ছোট গল্প
-

বিহঙ্গডানার মেয়ে
বটমলি হোমের বারান্দায় সিস্টার মেরি পেটরা দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ। টান করা পিঠের পেছনে হাতজোড়া দৃঢ় আবদ্ধ আর চোখ দুটো গভীর মনোযোগে নিবদ্ধ মাঠের অ্যাসেম্বলির দিকে। তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশের দেয়ালেই স্বচ্ছ কাচবন্দি যিশু কাঠের ক্রুশের ওপর ঝুলছেন। দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে কাতর শীর্ণ শরীর – একদিকে কাত হয়ে থাকা আর্ত-ব্যথিত মুখে তবু সান্ত্বনা ও সাহসের…
-

এক নষ্ট মেয়ের আপ্তবয়ান
আমার ঘুমের ঘোরেই তিনি আমাকে ধর্ষণ করলেন। হ্যাঁ, ধর্ষণ। ইচ্ছের অমতে যৌনকর্মকে ধর্ষণই তো বলে। কিন্তু যেহেতু সেই রাতে আমি তার স্ত্রীর তকমা গলায় জড়িয়েছি; সমাজ তাই আমার অভিযোগ গ্রহণ করবে না। তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। কথাগুলো বলেই আনমনা হলো রাখি – এক আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে তারই সঙ্গে যিনি…
-

কন্যাকাটা ভিটা
‘শীতের দিনেও এখানে হাঁটুজল থাকতো। ভাই-বেরাদাররা মাছ ধইরা আনতো। কত পদের মাছ। আর ওই মাছের স্বাদও আছিল অনেক। আর শ্রাবণ মাসে তো থইথই জল। ডিঙি নিয়া লোকজন ফসল তুলতো। পাট কাটতো। ওরে আল্লাহ, সাপের কথা আর কী কমু! কতজনরে যে সাপে কাটলো, তা ওঝার বাপেও জানে না। ‘এখন এ জায়গা চেনা যায় না। চেনার কোনো…
-

রেহানা ও তার গাছ
তখনো একটা মুনিয়া পাখি তেঁতুলগাছের মাথায় বসে একগুঁয়ের মতো আলোর একটা প্রান্ত টেনে ধরে রেখেছিল। নয়তো সন্ধ্যা কবেই নেমেছে। বাড়ির আঙিনায়, গোয়ালঘরে, বাঁশঝাড়ে, সর্বত্রই। শুধু গাঙ্গুলিদের বাড়ির মস্ত তেঁতুলগাছের পেছনে ক্ষেত থেকে তুলে আনা পাকা টমেটোর মতো একফালি আকাশ। মুনিয়া পাখির দাপাদাপি আর অসময়ের গানে বিকেলটা যেন থেমে আছে সেখানে। সন্ধ্যার শিহরণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে…
-

হাইফেন
একটু আগেই ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছিল সোহানা। সে জানত না আকরাম এতো তাড়াতাড়ি অফিস শেষ করে এসেই বলবে, ‘চলো, তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। অনেক কষ্টে সিরিয়াল পেয়েছি এখানে অনেক রোগীর ভিড়ে। এক মাস আগেই নাকি সিরিয়াল নিতে হয়। তোমার নয় নম্বর। অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছি। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।’ একটানে কথাগুলি বলে যায় আকরাম। যদিও…
-

নিঃসঙ্গ কলতান
ফেব্রুয়ারির সকালবেলার হালকা শীত শীত ভাবটা গায়ে যেন মখমল কাপড়ের মতো আরামে জড়িয়ে থাকে। ভোরের দিকে মাখনের মতো নরম কাঁথাটা আরো ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। পুরনো শাড়ি দিয়ে হাতে সেলাই করা নরম কাঁথা। মফস্বল শহরগুলোতে এখনো এসব সহজেই পাওয়া যায়। ছোটবেলায় দেখেছি, মা তার পুরনো শাড়িগুলো জমিয়ে, সেগুলো দিয়ে কাঁথা বানাতে দিয়ে দিত। খুলনায়…
-

একটি লাল ফড়িংয়ের গল্প
এক পুবের আমগাছের ছায়াটা গুটিগুটি পায়ে যেন সেতু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে। ছায়াটা ঠিক নিরেট ছায়া নয়, রোদের খানিকটা লুকোচুরি আছে ছায়ার ভেতর। কিন্তু সেতু মিয়ার প্রয়োজন নির্ভেজাল রোদ। সে নির্ভেজাল রোদের জন্য এরই মধ্যে তিনবার জায়গা বদল করেছে। পিঁড়ি পেতে সে প্রথমে বসেছিল ঘরের দাওয়ায়। রোদটা সেখান থেকে সরে যেতেই সে গিয়ে পুবের খোলা…
-

মাস্ক-সম্পর্কিত একটি সত্য ঘটনা
থার্মাল স্ক্যানারের সামনে দাঁড়াতেই ধবধবে সাদা স্পেস স্যুট পরিহিত নিরাপত্তা কর্মীটি মাহিদুলের চোখে চোখ রেখে ঈষৎ বিরক্তিযুক্ত কণ্ঠে বললেন – ‘আরে ভাই কী করছেন? হাত নয়, আপনার কপাল আনেন স্ক্যানারের সামনে।’ অনভ্যাসের কারণেই হয়তো হাতটি আগে চলে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে স্ক্যানারের সামনে নিজের মুখাবয়বটি তুলে ধরে মাহিদুল। স্ক্যানারের ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে শরীরের তাপমাত্রা…
-

মৃত্তিকার মায়া
প্রণব মজুমদার সাবিত্রীরা কেউ যেতে চায়নি। নিজেদের জমিজিরাত ও ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তর কেন? প্রশ্নটা সাবিত্রীরও। মাটি কামড়ে থাকতে চেয়েছিল ওরা। পিতার মতো অতিশয় মাটির মায়া সাবিত্রীরও ছিল। দেশ ছেড়ে যেতে সেদিন একটুও মন সায় দেয়নি তার। বারবার বাবাকে বলেছে, ‘নতুন অচেনা জায়গা! তোমাদের ছেড়ে কীভাবে সেখানে থাকবো?’ উত্তরে বাবা বলেছেন, ‘দিনকাল খারাপ! কখন কী হয়ে…
-

একটি চিরকুট ও একজন আতিকউল্লাহ
নেতা, পাতিনেতা, সাংবাদিক, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সুহৃদ, শত্রু সবার সময়-অসময়ের উৎপাতে বাড়িটা যেন বাজার হয়ে উঠেছে। এমন ঘটনা পরিচিত পরিবেশে এর আগে আর ঘটতে দেখেনি কেউ, শোনেওনি। অপার কৌতূহল যেন হঠাৎ তেড়ে আসা সুনামির মতো নানা প্রশ্ন নিয়ে নানা সম্ভাবনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। হাট-বাজার, চায়ের স্টল, বৈঠকখানা, পার্টি অফিস, গলির মোড়ের আড্ডা – সর্বত্র সব কথার মাঝে…
-

দুধপট্টি
বিয়ের কিছুদিন পর আমি আবিষ্কার করি যে, আমার আমার বর সাধারণ মানুষ নয়, সে বেশ সৃজনশীল, সে কবি কি না আমি বিয়ের আগে জানতাম না, তার সম্পর্কে কোনো তথ্য বাবা আমাকে বলেনি; আমি বাধ্য কন্যার মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসলাম কোনো কিছু না ভেবেই। তো একদিন দেখি সে ব্রার নতুন নামকরণ করছে, সে বলছে, তোমার দুধপট্টির…
-

অনিঃশেষ ঘুমের ভেতর
জা য়গাটা বেশ ভালোই, দিঘল সরল পত্রময় গাছে ঘেরা, শান্ত আর নির্জন, অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপদেশের মতো সুন্দর, নিরুপদ্রব। এখানকার অনন্ত নিরালায় হু হু বাতাস এসে শিশুদের মতো নিশ্চিন্তে দোল খায়। এই অখণ্ড স্তব্ধতায় রৌদ্র এসে ঋষির মতো ধ্যানমগ্ন হয়। গভীর রাতে যখন পৃথিবীর ওপর নক্ষত্রের আলো ঠিকরে পড়ে, এখানকার বাঁশবাগানে তখন শনশন বাতাসের শব্দ হয়।…
