সতেরো 

হারিকেনের চিমনিতে চুলের মতো সরু একটা ফাটল। খেয়াল করে না তাকালে চোখে পড়ে না। চিমনির গলার কাছে কালি জমেছে। সেই কালি সাফ করতে গিয়ে ত্যানার ঘষা মাত্র লাগাতে যাবে দোলন, তখনই ফাটলের দাগটা চোখে পড়ল। সাবধানে না করলে এই ফাটল বড় হবে। চিমনি দু’ফালা হয়ে যাবে। যে কোনো ফাটলের এই নিয়ম। চাপ পড়লে বড় হয়।

দোলন সাবধানী হাতে হারিকেনের চিমনি সাফ করতে করতে কমলরানীর দিকে তাকাল। মনের কূটকচালির লেশমাত্র নেই কণ্ঠস্বরে, বরং সহানুভূতির ছোঁয়া আছে। কমলরানীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সব কথাই তো আমাকে তুমি বললে। শুনে মনে হলো তোমার হিসাবে গণ্ডগোল আছে। মামাকে তুমি বুঝতে পারোনি।’

কমলরানী বসে আছে দোলনের খাটে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে পিছদুয়ার দিয়ে কমলরানীকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকেছিল দোলন। ঘরের অন্ধকার গাঢ় হতে চলেছে। কথা শুরুর আগে তাই হারিকেন জ্বালতে গিয়েছিল সে। দেশলাইটা রাখা ছিল টেবিলে রাখা হারিকেনটির পাশে। ন্যাকড়ায় চিমনি ঘষার ফাঁকে কথা শুরু করেই দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালল। কাঁটা ঘুরিয়ে হারিকেনের সলতে খানিকটা উঁচোয় তুলে কাঠি জ্বালল। কেরোসিন ভরাই ছিল। দপ্ করে জ্বলে উঠল হারিকেন। হারিকেনের মাথার ওপরকার আংটা টেনে চিমনি বসিয়ে দিলো নিপুণ হাতে। ঘরের ভেতরকার অন্ধকার কেটে গেল। 

কেঁদে কেঁদে কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে গেছে কমলরানীর। ছোট্ট খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল সে। বলল, ‘তোমার কথা আমি বুঝতে পারি নাই দোলন। তোমার মামার ব্যাপারে আমার কিয়ের গণ্ডগোল?’

হারিকেন টেবিলের ওপর রেখে কমলরানীর মুখোমুখি দাঁড়াল দোলন। ‘মামার বয়সের হিসাব আছে তোমার কাছে? আমার তো মনে হয় না। বয়সে সে তোমার বাবার সমানও হতে পারে, বড়ও হতে পারে। ছোট হবে না। এই বয়সের একজন মানুষ তোমার স্বামী। তার কাছে তুমি কি আশা করো। প্রথম কয়েকদিন তোমার মতে সে ঠিকঠাক ছিল, কিছুদিন ধরে ঠিক নাই। চারদিন-পাঁচদিন পর একবার সে তোমাকে কাছে টানে। এটাই স্বাভাবিক। সে তো আর কুঁড়ি-পঁচিশ বছরের জোয়ানমর্দ মানুষ না যে, প্রতিদিনই তোমাকে কাছে টানবে। এখন চার-পাঁচদিনে একবার টানে, এরপর সপ্তাহ পনেরো দিনেও একবার টানবে না। তারপর মাসেও একবার না। একসময় দেখবে তুমি আগুনে পুড়ছো আর মামা আছে জল হয়ে। এটাই বয়সের নিয়ম।’

একটানা কথাগুলো বলে মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলল দোলন। ‘এসব কথার কোনোটাই ঠিক নয়। আমার দেবু ঠাকুর অতিমানব। তাঁর শরীর অল্পবয়সী যুবকদের চেয়েও তেজি। প্রতিরাতেই 888sport promo codeদেহের উত্তাপ তাঁর প্রয়োজন। তাঁর উত্তাপ মেটাতে লাগে দোলনের মতো 888sport promo code। কমলরানীকে দিয়ে তা হবে না। এই 888sport promo code নিশ্চয় ঠাকুরের শরীরের তালে তাল মেলাতে পারছে না। তার কামশক্তি ক্ষীণ।’

কমলরানী বলল, ‘আমারও যে তারে রোজ রাইতেই লাগবো আমি তেমন আদেখলা মাইয়া না। তয় মাত্র বিয়া হইছে। পয়লা পয়লা চাহিদা কিছুটা থাকবোই। দিনে দিনে আমারও সেই চাহিদা কইমা আইবো।’

‘আমি তা বুঝি। ওসব তুমি ঠিকই বলেছো। এখন তোমাকে আমি অন্য একটা প্রশ্ন করি। এই বয়সী একজন মানুষের কাছে তোমার বাবা-মা কেমন করে তোমার বিয়ে দিলেন? তোমার বয়সী মেয়ের বাপের বয়সী মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয়? মামার কাছ থেকে জীবনে তুমি কি পাবে, তা তোমার বাপ-মা কেন ভাবলেন না?’

কমলরানী আবার ফুসফুস করে কাঁদতে লাগল। জড়ানো স্বরে বলল, ‘বিয়ার বয়স পার হইয়া যায়, পাত্র পাওয়া যায় না। দেশ-গেরামে সিয়ানা মাইয়ার কত পদের বিপদ। পার্টিশানের আগে হিন্দু মাইয়াগো এত বিপদ আছিল না। যারা আমগো ভয়ে কাঁপতো, চোখ তুইলা বাড়ির বউ-ঝিদের দিকে তাকাইতো না, এখন তাগো ভয়ে আমরা কাঁপি। কোনসুম টাইনা লইয়া যায় পানের বরজের ভিতরে। দিন-দোফরে দলবাইন্ধা ধর্ষণ করে। সেই ভয়ে ঘর থিকা বাইর হইতাম না। মা-বাপে কী করবো? ঠাকুরের মতো পাত্র পাইছে, বয়েস বেশি তাতে কী, মাইয়া পার করতে পারলেই বাঁচে।’

দোলন বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ‘তা অবশ্য ঠিক। এই যখন অবস্থা, তখন আর কান্নাকাটি করে লাভ কী? অবস্থা মেনে নিয়েই চলতে হবে। মন খারাপ না করে, কান্নাকাটি না করে যেভাবে চলছো, সেইভাবেই চলো। মামাকে বুঝতে দিও না কিছু।’

কমলরানী তখন আকুল হয়ে কাঁদছে। ‘কত স্বপ্ন আছিল আমার। বিয়ার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্ছা আসবো পেটে। বাচ্ছা হইয়া যাওয়ার পর তারে লইয়া ব্যস্ত থাকুম। স্বামীর আদর-সোহাগ তখন না পাইলেই বা কী? আমার মনে হয় সেই কপাল হইবো না। এই বয়সী মানুষ কি বাপ হইতে পারবো?’

দোলনের মনে তখন বিপুল আনন্দ। মনের বনে উতল হাওয়ার তোলপাড়। ‘ঠাকুরকে তুমি চেনো না, বসুবাড়ির মেয়ে। চাইলেই সে তোমাকে মাতৃত্বের স্বাদ দিতে পারে। তা সে দেবে না। তুমি তাকে চেনোনি, আমি চিনেছি। এই জগতের ভেতরে থেকেও তাঁর বিচরণ অন্য জগতে। এতবড় বাড়িতে একা পড়ে থাকে। কেউ চোখ তুলেও তাকায় না তাঁর দিকে। ভয়ে। আতঙ্কে। আমিও তো এক যুবতীকন্যা। দেখতে আকর্ষণীয়া। এই গ্রামেও জোয়ানমর্দ মুসলমান পুরুষের অভাব নেই। কই তারা তো আমার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাবার সাহস পায় না। কেন? দেবু ঠাকুরের ক্ষমতাবলে। তাঁর ক্ষমতার কোনো তল পাবে না তুমি। তবে তোমার কথায় আমি আজ বুঝেছি, আমার কারণে বিয়ে সে তোমাকে করেছে ঠিকই, কিন্তু তোমাকে তাঁর পছন্দ হয়নি। তাঁর পছন্দ আমি। আমি তাঁকে যা দিতে পারি, তুমি তা পারো না। তাঁর শরীর নিভে আসছে এই কারণে। দিনে দিনে এমন হবে, ঠাকুরের স্ত্রী হয়ে তুমি ঠিকই থাকবে, সেসব বাইরে বাইরে। ভেতরে তোমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সে ফিরবে আমার কাছে। আজ আমার চোখের সামনে ঠাকুরকে নিয়ে ঘরে খিল তোলো তুমি, সেই খিল আমি আবার তুলবো। হয়তো তোমার চোখের সামনেই তুলবো।’

মনের এইসব কথা কমলরানীকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলো না দোলন। মানুষটির অসহায় কান্না দেখে এমন ভঙ্গিতে তার কাছে এগিয়ে গেল, যেন সে খুবই সহানুভূতিশীল। যেন কমলরানীর কষ্টে তারও বুক ফেটে যাচ্ছে। 

এগিয়ে গিয়ে কমলরানীর দু’কাঁধে দু’হাত রাখল দোলন। অন্তরে বিষ, তবু মুখে মধু ঢেলে বলল, ‘কান্নাকাটি করো না। নিজেকে সামলে চলো। আমি তো আর মামার সঙ্গে এইসব বিষয়ে কথা বলতে পারি না। তারপরও 
 আকারে-ইঙ্গিতে তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করবো, সে যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। তোমাকে যেন ভালো রাখার চেষ্টা করে।’

কমলরানী আর কথা বলতে পারল না। উদ্গত কান্নায় ভাসতে ভাসতে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল দোলনকে। দোলনও তাকে চেপে ধরল এক হাতে, অন্য হাতে তার মাথায়-পিঠে হাত বুলাতে লাগল। হারিকেনের এক টুকরো আলো এসে পড়েছে তার মুখে। সেই মুখে ফুটেছে হায়েনার হাসির মতো নৃশংস এক হাসি। দোলনের চোখ তখন আর কোনো 888sport promo codeর চোখ নয়। সেই চোখ যেন ক্ষিপ্ত বাঘিনীর চোখ। এখনই যেন শিকার ধরে সেই শিকার ফালা ফালা করবে। চুমুকে চুমুকে পান করবে তার রক্ত।

দুপুর শেষ হয়ে আসার কালে এক দমকা হাওয়া ওঠে। বাড়ির 888sport app গাছের পাতায় যতটা না শব্দ ওঠে হাওয়ার, তারচেয়ে অনেক বেশি শব্দ হয় বাঁশঝাড়ের কাণ্ড আর পাতায়। শব্দটা মোহময়। শন শন, শন শন। বাঁশের দু’চারটা শুকনো পাতা খাড়া হয়ে এমন ভঙ্গিতে দুলে দুলে পড়তে থাকে যেন আকাশের দিকে বিঘত পরিমাণ হালকা কোনো ছুরি ছুড়ে দিয়েছিল কেউ। এখন সেই ছুরি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নেমে আসছে মাটিতে।

উঠোনে দাঁড়িয়ে অকারণেই বাড়ির পশ্চিম-দক্ষিণের পুকুরটার দিকে তাকিয়েছিল দোলন। পুকুর ছাড়িয়ে তার চোখ গিয়েছে ওপারের বাঁশঝাড়ের দিকে। দমকা হাওয়ায় বাঁশের পাতা ভাসতে ভাসতে ছুরির মতো নেমে যাচ্ছে মাটির দিকে, এই দৃশ্যটা দেখতে পেল। ঠাকুর এখনো বাড়ি ফেরেননি। সকালবেলায় বলে বেরিয়েছেন, আজ ফিরতে দেরি হবে। রোগী দেখতে যাবেন কামারগাঁও গ্রামে। দূরের গ্রাম। এজন্য সকাল সকাল রওনা দিয়েছিলেন। যেদিন 
 যে-গ্রামে যান, একসঙ্গে সেই গ্রামের অনেক বাড়ির রোগী দেখে আসেন। পুরনো রোগী, নতুন রোগী। দূরের গ্রামে গেলে দুপুরের খাওয়া সেরে আসেন কোনো রোগীর বাড়িতে। হিন্দুবাড়ি মুসলমানবাড়ি বলে কথা নেই, যে-বাড়িতে খাবারের আয়োজন সে-বাড়িতেই খান। ডাক্তার দেবকুমার ঠাকুর তাদের গ্রামে এসেছেন, মরণপথের যাত্রী কোনো রোগীবাড়িতে তাঁকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে, এই সংবাদ গ্রামে পৌঁছাবার পরেই ছোট-বড় অনেক রোগী উন্মুখ হয় ঠাকুরকে একবার দেখাবার জন্য। রোগের কথা বলবার জন্য। সেই ফাঁকে তাঁর খাবারের আয়োজন করে কোনো সচ্ছল রোগীবাড়ির লোক। ঠাকুর সানন্দে সেই বাড়ি থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে আসেন। 

ঠাকুরবাড়ি ফিরবেন না দেখে দোলন আর কমলরানী রান্নাঘরের মেঝেতে বসে একসঙ্গে দুপুরের খাওয়া সেরেছে। কমলরানীর মুখ থেকে আজো সরেনি বিষণ্নতার ছায়া। অন্যদিকে দোলনের মনভর্তি উচ্ছ্বাস আর গভীর আনন্দ। তবে মুখে সেসবের বিন্দুমাত্র ছায়া নেই। যেন কমলরানীর বেদনা বা বঞ্চনার কথা জেনে সেও হয়েছে সমান বিষণ্ন, এমন ভাব করে রেখেছে মুখের। 

খাওয়া শেষ করে কমলরানী চলে গেছে ঠাকুরের ঘরে, দোলন ঢুকেছিল তার ঘরে। এ-সময় নিয়মিতই ঘুমোয় দোলন। কমলরানীও তাই করে। দুই 888sport promo code ছাড়া বাড়িতে আর কোনো মানুষ নেই। আছে নির্জনতা, পাখি আর কীটপতঙ্গের ডাক। হাওয়ার তালে গাছের পাতাদের নাচানাচি।

আজ এই নির্জনতা যেন সহ্য করতে পারছিল না দোলন। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছে অনেকক্ষণ। ঘরের ভেতর দম যেন তার বন্ধ হয়ে আসছিল। বিছানা ছেড়ে উঠোনে এসেছিল। ঠাকুরের ঘরের ভেতর কোনো শব্দ নেই। কমলরানী নিশ্চয় গভীর ঘুমে। অথবা ঘুমের ভান করে পড়ে আছে বিছানায়। শেষ চৈত্রের রোদ ছিল উঠোন ভরা। 

গাই-গরুর শ্বাসের মতো উষ্ণ হাওয়া আছে। এই উষ্ণতা যেন স্পর্শ করে না দোলনকে। চোখের তারায় তার খেলা করে কূটদৃষ্টি। বোধহয় এই কারণেই বাঁশের পাতা সে ঝরে পড়তে দেখে আকাশের দিকে ছুড়ে দেওয়া ছুরির মতো মাটিতে নেমে আসতে।

ওদিককার রাস্তায় তখন রোদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় দুজন মানুষকে। ঠাকুর আর প্রিয়নাথ। একজনের মাথায় ছাতা, আরেকজনের হাতে ধরা ঠাকুরের ডাক্তারি ব্যাগ। চকের ওদিককার পায়েচলা পথ ধরে বাঁশঝাড় তলার দিকে হেঁটে আসছে তারা।

দোলন উৎফুল্ল। এই এক সুযোগ ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলার। প্রিয়নাথকে এড়িয়ে নিভৃতে ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধা হবে না।

পা চালিয়ে বাঁশঝাড় তলার দিকে এগিয়ে যায় দোলন।

বাঁশঝাড়ের ওদিককার পায়েচলা পথখানির মুখে এসে ঠাকুর আর প্রিয়নাথ দেখে দোলন দাঁড়িয়ে আছে বাঁশবনের চিরকিকাটা রৌদ্রছায়ার ভেতর। দেখে কিছু একটা অনুমান করলেন ঠাকুর। মাথার ওপর থেকে ছাতা নামিয়ে একহাতে ছাতা ধরে অন্যহাতে বুজাতে বুজাতে বললেন, ‘তুই বাড়িত যা প্রিয়নাথ। আমি আসতেছি।’ 

প্রিয়নাথের হাতে ছাতাটা ধরিয়ে দিলেন তিনি। প্রিয়নাথ বিনীতকণ্ঠে বলল, ‘আজ্ঞে কর্তা, যাইতাছি।’

যাওয়ার আগে এক পলক তাকাল দোলনের মুখের দিকে। সেই চোখে মতলবি দৃষ্টি। লোকটা মতলববাজ, ধাউর প্রকৃতির। কথাটা যেমন জানেন ঠাকুর, তেমন জানে দোলন। তবে ওই নিয়ে তারা কেউ তেমন মাথা ঘামায় না। ঠাকুরকে যমদূতের মতো ভয় পায় প্রিয়নাথ। তারপরও সময়-সুযোগ পেলে গ্রামের লোকজনের কাছে ঠাকুরের নামে কূটনামি করে। দোলনকে সে ভালো চোখে দেখে না। ঠাকুরের সঙ্গে দোলনকে পেঁচিয়ে ইতর কথাবার্তা খুব সূক্ষ্মভাবে প্রিয়নাথই গ্রামের কোনা-কানছিতে ছড়িয়েছে। এই ধরনের কূটনামিতে যা হয়, আসল ঘটনাটি হয় যদি একটি একহারা চারাগাছ, তবে তা হয়ে যায় বিশাল বৃক্ষ। তাতে গজায় পঞ্চাশ-একশটি ডালা আর গজায় হাজার লক্ষ পাতা। সেই পাতায় ঝড়ের হাওয়ার মতো ছড়াতে থাকে ইতর কথাবার্তার বিবরণ।

বাঁশবন ছড়িয়ে গাব, তেঁতুল, চালতা, নিম আর আম-জামের গাছগুলো আপন ভাইবোনের মতো জড়াজড়ি করে আছে। তলায় ধুলোমাটির চিরল পথ শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের মতো ধূসর। গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে সেই পথ হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেছে আবছা অন্ধকারে। 

প্রিয়নাথ সেই পথে উধাও হয়ে যাওয়ার পর ঠাকুর তাকালেন দোলনের দিকে। চেহারায় দূরপথ হেঁটে আসার ক্লান্তি। ছাতায় না-মানা চৈত্র দিনের দুপুর শেষ হয়ে আসা রোদের উষ্ণতায় মুখখানি বিবর্ণ। লালচে। ঘাড় গলার কাছের সাদা পাঞ্জাবিতে ঘামে ভেজার চিহ্ন। বগল আর বুকের কাছটাও তাই। ঘামে ভেজা পুরুষ-শরীরের মাদকতাময় গন্ধে কোনো কোনো 888sport promo code শরীরের রক্তস্রোত তীব্র হয়। দোলন তার শরীরের শিরায় শিরায় ঠাকুরের গা থেকে আসা ঘামগন্ধের মাদকতাময় উষ্ণতা টের পেল। ইচ্ছে হলো বাঁশঝাড়ের আবছা অন্ধকারে এখনই খুলে ফেলে শরীরের যাবতীয় বসন। মাটির বিছানায় শঙ্খলাগা জাত সাপের মতো ঠাকুরকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। মাটির বিছানা হয়ে উঠুক তাদের মিলনশয্যা। কমলরানী এই বাড়ির বউ হয়ে আসার পর আজই প্রথম শরীরে এই রকম অনুভূতি হলো দোলনের। শারীরিকভাবে ঠাকুরকে পাওয়ার জন্য ক্ষণকালের তরে যেন সে উন্মাদিনী হলো।

আজ কেন এতদিন পর এমন হলো দোলনের? 

কারণটা সে বুঝল। কমলরানীর প্রতি ঠাকুরের আকর্ষণ কমে গেছে শুনে নিভৃতে ঠাকুরকে পেয়ে এই অনুভূতি আজ তার হয়েছে। কমলরানীর কথায় সে বুঝে গেছে, তার দেহের আকর্ষণ ঠাকুরের কাছে আর নেই। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই কমলরানী তাঁর কাছে অকার্যকর 888sport promo codeতে পরিণত হয়েছে। নয়তো দোলন এই মানুষের যে দৈহিক চাহিদার কথা জানে, তাতে এমন হওয়ার কথা নয়। যে-মানুষ এই বয়সেও দোলনের মতো যুবতীকন্যার দেহের আগুন প্রতিরাতে কঠোরভাবে নিবৃত করেছে, নিজে ক্লান্ত হয়নি, দোলনকে অপরিসীম ক্লান্ত করেছে, সেই মানুষের এমন হবে কেন? তাঁর নিশ্চয় দোলনকেই চাই। কমলরানীতে তিনি তৃপ্ত নন। 

বাঁশঝাড়তলায় দাঁড়িয়ে বড় করে ক্লান্তির হাঁপ ছাড়লেন ঠাকুর। ‘কী হইছে রে? বাঁশতলায় আইসা খাড়াইয়া রইছস?’

রক্তে জ্বলা আগুন নিভাতে নিভাতে দোলন বলল, ‘তোমার সঙ্গে কথা আছে।’

‘কী এমন কথা যা বলতে দোফরের ঘুম না ঘুমাইয়া বাঁশতলায় আইসা খাড়াইয়া রইছস?’

‘বুঝতেই পারছ, জরুরি কথা। তোমার বউর সামনে বলা যাবে না।’

‘সেইটা বুজছি। আইচ্ছা ক? তয় ওই প্রিয়নাথটারে লইয়া চিন্তা করতাছি। ওইটা তো একটা জাউরা। কমলের কানে কী না কী তুইলা দেয়!’

‘প্রিয়নাথকে তুমি ভয় পাও?’

‘ভয় পাই না। তয় হারামজাদার ওপর ভারী রাগ লাগে। যা হোক, ও করতে পারবো না তেমন কিছুই। সংসারে একটা অশান্তি লাগাইবো। আইচ্ছা ক, কী কইতে চাস ক?’

 দোলন তার ডাগর চোখ দু’খানা তুলে ঠাকুরের মুখের দিকে তাকাল। ‘তুমি আমাকে সুন্দর করে কথা বলতে শিখিয়েছ আর সেই তুমি আজ আমার সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলছো?’

ঠাকুর হাসলেন। ‘রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, তুই আমার রোগী না। তুই আমার দোলন।’

‘আমার দোলন বলছো, আর তাকেই তুমি পর করে দিয়েছ। বিয়ে করে অন্য 888sport promo code এনেছ বাড়িতে। আমার চোখের সামনে তাকে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করো! তখন মনে থাকে না, দোলনের বুকটা তখন কেমন করে পোড়ে? কোন আগুন জ্বলে তার বুকে।’

দোলন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠাকুর বললেন, ‘সব জেনে-বুঝেও এসব কথা আবার কেন তুলছিস? তবে কমলের সঙ্গে আমি ভালো নেই রে।’

‘তা তোমার থাকবার কথাও না। তবে এত তাড়াতাড়ি, মাসখানেকের মধ্যেই বউর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, রাতের পর রাত তাকে কাছে টানবে না, এতটা আমি ভাবিনি।’

ঠাকুর একটু চমকালেন! ‘এসব তুই জানলি কী করে? কমল বলেছে?’

‘আমি তোমার সঙ্গে কখনো মিথ্যা বলিনি। হ্যাঁ, তোমার বউ আমাকে বলেছে। তবে তুমি তাকে এই নিয়ে কিছু বোলো না। অশান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই। তার সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করো। বিয়েই যখন করেছ, বউকে বঞ্চিত করবে কেন?’

‘কী করবো? আমার তাকে ভালো লাগে না। আমি তার সঙ্গে থেকে শান্তি পাই না। কামকলার কিছুই সে জানে না।’

‘তুমি তাকে তৈরি করে নাও।’

‘প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছি। সে ওই পদের মেয়েই না। স্বামীর সঙ্গে শুয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকাই নেই। ভাবখানা এমন, স্বামী যা করার করবে। তার করার নেই কিছুই। তোর সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক। আমি যে সুখ তোর কাছে পেয়েছি, তার কিছুই কমলের মধ্যে নেই। রাতের বিছানায় আমার শরীর শুধু তোকেই চায়।’

দোলন একটু চুপ করে রইল। একদিকে কমলরানীর কথা শুনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অনেকখানিই সে বুঝেছে, এখন ঠাকুরের কথায় বুঝল বাকিটা। শিরায় শিরায় আবার বইতে লাগল তার উষ্ণ স্রোত। তাপ-উত্তাপ ছড়িয়ে যেতে লাগল শরীরের আনাচে-কানাচে। ঠাকুরকে পাওয়ার জন্য অতিশয় ব্যাকুল হলো সে। তাদের মিলিত হওয়ার পথে বড় কাঁটাগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কমল। এই কণ্টকবৃক্ষ কেটে ফেলতে হবে গোড়া থেকে। পথ করতে হবে কণ্টকমুক্ত, মসৃণ।  

দোলন বলল, ‘তোমার বউকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। এক দু’মাস বাপের বাড়িতে রাখবে তাকে। আবার ফিরিয়ে এনে নিজের বাড়িতে রাখবে একমাস দু’মাস। আবার পাঠাবে মালখানগরে। এইভাবে দিন পার করবে। এই না করে তোমার-আমার অন্য কোনো উপায় নেই। সব দিক ঠিক রেখে এই হচ্ছে একমাত্র চলার পথ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বউকে তার বাপের বাড়িতে পাঠাও।’

ঠাকুর চিন্তিত চোখে দোলনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিকেল হয়ে আসছে। ঠাকুরবাড়ির গাছে গাছে চলছে পাতা আর পাখিদের আলোচনা। 

ঠাকুর একবার গাছপালার দিকে তাকালেন। সেদিক থেকে চোখ নামিয়ে তাকালেন দোলনের দিকে। ‘আমি চাইলে কমলকে এই বাড়িতে রেখেও রাতে তোর সঙ্গে থাকতে পারি।’

দোলন বিস্মিত। ‘কীভাবে? রাতে বউ ঘুমিয়ে পড়ার পর উঠে আমার ঘরে চলে আসবে? না না, সেটা ঠিক হবে না। ওরকম পরিস্থিতিতে মনে শান্তি থাকবে না। শুধু মনে হবে এই বুঝি তোমার বউ টের পেয়ে গেল! এই বুঝি এসে দাঁড়াল আমার ঘরের দরজায়। এই বুঝি টুকটুক করে শব্দ করল। ওরকম অবস্থায় কিছুতেই মনের মতো করে তোমাকে আমি সঙ্গ দিতে পারব না।’

ঠাকুর হাসলেন। ‘না, ব্যাপারটা মোটেই তেমন হবে না। কমল ভাবতেই পারবে না যে, আমি ঘরে নেই।’

‘তার মানে তাকে তুমি এমন করে ঘুম পারাবে যে সকালের আগে কিছুতেই সেই ঘুম তার ভাঙবে না। নাকি তাকে কোনো ওষুধ খাওয়াবে। ঘুমের ওষুধ।’

‘না, তাও না। তুই ভাবতেই পারবি না, এমন একটা কাজ আমি করব। ’

‘এসবের বাইরে আর কী হতে পারে বলো তো? আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।’

ঠাকুর তীক্ষè চোখে দোলনের চোখের দিকে তাকালেন। ‘তুই যে এতদিন ধরে আমার সঙ্গে আছিস, আমার সম্পর্কে কিছুই কি বুঝতে পারিসনি?’

‘পারব না কেন? সবই বুঝতে পেরেছি। তোমাকে সবাই যেমন দেখে আসলে তুমি তেমন না। তুমি একসঙ্গে যেন অনেকজন। তোমার ভেতর একসঙ্গে যেন বাস করে কয়েকজন দেবুঠাকুর। তারা একেকজন একেক রকম। কেউ প্রেমিক, কেউ স্বামী। কেউ ডাক্তার, কেউ রোগী। কেউ খুবই দয়ালু, আবার কেউ অতি নিষ্ঠুর। কেউ সাধু, কেউ সন্ন্যাসী। কেউ নৃশংস খুনি।’

ঠাকুর মাথা নাড়লেন। ‘ভালোই বুঝেছিস আমাকে। ঠিক তাই। আমি আসলে একসঙ্গে কয়েকজন। সেই কয়েকজনের একজনকে এখন আমার কাজে লাগাতে হবে।’

‘কীভাবে?’

‘রাতে সে-কথা তোকে আমি বলব। এখন চল, বাড়ি যাই।’

ঘরের ভেতর অমাবস্যা রাতের অন্ধকার। সিঁড়ির কাছে একটা হারিকেন নিভু নিভু করে জ্বালিয়ে রাখা হয়। সিঁড়ি ভেঙে নামতে হলে বা উঠতে হলে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা। তবে দরজা বন্ধ করলে ঘর ডুবে যায় অন্ধকারে। দরজার তলা আর এদিক-ওদিক দিয়ে, ঢেউটিনের বেড়ার ফুটিফাটা দিয়ে হারিকেনের আলোর আভাসটুকু ঘরে ঢোকে। গাঢ় অন্ধকারে সেই আভাসও অনেকখানি আলো জোগায়। 

আজ রাতে হারিকেনটা বোধহয় নিভে গেছে। তেল ফুরিয়ে গেছে কি না কে জানে। 

ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই আলোর আভাসটুকু খুঁজল কমলরানী। না, আলো নেই। অন্ধকার, শুধুই অন্ধকার। 

তখনই ঘুমভাঙার কারণ খুঁজল কমলরানী। রাত তেমন বেশি হয়নি। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল খুব বেশিক্ষণ হবে না। ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা হতে পারে। এখনই ঘুম ভাঙল কেন? কোথাও কি কোনো শব্দ পেয়েছে সে? বাড়িটা এমনিতেই নিঝুম নির্জন। রাতের বেলা সেই নিঝুমতা হাজারগুণ বেড়ে যায়। ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া, বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ বলতে গেলে থাকেই না। কখনো বাদুড়ের ডানার শব্দ পাওয়া যায়। দুয়েকটা রাতপাখির ডাক শোনা যায় হঠাৎই। শেয়ালের ডাক আর সেই ডাকে গৃহস্থবাড়ির কুকুরগুলোর উত্তেজিত ডাক শোনা যায় কখনো কখনো। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সেইসব ডাক কমলরানী আজ শুনেছে। ঠাকুর শুয়ে পড়েন প্রথমে। নিচের দরজা তার আগেই বন্ধ করা হয়। আজো তাই হয়েছে। দোতলার কামরায় উঠে কমলরানী দেখেছে ঠাকুর ঘুমিয়ে পড়েছেন। সিঁড়ির মুখে হারিকেন জ্বলছিল। খোলা দরজা দিয়ে হারিকেনের আলো এসে পড়েছিল বিছানায়। ঠাকুর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়েও পড়েছেন। তার পিঠের কাছটায় একটুখানি লেগে আছে হারিকেনের আলো। 

দরজা বন্ধ করে স্বামীর পাশে এসে শুয়ে পড়েছিল কমলরানী। একবার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর মাথায়-পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দেওয়া। তারপরই হয়েছিল অভিমান। না থাক। যে-মানুষ স্ত্রীর ব্যাপারে উদাসীন, তাঁকে সোহাগ করে কী লাভ? স্ত্রীর ব্যাপারে যাঁর আগ্রহই নেই, তাঁকে আগবাড়িয়ে নিজের কাছে টানার দরকার কী? মানুষটা তাকে আদেখলা ভাববে।

এইসব ভেবে গভীর অভিমান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল কমলরানী। ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে ফেলল কেন ঘুম ভেঙেছে তার। দরজা খোলার শব্দ পেয়েছে সে। দোতলার কামরার দরজা নাকি নিচের ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। তবে দরজা যে খোলা হয়েছে এমন শব্দ তার কানে গিয়েছে। এজন্য ঘুম ভেঙেছে।

কে দরজা খুলল?

এই ঘরে সে আর ঠাকুর। খুললে ঠাকুরই খুলেছেন। এত রাতে কেন তিনি দরজা খুলবেন? কোথায় গেলেন? প্রস্রাব করতে বেরোলেন? রাতে সাধারণত তিনি জলত্যাগে বেরোন না। শুয়ে পড়ার আগে ওসব সেরে আসেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে বিছানা ত্যাগের অভ্যাস। সেই সময় প্রাতঃকৃত্য সারেন। কমলরানী বউ হয়ে আসার পর থেকে এরকমই তো দেখছে।

আজ তাহলে কী হলো?

কমলরানী ভাবল সেও উঠবে। দেখবে সত্যি সত্যি ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়েছেন কি না! তখনই সব চিন্তা দূর হয়ে গেল তার। সে শুয়েছিল ঠাকুরের দিকে পিঠ দিয়ে। পালঙ্কটা অনেক বড়। দু’জনার মাঝখানে অনেকটা দূরত্ব ছিল। কমলরানী পাশ ফিরল আর তখনই টের পেল মানুষটা আগের মতোই তার জায়গায় শুয়ে আছেন। অতি মৃদু একটু শব্দ যেন করলেন। মুহূর্তে যাবতীয় চিন্তার অবসান হলো তার। না, তিনি ঘরেই আছেন। বেরোননি। দরজা খোলার শব্দ আসলে হয়ইনি। সে ভুল শুনেছে। ঘুমের ভেতর এমন হতেই পারে।

কমলরানীর তখন আবার ইচ্ছে করেছিল স্বামীর পাশে চেপে যায়। তাঁকে জড়িয়ে ধরে। আদর-সোহাগে জাগিয়ে তোলে তার কামভাব। সঙ্গে সঙ্গে মনোভাবটা বদলেও গেল তার। সেই অভিমান ফিরে এলো মনে। না, থাক। তিনি না চাইলে সে চাইবে কেন? আবার আগের কাতে ফিরল কমলরানী। মিনিট কয়েকের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। 

দরজায় টুকটুক করে শব্দ হয়েছিল দু’বার। দোলন জেগেই ছিল। জানতো ঠাকুর আজ তার ঘরে আসবে। শরীর উন্মুখ হয়ে ছিল প্রিয়তম মানুষটিকে পাওয়ার জন্য। পাশাপাশি একটা দুশ্চিন্তাও ছিল। সব ঠিকঠাকমতো সামাল দিয়ে ঠাকুর শেষ পর্যন্ত আসতে পারবেন কি না? দরজার শব্দে সেই ভাবনা কেটে গিয়েছিল। পাগলের মতো ছুটে গিয়ে দরজা খুলেছিল। জড়িয়ে ধরেছিল তার মানুষটিকে। 

একহাতে দোলনকে জড়িয়ে অন্যহাতে দরজা বন্ধ করেছিলেন ঠাকুর। 

তারপর আর কথা বলার অবকাশ ছিল না দু’জনার। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। মোলায়েম আলোয় ভরে আছে দোলনের বিছানা। সেই বিছানায় উন্মত্ত হয়েছিল দুটো শরীর। মাস দেড় মাসের ব্যবধানে পরস্পরকে তারা এভাবে পেল। কিন্তু দু’জনেরই মনে হলো যেন অনন্তকাল অপেক্ষার পর তারা মিলিত হলো। 

শরীরের তাপ-উত্তাপ মিটে যাওয়ার পর কথা তুলল দোলন। ‘কীভাবে কী করলে?’

ঠাকুর বড় করে শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘তুই-ই তো বলেছিলি আমি আসলে একজন নই। তোর কথাটা ঠিক। একজন আমি রয়ে গেছি কমলের কাছে, আরেকজন এসেছি তোর কাছে। ভয় পাবি না। তোর কাছে যে এসেছে সে-ই আসল।’

দোলন অভিমানে গাল ফুলাল। ‘এই কাজটা তা হলে এতদিন করোনি কেন?’

‘তোকে আমি মিথ্যে বলি না। আসলে আমি তোর কাছ থেকে সরতে চেয়েছিলাম। কমলকে পেয়ে তোকে ভুলতে চেয়েছিলাম।’

‘তা আমি বুঝেছিলাম। পারলে না কেন?’

‘শরীর। শরীর। কমল আমার শরীর বোঝে না। তুই বুঝিস।’

‘এখন কি তাহলে এভাবেই চলবে?’

‘দেখা যাক।’ 

‘বউ কি কোনোদিনও টের পাবে না যে, তুমি তার পাশে নেই? সেখানে শুয়ে থাকে তোমার ছায়া। অবাস্তব শরীর।’

‘পাওয়ার কথা না। কমল এখনো আমাকে চিনে ওঠেনি। বুঝে ওঠেনি। আমি আসলে কী তা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’

‘শুরুতে আমিও পারিনি। আমারও সময় লেগেছিল।’

‘সব জেনে-বুঝে তোর ভয় লাগেনি?’

‘না।’

‘ভয় তো লাগার কথা!’

‘প্রথম প্রথম একটু বোধহয় লেগেছিল। তোমাকে সব মিলিয়ে পাওয়ার পর ওসব আর মনেই থাকে না। তুমি তো আসলে একজনই। অন্যরা তো অবাস্তব। মায়া-জগতের বাসিন্দা। আচ্ছা, যাকে বউর কাছে রেখে এলে সে যদি তোমার বউকে ধরে। বউ তো ভাববে তুমিই …’

‘না, তা হবে না। ওদের ওই শক্তি নেই।’

এবার অভিমানী প্রেমিকার মতো ঠাকুরের বুকে কিল মারতে লাগল দোলন। ‘তুমি তাহলে আগেই এমন করোনি কেন? কেন আমাকে ঠকালে? আমাকে বঞ্চিত করলে?’

দোলনকে জড়িয়ে ধরে ঠাকুর বললেন, ‘এ-কথার জবাব আগেই দিয়েছি। তবে এমন আর হবে না। তোকে ছাড়া আমার চলবে না।’

ঠাকুরের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে দোলন বলল, ‘আমারও চলবে না তোমাকে ছাড়া।’

এইভাবে দেবকুমার ঠাকুরের বিশাল নির্জন বাড়ির ভেতরে কাটতে থাকবে তিনজন মানুষের জীবন। কমলরানীর আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে বদলে যাবে সেই জীবনের গতিপথ। কমলরানী গায়ে আগুন দেবে শীত শেষ হয়ে আসার কালে। যখন দেশগ্রামে বইতে থাকবে বসন্তদিনের হাওয়া। পুরনো পাতা ঝরে গিয়ে গাছগুলো সবুজ থেকে সবুজতর হবে নতুন পাতায়। ফুলে ফুলে রঙিন হবে ভুবন। গন্ধে মাতোয়ারা হবে মর্তভূমি। কোকিল পাখিগুলো শুধু ডেকেই যাবে। [চলবে]