ফরাসি লেখক জুল রেনার (Pierre-Jules Renard :1864–1910) তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘প্রতিভার প্রশ্নটি পরিমাণ-সংক্রান্ত। প্রতিভা একটি মাত্র পৃষ্ঠা লিখেই ক্ষান্ত থাকে না : লিখে ফেলে তিনশো পৃষ্ঠা। এমন কোনো 888sport alternative link নেই যা সাধারণ বুদ্ধি দ্বারা কল্পনাসাধ্য নয়; এমন কোনো বাক্য নেই, তা যত সুন্দরই হোক না কেন, যার নির্মাণ সম্ভব নয় কোনো প্রাথমিক শিক্ষার্থীর পক্ষে।’ তিনি মনে করতেন, প্রতিভার বেলায় ‘শুধু কলম তুলে নেওয়ার অপেক্ষা, অপেক্ষা শুধু কাগজ শাসন করার, ধৈর্যসহকারে তা ভরিয়ে তোলার। শক্তিমান ইতস্তত করেন না এ নিয়ে। তাঁরা স্থিরভাবে বসেন, ঘাম ঝরান, আর শেষ পর্যন্ত না পৌঁছে থামেন না।’ রেনার এ-ও মনে করতেন যে, ‘তাঁরা কালি নিঃশেষ করেন, কাগজ ব্যবহার করেন পুরোপুরি। এটাই একমাত্র প্রভেদ প্রতিভাবান ও ভীরুর মধ্যে, যারা শুরু করতে সমর্থ নয় কখনোই। 888sport live footballে বিরাজ করেন শুধু বৃষগণ’ (রেনার, ২০২২ : ৯)। আমাদের বাংলা 888sport live footballে প্রতিভাবান লেখকের তো অভাব নেই; কিন্তু রেনার কথাগুলো যদি মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে যে-ক’জন বাঙালি লেখকের নাম পাওয়া যাবে, তাঁদের মধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী অন্যতম।
আমাদের 888sport live888sport live footballে মননশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে ধারা রয়েছে – প্রমথ চৌধুরী, ধূর্জটীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ – সৈয়দ মুজতবা আলী ঠিক সেখানেও যেমন পুরোপুরি মাননসই নন; আবার পরশুরাম, পরিমল গোস্বামী কিংবা শিবরামের দলের লোক হিসেবে তাঁকে পরিচিত করানোটাও বেশ মুশকিল। অন্যদিকে, মুজতবা আলীকে এই দুই দল থেকে গোত্রচ্যুত করাটাও তো সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। বীরবল ওরফে প্রমথ চৌধুরী সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন, ‘তাঁর লেখায় ছিল স্বাদ। ছিল নিপুণ রাঁধুনিপনা। … এই বহুরূপী লেখকের যে বিষয়গুণ ছিল না তা নয়।
কিন্তু বিষয়গুণকে গৌণ করেছিল তাঁর পদবিন্যাস, যা দিয়ে তিনি মন হরণ করেছিলেন।’ এর পাশাপাশি প্রমথ চৌধুরীর রসিকচিত্তের মুগ্ধকর শৈলীকে অন্নদাশঙ্কর খেয়াল করতে ভুল করেননি। (অন্নদাশঙ্কর, ২০১৪ : ৬৮-৬৯)। অন্যদিকে, শিবরাম সম্পর্কে প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন, ‘সামান্য একটা খড়কুটো পেলে [সে] একটা বড় বাগান বানিয়ে নিতে পারতো অনায়াসে। শিবরাম … হাসির ছলে যেসব চরিত্র তৈরি করে গিয়েছে তা সত্যিই চমৎকার … বাংলা 888sport live footballে সেগুলির মূল্য যত দিন যাবে ততই আকাশছোঁয়া হবে নিঃসন্দেহে’ (প্রেমেন্দ্র, ১৯৯৬ : ৩)।
দুই
সৈয়দ মুজতবা আলীকে কোনো দল থেকেই আপাতত বাদ দিতে সম্মত নই আমরা। এবার তাঁর নিজের বিষয়ে আসা যাক। মুজতবা আলী জানিয়েছিলেন, ‘এ আমি নিশ্চয় করে জানি যে, আমার মনোজগৎ রবীন্দ্রনাথের গড়া। প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বলুন, দর্শন, কাব্য, ধর্মের ভিতর দিয়ে বহুর মধ্যে একের সন্ধান বলুন; কালিদাস, শেলি, কিটসের কাব্যের ভিতর দিয়ে বিশ্ব-888sport live footballের রসাস্বাদই বলুন – আমার মনোময় জগৎ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি।’ শুধু তো এটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি সৈয়দ মুজতবা আলী, সে-সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘জানা-অজানায় পঠিত – আমার চিন্তা, অনুভূতির জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব সব চেয়ে বেশী। জীবনের ক্রমবিকাশপথে নানা দিক থেকে রবীন্দ্রকাব্যের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে’ (মুজতবা, ১৪০৬ : ৯)। এমন অকপটে অগ্রজ 888sport live footballিকের ঋণস্বীকার করাটাও সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর কাব্যের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ঋণস্বীকারের প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই উদ্যোগী হয়ে অনুজ কবিকে জানিয়েছিলেন, ‘আমার কাছে ঋণস্বীকার করে আজকের দিনের বাংলা দেশে তুমি অসামান্যতা দেখিয়েছ। একেবারেই সাহস করতে না যদি ঋণটা বাইরের জিনিস না হতো।’ এরপরেই তিনি আসল কথাটি বলেন এভাবে, ‘কাব্যে তোমার একান্ত স্বকীয়তা আর সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে প্রকাশ পেয়েছে। তোমার 888sport app download apk যেখান থেকেই গয়না নিক্ না রূপ তো তারই – নিজের চেহারা বন্ধক দিয়ে সে কিছুই ধার নেয়নি’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ৩২)। রবীন্দ্রনাথ যদি জীবিত থাকতেন, সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার প্রতিক্রিয়ায় কী জানাতেন, সেটি আমরা শুধু অনুমান করে নিতে পারি। এমন তো নয় যে, রেনার এই কথাগুলো রবীন্দ্রনাথ কিংবা মুজতবা আলী – কারোরই সেই অর্থে জানা ছিল না – ‘তরুণ লেখকের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত লেখকের প্রভাবমুক্ত হওয়া এক চমকপ্রদ কাজ। কতই-না শ্রম স্বীকার করতে হয় নিতান্তই সহজভাবে আপন মৌলিকতায় উপনীত হতে’ (রেনার, ২০২২ : ১০)!
তিন
কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ে, ১৩৩০ সনের ২০শে ফাল্গুন তারিখে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় হচ্ছে মানুষ সৃষ্টিকর্তা। আজকের দিনের সভ্যতা মানুষকে মজুর করছে, মিস্ত্রি করছে, মহাজন করছে, লোভ দেখিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খাটো করে দিচ্ছে। মানুষ নির্মাণ করে ব্যবসায়ের প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আত্মার প্রেরণায়। ব্যবসায়ের প্রয়োজন যখন অত্যন্ত বেশি হয়ে উঠতে থাকে তখন আত্মার বাণী নিরস্ত হয়ে যায়। ধনী তখন দিব্যধামের পথের চিহ্ন লোপ করে দেয়, সকল পথকেই হাটের দিকে নিয়ে আসে।’ কিন্তু এই পর্বটাকেও রবীন্দ্রনাথ মানুষের জীবনের শেষ কথা কিংবা তার জীবনের একমাত্র ও অন্তিম পর্ব হিসেবে মেনে নিতে সম্মত ছিলেন না। কেননা, তাঁর মতে, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্বন্ধ বাহ্য প্রকৃতির তথ্য-রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে আত্মার চরম সম্বন্ধে নিয়ে যায় – যা সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, কল্যাণের সম্বন্ধ, প্রেমের সম্বন্ধ, তারই মধ্যে। সেইখানেই মানুষের সৃষ্টির রাজ্য।’ আর সে-কারণেই তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ‘সেখানে প্রত্যেক মানুষ আপন অসীম গৌরব লাভ করে, সেখানে প্রত্যেক মানুষের জন্যে সমগ্র মানুষের তপস্যা। যেখানে মহাসাধকেরা সাধন করছেন প্রত্যেক মানুষের জন্যে, মহাবীরেরা প্রাণ দিয়েছেন প্রত্যেক মানুষের জন্যে, মহাজ্ঞানীরা জ্ঞান এনেছেন প্রত্যেক মানুষের জন্যে’ (রবীন্দ্রনাথ, রচনাবলী : ঊনবিংশ খণ্ড, ২০২০ : ৩৬)। রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধিই প্রবাহিত হতে দেখি আমরা সৈয়দ মুজতবা আলীর চেতনায়। তাঁর একটি 888sport sign up bonusবিজড়িত রচনায় মুজতবা আলী লিখেছেন, ‘১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাই। … বিশ্বভারতীতে তখন জনদশেক ছাত্রছাত্রী ছিলেন; তাঁরা সবাই শান্তিনিকেতন স্কুল থেকেই কলেজে ঢুকেছেন – শ্রীহট্টবাসীরূপে আমার গর্ব এই যে বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগে আমিই প্রথম বাইরের ছাত্র। প্রথম সাক্ষাতে গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, কি পড়তে চাও? আমি বললুম, তা তো ঠিক জানিনে তবে কোনও একটা জিনিস খুব ভাল করে শিখতে চাই। তিনি বললেন, নানা জিনিস শিখতে আপত্তি কি? আমি বললুম, মনকে চারদিকে ছড়িয়ে দিলে কোনও জিনিস বোধ হয় ভাল করে শেখা যায় না। গুরুদেব আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, একথা কে বলেছে? আমার বয়স তখন সতেরো – থতমত খেয়ে বললুম, কনান ডয়েল। গুরুদেব বললেন, ইংরেজের পক্ষে এ বলা আশ্চর্য নয়।’ এই কাহিনির উপসংহার টেনে মুজতবা আলী বলেন, ‘‘কাজেই ঠিক করলুম, অনেক কিছু শিখতে হবে। সম্ভব অসম্ভব বহু ব্যাপারে ঝাঁপিয়ে পড়লুম। গুরুদেবের সঙ্গে তখন সাক্ষাৎ হত ইংরেজি ও বাংলা ক্লাসে। তিনি শেলি, কিটস আর ‘বলাকা’ পড়াতেন’’ (মুজতবা, ১৪০৬ : ১১)।
চার
রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কী-কী শিখেছিলেন মুজতবা আলী? সেসব তিনি তালিকা আকারে দেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর লেখাপত্র থেকে সব না-হলেও কিছুটা অন্তত আমরা ধারণা করতে পারি। যার একটি হচ্ছে – জীবন সম্পর্কে ধারণা ও 888sport live chatদৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ একবার মুজতবা আলী ও তাঁর সহপাঠীদের বলেছিলেন, ‘আমি জানি একতারা থেকে যে সুর বেরোয় তাতে সরলতা আছে কিন্তু সে সরলতা একঘেয়েমির সরলতা। বীণা বাজানো ঢের শক্ত। বীণাযন্ত্রের তার অনেক বেশী, তাতে জটিলতাও অনেক বেশী। বাজাতে না জানলে বীণা থেকে বিকট শব্দ বেরোয় কিন্তু যদি বীণাটাকে আয়ত্ত করতে পার তবে বহুর মধ্যে যে সামঞ্জস্যের সৃষ্টি হয় তা একতারার একঘেয়েমির সরলতার চেয়ে ঢের বেশী উপভোগ্য।’ এইটুকু বলার পর বিরাট বিশ্বের উদাহরণ টেনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষার্থীদের জানিয়েছিলেন যে, ‘আমাদের সভ্যতা বীণার মত, কিন্তু আমরা এখনও ঠিকমত বাজাতে শিখিনি। তাই বলে সে কি বীণার দোষ, আর বলতে হবে যে একতারাটাই সবচেয়ে ভালো বাদ্যযন্ত্র’ (মুজতবা, ১৪০৬ : ১২)। আলবার্ট শোয়েৎজার যেমন বলেছিলেন, সভ্যতার অপরিহার্য উপাদান, বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র তার বস্তুগত অর্জনের মধ্যে নয়, বরং ব্যক্তির সামগ্রিক পরিপূর্ণতা এবং গোটা মানবজাতির উন্নত মতাদর্শের মধ্যে নিহিত থাকে। শোয়েৎজারের মতে, ‘The essential nature of civilization does not lie in its material achievements, but in the fact that individuals keep in mind the ideals of perfecting of the man, and the improvement of the social and political conditions of peoples, and of mankind as a whole.Õ (Schweitzer, 1961 : 20)। আবার আমরা দেখি আইনস্টাইনের মতে, মানুষের সুচিন্তিত এবং অভিব্যক্ত ইচ্ছাশক্তির ওপর সভ্যতার এই শক্ত পাটাতন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তি বজায় রাখার কার্যকর সমস্যাই কেবল আজ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়নি, জনসাধারণকে শিক্ষাদান এবং তাদের সজাগ ও সচেতন করার গুরুদায়িত্বও আমাদের উপর পড়েছে। চিত্তের স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অবলোপী শক্তিসমূহের প্রতিরোধ করা যদি আমাদের কাম্য হয়, তাহলে প্রত্যাসন্ন সংকট সম্বন্ধে আমাদের মনে স্বচ্ছ ধারণা থাকা চাই।’ কেন সেসব থাকাটা জরুরি? – এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আইনস্টাইনের মনে হয়েছিল, মানুষের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ‘এই স্বাধীনতা না থাকলে শেকসপিয়ার, গ্যেটে, নিউটন, ফ্যারাডে, পাস্তুর বা লিস্টারের উদ্ভব সম্ভব হতো না। জনসাধারণ বাসোপযোগী স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ বাসগৃহ পেত না, রেলওয়ে ও বেতারের প্রচলন হতো না, মহামারির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার উপায় অনাবিষ্কৃত থাকত, স্বল্পমূল্যে গ্রন্থাদি পাওয়া দুর্ঘট হতো এবং
888sport live chat-সংস্কৃতির উপভোগ সর্বজনসুলভ হতো না। … একমাত্র স্বাধীন ও মুক্ত মানবই নব নব আবিষ্কার ও চিৎপ্রকর্ষ বিধায়ক সৃষ্টিকার্যে সক্ষম এবং এইসব আবিষ্কার ও সৃষ্টিই আমাদের আধুনিক মানবসমাজের অস্তিত্বকে সার্থক করে তুলেছে’ (আইনস্টাইন, ২০১৩ : ২১)। সেরকম একইভাবে বহুর মধ্যে একের সন্ধান – এইটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের মূল অন্বিষ্ট। মুজতবা আলীরও মনে হয়েছিল, ‘এইটেই ছিল রবীন্দ্রনাথের মূল সুর। চিরজীবন তিনি বহুর ভেতর একের সন্ধান করেছিলেন।’ মুজতবা আলী সাক্ষ্য দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের সেই সন্ধানের সাধনা তিনিও দেখেছেন (মুজতবা, ১৪০৬ : ১২)।
তাঁর বক্তব্যকে যাতে করে কেউ ভুল না-বোঝেন, সেই সতর্কতা থেকেই মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘একাডেমিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ দার্শনিক ছিলেন না … কিন্তু এ-কথা তিনি খুব ভালো করেই জানতেন ভারতীয় দর্শনের চরম আদর্শ আনন্দ। এবং সাংখ্য দর্শনের গোড়ার কথাই হচ্ছে, দুঃখের কারণ কি ভাবে, ঐকান্তিকরূপে সমূলে বিনষ্ট করা যায়। আমার সঙ্গে সকলে একমত না হলেও নিবেদন করি, যোগ যত না ব্রহ্মানন্দের পথনির্দেশ করেছেন, তার চেয়েও বেশী পথ নির্দেশ করেছেন আপনাতে স্থির হয়ে আপন “আনন্দময় কোষ” থেকে আনন্দ আহরণ করতে। বেদান্ত প্রণবমন্ত্রের অনুসরণে ত্রিভুবনে – অর্থাৎ ভূঃ ভুবঃ, স্বঃ – যা-কিছু আনন্দ আছে তা ব্রহ্মে লীন আছে জেনে এই ব্রহ্মে যোজিত হয়ে অনন্তকালব্যাপী অনন্তদেশব্যাপী পরিপূর্ণানন্দে লীন হতে আদেশ দেয়।’ এ-সবকিছুর জন্য যে-জিনিসটির প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে প্রজ্ঞা। শুধু আধুনিক দর্শনই নয়, আমরা যদি প্রাচীন দার্শনিকদের দিকেও তাকাই, দেখবো, তাঁরাও নানাভাবে প্রজ্ঞার গুরুত্বকে স্বীকার করেছিলেন। প্রাচীনকালের নবী বিজ্ঞ সলোমন তো প্রজ্ঞাকে রত্নখণ্ডের চেয়েও মূল্যবান জ্ঞান করতেন। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক ম্যারিত্যার মতে, ‘A philosopher is a man in search of wisdom. Wisdom does not indeed seem to be an exceedingly widespread commodity.’ (Maritain, 1961 : 3)। ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের প্রখ্যাত অধ্যাপক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের মতে, ‘দর্শনের প্রকৃতি সম্বন্ধে নানা প্রকার ধারণা আছে। কেহ ইহাকে 888sport live footballের প্রকারভেদ বলিয়া মনে করেন, কেহ 888sport apk না হউক, 888sport apkের একপ্রকার সমাপ্তি বা সমন্বয় বলিয়া কল্পনা করেন। কেহ বা ধর্ম্ম চর্যার অক্ষ বলিয়া গ্রহণ করেন।’ সেইসঙ্গে তিনি এটিও বলেছিলেন, ‘দর্শনচর্চ্চায় 888sport live footballের রসানুভূতি, 888sport apkের বস্তুজিজ্ঞাসা ও ধর্মের সাধনা, এ সকলেরই গৌণভাবে স্থান আছে, এটিই ইহার মুখ্য জ্ঞান নয়। 888sport apk ও দর্শন দুই-এরই মুখ্যভাব জিজ্ঞাসা। অজ্ঞাততত্ত্বের আবিষ্কারের প্রয়াস।’ দর্শনশাস্ত্রের এই বিজ্ঞজন ধারণা করতেন যে, ‘দর্শন শাস্ত্রের মুখ্যভাব তত্ত্বজিজ্ঞাসা। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হইতে দার্শনিক তত্ত্বের প্রভেদ কি এবং দার্শনিক জিজ্ঞাসার ফলে কোন বিশেষ জ্ঞান হয় কিনা, এই আপাততঃ বিচার্য্য বিষয়। কেহ কেহ দুই-ই এক পর্যায়ের তত্ত্ব বলিয়া মনে করেন। তাঁহাদের মতে দর্শন নানা888sport apkের একপ্রকার … সমন্বয় মাত্র। অপরে এই দুই তত্ত্বের একান্ত প্রভেদ স্বীকার করেন। কাব্যরস ও 888sport live football আদিতে যে রসের অনুভূতি হয় অথবা যে শ্রেয়র সাধনের নাম ধর্মচর্য্যা, দার্শনিক তত্ত্ব তাহারই সমপর্যায় বস্তু বলিয়া গ্রহণ করেন’ (কৃষ্ণচন্দ্র, ২০২৫ : ১২৪-১২৫)। দর্শনের কথা যতই বলুন না কেন, আমরা খেয়াল করি যে, মুজতবা আলী এটিও স্বীকার করেছেন যে, ‘বলে রাখা ভালো, রবীন্দ্রনাথ কোনো বিশেষ দার্শনিক তত্ত্ব বা বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ করবার জন্য 888sport app download apk লিখতেন না।’ তাঁর 888sport app download apk একান্তভাবেই ‘নিজের মহিমায় মহিমময়ী’ (মুজতবা, ১৪০৬ : ৩০-৩১)।
পাঁচ
আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সৈয়দ মুজতবা আলী শুধু দর্শনশাস্ত্রেই বিজ্ঞ ছিলেন না, সেইসঙ্গে 888sport live footballতত্ত্বেও ছিলেন পারদর্শী এবং একজন রসিক 888sport live footballবোদ্ধা। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সংগত কারণেই বলেছিলেন, ‘ডাক্তার মুজতবা আলী দর্শনশাস্ত্রের বিশেষ পণ্ডিত, আর তা ছাড়া তিনি ইংরেজি, ফরাসী আর জারমান এই কটা ইউরোপীয় ভাষারও পণ্ডিত। ফারসীর কাজ চালানো জ্ঞান তাঁর ছিল … তিনি প্রাচীন 888sport live footballিক আরবী আর আধুনিক আরবী এই দুইয়ের সঙ্গেও পরিচিত। … নবী মোহম্মদের বংশের মুসলমান ধর্মগুরু সৈয়দ ঘরের ছেলে তিনি; কিন্তু কৈশোর ও প্রথম যৌবনে শান্তিনিকেতনের আবহাওয়ায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের চরণতলে তাঁর মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়েছিল। প্রসাদগুণ বিশিষ্ট, সত্যকার হাস্য-রসোজ্জ্বল, লঘুশৈলীর অথচ ভাবগম্ভীর চলতি বাংলা ভাষায় তিনি যে অসাধারণ দখল তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, সেটি তাঁর মনের স্বাভাবিক শক্তির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ও প্রসাদ উভয়ের গঙ্গাযমুনা-মিলনের ফল।’ শুধুই এইটুকুই নয়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আরো বলেছিলেন যে, ‘বাংলা ভাষার সত্যকার প্রেমী লেখকের ভাষার প্রয়োগ দেখে কেউ সাধুবাদ না করে পারবেন না। বাংলা চলতি ভাষার শক্তি আর সৌন্দর্য তার বাচনক্ষমতা আর ভাবপ্রাচুর্য, আবার তার অজস্রতা আর বৈচিত্র্য – এককথায়, চলতি বাংলা যে কত জোরদার ভাষা, তা ইনি নিজের বিশিষ্ট ভঙ্গীতে বা ঢঙে নোতুন করে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এই রকম ভাষা পৃথিবীর যে-কোনও শ্রেষ্ঠ ভাষার সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারে, তাতে আর সন্দেহ নেই। অন্তর্নিহিত শক্তিকে টেনে বার করাতেই মুন্শিয়ানার অধিকারী। সহজাত কবচের মত সুন্দর শক্তিশালী ভাষার বর্ম তার লেখার ভাবদেহকে ঘাতসহ করে রেখেছে’ (সুনীতিকুমার, ২০০১ : ১০-১১)।
মাতৃভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিকে সৈয়দ মুজতবা আলী যেভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বাংলার মুসলিম মনীষীদের খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিত্বই সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান থেকে তিনি এইটি অন্তত বুঝতেন যে, মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য মাধ্যমিকে শিক্ষা দিলে একটি দেশের কতদূর পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। সেইসঙ্গে তিনি এ-ও বুঝেছিলেন যে, মাতৃভাষা ভিন্ন যে-শিক্ষা, ‘সে-শিক্ষা ছাত্রদের বুদ্ধিবৃত্তিকে অবশ করে তোলে, কল্পনাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয় এবং সর্বপ্রকার সৃজনীশক্তির কণ্ঠরোধ করে শিক্ষার আঁতুড়ঘরেই গোরস্তান বানিয়ে দেয়’ (মুজতবা, ২০১৫ : ১৩৭)। শুধু এইটুকু বলেই মুজতবা আলী ক্ষান্ত হননি, সেইসঙ্গে এটিও জানিয়েছিলেন, ‘মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য মাধ্যমিকে শিক্ষাদানের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আছে এবং তার ফল কী সেকথাও ঐতিহাসিকদের অবিদিত নয়।’ উদাহরণ দিতে গিয়ে মুজতবা আলী জানিয়েছিলেন, ‘ক্যাথলিক জগতের কেন্দ্র অর্থাৎ পোপের সঙ্গে যোগ রাখার প্রলোভনে (আজ পূর্ব পাকিস্তান করাচির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য যেরকম প্রলুব্ধ) একদা ইয়োরোপের সর্বত্র লাতিনের মাধ্যমিকে শিক্ষাদান পদ্ধতি জনসাধারণের মাতৃভাষার ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। এবং সে পাথর সরাবার জন্য লুথারের মতো সংস্কারক ও প্রোটেস্টান্ট ধর্মের মতো নবীন সংস্কারপদ্ধতির প্রয়োজন হয়েছিল।’ এরই সূত্র ধরে তিনি বলেছেন, ‘‘পরবর্তী যুগে দেখতে পাই ফরাসি লাতিনের জায়গা দখল করেছে এবং তার চাপে দিশেহারা হয়ে ফ্রেডরিক দি গ্রেটের মতো জর্মন সম্রাট মাতৃভাষা জর্মনকে অবহেলা করে ফরাসিতে 888sport app download apk লিখেছেন এবং সে 888sport app download apk মেরামত করবার জন্য ফরাসি গুণী ভলতেয়ারকে পৎসদামে নিমন্ত্রণ করেছেন। ঠিক সেইরকম রাশিয়ারও অনেক বছর লেগেছিল ফরাসির নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে। আজ উর্দুওয়ালা বাংলাকে যেরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন ঠিক সেইরকম জর্মন ও রুশ আপন আপন মাতৃভাষাকে অবহেলা করে বহু বছর ‘যশের মন্দিরে’ প্রবেশ লাভ করতে পারেননি’’ (মুজতবা, ২০১৫ : ১৩৭)। তাঁর এই 888sport liveের উপসংহার টানতে গিয়ে মুজতবা আলী বলেছেন, মানুষকে ‘মহান আদর্শের দিকে উদ্দীপ্ত করতে পারে সতেজ সবল 888sport live football। সে-জাতীয় 888sport live football মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষাতে কেউ কখনো নির্মাণ করতে পারেনি।’ মুজতবা আলী আবারো জোর দিয়ে বলেন, ‘জনগণের মাতৃভাষা উপেক্ষা করে গণরাষ্ট্র কখনোই নির্মিত হতে পারে না।’ 888sport liveের পরিশেষে এসে মুজতবা আলী জানিয়েছিলেন, ‘শিক্ষাগ্রহণ করি আর না-ই করি, কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার ভয় অহরহ বুকে পুষে সেই দৃষ্টিবিন্দু থেকে সর্বসমস্যার সমাধান অনুসন্ধান করা মারাত্মক ভুল।’ কেননা, তাঁর মতে, ‘বাড়িতে আগুন লাগার ভয়ে অষ্টপ্রহর চালে জল ঢালা বুদ্ধিমানের কর্ম নয়।’ ঠিক তেমনই – মুজতবা আলী মনে করতেন – ‘আজ যদি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় মাতৃভাষা বর্জন করি তবে কাল প্রাণ যাওয়ার ভয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হব’ (মুজতবা, ২০১৫ : ১৫৮)। অবাক এবং সেইসঙ্গে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি যে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সৈয়দ মুজতবা আলীর আশঙ্কাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এখানে বলা জরুরি যে, শুধু সৈয়দ মুজতবা আলী একা নন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও মাতৃভাষার স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘ছাত্রগণের অনেকের বিশ্বাস, অন্ততঃ কার্য্যতঃ পরিচয় পাই, যেন বাঙ্গালা ভাষা মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে সঙ্গে অনায়াসে বাঙ্গালীর আয়ত্ত হয়, যেন তাহার জন্য কোন সাধনার, কোন পরিশ্রমের প্রয়োজন নাই।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন যে, ‘কেবল গলার স্বর থাকিলেই কি কেহ সুগায়ক হইতে পারে? না, একটা যন্ত্র হাতের কাছে থাকিলেই যে সে সুবাদক হইতে পারে? যেমন সুগায়ক সুবাদক হইতে গেলে বহু পরিশ্রম করিতে হয়, তেমনি সুলেখক হইতে গেলে এই ছাত্রজীবন হইতেই রীতিমত রচনা অভ্যাস করিতে হইবে। অবান্তররূপে বলিতে গেলে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে পর্য্যন্ত না বিদ্যালয়সমূহে ইংরাজি 888sport live footballের ন্যায় বাঙ্গালা 888sport live footballের রীতিমত অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা হইবে সে পর্য্যন্ত বাঙ্গালা ভাষার উন্নতি হইবে না’ (শহীদুল্লাহ্ : ২০২৪ :২১)। অন্যদিকে আবার মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস করতেন যে, ‘বাঙলা দেশবাসী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙলা – সে বিষয়ে কাহারো সহিত কাহারো মতবিরোধ নাই। আমরা বাঙলায় কথাবার্তা কহি, বাঙলায় স্বপ্ন দেখি, বাঙলায় চিন্তা করি; আমাদের প্রাণ বাঙালীর প্রাণ, হাসিকান্না বাঙালীর হাসিকান্না, এমনকি আমাদের রক্তমাংস বাঙালীর রক্তমাংস। অতএব, অপ্রতিরোধনীয়রূপে আমাদের মাতৃভাষা – যে দেশের বায়ু আমাদের শ্বাস, যে দেশের মাটীতে আমাদের বাস, যে দেশের ফলজলে আমরা পালিত, যে দেশের নদ-নদীর স্নেহধারায় আমরা পরিপুষ্ট, সেই দেশের ভাষা – বাঙলা।’ এরই সূত্র ধরে ওয়াজেদ আলী দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন যে, ‘এমন কথা কেহ বলিতে পারেন না যে, বাঙলা ভাষা হিন্দুর নিজস্ব ভাষা, উহা কখনো মুসলমানের ভাষা হইতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, জগতে কোনো ভাষা কোনো কালে বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের নিজস্ব খাস সম্পত্তি হয় নাই এবং বোধ হয়, কোনো কালে হইবেও না’ (ওয়াজেদ, ১৯৯০ : ২৮২)।
শহীদুল্লাহ্-ওয়াজেদ আলী থেকে সৈয়দ মুজতবা আলী – এঁরা প্রত্যেকেই মাতৃভাষাকে শুধু মুখের ভাষা আর শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেই দেখেননি, তাকে 888sport live footballের একটি প্রকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করেছিলেন। শহীদুল্লাহ্র মতে, ‘জাতীয় উন্নতির জন্য, জগতের সম্মুখে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য, অন্য সভ্যজাতির সহানুভূতি আকর্ষণের জন্য আমাদের 888sport live footballকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর করিতে হইবে … নচেৎ আমাদের ভবিষ্যৎ মহত্ত্বের আশা মরু-মরীচিকা মাত্র’ (শহীদুল্লাহ্, ২০২৪ : ২০)। সেইসঙ্গে শহীদুল্লাহ্ এটিও বিশ্বাস করতেন যে, ‘888sport live football যদি সত্যিকার 888sport live football হয় সে মুক্তি দিবেই – দেহের মুক্তি, মনের মুক্তি, আত্মার মুক্তি। এই তিনটী নিয়েই মানুষ। একটী ছেড়ে অন্যের মুক্তিতে মুক্তি নেই। 888sport live footballের সকল উদ্দেশ্যই ঘুরে-ফিরে এসে দাঁড়ায় এখানে’ (শহীদুল্লাহ্, ২০২৪ : ২৩)। এখানে যাঁদের কথা আমরা উল্লেখ করেছি, তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যের মূল খুঁজে পাওয়া যাবে রবীন্দ্রনাথে, যিনি মনে করতেন, ‘আমাদের মানসিকতার মধ্যে যে-সব ঘৃণ্যতার মূল তার প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তুলতে কল্পনাশক্তির দরকার। ঘৃণাবৃত্তির প্রকাশটা 888sport live footballে জায়গা পাবে না, এ কথা বলব না কিন্তু সেটা যদি একান্তই একটা দৈহিক সস্তা জিনিস হয় তা হলে তাকে অবজ্ঞা করার অভ্যাসটাকে নষ্ট না করলেই ভালো হয়।’ রবীন্দ্রনাথ সেইসঙ্গে এ-ও জানিয়েছিলেন, ‘তুচ্ছ ও মহতের, ভালো ও মন্দের, কাঁকর ও পদ্মের ভেদ অসীমের মধ্যে নেই, অতএব 888sport live footballেই বা কেন থাকবে, এমন একটা প্রশ্ন পরম্পরায় কানে উঠল। এমন কথারও কি উত্তর দেওয়ার দরকার আছে। যাঁরা তুরীয় অবস্থায় উঠেছেন তাঁদের কাছে 888sport live footballও নেই, আর্টও নেই; তাঁদের কথা ছেড়েই দেওয়া যায়। কিন্তু, কিছুর সঙ্গে কিছুরই মূল্যভেদ যদি 888sport live footballেও না থাকে তা হলে পৃথিবীতে সকল লেখাই তো সমান দামের হয়ে ওঠে।’ সেই দিকটিতে খেয়াল করেই রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এইজন্যে অতি বড়ো তত্ত্বজ্ঞানী অধ্যাপকদেরও যখন ভোজে নিমন্ত্রণ করি তখন তাঁদের পাতে আমের অকুলোন হলে মাকাল দিতে পারি নে। তত্ত্বজ্ঞানের দোহাই পেড়ে মাকাল যদি দিতে পারতুম এবং দিয়ে যদি বাহবা পাওয়া যেত, তা হলে সস্তায় ব্রাহ্মণভোজন করানো যেত, কিন্তু পুণ্য খতিয়ে দেখবার বেলায় চিত্রগুপ্ত নিশ্চয় পাতঞ্জলদর্শনের মতে হিসাব করতেন না। পুণ্যলাভ করতে শক্তির দরকার। 888sport live footballেও একটা পুণ্যের খাতা খোলা আছে’ (রবীন্দ্রনাথ, রচনাবলী : ঊনবিংশ খণ্ড, ২০২০ : ৬৬-৬৭)।
ছয়
মুজতবা আলী যখন নিতান্তই কিশোর, ঠিক সে-সময়, ২৯শে কার্তিক ১৩২৬ সালে, তাঁকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আকাক্সক্ষা উচ্চ করিতে হইবে, এ কথাটার মোটামুটি পথ এই যে, স্বার্থই যেন মানুষের চরম লক্ষ্য না হয়। কল্যাণের জন্য আত্মকে উৎসর্গ করিতে হইবে। কিন্তু এই মূল কথাটাকে কাজে খাটাইবার পথ বহু বিচিত্র, কারণ সকল মানুষের স্বাভাবিক শক্তি এক রকমের নহে।’ আর তাই রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘সেই জন্যই আমাদের এই আত্মদানের পথ আমাদের শক্তি অনুসারে স্বতন্ত্র। তোমার পক্ষে কোন পথ সত্য তাহা বাহির হইতে বলিয়া দেওয়া সম্ভব নহে।’ এরপরই রবীন্দ্রনাথ মুজতবা আলীকে বলেছিলেন, ‘যদি আত্মোৎসর্গই তোমার যথার্থ লক্ষ্য হয় তবে অন্তরের ইচ্ছাবেগেই সত্য পথে বাহির হইবে। যদি তাহাতে স্বার্থপরতা, অহঙ্কার, যশোলিপ্সা প্রভৃতি মিশ্র থাকে তবেই ভুল হইয়া যায়’ (মুজতবা, ২০২১ : ৭৭)। এখানে লেখাই বাহুল্য যে, মুজতবা আলী আমৃত্যু ‘স্বার্থপরতা, অহঙ্কার, যশোলিপ্সা’র কারণে রবীন্দ্রনাথকথিত সেই ‘সত্য পথ্য’ থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। এসব দিকে লক্ষ রেখেই বিশিষ্ট মুজতবা-গবেষক অধ্যাপক নূরুর রহমান খান মন্তব্য করেন, ‘স্বদেশপ্রীতিবশতঃই এদেশের জনসাধারণের প্রতি এবং দৈশিক ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও সনাতন মূল্যবোধের প্রতি মুজতবা আলীর ছিলো প্রগাঢ় আস্থা। এ-মূল্যবোধের অবক্ষয়ে তিনি বিচলিত বোধ করেছেন। ভারতীয় সভ্যতা-বৈদগ্ধ্য-ঐতিহ্য অনেকটাই ছিলো গ্রাম-কেন্দ্রিক। টোল-চতুষ্পাঠী-মক্তব ছিলো এর লালন কেন্দ্র। প্রধানত সংস্কৃত এবং অনেকটা আরবী-ফার্সী ভাষা এই বৈদগ্ধ্যের মূলে রসদ জুগিয়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অপ্রতিরোধ্য হাওয়ায় এই বৈদগ্ধ্যের সম্পূর্ণ বিনষ্টির আশঙ্কায় আলী সাহেবের হতাশা নানাভাবে প্রকাশিত। ঐতিহ্যপ্রীতিবশতই সংস্কৃত, আরবী-ফার্সী ভাষার প্রতি তাঁর ছিলো বিশেষ দুর্বলতা’ (নূরুর রহমান, ২০১৪ : ২৫১)
সাত
রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘আত্মশক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, সেইটি সৈয়দ মুজতবা আলীর হৃদয় ও মননশীলতার মধ্যে ঐশ্বর্যের মতো বিরাজমান ছিল। পরব্রহ্মের পদপ্রান্তের মতো তিনি তাঁর নিজস্ব চেতনার গভীরতম প্রদেশে আনন্দে ও বেদনায় জড়িয়ে রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের রচনাকর্মের শাশ্বত ঔজ্জ্বল্যকে, যা কি না জীবনের নানা সময়ে তাঁকে আলোর মতো পথ চিনিয়েছে এবং পথ দেখিয়েছে। মুজতবা আলী সে-কারণেই অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ ‘আমাদের মতো পাপীতাপীদের যে ভাঙা নৌকা, সেটা ছেড়ে চলে যেতে চাননি। সুখের মলয় বাতাসে ঝঞ্ঝাবাতের ক্রূর আঘাতে নিমজ্জমান তরীতে বসে তিনি আমাদের শুনিয়েছেন, আমাদেরই হৃদয়ের গীতি – যে গীতির প্রকাশক্ষমতা আমাদের নেই।’ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর সেই রচনার শেষ বাক্যে মুজতবা আলী বলেছেন, ‘যুধিষ্ঠিরের মতো তিনিও স্বর্গারোহণ করতে চাননি’ (মুজতবা, ২০১৫ : ৭৫)। তাঁর এই যে আত্মজ্ঞান, সেই আত্মজ্ঞানের উপর ভর দিয়েই নিজের বিষয়ে এমন অকপটে বলতে পেরেছিলেন, ‘‘আমার লেখার সবচেয়ে বড়ো দোষ – বিস্তর parentheses, ব্রাকেট দিয়ে সংশ্লিষ্ট কথা বলা, ফুট নোট, লম্বা dash ইত্যাদি। সোজাসুজি হ্রস্ব হোক, দীর্ঘ হোক, ডাইনে বাঁয়ে না তাকিয়ে, মূল বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে আর পাঁচটা reference মনে পড়ছে সেগুলো অকাতরে বিসর্জন দিয়ে, মোদ্দা কথাটা বলে যাওয়া। Perfect logical thinking power না থাকলে এসব ‘বান্তর’ ‘অবান্তর’ সবকিছুই মূল বক্তব্যের সঙ্গে বিধাব রহ করা যায়। লম্বা ড্যাশ, ব্র্যাকেট, গৎ দ্বারা রচনা কণ্টকিত করে’’ (মুজতবা, ২০০১ : ২১৫)।
আট
এতসব ত্রুটির পরেও শেষ ‘জয়’ সৈয়দ মুজতবা আলীরই। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের ভাষায়, তিনি ছিলেন একজন ‘বিচিত্র সংলাপের সপ্রতিভ নায়ক। বক্তব্যের তাৎক্ষণিকতায়, শব্দ-নির্মাণের ব্যস্ততায়, নির্লিপ্ত
রহস্য-সংবেদনে, প্রতিবাদীকে পরাভূত করার কূটকৌশলে তাঁর সমকক্ষ আমি কাউকে দেখিনি। আমি তাঁর সঙ্গে কখনও বিতর্কে নামিনি, জানতাম সত্য আমার পক্ষে থাকলেও জিতবো না। তিনিই জিতবেন – জয় তাঁর ব্যসন এবং আনন্দ’ (আলী আহসান, ২০০১ : ১১৫)। আমাদের লেখাটি শুরু করেছিলাম জুল রেনারের দিনলিপির প্রসঙ্গ দিয়ে, লেখাটির ইতিও টানছি তাঁরই দিনলিপির প্রসঙ্গ দিয়েই। তাঁর সেই বিখ্যাত দিনলিপিতে রেনার বলেছিলেন, ‘প্রকৃত 888sport live chatী লেখেন, যেমনই হোক না কেন, হাজারো বিষয়ে, যা তাঁর মনে উদিত হয় অচেতনভাবে। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তাঁর এই ছোট-ছোট লাফ কিন্তু আয়াসলব্ধ নয়। এদের সব কিছুরই রয়েছে এক স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক লাবণ্য। প্ররোচনার প্রয়োজন পড়ে না – অপেক্ষমাণ থাকতে হয়’ (রেনার, ২০২২ : ১০)। কথাগুলো যখন আমরা পাঠ করি, মনে হয় যেন, সৈয়দ মুজতবা আলী সম্পর্কেই ওই ফরাসি লেখক তাঁর দিনলিপির এই মূল্যবান পৃষ্ঠাটি বরাদ্দ রেখেছিলেন।
সহায়কপঞ্জি
১. অন্নদাশঙ্কর রায়, ২০১৪। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্র (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৯), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।
২. আলবার্ট আইনস্টাইন, ২০১৩। জীবন-জিজ্ঞাসা ( প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৩), সংকলন ও 888sport app download apk latest version : শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সেরিবান, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।
৩. কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ২০২৫। ধর্ম, দর্শন ও সমাজ (সম্পাদনা : নির্মাল্য নারায়ণ চক্রবর্তী), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
৪. জুল রেনার, ২০২২। ‘কয়েক টুকরো ছেঁড়া মেঘ’ [নির্বাচিত দিনলিপি], (তরজমা : শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়), বইপত্তর, কলকাতা।
৫. নূরুর রহমান খান, ২০১৪। সৈয়দ মুজতবা আলী জীবনকথা (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯০), আগামী প্রকাশনী, 888sport app।
৬. প্রেমেন্দ্র মিত্র, ১৯৯৬। শিরোনাম শিবরাম, সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক, কোরক, কলকাতা।
৭. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ২০২৪। শহীদুল্লাহ্ রচনাবলী [প্রথম খণ্ড], (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৪), সম্পাদনা : আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, 888sport app।
৮. মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ১৯৯০। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী, সম্পাদনা : আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমি, 888sport app।
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৯৫। চিঠিপত্র : ষোড়শ খণ্ড, সম্পাদনা : সুতপা ভট্টাচার্য, বিশ^ভারতী, কলকাতা।
১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০২০। রবীন্দ্র-রচনাবলী : ঊনবিংশ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।
১১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০২১। রবীন্দ্রনাথের অগ্রন্থিত পত্রাবলি, মুহম্মদ মতিউল্লাহ্-সম্পাদিত, তবুও প্রয়াস প্রকাশনী, কলকাতা।
১২.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ২০০১। মজলিসী মুজতবা, সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক, কোরক, কলকাতা।
১৩. সৈয়দ আলী আহসান, ২০০১। মজলিসী মুজতবা, সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক, কোরক, কলকাতা।
১৪. সৈয়দ মুজতবা আলী, ১৪০৬। গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন (প্রথম প্রকাশ : ১৩৮৮), মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।
১৫. সৈয়দ মুজতবা আলী, ২০০১। মজলিসী মুজতবা, সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক, কোরক, কলকাতা।
১৬. সৈয়দ মুজতবা আলী, ২০১৫। শ্রেষ্ঠ 888sport live (প্রথম সংস্করণ : ২০০৬), সম্পাদনা : আবদুশ শাকুর, বিশ্ব888sport live football কেন্দ্র, 888sport app।
১৭. Albert Schweitzer, 1961. Civilization and Ethics (First English edition : 1923), Translated and revised by Mrs. Charles E. B. Russell, Unwin Books, London.
১৮. Jacques Maritain, 1961, On the use of philosophy, Princeton University Press, New Jersey.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.