ছোট গল্প
-

কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি
‘তোমার কোথায় দেশ? কিবা পরমাত্মা-পরিচয়? তুমি ছোট ঘরে বসে আজীবন পড়াশুনা করো তোমার সামান্য আয়, তুমি স্ফীতোদর।’ (‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়) বুকসেলফ … একবার খুব টানাটানির মধ্যে পড়ে গেলাম। ২০০৯ সালের কথা। সুজলার বয়স তিন আর স্বননের সাত-আট মাস হবে। চট্টগ্রামের যে-দৈনিকটাতে কাজ করতাম সেখানে নিয়মিত বেতন হতো না। বকেয়া পড়ত…
-

বনমানুষীর খোঁজে
দুই হাজার চৌদ্দোয় পৌঁছে শিকদার হাসান ফেরদৌস উনিশশো একাত্তরে ফিরে এলো। স্ত্রীকে চড়-গুঁতা মেরে, টেনে-ধাক্কিয়ে বাসা থেকে বের করে গলিতে ঠেলে দিতে দিতে চরম উৎকণ্ঠা কিংবা কামজ বিগারে ও চিল্লায় – সহেলি, সহেলি … এমন এক সিনে শিকদার সাহেবকে আশপাশের বাসাবাড়ি-দোকানপাটের লোকজনের ভারি অশোভন ঠেকে, তারা তার এমন জ্বলে ওঠার কারণ যেমন বুঝে উঠতে পারে…
-

কাআ তরুবর
এই চওড়া সড়ক ধরে হাঁটার সময় বহুদিন ডান-বাম পাশে তরুসারির নাম মনে করতে আমরা প্রায়ই ঝগড়ার মতো করে বসি; অনিন্দ্য কোনো গাছের নাম ঠিক বলতে পারে না, তবু সে স্বরচিত নাম দেয় গাছের : আমরা বড়জোর মেহগনি চিনতে পারি, দেবদারু চিনতে পারি তবে তার পাশে বড় বড় পাতার শাল কিংবা কদমগাছ চিনতে পারি না। সৈকত…
-

সন্দেহ
এখন কি দিন না রাত কিছুই বুঝতে পারছি না, সকাল বিকেল দুপুর সন্ধ্যার ভেদ ধরা তো দূরের কথা, একটা দরজা-জানালাহীন ঘুটঘুটে অন্ধকার-ঘরে আমাকে বন্দি করে রেখেছে ওরা! কত মাস, কত সপ্তাহ, কত দিন, কত ঘণ্টা, কত মিনিট ধরে আছি কোনো হিসাব নেই আমার। এই অন্ধকার মনে হচ্ছে কবরের মতো নিরেট, জমাটবাঁধা। হাত বাড়ালেই অন্ধকারের মোটা…
-

পাতাদের সংসার
অনেকদিন আগে পথিক এ-বাড়িতে প্রথম এসেছিল নিতান্তই খেয়ালের বশে। তখন তার ছিল হাঁটার ‘ব্যারাম’, অন্তত লোকে তাই বলতো। শহরময় অবিরাম হেঁটে বেড়াতো সে, মনে হতো যেন নিজের নামকরণের সার্থকতা প্রতিপন্ন করতে চাইছে – পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি বসতো না কোথাও, যেন উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনো কিছু, এমনই ছিল তার হাঁটার ভঙ্গি। আসলে কী খুঁজতো সে?…
-

আহীর আলমের বাম পা
ক তুমি আবিদ রাজা! ঠিক বলিনি আমি? মোবাইলের ওপাশে কাঠফাটা চিৎকার। সেই হাসির তরঙ্গের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিয়ে হাসে সিলভিয়া আখতার, হাসছো কেন? বলো আমি তোমাকে চিনেছি কি না! চিনতে হবে কেন? আমার নম্বর সেভ নেই তোমার সেটে? না, তোমার নম্বর আমার মোবাইল সেটে নেই। কণ্ঠস্বরে চিনেছি। একটু থেমে সিলভিয়া প্রশ্ন করে, রাজা এতদিন পর…
-

ফাগুনবউ
এইরকম দিনগুলিতে রোদ্দুর বরাবরই চড়তা থাকে। যদিও মাথার ওপরে ধূমল মেঘের চাঙারি বৃষ্টি নিয়ে ভেসে বেড়ায়। ভাসতে ভাসতে উড়ে চলে যায় বহুদূর। হয়তোবা দূরের কোনো আকাশে বা সুদূরের কোনো গাঁয়ে। রোদ্দুরের তীব্র উত্তাপের মাঝে মেঘেদের এমন মতিচ্ছন্নতার কারণ ধরতে পারে না ভরত। প্রখর সূর্যের নিচে কেনইবা তারা জমে ওঠে? কেনই-বা খামোকাই ভেসে বেড়ায়? আবার কেনই-বা…
-

অবচেতনের সহোদরা
[৪৮ বছর মনের ওপর পলেস্তারা পড়ার মতো যথেষ্ট সময় বলে যখন মনে হতে থাকে, ঠিক তখনি একজন বোনের আর্তি হুড়মুড় করে ধসিয়ে দেয় ভুলে-যাওয়া দেয়ালগুলোকে। আর মানুষ তখন পুরোপুরি ফিরে যায় ৪৮ বছর আগে।] মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ১৭ বছর হলে এখন ৬৫। কিন্তু গোলাম রসুলকে দেখলে কেউ তার বয়সের কথা ধারণাই করতে পারবে না।…
-

লাল শার্ট
দ্বিতীয়বারের মতো আরমানকে ফিরে যেতে হলো। সে তার স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র অন্তুকে নিয়ে গ্রামে এসেছিল বাবা-মাকে শহরে নিয়ে যেতে। আগেরবার বাবা সোলায়মান মিয়া শেষ মুহূর্তে এসে মত পালটালেন। তিনি বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে শহরে ছেলের সংসারে থাকতে রাজি নন। তাছাড়া দুই-তিনদিনের বেশি শহরের জীবন তাঁর ভালোও লাগে না। চারদিকে কেমন দমবন্ধ পরিবেশ! একবার আরমানের জোরাজুরিতে…
-

ফণির পরে
ক্যা বারে কুটি যাচ্ছু! রমেন মাস্টার বলে জয়নালকে। রমেন মাস্টারের বগলে ছাতা, তার হাঁটার গতি দ্রুত। তার মাথায় টাক, টাকের ওপরে নীল আকাশের নীল, গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ প্রতিফলিত হচ্ছে। জয়নাল গেরস্তি কাম করে, খেতি কাম করে; মানে সে একজন কৃষক; তার পরনে চেককাটা তমন্দ, গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি, তার চোখেমুখে রাজ্যের মেঘের ছায়া! অন্ধকার। রমেন…
-

বিশ্বনাগরিকের স্থানীয় সংকট
ইনানি যখন জেটির কাছাকাছি এসে পৌঁছয়, তখন ন্যাভাল অ্যাভিনিউর দিকটা থেকে আসা কিছু ফ্লুরোসেন্ট, কিছু সোডিয়াম আর কিছু মার্কারির সম্মিলিত আলোক পুরো এলাকাটাকে একেবারে উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। সল্টগোলা ক্রসিংয়ের দিক থেকেই হতে পারে একটা লং-ভেহিক্যাল গজরাতে গজরাতে চলে যায়। নভো কি রিজেন্ট কি বিমান যে-কোনো একটা পেস্নন আসেত্ম নেমে আসে রানওয়েতে। গতি এবং শব্দ মিলিয়ে…
-

কালু ডোম
ছেলেটা মায়ের সঙ্গেই এসেছিল হাসপাতালে। বান্দরবান সদর হাসপাতালে। চৌচির মাথা নিয়ে যশোদা ভর্তি হয়েছিল। বেহুঁশ। কে একজন হাসপাতালের গেটে রেখে গিয়েছিল। থানা-পুলিশের ভয়ে ইমার্জেন্সি পর্যন্ত নিয়ে যায়নি। ওই সকালে হন্তদন্ত হয়ে কালু ডোম ঢুকছিল। রাকিবস্যার খবর পাঠিয়েছেন – এখনই আয়। ডেঞ্জেরাস কেস। ইমেডিয়েটলি পোস্টমর্টেম করতে হবে। ডা. রাকিব সকালের ডিউটিতে ছিলেন। ব্যাপারটা সত্যি বোধহয় জরুরি।…
