ইমদাদুল হক মিলন
-

কাল
সতেরো হারিকেনের চিমনিতে চুলের মতো সরু একটা ফাটল। খেয়াল করে না তাকালে চোখে পড়ে না। চিমনির গলার কাছে কালি জমেছে। সেই কালি সাফ করতে গিয়ে ত্যানার ঘষা মাত্র লাগাতে যাবে দোলন, তখনই ফাটলের দাগটা চোখে পড়ল। সাবধানে না করলে এই ফাটল বড় হবে। চিমনি দু’ফালা হয়ে যাবে। যে কোনো ফাটলের এই নিয়ম। চাপ পড়লে বড় হয়। দোলন সাবধানী হাতে হারিকেনের চিমনি সাফ করতে করতে কমলরানীর দিকে তাকাল। মনের কূটকচালির লেশমাত্র নেই কণ্ঠস্বরে, বরং সহানুভূতির ছোঁয়া আছে। কমলরানীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সব কথাই তো আমাকে তুমি বললে। শুনে মনে হলো তোমার হিসাবে গণ্ডগোল আছে। মামাকে তুমি বুঝতে পারোনি।’ কমলরানী বসে আছে দোলনের খাটে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে পিছদুয়ার দিয়ে কমলরানীকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকেছিল দোলন। ঘরের অন্ধকার গাঢ় হতে চলেছে। কথা শুরুর আগে তাই হারিকেন জ্বালতে গিয়েছিল সে। দেশলাইটা রাখা ছিল টেবিলে রাখা হারিকেনটির পাশে। ন্যাকড়ায় চিমনি ঘষার ফাঁকে কথা শুরু করেই দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালল। কাঁটা ঘুরিয়ে হারিকেনের সলতে খানিকটা উঁচোয় তুলে কাঠি জ্বালল। কেরোসিন ভরাই ছিল। দপ্ করে জ্বলে উঠল হারিকেন। হারিকেনের মাথার ওপরকার আংটা টেনে চিমনি বসিয়ে দিলো নিপুণ হাতে। ঘরের ভেতরকার অন্ধকার কেটে গেল। কেঁদে কেঁদে কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে গেছে কমলরানীর। ছোট্ট খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল সে। বলল, ‘তোমার কথা আমি বুঝতে পারি নাই দোলন। তোমার মামার ব্যাপারে আমার কিয়ের গণ্ডগোল?’ হারিকেন টেবিলের ওপর রেখে কমলরানীর মুখোমুখি দাঁড়াল দোলন। ‘মামার বয়সের হিসাব আছে তোমার কাছে? আমার তো মনে হয় না। বয়সে সে তোমার বাবার সমানও হতে পারে, বড়ও হতে পারে। ছোট হবে না। এই বয়সের একজন মানুষ তোমার স্বামী। তার কাছে তুমি কি আশা করো। প্রথম কয়েকদিন তোমার মতে সে ঠিকঠাক ছিল, কিছুদিন ধরে ঠিক নাই। চারদিন-পাঁচদিন পর একবার সে তোমাকে কাছে টানে। এটাই স্বাভাবিক। সে তো আর কুঁড়ি-পঁচিশ বছরের জোয়ানমর্দ মানুষ না যে, প্রতিদিনই তোমাকে কাছে টানবে। এখন চার-পাঁচদিনে একবার টানে, এরপর সপ্তাহ পনেরো দিনেও একবার টানবে না। তারপর মাসেও একবার না। একসময় দেখবে তুমি আগুনে পুড়ছো আর মামা আছে জল হয়ে। এটাই বয়সের নিয়ম।’ একটানা কথাগুলো বলে মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলল দোলন। ‘এসব কথার কোনোটাই ঠিক নয়। আমার দেবু ঠাকুর অতিমানব। তাঁর শরীর অল্পবয়সী যুবকদের চেয়েও তেজি। প্রতিরাতেই 888sport promo codeদেহের উত্তাপ তাঁর প্রয়োজন। তাঁর উত্তাপ মেটাতে লাগে দোলনের মতো 888sport promo code। কমলরানীকে দিয়ে তা হবে না। এই 888sport promo code নিশ্চয় ঠাকুরের শরীরের তালে তাল মেলাতে পারছে না। তার কামশক্তি ক্ষীণ।’ কমলরানী বলল, ‘আমারও যে তারে রোজ রাইতেই লাগবো আমি তেমন আদেখলা মাইয়া না। তয় মাত্র বিয়া হইছে। পয়লা পয়লা চাহিদা কিছুটা থাকবোই। দিনে দিনে আমারও সেই চাহিদা কইমা আইবো।’ ‘আমি তা বুঝি। ওসব তুমি ঠিকই বলেছো। এখন তোমাকে আমি অন্য একটা প্রশ্ন করি। এই বয়সী একজন মানুষের কাছে তোমার বাবা-মা কেমন করে তোমার বিয়ে দিলেন? তোমার বয়সী মেয়ের বাপের বয়সী মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয়? মামার কাছ থেকে জীবনে তুমি কি পাবে, তা তোমার বাপ-মা কেন ভাবলেন না?’ কমলরানী আবার ফুসফুস করে কাঁদতে লাগল। জড়ানো স্বরে বলল, ‘বিয়ার বয়স পার হইয়া যায়, পাত্র পাওয়া যায় না। দেশ-গেরামে সিয়ানা মাইয়ার কত পদের বিপদ। পার্টিশানের আগে হিন্দু মাইয়াগো এত বিপদ আছিল না। যারা আমগো ভয়ে কাঁপতো, চোখ তুইলা বাড়ির বউ-ঝিদের দিকে তাকাইতো না, এখন তাগো ভয়ে আমরা কাঁপি। কোনসুম টাইনা লইয়া যায় পানের বরজের ভিতরে। দিন-দোফরে দলবাইন্ধা ধর্ষণ করে। সেই ভয়ে ঘর থিকা বাইর হইতাম না। মা-বাপে কী করবো? ঠাকুরের মতো পাত্র পাইছে, বয়েস বেশি তাতে কী, মাইয়া পার করতে পারলেই বাঁচে।’ দোলন বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ‘তা অবশ্য ঠিক। এই যখন অবস্থা, তখন আর কান্নাকাটি করে লাভ কী? অবস্থা মেনে নিয়েই চলতে হবে। মন খারাপ না করে, কান্নাকাটি না করে যেভাবে চলছো, সেইভাবেই চলো। মামাকে বুঝতে দিও না কিছু।’ কমলরানী তখন আকুল হয়ে কাঁদছে। ‘কত স্বপ্ন আছিল আমার। বিয়ার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্ছা আসবো পেটে। বাচ্ছা হইয়া যাওয়ার পর তারে লইয়া ব্যস্ত থাকুম। স্বামীর আদর-সোহাগ তখন না পাইলেই বা কী? আমার মনে হয় সেই কপাল হইবো না। এই বয়সী মানুষ কি বাপ হইতে পারবো?’ দোলনের মনে তখন বিপুল আনন্দ। মনের বনে উতল হাওয়ার তোলপাড়। ‘ঠাকুরকে তুমি চেনো না, বসুবাড়ির মেয়ে। চাইলেই সে তোমাকে মাতৃত্বের স্বাদ দিতে পারে। তা সে দেবে না। তুমি তাকে চেনোনি, আমি চিনেছি। এই জগতের ভেতরে থেকেও তাঁর বিচরণ অন্য জগতে। এতবড় বাড়িতে একা পড়ে থাকে। কেউ চোখ তুলেও তাকায় না তাঁর দিকে। ভয়ে। আতঙ্কে। আমিও তো এক যুবতীকন্যা। দেখতে আকর্ষণীয়া। এই গ্রামেও জোয়ানমর্দ মুসলমান পুরুষের অভাব নেই। কই তারা তো আমার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাবার সাহস পায় না। কেন? দেবু ঠাকুরের ক্ষমতাবলে। তাঁর ক্ষমতার কোনো তল পাবে না তুমি। তবে তোমার কথায় আমি আজ বুঝেছি, আমার কারণে বিয়ে সে তোমাকে করেছে ঠিকই, কিন্তু তোমাকে তাঁর পছন্দ হয়নি। তাঁর পছন্দ আমি। আমি তাঁকে যা দিতে পারি, তুমি তা পারো না। তাঁর শরীর নিভে আসছে এই কারণে। দিনে দিনে এমন হবে, ঠাকুরের স্ত্রী হয়ে তুমি ঠিকই থাকবে, সেসব বাইরে বাইরে। ভেতরে তোমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সে ফিরবে আমার কাছে। আজ আমার চোখের সামনে ঠাকুরকে নিয়ে ঘরে খিল তোলো তুমি, সেই খিল আমি আবার তুলবো। হয়তো তোমার চোখের সামনেই তুলবো।’ মনের এইসব কথা কমলরানীকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলো না দোলন। মানুষটির অসহায় কান্না দেখে এমন ভঙ্গিতে তার কাছে এগিয়ে গেল, যেন সে খুবই সহানুভূতিশীল। যেন কমলরানীর কষ্টে তারও বুক ফেটে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে কমলরানীর দু’কাঁধে দু’হাত রাখল দোলন। অন্তরে বিষ,…
-

কাল
ষোলো দুই 888sport promo code পুকুরের এ-ধারটায় জলের ওপর হাঁসের ছানার মতো ভাসছে একচাক হেলেঞ্চা। দুপুর হয়ে আসা রোদ পড়েছে হেলেঞ্চার গাঢ় সবুজ পাতায়। কোনো পাতা মুখ তুলে আছে আকাশের দিকে, কোনোটা উপুড় হয়ে জলের আয়নায় মুখ দেখে। গৃহস্থলোকের পছন্দের শাক। পচনধরা শোল, গজার বা শিং, টাকি মাছের সঙ্গে চচ্চড়ি করলে গরম ভাতের সঙ্গে খেতে ভারী স্বাদ।…
-

নিভে গেল বাতিঘরের আলো
খুব কাছের সবাই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ‘মনজুরভাই’ বলতেন। আমি ‘র’টা বাদ দিয়েছিলাম। বলতাম ‘মনজুভাই’। কেন বলতাম তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ব্যাখ্যা আবার একটু আছেও। বলতে ভালো লাগত। ওই নিয়ে তিনি কখনো কোনো কথা বলেননি। ফোন তুলে ‘মনজুভাই’ বললেই তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘বলো, মিলন।’ সত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে আমাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছেন। এত ভালোবেসে লেখা, ওরকম…
-

কাল
পনেরো দোলন পর্ব এক মনোরম গোধূলিবেলায় দেবু ঠাকুরের মনে পড়বে দোলনের কথা। ফাল্গুন মাস। দেবু ঠাকুর একাকী বেড়াতে গিয়েছিলেন পশ্চিমের মাঠের দিকটায়। গোধূলিবেলার আকাশ সেদিন কমলা রঙের। মাঠের দিকটা নির্জনে পড়ে ছিল। পায়েচলা পথে ছিল না মানুষের চলাচল। বিলের দিকটায় আমন-আউশের চারা বড় হচ্ছিল। পাট তিল কাউনের চারা বড় হচ্ছিল। বাঙ্গি তরমুজের জমিগুলো ফাঁকা হয়ে…
-

কাল
চৌদ্দ শ্রাবণ মাসের শুরুর দিককার এক রাতে তুমুল বৃষ্টি নামল। রাত তেমন হয়নি। বদরু খেয়ে এসে শুয়ে পড়েছে রান্নাঘরে। সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগী দেখেছেন দেবু ঠাকুর। দুপুরের দিকেও এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। উঠোনের মাটি ভেজা। সেই কারণে ঠাকুর আর ঘর থেকে বেরোননি। হারিকেনের আলোয় পড়ার টেবিলে বসেছিলেন। একবার ভাবলেন, কলের গানে গান শুনবেন। তারপর ভাবলেন, না…
-

কাল
তেরো রাতের খাওয়া শেষ করেছেন দেবু ঠাকুর। বড়ঘরে হারিকেন জ্বলছে। রান্নাঘরে জ্বলছে পিতলের একটা কুপি। উঠোনের জমাট অন্ধকারের ওপর দু’ঘরের আলো এসে পড়েছে। একদিকে হারিকেনের আলো, আরেকদিকে কুপির। সেই আলোয় পুরো উঠোন আলোকিত হয়নি। কিছুটা হয়েছে। রাতের খাওয়ার পর উঠোনে পায়চারি করার অভ্যাস ঠাকুরের। বৃষ্টি না থাকলে পায়চারিটা তিনি নিয়মিত করেন। রাতের খাবারের পর আধঘণ্টার…
-

কাল
বারো ‘‘আবদুল মোত্তালিব যখন জমজম কূপ খনন করতে গেলেন তখন কুরায়েশদের প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হলেন। তখন তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তাঁর যদি দশটি সন্তান হয় তাহলে তাঁদের একজনকে তিনি কাবাঘরের চত্বরে মহান আল্লাহপাকের নামে কুরবানি করবেন। আবদুল মোত্তালিবের দশটি সন্তান হলো। এক সময় তিনি তাঁদের ডেকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা জানালেন। আল্লাহপাকের সঙ্গে তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা…
-

কাল
এগারো চৈত্রসংক্রান্তির দিন বিশাল মেলা বসে কালীর মাঠে। কত আনন্দের উপকরণ সেই মেলায়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, বায়োস্কোপের বাক্স আর মাটির তৈরি হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভালুক সাজিয়ে মাঠে বসে থাকত বিক্রেতারা। গ্রাম এলাকার কুমোরেরা নিয়ে আসত হাঁড়িকুড়ি আর নিত্যদিনের গৃহস্থ 888sport promo codeর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। কামাররা আনতো দা-কাস্তে, কোদাল-কুড়াল, গরু কোরবানি দেওয়ার ছুরি এসব। ময়রারা আনত নানা রকমের…
-

কাল
দশ দরবেশ খাঁ সোনাদিঘি গ্রামের মোস্তফা খাঁর জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর বয়স তখন চার-পাঁচ বছর। দুপুরের দিকে শিশু মোস্তফা ঘরের পালঙ্কে ঘুমাচ্ছে। উঠোনের অন্যদিকে রান্নাঘরে বসে রান্না করছেন মা। ছেলে তাঁর প্রাণের অধিক। রান্না করতে বসেও বারবারই তাকাচ্ছিলেন বড় ঘরের দিকে। সেইসব দিনে শিয়ালের উৎপাত ছিল খুব। ক্ষুধার্ত শিয়ালেরা নিরিবিলি বাড়িঘর পেলে দলবেঁধে…
-

কাল
নয় কাঞ্চনকন্যা এই আখ্যান এখন একটু পিছন ফিরবে। বাসন্তীর ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের বছর বর্ষাকালের কথা। পুব কুমারভোগের মীর্জা বাড়িকে লোকে বলে ‘বড়বাড়ি’। বাড়িটি ছিল জমিদার অশ্বিনীকুমার চক্রবর্তীর। বিক্রমপুর ছিল পরগনা। ছোট-বড় জমিদার ছিল অনেক। অশ্বিনীবাবু তেমন বড় জমিদার ছিলেন না। আবার খুব ছোটও ছিলেন না। দু-আড়াই হাজার কানি জমির মালিক ছিলেন। বাড়িটা ছিল তিরিশ-পঁয়ত্রিশ…
-

কাল
আট ভুতো ও নিমাইয়ের কাহিনি কোনো বাপ যে ছেলেকে এত ভালোবাসতে পারে, এত আদরযত্ন মায়া-মমতায় ভরিয়ে রাখতে পারে; তাও নিজের ঔরসজাত সন্তান নয়, স্ত্রীর অপকর্মের ফসল, নিমাই এক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। মানুষ প্রকৃত অর্থে নিজেকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসে। নিমাইয়ের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। নিজের চেয়ে হাজার লক্ষগুণ বেশি ভালো সে ভুতোকে বাসে। ভুতোর জন্মের পর যে…
-

কাল
সাত বাসন্তীর কাহিনি ঠাকুরের সঙ্গে ওই কাণ্ডটি ঘটাবার পর বাসন্তী খুবই মর্মবেদনায় ভুগছিল। তার মনে হচ্ছিল, কাণ্ডটা আসলে সে ঘটায়নি। তেঁতুলতলা বা বাঁশঝাড়তলায় তিনাদের যিনি বসবাস করেন, তাদের সত্যি সত্যিই কেউ না কেউ বাসন্তীর ওপর ভর করেছিল। বাসন্তীকে দিয়ে কাজটা সে করিয়েছে। ঠাকুরকে বাসন্তী কামনা করেছে ঠিকই কিন্তু এই পদ্ধতিতে সেই কামনার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে, বাসন্তী…
