বাড়ির নাম দিলশাদ মহল।
বাঈজী দিলশাদ বেগমের গানের প্রতি যে মমতা ও প্রেম, সেই মমতা আর ভালোবাসায় বাড়িটি তৈরি করেছেন। বাড়ির বয়স একশ বছর পূর্ণ হয়েছে। একশ বছর আগে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহর কাছ থেকে নজরানা পান তরুণী রূপসী বাইজি দিলশাদ বেগম। জনমানবহীন এই বিরানভূমিতে যখন এসে পৌঁছালেন হতাশ হয়েছিলেন বইকি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ও দুঃখ-বেদনায় চোখের পানি বাঁধ মানেনি। সঙ্গের লোকজন এতোই হতাশ হলো যে, তারা ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করল। এখানে কোনো জনবসতি নেই। বাইজির গান শুনবে কে? রুজিরোজগার না হলে বাঁচবে কী করে? এই বিরানভূমিতে হয় ডাকাতের হাতে, নয়তো না খেয়ে তাদের মরতে হবে।
বাইজি দিলশাদ বেগম সঙ্গী-সাথিদের মনে করিয়ে দিলো, তাদের ফেরার পথ বন্ধ। তাদের কারণে দিল্লির অভিজাত শ্রেণির যুবক ও ইংরেজ প্রশাসনের যুবক কর্মকর্তারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যুবকরা কর্মবিমুখ, বাইজি ও সুরায় বুঁদ হয়ে ধ্বংসের পথে আনন্দে মশগুল হয়ে আছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। জরুরি ভিত্তিতে দিল্লিকে বাইজি ও বেশ্যা মুক্ত করা হলো। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদের জমির দলিল ধরিয়ে দিল্লি থেকে, রাজ্যের রাজধানী থেকে, বড় বড় শহর বন্দর নগর থেকে দূরদূরান্তে অজানা বিরানভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। বাইজিরা বাধ্য হয়ে অজানার পথে জীবন-জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।
দিলশাদ বেগমের আশ্রয় মিলল মুর্শিদাবাদ শহর থেকে ষাট মাইল দূরে এক বিরানভূমিতে। আশেপাশে দশ মাইলের মধ্যে কোনো গ্রাম, বসতভিটা, শস্যক্ষেতের দেখা মিলল না। জলা-জংলা জায়গা। পাশ দিয়ে ভাগীরথী নদী বয়ে গেছে। নদীর পানে তাকিয়ে দিলশাদ বেগমের মন প্রসন্নতায় ভরে উঠল।
– কিতনা মিঠা আওয়াজ!
জনমানবহীন নিস্তব্ধতায় গাছের মর্মরধ্বনি আর বহমান নদীর কুলকুল ছান্দসিক আওয়াজ দিলশাদ বেগমের হৃদয়ে সংগীতের ঝংকার তুলল।
– ইস গাঁওকা নাম কেয়া?
দৃষ্টির সীমানায় কোনো জনমানুষ নেই যে গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করে।
দিলশাদ বেগম বলল, ইয়ে গাঁওকা নাম আজসে ‘দিলশাদ কা গাঁও’। হামারা গাঁওমে পহেলি জো আদমি আয়েগা উসকো দিল শানৎ হো জায়েগা। দিলমে মোহাব্বতকা খুসবু আঁখ মেলেগা। আউর দিলশাদ কো গজল প্রেম জোয়ারসে ভাস জায়েগা। ওহি গাঁওকা নাম ‘দিলশাদ কা গাঁও’ ছোড়কে আওর কুছ হো সাকতা?
দিলশাদ বাইজির দেহের বাঁকবিন্যাস ও বাঁধভাঙা হাসির সুরেলা ঝংকারে এক যুবক অশ্বারোহী ঘোড়ার রাশ টেনে দাঁড়ালের। তিনি বিস্মিত! অভিভূত! এই নির্জন প্রান্তরে এরা কারা? এই অপরূপা 888sport promo code এখানে এলো কী করে? তিনি কি কুহকে পড়েছেন? দৃষ্টিবিভ্রম? অলীক ভ্রান্তির গোলকধাঁধায় আচ্ছন্ন হয়ে আছেন? এটা তাঁর এলাকা। এর আগে এদের কখনো দেখেছেন বলে মনে হয় না। এদের পোশাক আচরণ কথাবার্তা ভিন্ন। ভিনদেশি উচ্চ বংশীয় মনে হয়।
কৌতূহলী অশ্বারোহী অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দিলশাদ বেগমের দিকে এগিয়ে গেলেন। দিলশাদ বেগম ও তার দল অশ্বারোহী যুবককে কুর্নিশ করে স্বাগত জানাল।
– আপনারা এখানে কেন? এখানে কোনো জনবসতি নেই। যাবেন কোথায়?
দিলশাদ বেগম নম্রস্বরে জিজ্ঞেস করল, জনাব, দাসী কি আপনার পরিচয় জানতে পারে?
– আমি জয় নারায়ণ চৌধুরী। অত্র এলাকার জমিদার। আমি শিকারে বের হয়েছিলাম। দূর থেকে দেখে মনে হলো আপনারা কোনো বিপদে পড়েছেন। আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?
– বাবুজি, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। আমরা খুব বিপদে আছি। আমি একজন কালাকার। এরা আমার সহ888sport live chatী। আমরা দিল্লি থেকে এসেছি। বাহাদুর শাহর দরবারে গজল গাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমার নৃত্য শাহি দরবারে প্রশংসা অর্জন করেছে। বাবুজি কি একটা গজল শোনানোর সুযোগ আমাকে দেবেন?
– এখানে, এই জঙ্গলে?
– গজল, এই নদী, গাছের স্নিগ্ধ ছায়া, সুশীতল হাওয়া খুদা কি নিয়ামত হ্যায় বাবুজি। দিল চাহে তো গজল কা মিঠা আওয়াজসে দোজখ বি বেহেশত হো সাকতা।
বৃক্ষের ছায়ায় খোলা প্রান্তরে গাছে গাছে মর্মরিত হতে থাকল দিলশাদ বেগমের সুরেলা কণ্ঠস্বরে ঐশ্বরিক বাণী। জয় নারায়ণ নিজে গানের চর্চা করেন। তাঁর কণ্ঠ সুরেলা না হলেও গানের মর্ম তিনি বোঝেন। গান তাঁর কাছে পরম আরাধ্য গভীরতম আনন্দ। তাঁর মনে হলো, এ সুরেলা কণ্ঠ, মর্মবাণী জাগতিক নয়। স্বর্গ থেকে ভেসে আসছে এই অলৌকিক মাধুর্য। তিনি প্লাবিত হলেন সুরের মোহনীয় জাদুতে। নিমগ্ন হলেন গভীর ধ্যানে।
দিলশাদ বেগমের গান শেষ হয়েছে। সুরের রেশ তখনো শেষ হয়নি। জয় নারায়ণের হৃদয় বীণায় তখনো গানের রেশ নিমগ্ন ধারায় বয়ে যাচ্ছে। দিলশাদ বেগম রহস্যের হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল, বাবুজি, গানা ক্যায়সে হুয়া?
জয় নারায়ণ রহস্য করে বললেন, তোমার কণ্ঠে গান শেষ হয়েছে। কিন্তু আমার হৃদয়ে তোমার গান বেজেই চলছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। এখন আমার কী হবে?
দিলশাদ বেগম হাসিতে ভেঙে পড়ে, বাবুজি, আপ শায়ের হ্যায়? ইয়ে তো শায়ের কি বাত।
জয় নারায়ণ বললেন, আমি তোমার গুণমুগ্ধ সেবক। তুমি আমার বাড়ি চলো। যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা তুমি পাবে। আমি 888sport live chatীর মর্যাদা দিতে জানি।
– নেহি বাবুজি। আপনার সংসারে আমি আগুন লাগাতে পারবো না। বাইজির নেশা খুব খারাপ নেশা আছে। রানিমাকে আমার নমস্কার। হামার কোঠি চাহিয়ে। আপনার দিল যখন চাহিবে হামার কোঠিতে গানা শুনতে নাচের মৌজ নিতে চলিয়া আসিবেন। ইয়ে জামিন সম্রাট বাহাদুর শাহ মুঝে ইনাম দিয়া। দেখিয়ে মেরা দলিল।
সেই বিরানভূমিতে গড়ে উঠল বাইজি দিলশাদ বেগমের কোঠি। দিলশাদ মহল। গ্রামের নাম হলো ‘দিলশাদ কা গাঁও’। নামে কোঠি আদতে প্রাসাদ। দিলশাদ বেগমের সমস্ত সঞ্চয় আর জয় নারায়ণের সাহায্য-সহযোগিতায় গড়ে উঠল জয় নারায়ণের প্রাসাদের আদলে আরেক রংমহল। সিংহদ্বারের চূড়ায় পাহারায় থাকলো দুটি গর্জনরত সিংহ। সুরক্ষার উঁচু দেয়ালঘেরা দোতলা প্রাসাদ। নাচঘরের জলসায় জ্বললো রঙিন ঝাড়বাতি। নিত্যরাতে জমে ওঠে আনন্দ ফোয়ারা। দিলশাদ বেগমের কিন্নরী কণ্ঠে সুরের জাদু খেলা করে। গানের সুরে-তালে নৃত্য888sport live chatীর অপূর্ব দেহপল্লবের শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘুঙুরের ছন্দে তালে দর্শকদের দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ে দুর্নিবার মোহ। রঙিন আনন্দ-নেশা যত বাড়ে, রাত তত গভীর হয়।
তৈরি হলো ওস্তাদ, যন্ত্রী, কর্মচারী, দারোয়ান, পাইক-পেয়াদা থাকার ঘর। আশেপাশে দূরদূরান্ত থেকে জমিদার, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাট তৈরি হলো। বাবুদের প্রয়োজনে দোকানপাট, বাড়িঘর, বসতি, শস্যক্ষেত, হাটবাজার – একে একে সবই গড়ে উঠল। এরপর একশ বছর পার হয়েছে। জমিদার রাজ নারায়ণের প্রাসাদ এখন পোড়োবাড়ি। তাঁর বংশধররা বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় কায়ক্লেশে দিনাতিপাত করে।
দিলশাদ বেগম নেই, কিন্তু তার কোঠি দিলশাদ মহল এখনো সগৌরবে টিকে আছে। আগের সেই জৌলুস নেই, সিংহদ্বারের সিংহ ভেঙে পড়েছে। দালান টিকে আছে, জনবসতি আছে। জমিদার নেই, নৃত্য-গানের সমঝদারও নেই। ব্যবসাও নেই আগের মতো। এখন হাল ধরেছে দিলশাদ বেগমের পঞ্চম প্রজন্ম লাইলি বেগম।
একশ বছর পূর্বে যে বিরানভূমিতে বাইজি দিলশাদ বেগমের কোঠিবাড়ি তৈরি হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঘিঞ্জি ব্যস্ত এক জেলা শহর ‘দিলশাদ টাউন’। আজকাল পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সামাজিক ফোরামে, রাজনৈতিক মহলে খুব আলোচনা হচ্ছে শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে বাইজি কোঠি তথা বেশ্যালয় থাকা শহরের জন্য মর্যাদা হানিকর। বড্ড দৃষ্টিকটু। বাইজির নামে শহরের নাম ভাবতেই বেশ্যার নগ্ন শরীর ভেসে ওঠে। বাইজি কোঠির গা-ঘেঁষে মেয়েদের স্কুল, হাসপাতাল। উচ্ছেদ না করলে শহরের যুবক সমাজকে রক্ষা করা যাবে না। ক্যান্সারের মতো মানুষের সুস্থ চিন্তাধারা, সমাজ, রাজনীতি, ধর্মকে গ্রাস করবে। ক্যান্সার যত দ্রুত অপসারণ করা যায় ততই মঙ্গল।
বাইজি কোঠি উচ্ছেদ নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। বিরোধ দেখা দিলো এই পাপভূমির ব্যবহার নিয়ে। ধর্মীয় নেতারা দাবি করলেন, একশ বছর ধরে বাইজি কোঠিতে যে পাপ জমা হয়েছে তার থেকে মুক্তির উপায় হলো এখানে মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণ করা। সমাজপতিরা বললেন, জেলা শহরে বড় কোনো হাসপাতাল নেই। আমরা চাই হাসপাতাল কমপ্লেক্স। রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের দাবি, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের আর্থিক সংকট বিবেচনায় রাখতে হবে। সুপার মার্কেট করলে বিনা ইনভেস্টমেন্টে সরকার লাভবান হবে।
উচ্ছেদ মামলা আদালতে গড়াল। বর্তমান উত্তরাধিকারী লাইলি বেগম আদালতে বয়ান দিলেন, স্যার, আমরা বাইজি, আমরা 888sport live chatী। বংশপরম্পরায় নৃত্য-গীতের মাধ্যমে আমরা মানুষের মনের আনন্দকে পরিপূর্ণতা দিয়েছি। এটাই আমাদের পেশা। আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার। কোন অপরাধে আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? আমাদের নিয়ে সমাজে ভুল ধারণা প্রচার করা হচ্ছে। আমরা বেশ্যা নই। আমরা 888sport live chatী।
আদালত সংবিধানবিরোধী কোনো উপাদান পেলেন না। মামলা খারিজ হয়ে গেল।
পরদিন গভীর রাতে বাইজি কোঠিতে আগুন লাগল। কীভাবে আগুন লাগলো কিংবা কে লাগালো তা অজানা থেকে গেল। আগুন নেভাতে যারা বাইজি কোঠিতে ঢুকেছে তাদের হাতে কোঠির মেয়েরা লাঞ্ছিত হলো। মাদ্রাসার ছাত্ররা দশ দিনের মধ্যে বাইজি কোঠি খালি করার চূড়ান্ত হুমকি দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করল। আদালত এবার কারণ খুঁজে পেলেন। দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে শহর ও মানুষকে রক্ষা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য বাইজিদের কোঠি ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা সমপরিমাণ জমি পাবে। বাড়ি নির্মাণের ক্ষতিপূরণ পাবে। শহরে থাকা বাইজিদের জন্য নিরাপদ নয়। লোকালয় থেকে দূরে বহু দূরে কোনো বিরানভূমিতে তাদের চলে যেতে হবে। যেখানে মনুষ্য সমাজ নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাইজি বাড়ির মালপত্র গাড়িতে উঠছে। একশ বছরের বসতি, পাঁচ প্রজন্মের শেকড় এই মাটির গভীরে প্রোথিত। অশ্রু বাঁধ মানছে না। লাইলি বেগমের মনে পড়ছে তার পূর্ব পঞ্চম প্রজন্ম দিলশাদ বেগমের কথা। বংশপরম্পরায় এ-কথা প্রচলিত আছে যে, তুমি এখানে অশ্রু বিসর্জন করছো। কিন্তু তুমি যাচ্ছো একটি নতুন শহর পত্তন করতে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.