ছোট গল্প
-

মাজু খাতুন
সুধা চুপিচুপি শতদ্রুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন, ‘এই যে দ্রুভাই, তোমার দাদাভাই সারাবাজার চষেও খুঁজে পাননি তোমার নরেন মিত্তিরের রস।’ শতদ্রু তখন ঘুমের দেশ ছেড়ে ধীরে ধীরে তরী ভেড়াবে তীরে। সুধার কথাটা শুনে আচ্ছন্নের মতো বলে ওঠে সে, ‘আহা, বউমণি, দাদাভাইয়ের কি মাথা খারাপ হলো, বাজারে গেছে খুঁজতে, ওটা তো পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রিটে,…
-

ফ্ল্যাট নম্বর ৭/সি
রাজাবাজার তেরো নম্বর রোডে গিয়েছিলেন কখনো? যাননি মনে হয়। ওদিকের বাসিন্দা না হলে কে যায় ওই ঘিঞ্জি এলাকায়। কোনো অফিস-আদালত নেই, ভালো কোনো মার্কেট বা রেস্তোরাঁ নেই – কেন যাবেন? কখনো গেলে দেখবেন ওই রোডের মাথায় পানির পাম্পটির পাশেই একটি আটতলা বাড়ি। গেটের ওপর লেখা ‘একরাম ভিলা’। বাড়ির কোনায় একটি নারিকেল গাছ মরি মরি করেও…
-

ব্ল্যাকবোর্ড
পাঁচ ফুট উচ্চতার দেয়ালের ঠিক ওপাশে দু-জোড়া চোখ স্থির তাকিয়ে থাকে স্কুলভবনটির দিকে। তাদের দৃষ্টিতে গীতা মাসির চলে যাওয়ার অপেক্ষা। গীতা মাসি বড়নখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আয়া। প্রতিদিন সকাল নয়টার পর স্কুলে আসে, শিক্ষকদের বসার রুমের তালা খুলে রুম পরিষ্কার করে। রুমের সামনেই রঙ্গন ফুলের কয়েকটি কচি গাছ, প্রতীক্ষা করছে লালচে আলো ছড়ানোর। গাছগুলোতে প্রতিদিন…
-

অপূর্ব নিবিড় নিদ্রা
চেতনা ফিরে আসার সময়ে আমি দূরাগত কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল, কেন মনে হয়েছিল জানি না, জলার ধারে একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে নিরুপদ্রব মুহূর্তে উচ্ছ্বসিত পাখিদের কাকলি। কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হলো, না, এটা মানুষেরই কণ্ঠস্বর। তবে টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা কথা ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে দিলে যেমন শব্দগুলো ভেঙেচুরে কিছু অর্থহীনতা ছড়িয়ে দেয়, অনেকটা সেরকম।…
-

মেঘের মতো কোমল
‘মানুষ এমুন ক্যানে লালু?’ চোখভরা জল নিয়ে হিল্লি প্রশ্নটা করে ওকে। উত্তরটা লালুর জানা নেই। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে হিল্লির দিকে। নারকীয় দৃশ্যগুলো এ-সময় চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। সেদিকে মুহ্যমান লালুর হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। মনে মনে সে-ও হিল্লির মতো কাকে যেন অসহায়ের মতো একই প্রশ্ন করে, ‘মানুষ…
-

স্বাধিকার
অগ্রহায়ণের শুরু। মাঠের ফসল উঁচু খামারে উঠতে শুরু করেছে। ঝাড়া-মাড়াইয়ের পরে সেই সম্পদ কয়েকদিন গেলেই গোলায় উঠবে। মুন্না ছোটখাটো চাকরি করে। সকালে বের হলে ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়। তাই বিঘেদুই জমি থাকলেও মাঠে যাওয়ার সুযোগ পায় না, যদিও জীবনের মূলস্রোতে সে চাষিবাড়ির ছেলে। তাই কি অগ্রহায়ণ এলেই মনের পরতে পরতে এতো বেশি খুশির আমেজে…
-

তর্জনীটি বাতাসে দুলে উঠলে
গলিপথে স্লোগান শুনে রান্নাঘরের জানালা থেকে উঁকি দিলো রাত্রি। মিছিল যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করল বারান্দায় গিয়ে গলির সেই শেষ মাথা পর্যন্ত লম্বা মিছিলটা দেখে। ‘জেলের তালা ভেঙেছি, শেখ মুজিবকে এনেছি’ বলতে বলতে হাঁটছে মিছিল। সেøাগানের আওয়াজে পাড়ার গলিটা যেন গমগম করছে। কালকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আজ রেসকোর্স ময়দানে…
-

সমাজের আবর্তে
এ-গলি সে-গলি ঘুরিয়ে কামালকে নিয়ে বিধান গেল বিরাট একটা দোতলা বাড়ির সামনে। ওপরে-নিচে কটা ঘর এক নিমেষে গোনা যায় না। একরাশ ভয় এসে জুটল কামালের মনে। বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। এমন জায়গায় সে এসে পড়েছে, এখানে যদি হাড়কাঠে ফেলে কাউকে বলি দেয়, তাহলে কেউ টেরই পাবে না। লোকজন যে একেবারে নেই, তা নয়, দু-চারজন…
-

গরিবকাল
মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। একটু এপাশ-ওপাশ করি, তারপর আবার ঘুমিয়ে যাই। চৌকিতে বাবার সঙ্গে ঘুমাই। মেঝেতে মা আর অন্য চার ভাই-বোন। আমি বড় ছেলে। বাবা খুব ভালোবাসেন আমাকে। আমিও বাবা ছাড়া কিচ্ছু বুঝি না। ক্লাস সেভেনে পড়া ছেলেটি এখনো পারলে বাবার কোলে চড়ে। বাবাও পারলে তাকে কোলে নেন। সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময়…
-

ভদ্দা কুণ্ডলকেশা
নগরবাসী এমন নির্দয় দৃশ্য কখনো দেখনি। চৈত্রের আকাশ খুব যেন রাগ করে আছে। সূর্যের তীব্র আলো, উদ্ধত উত্তাপ। পুড়ে যাচ্ছে প্রকৃতির সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গ। নিদাঘের এমন দুপুরে মগধের রাজধানী রাজগৃহের রাজপথের দৃশ্য : পিছমোড়া বাঁধা এক যুবক, চোখে কালো ফেট্টি। চাবুকপেটা করে, টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে রাজার কয়েকজন সান্ত্রী। আধো কৌতূহল, আধো ভীতি। নিরাপদ দূরত্বে থাকা…
-

গোখরার ছোবল, কেউটের বিষ
সিদ্ধান্তটা নিতান্তই আমার। ‘ভাবিয়া করিও কাজ’ – এ-প্রবচনের মর্মার্থ মাথায় নিয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মূল কথা হচ্ছে একা থাকব। একা থাকার মধ্যে মগ্নতার ব্যাপার থাকে। নিজের মধ্যে তৈরি হয় নিজস্ব চাহিদা, অযৌক্তিক চাহিদা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। আমার মধ্যে অযৌক্তিক চাহিদা নেই; অন্তত আমার দৃষ্টিতে আমি বিচার করে বলতে পারি সে-কথা। আমার স্বচ্ছতার…
-

বলাই ডাক্তারের ভিটেমাটি
‘যম নাকি শহরে আইসা গেছে, ডাক্তারবাবু…?’ ‘সে-তো এক মাসের বেশি। এপ্রিল মাসের তিন তারিখেই শহরের দখল নিয়েছে …।’ ‘গাঁও-গেরামেও নাকি ঢুকছে …?’ ‘হ্যাঁ। যাকে যেখানে পায়, পাখি-মারার মতো করে মারছে। ঘরবাড়ি পোড়াইয়া ছারখার করছে। শিবপুর জমিদারবাড়ি এখন দেখতে যেন ঠিক শ্মশানঘাট …।’ ‘তাইলে এহন বাঁচার উপায় কী, ডাক্তারবাবু? মাগ-ছাওয়াল নিয়া তো জানে মরণ লাগবো …।’…
