তরু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শিশুবেলাটা আনন্দেই কেটেছে। যেই একটু বড় হলো, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, যন্ত্রণাটা তখন থেকে শুরু।
স্কুল বন্ধ। নির্জন দুপুরে জানালার ধারে বসে তরু একটি বই পড়ছে। কিছুক্ষণ পরপর ফ্রকের ঝুল দিয়ে চোখ মুছছে। তরুর খুব কষ্ট হচ্ছে। বইটি রেখে দিলে তার কষ্ট বন্ধ হয়। কিন্তু বইটি সে রাখতে পারছে না। বরং কী এক বিষাদ-মগ্নতায় সে বই আঁকড়ে আছে।
ঠিক তখন বড়পা কলেজ থেকে ফিরল। তরুকে দেখে জিজ্ঞেস করল, কিরে, কী পড়ছিস?
– খুব দুঃখের একটা বই পড়ছি।
– কী বই?
– হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে।
বড়পা চমকে উঠল। তরুর হাত থেকে বইটি ছিনিয়ে নিলেন। রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করল, কোথায় পেয়েছিস?
তরুর মনে হলো সে কোনো অন্যায় করেছে। অন্যায়টা যে কী সে বুঝতে পারছে না। নতমুখে বলল, তোমার বুক সেলফ থেকে নিয়েছি।
– আমার পারমিশন ছাড়া আমার 888sport free bet login ঘাঁটাঘাঁটি করিস কেন? এই বই পড়ার বয়স তোর হয়েছে? স্কুলের পড়ায় মন নেই। এখনই অ্যাডাল্ট বই পড়া শুরু করেছিস?
বই পড়ে যে অশ্রু ঝরেছে তা ছিল গল্পের চরিত্রের দুঃখে সহমর্মী বেদনায়, এখন যে-অশ্রু ঝরেছে তা অপমানের, অজানা অপরাধের।
বড়ভাই ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে বিছানায়, তারপর ফ্যান অন করে বিছানায় আছড়ে পড়ে। হেঁড়ে গলার চিৎকার শুরু করে, তরু, তরু, কইরে এক গ্লাস পানি আনতে কতক্ষণ লাগে?
বাসায় থাকলে এটা তরুর ডিউটি। ভাইয়া এখন এক গ্লাস পানি খাবে। তরু জানে। ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে অর্ধেক নরমাল পানির সঙ্গে ঠান্ডা পানি মেশালো। ঢাকনা দিয়ে গ্লাসের মুখ ঢেকে তবেই ভাইয়াকে পানি দিতে হবে। ভাইয়ার এরকমই নির্দেশ। একটু সময় তো লাগবেই। সে-ধৈর্যটুকু ভাইয়ার নেই। আবার চিৎকার শুরু করে, কইরে তরু, তাড়াতাড়ি পানি আন। জান যে যায় রে …
ভাইয়ার তাড়া খেয়ে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ছুটা গৃহকর্মীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে সর্বনাশ হয়ে গেল। গৃহকর্মী বয়স্ক মহিলা, রাগত স্বরে বলল, আফা, চোখে দেহেন না? ভাইয়া কিছু না দেখে গ্লাস ভাঙার শব্দ শুনে আরো রেগে গেল, একটা কাজও যদি ঠিকমতো করতে পারিস। অকম্মার ধাঁড়ি।
মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে তরুকে বুকে আঁকড়ে ধরলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তোর হাত-পা কাটেনি তো?
তরু মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে।
মা রাগতস্বরে ভাইয়াকে বললেন, বাড়ি এসেই চেঁচামেচি। পানিটুকুও নিজের হাতে খেতে পারিস না। নওয়াব বাহাদুর। এখন থেকে নিজের পানি নিজে খাবি। তরু তোর পানি দেবে না।
ভাইয়া বলল, মেয়েদের এতো প্রশ্রয় দিও না। শ্বশুরবাড়ি গেলে টের পাবে। সেখানে তোমার মতো মা থাকবে না। দজ্জাল শাশুড়ি থাকবে।
কাজ করতে তরুর ইচ্ছে করে। কিন্তু সবাই তার দোষ ধরে, বকাঝকা করে, তখন খুব রাগ হয়। আপু-ভাইয়া যে একশ একটা ভুল করে, সে-ভুলের কথা বলতে তরুর ইচ্ছে করে। সকলের ছোট হওয়ায় বলতে পারে না। তখন সে বাড়ির একমাত্র বৃক্ষ কদমগাছের কাছে চলে যায়। গাছের কাছে তার রাগ-দুঃখ-আনন্দ সব বলে। গাছের সঙ্গে কথা বলার সুবিধা হলো, গাছ খুব ভালো শ্রোতা। কথার মাঝে কথা বলে না। কোনো প্রতিবাদ করে না।
কথা যখন শেষ হয়ে আসে তরুর তখন রাগ হয়, তোমার কাছে আর আসবো না। আমি যে এত বকবক করলাম, তুমি কোনো কথা বললে না।
তরু যখন আরো ছোট ছিল তখন ঝগড়া-ঝগড়া একটা খেলা খেলতো। পুতুল অরুর মা তরু আর পুতুল অনুর মা বিনু। এদের ছেলেমেয়ের বিয়ে নিয়ে ঝগড়াটা শুরু হতো। তরুর সঙ্গে বিনু কথায় কখনো পেরে উঠতো না। সবসময় তরুর জিৎ হতো। ‘ঝগড়াটে তরু’ খেতাব পেয়ে সমবয়সীদের কাছে তরুর মর্যাদা বেড়ে গেল।
আজ তরুদের বাড়িতে একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান আছে। আপা-দুলাভাই, ভাই-ভাবি, তাদের ছেলেমেয়ে, বাবা-মা সবাই একত্রিত হয়েছেন। তরু এখন আর বালিকাটি নেই। 888sport app বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা 888sport live footballের শেষ বর্ষের ছাত্রী। আজ তার প্রথম কনে দেখা অনুষ্ঠান।
তরু দেখতে সুদর্শনা, বিভাগীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। ভালো আবৃত্তি করে। চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছে, কিন্তু কোনো প্রেমিকের দেখা পায়নি। এটার কারণ সম্ভবত তার ধারালো জিহ্বা এবং খামখেয়ালিপনা।
অভিভাবকরা সকলে তাই সাবধান করে দিলো, তোমার জিহ্বাকে সংযত রেখো। ভদ্র নমনীয় স্বরে কথা বলবে। হেঁয়ালি মার্কা কথাবার্তা বলবে না।
তরু পাত্রের ছবি দেখেছে। অতি সুবোধ বালক। ছোটবাবুকে সিঁথির চুল আঁচড়িয়ে মা যেমন স্কুলে পাঠায়, সেভাবে চুল আঁচড়ে পাত্র এখন বিশ্ববিদালয়ের ক্লাস নিতে যায় কী করে? তাই ভেবে তরুর হাসি পেয়েছে। এখনো কি পাত্রের মা তাঁর চুল আঁচড়ে দেন? ভেবে রেখেছে সুযোগ পেলে পাত্রকে জিজ্ঞেস করবে।
পাত্রকে মুখোমুখি দেখে তরু মুগ্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ গৌরবর্ণ সুপুরুষ, শুধু স্কুলবালকের আদলে চুল আঁচড়ানোর কারণে বালক-বালক গোবেচারা লাগছে। তরু দৃষ্টি ফেরাতে ভুলে গেল। পাত্র লজ্জায় রাঙা হয়ে লবঙ্গলতার মতো দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
পাত্রের বন্ধু পাত্রের কানে ফিসফিস করে কিছু বললে পাত্রের মুখে মৃদু লাজুক হাসি দেখা গেল।
পাত্রীর মামা বললেন, ওরা কথা বলুক। চলুন, আমরা পাশের রুমে গিয়ে বসি।
তিন মিনিট ধরে শূন্যঘরে পাত্র-পাত্রী মুখোমুখি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। পাত্র ঘরের চারপাশ দেখছে, জানালার বাইরের আকাশ দেখছে। শুধু তরুকে দেখছে না।
তরু দেখছে মানুষটাকে। এ কেমন মানুষ, শিক্ষকরা বাচাল হয়। এ দেখছি বোবা। কথা বলছে না। তার দিকে একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না।
তরু খুক খুক করে কাশল।
পাত্র জিজ্ঞেস করল, আপনার ঠান্ডা লাগছে? এসি বন্ধ করে দিন।
তরু বলল, না। আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
পাত্র মৃদু হাসল, সে কি, কেন?
তরু বলল, আমাদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে ওনারা চলে গেলেন। আপনি কোনো কথা বলছেন না। কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করতে পাবেন।
পাত্র বলল, যা জানার আপনার বায়োডাটায় তা দেখেছি। আপনিও আমার সম্পর্কে জেনেছেন। দেখাটা বাকি ছিল, তাও হলো।
তরুর অন্তর কেঁপে ওঠে, তা কেমন দেখলেন? আপনি ঘরের চারপাশ দেখেছেন। আমার দিকে কখন তাকালেন?
– ওই যে যখন ঘরে ঢুকি, আপনি ফিরে তাকালেন, জলে ভাসা দুটি চোখ। এমন চোখ যাদের তারা খুব মায়াবতী হয়।
তরু স্তব্ধ হয়ে গেল। কণ্ঠস্বর বাচনভঙ্গি এত সুন্দর! হৃদয়বীণায় ঝংকার ওঠে। তার তেইশ বছরের জীবনে এত মুগ্ধ উচ্চারণ কেউ করেনি। তরুর চোখ ভিজে ওঠে। তরু দ্রুত আড়ালে গেল। পাঁচ মিনিট পর দু-হাতে দুটি চায়ের কাপ হাতে ফিরে এলো।
এক মাসের মধ্যে তরু ও তমালের বিয়ে হয়ে গেল।
মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন শিক্ষিত মেয়ের স্বামী-বিয়ে সম্পর্কে যে প্রত্যাশা থাকে, তরুর প্রাপ্তি তাকেও ছাড়িয়ে গেল। সকালবেলায় দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে যায় – বাংলা 888sport live footballের ছাত্রী তরু আর ইংরেজি 888sport live footballের তরুণ শিক্ষক তমাল। সময় মিললে দুজনে একত্রে বাসায় ফেরে, নয়তো তরু গাড়িতে, তমাল রিকশায়।
তরুর শাশুড়ি সালেহা বেগম তরুর কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিয়েছেন তার পছন্দ-অপছন্দ। ব্রেকফাস্ট কি
চা-সন্ধ্যার আয়োজন – সব তৈরি হয় তরুর পছন্দের খাবার দিয়ে।
তরু অভিমানের সুরে বলে, মা, আপনি আমার পছন্দের সব খাবার তৈরি করেন। তমালের পছন্দের খাবার তৈরি করেন না কেন? ও তো আমাকে হিংসে করবে?
সালেহা বেগম তরুকে বুকে টেনে বলেন, মারে, নিজের পছন্দ বলে ওর কিছু নেই। সবকিছুই ওর পছন্দ। অপছন্দ কী সেটা জিজ্ঞেস করতে পারিস।
বিয়ের এক বছর না পেরোতে সালেহা বেগম মারা গেলেন। তমাল আরো নীরব হয়ে গেল। গৃহকর্মী ঘরের কাজ করে নীরবে, ঘড়ির কাঁটা ধরে মায়ের নিয়ম মেনে। কোনো কিছুর অভাব নেই, অভিযোগ নেই। সব থেকেও কোথাও যেন কী নেই। তরু কোথাও অপূর্ণতা অনুভব করে। তরুর পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সন্তান নয় – এ সিদ্ধান্ত দুজনের। অপূর্ণতা অন্য কোথাও। কিশোরীবেলায় তরু ভেবে রেখেছে, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে মনের সুখে কথা বলবে, ঝগড়া করবে। ঝগড়ার প্রিয় প্রতিপক্ষ হচ্ছে স্বামী। পরাজয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। আর তমালের মতো স্বামী, ক্লাসরুমে যত ভালো বক্তাই হোক, ঘরের লড়াইতে তার কথার মারপ্যাঁচে পাঁচ মিনিটে কুপোকাত। সুবোধ বালক হেরে গিয়ে বড়জোর অভিমান করবে।
এক বছর হয়ে গেল তরু এখনো তমালের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারল না। ঝগড়ার বিষয়-কারণ খুঁজে পায় না। তমালের ওপর রাগ জমাতে পারে না। কোনো বিষয়ে রাগ নেই, বিরক্তি নেই, প্রতিবাদ নেই। তরু যা কিছু করে সবকিছু যেন ঠিক। তমাল কি মানুষ নয়, রোবট?
এক মধ্যরাতে তরু হঠাৎ ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসে। চারপাশে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকাতে থাকে। তমালকে জাগায়। তমাল ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তরু?
তরু বলল, মাকে মনে পড়ছে। কতদিন মাকে দেখি না।
তমাল আড়চোখে ঘড়ি দেখল, রাত ১২টা ৪০ মিনিট।
তরু লাইট অন করে শাড়ি পাল্টে মায়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগল। গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তমালও তৈরি হলো। তরুকে হাসিমুখে বলল, আজ পূর্ণিমা। চলো আমরা রিকশায় যাই। পূর্ণিমার জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে যাবো।
তরু রাগত চোখে তমালকে দেখে বলল, আমি বললাম, তুমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলে। এখন ক’টা বাজে?
– রাত একটা। মাকে দেখার ইচ্ছে হয়েছে, হঠাৎ স্বপ্ন দেখে মন ব্যাকুল হয়েছে। অসুবিধা কী, তোমার ইচ্ছেকে আমি অনার করি।
তরু লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল।
এক চা-সন্ধ্যায় তরু মধুর হেসে এলায়িত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, তোমার প্রিয় বিষয় কী?
– পছন্দের বিষয়? তমাল একটু ভাবল। পছন্দ আর প্রিয়র ব্যবধান সে খুঁজে পেল না। মৃদু হেসে বলল, ওই, বই বউ।
– তোমার অপছন্দ কী?
তমাল মেধাবী ছাত্র, শিক্ষক মানুষ। এত কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি পড়েছে বলে মনে হয় না। মাথা চুলকাতে গিয়ে হঠাৎই মনে পড়লো ছেলেবেলায় করলা ভাজি খেয়ে সে বমি করেছিল। সেই বিভীষিকা এখনো তাড়া করে। এত তিতা যে জিহ্বা থেকে তিতা দূর হতে সাতদিন লেগেছিল।
তমাল বলল, তিতা। লোকজন কী করে যে তিতা খায় ভাবলেই আমার বমি আসে।
তরু সোহাগী বিড়ালের মতো তমালের আরো নিবিড় হয়ে গালে নাক ঘষে বলল, আগামীকাল ছুটির দিন। আমি রান্না করবো। বউয়ের রান্না খেতে তোমার ইচ্ছে করে না?
উদ্ভাসিত আনন্দে তমাল বলল, এ তো আমার পরম সৌভাগ্য! আগামীকাল আমাদের বউভাত। বউয়ের হাতের রান্না খাবো।
খাবারের সময় চিরকাল দুজন আয়া থাকে। আজ খাবারঘরে কেউ নেই। তরু বলল, আজ আমাদের বউভাত, শুধু আমরা দুজন থাকবো।
তরু দুজনের প্লেটে হাসিমুখে ভাত বেড়ে দিলো। তারপর যা দিলো তমাল চিনতে পারল না। অচেনা কিছু – কোনোদিন দেখেছে বলে মনে হয় না।
তরু চাইছে তার কথা শোনামাত্র তমাল ভয় পাবে, রেগে যাবে, প্লেট ভেঙে ফেললে খুব ভালো হয়। না হলে প্লেট ঠেলে দিয়ে না খেয়ে সে উঠে যাবে। সে চাইছে তমাল রেগে উঠুক।
তরু বলল, খাবার শুরু করতে হয় তেতো দিয়ে। এটা করলা ভাজি। তোমার করলাভীতি দূর করা দরকার। তমালের মন বিষণ্নতায় ভরে গেল। সে হাসিমুখে বলল, মনে হয় এবার পারবো। সামান্য করলা ভাজি ভাতের সঙ্গে নিয়ে দলা পাকিয়ে ওষুধ খাওয়ার মতো পানি দিয়ে গিলে ফেলল।
তরু তার খাওয়া বন্ধ রেখেছে। সে উত্তেজিত। তমালের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বলছে, তুমি রেগে ওঠো তমাল। এ অন্যায় মেনে নিও না। আমার গালে কষে চড় দাও। প্লেট আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেল। তুমি জেগে ওঠো। কেন রেগে উঠছ না? আমি তোমার ভয়ংকর ক্রোধ দেখতে চাই।
দ্বিতীয়বার ভাতের ভেতর করলাভাজি ভরে খেতে গিয়ে তমাল হেরে গেল। মুখ চেপে দৌড়ে গেল বেসিনে। বমি করে ফেলল।
তরু ছুটে তমালকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। সঙ্গে চলছে পাগলের প্রলাপ, আমি পাপিষ্ঠা, অপরাধী, আমাকে মারো, শাস্তি দাও …
তমাল বিরক্ত হয়ে বলল, আহ তরু, এসব কী বলছো? তুমি আমার স্ত্রী। তোমাকে কেন মারবো? আমি কাউকে আঘাত করতে পারি না।
বিকেলে ডাক্তার এলো, তেমন কিছু হয়নি। পথ্য হলো, যে-খাবার ভালো লাগে না, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা খাবেন না।
তরু কাঁদছে, বারবার বলছে, আমার জন্য তোমার এ অবস্থা। আমি অন্যায় করেছি, তুমি আমাকে শাস্তি দাও। শাস্তি না পেলে আমার অপরাধবোধ কমবে না।
তমাল বলল, বেশ, শাস্তি তুমি পাবে। তোমার মনে কোনো অপরাধ বোধ থাক সে আমি চাই না।
তরু ভয়ে বিস্ময়ে কৌতূহলে তমালের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তমাল বলল, আমি তোমাকে কিছু কথা বলবো, তোমার পছন্দ হোক বা না হোক – শুনতে হবে। পালন করা না করা তোমার ইচ্ছে। এটাই তোমার শাস্তি।
চায়ের কাপ হাতে তমাল তরু মুখোমুখি বসলো।
– আমাদের বাড়ির আঙিনায় বিশাল যে গাছটা দেখছ, ছাতার মতো ঢেকে রেখেছে অর্ধেক আঙিনা, ওই গাছটা চেনো?
তরু মাথা নেড়ে জানাল, চেনে না।
– মেহগনি গাছ। স্কুলে আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। নির্জনতা পছন্দ করতাম। বই ছিল প্রিয় সঙ্গী। সহপাঠীদের দেখতাম গলায় গলায় ভাব, কত কথা হাসি মজা, খাবার গান বই শেযার করছে। আমার ভালো লাগতো। ওদের মতো হতে পারি না ভেবে খারাপ লাগতো। আবার দেখা যেতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া বেধে গেছে, কী কুৎসিত বকা, হাতাহাতি রক্তারক্তি পর্যন্ত গড়াত। সে সময় আমার হাতে একটি বই আসে, হাউ টু লার্ন ফ্রম প্লান্টস।
বিশ্বের সব গাছ যদি কোনো কারণে বিলুপ্ত হয়, প্রাণিজগৎও লুপ্ত হবে সে আমরা জানি। আমাদের মেহগনি গাছটা বছরে কত টন অক্সিজেন তৈরি করে এবং এর বর্তমান বাজারমূল্য কত জানলে অবাক হয়ে যাবে।
তরু জিজ্ঞস করল, কত?
তমাল বলল, ওই বইটাতে অক্সিজেনের হিসাব কষার একটি সূত্র দেওয়া আছে। সেই সূত্রমতে সে-সময় আনুমানিক অক্সিজেন উৎপাদনের পরিমাণ এবং তার বাজারমূল্য বের করেছিলাম। বছরে এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ তিরিশ হাজার টাকার মতো।
তরু বলল, আমাদের বাড়িতে একটা কদমফুলের গাছ ছিল। বাসায় আমাকে কেউ পাত্তা দিত না। কথা শোনার কেউ ছিল না। সবার ছোট হলে যা হয়। আমার সব কথা ছিল ওই কদমগাছটার সঙ্গে। আমার সুখ-দুঃখের সাক্ষী ওই কদমগাছ। গাছটা শ্রোতা হিসেবে ভালো। কিন্তু কথা বলতে পারে না, ঝগড়া জমে না। তখন রাগ করে ঘরে ফিরে আসতাম।
তমাল বলল, তর্ক ক্রোধ মানুষের জীবনকে তিক্ত করে, বিভক্ত করে। ভালোবাসা দুঃখ আনন্দ ছাড়া গাছের আর কোনো রিপু নেই। গাছ পশুপাখি-মানুষের আহার জোগায়, আশ্রয় দেয়। জীবজগতের জন্য গাছের জীবন নিবেদিত। ওই বইটি পড়ার পর আমি গাছের গুণাবলি, স্বভাব আমার মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষ মনুষ্যত্ববোধ তার মননে স্থায়ী ও উন্নয়নের জন্য গাছের কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারে। মানুষ হয়তো কোনো একদিন তার ভেতর বৃক্ষের মগ্নতা ও মহত্ত্ব আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে। সেদিন পৃথিবী থেকে আধিপত্য, যুদ্ধ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসম বণ্টন সব দূর হবে। শ্রেষ্ঠ জাতি তত্ত্বের প্রতিযোগিতা আর থাকবে না। মানুষের মন হবে বৃক্ষের মতো ভালোবাসায় নিবেদিত, ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল।
তরু জিজ্ঞেস করল, মানুষ কি তখন বৃক্ষমানব হবে?
তমাল বলল, সে যখন হওয়ার তখন হবে। তুমি তরু অর্থাৎ বৃক্ষ। আমি তমাল, একশ্রেণির বৃক্ষ। আমরা দুজন কি চেষ্টা করতে পারি না বৃক্ষের গুণাবলি আমাদের মধ্যে আত্মস্থ করতে?
তমালের বুকে মাথা রেখে তরু কিছুক্ষণ নীরবে কাটালো। পরে ফিসফিস করে বলল, পারি। আমরাই হবো প্রথম বৃক্ষ মানব-মানবী।
তমাল তার দু-বাহুর উষ্ণতায় তরুকে নিবিড় আশ্রয়ে টেনে নিল। তরুর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, না। তরু আর তমালের মিলনে যে আসবে সে হবে প্রথম বৃক্ষ মানব বা মানবী।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.