ছোট গল্প
-

রাত্রিমা ও ঘুমগাছের বন
এই গল্পটা আমার মায়ের। এটাকে গল্প বলা যাবে কিনা বুঝতে পারছি না; কিন্তু গল্পের মতোই। এখনো ভাবলেই সব দৃশ্য হয়ে যায়। আমাদের ছিল ঘুমগাছের বন। সেই বনের ভেতর আমাদের কাঠের দোতলা বাড়ি, টিনের ছাউনি। ওখানে থাকতো আমার রাত্রিমা, আমি, আমার ভাইবোনেরা, একটি ভয়ানক রূপবতী বৃদ্ধ দাদি, আর মধ্যে মধ্যে বাবা। বাবা তো দূর বনের সরকারি…
-

মরিচপোড়া
আমি যখন বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালাম, সূর্য তখন মধ্যগগন থেকে অল্প একটু হেলে পড়েছে পশ্চিমে। চারদিকে ঝাঁঝাঁ সোনা গলানো রোদ। আমিও এসেছি বহু পথ অতিক্রম করে। কত হবে? হাজার লাখ ক্রোশ। মাপজোখ নেই। আমি কিছুটা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। যদিও রোগ, শোক, জরা আমাকে তেমন একটা ছুঁতে পারে না। তারপরও এই নশ্বর পৃথিবীর সবকিছুই যেহেতু একদিন…
-

শৈশবের বানরেরা কোথায় হারাইয়া গেল
যদিও সায়েন্স ল্যাবের ভিড়মগ্ন রাস্তাঘাট মানুষ এবং নানা কিসিমের (বাস, জিপ, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টেম্পো, মোটরসাইকেল, রিকশা ইত্যাদি …) যানবাহনে বিপর্যস্ত, যদিও এলিফ্যান্ট রোডের দোকানগুলো শাড়ি, বস্নাউজ, ব্রা, পাঞ্জাবি, বাহারি জুতা, চশমা, ঘড়ি, শোপিসে ঠাসা এবং এসবের প্রাচুর্যে যদিও বানরবিষয়ক ভাবনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় তবু আবুল কাসেমের মাথায় এ-ভাবনাই লাফঝাঁপ মারে। এমনকি শৈশবে দেখা সেই…
-

অলক্ষে
শেওড়াপাড়ায় ধসে যাওয়া রহমান টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষের ফাঁকে পড়ে থাকা হাজারখানেক গার্মেন্ট শ্রমিকের লাশ এবং আহত বা জীবিতদের ভিড়ে সোমা আখতারকে (২১) আর খুঁজেই পাওয়া গেল না! কয়েক দফায় জুরাইন কবরস্থানে যেসব নাম-না-জানা গার্মেন্ট শ্রমিকের গলিত-অর্ধগলিত বা খ–ত লাশ কবর দিয়েছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম তাদের ভেতরে, যাদের বিকৃত চেহারাটা কিছুটা হলেও বোঝা যাচ্ছিল তখন, সেই দলেও…
-

শান্তা, শাড়ি আর সালমার কথা …
হঠাৎ আমাদের কথাগুলো খইয়ের দানার মতো ফুটতে লাগলো। উৎসাহের আতিশয্যে সেগুলো দুজনের উষ্ণ মুখগহবরের ভেতর থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে থাকলো টেবিলের দুপাশে। অনেকটা ফটফট ফটাশ আওয়াজ তুলে। আমাদের মনের ওপর কথাগুলোর প্রভাব ছিল এমনই সশব্দ, দারুণ উত্তেজনাকর। আমরা দুজন টেবিলের দুদিকে বসে ছিলাম। অনেকদিন পর এমন অন্তরঙ্গ আলাপের সুযোগ পেয়ে আমরা উভয়েই বেশ প্রগলভ হয়ে উঠলাম।…
-

হরিপদর দোকানে বিকেল নামার সময়
বহু পুরনো জংধরা টিনের বাক্সে বাঁশ কিংবা গজারি কাঠের চেলা দিয়ে বাড়ি মারলে যেরকম পুরনো আমলের মতো একটা আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ফইজুলের গলার স্বরটাও অবিকল সেরকম। ফইজুল যখন অপরিচিত জায়গায় গিয়ে কথা বলে তখন সবাই ওর দিকে যতটা না আগ্রহ নিয়ে তাকায় তারচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনে তার কথা। ফইজুলের এই কথা বলার ধরন-ধারণের…
-

অমানুষ
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুতবেগে নামছে ও, এগারো ধাপের একটা সিঁড়িতে দুবার পা। দশতলা থেকে নামতে বড়জোর এক মিনিট। হাতের মুঠোয় শুধু দুটো ফোন নম্বর, বাঁশপাতা কাগজে লেখা। পালাতে হবে তাকে, এক্ষুনি! পেছনে ধাবমান-গিন্নি দুই সিঁড়ি দ্রুততার সঙ্গেই নেমেছিল, এককালে সেও কম খেলোয়াড় ছিল না যে! কিন্তু সাম্প্রতিক হার্টের ব্যামো, কোমরের হাড় ক্ষয় তাকে থামাল। মাথাটা কাজ…
-

বগি নম্বর ৮৩০৫
বেঁচে থাকা মানে দুর্ভোগ পোহানো। টিকে থাকা মানে ওই দুর্ভোগের কোনো তাৎপর্য বুঝতে পারা। – নিট্শে ট্রেন এক রহস্যময় বাহন। কত চড়েছে সাজু! তবু এর রহস্যের তল পায়নি। রহস্যময় আসলে ট্রেন নয়। লোহালক্কড়ের মধ্যে কী এমন রহস্য? সেই শতাব্দীকাল প্রাচীন ইঞ্জিন কলুর বলদের মতো বগিগুলোকে টানে, আঠারো শতকের নিগ্রো ক্রীতদাসদের মতো বগির চাকাগুলো গড়িয়ে…
-

বৈশাখ, এসো হে
সুমিত চলে যাওয়ার পর, সেই মার্চেই বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু কুইন্সের জ্যামাইকায় পথঘাট ছিল বৃষ্টির পানিতে ভেজা আর স্যাঁতসেঁতে। পারসন্স বুলেভার্ড থেকে জ্যামাইকা অ্যাভিনিউ বা উঁচুতে উঠে হিলসাইড সবখানের ফুটপাতগুলো যেন কালো আর চকচকে হয়ে উঠল। সেইসঙ্গে দুই-এক বস্নক পরপর জেব্রাক্রসিংয়ের ঢালগুলোতে জমাট পানি। বৃষ্টিতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। বরং ভালোই…
-

জ্যাকপট
ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিকে বলা যেতে পারে 888sport app শহরের গুলশান। এখানে প্রযুক্তিবিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির হেড অফিস, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিদিন গজিয়ে উঠছে ছানাপোনা আরো অনেক নাম-না-জানা অফিস। যে-কোনো মুহূর্তে এই এলাকার কোনো একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপেস্নক্স ধরে ঝাঁকি দিলে শয়ে শয়ে প্রকৌশলী আর কম্পিউটার প্রোগ্রামার বের হয়ে আসবে – অনেকটা ভরা মৌসুমে বরই গাছ ঝাঁকি…
-

লুব্ধক
আত্মহত্যা তাহলে এরকম! নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর শেষ বিন্দু দেখতে পায় মোজাফফর হোসেন; ষোলোতলা বারান্দা থেকে এক লাফে মৃত্যু হবে তার! দশ সেকেন্ড আগেও বোঝেনি মোজাফফর – কথা শুনছিল আর হাসছিল, মাসুদ সাহেবের লাগাতার রসিকতায় না হেসে থাকা যায় না; যদিও সে এসেছে মাসুদ সাহেব মানে ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমানের কাছে একান্ত প্রয়োজনে। মোজাফফর মন্ত্রণালয়ের সেকশন…
-

আগুন
যমজ কন্যাদ্বয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অস্ফুট স্বরে তাদের বয়সী বাবা শুধু আওড়াতে শিখলেন – ‘আগুন’, ‘আগুন’। একসময় তার মুখে কোনোদিন আর কেউ ‘আগুন’ শব্দ ছাড়া অন্য কোনোই শব্দ উচ্চারিত হতে শুনল না। ‘আগুন’ ছাড়া পৃথিবীতে আর যত শব্দ আছে তার সবকিছু তিনি ভুলেও গেলেন; কিন্তু সব কথা ভুলে গেলেও তার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা…
