, যা দ্বারা মানুষের স্পর্শ বা কথা বুঝতে পারে। অনেক সময় তার অনুভূতি রিলে করতে পারে। রায়হান আবার প্রশ্ন করল, গাছ কি কথা বলতে পারে? সেটার স্পষ্ট জবাব কোথাও পেল না রায়হান। অর্থাৎ গাছ যে কথা বলতে সক্ষম – গবেষণায় সেটি জানা যায়নি। অথচ রায়হানের সঙ্গে গুলচন্দ একজন পূর্ণবয়স্ক তরুণীর মতো কথা বলে, রাগ-অভিমান করে।
নানা কারণে দিনে দিনে রায়হানের মাথা আরো বেশি আউলিয়ে যাচ্ছে। অফিসের কাজ ঠিকমতো করতে পারছে না। খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সারাক্ষণ অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে। আশিক, নোমান বিষয়টি খেয়াল করেছে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে, রায়হানকে প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে আমাদের খুলে বলো। তোমাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। অফিস কি বন্ধ? যাচ্ছো না। খাওয়া-দাওয়া করছো না ঠিকমতো। চেহারা কি বানিয়েছো বলো তো?’
রায়হান যথারীতি অল্প কথায় এড়িয়ে যায়। ‘আরে কিছুই হয়নি। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ছুটি নিয়েছি কদিনের। ঠিক হয়ে যাবে, টেনশন নিও না।’ মেসের রীতি অনুযায়ী তারা আর বেশি কিছু জানতে চায়নি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নতুন কোনো চাকরির জন্য চেষ্টাও করছে না।
রায়হান বারান্দায়ও সচরাচর যায় না আজকাল। গেলে মাথা আরো গরম হয়ে ওঠে। গুলচন্দের দিকে তাকিয়ে তীব্র আক্রোশ তৈরি হয়। মনে হয়, তার জীবনে যে বিষণ্নতা ভর করেছে সেটির কারণ এই গুলচন্দ। তবে গুলচন্দের যত্ন নেয় নিয়মিত। সার-পানি দেয়। ধীরে ধীরে হলদেটে ভাব কেটে গাছটি বেশ স্বাস্থ্যবতী হয়েছে। পাতাগুলো চমৎকার সবুজ।
চার
নিজের প্রতি ক্রমাগত অনিয়ম, অযত্ন আর স্বেচ্ছাচারের ফলে রায়হানের চেহারা উ™£ান্তের মতো হয়ে গিয়েছিল। বাইরে যায় না, কারো সঙ্গে কথা বলে না। নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ। নেশা করে অন্ধকার ঘরে পড়ে থাকে অথবা বারান্দায় বসে গন্ধরাজ ফুলগাছের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলে। নোমান এবং আশিক দুজনেই বিষয়গুলো খেয়াল করে। রায়হানকে কোনো প্রশ্ন করলে উলটাপালটা জবাব দেয়। নোমান বুঝতে পারে, রায়হান মেন্টালি সুস্থ নয়। একদিন অনেকটা জোর করে রায়হানকে নোমান তার এক সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর কাছে নিয়ে যায়। রায়হান গুলমোহর এবং গুলচন্দের বিষয়ে প্রতিটি কথা সাইকিয়াট্রিস্টকে খুলে বলেছিল। তিনি মন দিয়ে সব শুনে একবাক্যে বলে দিয়েছেন, রায়হান ভয়ানক এক মানসিক ব্যাধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গুলচন্দের বিষয়ে সে যা কিছু শুনছে দেখছে তার পুরোটাই ‘হ্যালুসিনেশন’। রায়হান গুলমোহরকে অত্যধিক ভালোবাসার কারণে তার সঙ্গে বিচ্ছেদ মানতে পারেনি। গুলচন্দের মধ্যে সে গুলমোহরকে খোঁজার চেষ্টা করেছে। তার অপ্রাপ্তিগুলো গুলমোহরের দেওয়া গাছের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের মনের ভার লাঘব করেছে, যাকে সাইকোলজির ভাষায় ‘প্রজেকশন’ বলে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, এই অবস্থা থেকে বের হতে চাইলে সবার আগে গন্ধরাজ গাছটিকে বারান্দা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। না হলে রায়হানের উন্মাদ হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।
এরপরে রায়হান অনেকদিন বারান্দাতেই যায়নি। গাছের যত্ন যা করার আশিক করেছে। সে নিয়মিত মেন্টাল থেরাপি নিচ্ছে। মেডিসিনও খাচ্ছে। পুরনো অফিসে আবার জয়েন করে যাওয়া-আসা করছে। সবকিছু মোটামুটি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে এলেও গন্ধরাজ গাছটিকে সে আজো ফেলতে পারেনি। এখনো মনে হয় গুলচন্দ তার সঙ্গে কথা বলছে।
এপ্রিল শুরু হয়েছে মাত্র। তেমন গরম নেই, বরং হালকা বৃষ্টি হওয়াতে আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা ঠান্ডা। আকাশ এখন একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। অনেকদিন পর রায়হান বারান্দায় এসে বসে। বারান্দাটি এমন অবস্থানে যে দিনের পুরো রোদ সে পায় আবার পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয় ভেসে যায়। আজ চৈত্র পূর্ণিমা। গুলচন্দের শরীরে চাঁদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। তার শরীরজুড়ে অনেক সাদা ফুল ফুটে আছে। মনে হচ্ছে গুলচন্দ সবুজের বুকে সফেদ ফুলের প্রিন্টের শাড়ি পরেছে।
আজ বিকেলে গুলমোহরের বিয়ের খবর পেয়েছে রায়হান। আজই বিয়ে তার। অদ্ভুত বিষয় হলো, এতে তার ভেতরে তীব্র কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়নি। অথচ এই দিনটির কথা ভেবে কত রাত যে সে আতঙ্কিত হয়ে নির্ঘুম কাটিয়েছে!
রায়হান গুলচন্দের পাতায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘গুলু তুমি এত ফুল নিয়ে সেজেছো কেন আজ? তোমারও আজ বিয়ে নাকি, গুলমোহরের মতো?’
গুলচন্দ নিঃসাড়! কোনো কথা বলছে না।
রায়হান গুলচন্দের একটি ফুলে হাত বুলিয়ে বলে, ‘কী সুন্দর ফুল আর কী মোহনীয় ঘ্রাণ তোমার গুলু। তবে কি জানো? মানুষ যখন অবশ্যম্ভাবী কোনো পরিণতিকে মেনে নেয়, তখন সে যাবতীয় ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। আজ আমি মুক্তি পেয়েছি।’
রায়হান একা একাই বকবক করছে কিন্তু গুলচন্দ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তার শাখা-প্রশাখা আগের মতোই স্থির। পাতাগুলো মৃদু বাতাসে হালকা নড়ছে। রায়হানের বিশ্বাস হয়, সত্যি সে এতদিন হ্যালুসিনেশনে ভুগছিল। আদতে সে একটি সাধারণ গন্ধরাজ ফুলগাছ। বৃক্ষের কখনো ভাষা থাকে না। মনে মনে হাসে রায়হান। একটা ফুলগাছকে গুলমোহর ভেবে কত কত কল্পনা, পাগলামিই না সে করেছে। কত কত কথা বলেছে। 888sport app download apk পড়ে শুনিয়েছে, যেন গুলমোহর শুনছে । আদর করেছে, যেন গুলমোহরকে আদর করছে। আবার অভিমানও করেছে, যেন গুলমোহরের ওপর রাগ ঝাড়ছে।
আজ বড় নির্ভার লাগছে রায়হানের। মনে হচ্ছে, তার জীবনে কোথাও কোনো সমস্যা নেই। কোনো অভাব-অনটন, অফিসের হ্যাপা, গুলমোহরকে না পাওয়ার বেদনা কিছুই নেই। একদম স্বাধীন সুস্থ একটা মানুষ, যার কোনো পিছুটান নেই। জবাব দিতে পারবে না জেনেও রায়হান কেন জানি গুলচন্দের সঙ্গে কথা বলছে, হয়তো সে চাচ্ছে গুলচন্দ আগের মতো কথা বলুক। রায়হান অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে গুলচন্দকে বলল, ‘শোন গুলচন্দ, তুমি বাস্তব নাকি আমার কল্পনা, আমি জানি না। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বলে আমি শান্তি পাই। তবে আজ তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা, শেষ কথা। আগামীকাল একটা ভালো নার্সারিতে তোমাকে দিয়ে আসব। আশা করি সেখানে তুমি যত্নে থাকবে।’
গুলচন্দ চুপ। ডাক্তার কোনো ধরনের আবেগকে প্রশ্রয় দিতে নিষেধ করেছেন। রায়হান নিজেকে জোর করে বারান্দা থেকে ঘরে নিয়ে আসে। তারপর বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের ঘুম রায়হানকে জাপটে ধরে। ঘুমের অতলে এমনভাবে তলিয়ে যায় যে, ভোরের আলো ফোটার আগে দুনিয়াদারির কোনো শব্দ বা ভাবনা তাকে জাগাতে পারেনি।
সকালে যখন ঘুম ভাঙে দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা তখন ছয়ের ঘর পার করে ফেলেছে। সূর্যের নরম আলো বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে। ঘুম থেকে জেগে রায়হানের প্রথমেই মনে পড়ে গুলচন্দকে আজ বিদায় জানাতে হবে। খাট থেকে নেমে সে একটু ত্রস্ত পায়ে বারান্দার দিকে এগোয়। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে গুলচন্দের দিকে চোখ পড়তেই থমকে যায় রায়হান।
গুলচন্দের শরীরে একটা পাতা বা ফুল অবশিষ্ট নেই। মেঝেতে পাতাগুলো সবুজ গালিচার মতো বিছিয়ে আছে, ফাঁকে ফাঁকে সাদা ফুল। ওর মূল, কাণ্ড থেকে শুরু করে প্রতিটি শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, বহুকাল আগের মৃত ফসিল।
রায়হান দরজার চৌকাঠে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। সে বুঝতে পারছে না, এই মুহূর্তে সে যা দেখছে, সেটি কি তার হ্যালুসিনেশন, নাকি বাস্তব?


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.