বাবার যত বাণী

বাণী একটা ভারি পদ। আবার মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে এর জন্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুখের কথা বাণী। বাণী বিদ্যাদেবী সরস্বতী। যাকে আমরা বীণাপাণিও বলে থাকি।

বাণী বলতে সাধারণত বুঝি কোনো গুণীজন বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির আশীর্বাদ বা জ্ঞানমূলক বক্তব্য। আর একটি প্রধান অর্থ, একজনের সারা জীবনের সারকথা, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যেমন সক্রেটিসের উক্তি : নিজেকে জানো।

কী কঠিন কথা রে বাবা! নিজেকে জানব কী করে? এমন যন্ত্র কোথায় পাব? এক্ষেত্রে মার্কিন মনোসমাজবিদ চার্লস এইচ. কুলি একটি ভালো পদ্ধতি দিয়ে গেছেন : যাকে বলে আয়নাতত্ত্ব বা লুকিং গ্লাস থিওরি। অর্থাৎ সমাজ তোমার সম্বন্ধে কী বলে, কী ধারণা করে, সেটাই তুমি। সমাজের আয়নায় নিজেকে দেখো। যখন সমাজ বলে লোকটা ভালো : বুঝতে হবে ব্যক্তিটি উৎকৃষ্ট সদস্য।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাণী : তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা এনে দেব।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, লক্ষ্যে না পৌঁছান পর্যন্ত স্থির হয়ো না।

তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ বলেছেন, যত মত, তত পথ।

আমার বাবা 888sport live footballিক শওকত ওসমান, এটা তাঁর 888sport live footballিক নাম : আসল নাম শেখ আজিজুর রহমান।

বাবা 888sport live football শুরু করেন 888sport app download apk দিয়ে। তখন আজিজুর রহমান নামে আর এক কবি থাকায় তিনি একরকম বাধ্য হন নাম বদলাতে।

তাঁর নাম গ্রহণেরও একটা ছোট কাহিনি আছে। আমার পিতামহ শেখ মহম্মদ এহিয়া ছিলেন ভাইদের মধ্যে

তৃতীয়। ওসমান নামে তাঁর ওপরের অর্থাৎ মেজোভাই ছিলেন একজন। তিনি অকালে প্রয়াত হন। এদিকে আমার বাবার এক বড় বোন ছিলেন, তিনি ভাইয়ের নাম রাখতে চেয়েছিলেন শওকত আলী – এভাবে শওকত ও ওসমান গ্রথিত হয়ে বাবার নাম হয় শওকত ওসমান। এভাবে চাচা ও বড় বোন দুজনকেই 888sport apk download apk latest version জানান বাবা। বাবার
এ-ধরনের সৃষ্টিধর্মী কর্মকাণ্ড আমাকে খুব চমকিত করত। বাবার জন্ম ১৭ই জানুয়ারি ১৯১৭, মৃত্যু ১৪ই মে ১৯৯৮ 888sport appয়। জন্ম  হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে। থানা খানাকুল, মহকুমা আরামবাগ, অবিভক্ত বাংলা, ব্রিটিশ ভারত ডোমিনিয়ন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে কলকাতা থেকে অপশন দিয়ে যোগ দেন। বাসা নিয়েছিলেন নবাব সিরাজউদ্দদৌলা রোডে, ৩৪ বি চন্দনপুরায়। চট্টগ্রাম কলেজের পেছনের সড়ক এটি। চকবাজার থেকে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোডের পরিধি।

বাবা আমাদের যেসব উপদেশ দিতেন, তার মধ্যে ছিল একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদ। এই প্রবাদটি আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বারবার বলতেন।

চীনা প্রবাদবাণীটি নিম্নরূপ :

তিনি বলতেন, শোনো, এই প্রাচীন চীনা প্রবাদটি : জ্ঞান হলো উজানে বাওয়া নৌকো (নৌকা) – যদি তা না এগোয় পিছিয়ে যাবে।

আমি তৎক্ষণাৎ প্রবাদবাক্যটি লিখে নিই এবং সর্বদা 888sport app download for android করি। আর বাবার মুখখানি দেখতে পাই। এসব কথা যখন বলতেন তাঁর চোখ-মুখ কত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তিনি যে পিতা – তখন বুঝতে পারতাম। সন্তানকে গড়ে তোলার জন্যে কী আপ্রাণ চেষ্টা। সবদিক দিয়ে সাহায্য করা।

এরপরই তাঁর যে-কথাটি মনে পড়ে সেটা হলো : তিনি বলেন, দুটি জায়গায় মানুষ পরাজিত হয়ে খুশি হয় – এক. পুত্র ও দ্বিতীয়. ছাত্র।

তিনি খুব স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ ছিলেন। যোগব্যায়াম-প্রাণায়াম, খালি হাতে ব্যায়াম। তবে যোগব্যায়ামে ধ্যান দিতেন বেশি। বিশেষ করে প্রাণায়ামে। এমনকি শীর্ষাসন পর্যন্ত করতেন। অর্থাৎ মাথার উপর ভর – পা উপরে।

আমরা যখন চট্টগ্রামে ছিলাম, সেই সময় আমাদের উঠতি বয়স। তখন তিনি আমাদের এসব শিখিয়ে দিয়েছিলেন অনেকটা নৃত্যাকারে প্রাণায়ামাসন শেখাতেন মুদ্রার ভঙ্গিতে।

আমরা ভাইবোনেরা ছুটির দিনে যেতাম দেবপাহাড়ে। যখন দিগন্তে সূর্যোদয় হতো, আমরা ভাইবোন মিলে বাবার শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাণায়াম করতাম। দিগন্তে সূর্যের উঁকি – লালিমায় ভরে যেত পাহাড়, আমরা প্রাণায়ামে ব্যস্ত। একবার বাঁ নাকে শ্বাস টানা, ডান নাক বন্ধ করে … আবার ফিরতি যাত্রা। এভাবে আট-দশ মিনিট আমরা সূর্য-প্রণাম সারতাম। এটা অবশ্য শুধু ছুটির দিনে। বাকিটা চন্দনপুরার বাসায় করতে হতো। অনেক সময় উৎসাহ দেওয়ার জন্য বাবাও যোগ দিতেন।

এবার এই প্রসঙ্গে তাঁর বাণীতে আসি। তিনি বলতেন, দেখ বাবা, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের একমাত্র মূলধন হলো শরীর। এটাকে যত্নে রাখবে। তবেই জীবন সহজে কাটবে। না হয় বাঁচার আনন্দ পাবে না।

বাবা ৮২ বছর বেঁচে ছিলেন। দারিদ্র্য তাঁর পিছু ছাড়েনি। নিজের সংস্থান নিজে করতেন। এর মধ্যেই হাজার মানুষকে আর্থিক সাহায্য করে গেছেন।

তৎকালীন সরকারি বেতনের পেনশন ছিল খুবই অপ্রতুল। তাই লিখে যা পেতেন তা থেকেই মানুষকে সাহায্য করতেন। সন্তানদের কাছ থেকে পারতপক্ষে সাহায্য নিতেন না। একমাত্র মেয়ে লাইলী যা দিত গ্রহণ করতেন। নিঃসংকোচে। বড় বেশি ভালোবাসতেন একমাত্র কন্যাকে। ভালো নাম রেখেছিলেন আনফিসা – অর্থাৎ কাহিনিময়।

বাবার মতো আমার সঙ্গেও লাইলীর সম্পর্কটা ছিল নিবিড়। ক্যান্সার ওকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিল। ২০১৩ সালে টরন্টোতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। আমাদের সবাইকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে অনন্তের পথে পাড়ি দিলো। আজো মনটা সমানে কাঁদে।

‘মন কেন এতো কথা বলে’ এই গানটা ছিল আমার মায়ের খুব প্রিয় গান। সত্যি কথা বলতে কী, আমারও প্রিয় গান।

বাবা একটা কথা হাজারবার বলেছেন, আমার আছে এক ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি নজরুলের আশীর্বাদধন্য ছিলেন, কিন্তু ঠাকুরের মর্যাদাটা ছিল ধ্রুবতারার মতো।

রজনীকান্তের একটি গান :

তুমি নির্মল কর

মঙ্গল করে

মলিন মর্ম মুছায়ে …

এটা তিনি আমার সেজোভাই স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে তার বাল্য বয়সে সকালে প্রায়ই গাইতে বলতেন।

পিতা-পুত্র সকালটাকে নির্মল করে তুলত।

আজ সব ছবির মতো। কখনো ফ্রেমে বাঁধানো, কখনো live chat 888sport।

কাউকে দাঁড়িয়ে জলপান করতে দেখলে বাবা বাধা দিতেন। বলতেন, বসে খাও।

খাও কথাটা বাংলা ভাষায় বড় জোর খাটিয়ে বসবাস করছে। পান করা আমাদের চলতি কথায় নেই বললেই চলে। সবই খাওয়া। বকুনি খাওয়া, ঝাঁটা খাওয়া … কোনো কিছু খেতে বাধা নেই।

বাবার এই জলপানটা বসে করার মধ্যে 888sport apkসম্মত

কারণ আছে। তিনি সেটা জেনে বলতেন, না কারো কাছ

থেকে শুনে বলতেন, তার সঠিক হদিস দিতে পারব না। তবে বর্তমানে চিকিৎসা888sport apkে জানা গেছে, বসে না খেলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে।  তাই ‘বসে জলপান করো’ বাবার এই বাণীটি স্থায়ী রূপ ধারণ করে। আমি যখন জলপান করতে যাই, বাবার কথা মনে পড়ে। বাবার কণ্ঠ শুনতে পাই : বসে খাও। বাঙালি জাতি সম্বন্ধে বাবার অভিমত ছিল, ‘বাঙালি হলো সোডা ওয়াটার জাতি। ফস করে জ্বলে ওঠে, ভস করে নিভে যায়।’

 শেষ একটা কথা আমার কাছে খুব মূল্যবান মনে হয়। তিনি বলতেন : সত্যিকার ধার্মিক মানুষ যে কোনো মানুষের চেয়ে ভালো। এর কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি, কিন্তু আমার মনে হয় তার কোনো প্রয়োজনও নেই।