ছোট গল্প
-

ভালোবাসার ঝরা ফুল
অফিসের কাজেই শ্রীমঙ্গল যেতে হয়েছিল, অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে তারপর শ্রীমঙ্গল। দেশের অন্যতম টুরিস্ট স্পট হওয়ায়, এই শীতের সময় অনেক চাপ লক্ষ করা গেল, থাকার জন্য মোটামুটি একটা হোটেলের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল অফিসেরই একজন সেলস সুপারভাইজার বারেক, অত্যন্ত তেলবাজ প্রকৃতির এক লোক, বয়সের চেয়ে বয়সীদের মতো কথা বলে আরাম পান, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ষোলো আনা।…
-

খুলির আকৃতি
চুল কাটা শেষ হলে নাপিত যখন মাথার পেছনে ও দুই পাশে আয়না ধরেছিল, তখন একত্রিশ বছর বয়সী নওশাদ হাফিজের চিন্তায় একটা খটকা ধাক্কা দেয়, ‘অন্যরকম লাগছে। খুলির শেইপ কি বদলে যাচ্ছে?’ পেছনের দেয়ালে ঝোলানো মেসির ড্রিবলিং, সামনের আয়নায় মাথার সঙ্গে ফুটবল এবং কয়েকটা লাল হলুদ বুট পরা পা মাথার পাশে, দেখা গেলেও নাপিতকে নওশাদ আরো…
-

দাউ
না, শেষ ইন্টারভিউটাও বাঁধল না। যেন একটা চিল ভেসে উঠল আকাশে। মাথার উপর, অপেক্ষমাণ। ছেলেটা চুপ। একটা বিড়ি ধরাল। ফুটপাতটা ধরে একমুখ ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে হাঁটতে লাগল। পিছন পিছন সেই চিল। শিয়ালদা স্টেশনে এলো, বাড়ি ফিরবে। এভাবে ফিরিয়ে দেওয়াকে কী বলে? সে কিন্তু এবার সত্যিই খুব খেটেছিল। যোগাযোগ জুটেছিল একটা। দাদার বড় শ্যালক নাকি পার্টি…
-

স্বপ্নছোঁয়ার পদযাত্রা
অবাধে জন্ম নেওয়া আট ভাইবোনের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের চতুর্থ সন্তান নাহিদ যখন মাস্টার্স শেষ করে একটা চাকরির ধান্দায় ব্যস্ত, তখন তার মনের আরেকটি অংশের সবটুকু জুড়ে থাকে উচ্চমধ্যবিত্তের অনার্স পড়ুয়া সুদর্শনা মীরা খানম। নাহিদের অবসরপ্রাপ্ত বাবার উপার্জনহীনতায় বড় দুই ভাইয়ের সামান্য আয়-রোজগারে এত বড় সংসারের উদরপূর্তির পর যা হাতে থাকে তা দিয়ে বাকি ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচটা…
-

মতিন নাকি প্লাটিপাস
মতিন গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত তিনবার নিজেকে প্লাটিপাস দাবি করেছে। আমি পাত্তা দিইনি। দুইবার মোবাইল রেখে দিয়েছি; শেষবার বলার পর থেকে আমি মোবাইল অফ করে রেখেছি। গত রাত থেকে শুরু। এখন পরের দিন দুপুর ২টা। আমি ড. ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। তাঁকে সন্ধ্যার আগে পাওয়া যাবে না; চেম্বার থেকে জানাল। আমি সকালে নাশতা করেছি;…
-

বেলশুঁঠ
এক এই উত্তীর্ণ দুপুরের তেজহীন রৌদ্রে বালকটি দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠছে। হাতে মাটির ঢেলা। ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলে নিশ্বাস ছাড়ছে আর দৌড়াচ্ছে। ধবলীকে ধরতেই হবে। হাতের ঢেলা ছুড়ে আহত করতে চায় ওকে। মাঝে মাঝে নিশানা লেগেও যায়। ক্যাঁয় ক্যাঁয় করে ওঠে ধবলী। ব্যথায় দেহটা খানিকটা বেঁকেও যায়। মুখ থেকে ছিটকে পড়ে বালকের আকাঙ্ক্ষিত বেলশুঁঠ। এই অদ্ভুত…
-

সেগুনবাগিচার সারমেয়
ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গাড়িটা ডানে মোড় নেয়। ফজল খেয়াল করে, একটা সাদা-কালো ছোপ কুকুর তার গাড়ির পেছনে ভেক ভেক করে তেড়ে আসছে। বেশ অনেকটা দৌড়ে রণে-ভঙ্গ। ফজল চালককে বলে : হারুন, কুকুরটা গাড়ির পেছনে কেন দৌড় দিলো বলো তো? স্যার, গতকালও পেছনে এসেছিল, আপনি খেয়াল করেননি। কিন্তু কেন? ঠিক আছে স্যার, আমি জানার চেষ্টা করব।…
-

এ ঢাক নিয়ে রাজবিহারী এখন কী করবে…
না, শিবানন্দের মা, আর বুঝি পারলাম না। বুক-ভরা যন্ত্রণা নিয়ে মধুবালার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল রাজবিহারী। আর পারছি না শিবানন্দের মা, আর পারছি না। – আবার কী হলো? এ-কথা বলে স্বামীর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকালো মধুবালা। – কী আর হবে? তোমার সুপুত্র বলে দিয়েছে ও আর কোনোদিন ঢাক ধরবে না – বাজাবে না আর…
-

ছিঃ
প্রেম দিয়েই শুরু হয়েছিল সম্পর্ক। ক্যাম্পাস-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তছনছ করে প্রেমের পাগলা ঘোড়া ছুটিয়ে তারপর বিয়ে করে ক্ষান্ত হলো ওরা দুজন। দুজন বলতে ধ্বনি আর আশরাফ। তাদের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। যে-সময়ে প্রেমিক-যুগল হিসেবে ক্যাম্পাসে ওদের নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ, সেটা আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিককার সময়। ওরা সে-সময়ের নায়ক-নায়িকা। খুল্লামখুল্লা প্রেমের জন্য রীতিমতো বৈরী সময়; তবু দেশি…
-

জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে
শেষ পর্যন্ত ভাগ্য যেন সহায় হলো অনিমেষের। আগে থেকেই কিছু লোক দাঁড়িয়ে ছিল। অনিমেষ এসেছিল ঘণ্টাখানেক পরে। তার পরও আর কেউ কেউ এসেছে। ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও আছে। সবাই লম্বা বোরখায় আবৃত। লঞ্চঘাটে এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সেই কখন থেকে। সবার মুখে চোখে উৎকণ্ঠা, আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। গলায় তেমন জোর নেই। কথাবার্তা হচ্ছে খুবই কম।…
-

আয়েশাপাগলির গর্ভফুল
স্কুলে যাওয়ার সময় দেখি আয়েশাপাগলি রাস্তার ড্রেনের পাশে বসে বমি করছে। পথযাত্রীরা যাওয়ার সময় বকে বকে যাচ্ছে। কেউ নাকে রুমাল চেপে চলে যাচ্ছে। আমরা কয়েক বান্ধবী একটু নিরাপদ দূরত্ব রেখে চলে গেলাম। আমার বয়স তখন বারো কী তেরো বছর। সেদিন স্কুল থেকে ফিরেই দেখি সবাই যেন কীসব বলাবলি করছে। জিজ্ঞেস করলে কেউ কিছু বলে না।…
-

মম আসেনি
কথা ছিল, কার্জন হলের সামনের চত্বরে অপেক্ষা করবে। সময় জানিয়েছিল এগারোটা। সাজিদ কথামতো ঠিক সময়ই এসেছে। এবং তারপর থেকে অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ সদ্য চারা গজানো ফুলের বেডগুলো দেখে, তারপর দেখে মাঝারি সাইজের মেহগিনি গাছের সারি। ডালে ডালে নোনা ফলের সাইজের ফল ধরেছে। কিছুটা আগাম হলেও অশোক গাছের ডালে একটা দুটো লাল রঙের ফলের থোকাও চোখে…
